শৈবাল চৌধূরী
প্রকাশিত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ম্যাজিক স্মৃতি
স্মৃতিতে থিও এনজেলোপুলুস ও ল্যান্ডস্কেপ
শৈবাল চৌধূরী

১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘ভারতীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’টির আলাদা একটা তাৎপর্য ছিলো। সে বছর উৎসবটির ২৫তম আয়োজন ছিলো। এই উৎসবের সূচনা হয়েছিলো ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায়। সেই উৎসব সেসময়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে বিপুল অভিঘাতের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে যুব প্রজন্মের মধ্যে। যা এই উপমহাদেশের নববাস্তববাদী চলচ্চিত্র আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিলো। এরপর অনেক দিন এই উৎসব নানা কারণে আর অনুষ্ঠিত হয়নি। পরে উৎসবটি দুইভাবে আয়োজিত হতে থাকে। এক বছর দিল্লিতে যার নাম ‘ফিল্মোৎসব’, ইংরেজিতেও তাই। আরেক বছর ভারতের অন্য একটি শহরে, যার নাম ‘ভারতীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ ইংরেজিতে ‘Internationl Film Festival of India’, সংক্ষেপে ‘IFFI’। পরবর্তী সময়ে দুটি উৎসবকে একত্র করে কেবল IFFI-এর আয়োজন করা হতে থাকে পর্যটন শহর গোয়ায়। হয়তো এর নেপথ্যে ফ্রান্সের পর্যটন শহর কানে উৎসব আয়োজনের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের খেয়ালে ছিলো। যাহোক, গত বেশ ক’বছর ধরে গোয়ায় নিয়মিত IFFI-এর আয়োজন হয়ে আসছে, যা এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো চলচ্চিত্র উৎসব। আর এরপর থেকে ভারতের সব বড়ো শহর ছাড়াও ছোটো ছোটো অনেক শহরেও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে।
একটি চলচ্চিত্র উৎসবের অনেক দিক থাকে। একই সঙ্গে সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র দেখতে পাওয়ার সুযোগটাই কেবল নয়, সারাবিশ্বের নবীন-প্রবীণ নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলী, প্রযোজক, পরিবেশক, প্রদর্শক, চলচ্চিত্রকর্মী সবার মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে যোগাযোগ স্থাপিত হয়, ভাবনা ও পরিকল্পনার আদান-প্রদান ঘটে, পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এককথায় চলচ্চিত্রের এক নতুন দিগন্তরেখার দেখা মেলে।
বাংলাদেশেও একসময় অনুষ্ঠিত হয়েছিলো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। উৎসবটি নিয়মিতও হয়ে উঠেছিলো। ঢাকা ও চট্টগ্রামে একই সঙ্গে তা আয়োজিত হতো। কিছু চলচ্চিত্র দেখানো হতো টিভিতেও। উৎসবের বাতাবরণে ভালো মানের চলচ্চিত্র তৈরির উৎসাহ উদ্যোগও পরিলক্ষিত হচ্ছিলো তখন। অজানা কারণে বন্ধ হয়ে গেলো সব।
তবে কলকাতার উৎসবের একটা ভিন্ন দিক রয়েছে। শহরটি উপমহাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের আঁতুড়ঘর। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পরিবেশ এ শহরের বরাবরই উন্নত যা বিশ্ববিদিতও বটে। কাজেই কলকাতার উৎসবে সারাবিশ্বের নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলী, সমালোচক, সংবাদশিল্পী সবার উৎসাহের পারদ উপরের দিকেই থাকে। সবার স্বতঃস্ফূর্ততা প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা আমার অনেকবারই হয়েছে। প্রতিবারই বিশ্বখ্যাত অনেক নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলীকে দেখার এবং অনেকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে।
১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে IFFI-এর রজত জয়ন্তী উপলক্ষে কলকাতায় আয়োজিত উৎসবটি বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সারাবিশ্ব থেকে চলচ্চিত্রসেবী প্রচুর অতিথিকে সে বারের উৎসবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের সংখ্যাও ছিলো অন্যবারের চেয়ে বেশি। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে সত্যজিৎ রায় পরলোকগমন করেন। তার স্মৃতিতে ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দের উৎসবটি উৎসর্গ করা হয়েছিলো। ইতালি থেকে সস্ত্রীক মাইকেলেঞ্জোলো আন্তোনিওনি এসেছিলেন তার সেসময়ের সহকারী জার্মান নির্মাতা ভিম ভেন্ডারসকে নিয়ে নন্দন ভবনে স্থাপিত ‘সত্যজিৎ রায় আর্কাইভ’ উদ্বোধনের জন্যে। এ উপলক্ষে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয় সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে।
সেবার এসেছিলেন সারাবিশ্বের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অনেকেই। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ক্রিস্তফ জানুসি, ফার্নান্দো সোলানাস, জাফর পানাহি, মাজিদ মাজিদি, নাগিসা ওশিমা, বিলি ওয়াইল্ডার, পেদ্রো আলমোদোভার, ডেরেক ম্যালকম (চিত্রসমালোচক)। আরো অনেক গুণী নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলী। সবার নাম আজ আর মনে পড়ছে না। আন্তোনিওনি ও ভিম ভেন্ডারসের কথা তো আগেই বলেছি। এছাড়া সারা ভারতের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট জাদরেল লোকজনেরা তো ছিলোই।
তবে উৎসবের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র ও তার পরিচালককে নিয়ে সবার ঔৎসুক্য ছিলো উৎসবের আগে থেকেই। উৎসবের আগে থেকেই বলা হচ্ছিলো এবার ডিজিটাল পদ্ধতিতে নির্মিত একটি অসাধারণ গ্রিক চলচ্চিত্র দিয়ে উদ্বোধন হবে। স্বভাবতই উপস্থিত থাকবেন সেই চলচ্চিত্রের নির্মাতা যিনি গ্রিক দেশে বেশ নামজাদা।
সেই উৎসবে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্র থেকে ছিলাম আমি ও কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক নাজিমুদ্দীন শ্যামল। আগে থেকে আমরা পত্রপত্রিকায় এসব সংবাদ পাচ্ছিলাম। তো গ্রিসের সেই নির্মাতার নাম জানলাম, থিওডোরোস এনজেলোপুলুস। থিও নামেই যিনি বেশি পরিচিত। উৎসবের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হবে তার ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট চলচ্চিত্রটি। যেটি বছর কয়েক আগে নির্মিত। স্বভাবতই আমাদের আগ্রহ ছিলো ডিজিটাল ফরমেটের চলচ্চিত্র দেখার প্রতি। নির্মাতার প্রতি তেমন আগ্রহ ছিলো না। কেননা তাকে তখনো তেমন চিনতাম না।
উদ্বোধনী চলচ্চিত্র ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। যেহেতু কয়েক বছরের পুরনো, তাই একে উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত করায় পত্রপত্রিকায় সমালোচনা হচ্ছিলো। উৎসব কর্তৃপক্ষ বলছিলেন, তাদের উদ্দেশ্য একজন প্রতিভাবান নির্মাতাকে এ অঞ্চলের চলচ্চিত্রামোদীদের কাছে উপস্থাপন করা, যিনি তার দেশ ও মহাদেশে ইতোমধ্যেই সমাদৃত। এবং যেহেতু ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট তার সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র তাই এ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করা হচ্ছে। তাছাড়া গুণগত বৈশিষ্ট্য ও নির্মাণের অভিনবত্ব চলচ্চিত্রটিকে উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের উৎসাহিত করেছে।
যাহোক, ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দের ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রবীন্দ্র সরোবরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থিওকে সংবর্ধিত করা হয়। উৎসব উদ্বোধন করেন তপন সিংহ। পরে উদ্বোধনী চলচ্চিত্র ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট প্রদর্শিত হয় নন্দনের মূল প্রেক্ষাগৃহে এবং সেখানেও চলচ্চিত্রটির নির্মাতাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তিনিও দর্শকের উদ্দেশে কথা বলেন। সেসব কথা অবশ্য আজ আর মনে নেই। তবে মনে আছে তিনি বলেছিলেন, কলকাতা সত্যজিৎ রায়ের শহর, ভালো চলচ্চিত্রের শহর, এতো বড়ো উৎসবে, এতো বড়ো প্রেক্ষাগৃহে তার চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে এটা তার সৌভাগ্য। সবচেয়ে বড়ো সৌভাগ্য সত্যজিৎ রায়ের শহরে নিজের চলচ্চিত্র নিয়ে আসতে পেরে।
উদ্বোধনের পর উৎসব শুরু হয় ১০ জানুয়ারি সকাল থেকে। এর পরবর্তী কয়েক দিনে তাকে অনেকবারই দেখেছি নন্দন চত্বরে। উৎসবের দ্বিতীয় দিন সকালে ‘মিট দ্য ডিরেক্টর’ অনুষ্ঠানে এবং আরেক দিন ‘ওপেন ফোরাম’ অনুষ্ঠানে থিও তার চলচ্চিত্র, গ্রিসের চলচ্চিত্র এবং উৎসবে প্রদর্শনরত তার চলচ্চিত্র ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট সম্পর্কে অনেক কথাই বলেছিলেন। বলেছিলেন ভারত ও গ্রিসের প্রাচীন সভ্যতার পারস্পরিক সম্পর্ক ও সাদৃশ্যের নানা কথা।
তবে আজ দুঃখ হয়, অনেকের সঙ্গে কথাবার্তা বললেও থিওর সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি। সৌম্যদর্শন মানুষটিকে কাছ থেকে, দূর থেকে দেখতাম। কিন্তু কথা বলিনি কিছু সংকোচ থেকে। সে সংকোচ গ্রিসের চলচ্চিত্র সম্পর্কে অজ্ঞতাপ্রসূত। তাছাড়া থিও সম্পর্কেও তখন বেশি আগ্রহ তৈরি হয়নি। যেহেতু ল্যান্ডস্কেপ ছাড়া আর কোনো চলচ্চিত্র তার দেখার সুযোগ হয়নি তখনো।
ল্যান্ডস্কেপ উদ্বোধনী প্রদর্শনীর পর রবীন্দ্র সদনে আরেকবার দেখানো হয়। এছাড়া উৎসবের মূল কেন্দ্রের বাইরে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহেও সাধারণ দর্শকের জন্যে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করা হয়। প্রথম দেখায় ভালোলাগার কারণে রবীন্দ্র সদনেও দ্বিতীয় প্রদর্শনীতে চলচ্চিত্রটি দেখেছিলাম। এর আগে সচেতনভাবে গ্রিসের চলচ্চিত্র দেখেছিলাম মাত্র দুটি জোরবা দ্য গ্রিক ও ডটার অব দ্য সান। দুটোই ভালো লেগেছিলো। বিশেষ করে জোরবা দ্য গ্রিক। এই চলচ্চিত্রটি যদিও বৃটেন ও গ্রিসের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত। তবুও অ্যান্থোনি কুইন, অ্যালান বেটস, লিলা কেডরোভা ও আইরিন পাপাস এর অসাধারণ অভিনয় সমৃদ্ধ মাইকেল কেকয়ানিস নির্মিত চলচ্চিত্রটি একটা সময় পর্যন্ত গ্রিসের চলচ্চিত্রের স্বাদ দিয়েছিলো দর্শককে। ওয়াল্টার ল্যাসলির অনিন্দ্য সুন্দর চিত্রগ্রহণ এ চলচ্চিত্রের একটি বড়ো সম্পদ। ওয়াল্টার ল্যাসলি ও লিলা কেডরোভা অস্কার পুরস্কার পেয়েছিলেন সেরা চিত্রগ্রহণ ও অভিনয়ের জন্যে।
ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট দেখে এসে দীর্ঘদিন ধরে এ চলচ্চিত্রের এবং থিও এনজেলোপুলুস সম্পর্কে বন্ধুদের কাছে গল্প করতাম। পরবর্তী সময়ে যখন ডি ভি ডি’র যুগ এলো, তখন ল্যান্ডস্কেপ আবারও দেখি। আরো দেখি থিওর দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স (১৯৭৫), উলিসেস গেজ (১৯৯৫), ইটারনিটি অ্যান্ড আ ডে (১৯৯৮)। তবে ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট-এর ঘোরটা বরাবরই অক্ষুণ্ন ছিলো। বন্ধুদের মধ্যেও অনেকে থিওর ভক্ত হয়ে ওঠে।
থিওডোরাস এনজেলোপুলুসের (Theodoros Angelopoulos) চলচ্চিত্রে গ্রিসের প্রাচীন লোকায়ত দর্শন ও ঐতিহ্য নানাভাবে উঠে আসে। পাশাপাশি থাকে সে দেশের অস্থির রাজনীতির প্রসঙ্গ। দ্বিতীয় কারণে তিনি গ্রিসের রাজনীতিওয়ালাদের বিশেষ করে সামরিক শাসনযন্ত্রের বিরাগভাজন হয়েছেন বার বার। তার জন্ম ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ এপ্রিল গ্রিসের রাজধানী অ্যাথেন্সে। পড়াশোনা করেন আইনশাস্ত্রে। ক্যারিয়ার শুরু করেন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে। আর এ কারণে সেনাবাহিনীকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এরপর ফ্রান্সে চলে যান এবং সেখানে চলচ্চিত্র বিষয়ে দীর্ঘ পাঠগ্রহণ শেষে ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি গ্রিসে ফিরে এসে চলচ্চিত্র নির্মাণে নেমে পড়েন। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি তার প্রতিভার প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হন এবং গ্রিসে তো বটেই বিশ্বচলচ্চিত্রে পরিচিত হয়ে ওঠেন শক্তিশালী এক নির্মাতা রূপে। অবশ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের আগে তিনি বামপন্থি পত্রিকা ‘দৈনিক আল্লাগি’তে চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে কাজ করেন। একজন চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে থিও যথেষ্ট পরিপক্কতার স্বাক্ষর রাখেন। লেখক হিসেবেও থিও ছিলেন যথেষ্ট সফল। যদিও নির্মাতা প্রতিভার আড়ালে তার লেখক প্রতিভা অনেকটা ঢাকা পড়ে গেছে। তবে তার চলচ্চিত্র-সাহিত্য (কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ) তার লেখক সত্তার অসাধারণ প্রকাশ সারা জীবন ধরে করে গেছে।
থিও স্বভাবতই একজন কমিটেড শিল্পী। এই কমিটমেন্ট তার দেশের প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের প্রতি, তার দেশের সমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থার প্রতি, তার দেশের জনগণের প্রতি। এ কারণেই তার চলচ্চিত্রে তার দেশের মানুষের অসহায়তার কথা, রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা বার বার চিত্রিত হয়। সামরিক-বেসামরিক স্বৈরশাসন জনিত কারণে সমৃদ্ধ এই জনপদের বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থার ভঙ্গুরতার চিত্র তাই তিনি নানাভাবে তার চলচ্চিত্রে তুলে ধরতে সদাসচেষ্ট থাকতেন।
থিওর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে; দ্য ব্রডকাস্ট (১৯৬৮), রিকন্সট্রাকশন (১৯৭০), ডেইজ অব থার্টি সিক্স (১৯৭২), দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স (১৯৭৫), দ্য হান্টার্স (১৯৭৭), আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট (১৯৮০), ভয়েজ টু সাইথেরিয়া (১৯৮৪), দ্য বিকিপার (১৯৮৬), ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট (১৯৮৮), দ্য সাসপেন্ডেড স্টেপ অব দ্য স্টর্ক (১৯৯১), উলিসেস গেজ (১৯৯৫), ইটারনিটি অ্যান্ড আ ডে (১৯৯৮), দ্য উইপিং মিডো (২০০৪), দ্য ডাস্ট অব টাইম (২০০৯) ইত্যাদি।
তবে তিনটি চলচ্চিত্রের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য--দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এবং ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট। দ্য ট্র্যাভেলিং প্লেয়ার্স গ্রিক দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যকে যেমন তুলে ধরে তেমনই নির্মাতার লোকায়ত দর্শনকেও উপস্থাপন করে। তেমনই আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বীর আলেকজান্ডারের বীরত্বগাঁথা নয়, সমনামের এক ডাকাত সর্দারের গল্প যে অসহায় কৃষকদের পক্ষে সামন্ত মহাজনদের মুখোমুখি দাঁড়ায়। চলচ্চিত্রটির নাম এক্ষেত্রে এক রূপক হয়ে ওঠে এবং চলচ্চিত্রটি হয়ে ওঠে গ্রিক সমাজতন্ত্রের রূপকধর্মী চিত্র।
চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক ধীমান দাশগুপ্ত যেভাবে এ দুটি চলচ্চিত্রকে মূল্যায়ন করেছেন,
দ্য ট্র্যাভেলিং প্লেয়ারস পরিচালকের লোকায়ত দর্শনকে তুলে ধরে। গ্রিসদেশের একটি ভ্রাম্যমান নাচগানের দল ১৯৪০ থেকে প্রায় এক যুগ সময় ধরে সারাদেশ জুড়ে তাদের আধ্যাত্মিক অভিনয় প্রদর্শন করে বেড়াতো, ছবিটি এরকম একটি গোষ্ঠীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এবং জীবনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংকট ও জীবনে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার গুরুত্ব ইত্যাদি বিষয়ে হয়ে উঠেছে একটি আধুনিক ডিসকোর্স। যেমন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট গ্রিক সোশিয়ালিজম বিষয়ে সাড়ে তিন ঘণ্টা দীর্ঘ এক রূপকচিত্র যা আলাপের মতো ধীর লয়ে অন্তিমে ধ্রুপদ বা ধামার হয়ে ওঠে। ছবির নায়ক আলেকজান্ডার কিন্তু ম্যাসিডোনিয়ার সেই ইতিহাসপ্রসিদ্ধ মহাবীর নন, পরিবর্তে এক ডাকাত সর্দার যার সাহায্য পেয়ে কৃষকেরা তাদের সামন্ত প্রভুদের উচ্ছেদ করে। ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ, কাব্যিক জগতের সৃষ্টি, দেশ ও কালের রূপক বা প্রক্ষেপ, রিয়ালিটি ও ফ্যান্টাসির এবং টেক্সট ও সাবটেক্সটের দ্বান্দ্বিকতা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে থিয়োডোরোস এমন এক চিত্রজগতের জন্ম দেন যা দ্বিতীয় জীবন তথা সমান্তরাল জীবনের এবং অন্য জগৎ তথা অন্তর্জগতের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করায়। তাঁর চিত্রজগৎ একই সঙ্গে এখানের ও অন্য কোনো খানের কথা বলে, এখানের ও অন্য কোনো সময়ের কথা।
ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট থিওর ট্রিলজি অব সাইলেন্সের তৃতীয় বা শেষ পর্ব। ট্রিলজির তিনটি চলচ্চিত্র হলো--ভয়েজ টু সাইথেরিয়া (১৯৮৪), দ্য বিকিপার (১৯৮৬) এবং ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট (১৯৮৮)। তিনটি চলচ্চিত্রই সুনির্মিত হলেও তুলনামূলকভাবে তৃতীয়টি বেশি উল্লেখযোগ্য। তার বিষয়বস্তু, নির্মাণ আঙ্গিক-বিশেষ করে চিত্রগ্রহণ, সঙ্গীত ও অভিনয় সবমিলিয়ে ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট চলচ্চিত্র ভাষার এক অপরূপ নিদর্শন। চিত্রগ্রহণ আর সঙ্গীতের কাব্যময়তা এই চলচ্চিত্রের প্রাণ।
ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট দুই শিশুর তাদের বাবাকে খুঁজে ফেরার গল্প। এই অনুসন্ধান এই চলচ্চিত্রে নিছক পিতৃ অনুসন্ধান হয়ে থাকে না শেষ পর্যন্ত, হয়ে ওঠে জীবনের নানা পথের অনুসন্ধান, হয়ে ওঠে জীবনের এক দীর্ঘ পরিভ্রমণ। গ্রিসের এক কিশোরী ভৌলা আর তার ছোটোভাই আলেকজান্দ্রোস-এর ধারণা তাদের বাবা সুদূর জার্মানিতে থাকেন। তারা দুজন সিদ্ধান্ত নেয় বাবাকে খুঁজে পেতে তারা সে দেশে যাবে। এই যাত্রায় তারা সঙ্গ পায় ওরেস্টিস নামের এক লোকের, যিনি তাদের সর্বক্ষণ ছায়া দিয়ে রাখেন। কিন্তু একপর্যায়ে তারা ওরেস্টিসের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ভৌলা আর আলেকজান্দ্রোস সিদ্ধান্ত নেয় তারা নিজেদের মতো আবার অনুসন্ধানের কাজ শুরু করবে। কিন্তু তারা সত্যিকার অর্থে একা হয়ে পড়ে এবং বিস্তর কঠিন কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয় পদে পদে। দীর্ঘ পথভ্রমণে তারা পথ হারিয়ে ফেলে। অপার মনোরম প্রকৃতি তাদের কাছে রহস্যঘেরা বিস্ময় হয়ে দেখা দেয়।
কলকাতায় প্রথম প্রদর্শনের পর চলচ্চিত্রটি যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করে। অনেকেই ভৌলা ও আলেকজান্দ্রোসকে দূর্গা ও অপুর সঙ্গে তুলনা করেন। এ নিয়ে ওপেন ফোরাম অনুষ্ঠানে কেউ কেউ থিওকে প্রশ্নও করেন। থিও জানান, এই জীবন পরিভ্রমণ আমাদের জীবনে হরহামেশাই ঘটে। কেবল অপু-দূর্গা বা ভৌলা-আলেকজান্দ্রোসের বেলাতেই নয়। আমরা প্রকৃতার্থেই একা, নিঃসঙ্গ। অপার প্রকৃতিতে যেমন, নাগরিক ভিড়েও তাই। প্রতিনিয়তই আমরা নিজেকে খুঁজে বেড়াই, খুঁজে বেড়াই অন্যকে। আর এই অন্বেষণের মধ্যেই আমরা মুখোমুখি হই জীবনের নানা কঠোর কঠিন সত্যের, বাস্তবতার।
ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট-এর সম্পদ তানিয়া পালাইওলোগো (Tania Palaiologou) ও মিখাইলিস জেকের (Michalis Zacke) মর্মস্পশী অভিনয় ভৌলা ও আলেকজান্দ্রোসের চরিত্রে। তেমনই স্মরণীয় অভিনয় করেছিলেন স্ট্র্যাতোস জোরতজোগলোন (Stratos Tzortzoglon)। এই চলচ্চিত্রের আরেকটি সম্পদ এলেনি কারাইন্দ্রো’র করা অসাধারণ সঙ্গীত যা পুরো চলচ্চিত্রকে অবিস্মরণীয় করে তোলে।
একজন শিল্পী যখন সৃষ্টিরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন, তখন তার চেয়ে ইপ্সিত আর কিছু হয় না। থিওডোরাস এনজেলোপুলুসের জীবনেও সেই ইপ্সিত ঘটনাটি ঘটেছিলো। যদিও তা ছিলো অত্যন্ত মর্র্মান্তিক। ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি গ্রিসের পাইরিয়াস শহরে শুটিং করার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনায় অত্যন্ত মুষড়ে পড়েন তার স্ত্রী ফোবি ইকোনোমোপুলুস (Phoebe Economopoulos)। ফোবি ছিলেন থিওর জীবনে প্রেরণাদায়ী এক অবলম্বন। একে অন্যকে আঁকড়ে ধরেই কাটিয়েছেন জীবনের ৩২ বছরের দাম্পত্য (১৯৮০—২০১২)। ফোবি গ্রিসের একজন স্বনামখ্যাত অভিনয়শিল্পী ও চিত্রপ্রযোজক। থিওর উল্লেখযোগ্য প্রায় সব চলচ্চিত্রেরই প্রযোজক ও ব্যবস্থাপক ছিলেন ফোবি। ফোবির এই হতাশাচ্ছন্নতা কেটে উঠতে অনেক সময় লেগে যায়। থিও-ফোবির তিন কন্যা এলেনি, আনা ও ক্যাথরিনাও নানাভাবে গ্রিক চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
শেষ করি আবারও ধীমান দাশগুপ্তের কথায়,
মিকলোশ ইয়াঞ্চোর অতি আধুনিক চিত্রপ্রকরণের এবং অ্যাঞ্জোলোপোউলসের মহাকাব্যিক চিত্রাঙ্গিকের সঙ্গে আমি বাংলা কবিতার প্রথাসিদ্ধ প্রকরণের বিপরীতে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের ধারাবাহিক আঙ্গিকের এপিক প্রতিম কাঠামোর সুস্পষ্ট সাযুজ্য খুঁজে পাই। তাঁর ছবিতে ব্রেখ্টের এপিক সিনেমার বিশেষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। তাঁর ছবির বিষন্ন মেজাজের সঙ্গে আমি তারকোভস্কিরও সাদৃশ্য লক্ষ করি যা অবশ্য গ্রিক ট্র্যাজেডিরও প্রভাব।
অ্যাঞ্জোলোপোউলস যেনো বলতে চান, নশ্বরতার মধ্যেই রয়ে গেছে শাশ্বতের উপাদান, একটি দিনের বা একটি ক্ষণের মধ্য দিয়েও মানুষ সেই শাশ্বতকে ছুঁতে পারে। তা আমরা ছোঁব কিনা তা আমাদেরই ওপর নির্ভরশীল।
লেখক : শৈবাল চৌধূরী, একাধারে চলচ্চিত্রনির্মাতা, লেখক এবং সভাপতি, চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্র। এছাড়া তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে চলচ্চিত্র পড়ান।
https://www.facebook.com/shaibal.chowdhury.56
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন