শাহরিয়ার কবির
প্রকাশিত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
বিদেশে বাংলাদেশের ছায়াছবি
শাহরিয়ার কবির

বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমগুলোর ভিতরে চলচ্চিত্রের স্থান হচ্ছে সবচেয়ে পিছনের সারিতে, বরং বলা চলে শিল্পমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র এদেশের মানুষের কাছে বিন্দুমাত্র আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। অথচ চিত্রকলা, সাহিত্য, সঙ্গীতসহ শিল্পকলার বিভিন্ন শাখাগুলো শিল্পের নিরিখে অবশ্যই বৈশিষ্ট্যের দাবি করতে পারে। শিল্পের সবচেয়ে বলিষ্ঠ মাধ্যম চলচ্চিত্রে এই দুর্ভোগের জন্য কারা দায়ী, সে প্রশ্ন এখনো উহ্য থাকে; তবে এটা ঠিক যে এদেশে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে, প্রচুর পরিমাণে দেশীয় ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিয়োগ ঘটছে এবং লাখ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগের ভিত্তিতে চলচ্চিত্র এদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে।
বাংলাদেশের চিত্রকলার ভালো বাজার রয়েছে বিদেশে। সাহিত্য, সঙ্গীত ইত্যাদির বিনিময় ও বাজার ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু চলচ্চিত্র সম্পর্কে যখন এ ধরনের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়, তখন আমাদের মনে দুঃখ ও ক্ষোভের সঞ্চার হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ থাকে না। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ছায়াছবি বিদেশের বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রেরিত হয়েছে, চলচ্চিত্র মেলায় অংশ নিয়েছে কিন্তু তার ফলাফল অত্যন্ত হতাশাজনক। উৎসব এবং চলচ্চিত্রমেলায় অংশগ্রহণ করার দুটো প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, উৎসবের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সম্মান অর্জন করা এবং মেলার মাধ্যমে বিদেশে ছবির বাণিজ্যিক লেনদেনের পথ সুগম ও প্রশস্ত করা। আজ অবধি বাংলাদেশের ছবি বিদেশের কোনো প্রতিযোগিতা ভিত্তিক উৎসব থেকে কোনো সম্মানজনক পুরস্কার অর্জন করতে সক্ষম হয়নি এবং সেই সঙ্গে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ছবির বাজারের সম্ভাবনাও সুদূর পরাহত। উৎসবে অংশগ্রহণ করার তৃতীয় কারণ যদি দেশের সংস্কৃতিকে বিদেশে পরিচিত করার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলেও এই পরিচিতির মাধ্যমে কোনো সুফল হচ্ছে না, কারণ বিদেশের উৎসবে অংশগ্রহণকারী এইসব ছবি থেকে দেশীয় জীবনযাত্রার আংশিক অথবা বিকৃত পরিচয়ই বিদেশীরা সঞ্চয় করবে বা ভুল মূল্যায়নের পক্ষে সহায়ক হবে।
কিছুটা নির্মমভাবে যদি এদেশীয় চলচ্চিত্রের মান নির্ণয় করতে হয়, তাহলে দেখা যাবে বিদেশে চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার উপযুক্ত একটি ছবিও বাংলাদেশে আজ অবধি নির্মিত হয়নি এবং বিদেশে প্রতিযোগিতা ভিত্তিক বাজার সৃষ্টির বিষয়েও এদেশীয় কোনো ছবি এতোটুকু ভূমিকা গ্রহণ করতে পারবে না। যথেষ্ট সহনশীল হলে দেখা যাবে, একটা দুটো ছবির কিছুটা সম্মান লাভের সম্ভাবনা ছিলো এবং বাজার লাভের ব্যাপারেও কিছুটা সহায়তা করতে পারতো--দুর্ভাগ্যের বিষয় সেসব ছবি উৎসবে বা মেলায় প্রেরিত হয়নি। কিছুদিন আগে ভারতে বাংলাদেশের যে ছবিগুলোর মেলা হলো, ভারতীয় পত্রপত্রিকায় অত্যন্ত তীব্র ভাষায় সেসব ছবির সমালোচনা করা হয়েছে যা আমাদের কাছে বিন্দুমাত্র অযৌক্তিক মনে হয়নি।
মেলার জন্য যখন ছবি বাছাই করা হচ্ছে তখন স্থানীয় পত্রপত্রিকাতেও কম সমালোচনা করা হয়নি। অবুঝ মন-এর মতো তৃতীয় শ্রেণির সুশীল মজুমদার টাইপ মেলোড্রামা দেখে কেনো ভারতীয় দর্শক ও সমালোচকরা ক্ষিপ্ত হবে না এটা আমাদের বোধগম্যের বাইরে। উৎসবে যখন পুরনো ছবিও দেখানো হয়েছে, তখন জহির রায়হানের কাঁচের দেয়াল, সালাউদ্দিনের সূর্যস্নান, সুভাষ দত্তের আয়না, স্বচ্ছন্দে সম্মানজনক ছবি হিসেবে মেলায় পাঠানো যেতো। নতুন ছবির ভিতর আলমগীর কবিরের ধীরে বহে মেঘনা, ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম, মহীউদ্দীনের দুরন্ত দুর্বার, চাষী নজরুলের ওরা ১১ জনও অনায়াসে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবি রাখে। তিতাস সম্পর্কে অনেকে বলে থাকেন, এটা ভারতীয় পরিচালক দ্বারা নির্মিত। কিন্তু এ কথা তারা ভুলে যান যে, এ ছবি বাংলাদেশের অর্থে, বাংলাদেশের কুশলীদের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশে নির্মিত ছবি। এ ছবি যদি কোনো উৎসবে শ্রেষ্ঠ ছবির শিরোপা পায়, তা বাংলাদেশের ভাগেই জুটবে আর বিদেশে বিক্রি করে যদি কিছু স্বর্ণমুদ্রা সংগ্রহ করা যায়, সেটাও বাংলাদেশেরই প্রাপ্য হবে। ছবি হিসেবে তিতাস নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি। অথচ এ ছবি ভারতীয় মেলাতেও দেখানো হয়নি, তাসখন্দ উৎসবেও প্রেরিত হয়নি, আমাদের প্রাপ্য সম্মান থেকে যারা এভাবে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করছেন, তাদের কার্যকলাপ নিঃসন্দেহে ষড়যন্ত্র ও দূরভিসন্ধিমূলক। ভারতে অনুষ্ঠিত মেলার যদি প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে থাকে বাজার সৃষ্টি করা--তাহলেও প্রদর্শিত ছবির তালিকাটিও ত্রুটিপূর্ণ ছিলো। অবুঝ মন-এর চেয়ে খান আতার সাত ভাই চম্পা পশ্চিমবাংলায় ভালো বাজার পাবে। জহির রায়হানের বেহুলা আঙ্গিকের বৈশিষ্ট্য বাদ দিলেও ধর্মীয় কারণেই ভালো বাজার পেতে পারে। আর এটা কে না জানে মধ্যপ্রাচ্যে বাজারের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ দেশ ভারতেও ইসলামি ভাবধারায় পুষ্ট প্রচুর ছবি নির্মিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে পৃথিবীর প্রতিটি দেশেরই আগ্রহ রয়েছে--সেই দেশ ভারতই হোক অথবা রাশিয়াই হোক, সেখানকার চলচ্চিত্রামোদীরা নিশ্চয় এদেশের ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন দেখতে উৎসাহী হবেন। মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রামাণ্য কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি এদেশে নির্মিত না হলেও চাষী নজরুলের ওরা ১১ জন ও সংগ্রাম (পূণর্সম্পাদনা সহ) এবং আলমগীর কবিরের ধীরে বহে মেঘনা নিশ্চয়ই অবুঝ মন, রংবাজ-এর চেয়ে ঢের বেশি সম্মানজনক ছবি। ধীরে বহে মেঘনার মতো পরিচ্ছন্ন ছবি স্বাধীনতার পর এদেশের কোনো চিত্রনির্মাতা বানাতে পেরেছেন কি? আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিপুল সংখ্যক তরুণের অংশগ্রহণের প্রধান কারণ ছিলো রোমান্টিকতা (ওরা ১১ জন) এবং এর মূলে রাজনৈতিক চেতনা ততোখানি সমৃদ্ধ ছিলো না (ধীরে বহে মেঘনা), এই সত্যের আলোকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বিচার করলে পৃথিবীর ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এর বৈশিষ্ট্যটুকু ধরা পড়বে, যা একান্তভাবেই আমাদের নিজস্ব।
বিদেশে পাঠানোর জন্য যারা ছবি মনোনীত করেন তাদের ধারণা দেশে যে ছবিগুলো ভালো ব্যবসা করেছে সে ছবিগুলো নিশ্চয় বেশি দর্শক পছন্দ করেছে, আর বিদেশে পাঠাতে হলে সেই দর্শক মন-নন্দিত ছবিগুলো পাঠানোই উচিত। আমাদের দেশে সৎ চিত্রসমালোচনার কিছুটা অভাব রয়েছে বৈকি? কিন্তু সরকারি এই আমলারা যারা বাইরের উৎসবে ছবি পাঠাচ্ছেন, তারা কখনোই কোনো ছবির সমালোচনা পড়েন না, ভালো ছবি বলতে কী বোঝায় জানেন না, বিদেশে কী ধরনের ছবি পাঠাতে হবে তা তো জানেনই না; তাছাড়া বিদেশে কী ধরনের ছবি আজকাল বানানো হচ্ছে তারও কোনো খোঁজখবর রাখেন না। অবশ্য অমুক সমিতির চেয়ারম্যান, তমুক দপ্তরের সচিবরা মিলে যখন পদাধিকার বলে রাতারাতি ছবির সমঝদার হয়ে যান, তখন এ ধরনের ভুলত্রুটি হওয়া খুবই স্বাভাবিক।
শাহরিয়ার কবির
যেসব ছবিতে আমাদের জীবনের বিন্দুমাত্র প্রতিফলন নেই; আছে বাস্তবের বিকৃত ব্যাখ্যা, সত্যের ভুল মূল্যায়ন, সর্বোপরি রুচিহীনতা, স্থূল ভাঁড়ামি অথবা অশ্লীলতা--এই মূর্খ নির্বাচকদের কল্যাণে সেই ছবি অনায়াসেই বিদেশের উৎসবে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়ে গেছে। দেশ ও জাতির মুখে চুনকালি লেপে দিচ্ছে। ভারত ও রাশিয়ায় প্রেরিত চিত্রসমূহের ভিতর অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, আনোয়ারা, আবার তোরা মানুষ হ, লালন ফকির ও আলোর মিছিল ছাড়া অন্য সবগুলো ছবির বেলাতেই উপরোক্ত মন্তব্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এ ছবিগুলোর সঙ্গে পূর্বে উল্লিখিত ছবিগুলো যদি যুক্ত হতো, তাহলে আমরা হয়তো এতোটা দুর্নামের ভাগী হতাম না।
এ কথা বলার মানে এই নয় যে, আগামী কোনো উৎসবে এসব ছবি পাঠালে এর কোনো একটি গ্র্যান্ডপ্রিকস নিয়ে আসবে বা বিদেশিরা সেটা কেনার জন্য লাফালাফি করবেন। আগেই বলা হয়েছে, এ ধরনের ছবি বাংলাদেশে আজ অবধি নির্মিত হয়নি। বছরে যেখানে ৫০টি ছবি নির্মিত হচ্ছে, সেখানে উৎসবে পাঠানোর জন্য পাঁচটি ভালো ছবি খুঁজে পাওয়া যাবে না, এ লজ্জা আমরা কোথায় রাখবো? সবাই বলেন, আজকাল তাবৎ মূর্খের দল ছবি বানানো শুরু করেছে বলেই আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পের এই দৈন্যদশা। মূর্খরা ভালো ছবি বানাবে না এ কথা কে না জানে, কিন্তু এই মূর্খদের কারা লালন করছেন, এ প্রশ্নের কেউ জবাব দেবেন কি? অনেকে বলবেন, কেনো মূর্খ দর্শক! নিবন্ধকার এক্ষেত্রে বিনীত কণ্ঠে জানিয়ে দিতে চায়, আমাদের পরম উদার সদাশয় সরকারই এদের সযত্নে লালন করছেন; সমৃদ্ধির সুযোগ করে দিচ্ছেন। চরম উদার দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই এরা ভাবতে পারেন না, লাখ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে তারা যে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করছেন বা করার অনুমতি দিচ্ছেন তা সমাজের ও দেশের কী মারাত্মক ক্ষতি সাধন করছে। লাখ লাখ দর্শককে এই সমস্ত বিকৃত জীবনদর্শনের প্রতিফলন সম্বলিত চলচ্চিত্রসমূহ দেখতে বাধ্য করে তাদের কোথায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, এ প্রশ্নের জবাব কি সরকার দিতে পারবেন? বৈদেশিক মুদ্রার জন্য যেখানে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে এই সরকারকে করুণভাবে ছুটাছুটি করতে হচ্ছে, তখন এই বিপুল অপচয়ের কী অর্থ হতে পারে?
এ কথা অবশ্য কেউ বলছেন না যে, বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচানোর জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়া হোক। সোভিয়েত বিপ্লবের প্রথম দশকের ভয়ঙ্কর দুঃসময়ের ভিতরও কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ব্যাটলশিপ পটেমকিন, অক্টোবর, মাদার ও য়েন্ড অব সেন্ট পিটার্সবুর্গ-এর মতো ছবি নির্মিত হয়েছিলো, যা বিশ্বচলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। আমাদের দেশেও ছবি বানাতে হবে, তবে ৫০টি খারাপ ছবির ভিতর পাঁচটি অন্তত ভালো ছবি হওয়া চাই। এখন যেভাবে ছবি বানানো হচ্ছে তাতে আগামী ১০-২০ বছরে যদি একখানি ভালো ছবিও নির্মিত হয়, তাহলে সেটাকে দুর্ঘটনা বলতে হবে। এই অবস্থায় ভালো ছবি নির্মিত হতে পারে না।
স্বাধীনতার পর এই তিন বছরে সরকার বিদেশে চলচ্চিত্র প্রশিক্ষণের জন্য দুটো ভারতীয় বৃত্তি গ্রহণ করেছেন। এ সংখ্যাটি অত্যন্ত হাস্যকর হলেও এই একটি বিষয়ে সরকার চলচ্চিত্রের প্রতি কিছুটা আগ্রহ দেখিয়েছেন। পোল্যান্ডসহ একাধিক বন্ধু দেশ চলচ্চিত্রের জন্য বৃত্তি দিতে আগ্রহী হলেও বাংলাদেশ সরকার রহস্যজনক কারণে সেসব বৃত্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। লাখ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা শুধু রদ্দিমার্কা ছবি বানানোর জন্য খরচ না করে যেখানে সরকারের নিজেদের উদ্যোগেই বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য চলচ্চিত্রকর্মীদের পাঠানো উচিত ছিলো, সেখানে অযাচিতভাবে পাওয়া এইসব বৃত্তি প্রত্যাখ্যান করার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ থাকতে পারে না। বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতি শেখার জন্য সরকার যেখানে প্রতিবছর এক গাদা ছাত্র-ছাত্রীকে বিদেশে পাঠাতে পারেন, সেখানে চলচ্চিত্রের জন্য তিন বছরে দুটো বৃত্তি কী ভয়ঙ্কর রসিকতা! তবু ভালো, আজকাল শোনা যাচ্ছে আরো নাকি দু-একটা বৃত্তি দেওয়া হতে পারে। তবে শুধু বাইরে পাঠালেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। বাইরে থেকে এসে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই ছাত্ররা যদি অনুকূল পরিবেশের অভাবে অবুঝ মন বানাতে শুরু করেন, তাহলে সমস্ত আয়োজন মাটি হয়ে যাবে। আর এদের দিয়ে সরকারি প্রামাণ্যচিত্র ‘ইরি ধানের চাষ’ বা ‘সবুজ বিপ্লব’ মার্কা ছবি বানালেও শ্রমের ও মেধার দুঃখজনক অপচয় হবে। ফিল্ম ফিনান্স বোর্ড গঠন করার দাবি নতুন কিছু নয়। সরকারকে অবিলম্বে ফিল্ম ফিনান্স বোর্ড গঠন করে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ চিত্রনির্মাতাদের সুযোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এইসব প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের জন্য যথেষ্ট জায়গা বানাতে হবে। বিদেশে আমাদের ছবি শিরোপা অথবা বাজার পাওয়ার উপযুক্ত হয়নি, কথাটা এখন যেমন সত্যি, তেমনই সরকারকে সক্রিয়ভাবে উদ্যোগী হয়ে এর সম্ভাবনাকে সত্য বলে প্রমাণ করতে হবে। প্রতিবেশী ভারতেও ফিল্ম ফিনান্স করপোরেশন রয়েছে, যেখান থেকে মৃণাল সেনের মতো বামপন্থি চিত্রনির্মাতাকেও চিত্রনির্মাণে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার সত্যজিৎ রায়ের ছবি যৌথভাবে প্রযোজনা করছেন। কারণ বিদেশে ভারতীয় ছবির বিরাট বাজার ও সম্মান রয়েছে।
বাজারের ক্ষেত্রে অবশ্য বাংলাদেশকে ভারতীয় ছবির সঙ্গে প্রত্যক্ষ প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। তবে ভারতের ৫০টি ছবি যদি বাজার পায়, আমাদের পাঁচটা ছবির জন্য সেই চেষ্টা করতে হবে। বিদেশে বাজার-লাভের বিষয়ে নিবন্ধকারের সঙ্গে একাধিক বিদেশি সংস্থার আলাপ হয়েছে। তাদের বক্তব্য, ইউরোপের কল্যাণে ছবির কারিগরি মান সম্পর্কে তাদের চূড়ান্ত ধারণা হয়ে গেছে, তারা এদেশীয় ছবিতে কারিগরি দক্ষতা আশা করেন না। তারা চান বক্তব্য। সুন্দর জীবননিষ্ঠ বক্তব্য, যাতে এদেশের জীবনযাত্রার বাস্তব প্রতিফলন থাকবে। বক্তব্য যদি সর্বজনীন হয়, তাহলে সে ছবি বিদেশে যথাযোগ্য মর্যাদা পাবেই।
প্রতিবছর সরকার ছায়াছবির কল্যাণে যে পরিমাণ প্রমোদকর পাচ্ছেন, তার ১০ ভাগের একভাগও যদি আন্তরিকভাবে চলচ্চিত্রশিল্পের কল্যাণে নিয়োগ করেন, তাহলে দেশীয় চলচ্চিত্রের মানোন্নয়নের সঙ্গে বিদেশে মর্যাদা লাভের পথও সুগম হবে।
দায়স্বীকার : এই প্রবন্ধটি ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ২১ জুন, নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র তৃতীয় বর্ষ, সংখ্যা ৬ এ প্রকাশ হয়। প্রবন্ধটি ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এ পুনর্মুদ্রণের ক্ষেত্রে নিজস্ব বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
লেখক : শাহরিয়ার কবির, খ্যাতনামা লেখক, সাংবাদিক ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্রনির্মাতা। তিনি ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তী সময়ে পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। শাহরিয়ার বর্তমানে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন