Magic Lanthon

               

ভূমিকা ও ভাব ভাষান্তর : প্রিয়াংকা দেবনাথ

প্রকাশিত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

কিরিল সেরেব্রেনিকভ

চলচ্চিত্র নির্মাণ এমনিতেই কঠিন ব্যাপার সেটা হোক রাশিয়া, চিন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে

ভূমিকা ও ভাব ভাষান্তর : প্রিয়াংকা দেবনাথ


তার জন্ম ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ৭ সেপ্টেম্বর, দক্ষিণ রাশিয়ার রস্তভ-অন-ডন শহরে। ছোটো থেকেই প্রবল ইচ্ছে রাশিয়ান থিয়েটার অভিনয়শিল্পী আন্দ্রে মিরোনভের মতো অভিনয়শিল্পী হওয়ার। কিন্তু বাধ সাধে চিকিৎসক বাবা ও স্কুল শিক্ষক মা। তাদের ইচ্ছা ছেলেও কোনো এক নিরাপদ পেশায় যুক্ত হবে। কিন্তু ছোটোবেলার সেই মঞ্চ, থিয়েটার আর অভিনয়ের ক্ষুধাকে পুঁজি করে বড়ো হতে থাকেন তিনি। কথা হচ্ছে রাশিয়ার প্রখ্যাত শিল্পনির্দেশক, মঞ্চনাটক নির্দেশক ও চলচ্চিত্রনির্মাতা কিরিল সেরেব্রেনিকভ-এর। কেবল ইচ্ছাশক্তি এই মানুষটিকে শিল্পের আঙিনায় অনেক দূর নিয়ে গিয়েছিলো।

গুণী এই মানুষটি রাশিয়ার রস্তভ স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। মঞ্চনাটকের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে মঞ্চনাটক নির্দেশনাকেই বেছে নেন পেশা হিসেবে। গল্পের শুরু সেখান থেকেই। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একের পর এক মঞ্চনাটকে কাজ করতে থাকেন। এর ফাঁকে ফাঁকে ভিজ্যুয়াল মাধ্যমেও দেখা যেতে থাকে তাকে। শুরুতে কিরিল মিউজিক ভিডিও ও টেলিভিশন বিজ্ঞাপন নির্মাণ শুরু করেন। একপর্যায়ে তার আগ্রহ বেড়ে চলচ্চিত্রে গিয়ে ঠেকে। কিরিল প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দেন ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে। প্রথম চলচ্চিত্র আনড্রেস্ড-এ তিনি বেশ প্রশংসিত হন। এরপর একে একে নির্মাণ করেন রাগিন (২০০৪), পেয়িং দ্য ভিক্টিম (২০০৬), বিট্রেয়াল (২০১২), ক্রাশ (২০০৯), দ্য স্টুডেন্ট (২০১৬), সামার (২০১৮), আফটার দ্য সামার (২০১৮)। পাশাপাশি মঞ্চনাটকও চলতে থাকে একই তালে।

২০১২ খ্রিস্টাব্দে কিরিল মস্কোর বিখ্যাত আর্ট কমপ্লেক্স দ্য গোগল সেন্টার-এ আর্টিস্টিক ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পান (নির্দেশক শুধু নাটকের নির্দেশনা দেয়, কিন্তু আর্টিস্টিক ডিরেক্টর পুরো প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব বহন করে)। কি নাটক, কি চলচ্চিত্র--কিরিলের প্রত্যেকটি কাজের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে ধর্ম, রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা এবং জেন্ডার সংবেদনশীলতার মতো মারাত্মক গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয় এবং তাদের অসংলগ্নতা। ফলে তিনি প্রশংসিত যেমন হয়েছেন, সমালোচনার মুখেও পড়েছেন বার বার। কর্তৃপক্ষের রক্তচক্ষুর মুখে পড়েছেন একাধিকবার। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ মে রাশিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ হিসেবে দেখানো হয়, গোগল সেন্টার থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ আগস্ট মস্কোর আদালত তাকে গৃহবন্দি করে রাখার আদেশ দেন। এরপর টানা দুই বছর কারাগারে থাকতে হয় কিরিলকে।

চলচ্চিত্র ও নাটকের জন্য কিরিল দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেন এবং অনেকগুলো পুরস্কার পান। কান চলচ্চিত্র উৎসব থেকে শুরু করে বিশ্বের বড়ো বড়ো সব উৎসবে তার চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। কিরিলের আলোচিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে একটি হলো দ্য স্টুডেন্ট (২০১৬)। এই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি সমগ্র রাশিয়ার একটি ভিন্নমাত্রার চিত্র ফুটিয়ে তোলেন। চলচ্চিত্রে স্কুলপড়ুয়া এক শিক্ষার্থীকে প্রচণ্ড রকমের ধর্মান্ধ হয়ে পড়তে দেখা যায়। তার কাছে ধর্মের বাইরে মানুষ, মানবীয় সম্পর্ক ও ভালোবাসার খুব বেশি মূল্য ছিলো না। পুরো পৃথিবীকে ভয়াবহ একরৈখিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা শুরু করে ছেলেটি। সে অবিশ্বাসীদের মেনে নিতে পারে না, তার মতের বিপরীতে যাওয়া কাউকেই সহ্য করতে পারে না।

দ্য স্টুডেন্ট, তার চলচ্চিত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাশিয়ান চলচ্চিত্রের অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা জায়গায় কথা বলেছেন কিরিল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি সাক্ষাৎকার ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পাঠকের জন্য বাংলায় ভাব-ভাষান্তর করা হলো। তৃতীয় সাক্ষাৎকারটি অবশ্য আরো পুরনো, ২০১২ খ্রিস্টাব্দের। এটি কিরিলকে আরো একটু কাছ থেকে বুঝতে সাহায্য করবে। পুনরাবৃত্তি এড়ানোর জন্য সাক্ষাৎকারগুলো থেকে কিছু কিছু অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে।

প্রথম সাক্ষাৎকারটিতে আলোচিত-সমালোচিত এই নির্মাতা দ্য স্টুডেন্ট (২০১৬) নিয়ে কথা বলেছেন বোরোয়িং টেপস নামে এক ওয়েবসাইটের জেক ওয়াটার্স-এর সঙ্গে। দ্বিতীয়টিতে কিরিল কথা বলেছেন চলচ্চিত্রবিষয়ক ওয়েবসাইট নো ফিল্ম স্কুল-এর এমিলি বুডার সঙ্গে। তৃতীয় বা শেষ সাক্ষাৎকারটি ২০১২ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃতি বিষয়ক ওয়েবসাইট দ্য আপকামিংকে দেওয়া।

প্রথম অংশ

জেক ওয়াটার্স : শুরুতেই আপনার কাছে জানতে চাই, চলচ্চিত্র নির্মাণের অনুপ্রেরণা কার কাছ থেকে পেলেন?

কিরিল সেরেব্রেনিকভ : জন কাসাভেটাস, লুই বুনুয়েল, ইঙ্গমার বার্গম্যান, পিয়ের পাওলো পাসোলিনি, আন্দ্রেই তারকোভস্কি, ফেদেরিকো ফেলিনি, স্ট্যানলি কুব্রিক আর অবশ্যই লার্স ভন তিয়ার--এই নির্মাতাদের চলচ্চিত্র দেখে আমি ভীষণ অনুপ্রাণিত হই।

জেক : আপনার দ্য স্টুডেন্ট (২০১৬) চলচ্চিত্রটি মূলত ব্যক্তিমানুষ এবং সমাজ উভয়ের ওপর ধর্মীয় গোঁড়ামির নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলে। এই বিষয় নিয়ে কাজ করার চিন্তাটা কীভাবে এলো?

কিরিল : রাশিয়ায় তো সব বিষয়ে ধর্মের হস্তক্ষেপ চলে। ধর্মপ্রচারকরা টেলিভিশনও দখল করে ফেলেছে। ধর্মই যেনো এখন মানুষের সবচেয়ে বড়ো আদর্শিক জায়গা হয়ে উঠেছে, সবার মননকে নিয়ন্ত্রণ করছে। অথচ ধর্ম তো নিজেই একটা ধোঁয়াটে মতবাদ, এটি মানুষের মধ্যে আরো ধোঁয়াশা ছড়ায়। অন্যদিকে রাশিয়ানরা নিজেদের কথা নিজেরা ভাবতে পারে না। তারা চিরকালই কোনো না কোনো নেতাকে অনুসরণের মধ্যেই জীবন খুঁজে পেয়েছে। ফলে গির্জা রাষ্ট্রকাঠামো থেকে আলাদা বিষয় হওয়ার পরও সমাজের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করে। যেমন ধরুন, সেনাবাহিনীর আচরণ থেকে শুরু করে গণমানুষের আচারবিধি, এমনকি সংস্কৃতি, শিক্ষা--সবকিছুতে ধর্মই ঠিক করে দেয় কোনটা ভালো আর কোনটা ভালো না। ধর্মই মানুষের মূল আদর্শ হিসেবে কাজ করে। আর এই বিষয়গুলোকে চলচ্চিত্রে তুলে আনাই ছিলো আমার মূল আগ্রহের বিষয়।

জেক : চলচ্চিত্রের সেট হিসেবে একটি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলকে বেছে নিলেন। রূপকার্থে এটি সমগ্র রাশিয়ান সমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করে; কি বলেন?

কিরিল : মেরিয়াস ভন মায়েনবার্গের (জার্মান নাট্যকার) একটা নাটক থেকে দ্য স্টুডেন্ট-এর ধারণাটা পেয়েছিলাম। নাটকটি দেখেছিলাম বার্লিনে। দেখেই বেশ পছন্দ হয়েছিলো। তারপর মায়েনবার্গের কাছে স্ক্রিপ্টটা চেয়ে পাঠালাম। নাটকটা পড়ে বার বার মনে হচ্ছিলো, এটা তো রাশিয়ার সমসাময়িককে দেখাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম, জার্মানিতে বসে মায়েনবার্গ কী করে এতো সুন্দরভাবে রাশিয়াকে ফুটিয়ে তুললো! আমার মনে হয়, বর্তমান সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো নাট্যকার মেরিয়াস। তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পান। তবে এই নাটকের প্রভাব রাশিয়ায় যতোটা, জার্মানিতে ততোটা নয়। এটা আসলে আমাদের বাস্তবতা।


জেক : ধর্মের অন্যান্য দিকের পাশাপাশি দ্য স্টুডেন্ট-এ এল জি বি টি কিউ সম্প্রদায়ের ওপর মৌলবাদী খ্রিস্টানদের আক্রমণের দিকটাও চোখে পড়ে। রাশিয়ায় এই ধরনের ক্রমবর্ধমান রূঢ়তা দেখে সংখ্যালঘু এল জি বি টি কিউ সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়। তো এমন স্পর্শকাতর চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে আপনার কখনো মনে হয়েছে, রাষ্ট্রের দিক থেকে কোনো চাপ বা প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে?

কিরিল : দেখুন, আমরা সব রকমের ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছি। আর হয়তো এটা সম্ভব হয়েছে, কারণ রাশিয়ার নতুন প্রজন্মের প্রযোজকরা বেশ স্মার্ট, শিক্ষিত ও সাহসীও বটে। তাদের এই গুণ আমার মনে আশার সঞ্চয় করে, সাহস জোগায়। একটা উদাহরণ দিই, একবার আমরা হায়না মুলারের (জার্মান নাট্যকার) লেখা একটা নাটক রাশিয়ায় মঞ্চস্থ করেছিলাম। সেই নাটকে টানা দুই ঘণ্টা ২০ জন অভিনয়শিল্পী (নারী-পুরুষ) নগ্ন হয়ে অভিনয় করে। নাটকটি দেখে কিছু মানুষ নিষিদ্ধ করার হুমকিও দেয়। আমি তাদের মুখোমুখি হয়েছি, প্রশ্ন করেছি--সমস্যা কোথায়? এটা ক্ষমতা-বিরোধী, রাষ্ট্র-বিরোধী নাকি পুতিন-বিরোধী? তারা কোনো উত্তর দিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত আমাদের কিছুই হয়নি, আর আমি এই রকম কাজ করেই যাচ্ছি।

জেক :  দ্য স্টুডেন্ট রাশিয়ায় প্রদর্শনের সময় মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিলো?

কিরিল : এই ধারার চলচ্চিত্র হিসেবে আমি কিন্তু বেশ ভালো রেসপন্স পেয়েছি। আর সেদিক থেকে বলতে গেলে গণমাধ্যমেও ভালো প্রতিক্রিয়া ছিলো এবং বাণিজ্যিকভাবেও চলচ্চিত্রটি বেশ চলেছে।

জেক : যদি বাজেটের সমস্যা না থাকে, কোন কাজটা করতে চাইবেন?

কিরিল : অবশ্যই আমি চাইকোভস্কির (রাশিয়ান সঙ্গীতকার Pyotr Ilyich Tchaikovsky) জীবনী নিয়ে কাজ করবো। বছর কয়েক আগে একবার কাজটা আমরা শুরুও করেছিলাম। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় বাজেট না পাওয়ায় সেটা বন্ধ করতে হয়েছিলো। চাইকোভস্কি এখনো আমায় খুব টানে।

জেক : শেষ প্রশ্ন, এখন কী নিয়ে কাজ করছেন?

কিরিল : রাশিয়ার অন্যতম রকস্টার ভিক্টর সোইকে ধরে সোভিয়েত-যুগের গীতিনাট্য-সঙ্গীত নিয়ে কাজ করছি।

দ্বিতীয় অংশ

এমিলি বুডার : কিরিল আপনাকে শুভেচ্ছা। প্রথমেই জানতে চাই, দ্য স্টুডেন্ট-এর গল্প আপনার প্রযোজিত একটি নাটক থেকেই নেওয়া, তাইতো?

কিরিল : নাটকটি লিখেছেন মূলত মেরিয়েস ভন মায়ানবার্গ। বার্লিনের শাওবুনা থিয়েটারে এটি প্রথম মঞ্চায়ন হয়। আমি মেরিয়াসের কাছ থেকে ওটা ভাষান্তর করে রাশিয়ায় মঞ্চায়নের অনুমতি নিয়েছিলাম। এরপর গোগল থিয়েটারে নাটকটি মঞ্চায়ন করি। আমি তিন বছর গোগল থিয়েটারের আর্টিস্টিক ডিরেক্টর ছিলাম। সেখানে নাটকটি বেশ ভালো চলেছে। রাজনৈতিক সমস্যার কারণে নাটকটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাশিয়ায় আসতে পারেননি মেরিয়েস।

একটু বলে রাখি, মেরিয়েস রাশিয়ার সমকামিতা বিরোধী আইনের কঠোর বিরোধী। তাই রাশিয়া ও জার্মানিতে যারা এই আইনের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে, তাদেরকে তিনি সহায়তা করতে চাচ্ছিলেন। দ্য স্টুডেন্ট সম্প্রতি প্রথমবার দেখেছেন তিনি। চলচ্চিত্রটি দেখে নাকি তিনি খুবই রোমাঞ্চিত।

এমিলি : গল্পটাকে নাটক থেকে চলচ্চিত্রে রূপ দিলেন কীভাবে?

কিরিল : চলচ্চিত্রটি বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও কিন্তু আমাদের কাছে টাকা ছিলো না। অনেক চেষ্টা করেও সরকারের কাছ থেকে কোনো বাজেট পাওয়া যায়নি। শেষমেশ স্বাধীনভাবেই চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে হলো। আমি প্রযোজকদের প্রশ্ন করেছিলাম, এই রকম বিষয় নিয়ে কাজ করতে তারা ভয় পাচ্ছে কি না। কারণ বর্তমান রাশিয়ায় এমন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কথা বলা তো মোটেও সহজ নয়। তখন তারা বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে না বলছিলো; তারা আরো বলছিলো--এটি একটি স্বাধীনধারার চলচ্চিত্রই হবে। গত আগস্টে (২০১৬) আমরা কালিনিনগ্রাদে চলচ্চিত্রটি শুটিং করি। সেখানেই আমরা সেই স্কুল, ছেলে-মেয়ে, বাড়িঘর এবং যাবতীয় সবকিছু পেয়ে যাই। কালিনিনগ্রাদ আগে জার্মানির শহর ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি রাশিয়ার মধ্যে চলে আসে।

এমিলি : তার মানে আপনার চলচ্চিত্রের অধিকাংশ অভিনয়শিল্পী ওই শহরেরই?

কিরিল : সবাই না, মঞ্চনাটকে যারা কাজ করেছিলো বেশিরভাগ চরিত্র তাদের মধ্যে থেকেই নেওয়া হয়েছে। তবে প্রধান চরিত্রটা পরিবর্তন করেছিলাম। কারণ ওই অভিনয়শিল্পীর বয়স একটু বেশিই ছিলো। আর চলচ্চিত্রের চরিত্রটার জন্য আমার অল্পবয়সি ছেলের প্রয়োজন ছিলো। অন্য চরিত্রগুলো নেওয়া হয়েছিলো স্পোর্টস কলেজের ছেলে-মেয়েদের মধ্য থেকে।

বাকি অভিনয়শিল্পীরা যেহেতু নাটকের, তাই চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে তাদের সবকিছু মোটামুটি জানাই ছিলো। কিন্তু বিপদ হলো, আমি চলচ্চিত্রে লম্বা লম্বা শট্ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তাই প্রতিদিন শুটিংয়ের আগে বেশ কয়েকবার করে আমাদের অনুশীলন করতে হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, নাটক আর চলচ্চিত্র তো সম্পূর্ণ আলাদা মাধ্যম।

এমিলি : লম্বা শট্গুলো কীভাবে নিলেন?

কিরিল : সবচেয়ে লম্বা শট্টি ১১ মিনিটের। তবে আমরা কিছু জায়গায় শটের মাঝে কেটে জোড়া দিয়েছি, যাতে ইনটেন্সটা আরো ভালো হয়। প্রাকৃতিক আলোতেই প্রত্যেক দিন দুই-তিনটে করে শট্ নিতাম। চলচ্চিত্রটি শেষ করেছিলাম খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। তার পরেও এটা আমাদের কাছে একটা দুঃস্বপ্নের মতো ছিলো; কারণ ৩০ জন অপেশাদার আর মাত্র তিন জন পেশাদার মানুষ নিয়ে কাজটা করতে হয়েছে। সেখানে সবার খুব স্বতঃস্ফূর্ততা প্রয়োজন ছিলো।

হলিউডের বার্ডম্যান চলচ্চিত্রের কথাই ধরুন, তারা সতর্কতার সঙ্গে সময় নিয়ে কাজটা করেছে! অথচ বাজেটের স্বল্পতার কারণে আমাদের সেই সুযোগ ছিলো না। আমরা খুব অল্প সময়ে কাজটা শেষ করি; চলচ্চিত্রটির শুটিং আমরা এক মাসে শেষ করেছিলাম।

এমিলি : আপনার চিত্রগ্রাহক ভ্লাদিস্লাভ অপিল্যান্টস-এর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলুন।

কিরিল : তিনি তো রাশিয়ার প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক; একেবারে খোলা মনের মানুষ আর খুবই হেল্পফুল। সোভিয়েত রাশিয়ার প্রখ্যাত নির্মাতা নিকিতা মিখালকভ-এর সঙ্গে তিনি অনেক কাজ করেছেন। কাজ শুরুর আগেই আমি অপিল্যান্টসকে পুরো পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছিলাম; বলে নিয়েছিলাম--আমাদের বাজেট কম। তবে আমাদের দুর্দান্ত একটা গল্প আছে, আর আমরা লম্বা লম্বা সব শট্ নিতে চাই। আমার কথা শুনে তিনি অবাক হয়েছিলেন। বেশ খানিক ভেবে তিনি বললেন, দেখা যাক কী করা যায়। তখন আমি বললাম, দেখেন আমাদের শক্তির জায়গা হচ্ছে, আমরা কোনো কিছুকে ভয় করি না। সুতরাং চলুন মানুষকে চমকে দেওয়ার মতো কিছু করা যাক।

শুধু অপিল্যান্টসই না, আমার মনে হয় রাশিয়ার অন্যান্য চিত্রগ্রাহকও অসাধারণ। আর তাদের মধ্যে অনেকেই রাশিয়া ছাড়িয়ে হলিউড ও ইউরোপে দুর্দান্ত কাজ করছে। তাদের কাজের ধরনও দারুণ।

এমিলি : চলচ্চিত্রের মধ্যে ভেনিয়াকে খুবই বিষণ্ন দেখাচ্ছিলো; মনে হয়েছে সে খুব কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অবিরত কোনো একটা জিনিসের সঙ্গে লড়াই করে চলেছে, যেটাকে সে ঠিক ধরতে পারছে না। আপনার কী মনে হয়, কষ্টের কারণেই মানুষ ধর্মের দিকে আসে?

কিরিল : কষ্ট ও কোনোধরনের মানসিক আঘাত থেকে মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। আসলে ধর্ম ভালোবাসারই আরেক নাম ছিলো, কিন্তু এখন আমাদের জীবন, আমাদের পৃথিবীতে সেটা আর এভাবে কাজ করে না। এখন ধর্ম দেশের সঙ্গে দেশের, জাতির সঙ্গে জাতির লড়াইয়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ধর্ম চলে গেছে বিভেদ আর সন্ত্রাসবাদের জায়গায়। এটা ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে।

এমিলি : বাক-স্বাধীনতা নিয়ে আপনার চিন্তাভাবনা কেমন? রাশিয়া আর আমেরিকার পরিপ্রেক্ষিতে বাক-স্বাধীনতার চর্চা কোথায় বেশি?

কিরিল : স্বাধীনতা! সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতা প্রত্যেকটা মানুষের জন্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। স্বাধীনতার জন্য মৃত্যুকেও বরণ করা যায়। আমার মনে হয়, চরিত্রগুলো লড়াই করছে তাদের জীবন দর্শনের জন্য। এটা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির লড়াই।

দ্য স্টুডেন্ট-এ টিন-এইজ এই বালকটির জন্য এটা অবশ্য টেস্টোস্টেরন হরমোনের বিস্ফোরণ ছিলো। মেয়েরা তাকে পাত্তা না দেওয়া, পারিবারিক টানাপড়েন, বাবার অনুপস্থিতি, অসচেতন মা--কেউ তাকে বুঝতে চায় না। ফলে যেকোনো মূল্যে পৃথিবীর কাছে সে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়, জাহির করতে চায়। এটা তো সমস্যা, যা ছেলেটিকে পরে হিংসাত্মক করে তুলেছিলো।

তৃতীয় অংশ

দ্য আপকামিং : রাশিয়ার অবস্থা এখন কেমন? পুতিন, কিংবা পুসি রায়ট

কিরিল : বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতি খুবই খারাপ। কিছু মানুষকে আমি ঠিক বুঝে উঠতেই পারি না। টেলিভিশনে পুসি রায়টের টি-শার্ট পরার অভিযোগে পর্যন্ত আমাকে সেন্সর করা হয়েছে। এটা কোনো কথা!

দ্য আপকামিং : রাশিয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণ কি তাহলে কঠিন?

কিরিল : চলচ্চিত্র নির্মাণ এমনিতেই কঠিন ব্যাপার, সেটা হোক রাশিয়া, চিন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে। কাজ করতে গিয়েই এই ব্যাপারটা শুধু বোঝা যায়। আর এ কারণেই চলচ্চিত্রের মানুষগুলোর ব্যাপারে ভালো-মন্দ অনেক কিছুই দেখতে বা শুনতে পাওয়া যায় না। আবারও বলছি, চলচ্চিত্র নির্মাণ আসলেই কষ্টসাধ্য কাজ।

আমি চলচ্চিত্রে কম, থিয়েটারেই বেশি কাজ করি। এ কারণে আমি চলচ্চিত্রের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার অনেক সময় পাই। যখনই নতুন কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ভাবি, আমার টেনশন হয়। কারণ থিয়েটার আর চলচ্চিত্র একেবারেই ভিন্ন দুটি প্লাটফর্ম। চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য শক্তি আর শ্রম দুটোরই প্রয়োজন।

দ্য আপকামিং : রাশিয়ায় পরিস্থিতি কি এতোটা খারাপ হতে পারে যে, আপনাকে অন্য কোথাও গিয়ে কাজ করতে হবে?

কিরিল : আমি কর্মফলে বিশ্বাসী। আমার জন্ম রাশিয়ায়, তাই আমাকে এখানেই কাজ করতে হবে। আর কোনো উপায় নেই, আমি এখানেই কাজ করতে চাই। আমাকে বের করে দেওয়া হলে বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে, আমার বিশ্বাস রাশিয়ার মানুষ এর বিরুদ্ধে লড়বে। অবশ্য এর জন্য সময় লাগবে। কারণ রাশিয়া আয়তনে অনেক বড়ো। ক্ষমতার দিক থেকেও খুব শক্তিশালী। আর আমরা আসলে পুঁজিবাদের শিকার। পুতিনও বলতে গেলে সত্যিকার রাশিয়ান ডিক্টেটর নন। তিনিও সামগ্রিক পুঁজিবাদের অংশ এবং তিনিও আর সব আন্তর্জাতিক নেতার মতোই। তবে তিনি শুধু কাজটা করেন রাশিয়ান ঢঙে।

সূত্র

https://borrowingtape.com/interviews/the-student-qa-director-kirill-serebrennikov; retrieved on: 10.08.2019

https://nofilmschool.com/2016/05/the-student-uchenik-kirill-serebrennikov-interview-cannes-2016; retrieved on: 10.08.2019

https://www.theupcoming.co.uk/2012/09/01/interview-with-kirill-serebrennikov-director-of-izmena-betrayal/; retrieved on: 10.08.2019

টীকা

১.Lesbian, Gay, Bisexual, Transgender-দের একটি কম্যুনিটি। Q দ্বারা আরেক শ্রেণির মানুষকে বোঝানো হয়, যারা সম্প্রতি এই কম্যুনিটিতে যুক্ত হয়েছে। এরা নিজেদের যৌনাবস্থা নিয়ে সন্দিহান।

২. পুসি রায়ট--মস্কোকেন্দ্রিক একটি নারীবাদী আন্দোলন। এটির শুরু ২০১২-এর আগস্টে।

 

প্রিয়াংকা দেবনাথ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

[email protected]

https://www.facebook.com/priyanka.debnath.31521

 

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন