Magic Lanthon

               

মাহামুদ সেতু

প্রকাশিত ২৫ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দেবী : চলচ্চিত্রিক বিভ্রম তৈরির ব্যর্থ চেষ্টা

মাহামুদ সেতু


বিভ্রমের নাম চলচ্চিত্র

ঢাকা শহরের কথাই বলি। যানজটের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে স্থবির এই শহরে জীবনযাত্রা কিন্তু অনেক গতিশীল। তারপরও এই ব্যস্ত শহরের মানুষেরা চলচ্চিত্র দেখে; বিনোদনহীন শহরে হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে চায়। কিন্তু মানুষ আসলে চলচ্চিত্র দেখে কেনো? এই প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন হতে পারে। উত্তর যাই হোক, বাস্তবতা হলো, আমরা আসলে বিভ্রান্ত হতে চাই বলেই রুপালি পর্দায় চোখ রাখি। এই পর্দা প্রেক্ষাগৃহের বিশাল স্ক্রিন থেকে শুরু করে মুঠোফোনের ক্ষুদ্র স্ক্রিন--যেকোনোটাই হতে পারে।

   নির্মাতা তার দক্ষতা দিয়ে নিজের গল্পটিকে দর্শকের সামনে মূর্ত করে তোলে। অন্যদিকে দর্শক জানে, তারা পর্দায় যা দেখে তা মিথ্যা! তারপরও নির্মাতার মুন্সিয়ানায় তারা নিজেদেরকে সেই মিথ্যার ভিতর হারিয়ে ফেলে; সেটাকে ‘সত্য’ বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। তাইতো চলচ্চিত্রে প্রিয় নায়ক-নায়িকার মৃত্যুতে চোখে জল আসে! ভৌতিক চলচ্চিত্র দেখতে গিয়ে দৃশ্যের পরতে পরতে দর্শক ভয়ে চমকে ওঠে! অর্থাৎ তারা বিভ্রান্ত হয়। অবশ্য চলচ্চিত্র যে সবসময় দর্শককে বিভ্রান্তই করে তা কিন্তু নয়। বরং অনেক সময় উল্টোটাও হয়--দর্শককে এমন সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় নির্মাতা, যা তারা কল্পনাও করেনি। দর্শকের মনোজগতে তা আলোড়ন তোলে; চিন্তাশক্তিকে নতুন দিশা দেয়।

এই উভয় ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা নির্মাতার। কারণ চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ার নিউক্লিয়াস তো তিনিই। সেজন্য তিনি দর্শককে বিভ্রান্ত করবেন নাকি ভিন্ন সত্যের সামনে দাঁড় করাবেন, সেটা তার যোগ্যতা, দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। এখন দেখার বিষয় ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র দেবী : মিসির আলি প্রথমবার-এ নির্মাতা দর্শককে বিভ্রান্ত করেছেন নাকি নতুন কোনো ‘সত্য’ উন্মোচন করেছেন। বলে রাখা ভালো, এই চলচ্চিত্রটি প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘দেবী’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত।

প্রোলগ থেকে শুরু

দেবী শুরু হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্ধৃত করে। ÔThe small wisdom is like water in a glass-clear, transparent, pure. The great wisdom is like the water in the sea-dark, mysterious, impenetrable.Õ অর্থাৎ ক্ষুদ্র জ্ঞান গ্লাসের পানির মতো পরিষ্কার, স্বচ্ছ ও বিশুদ্ধ। তবে জ্ঞানের বিশাল অংশ সমুদ্রের পানির মতো অস্পষ্ট, রহস্যময় ও অভেদ্য। এটা ঠিক যে, বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের খুব ক্ষুদ্র অংশই আজ পর্যন্ত মানুষ আবিষ্কার করতে পেরেছে। এখনো প্রকৃতির অনেক রহস্যই আমাদের কাছে ব্যাখ্যাতীত। মানুষ তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি স্বীকার করলেও, যা এখনো বিজ্ঞান সত্য বলে স্বীকার করেনি, তা বিশ্বাস করার যুক্তিযুক্ত কোনো কারণ নেই; অন্তত যেটার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালিয়েও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু দেবীতে এই সরল যুক্তিকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।

   হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্র মিসির আলি মূলত তার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের জন্যই বিখ্যাত। আপাতদৃষ্টিতে বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত ঘটনার পিছনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরাই তার কাজ। তিনি প্রচণ্ড যুক্তিবাদী একজন মানুষ। প্রকৃতিতে যুক্তির বাইরে কিছু আছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। ‘দেবী’তেও তিনি রানুর ‘অসুস্থতা’র পিছনে যুক্তি খুঁজেছেন। কিন্তু চলচ্চিত্রে এসে মিসির আলি বোধহয় তার স্বকীয়তা হারিয়েছেন। দেবীতে মিসির আলির সত্যান্বেষণের চেয়ে রানুর অস্বাভাবিকতা প্রকটভাবে চোখে পড়েছে। যেখানে অনেক সময়ই অমীমাংসিত রহস্যই উৎপাদন করেছেন নির্মাতা অনম বিশ্বাস।

   দেবীর প্রথম দৃশ্য। সময়কাল ১৭৫৭। এক জল্লাদ একটি মেয়েশিশুকে বলি দিতে উদ্যত হয়েছে। হঠাৎ জল্লাদের মুণ্ডুই ধর থেকে আলাদা হয়ে যায়। চলচ্চিত্রে কিন্তু এটা রূপকথার গল্প হিসেবে চিত্রায়ণ করা হয়নি। কারণ এখানে নির্মাতা ঘটনার সময়কাল উল্লেখ করে দিয়েছেন। তাছাড়া পুরো বিষয়টি পরিষ্কারভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ব্যাখ্যা করার কোনো অবকাশ রাখেননি অনম বিশ্বাস। অর্থাৎ পুরো ঘটনাটিকেই তিনি অতিপ্রাকৃত করে তুলেছেন।

   এর পরের দৃশ্যপট ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ঢাকা শহর। ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’ রানুকে কেন্দ্র করে দেবীর গল্প এগিয়ে যায়। রানু বিভিন্নভাবে ভয় পান। দুইটা মেয়েশিশুর ছায়া তাকে তাড়া করে বেড়ায়। অশরীরী নারী ও পুরুষ কণ্ঠ তাকে ডাকাডাকি করে। অবশ্য শুধু রানুই ভয় পান না শেষ পর্যন্ত। দেখা যায়, তার স্বামী আনিস ও কাজের লোকও ভয় পেতে শুরু করে। অর্থাৎ গল্পটা মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েনের জায়গা থেকে ভূতের গল্পের দিকে মোড় নেয়।

   চলচ্চিত্রের ১৯ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে ছাদের ওপর দুইটা মেয়েশিশুর ফ্ল্যাশ ইন হয়। এরপর থেকে ২১ মিনিট পর্যন্ত রানুর বাসায় ‘ভূতের’ তাণ্ডব চলে। দৃশ্যটিকে সহজেই রানুর বিভ্রম বলে চালিয়ে দেওয়া যেতো, যদি দৃশ্যের শুরুতেই মেয়েশিশু দুটিকে ফ্ল্যাশ ইনে আনা না হতো। তাছাড়া এখানে রানু স্বপ্ন দেখছিলেন, এমনটাও কিন্তু দেখাননি নির্মাতা। তার মানে হলো, চলচ্চিত্রটির প্রেক্ষাপটে অশরীরী শিশু দুটির অস্তিত্ব ‘সত্য’। আর শিশু দুটি সত্য হলে দর্শকমনে মিসির আলির যে ইমেজ তা মিথ্যা হয়ে যায়। কারণ চলচ্চিত্রটি আর সাইকোলজিকাল থ্রিলার থাকে না, বরং নির্মল ভৌতিক চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে। যেখানে পরতে পরতে ভয়ঙ্কর দৃশ্য থাকে, ব্যাখ্যা করার মতো কিছু থাকে না।

এরপর আবার দেবীর এক ঘণ্টা ২১ মিনিটের দিকেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। এবার রানুর বাসার কাজের ছেলে জিতু ওই মেয়েশিশু দুটিকে দেখে ভয় পায়। অর্থাৎ বোঝাই যায়, নির্মাতা ‘ভূতের’ অস্তিত্ব প্রমাণে উঠেপড়ে লেগেছেন। আর এটাকে প্রতিষ্ঠিত করতেই হয়তো রবীন্দ্রনাথের উদ্বৃতির প্রয়োজন পড়ে--জগতের অপ্রমাণিত বিষয়কে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা হিসেবে চালিয়ে দিতে।

দেবীর সবচেয়ে আপাত অবাস্তব দৃশ্য দেখা যায় শেষ অংশে। অপহরণকারী (ইরেশ যাকের) যখন নীলুকে খুন করতে যায়, তখন ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের সেই জল্লাদের মতো তিনিও ‘অপঘাতে’ মৃত্যুবরণ করেন। জল্লাদের মুণ্ডু বিচ্ছিন্ন হওয়ার দৃশ্যমান কোনো কারণ না দেখা গেলেও অপহরণকারীর মৃত্যুর কারণ স্পষ্টভাবেই দেখান নির্মাতা। আর দশটি ভৌতিক চলচ্চিত্রের মতোই এক ঝাঁক পেরেক কোনো ‘যাদুমন্ত্র বলে’ ছুটে গিয়ে অপহরণকারীর শরীরে বিদ্ধ হয়। যদিও ‘দেবী’তে অপহরণকারীর মৃত্যু হয়েছিলো কি না তা স্পষ্ট নয়। তবে তিনি অপার্থিব ভয় পেয়েছিলেন। আর ভয় পুরোপুরিই মানুষের মনস্তাত্ত্বিক একটি ব্যাপার। কে কখন, কীভাবে ভয় পাবে তা বলা মুশকিল। তবে সেই ভয়ের কারণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু দেবীতে অপহরণকারী শুধু ভয়ই পাননি, বরং দৃশ্যত পেরেকের আঘাতে তার মৃত্যু হয়। যে পেরেক আবার ‘স্বয়ংক্রিয়’! অর্থাৎ অশরীরী আত্মার শরীরী প্রকাশ ঘটে পেরেকের মধ্য দিয়ে। আর এর মধ্য দিয়ে দেবীও চূড়ান্তভাবে সাইকোলজিকাল থ্রিলার থেকে অবিসংবাদিতভাবে ভৌতিক চলচ্চিত্রে রূপ নেয়।

   এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেবী সাইকোলজিকাল থ্রিলার হোক বা ভৌতিক চলচ্চিত্র হোক, তাতে সমস্যা কোথায়? কোনো গল্প, উপন্যাস, কবিতা বা যেকোনো সাহিত্যকর্মের চলচ্চিত্রায়নের ক্ষেত্রে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে, নির্মাতাকে সেটা হুবহু পর্দায় তুলে আনতে হবে। এটা ধরেই নেওয়া যায়, নির্মাতা যে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করছেন তা একান্তই তার নিজের সৃষ্টি। এক্ষেত্রে তার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে নিজের মতো করে পুরোটা বিনির্মাণের। কিন্তু সেটা করতে গেলেও নির্মাতাকে সচেতন থাকতে হয়, তিনি আসলে কী করছেন। দেবীতে অনম বিশ্বাসের এই সচেতনতার অভাব প্রকট। কারণ তিনি একদিকে ‘দেবী’র সঙ্গে তাল মিলিয়ে রানুর ভয়ের রহস্য ভেদ করাচ্ছেন মিসির আলিকে দিয়ে; অন্যদিকে পর্দায় ব্যাখ্যাতীত দৃশ্যের অবতারণা করে দেবীকে ভৌতিক চলচ্চিত্রের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আর এটা করতে গিয়ে নিজের স্বপক্ষে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথকেও!

   আসল কথা হচ্ছে, হয় অনম বিশ্বাস বোঝেননি তিনি কী করছেন, নয়তো জেনে বুঝেই দর্শকের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন--‘মিসির আলি প্রথমবার’ ট্যাগলাইন ব্যবহার করে। কারণ, মিসির আলি ভৌতিক গল্পের চরিত্র নন, তিনি যুক্তিবাদী ও সত্যান্বেষী একটি চরিত্র। তবে তিনি যে সবসময় রহস্যভেদ করতে সফল হয়েছেন তা নয়, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তার দক্ষতায় সেই রহস্যটাকে রহস্যই রেখেছেন। অথচ অনম বিশ্বাস সেই রহস্যকে ভৌতিক রূপ দিয়ে মিসির আলিকে ব্যর্থতার ঘোল খাইয়েছেন, সেই সঙ্গে দর্শককেও সাইকোলজিকাল থ্রিলার দেখানোর নাম দিয়ে জগাখিচুড়ি উপহার দিয়েছেন।

বিভ্রম জাগায় নাকি বিরক্ত করে?

স্কুলে থাকতে পড়েছিলাম, নাটকের উপাদান তিনটি--স্থান, কাল ও পাত্র। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও একই কথা যথাযথভাবেই প্রযোজ্য। এখানেও কোনো একজন বা একদল মানুষের জীবনের কোনো এক সময়ের গল্প বলা হয়। দেবীতেও গল্প বলা হয়--রানু আর নীলুর গল্প। আনিস, মিসির আলি ও অন্যান্যরা সেই গল্পে সহযোগী চরিত্র। চলচ্চিত্রের শুরুতেই নির্মাতা বলে দিয়েছেন, এটা ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ঢাকা শহরের গল্প। ফলে পরিষ্কারভাবে চলচ্চিত্রের উপাদান--স্থান, কাল ও পাত্র এখানে বর্ণিত। সমস্যা হলো, নির্মাতা যখন স্থান ও কাল বলে দেন, তখন সেই গল্পটাকেও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজাতে হয়। খুব সাধারণভাবেই বলি, কিছুদিন আগে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত তৌকীর আহমেদের ফাগুন হাওয়ায় চলচ্চিত্রের একটি স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে একটি চরিত্রের পকেটে মুঠোফোন সদৃশ বস্তু দেখা যায়। তা আসলেও মুঠোফোন কি না অর্থাৎ চিত্রগ্রহণের সময় ভুলক্রমে সেই ব্যক্তির পকেটে মুঠোফোনটি রয়ে গিয়েছিলো কি না তা জানা যায়নি। কিন্তু ঠিকই এটা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। কারণ ১৯৫০-এর দশকে মুঠোফোনের অস্তিত্বই ছিলো না।

   নির্মাতা যে সময়ের গল্প বলছেন, পর্দায় বাস্তবের সেই সময়ের সঙ্গে মিল না পেলে তা নির্মাতার অদক্ষতা হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। আসলে চলচ্চিত্র কিন্তু শুধুই নির্মাতার কল্পনাকে পর্দায় তুলে ধরে না। বরং সেটা কোনো এক সময়ের ডকুমেন্টেশনও করে। এজন্যই ৫০-১০০ বছর আগের চলচ্চিত্র দেখে আমরা সহজেই সেই সময়ের বাস্তবতাকে অনুভব করতে পারি। কিন্তু দেবী এই জায়গায় কতোখানি উতরে যেতে পেরেছে তা ভেবে দেখার বিষয়।

   রানুদের বাড়িওয়ালার বড়ো মেয়ে নীলু বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। তিনি সবসময় নিজেকে নিজের ভিতর গুটিয়ে থাকেন। ইন্ট্রোভার্ট অনেকে হয়, এটা অস্বাভাবিক নয়। তবে নিজের ছোটোবোনের সামনেও কেউ নিজেকে গুটিয়ে রাখবে, তা নিশ্চয় স্বাভাবিক নয়? চলচ্চিত্রজুড়েই নীলু সবসময় লুকিয়েই ফেইসবুক ব্যবহার করেছেন। এমনকি ছোটোবোনও যেনো দেখতে না পায়, এভাবে চুরি করে চ্যাটিং করতে দেখা যায় তাকে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি কি ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ঢাকার এমন চিত্রায়ণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? মনে হয় না। বর্তমানে এমন কোনো নারী পাওয়া যাবে, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে অথচ লুকিয়ে ফেইসবুক ব্যবহার করে! অবশ্য নীলুর পরিবার যদি রক্ষণশীল হতো তবুও বিষয়টি মেনে নেওয়া যেতো। তার পরিবার নিয়েও সে ধরনের কোনো পরিপ্রেক্ষিত চলচ্চিত্রে দেখা যায় না। নীলুর ছোটোবোনকে ঠিকই টি-শার্ট, শর্টস পরে ঘুরতে দেখা যায় দেবীতে। তাহলে নীলু কেনো গুটিয়ে থাকে?

   এর উত্তর হয়তো ‘দেবী’তে পাওয়া সম্ভব। হুমায়ূন আহমেদের বর্ণনায়, নীলু ‘সুন্দর’ নয়। তার গায়ের রঙ ময়লা। ছোটোবোনের মতো সুন্দরী না হওয়ায় তার ভিতরে দুঃখবোধ রয়েছে। দেবীতেও রানু যখন নীলুকে তার বিশেষ বন্ধু আছে কি না জিজ্ঞেস করে, তখন তিনি উত্তর দেন, ‘না, তেমন কেউ নেই। আমি তো সুন্দর না।’ অর্থাৎ ছোটো করে হলেও নির্মাতা এখানে শারীরিক ‘সৌন্দর্য’ না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছেন হুমায়ূন আহমেদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। বোঝা যায়, ‘সুন্দর’ না হওয়াতেই নীলুর মধ্যে হীনমন্যতা কাজ করে।

   দেবীতে নীলুর এই উপস্থাপন দুইভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নীলুর অন্তত এটুকু বোঝার মতো ক্ষমতা থাকা উচিত যে, শারীরিক সৌন্দর্যই একজন নারীর একমাত্র যোগ্যতা নয় সমাজে মাথা উঁচু করে চলার জন্য। তাও আবার তিনি কিনা মনোবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী এবং স্বয়ং মিসির আলি তার শিক্ষক! তার জানা স্বাভাবিক, নারী কোনো ভোগ্যপণ্য নয় যে, দর্শনধারী না হলে বাজারমূল্য কমে যাবে! কিন্তু নীলুর হীনমন্যতা তাকে মানুষ নয়, বরং নারী হিসেবেই উপস্থাপন করে। এক্ষেত্রে নির্মাতা হয়তো হুমায়ূন আহমেদের ঘাড়ে দায় চাপাতে পারেন। এমন হলে নির্মাতা হিসেবে অনম বিশ্বাসের স্বাতন্ত্র্য রইলো না। তাছাড়া তিনি কিন্তু ‘দেবী’র নীলুকেও ঠিকঠাক উপস্থাপন করতে পারেননি। দেবীর নীলুর গায়ের রঙ ময়লা না, অন্তত নীলু চরিত্রে অভিনয় করা শবনম ফারিয়া প্রচলিত ধারণা অনুসারে ‘অসুন্দর’ও নন। অথচ তার মুখ দিয়ে যখন বলানো হয়, আমি সুন্দর না, সেটা আর যাই হোক দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। পুরো বিষয়টিই খেলো হয়ে যায়। অনম বিশ্বাস না হুমায়ূনের নীলুকে দেখাতে পেরেছেন, না পেরেছেন নীলুকে নিজের মতো করে তুলে ধরতে!

   শুধু নীলুর উপস্থাপনই নয়। বরং বর্তমান সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে মিসির আলির বাসার পরিবেশ মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। আপাত নিঃসঙ্গ, ছন্নছাড়া বা খামখেয়ালি হলেই যে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক চিলেকোঠায় জোড়াতালি দেওয়া টিনের ঘরে থাকবেন, তা মোটেও গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। আবার মিসির আলি যেভাবে গলায় মুঠোফোন ঝুলিয়ে রাখেন, সেটাও তার চরিত্রের সঙ্গে যায় না। তাছাড়া তিনি শুরুতে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের গল্প বলা হচ্ছে জানালেও নিজেই হয়তো ভুলে গেছেন, এই সময়ে ‘নোকিয়া ১১০০’ মডেলের ওই মুঠোফোন আর সচল অবস্থায় পাওয়া যায় না। খুব ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে, মিসির আলির মোবাইল ফোনসেটটিও সচল না! সেজন্যই হয়তো রানুর গ্রামের বাড়ি গিয়ে তিনি দোকান থেকে রানুকে ফোন করেন। অবশ্য বর্তমানে গ্রামেও ফোনে কথা বলার মতো দোকান আছে বলে মনে হয় না। তাছাড়া ওই মডেলের দুই-একটা মুঠোফোন যদি সচল পাওয়া যায়ও, সেটা একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক গলায় ঝুলিয়ে রাখবেন, কেমন অবিশ্বাস্য লাগে। আসলে নির্মাতা হয়তো নিজেও বোঝেননি মিসির আলির উপস্থাপন কেমন হতে পারে! পুরো গল্পটার উপস্থাপন নিয়েই হয়তো তার আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিলো।

   রানুর গ্রামে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে মন্দিরের মূর্তি চুরির অভিযোগে মার খাওয়া চোরের সঙ্গে মিসির আলির কথোপকথনের দৃশ্যটার গুরুত্ব ও মাজেজা ঠিক বুঝে আসে না। সেখানে চোর মিসির আলিকে আহ্বান জানান তাকে পেটানোর জন্য। এই দৃশ্যে নির্মাতা আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা হয়তো তিনি নিজেও পরিষ্কার নন। তাছাড়া কোনো চোর কাউকে এভাবে পেটানোর আহ্বান জানায়, এটাও বিশ্বাস করা কষ্টের। আবার রানুর বর্ণনায়, ১০-১১ বছর বয়সে তিনি প্রথম ভয় পান। অর্থাৎ নদীতে গোসলের সময় একটি মৃতদেহ তার পা টেনে ধরে। যদিও দেবীতে রানুর বর্তমান বয়স কতো তা বলেননি নির্মাতা, তবে ধরে নেওয়া যায় ৩০-এর বেশি হবে না সেটা। এই হিসাবে ঘটনাটি ২০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ঘটেছে। কিন্তু রানুর চাচার বক্তব্য অনুসারে, সেসময় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিলো না। থানায় খবর দেওয়ার দুই দিন পর পুলিশ এসে লাশটি পুঁতে ফেলে। কোনো ময়নাতদন্তও হয়নি। এখন পাঠক, আপনিই বলুন, ২০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মধুপুর এমন কোন দুর্গম এলাকা ছিলো, যেখানে যেতে দুই দিন সময় লাগতো!

   চলচ্চিত্রের ১০ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে রানুকে বাজারের ব্যাগ হাতে দেখা যায়। এরপর ১২ মিনিটের মাথায় দেখা যায়, তিনি বাজারে ঘুরে মাছ-সবজি কিনছেন। কিন্তু ঝামেলা পাকে ১৮ মিনিটের দিকে গিয়ে। সেসময় দেখানো হয়, রানু বাজারের ব্যাগ হাতে পথ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এই তিন দৃশ্যেই হুবহু একই কস্টিউম ও প্রপ্স দেখা যায়। যদিও অন্য দৃশ্যগুলো থেকে বোঝা যায়, ১২ মিনিট থেকে ১৮ মিনিটের মধ্যে একাধিক দিন পার হয়ে গেছে। অর্থাৎ রানুর বাজারের দৃশ্যগুলো যে ভিন্ন ভিন্ন দিনের তা পরিষ্কারভাবে বোঝানোর জন্য কস্টিউম পাল্টে দিলেও সেটা গ্রহণযোগ্য হতো। অথচ নির্মাতা তা হয়তো বেমালুম ভুলে গেছেন বা খেয়ালই করেননি। তাছাড়া রানুর মানসিক সমস্যা থাকলেও তিনি যে পথ ভুলে বিভ্রান্ত হবেন, এমনটা বিশ্বাযোগ্য না। কারণ তিনি ভবিষ্যৎ বলতে পারেন, বর্তমান ভুলে যান না! চলচ্চিত্রজুড়ে এসব ‘ভুল-ভ্রান্তি’ নির্মাতার দক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আর দর্শককে করে বিরক্ত!

অভিনয়, সত্যি নয়

মঞ্চনাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয়শিল্পীদের কাজ হচ্ছে গল্পের চরিত্রকে দর্শকের সামনে মূর্ত করে তোলা। যিনি এই কাজটা যতো অকৃত্রিমভাবে করতে পারেন, তিনি ততো বড়ো শিল্পী। অভিনয়শিল্পী ওই চরিত্রটার ভিতর যতোখানি ঢুকে যান, তিনি ততোটাই সফল হিসেবে গণ্য হন। অর্থাৎ চলচ্চিত্রের পর্দায় দর্শক যাতে ওই অভিনয়শিল্পীকে নয়, বরং সেই চরিত্রকে দেখতে পায়, তা নিশ্চিত করাই শিল্পীর কাজ। কিন্তু কখনো কখনো চরিত্রের চেয়ে শিল্পী নিজে বেশি প্রাধান্য বিস্তার করেন পর্দায়। আর তখনই গোল বাঁধে!

   একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের আচরণ কেমন হবে তা বলা মুশকিল। কেউ হয়তো হাসে, কেউ কাঁদে, কেউবা ভয় পায়! আবার ক্ষেত্র বিশেষে এই সবগুলোই থাকতে পারে তার আচরণে। রানুও একেক সময় একেক আচরণ করেন। কখনো তিনি ভয় পান, কখনো অশরীরীদের সঙ্গে হেসে গল্প করেন, কখনো কাঁদেন। তার আসল রোগ কী, সেটা হয়তো মনোচিকিৎসকরা বলতে পারবে। যদিও মিসির আলি তার রোগের পুরোটার তত্ত্ব তালাশ করতে পারেননি। আসলে কেউ যদি ‘আরব্য রজনীর গল্পের’ মতো কারো ভবিষ্যৎ বলার অলৌকিক শক্তির অধিকারী হয়, সেটার পিছনে তত্ত্ব দাঁড় করানো কঠিনই নয়, বরং অসম্ভব বলা চলে। আর মিসির আলিও যেহেতু সব অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন না, তাই তিনিও ব্যর্থ হয়েছেন রানুর রোগ নির্ণয়ে।

   রানু চরিত্র রূপদানকারী জয়া আহসান অত্যন্ত সুঅভিনয়শিল্পী। বর্তমান সময়ের আলোচিত ও জনপ্রিয় একজন তারকাও বটে। ফলে চলচ্চিত্র দেখতে গিয়ে দর্শক রানুকে দেখে নাকি জয়ার অভিনয় দেখে সেটাও বিবেচনার দাবি রাখে। আসলে কাহিনিচিত্রের ক্ষেত্রে পর্দায় যা দেখানো হয়, সবই ‘নির্মিত সত্য’। আর এই সত্যকে, কে কতো বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে, তার ওপর সেই অভিনয়শিল্পীর গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে। কিন্তু দর্শক হিসেবে দেবী দেখতে গিয়ে বার বার এই বিশ্বাস নড়ে গেছে। মনে হয়েছে, রানু চরিত্রটি কি আসলেও এই রকম?

   মিসির আলির সঙ্গে রানুর প্রথম সাক্ষাতের কথাই ধরা যাক। সেখানে রানু না দেখেই তাসে থাকা ছবির বর্ণনা দেন। এই দৃশ্যে তাকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে। শুধু আত্মবিশ্বাসীই নয়, তার অভিব্যক্তি দেখে মনে হয়, মিসির আলিকে তিনি চ্যালেঞ্জ করছেন। কিন্তু পরক্ষণেই যখন মিসির আলি তাকে তার ভয় পাওয়ার গল্প বলতে বলেন, তখন পুরোই বিপরীত দৃশ্য দেখা যায়। এখানে রানুর সেই আত্মবিশ্বাস, সূক্ষ্ম চ্যালেঞ্জের আহ্বান কর্পূরের মতো উবে যায়! তাকে আতঙ্কিত মনে হয়। ঢক ঢক করে পানি পান তার আত্মবিশ্বাসের অভাবকে তীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলে। অবশ্য কেউ ভয় পেলে বা ভয়ঙ্কর কোনো স্মৃতি মনে পড়লে যে এভাবে পানি পান করে, সেটাও মেকি মনে হয়েছে! যাহোক, একজন মানসিক অসুস্থ ব্যক্তির অল্প সময়ের ব্যবধানে পুরোই বিপরীত দুই রূপ দর্শকমনে খচখচানি জন্ম দেয়--রানুর চরিত্রটা কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে।

আসলে দেবীতে রানুর চরিত্রে জয়া এতো ‘সুন্দর’ অভিনয় করেছেন, অনেক সময়ই তা অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে; প্রশ্ন জেগেছে, সত্যিই কি এমন করে কোনো ‘অসুস্থ’ মানুষ! চলচ্চিত্রের ২০ মিনিটে যে রানু অশরীরীদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে ভয় পান, তিনিই আবার ৪০ মিনিটে তাদের সঙ্গে মাঝরাতে ছাদে বসে হেসে গল্প করেন! যদিও ২০ মিনিটের সেই ভয়ের দৃশ্য দেখে ভয়ের চেয়ে বিরক্তিই জেগেছে বেশি; মোটেও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি ‘ভূতদের’ হট্টগোল। সবমিলিয়ে নির্মাতা হয়তো গুলিয়ে ফেলেছেন, রানুকে ভয়ে রাখবেন নাকি ‘ভূতদের’ কাতারে নামাবেন, তা নিয়ে!

তবে কিছু দৃশ্যের উপস্থাপন চমকপ্রদ ছিলো। বিশেষ করে, রানুর ভয় পেয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে থাকার দৃশ্যটা। চলচ্চিত্রের আবহের সঙ্গে এই দৃশ্যের ভালো খাপ খেয়েছে। অবশ্য দেবীজুড়েই জয়া আহসান ভালো অভিনয় করেছেন। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে,  নির্মাতা তাকে দেবী হিসেবেই উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, রানু হিসেবে নয়! আর সেজন্যই প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হয়ে দর্শকের চেতনায় জয়া ঘুরে বেড়িয়েছে, রানু নয়। এতে করে জয়া অভিনয়শিল্পী হিসেবে বাহবা কুড়িয়েছেন; কিন্তু চরিত্র হিসেবে রানুর প্রতি হয়তো সুবিচার করতে পারেননি।

শেষ কথা

দেবী ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের শীর্ষ ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র।১ পুঁজিঘন শিল্পমাধ্যম হিসেবে এই ব্যবসায়িক সফলতা নিঃসন্দেহে জরুরি এবং প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু একজন নির্মাতা কি শুধু অর্থ আয়ের জন্যই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন? নাকি তার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নিজের স্বতন্ত্র সত্ত্বা নির্মাণ করাটাও উদ্দেশ্যের মধ্যে থাকে? অনম বিশ্বাস যদি শুধু প্রথম লক্ষ্যের পিছনে ছুটে থাকেন, তাহলে তিনি অবশ্যই সফল। যদি দ্বিতীয় লক্ষ্যটাও সুপ্তভাবে তার মনে থাকে, সেক্ষেত্রে তিনি তার স্বাতন্ত্র্য পর্দায় তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। মহাকালের খাতায় আর্থিক হিসাব টিকে থাকে না, সেখানে স্থান পায় কর্ম।

   দেবীতে নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের মৌলিকত্বকে ধরে রাখতে পারেননি, আবার তাকে ছাড়িয়েও যেতে পারেননি। যা পেরেছেন তা হলো, হুমায়ূন আহমেদকে বিক্রি করতে!

 

লেখক : মাহামুদ সেতু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের অ্যান্টি-টোব্যাকো প্রোগ্রামে মিডিয়া ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত।

[email protected]

https://www.facebook.com/mahamudsetu

 

তথ্যসূত্র

১. https://www.prothomalo.com/entertainment/article/1573960; retrieved on: 28.05.2019

বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ (১৭ সংখ্যা) ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন