মাজিদ মিঠু
প্রকাশিত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘চলচ্চিত্র ও জাতীয় মুক্তি’ চলচ্চিত্রকর্মীদের আশার বাতিঘর
মাজিদ মিঠু

‘এ দেশের সংস্কৃতি এ দেশের মানুষ, তাদের ধর্ম, ভাষা, মাটি, জল, আকাশ, বাতাস থেকে তার জীবনরস আহরণ করবে, ফলে-ফুলে বিকশিত হবে, সুন্দর হবে। সংস্কৃতির এই সংজ্ঞাতেই অনূদিত হবে স্বাধীন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক বাঙ্গালির অর্থনীতি, রাজনীতি আর ললিতকলা।’ এমন এক স্বপ্ন নিয়েই দেশের মানুষের মুক্তির জন্য পশ্চিমা আড়ম্বরপূর্ণ জীবন ছেড়ে ফিরে এসেছিলেন আলমগীর কবির। দেশের স্বার্থে এই ফিরে আসাকে তিনি বলেছেন নিজস্ব দেনা। ‘দেশমাতৃকার কাছে দেশের কাজ করার জন্য কোনরকম পুরস্কার চাওয়া চলবে না। কারণ দেশের কাজ করার সুযোগ পাওয়াটাই সর্বোচ্চ পুরস্কার।...যুদ্ধে গিয়েছিলাম যুদ্ধপরবর্তী কালে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে--দেশমাতৃকার কাছে নিজের দেনা পরিশোধ করে মুক্ত মন নিয়ে ঘুমোতে--প্রাক্তন দার্শনিকের [মত ‘মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম’ এ কথা বারবার বলার জন্য নয়]।’ দেশের প্রতি এই ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বিষয়েও আলমগীর কবিরের গভীর ভালোবাসার ছাপ পাওয়া যায়, তা হলো চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রকে তিনি দেখেছিলেন মত প্রকাশের শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময় মাধ্যম হিসেবে। লন্ডনে থাকতেই চলচ্চিত্রের প্রতি তার অনুরাগ গভীর হয়। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে ইঙ্গমার বার্গম্যান-এর দ্য সেভেন্থ সিল দেখে চলচ্চিত্রের প্রতি তার এ অনুরাগ জন্ম নেয়। ‘এই একটি মাত্র ছবি আমাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে এবং আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।’ মানুষের মুক্তি ও চলচ্চিত্র নির্মাণ এ দুটি স্বপ্ন যেনো আলমগীর কবিরের মধ্যে মিশে গিয়েছিলো অবিচ্ছেদ্যভাবে।
তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের নিপীড়নের খবর পড়ে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে গড়ে ওঠে ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট। যার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন আলমগীর কবির। তাই ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে দেশে ফিরতেই তার স্থান হয় কারাগারে। সরকারি জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে লিখতে তাই ঢাকায় এসে পেশা হিসেবে বেছে নেন সাংবাদিকতাকে। একই সঙ্গে চলতে থাকে চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি। মূলত চলচ্চিত্র সমালোচনা লিখেই প্রসিদ্ধি পান তিনি। পরিচয় ঘটে জহির রায়হানের সঙ্গেও। মুক্তিযুদ্ধে তারা কাজ করেছেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন সদ্য স্বাধীনতার আবিরে রাঙা অসাম্প্রদায়িক এক বাংলাদেশে চলচ্চিত্রশিল্প বিকশিত হবে তার নিজস্ব রঙে। বলবে এ মাটির, এ রক্তের কথা। কিন্তু দিন যতো গড়াতে থাকলো ততোই আশাহত হতে থাকলেন আলমগীর কবির। তার লেখনিতে, সভা-সেমিনারের বক্তৃতায়, ঘরোয়া আড্ডায়, চিঠি-পত্রে তাই তিনি চলচ্চিত্র নিয়ে লিখেছেন-বলেছেন তার স্বপ্নের কথা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কেমন হওয়া দরকার, কোন পথে সে চলচ্চিত্রের বিকাশ ঘটবে, তা নিয়ে তিনি অকাল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বলে গেছেন। তার লেখাগুলো যেনো মুক্তার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিলো কোনো এক অজ্ঞাত সমুদ্রতটে। স্বমহিমায় উজ্জ্বল কিন্তু অবহেলিত। সেই মুক্তাদানাগুলো দিয়েই নতুন করে মালা গাঁথতে উদ্যমী হয়েছে কয়েকজন মানুষ। তারই ফসল ‘চলচ্চিত্র ও জাতীয় মুক্তি’ বইটি। আলমগীর কবির রচনা সংগ্রহ সিরিজের প্রথম বই এটি।
প্রায় চারশো পৃষ্ঠার বৃহদাকার এ রচনা সংগ্রহ সম্পাদনা করেছেন আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান ও প্রিয়ম প্রীতিম পাল। সম্পাদনা পরিষদে আরো আছে আরস্তু লেনিন খান, তাহমিদাল জামি, মেহেদী হাসান, রায়হান রাজু ও সামসুদ্দোজা সাজেন। সহকারী সম্পাদক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম। গ্রন্থের প্রবেশিকায় সম্পাদকমণ্ডলী জানিয়েছে, দীর্ঘ দুই দশক ধরে আলমগীর কবির যে লেখালেখি করেছেন তা শুধু চলচ্চিত্র সমালোচনাতেই সীমাবদ্ধ নেই বরং ইতিহাসকার হিসেবেও তিনি হয়ে দাঁড়িয়েছেন সমান দক্ষ। আলমগীর কবির যেমন জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দেখেছেন, তেমনই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির একাংশের মুক্তিসংগ্রামও প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছেন। সম্পাদকমণ্ডলী তাই রচনা সংগ্রহের এ খণ্ডের নাম দিয়েছে ‘চলচ্চিত্র ও জাতীয় মুক্তি’। আলমগীর কবিরের লেখালেখি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সেখান থেকে সংগ্রহ করতে তার পরিবার, বন্ধু, গুণগ্রাহী, চলচ্চিত্র গবেষক, সাংবাদিকসহ যারা এ লেখা জোগাড়ে সহায়তা করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে সম্পাদকমণ্ডলী। এ গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে দ্বিধাহীন নির্মাতা জহির রায়হানের পূণ্য স্মৃতিতে। যিনি ছিলেন আলমগীর কবিরের একাধারে বন্ধু, গুরু, এমনকি অনেকটা ভরসাস্বরূপ।
এ গ্রন্থে প্রবন্ধ-নিবন্ধ, বক্তৃতা-বিবৃতি, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি মিলিয়ে আলমগীর কবিরের মোট ৪৫টি বাংলা রচনা স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে কবিরের সমসাময়িক দুইজন চলচ্চিত্রনির্মাতার আরো তিনটি লেখা সংযুক্ত করা হয়েছে। সম্পাদকমণ্ডলীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ৪৮টি লেখা কেবল আলমগীরের বৃহৎ রচনাবলীর ভূমিকাস্বরূপ। এ লেখাগুলো থেকে কেবল তার চলচ্চিত্র ভাবনার কিছু ইশারা পাওয়া যাবে। “আলমগীর কবিরের অজ্ঞান অথবা ‘আমি মুক্তিযুদ্ধকে বুঝতে পারিনি’” শিরোনামে বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। আলমগীর কবিরের দেশের প্রতি ভালোবাসা-দায়বদ্ধতাকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন ‘দেশবাৎসল্য’ নামে। ভূমিকায় তিনি আলমগীর কবিরের দেশের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি মানুষের জন্য সংগ্রাম ও একটি স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে আলমগীর কবিরের অনুরাগের স্বার্থক একটি ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন।
ভূমিকার পরে প্রবেশিকা, কুঞ্চিকা ও বাংলা হরফে অবাংলা নামবলি-অংশের পরে শুরু হয়েছে এ গ্রন্থের মূল অংশ। এ গ্রন্থটিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগে রয়েছে প্রবন্ধ ও নিবন্ধ; দ্বিতীয় ভাগে বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকার। এ দুটি ভাগ আবার বিষয়ভিত্তিক তিনটি বিভাগে বিভক্ত। এছাড়াও শেষাংশে সংবর্ধনা অংশে রয়েছে আলমগীর কবিরকে নিয়ে লেখা দুজন নির্মাতার তিনটি লেখা। এরপর আলমগীর কবির তথ্যমালা অংশ সাজানো হয়েছে, চলচ্চিত্রপঞ্জি, গ্রন্থপঞ্জি, স্বীকৃতিমালা, জীবনপঞ্জি ও দোহাই দিয়ে। গ্রন্থটি শেষ হয়েছে রচনা পরিচয় ও নির্দেশিকার মাধ্যমে।
গ্রন্থের প্রথম ভাগ: প্রবন্ধ ও নিবন্ধ-এর তিনটি বিভাগ রয়েছে। জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, ইতিহাস ও মূল্যায়ন এবং বিতর্ক ও বিবৃতি। জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম অংশে স্থান পেয়েছে ছয়টি লেখা। যার প্রথমটি ‘একাত্তরের ডায়েরি’। প্রবন্ধটি জুড়ে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ ও যুদ্ধকালীন অবস্থার চিত্র। মুজিবনগর সরকার গঠনের পর লুকিয়ে আগরতলা পৌঁছা এবং সেখানে অবস্থা দেখে আলমগীর কবির ভাবতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘আওয়ামীলীগ এই যুদ্ধের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। সামরিকভাবে তো নয়ই, এমনকি প্রশাসনিকভাবেও নয়।...শেখ সাহেব থাকলেও হত, কিন্তু তিনি কোথায় তখনো সঠিক কেউ জানে না।’ এমন অবস্থায় আগরতলা থেকে উড়োজাহাজে কলকাতা এলেন কবির। উড়োজাহাজ থেকেই দেশে ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছিলেন। সেখানে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারে আহমেদ চৌধুরী নামে কমেন্টারি পড়তে শুরু করেন। এ সময় সাংবাদিক হিসেবে বিশ্বের বড়ো বড়ো পত্রিকা-বেতারে চাকরির সুযোগ এলেও তা প্রত্যাখ্যান করে দেশের স্বার্থে কাজ করতে থাকেন আলমগীর কবির। তাকে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার তথ্য মন্ত্রণালয়ের চিফ রিপোর্টার করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইংরেজি বিভাগ খোলার দায়িত্ব দেন। একাত্তরের ডায়েরিতে উঠে এসেছে লো বাজেটে প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে জহির রায়হান স্টপ জেনোসাইড-এর কাজ শেষ করেছিলেন। কবির উল্লেখ করেন, স্টপ জেনোসাইড ব্যান করার জন্য একদল তথাকথিত আওয়ামী লীগার স্বাক্ষর অভিযান শুরু করেছিলো। এর মধ্যে জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একটি বিশেষ বার্তার বাহক হয়ে ঢাকায় ফিরতে হয় কবিরকে। এ সময় পায়ে হেঁটে দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার সময় পাকবাহিনীর হামলায় তিনি আহত হন। অনেক কষ্টে কলকাতায় ফিরে গিয়ে নিজ কাজে যোগ দেন। এর মধ্যে জহির রায়হানের প্রযোজনায় তিনি দুটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন। কবির উল্লেখ করেছেন, জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রটি সেসময় কলকাতায় প্রদর্শন করে ভারতীয় টাকায় প্রায় পাঁচ লাখের বেশি আয় করে। যার পুরোটাই জহির বাংলাদেশ সরকারকে দান করেছিলেন। আলমগীর কবির ‘একাত্তরের ডায়েরি’ শেষ করেছেন আক্ষেপ দিয়ে। ‘এত বড় ত্যাগের স্বীকৃতি কই? কজনই বা খবরটা রাখে?’৫‘একাত্তরের ডায়েরি’ মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনা ও চলচ্চিত্রের এক অমূল্য দলিল হিসেবে গণ্য হওয়ার দাবি রাখে।
পরের তিনটি প্রবন্ধ ‘মুজিবনগরে চলচ্চিত্র: কর্ম ও প্রত্যাশা’, ‘মুক্তিযুদ্ধ এবং আমাদের চলচ্চিত্র’ এবং ‘সংস্কৃতির সংকট ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র’। প্রথম প্রবন্ধে মুজিবনগর সরকারের চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রচেষ্টা উঠে এসেছে। যেখানে কবির দেখাচ্ছেন, সেসময়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম সিরিয়াস প্রচেষ্টা হয় সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে। এবং স্টপ জেনোসাইড তারই ফসল। যা দেখে তৎকালিন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীও চমৎকৃত হন। এবং এ সময় এক সভাতে সিদ্ধান্ত হয়, আওয়ামী লীগের বাইরে যারা বুদ্ধিজীবী তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেওয়া হবে। কবির এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। চলচ্চিত্রে নবতরঙ্গের আশা রেখে প্রবন্ধ শেষ করেন তিনি। পরবর্তী দুটি প্রবন্ধে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে স্থূল কাহিনি-নির্ভর কিছু চলচ্চিত্রের সমালোচনা করেছেন। তাতে সরকারের কী দায়িত্ব ও পরিচালকের কতোটুকু দায় থাকা দরকার তা উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে মানুষের রুচি নষ্ট করে দিতে বাজারি চলচ্চিত্রের প্রাধান্য ও তার ভিতরেই মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাজুড়ে দিয়ে ব্যবসায়িক রূপ দেওয়াতে যে হ-য-ব-র-ল তৈরি হয়েছে, তার জন্য এ সংস্কৃতি ও পরিচালকদের দুষেছেন তিনি। সেন্সরশিপ নিয়ে কবির বলেছেন, শিল্প বিচার করতে পারেন কেবল শিল্পীরাই, আমলা নয়। তাই তিনি সেন্সরবোর্ড আরেকটু ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন। ফিল্ম ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার দাবি মুজিবনগর সরকারের কাছেই পেশ করেছিলো তারা। কিন্তু স্বাধীনতার পর সে সব উবে গেছে, যা আজও বাস্তবায়ন হয়নি বলে আক্ষেপ করেছেন কবির। তার ধীরে বহে মেঘনা-কে গতানুগতিক ধারার বাইরে নির্মাণ করায় এখানকার বুদ্ধিজীবীরা নিতে পারেননি এমন ধারণা কবিরের। মোদ্দা কথা, তিনি চলচ্চিত্রের অন্দর-বাইরের সংস্কৃতি বদলে দেওয়ার কথা বলেছেন এ প্রবন্ধ দুটিতে।
‘চলচ্চিত্রে একুশের চেতনা’ এবং ‘একুশের চেতনায় বাংলাদেশের নাটক ও চলচ্চিত্র’ প্রবন্ধ দুটিতে আলমগীর কবির চেতনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তার মতে, একুশের ভাষা বিপ্লব কেবলই মাতৃভাষায় কথা বলা, বিদ্যা আহরণ বা অফিসের নথি বাংলায় হবে এমন দাবিতে ছিলো না, কারণ ছিলো আর্থসামাজিক। অর্থাৎ সমস্ত অন্যায় অবিচারের মুখোশ ভেঙে প্রগতিশীল, আপসহীন একটি জাতি গঠনই ছিলো এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য। আর তাতে বলিয়ান হয়েই রচিত হওয়ার কথা ছিলো এদেশের শৈল্পিক পরিসর--নাটক, চলচ্চিত্র। কিন্তু মাঝখান থেকে বাজারি, মুনাফালোভীরা স্থূল বিনোদনসর্বস্ব চলচ্চিত্র-নাটকে দেশের মানুষকে বুদ করে রাখতে চেয়েছে। আলমগীর কবির এর পরিবর্তন চেয়েছেন।
গ্রন্থের প্রথম ভাগ, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ-এর দ্বিতীয় বিভাগ--ইতিহাস ও মূল্যায়ন। এ অংশে কবিরের ১৪টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ স্থান পেয়েছে। এ অংশের ‘আজ ও কালের প্রেক্ষণে বাংলাদেশের ছবি’, ‘একুশ বছরের চলচ্চিত্রাঙ্গন: একটি সমীক্ষা’, ‘স্বাধীনতা-উত্তর চলচ্চিত্র’, ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের পঁচিশ বছর’ এবং ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র’ শিরোনামের প্রবন্ধ-নিবন্ধে আলমগীর কবির তুলে ধরতে চেয়েছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শুরু হয়েছিলো কীভাবে, কোন কোন বাঁক পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান রূপ আসলো, এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কী হওয়া উচিত ছিলো আর কী হয়েছে! কবিরের মতে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণের একটা যুগ এসেছিলো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাজারি যুগের কাছে সে যুগের বাণিজ্যিক পরাজয় ঘটেছে। কবির স্বপ্ন দেখেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পরে অন্তত ১০ বছর সেই স্বাধীনতার চেতনায় মুক্তিকামী মানুষের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ হবে। কিন্তু তার সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। প্রথমত, চলচ্চিত্রে অর্থ লগ্নিকারীরা এটা চায়নি। তারা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কে চলচ্চিত্রে অর্থ লগ্নি করে লাভসহ তা তুলে আনার নিরাপদ মাধ্যম ভেবেছিলেন। ফলে চটুল কাহিনি নিয়ে অবাস্তব চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে। কবিরের ভাষায়, এরা কঠিন ব্যবসায়ী। যারা চিন্তার উদ্রেগ ঘটায় এমন চলচ্চিত্রে অর্থ লগ্নি করতে চান না। দ্বিতীয়ত, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটছিলোই না। কবির মনে করেন, ‘এইসব জৈবিক বিনোদনসর্বস্ব ছবির একটা রাজনৈতিক দিকও আছে। সার্বিক নৈরাজ্য এবং হতাশার প্রেক্ষাপটে এ জাতীয় ছবি গণ-আফিমের কাজ করে। তাই প্রত্যেক গণবিরোধী সরকার এসব ছবিকে রাজনৈতিক দোসর ভেবে পর্যাপ্ত নির্মাণ ও প্রচারের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চত করে।’ ফলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি ভালো চলচ্চিত্র। কিছু ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। কবির দেখান, নকল,‘কু-রুচিপূর্ণ’ চলচ্চিত্রগুলো সেন্সরবোর্ডে ছাড় পেয়ে যায়, কিন্তু সামাজিক বাস্তবতার চলচ্চিত্রগুলো আটকে যায় রাজনৈতিক বিবেচনায়। তৃতীয়ত, এইসব নিম্নমানের চলচ্চিত্র দেখে এক শ্রেণির দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফলে স্বাধীনতার পরে যে ভালো দর্শক রুচি গড়ে ওঠার আশা করেছিলেন কবির, তার অপমৃত্যু ঘটে এভাবেই। ৬০-এর দশকের কথা মনে করিয়ে কবির লিখেছেন, ভারতীয় ও উর্দু চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রূপবান বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জয় নিশ্চিত করে। কিন্তু লোককাহিনি আর যাত্রাপালাভিত্তিক এ চলচ্চিত্র ধারা প্রাধান্য পাওয়ায় ‘ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশও পেল একটি বেঢপ বামন চলচ্চিত্র শিল্প।’ এরপর এখন পর্যন্ত দেখা যায়, বস্তুনিষ্ঠ, সামাজিক দায়বদ্ধ চলচ্চিত্রগুলো বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মুখ থুবড়ে পড়ে। প্রেক্ষাগৃহ পায় না। পেলেও ঢাকার বাইরে কেউ জানতেই পারে না সেই চলচ্চিত্রের নাম। ফলে এর নির্মাতা, অর্থ লগ্নিকারকরা হারিয়ে যায় একটি দুটি চলচ্চিত্র করেই। এমনটা যে হবে তা কবির বলেছিলেন অনেক আগেই।
‘চলচ্চিত্রের গতিপ্রকৃতি ও প্রসঙ্গ কথা’, ‘প্রামাণ্য চলচ্চিত্র’, ‘চলার পথের কিছু ভাবনা’ এবং ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যম: গলদ কোথায়’ প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলোতে উঠে এসেছে গণমাধ্যম ও চলচ্চিত্রের নির্মাণ ও প্রকৃতি সম্পর্কিত ভাবনা। এ অংশে কবির সংলাপ, সঙ্গীত, অভিনয়, চলচ্চিত্রকার এবং অঁত্যর চলচ্চিত্রের মতো বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তার মতে, বাংলাদেশের নির্মাতাদের প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের ওপর আরো জোর দেওয়া উচিত। তবে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র তৈরি করে যে জীবিকা নির্বাহ করা যাবে না, তাও স্মরণ রাখতে বলেছেন তিনি। কবিরের মতে, চলচ্চিত্রে অবশ্যই একজন নির্মাতার নিজস্ব ধ্যান-ধারণা চেতনার প্রকাশ থাকতে পারে। তাছাড়া ভালো চলচ্চিত্র রচনার দায় শুধু নির্মাতার নয়, এ কথাও বলেছেন কবির। ‘চলচ্চিত্রে নতুন গল্প বলা আমার মতে চলচ্চিত্রকারের দায়িত্ব নয়। কারণ নতুন গল্পপ্লট আবিষ্কার করার দায়িত্ব লেখকের। চলচ্চিত্রকারের দায়িত্ব হল নতুন বা পুরনো যেকোন আখ্যানের নতুন সিনেমাটিক ট্রিটমেন্ট বা ইন্টারপ্রিটেশন সৃষ্টি করা।’ দেশের চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই লেখক গোষ্ঠীর অভাবই প্রকট। চারিদিকে রিমেইক, চুরি আর বাইরের দু-তিনটা চলচ্চিত্রকে কেটে ছেঁটে ‘মৌলিক’ গল্প লেখা লেখকের দাপটই বেশি। এদিকে গণমাধ্যমের চরিত্র তুলে ধরে কবির দেখাচ্ছেন, সদ্য স্বাধীন দেশে মানুষের আচরণ-রীতি-নীতি পরিবর্তন ও গঠনে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যমের সংখ্যা হলেও সেখানে সুচিন্তার যে বিস্তৃতি বাড়ছে না সেটা দুশ্চিন্তায় ফেলেছিলো কবিরকে। প্রচলিত গণমাধ্যমের পাশাপাশি চলচ্চিত্রও সমাজ ও জনমানস গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এমনটাই চেয়েছেন কবির।
‘সুসংস্কৃতি চাই’ এবং ‘ভিসিআরের দৌরাত্ম্য ও মধ্যবিত্ত দর্শক’ প্রবন্ধ দুটিতে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সংস্কৃতির পরিবর্তনের কথা বলেছেন কবির। নষ্ট ও পচে যাওয়া সংস্কৃতি উপড়ে ফেলে মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সামাজিক দায়বদ্ধ সংস্কৃতির কথা বলেছেন তিনি। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এই সুসংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল বলেই মানেন কবির। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও এ সুসংস্কৃতি দাবি করেছে কবির। তার মতে, সুনির্মিত চলচ্চিত্রও সুসংস্কৃতির বাহক। আর এই সুনির্মিত চলচ্চিত্রের জন্য প্রয়োজন হবে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সুসংস্কৃতি। যা আজও অধরাই থেকে গেছে এই বাংলাদেশে। সেন্সরবোর্ডে স্বজনপ্রীতি, আমলাতান্ত্রিকতার অবসান ঘটিয়ে মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন, শ্রদ্ধাশীল, শিল্পমনাদের নিয়োগ দিতে পরামর্শ দিয়েছেন কবির। তাছাড়া সরকারি অনুদানের ক্ষেত্রেও এ সুসংস্কৃতি একইভাবে জরুরি বলে মনে করেন তিনি। আর প্যারালাল প্রদর্শনী ব্যবস্থা ছাড়া এ সবই বৃথা যাবে। তাই চলচ্চিত্র পরিবেশনেও সুসংস্কৃতি জরুরি। তাছাড়া অপসাংবাদিকতা, সেন্সর সবকিছুকে পথে আনতে পারলেই চলচ্চিত্র মুক্তি পাবে। তাই মুক্ত চলচ্চিত্রের দাবি জানিয়েছেন আলমগীর কবির। ৮০’র দশকের শুরুর দিকের ভিসিআর-এর দৌরাত্ম্যে জনমানুষের দৈহিক ও চেতনার যে ক্ষতি তা অপূরণীয় উল্লেখ করে তা থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন কবির। সেই সঙ্গে চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের পরামর্শও দিয়েছিলেন কী করে ভিসিআর থেকে দর্শককে প্রেক্ষাগৃহমুখী করা যায়। যা আজও প্রায় সমান কার্যক্ষমতা নিয়ে পথ দেখাচ্ছে আমাদের। কিন্তু আমাদের দেশের চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের চোখে এতোটাই ধুলা জমা হয়েছে যে ঠিক প্রেক্ষাগৃহের যুগ যুগ পুরনো পর্দার মতো, তারা দেখতেও পাচ্ছে না কতো সহজেই চলচ্চিত্রের সুদিন ফেরানো যায়। কবির যেনো উলুবনে মুক্তা ছড়িয়ে রেখে গেছেন।
‘জহির: একটি চেতনা’ নিবন্ধে জহির রায়হানের সংগ্রামী জীবন ও চলচ্চিত্রের জন্য তার অবদান মূল্যায়নের প্রয়াস লক্ষণীয়। কবির দেখিয়েছেন মুনাফালোভী প্রযোজক-পরিবেশকদের চাপেও জহির ছিলেন অনড়। তার চেতনাকে কেউ দমাতে পারেনি। দেশকে ভালোবেসেই তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে এসেছিলেন এবং করেছেন। তার চলচ্চিত্রগুলো মানুষের কথা বলে, শোষিতের কথা বলে, সংগ্রাম করতে শেখায়। তাই জহির মানুষ হিসেবে যেমন উন্নত তেমনই শিল্পী হিসেবেও। ‘ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো: অবিশ্বাস্য তিরোধান’ প্রবন্ধে কবির লিখেছেন, ত্রুফোর অকালমৃত্যু শুধু আটলান্টিকের উভয় তীরেই বিষাদের ছায়া ফেলবে না, এই উপমহাদেশেও শূন্যতার উপলব্ধি ঘটাবে। ঠিক একইভাবে আলমগীর কবিরের অকাল তিরোধানও আমাদের মধ্যে শূন্যতার উপলব্ধি ঘটায়।
গ্রন্থের প্রথম ভাগ; প্রবন্ধ ও নিবন্ধ-এর তৃতীয় বিভাগটি হলো--বিতর্ক ও বিবৃতি। এ অংশে আলমগীর কবিরের ১০টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ স্থান পেয়েছে। এ অংশের প্রথম প্রবন্ধটি “বিষয় ‘সূর্যকন্যা’: মহসিন শস্ত্রপাণির সমালোচনার জবাবে” কবির লিখেছিলেন ‘বিচিত্রা’য় প্রকাশিত শস্ত্রপাণির এক সমালোচনার জবাবে। সূর্যকন্যায় আলমগীর কবির সাংস্কৃতিক বিকৃতি ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছিলেন শস্ত্রপাণি। এই অভিযোগের যথাযথ জবাব দিয়েছেন কবির। কবিরের মতে, সূর্যকন্যা অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পেয়েছে এজন্যই যে নারী অধিকার বিষয়ে এটির চরিত্রগুলো শিক্ষিত মহলের অন্তরঙ্গ সীমানার মধ্যে নির্মিত হয়েছিলো। এছাড়া “‘সীমানা পেরিয়ে’ নিয়ে চিত্রকর্মীর আলোচনা প্রসঙ্গে” প্রবন্ধটিতে একজন চিত্রকর্মীর ব্যক্তিগত মতামত নিয়ে আলমগীর কবিরের জবাব উঠে এসেছে। অযাচিত ভাষায় আক্রমণ করায় এ প্রবন্ধটিতে তার তীব্র প্রতিবাদ জানান তিনি।
একটি প্রদর্শনী ক্রিকেট ম্যাচে অংশগ্রহণ না করায় প্রযোজক সমিতির সভাপতিসহ অন্যান্যের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে কবির ও তার স্ত্রীর দেশপ্রেম নিয়ে কথা ওঠায় তার প্রতিবাদস্বরূপ কবির ‘চিত্রকর্মীদের বিবৃতি প্রসঙ্গে’ নিবন্ধটি লেখেন। যেখানে কবির ও তার স্ত্রী আক্রোশের শিকার হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাছাড়া প্রযোজক সমিতি ও অন্যান্যদের উদ্দেশে তিনি পাঁচ দফা কর্মপদ্ধতিও বাতলে দেন। এ নিবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় ‘কবির সাহেব, সবই কি প্রচারের জন্য?’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লেখেন তৎকালীন প্রযোজক সমিতির সভাপতি এহতেশাম। যা আলোচিত গ্রন্থের সংবর্ধনা ক-অংশে ছাপা হয়েছে। যেখানে কবিরের বক্তব্য খণ্ডন ও আরো যুক্তি তুলে ধরা হয়। এহতেশামের এই নিবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কবির আরো একটি নিবন্ধ লেখেন ‘এই আমার শেষ উত্তর: বিবাদ করার সময় আমার নেই’। এ নিবন্ধে কবির তার বিরুদ্ধে ভারতীয় শিল্পী এনে কাজ করা, উর্দু ও ইংরেজি চলচ্চিত্রের আমদানি প্রসঙ্গে এহতেশামের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। “‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ও আমজাদ হোসেন প্রসঙ্গে খোলা চিঠি” প্রবন্ধে নির্মাতা আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে সূর্য দীঘল বাড়ির চরিত্র চুরির অভিযোগ ওঠে এবং তিনি জবাব না দেওয়ায় কবির এ প্রবন্ধে তাকে জবাব দিতে অনুরোধ জানান। পাশাপাশি প্রবন্ধটিতে নকল, চুরি ও কপিরাইট হননের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া নিয়ে কবির তার যুক্তি তুলে ধরেন। ‘ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স সম্পর্কিত হাওয়াই খবর প্রসঙ্গে’ নিবন্ধটিতে নির্মাতা এম আবদুস সামাদকে বাদ দিয়ে ফিল্ম আর্কাইভের প্রথম একটি কোর্সের পরিচালক হওয়ার বিষয়ে জবাব দেওয়া হয়েছে। যেখানে অভিযোগ করা হয়েছিলো কবির ইচ্ছাকৃতভাবে সামাদকে বাদ দিয়েছেন।
‘প্রযোজক সমিতির অভিযোগের জবাবে’ নিবন্ধটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের ভাবমূর্তিকে জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করার অভিযোগ সম্পর্কিত একটি জবাব। যেখানে কবির মনোবেদনা নিয়ে বলেন, আমি কি এ শিল্পের বাইরের কেউ? এ নিবন্ধে নির্মাতাদের আত্মসমালোচনার পরামর্শ দেন কবির। ‘খান আতা আপনি বহুরূপী’ নিবন্ধটি আলমগীর কবির লিখেছিলেন খান আতাউর রহমানের ‘আলমগীর কবিরের কাছে খোলা চিঠি’ প্রবন্ধটির জবাব হিসেবে। যা আলোচিত গ্রন্থের শেষের দিকে সংবর্ধনা খ-তে স্থান পেয়েছে, এবং এরপর খান আতাউর রহমান ‘আমিতো বহুরূপী বটেই’ শিরোনামে এর জবাব দেন। সেটিও আলোচিত গ্রন্থের সংবর্ধনা গ-অংশে ছাপা হয়েছে। এরপর আলমগীর কবির সেটির জবাবে লেখেন ‘খান আতা আবার প্রমাণ করলেন, আমরা ক্রস পারপাসে কথা বলছি’। এ নিবন্ধগুলোতে আলমগীর কবির এবং খান আতাউর রহমান নিজেদের ব্যক্তিগত, চলচ্চিত্র নির্মাণ, চলচ্চিত্র নিয়ে বোঝাপড়া, মুক্তিযুদ্ধে একে অন্যের ভূমিকা নিয়ে একে অন্যের কথার জবাব দিয়েছেন। ‘প্রতারকরা আমাকে প্রতারক বলে খিস্তি করলে খুব একটা আশ্চর্য হই না’ শীর্ষক এ প্রতিবাদপত্রটি আলমগীর কবির দিয়েছিলেন ‘পূর্বানী’ পত্রিকায়। কবিরকে ‘রঙ্গব্যঙ্গ রিপোর্টে’ প্রতারক বলার জবাব দেওয়ার পাশাপাশি এফডিসি’র এমডি’র কার্যকারিতার কথাও তিনি তুলে ধরেন। কবিরের মতে, এফডিসি’তে যিনিই দায়িত্ব নিয়ে আসেন, প্রথমে ‘সুস্থ ধারা’র চলচ্চিত্র নির্মাণে তার সদিচ্ছা থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও অদৃশ্য নিয়মে ঝিমিয়ে যান। কবিরের ভাষায়, কোটারির বা ক্লাবের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। অর্থাৎ শেষ অব্দি ভালো চলচ্চিত্রের কথা কেবল কথা হয়েই বাতাসে উড়তে থাকে।
গ্রন্থের দ্বিতীয় ভাগ, বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকার-এর তিনটি বিভাগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ, চলচ্চিত্রশিল্প এবং চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন। প্রথম বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধ অংশে তিনটি লেখা রয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন ছবি চিন্তা করা কঠিন’, ‘মুক্তিযুদ্ধের নামে যা দেখান হয় তা রীতিমত মনগড়া’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধে চলচ্চিত্র কর্মীদের অবদান খুবই কার্যকর ছিল’ শিরোনামের লেখা তিনটিতে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ নিয়ে আলোচনা করেছেন কবির। মুক্তিযুদ্ধকে বোঝা আর সে অনুযায়ী চলচ্চিত্র নির্মাণ এক কঠিন পথ। কবির নিজেও সেটা স্বীকার করেছেন। ‘[আমি তখন] মুক্তিযুদ্ধকে ঠিক বুঝতে পারিনি। কেননা আমি জানতাম সত্য এক জিনিশ এবং বাস্তব আরেক জিনিশ। আমি বুঝতে পারিনি মুক্তিযুদ্ধে কে ভিলেন এবং কে নায়ক।’ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পর্যাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাণ না হওয়ার পিছনের কারণও কবির বাতলে দিয়েছেন। ‘আমাদের এখানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি তৈরি না হবার কারণ হচ্ছে, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন তাঁরা তা হৃদয়ে অনুভব করেন না, আর যাঁরা অনুভব করেন তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ সেভাবে দেখেননি। এছাড়া রয়েছে নানা ধরনের অক্ষমতা।’ আলমগীর কবির চেয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে কোন দিকগুলো উঠে আসবে তার পরিষ্কার একটা সরকারি নীতি থাকা উচিত। কিন্তু ভগ্ন এই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কে সেই নীতি তৈরি করবে সেটি এখন বড়ো প্রশ্ন। কবির মনে করেন, তার সময় পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে যতো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে বেশিরভাগই বাণিজ্যিক অতিরঞ্জনের দায়ে দুষ্ট। টাকা আয়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধের মানবিক আবেদন নিয়ে খেলা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় বিভাগ, চলচ্চিত্র শিল্প অংশে স্থান পেয়েছে আটটি বক্তৃতা-সাক্ষাৎকার। ‘সুস্থ সমালোচনা কেউ সহ্য করতে পারে না’ সাক্ষাৎকারটিতে কবির বলতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একে অন্যের প্রতি অবিশ্বাস ও সন্দেহ পোষণ করেন। অন্যের ওপর দিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে তৎপর সবাই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলচ্চিত্র সমালোচনা করে প্রসিদ্ধি পাওয়া কবির যখন তাই নিজ দেশে সমালোচনা শুরু করলেন, তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন কিছু ক্ষেত্রে। ‘আমাদের চলচ্চিত্রে সমাজ সচেতন কর্মনিষ্ঠ শিল্পী প্রয়োজন’ শীর্ষক সাক্ষাৎকারে কবির নিজের চলচ্চিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া ও দেশের কাজে দেশে ফেরার গল্প বলেছেন। পরের অংশে এদেশে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণের পথ বাতলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এখানে সেন্সরবোর্ড সম্পর্কে কবির বলেছেন, এর কোনো প্রয়োজন নেই। তাছাড়া অন্য দেশের চলচ্চিত্র দেশে মুক্তি দিতেও তার অনাপত্তির কথা জানান। তার মতে, প্রতিযোগিতা থাকলে শিল্প আরো সমৃদ্ধ হবে।
সাপ্তাহিক বিচিত্রায় দেওয়া তার ‘পদ্ধতিগত শিক্ষা থাকলে সাহস এবং শক্তি দুটোই বাড়ে’ শিরোনামের সাক্ষাৎকারে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, এ শিক্ষা কোনো পরিসরে আটকে রেখে নয় বরং শিক্ষার দরজা উন্মুক্ত রেখেই সৃজনশীল কাজে সুফল বয়ে আনতে পারবে। ‘আমরা প্রোটিয়ান অভিনয় পদ্ধতির ছায়া আজও সরাতে পারিনি’ শীর্ষক বক্তৃতায় চলচ্চিত্রে অভিনয়ে বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন কবির। এক্ষেত্রে কৃত্রিম অভিনয়রীতি বদলে স্বতঃস্ফূর্ত ও পরিবেশের সঙ্গে মিশিয়ে করা অভিনয়রীতিকে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। ‘মানুষ সমাজ ও জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েছে’ শীর্ষক মতামতে কবির বলতে চেয়েছেন, সাংস্কৃতিক শূন্যতার এই সময়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় মানুষের মূল্যবোধ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে এ সংস্কৃতিতে উদ্ভট ও ফ্যান্টাসি নির্ভর চলচ্চিত্র জায়গা দখল করে নিচ্ছে। যতোদিন সমাজ স্থির না হবে ততোদিন চলচ্চিত্রেও সুস্থতা আসবে না বলেই মনে করেন তিনি। ‘ভালো ছবির ব্যাপারে ছেলেদের চাইতে মেয়েদের আগ্রহই বেশি’--এ সাক্ষাৎকারে কবির যুক্তি তুলে ধরেন, জৈবিক তাড়নায় অনেক শিক্ষিত পুরুষও ‘নোংরা চলচ্চিত্র’ দেখে, কিন্তু নারীরা এক্ষেত্রে শৈল্পিক চলচ্চিত্রের দিকেই বেশি ধাবমান। তাছাড়া ‘কুরুচিপূর্ণ’ চলচ্চিত্রের দর্শক সবসময়েই বেশি থাকে বলেও কবির উপলদ্ধি করেছেন। আর ‘সুস্থ ধারা’র চলচ্চিত্রের দিন ফেরাতে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন কবির।
স্বাধীনতার পর দেশের চলচ্চিত্রের মান ক্রমশ নিচের দিকেই নামছিলো, এ থেকে উত্তরণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের নীতিমালা ও পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন’ শীর্ষক সাক্ষাৎকারে। তাছাড়া চলচ্চিত্রকর্মীদের উৎসাহ দিতেই এমনটি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন কবির। ‘চলচ্চিত্রে সমাজ-বাস্তবতা না থাকলে তা মানুষের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না’ শীর্ষক সাক্ষাৎকারে কবির জানান, ‘বাস্তবতাবোধ শিল্পের প্রথম এবং প্রধান শর্ত। ... যা মানুষের জন্য কল্যাণ করে না তা শিল্প নয়। মানুষের সত্য-সুন্দরের চেতনাকে শাণিত করা শিল্পের ধর্ম।’ এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের যুক্তি-সমাজ-বাস্তবতাভিত্তিক চলচ্চিত্র দেখার দর্শক নেই--এমন কথাকে অমূলক মনে করেন কবির।
তৃতীয় বিভাগ, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন অংশে রয়েছে চারটি লেখা। ‘এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মমেকিংয়ে না গেলে সংসদ আন্দোলন মরে যাবে’, ‘চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনটা ঢাকাকেন্দ্রিক আপার ক্লাস আন্দোলন হয়েছে’, ‘সরকারি কালাকানুন সংসদ আন্দোলনের মূল প্রতিবন্ধক’ এবং ‘গ্রামে গ্রামে ফিল্ম সোসাইটি তৈরি করতে হবে’--এর মধ্যে প্রথম দুটি সাক্ষাৎকার এবং পরে দুটি ভাষণ বা বক্তৃতা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চারটি লেখায় আলমগীর কবির চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন সম্পর্কে যে কথাগুলো বলে গেছেন তার সবগুলোই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ফলে গেছে। এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মমেকিং বাংলাদেশে হয়েছে প্রায় হাতেগোনা কয়েকটা। এ চর্চায় সম্পৃক্ত না থেকে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে ক্লাবভিত্তিক আন্দোলনে পরিণত করার বিপক্ষে বলেছেন কবির। তাছাড়া চলচ্চিত্র দেখা, ভাষা বোঝা, নির্মাণ সবকিছুর ওপর তিনি একসঙ্গে গুরুত্বারোপ করেছেন।
চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে বেগবান করতে এবং সরকারি যেসব আইন সংসদ আন্দোলনকে বাধা দেয়, তা তুলে নেওয়ার জন্য আন্দোলন সুসংহত করে গণ-অভিমত তৈরির কথা বলেন কবির। এজন্য প্রয়োজন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে ঢাকা থেকে বের করা। এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া। এছাড়া তিনি সংসদ কর্মীদের চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহ দিয়েছেন। কবিরের মতে, চলচ্চিত্রের ডিউরেশন মুখ্য বিষয় না। চলচ্চিত্রে সত্য তুলে আনা গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া চলচ্চিত্রে সমাজের কথা, জীবনবোধের কথা, রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছু নিয়েই কথা বলতে পরামর্শ দিয়েছেন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের কর্মীদের। কবির কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা ভয় পাবেন না-নির্দ্বিধায়, মুক্তমনে, মুক্তদৈর্ঘ্যরে ছবি দিয়ে এসব সত্য উন্মোচন করবেন দর্শকদের সামনে।’ এটিই ছিলো আলমগীর কবিরের জীবনের শেষ ভাষণ। বগুড়ার উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে বগুড়া চলচ্চিত্র সংসদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথাগুলো বলেছিলেন তিনি। ২০ জানুয়ারি ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে বগুড়া থেকে ঢাকা ফেরার পথে নগরবাড়ি ফেরিঘাটে দুর্ঘটনায় মাত্র ৫০ বছর বয়সে সবাইকে ছেড়ে চলে যান আলমগীর কবির।
অনেক কিছু করার ছিলো আলমগীর কবিরের, চেয়েছিলেনও করতে। দেশকে নিয়ে, দেশের চলচ্চিত্র নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিলো তার। তিনি চেয়েছিলেন নতুন প্রজন্ম এই স্বপ্নের সারথি হবে। তার অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণে চেতনে-অচেতনে যারা এখনো দেশ ও দেশের চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে ‘চলচ্চিত্র ও জাতীয় মুক্তি’ তাদের জন্য অমূল্য পাথেয়। প্রার্থনা এই, আলমগীর কবির রচনা সংগ্রহের পরবর্তী কিস্তিগুলো পূর্ণতা পাক।
বইয়ের নাম: চলচ্চিত্র ও জাতীয় মুক্তি
লেখক: আলমগীর কবির
সম্পাদনা: আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান ও প্রিয়ম প্রীতিম পাল
প্রকাশক: ওসমান গনি, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা
প্রথম প্রকাশ: মাঘ ১৪২৪, ফেব্রুয়ারি ২০১৮
প্রচ্ছদ: শিবু কুমার শীল
মূল্য: ৯০০ টাকা
লেখক: মাজিদ মিঠু, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনে পড়ান।
https://www.facebook.com/mazid.mithu
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন