Magic Lanthon

               

সোহাগ আব্দুল্লাহ

প্রকাশিত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ধ্রুপদী চলচ্চিত্র ও নির্মাতা

শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারস বিপ্লবের বিরুদ্ধে এক ‘বিপ্লবী’র সৃষ্ট মহান-শিল্প

সোহাগ আব্দুল্লাহ


একজন শিল্পীর আখ্যান

রাশিয়া তখন অনেক শক্তিশালী। অক্টোবর বিপ্লব হয়ে গেছে। পূর্ব ইউরোপের আরো ১৫টি দেশ মিলে গড়ে উঠেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। জন্ম নিচ্ছে নানাধরনের মুক্ত চিন্তার আন্দোলন এবং সেগুলো চলছেও। তবে ভাঙাগড়া তখনো একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। এই রকম সময়ে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ৯ জানুয়ারি জন্ম নেয় এক শিশু; নাম সার্কিস হোভসেফি প্যারাজানিয়ান্টস। যিনি চলচ্চিত্রপাড়ায় পরে সের্গেই প্যারাজানভ নামে পরিচিত হন। সের্গেইয়ের মা সিরানুশ বেজানোভা ও বাবা রোসিফ প্যারাজানভ ছিলেন অত্যন্ত শিল্পমনস্ক মানুষ। ফলে শিল্পের প্রতি যে দরদ, সেটা খুব ছোটোবেলা থেকেই প্রবাহিত হয়েছিলো সের্গেইয়ের মধ্যে। আর সেই প্রতিবেশ থেকেই হয়তো পরবর্তী সময়ে তিনি কালজয়ী হতে পেরেছিলেন।


তবে সবকিছু মিলিয়ে সের্গেই প্যারাজানভের জীবন অতো সোজা ছিলো না। কারণ রাশিয়ার আর দশজন নির্মাতার মতো ছিলেন না সের্গেই। বিশ্বের প্রথম চলচ্চিত্রকে জাতীয়করণ করা এই দেশটির নির্মাতা হয়েও তিনি প্রতিনিয়ত সমালোচনা করে গেছেন দেশটির চলচ্চিত্রের। তার চলচ্চিত্র রাশিয়ার শাসনকেই শাসিয়েছে পুরো সময়। আর সেই শাসানো সহ্য হয়নি শাসকদের। ফল হিসেবে তিনবার সের্গেইকে কারাগারে যেতে হয়েছে। তবে এতো কিছু করেও তাকে থামানো যায়নি। শক্ত ভিত্তি ও জাত শিল্পীকে কি দুনিয়ার কোনো শক্তি থামাতে পারে! সের্গেইকেও পারেনি। তার সৃষ্টি কোনো না কোনোভাবে মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করেছে। মুক্তির পক্ষে কাজ করা সের্গেই প্যারাজানভ এবং তার চলচ্চিত্র শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারস নিয়ে এগোবে এই প্রবন্ধ।


একটি চলচ্চিত্রিক ভ্রমণ ও সের্গেই

ছোটোবেলা থেকেই একটা সাংস্কৃতিক আবহে ছিলেন সের্গেই প্যারাজানভ। অনেক ছোটো থেকেই তিনি বাবা-মার সঙ্গে আর্ট গ্যালারিতে যাতায়াত শুরু করেন। প্রথাগত পড়ালেখার পাশাপাশি ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে সের্গেই ভর্তি হন একটি ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলে। এর কিছুদিন পরে তাকে জীবিকার জন্য রেলওয়ের চাকরিতে যোগ দিতে হয়। শিল্পের সঙ্গে যার বসবাস সেই লোকটি কী রেলওয়ের ধরাবাঁধা চাকরি করতে পারে! ফলে সের্গেইও চাকরি ছেড়ে দেন। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে যান মস্কোতে। সেখানে তিনি ভর্তি হন পৃথিবীর প্রথম ফিল্ম স্কুল রাশিয়ার অল ইউনিয়ন স্টেট স্কুল ফর ফিল্ম আর্ট অ্যান্ড সিনেমাটোগ্রাফিতে (VGIK)। এই স্কুলেই সের্গেইয়ের সঙ্গে দেখা হয় ইগোর সাভছেনকো (Igor Savchenko, সোভিয়েত চলচ্চিত্রনির্মাতা, চিত্রনাট্যকার) ও আলেকজান্দার দুভঝেঙ্কোর (Alexander Dovzhenko, সোভিয়েত চলচ্চিত্রনির্মাতা, প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার) মতো চলচ্চিত্র-শিক্ষকের সঙ্গে। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে সের্গেইয়ের জীবনে একটা অন্য রকমের ঘটনা ঘটে। নিকোলাস মিলকোভার নামে এক ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ দায়ের করেন। সমকামিতা নিষিদ্ধ থাকায় এই অভিযোগের দায়ে সের্গেইকে তখন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু এ যাত্রায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিশেষ ক্ষমার আওতায় সাত মাস পর কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান।


ফিল্ম স্কুলে ডিপ্লোমা চলচ্চিত্র হিসেবে সের্গেই নির্মাণ করেন মোলডাভিয়ান ফেয়ারি টেল (Moldavian Fairy Tale)নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য শিশুতোষ চলচ্চিত্র। মোলডাভিয়ান ফেয়ারি টেল দেখে খানিকটা আশ্চর্য হয়েছিলেন দুভঝেঙ্কো। প্রথমে তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি সের্গেই এ ধরনের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারে। চলচ্চিত্রটি একবার দেখার পর তাই তিনি সের্গেইকে কৌশলে বলেন, চলো এটি আরেকবার দেখি। তিনি আসলে পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলেন সের্গেইয়ের মাথা থেকেই এ ধরনের একটি আইডিয়া এসেছে কি না। ফিল্ম স্কুলে এই ধরনের ঘটনা তখনো বিরল ছিলো। কারো চলচ্চিত্র নিয়ে এ ধরনের প্রশ্ন তোলা এর আগে হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে দুভঝেঙ্কো খানিকটা অস্বস্তিতে ছিলেন। এদিকে চলচ্চিত্র ও শিল্প সমালোচক উরেনেভ তো দুভঝেঙ্কোকে বলেই ফেললেন, আমার যতোদূর মনে হয়, সের্গেই এটা জবেনিগরা (Zvenigora, ১৯২৮) থেকে নকল করেছে। অবশ্য দুভঝেঙ্কো ততোক্ষণে ছাত্রের পরীক্ষা নিয়ে ফেলেছেন। তিনি উরেনেভকে দৃঢ় ভাষায় বলে দেন, হয়তো দুটি চলচ্চিত্রের কনসেপ্ট মিলে গেছে, কিন্তু তুমি নিশ্চিত থাকো সের্গেই এটা নকল করেনি। আমি এ নিয়ে তার সঙ্গে নানাভাবে কথা বলেছি। এই ঘটনাতেই দুভঝেঙ্কোর সঙ্গে সের্গেইয়ের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়, পরে অবশ্য গুরু-শিষ্যের সম্মিলিত কাজ দেখা যায়। চলচ্চিত্রশিক্ষার পাশাপাশি সোভিয়েত ফিল্ম স্কুল থেকে আরেকটি শিক্ষা নিতে হয়েছিলো সের্গেইকে--সাম্যবাদ। তবে এই শিক্ষাটা অন্যদের মতো কোনো প্রশ্ন না তুলে মেনে নেননি সের্গেই। আর এই প্রশ্ন তোলাটাই পরবর্তী সময়ে তার জন্য কাল হয়েছিলো।


ফিল্ম স্কুলে পড়াকালীন সের্গেইয়ের জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে নিগার কেরিমোভা নামে এক মুসলিম নারীর সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কেরিমোভা মুসলিম তাতার (তুরস্কের তাতারস্থান থেকে যাওয়া মুসলমান) পরিবারে বড়ো হলেও সের্গেইকে বিয়ে করার জন্য খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু এই ঘটনা মেনে নিতে পারে না নিগার কেরিমোভার পরিবার। এর পরেই ঘটে এক ভয়ঙ্কর ঘটনা। যা সের্গেইয়ের জীবনকে তছনছ করে দেয়--ধর্ম পরিবর্তনের কারণে কেরিমোভাকে তার আপন ভাই হত্যা করে!


স্ত্রীর এমন নির্মম মৃত্যুতে যেনো তার কাছে দুর্বিসহ হয়ে ওঠে মস্কো শহর। সবকিছু ভুলতে এবার তিনি রাশিয়া ত্যাগ করে পাড়ি জমান ইউক্রেনের কাইভ শহরে। এখানে এসে সের্গেই সবকিছু ভুলে চলচ্চিত্র নির্মাণে মনোনিবেশ করেন। যদিও হাতেকলমে অভিজ্ঞতা বলতে শুধু ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত ওই একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ইউক্রেনে সের্গেই প্রথম যে সমস্যাতে পড়েন সেটা হলো ভাষা। তাকে নতুন করে এখানে ভাষা শিখতে হয়। তবে এতো কিছুর মধ্যে তার স্বস্তির জায়গা ছিলো একটাই সেটা হলো ফিল্ম স্কুলে তার গুরু দুভঝেঙ্কো। নির্মাতা দুভঝেঙ্কোর একটি স্টুডিও ছিলো কাইভ-এ। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে এই স্টুডিওতেই সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন সের্গেই। কাজ শুরুর কিছুদিনের মধ্যে তিনি একটি কাহিনিচিত্র নির্মাণে হাত দেন। মালদোভার লেখক এমিলিয়ান বুকভ-এর রূপকথার গল্প অবলম্বনে নির্মাণ করেন কাহিনিচিত্র আন্দ্রেইশ (১৯৫৪)। এরপর সামান্য বিরতি দিয়ে ১৯৫৭-তে দুমকা নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন সের্গেই। এটি ইউক্রেনের জনপ্রিয় লোকসঙ্গীতের ওপর নির্মিত। একই বছর তিনি ইউক্রেনের শিল্প নিয়ে গোল্ডেন হ্যান্ডস (১৯৫৭) ও ইউক্রেনীয় অভিনয়শিল্পী নাটাল্যা উশভিয়ের ওপর নাটাল্যা উশভি (১৯৫৭) নামে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। এরপর আবারও চলচ্চিত্র নির্মাণে বিরতি দেন সের্গেই। ১৯৬২-তে নির্মাণ করেন যুদ্ধকালীন গীতিনাট্য ইউক্রেনিয়ান রাপসোজে এবং ফ্লাওয়ার অন দ্য স্টোনফ্লাওয়ার অন দ্য স্টোন (১৯৬২)-এর গল্প গড়ে উঠেছে পূর্ব ইউরোপের কয়লা খনি অধ্যুষিত এলাকা ডোনেটস বেসিনের একটি শহরে হঠাৎই ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুপ্রবেশ নিয়ে।


চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি দ্বিতীয়বার বিয়ের পিড়িতে বসেন সের্গেই প্যারাজানভ। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি এবার বিয়ে করেন ইউক্রেনের সভেতলানা ইভানিভনা শ্চেরবাতিউককে। বিয়ের দুই বছরের মাথায় জন্ম নেয় ছেলে সুরেন।


নিজের সৃষ্টিকে ছাড়িয়ে

মজার ব্যাপার হলো, ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সের্গেই প্যারাজানভ যে চলচ্চিত্রগুলো নির্মাণ করেছিলেন সেগুলোকে তিনি আবর্জনার সঙ্গে তুলনা করেন। এর পিছনে অবশ্য একটা ঘটনা আছে। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে আন্দ্রে তারকোভস্কি (রাশিয়ান নির্মাতা, লেখক ও তাত্ত্বিক) নির্মাণ করেন তার প্রথম চলচ্চিত্র ইভান্স চাইল্ডহুড। এই চলচ্চিত্রটি দেখার পর তা সের্গেই প্যারাজানভের ওপর ভয়াবহ রকমের প্রভাব ফেলে। তিনি বুঝতে পারেন, চলচ্চিত্রের নামে তিনি এতোদিন যা নির্মাণ করেছেন তা আসলে কিছুই হয়নি। নির্মাতা হিসেবে তিনি নতুন করে নিজেকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেন।

তারকোভস্কির চেয়ে আট বছরের বড়ো ছিলেন সের্গেই। তারপরও তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। এই সম্পর্কের বদৌলতে সিনিয়র হয়েও তারকোভস্কিকে নিজের গুরু ও পথ প্রদর্শনকারী মানতেন সের্গেই প্যারাজানভ। তারকোভস্কির চলচ্চিত্রের অরৈখিক ধরন ও চরম বাস্তবতা সের্গেই প্যারাজানভকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলো সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাকে ছাপিয়ে শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারস নির্মাণে।


তবে তারকোভস্কিও যথেষ্ট আমলে নিতেন সের্গেইকে। সের্গেইয়ের প্রায় সব চলচ্চিত্রের প্রশংসা করতেন তারকোভস্কি, তার দ্বারা কিছুটা প্রভাবিতও ছিলেন। তারকোভস্কি বলতেন, সের্গেইয়ের চলচ্চিত্রগুলো আমি খুব ভালোবাসি। ওর প্রতি সম্মান রেখে, অত্যন্ত আনন্দ নিয়েই আমি এটা করে থাকি। কারণ ওর চিন্তাধারা, প্রথাবিরুদ্ধ, কাব্যিক কাজ আমাকে সুন্দরকে ভালোবাসতে ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজেকে মুক্ত হতে শেখায়।


১৯৬৫-তে সবকিছু ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাণে নেমে পড়েন সের্গেই। শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারস নির্মাণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার নতুন পথ চলা। এই চলচ্চিত্রটি তাকে নির্মাতা হিসেবে ভিন্ন এক অবস্থানে নিয়ে যায়। অনেকে এই চলচ্চিত্রটিকে প্রভাবের দিক থেকে আইজেনস্টাইনের দ্য ব্যাটলশিপ পটেমকিন-এর (১৯২৫) সঙ্গে তুলনা করেন। এর মাধ্যমে সের্গেই প্যারাজানভের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।


শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারস দেখার পর সোভিয়েত ফিল্ম মিনিস্ট্রি বুঝতে পেরেছিলো, এটা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার নীতিমালা ও সমাজের মধ্যকার আবর্জনা দূর করবে। চলচ্চিত্রটি রাশিয়ার সমকালীন বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলিত করে এবং তাদের অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা এর বিষয়বস্তুকে যেনো খুব সহজে মেনে নিতে পারছিলো না। তবে ইউক্রেনের আঞ্চলিক ভাষা কার্পাথিয়ান ও হোস্টাল-এ নির্মিত হওয়ায় অধিকাংশ রাশিয়ানের পক্ষে শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারস বোঝা একটু কঠিনই হচ্ছিল। সের্গেইকে তাই মিনিস্ট্রি থেকে অনুরোধ করা হয় রাশিয়ান ভাষায় চলচ্চিত্রটি ডাবিং করার জন্য। কিন্তু এটা করতে সের্গেই অস্বীকৃতি জানান। তার আশঙ্কা ছিলো, রুশ ভাষায় ডাবিং করে সোভিয়েতজুড়ে চলচ্চিত্রটি মুক্তি দেওয়া হলে, এর ইউক্রেনীয় ভাষার যে স্বাদ সেটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।


১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে সের্গেই নির্মাণ করেন তার নতুন চলচ্চিত্র জীবনের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র দ্য কালার অব পমেগ্রানেট। আর্মেনিয়ার লেখক ও গীতিকার সাইয়াত-নোভার পরাবাস্তব জীবন নিয়ে এটি নির্মিত। এই চলচ্চিত্রটিও তাকে একজন জাত নির্মাতা হিসেবে পরিচিত করায়। চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে সোভিয়েতের আরেক মাস্টারপিস মিখাইল ভারতানভ-এর ভাষ্য ছিলো এমন--সম্ভবত গ্রিফিথ ও আইজেনস্টাইনের প্রস্তাবিত চলচ্চিত্রিক ভাষার বাইরে বিশ্ব চলচ্চিত্রে দ্য কালার অব পমেগ্রানেট বিপ্লবী নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পেরেছে।


এরপর মাঝে বেশকিছু সময় চলচ্চিত্র থেকে দূরে থাকতে হয় সের্গেইকে। সেই সঙ্গে তার চলচ্চিত্র নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ৮০র দশকের মাঝামাঝিতে সোভিয়েত সেন্সরশিপ শিথিল হলে সের্গেই আবার চলচ্চিত্র নির্মাণে ফিরে যান। তিনি নির্মাণ করেন দ্য লিজেন্ড অব সুরাম ফরট্রেস (১৯৮৪) ও আশিক কারিব (১৯৮৮)। চলচ্চিত্র দুটিতে জর্জিয়া ও আজারবাইজানের সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে সের্গেই তার আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র দ্য কনফেশন নির্মাণ শুরু করছিলেন। কিন্তু চলচ্চিত্রটি শেষ করার আগেই ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি পৃথিবী ত্যাগ করেন।


নিজের তিনটি মাতৃভূমির কথা বলতেন সের্গেই। তার ভাষায়, আমার মাতৃভূমি তিনটা। আমি জর্জিয়াতে জন্মগ্রহণ করেছি, কাজ করেছি ইউক্রেনে এবং আর্মেনিয়ায় মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছি। অবশ্য শেষমেষ আর্মেনিয়াতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন সের্গেই। তিনি এমন এক নির্মাতা ছিলেন, যিনি নির্মাতা হওয়াকে জন্মগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি মনে করতেন, প্রশিক্ষণ নিয়ে নির্মাতা হওয়া যায় না, এমনকি VGIKর মতো ফিল্ম স্কুলে পড়াশোনা করেও নয়। এ গুণটি জন্মগতভাবেই পেতে হয়, মায়ের গর্ভ থেকে নিয়ে আসতে হয়। নির্মাতার মাকে ভালো অভিনয়শিল্পী হতে হয়, যাতে উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি এ গুণটি পেতে পারেন। আর আমার মা-বাবা দুজনই শৈল্পিক আবহের মানুষ ছিলেন।


কারাগারও সৃষ্টির খেলাঘর

শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারসদ্য কালার অব পমেগ্রানেট-এ তৎকালীন সোভিয়েত সমাজের বৈষম্য ফুটে ওঠে। যা খুব সহজভাবে নেয় না সোভিয়েত সরকার। তারা সের্গেইকে বিপদে ফেলার সুযোগ খুঁজতে থাকে। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে সোভিয়েত সরকার একটা সুযোগ পেয়েও যায়। এবার তার বিরুদ্ধে শিল্প পাচার, মুদ্রা জালিয়াতি ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়। এ মামলায় সের্গেইয়ের পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। তবে সের্গেইয়ের ওপর এই জুলুমকে অনেকেই সহ্য করেনি। বন্ধু তারকোভস্কি পাশে দাঁড়ান তার। ইউক্রেনের সমাজতন্ত্রী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তারকোভস্কি লেখেন, গত ১০ বছরে সের্গেই প্যারাজানভ মাত্র দুইটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন--শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারসদ্য কালার অব পমেগ্রানেট। দুটি চলচ্চিত্র প্রথমে ইউক্রেনে তারপর সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং সর্বশেষ গোটা বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করে। শৈল্পিক মানে গোটা দুনিয়ার অল্পকিছু ব্যক্তি প্যারাজানভের সমতুল্য। এখন সে দোষী, সে নিজের একাকিত্বের কারণে দোষী। উল্টোভাবে এটাও ঠিক যে, নিয়মিত তার কথা মনে না করার জন্য এবং তার শৈল্পিক ক্ষমতার গুরুত্ব আবিষ্কার না করার জন্য আমরাও দোষী।




শুধু কারাগারে পাঠিয়েই থেমে থাকেনি সোভিয়েত সরকার,  সেই সঙ্গে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলচ্চিত্র নিয়ে তার সমস্ত প্রজেক্ট ও পরিকল্পনা। সের্গেই বুঝতে পেরেছিলেন, সোভিয়েত সরকার তাকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে এবং আর চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে দেবে না। চার বছর কারাভোগের পর সের্গেইকে মুক্ত করতে এবার এগিয়ে আসে বিশ্বের নানা দেশের কবি, সাহিত্যিক, লেখকরা। এদের মধ্যে ছিলেন ফরাসি পরাবাস্তবাদী কবি ও ঔপন্যাসিক লুই আরাগঁ, রুশ কবি এলসা ট্রিওলেট ও মার্কিন লেখক জন আপডাইক প্রমুখ। এছাড়া সোভিয়েত সমাজতন্ত্রী দলের সাধারণ সম্পাদক লিওনিদ ব্রেজনেভও এতে সহায়তা করেন। মস্কোর বোলশাই থিয়েটারে কাকতালীয়ভাবে ব্রেজনেভের সঙ্গে আরাগঁ ও ট্রিওলেটের দেখা হয়। ব্রেজনেভ তখন তাদের জিজ্ঞাসা করেন, আপনাদের কোনো কাজে আমি সাহায্য করতে পারি কি না? জবাবে সের্গেই প্যারাজানভকে মুক্তি দিতে অনুরোধ করেন আরাগঁ। পরে শিল্পী, সাহিত্যিক, নির্মাতাদের চাপে ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সোভিয়েত সরকার। জর্জিয়ার তিবিলিসি শ্রমিক ক্যাম্প ও কারাগারে চার বছর নয় মাস থাকার ফলে সের্গেইয়ের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে।


এদিকে কারাগারে গিয়েও বসে থাকার পাত্র ছিলেন না সের্গেই। এখানে তিনি ছোটো পুতুল আকৃতির অনেকগুলো মূর্তি (ভাস্কর্যের মতো) তৈরি, প্রায় আটশোটি চিত্র ও কোলাজ অঙ্কন করেন। কারাগারে তার এসব কাজ দেখে রক্ষীরা খুব বিরক্ত হতো, তারা কখনো কখনো পরিহাসও করতো তাকে। ছবি আঁকা ও মূর্তি বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঠিকমতো তাকে দেওয়া হতো না। এমনকি অনেকে তাকে পাগল মনে করতো। অবশ্য এই পরিস্থিতি খুব বেশিদিন সইতে হয়নি সের্গেইকে। কারণ মস্কো থেকে হঠাৎই এক বার্তা আসে কারাগারে, সেখানে বলা হয়, বন্দি এই নির্মাতা অত্যন্ত মেধাবী। এই বার্তা পাওয়ার পর কারাগার কর্তৃপক্ষের তার ব্যাপারে আচরণ পরিবর্তন হয়।


সের্গেইকে দ্বিতীয়বার কারাগারে পাঠানো হয় ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে। এবার তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে ঘুষ নেওয়ার। মস্কোর টাগানাকা থিয়েটারে কবি ও অভিনয়শিল্পী ভ্লাদিমির ভিসোতস্কি স্মরণে একটি মঞ্চনাটক দেখে ফেরার পথে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এবার অবশ্য বেশিদিন তাকে কারাগারে থাকতে হয়নি। এক বছরের কম সময়ের মধ্যে তিনি মুক্তি পান। কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিবিলিসিতে ফিরে অভিমানী সের্গেই চলচ্চিত্রে আর না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। অবশ্য তৎকালীন সেন্সর বোর্ড তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিলো। এবার তিনি আরো জোরালোভাবে চিত্রকলায় মনোনিবেশের সিদ্ধান্ত নেন।


সের্গেই-এর যতো প্রাপ্তি

সমকালীন বেশিরভাগ চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জিতেছে সের্গেইয়ের চলচ্চিত্র। মার ডেল প্লাটা চলচ্চিত্র উৎসব, ইস্তানবুল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, নিকা পুরস্কার, রোটেরডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, সিগটেস কাতালান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, সাও পাওলো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এগুলোর মধ্যে অন্যতম। শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারস নির্মাণের জন্য সের্গেই মোট ২৩টি পুরস্কার জেতেন।


গুণী এই নির্মাতা ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে ফেদেরিকো ফেলেনি, তোনিনো গুয়েরা, ফ্রান্সিসকো রোজি, অ্যালবার্তো মোরাডিয়া, জুলিয়েতা মাসিনা, মার্সেলো মাস্ত্রোইয়ান্নি ও বেরনার্দো বের্তোলুচ্চির মতো ব্যক্তিরা শোক প্রকাশ করে। মৃত্যুর পর রাশিয়ায় পাঠানো এক শোকবার্তায় তারা লিখেছিলো, বিশ্ব চলচ্চিত্রাঙ্গন এক যাদুকরকে হারালো। তবে এতো বছর পরে এসে সের্গেইকে নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে সারা পৃথিবীতেই। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে হলিউডে প্যারাজানভ-ভারতানভ ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। সের্গেই প্যারাজানভ ও রাশিয়ান আরেক চলচ্চিত্রনির্মাতা মিখাইল ভারতানভের কর্ম নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি তা সংরক্ষণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই ইন্সটিটিউট কাজ করবে বলে জানা যায়।


শ্যাডোস-এ যা আছে

ইউক্রেনের লেখক মাইখাইলো কোটসিউবিনস্কিদ্য ক্লাসিক বুক-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারস। চলচ্চিত্রে ইভানের শিশুকাল, বাল্যকাল ও পরিণত বয়সের পরিণতি দেখানো হয়েছে। সঙ্গে উঠে এসেছে পশ্চিম ইউক্রেনের কার্পাথিয়ান অঞ্চলের হুতসুল সংস্কৃতির বিশদ চিত্র। বরফ ঢাকা পাহাড়ে গাছ কাটতে যান ইভানের বড়োভাই ওলেসকো। সেখানে ছোটোভাই ইভানকে বাঁচাতে গিয়ে গাছের নিচে চাপা পড়ে মারা যান তিনি। ইভান তার বাবা-মায়ের ছোটো ও শেষ সন্তান। গির্জায় ইভানের বাবার সঙ্গে প্রতিবেশী মারিচকার বাবার ছোটো একটি ঘটনা নিয়ে দ্বন্দ্ব হয়। দ্বন্দ্বের একপর্যায়ে কুঠার দিয়ে কুপিয়ে ইভানের বাবাকে হত্যা করে মারিচকার বাবা। বাবার খুনের ঘটনা ইভানের স্মৃতিতে খুব বেশিদিন স্থায়ী হয় না। ছোটো মারিচকার সঙ্গে একধরনের সম্পর্ক হয় ইভানের। যদিও দুই পরিবারের কেউই চায় না তাদের সন্তানেরা একে অন্যের সঙ্গে কোনোধরনের সম্পর্কে জড়াক। কিন্তু ইভান ও মারিচকা নিজেদের মতো করেই বেড়ে উঠতে থাকে।


একদিকে দরিদ্রতা, অন্যদিকে আয়ের উৎস না থাকায় ইভানকেই পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়। তার মা এই বলে সান্ত্বনা দেন যে, তার বাবা বেঁচে থাকলে তাকে এতো কষ্ট করতে হতো না। ইভানের মাকে আজকের এই শোচনীয় অবস্থার জন্য মারিচকাদের দোষারোপ করতে দেখা যায়। ইভান একদিন দূরে কাজে যান। এদিকে একটি ভেড়াকে বাঁচাতে গিয়ে পাহাড় থেকে পা পিছলে পড়ে মারা যান মারিচকা। গ্রামের লোকজনের ধারণা হয়, ইভানকে না পাওয়ার বেদনা থেকে মারিচকা মারা গেছেন। মারিচকার মৃত্যুর খবর পেয়ে শোকে ইভান উন্মাদের মতো সময় কাটাতে থাকে। একপর্যায়ে শোক কাটিয়ে উঠতে প্যালহনা নামে একজনকে বিয়ে করেন ইভান এবং শ্বশুরবাড়িতেই থেকে যান। এতে আর্থিক অনটন ঘুচে যায় ঠিকই কিন্তু তাদের কোনো ছেলে-মেয়ে না থাকায় সুখটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। প্যালহনা স্থানীয় এক যাদুকরের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। একদিন এক সরাইখানায় তাদের আলিঙ্গনরত অবস্থায় দেখে ইভান কুঠার নিয়ে যাদুকরকে মারতে তেড়ে আসলে উল্টো তিনিই আঘাত প্রাপ্ত হন। সেই মুহূর্তে ইভানের মনে পড়ে মারিচকার কথা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভবঘুরের মতো মারিচকার কথা চিন্তা করতে করতে পাহাড় থেকে পড়ে ইভান মারা যান। তাকেও হুতসুলের চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী দাফন করা হয়।


এক সাংস্কৃতিক রাজনীতি

শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারস-এর শুরুতে পর্দায় ভেসে উঠে চলচ্চিত্রটি ইভান ও মারিচকার ভালোবাসা সম্পর্কে কাব্যিক নাটক। চলচ্চিত্রটি পৃথিবীকে পরিচয় করিয়ে দেবে কার্পাথিয়ান লোকসংস্কৃতির সঙ্গে। এক দৃশ্য পরেই পর্দায় দেখা যায়, হুতসুল অঞ্চলের মানুষকে ঈশ্বর ও লোকজন ভুলে গেছে কথাটি। সের্গেই প্যারাজানভের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে নির্মিত। তার উল্লেখযোগ্য কিছু প্রামাণ্যচিত্রও সেই কথাই বলে। ইউক্রেনের একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষজন কী করে, কীভাবে তারা তাদের জীবন পরিচালিত করে, তার একখণ্ড বয়ান যেনো শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারস। সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরা ওই কার্পাথিয়ান পর্বতের পাদদেশে দুই শিশু ইভান ও মারিচকার সম্পর্ককে জালে জালে বিন্যস্ত করে একে একে উঠে এসেছে সেখানকার পরিবেশ ও পারিবারিক আবহ। দেখানো হয়েছে জীবনের আদিমতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিহিংসা ও হিংস্রতাও। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে সের্গেই ঠিক কোন দিকে প্রাধান্য দিয়েছেন, তা আপাতদৃষ্টিতে বোঝা কঠিন। যদিও হুতসুলের ঐতিহ্য, সঙ্গীত, পোশাক ও উপভাষাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বার বার তুলে ধরা হয়েছে। এজন্য চলচ্চিত্রে প্রচুর প্রতীকী ইমেজের ব্যবহার করেছেন নির্মাতা। ক্রস, মেষশাবক, কবর, প্রফুল্লতা ইত্যাদি ধর্মীয় ও ফোকলোরিক চিত্রগুলো বার বার ধরা দিয়েছে চলচ্চিত্রজুড়ে। চলচ্চিত্রে রঙের খেলাও দেখা যায় বিভিন্ন সময়ে। কাহিনির নানা চরিত্রের অবস্থা বোঝাতে রঙগুলো যেনো চলচ্চিত্রটির জন্য আশির্বাদ হয়ে এসেছে।


ইভানদের বাঁচার একমাত্র অবলম্বন ছিলো কুঠার। ইভানদের সব কাজেই কুঠারের ব্যবহার দেখা যায়। কুঠার যেনো সেই আদিমকালের মানুষের দুই হাত। যে হাতই সভ্যতাকে পাল্টিয়ে দিয়েছে ক্ষণে ক্ষণে। আর মানুষকে করেছে উন্নত জীব। কিন্তু ইভানদের কুঠার আর কতোটুকু পারলো। শুধু কাঠ কেটেই চলে গেলো তাদের জীবন। তাদের ঘর, রাস্তাঘাট, ভেলা, বেড়া সবই কাঠের তৈরি। যেনো কাঠ তাদের একমাত্র খাবার। কিন্তু এই কাঠ খাবারে তাদের জীবন চলে না। ইভানকে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে হয়। ইভানের বিদায় বেলাতেও মায়ের বুকে ঠাঁই পায় ওই কুঠারই। এমনকি চলচ্চিত্রের ২১ মিনিট ২০ সেকেন্ডে কুঠার বুকে নিয়ে ইভানের মা মৃত চার জনকে স্মরণ করে প্রার্থনা করেন। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় বলেন, যাতে কোনো রকমে রুটি-রুজির মাধ্যমে বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু যে কুঠার বুকে নিয়ে এই প্রার্থনা, যা ওই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, সেই কুঠারই কেড়ে নেয় ইভানের আপনজন বাবাকে। চলচ্চিত্রের সাত মিনিট সাত সেকেন্ডে ইভানের বাবাকে মারিচকার বাবা কুঠারের আঘাতে হত্যা করে।


চলচ্চিত্রের ২৬ মিনিটে ভেড়ার মালিক ও ইভানের মধ্যে আলাপে ইভানকে অনেকটা আকুতির সুরেই বলতে দেখা যায়, তাকে যেনো কাজ করতে নেওয়া হয়। ইভান মালিকের সবধরনের কাজ করতে রাজি হন। একদিকে একজন অনেক সম্পত্তির মালিক অন্যদিকে ইভানদের কিছুই নেই। ঈশ্বরের কাছে ইভানের মায়ের প্রার্থনা কেবল বেঁচে থাকার মতো খাবারের জন্য। ইভানের মতো অনেককেই খেয়েপরে বাঁচার জন্য ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়-পর্বত-তৃণভূমিতে ভেড়া চরাতে হয়। এমনকি তৃণভূমিতে বৃষ্টিতে একমাত্র জামা ভিজে গেলে সেটা আগুনে শুকিয়ে আবার পরতে হয়। এসব কিছু প্রমাণ করে তারা কতোটা অসহায়, দরিদ্র, বিপর্যস্ত। যে সময় পূর্ব ইউরোপজুড়ে সমাজতন্ত্রের দামামা বাজছে, ঠিক সেই সময় ইভানদেরকে শুধু বেঁচে থাকার মতো খাবারের জন্য লড়াই করতে হয়। তার মানে মুক্তির আশা জাগানিয়া অক্টোবর বিপ্লব কি তাহলে মানুষকে বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি! সের্গেই হয়তো চলচ্চিত্রের পরতে পরতে তাই জানান দেওয়ার চেষ্টা করেন।


শ্যাডোস অব ফরগটেন অ্যান্সেসটারস-এর সিনেমাটোগ্রাফার ইউরি ইলিনকো ও ভিক্টর বেস্টায়েভ গল্পটিকে ভিজ্যুয়ালি আনার জন্য অসাধারণ ক্যামেরা কৌশল ব্যবহার করেন। চলচ্চিত্রের ইমেজগুলো কখনো কখনো প্রাণবন্ত থেকে বিবর্ণ রঙে বদলে যায়, আবার কালো-সাদা থেকে রঙিনে রূপান্তর হয়। চলচ্চিত্রটিতে গ্রামের লোক-উৎসবকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখানো হয়েছে। এগুলো পর্দায় এসেছে প্যানিং ও ট্র্যাকিং শটে। কিছু শটে ক্যামেরা তিনশো ৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত প্যান করা হয়েছে! যা দর্শককে অনেকখানি বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়।


চলচ্চিত্রে তিনি একাধিক শক্তিশালী ইমেজের ব্যবহার দেখিয়েছেন। ২২ মিনিটে ইভানকে বিদায় দিতে আসেন মারিচকা। টানা কয়েক সেকেন্ডের ক্যামেরা প্যানিং দেখানো হয় তখন। বৃষ্টি নামে, বিদায় নেন ইভান। দুজনের এই বিষণ্নতা, একাকিত্ব বোঝাতেই যেনো বৃষ্টি নামে। তাদের কষ্টগুলো যেনো বৃষ্টি হয়ে ঝরে। এটাই ছিলো ইভান ও মারিচকার শেষ দেখা। আবার সরাইখানাতে এক ঘণ্টা ২২ মিনিটে নিজের স্ত্রী প্যালহনকে যাদুকরের সঙ্গে দেখেন ইভান। সহ্য করতে না পেরে কুঠার দিয়ে যাদুকরকে মারতে গিয়ে ইভান নিজেই আহত হন। তখন এক বিষণ্ন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সরাইখানা থেকে বেরিয়ে একা হাঁটতে থাকেন তিনি। ইভানের মাথায় আঘাত, বুকে আঘাত, পরের দৃশ্যেই দেখা যায় গাছ কেটে ফেলা একটি ফাঁকা মাঠ। সেখানে গাছের গুড়িগুলোয় আগুন জ্বলছে। এ যেনো ইভানেরই মনের অবস্থা।

 

লেখক : সোহাগ আব্দুল্লাহ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

[email protected]

https://www.facebook.com/abd.shohag.3


তথ্যসূত্র

1. https://openjournals.uwaterloo.ca/index.php/kinema/article/view/834/758; retrieved on: 08.11.2019

 

তথ্য সহায়িকা

1. https://www.imdb.com/name/nm0660886/bio?ref_=nm_ov_bio_sm; retrieved on: 03.08.2019

2. https://www.themoscowtimes.com/2014/02/27/parajanovs-influence-still-spreading-on-90th-anniversary-a32541; retrieved on: 03.08.2019

3. http://archive.fo/t5wo9; retrieved on: 25.08.2019


বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন