অনুপম সেন অমি
প্রকাশিত ০৯ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সতীদাহ প্রথার পোস্ট মেমোরি এবং ঋতুপর্ণের সব চরিত্র কাল্পনিক
অনুপম সেন অমি

ঋতুপর্ণ ঘোষের সব চরিত্র কাল্পনিক নিয়ে লেখার ইচ্ছে অনেকদিনের। চলচ্চিত্রটি ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় এবং শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। আমি দেখেছি, ঋতুর চলচ্চিত্র খুব সচেতনভাবেই ইন্টারটেক্সচুয়াল। যেমন, অন্য কোনো গল্প, গান, কবিতা তার চলচ্চিত্রের মূল টেক্সটের কাঠামো তৈরি করে। আর এই ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি পেরিয়ে/এড়িয়ে তার চলচ্চিত্রের পাঠ তাই অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। সেই সঙ্গে চরিত্রায়ণের বিষয়ও নির্ভর করে আনুষঙ্গিক কী কী রেফারেন্স চলচ্চিত্রে আছে, তার ওপরে। ঋতুর অন্যান্য প্রধান চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও হয়তো এই ধারণাটা খাটে।
ন্যারেটিভ প্যাটার্নের কথা ভেবেই সব চরিত্র কাল্পনিক নিয়ে লেখার আগ্রহটা আসে। বিশেষ করে, যেভাবে পুরো ন্যারেটিভে কবিতার কথা, কবির কথা, ব্যক্তিগত গল্প ও কবিতার পিছনের গল্পকে ভেঙেচুরে একই ফ্রেমে দেখানো হলো (ভিন্ন সময়ে ও ভিন্ন স্থানে), তা গল্পের ফ্র্যাগমেন্টেড বয়ানকে প্রতিস্থাপন করে অন্য এক মাত্রায়। বিষয়টা হচ্ছে পুরো চলচ্চিত্রের বয়ান পাওয়া যায় তখনই, যখন সব ভাঙা ইমেজ এক করে দেখা হচ্ছে। এই উপায়েই সাধারণত ন্যারেটিভের তথাকথিত লিনিয়ারিটিকে ভাঙা হয়। তখন আমরা আর একের পর দুই দেখি না বা দেখি না কোনো সরলরৈখিক যাত্রা। এই ফ্র্যাগমেন্টেড মেমোরি ন্যারেটিভের সুবিধা হলো, আমরা যেকোনো জায়গা থেকেই এর ব্যাখ্যা প্রক্রিয়া শুরু করতে পারি। অথবা আলাদাভাবে (আমি বলতে চাচ্ছি, যেকোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই) দেখাও যেতে পারে কীভাবে তৈরি হচ্ছে চলচ্চিত্রের পুরো বয়ান। যেমন করে আমার এই লেখায় আমি সব চরিত্র কাল্পনিক-এর ওপর একটা নারীবাদী পাঠ দাঁড় করানোর চেষ্টা করবো। দেখতে চাইবো কী করে এই চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভের ভিতর দিয়ে নারীবাদী তত্ত্বীয় আলোচনা সম্ভব হতে পারে।
দুই.
মূলত গল্পে প্রধান দুই নারীচরিত্রের একজন হলেন রাই আর অন্যজন নন্দ’র মা; যার প্রাতিষ্ঠানিক নাম প্রিয়বালা দাস। প্রথম জন কবি ইন্দ্রনীলের স্ত্রী আর অন্যজন তাদের ঘরে ঝিয়ের কাজ করেন এবং কাজের বিনিময়ে তিনি থাকা-খাওয়া ছাড়াও টাকা পান। চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভে এই দুইজনের রিপ্রেজেন্টেশন দু’রকম। এর কারণ হতে পারে, তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণি, দূরত্ব/বিন্যাস। একজন যদি ট্রাডিশনালিটিকে রিপ্রেজেন্ট করে থাকে, তবে অন্যজন (রাইয়ের কথা বলা হচ্ছে) করে/করছে/করতে পারে মডার্নিটিকে। তাদের আপাত সামাজিক অবস্থান ভিন্ন হলেও বাস্তব জীবনে এই দুই নারীর পরিণতি যেনো সমান্তরাল। স্বামীবিহীন জীবন এই দুই শ্রেণিকে এক কাতারে নামিয়ে আনতে পারে। অন্তত চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভে আমরা তাই দেখি। কবি ইন্দ্রের মৃত্যুর পর, এই দুই নারীর ভিতর গড়ে ওঠা সখ্য বেশ নির্ভরশীল; এটা বোঝা যায়। ইন্দ্রনীলের স্মৃতি নিয়ে বাঁচার সিদ্ধান্ত এবং রাইয়ের প্রতি নন্দর মায়ের সহানুভূতি এই দুই ঘটনা আর যেকোনো কারণেই ঘটে থাকুক না কেনো; এরা পারস্পরিকভাবেই সহজাত পুরুষতান্ত্রিক ধারণা/দৃষ্টি অথবা স্বাভাবিক পুরুষতান্ত্রিক প্রত্যাশাকে তৃপ্ত করতে পারে।
রাইয়ের স্মৃতিকাতরতা এবং নন্দর মায়ের ইম্পেথিটিক অবস্থান তাদের দুজনকেই শ্রেণি বৈষম্যের বাইরে এনে শুধুই যে এক অবস্থানে নিয়ে আসে/আসতে পারে তা নয়, এর মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিক চিত্রায়ণও অনেক বেশি ‘ফেমিনিন’ হয়ে ওঠে। কেননা গয়া-কাশী যাওয়া যতোটা না ধর্মীয় প্রয়োজনীয়তা রাইয়ের কাছে, তার চেয়েও বেশি হয়তো কোনো বিশেষ সামাজিক দায়বদ্ধতা। এই দায়বদ্ধতার ওপর বর্তায়-প্রথমত, তিনি একজন স্ত্রী, যার স্বামী সম্প্রতি মারা গেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক ডিসকোর্সে বিধবা নারীদের সততা প্রমাণের একটা দায়বদ্ধতা তো থেকেই যায়। আবার সম্প্রতি মৃত স্বামীর প্রতি তার ভালোবাসা (যা ইন্দ্রনীলের মৃত্যুর পরেই অনেক বেশি প্রকাশিত) প্রকাশের একটা মাধ্যমও হতে পারে এই তীর্থযাত্রা। রাই স্বামীর জন্য যে চিরস্থায়ী শোক পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে/নিয়েছে, তা আমাদের হয়তো এই উপমহাদেশে ‘সতীদাহ’ প্রথার ট্রমাতাড়িত স্মৃতির কাছেই ফিরিয়ে নিতে চাইছে আবার। সতীদাহ প্রথা উঠে গেছে, কিন্তু ‘শোকের সংস্কৃতি’ উচ্চ/মধ্যবিত্ত শিক্ষিত নারীরা পালন করবে/করতে থাকবে, এই প্রত্যাশা সমাজের ডিসকোর্সে এখনো বিরাজ করে। এ নিয়ে The Ongoing Tragedy of Indian Widows নামে একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে,
Although widows today are not forced to die in ritual sati (burning themselves on their husband's funeral pyre), they are still generally expected to mourn until the end of their lives. According to 2,000-year-old sacred texts by Manu, the Hindu progenitor of mankind: ``A virtuous wife is one who after the death of her husband constantly remains chaste and reaches heaven though she has no son.''১
এই সাধারণ কালচারাল ডিসকোর্স থেকে রাই হয়তো বেরুতে পারে/চায় না। এখানে সামাজিক চাপ/প্রত্যাশা এতোটা স্পষ্টভাবে না থাকলেও রাইয়ের সিদ্ধান্ত পিতৃতান্ত্রিক সমাজের আনকনশাসে টিকে যাওয়া সতীদাহ প্রথার স্মৃতিকে পরোক্ষভাবে মূর্তমান করে তোলে। রাই প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে অথবা অ/সচেতনভাবে আমাদের কাছে সেই ধর্মীয় টেক্সটের ‘virtuous wife’র ভূমিকায় হাজির হন।
তিন.
বিধবাদের শোক পালনের যে আদি সংস্কৃতি তা থেকে হয়তো বর্তমান ভারতের উচ্চ/মধ্যবিত্ত নারীরা বেরিয়ে এসেছে; কিন্তু কোথাও এখনো একটা পুরুষতান্ত্রিক চাপ/প্রত্যাশা রয়ে যায়, যা নারীদের শারীরিক ও মানসিক শোক পালনের অভ্যস্ততায় আন/কনশাসলি বেঁধে ফেলতে চায়। বৈধব্যও এক প্রকারের সামাজিক মৃত্যু। তবে এখানে যদিও এজেন্সির প্রশ্ন চলে আসে। চলচ্চিত্রে রাইয়ের ওপর কারো চাপ বা কোনো সামাজিক চাপের বয়ান আমরা দেখি না। তারপরেও তার ‘শেখরের কাছে ফিরে না যাওয়া’ এবং ‘ইন্দ্রনীলের স্মৃতি বয়ে চলার’ যে জীবন আমরা শেষ পর্যন্ত দেখি, তা রাইয়ের পক্ষে এক ধরনের স্পিরিচুয়ালিটিকে আঁকড়ে ধরার মতো। এই স্পিরিচুয়ালিটি হতে পারে তার নিখাদ ভালোবাসা থেকে জাত। কিন্তু এটাও হয়তো সে প্রেক্ষাপটে সত্য যে, এই বিশেষ ভাবাদর্শময় জীবন তাকে সমাজে ‘ডিসেক্সুয়ালাইজড’ সত্তায়ও রূপান্তর করে/করেছে/করবে। সেক্ষেত্রে রাইয়ের সধবা জীবন ও বিধবা জীবনের যে রিপ্রেজেন্টেশন এই দুইয়ের ফারাক হতে পারে বিস্তর; এবং তার এই রূপান্তরিত বোধ/জীবন ব্যবস্থা যেনো কোনো অতীতের (যখন সতীদাহ প্রথা চালু ছিলো সমাজে) সতী নারীর ট্রমাতাড়িত স্মৃতিকেই প্রতিস্থাপন করে চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভে।
রূপান্তরের ভিতর দিয়ে হয়তো রাইও একজন আধুনিক সতী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে এখানে। তাই রাইয়ের প্রতি দর্শক হিসেবে যে সহানুভূতি, তা হতে পারে তার একাকী জীবন (সেক্সুয়ালিটি বিবর্জিত) যেভাবে সামাজিক প্রত্যাশা পূরণ করে তার একটা পরোক্ষ প্রতিদান। নন্দর মায়ের সঙ্গেও তার যে আপাত ইন্টিগ্রিটি/একাত্মতা পর্দায় দেখা যায়, সেইখানেও থাকতে পারে রাইয়ের ব্যক্তিমানসে ‘ফেমিনিওটি’ উৎপাদনের একটা অ/সচেতন প্রয়াস।
চার.
ইন্দ্রনীল বেঁচে থাকাকালীন রাইয়ের যে পারিবারিক সঙ্কট, তা তাকে শেখরের ওপর মানসিকভাবে (আমরা জানতে পারি না, তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক ছিলো কিনা) নির্ভরশীল করে তোলে; আর ঠিক তার উল্টোটাই ঘটে কবি স্বামীর মৃত্যুর পরে। তখন তার ব্যক্তিমানসে যে সামাজিক চাপ তৈরি হয়/হয়েছে বলে মনে হয় (যদিও এখন পরিবার বলতে যে সচরাচর ধারণা তা আর সেখানে উপস্থিত থাকে না), তাকে ডিঙিয়ে রাইয়ের পক্ষে শেখরের কাছে যাওয়াটা স্বামীর প্রতি ‘বিশ্বস্ত হতে না পারার কষ্ট’ অন্তর্মানসে উৎপাদন করে/করতে পারে। একইভাবে এই স্মৃতি ‘বয়ে বেড়ানোর’ যে নিত্য-নৈমিত্তিক আচার বাঙালি রোমান্টিক গল্প-উপন্যাস অথবা চলচ্চিত্রে অথবা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে আমরা দেখে থাকি, তার পুনরুৎপাদনও হয় ঋতুর চলচ্চিত্রে। গল্পের নায়িকারা আর সামনে যেতে পারছে না (‘মুভ অন’ অর্থে) যেনো। স্বামীর স্মৃতি নিয়ে রাইয়ের ‘আটকে পড়া’ আর ইন্দ্রনীলের লেখা কবিতায় যে নন্দর মায়ের গল্প, তার একা হয়ে যাওয়া, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া, তাদের আপাত শ্রেণি-দূরত্ব বিলীন করে একই পরিণতিতে পৌঁছিয়ে দেয়।
এই স্থবিরতা বিশেষত মন-দৈহিক; স্থানিক হয়তো নয়। তাই মনে হতে পারে, তাদের পারস্পরিক বন্ধুত্ব/সাহচর্য যতোটা না বন্ধুসুলভ তার চেয়ে বেশি (হয়তো এই প্রেক্ষাপটে) নারীসুলভ। শ্রেণির বাধা পেরিয়েও দুই নারীর বৈধব্য জীবন এক ছাদের নিচে সামিল হয়েছে। এখানে তাদের সামাজিক শ্রেণি এক, যার পরিণতিও অভিন্ন মনে হতে পারে। অর্থনৈতিক বৈষম্য রেখেও কেবল ‘নারী’ হিসেবে তাদের একে অন্যকে বোঝার একটা সুযোগ ন্যারেটিভে চলে আসে। সেক্ষেত্রে এটা সমাজের চিরাচরিত পুরুষতান্ত্রিক চলকেও নির্দেশ করতে পারে, যেটি শ্রেণি বিলুপ্তি ঘটিয়েও সর্বস্তরের নারীকে কেবল ‘নারী’ হিসেবেই, শুধু একটা ক্যাটাগরিতে দেখতে চায়/পারে। এই দেখার মধ্যে একটা বিপত্তি আছে। আর সেটি হলো, এই দেখার চল অ/সচেতনভাবেই একটা সামাজিক চাপ তৈরি করে একজন নারীর ওপর। আর সেকারণেই হয়তো গল্পে কিংবা বাস্তবেও নারীদের ‘মুভ অন’ করাটা একটা ইম্পসিবিলিটি। এই স্থবির ও স্থিতিশীল জীবনে বিধবা নারীদের দেখা হয়তো পুরুষতন্ত্রের (পড়ুন দর্শকের) দৃষ্টিকে খুশি করে, কিন্তু একই সঙ্গে এই রূপান্তর একজন নারীর সাবজেকটিভ অবস্থানকে সমাজে বিপন্নও করে/করতে পারে।
পাঁচ.
প্রসঙ্গক্রমে আরো একটা দিক নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। গল্পে নন্দর মায়ের আইডেন্টিটি সঙ্কটের বিষয়টা যতোটা প্রকাশ পেয়েছে তাকে নিয়ে লেখা কবিতায় অথবা কোনো বিশেষ ভাবনায়; রাইয়ের সঙ্কট, বিশেষত ব্যক্তিক, ঠিক ততোটাই থেকে গেছে অপ্রকাশিত। বরং কবিতায় রাই এসেছে রোমান্টিক অনুষঙ্গ হিসেবে, যেখানে তার ব্যক্তিত্বের সঙ্কটের জায়গাটা অনুচ্চারিত থেকে গেছে সবসময়। টেক্সচুয়াল রিপ্রেজেন্টেশনে তার ব্যক্তিত্বের ইমেজ মেটাফোরিকাল হয়ে উঠেছে যেনো। কবির মনোজগতে তৈরি করা/হওয়া ইমেজ তার বাস্তব ব্যক্তিত্বকে প্রতিস্থাপন করেছে শব্দে। কবিতায় ব্যক্তি রাইয়ের অনুপস্থিতি অনেকটা নন্দর মায়ের প্রকৃত নাম বিলুপ্তির মতোই। নন্দ নামের যে ছেলেটিকে আমরা কখনো কেউ দেখিনি/দেখবো না এবং যার শারীরিক উপস্থিতিও গল্পের প্রয়োজনে নিছক গৌণ অথবা অপ্রয়োজনীয় ছিলো, সেই নামটিই অধিকার করে নিয়েছে প্রিয়বালা দাসের অস্তিত্ব। যদিও তার প্রাতিষ্ঠানিক নামের অবলুপ্তি হতে পারে শ্রেণিগত কারণে; কিন্তু অন্যের কল্পনায় তার অস্তিত্বের যে প্রতিস্থাপন এবং সংকোচন, তা তার ‘নিজের গল্প’ বলার/শোনানোর প্রয়াসকেই তো অস্বীকার করে।
প্রিয়বালা দাসের যে অব্যক্ত গল্প তাও তো মেটাফোরিকালি হাজির হচ্ছে/হয় কবির কল্পনায় এবং শব্দে। কবি যেভাবে বাস্তবতা আর কল্পনা মিশিয়ে নন্দর মাকে আমাদের দেখিয়েছেন/শুনিয়েছেন তার কবিতায়, সেই নন্দর মা আমাদের বাস্তবের প্রিয়বালা দাসের ব্যক্তি অবস্থানকে একটা কাব্যিক/রূপক ব্যাখ্যায় নিয়ে গেছে; এবং সেখানে প্রকৃত প্রিয়বালা দাস বিরাজ করেন কিনা তা ভাববার বিষয়। আর যদি করেও থাকেন তাও হয়তো কবিতার অনুষঙ্গ হিসেবে এবং নন্দর মা হিসেবে, যার ব্যক্তিমানসের গল্প কবির কথায় শুনে উপলব্ধির অবকাশ পায় দর্শক। এক্ষেত্রে তার নিজের ন্যারেটিভ এবং নাম উভয়ের বিলুপ্তি একটা প্যারালাল লাইন তৈরি করে রাইয়ের ব্যক্তিক সঙ্কটগুলোর সঙ্গে, যা তার কবি স্বামীর চোখে অপ্রকাশিত/অধরাই রয়ে গেছিলো হয়তো। ব্যক্তি রাই কবিতায় কাজরি’র (কবিতার সেই নারীচরিত্র যার সঙ্গে রাই তার সাযুজ্য খুঁজে পান) সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠেছে যেভাবে, ঠিক একইভাবে কি প্রিয়বালা দাসের রূপান্তর ঘটেছে একজন নন্দর মা হিসেবে? সেই প্রেক্ষাপটে বলা চলে তাদের ‘ব্যক্তি’ পর্যায় থেকে উপমিত অবস্থানে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ার যে অভিজ্ঞতা তার পুরোটাই ছিলো কিন্তু কবি ইন্দ্রনীলের নিয়ন্ত্রণে। অন্য সবার এজেন্সি এখানে থাকার কথা নয়।
ছয়.
আলোচনাটা আরো ইন্টারেস্টিং হয়, রাই যখন নীলকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তখন। এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হলে তার ব্যক্তিসত্তার মুক্তি ঘটতে পারতো নীলের বিমূর্ত কবিতার ভিতর তার যে অবজেকটিভ রিপ্রেজেন্টেশন সেখান থেকে। কিন্তু ব্যক্তি নীলের মৃত্যু একই সঙ্গে রাইয়ের ব্যক্তিসত্তারও বিকাশ হতে দেয় না। রাই বরং নীলের কবিতাকে কোনো পরাবাস্তব উপায়ে নিজের সঙ্গে ইন্টিগ্রেট করে নেয়। ব্যক্তি নীল আর কবি নীলের ভিতর পার্থক্য তিনি আর করতে চান না। এই করতে না চাওয়াটার ভিতর একধরনের সাবজুগেটেড ঘেরাটোপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। শেখরের কাছে না যাওয়াটাও এক প্রকারের ব্যক্তি চিন্তার নতিস্বীকার হতে পারে। নীলের কবিতা, যা আর কখনো লেখা হবে না এমন এক ‘ন্যারেটিভ অব ডিসকন্টিনিউটি’তে রাই ঢুকে পড়েন। আপাতদৃষ্টিতে তার ‘একা থাকার সিদ্ধান্ত’ নীলের সৃষ্টিশীলতার কাছে আত্মসমর্পণ/ত্যাগ মনে হলেও, এই সিদ্ধান্ত একটা পুরুষতান্ত্রিক প্রত্যাশা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। যে পুরুষতান্ত্রিক স্বাভাবিকতার কাছে নন্দর মায়ের আত্মপরিচয় লোপ পায়, সেই একই চাপা কোনো প্রত্যাশাও ব্যক্তি রাইকে কবিতায় কেবল উপমা হিসেবেই মূর্তমান করে তুলতে পারে, যেখানে তার ব্যক্তিসত্তা লীন হয়ে যায় অন্যের সৃষ্টিতে।
‘ব্যক্তি রাই’ নীলের কবিতায় উপস্থাপিত হন না কোনো প্রত্যক্ষ উপমায়, বরং নীল তার কবিতার নায়িকা কাজরির সঙ্গে একাত্ম করে দেয় রাইয়ের অবস্থান। রাইয়ের সাবজেকটিভ অবস্থান নীলের কবিতায় অবজেক্ট হয়ে যায়। এমনকি রাইয়ের গল্পগুলোও নীলের কবিতা হয়ে যায়। রাইয়ের ডায়েরি থেকে নীল ইংরেজিতে লেখা কোনো অনুগল্প নিজের মতো করে কবিতায় ট্রান্সলেট করেন। এটি অবশ্য জানা যায় নীলের মৃত্যুর পরে। এর আগে রাইকে তিনি বলেননি কিছুই, ঠিক যেমন করে কবিতায় রাইয়ের ব্যক্তিসত্তা নিজের অজান্তেই কাজরি হিসেবে অনূদিত হয়েছে। তারপরেও রাই অ/সচেতনভাবেই তার এই সাবজেকটিভ অবস্থান ভুলে নীলের কবিতার উপমিত নারীর সঙ্গে নিজেকে আত্মস্থ করে নেন/নিতে চান।
কেউই তো জানতে পারে না, কাজরি কে ছিলো? কিন্তু আমরা তাদের একাত্ম হয়ে পড়ার অনুভূতি বুঝতে পারি। তাদের (রাই এবং ইন্দ্রনীল) নিজেদের মধ্যে বিশেষ ব্যক্তিগত আলাপ/গল্প কীভাবে অনুষঙ্গ হয়ে কবিতায় এসেছে, তার থেকে আমরাই এবং কাজরিকে পাশাপাশি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু রাই যে তার ব্যক্তিগত অনুভূতি আর গল্পগুলো নীলের কবিতায় রূপান্তরিত হওয়ার বিষয়টা মেনে নেয়, তার কারণ হতে পারে নিজের সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কোনো সংশয় অথবা ইন্দ্রনীলের মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে তার ব্যক্তি অবস্থান থেকে রূপক অবস্থানে অ/সচেতন বিচ্যুতি/স্থানান্তর।
লেখক : অনুপম সেন অমি, ইউনিভার্সিটি অব ইন্টার্ন ফিনল্যান্ডে ইংলিশ অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ নিয়ে পড়াশোনা করছেন।
তথ্যসূত্র
১. http://www.womensmediacenter.com/women-under-siege/the-ongoing-tragedy-of-indias-widows; retrieved on: 25.04.2018
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন