Magic Lanthon

               

প্রিয়াংকা দেবনাথ

প্রকাশিত ০৯ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ক্ষমতা ও আধিপত্যের পদতলে বিসর্জন

প্রিয়াংকা দেবনাথ


 

আমাদের কোন দোষ ছিলনা গো মজিবর চাচা।

আমরা যে এমনি-এমনি ভাগ হয়ে গেলাম,


                                            

হাল ছেড়ো না বন্ধু


কে দোষী আর কে নির্দোষ-তা মাপার কোনো যন্ত্র পৃথিবীতে নেই। তবে বর্তমানে তা মাপা হয় ক্ষমতা, আধিপত্য আর পুঁজিকে মাপকাঠি ধরে। যার ক্ষমতা, শক্তি আছে, তার কোনো দোষ নেই। সামন্ত সমাজে ক্ষমতাধররা প্রজাদের শাস্তি দিতো প্রকাশ্যে, জনসম্মুখে। আর সে শাস্তির ধরন ছিলো অনেক বেশি শারীরিক। ‘সামান্য অপরাধে হাত-পা কেটে ফেলা, শিরচ্ছেদ করার মতো নিষ্ঠুরতা ছিলো তখনকার শাস্তির ধরন। তারা যে দোষী-অপরাধী এটাই শুধু এর কারণ নয়; ক্ষমতাধররা চাইতো তাদের ক্ষমতাকে সাধারণেরা ভয় পাক। আধুনিক রাষ্ট্রে মধ্যযুগের সেই প্রকাশ্যে শাস্তি বা দণ্ড দেওয়ার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেলো। এ ধরনের শাস্তি অমানবিক, নিষ্ঠুর বলে সংস্কারের দাবি উঠলো; শারীরিক নির্যাতন নয় বরং দোষীকে নজরবন্দি করে তাকে সামাজিক অনুশাসনে শিক্ষিত করে তোলা হয়ে উঠলো শাস্তির লক্ষ্য। এখন আর কথায় কথায় ক্ষমতা দেখানোর জন্য মানুষের হাত-পা কেটে ফেলা হয় না, প্রকাশ্য চড়ানো হয় না শূলে। এখন ‘জন্তর-মন্তর ঘরে ঢুকিয়ে মগজ ধোলাই করা হয়। ফলে শাস্তির তীব্রতা কমলেও মাত্রা কমেনি একফোঁটাও। তাই একইভাবে পাল্টে যায়নি ক্ষমতা, পুঁজি, আধিপত্য আর শোষণের নীতি। আর এই চর্চায় এক গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপাদানের নাম চলচ্চিত্র।


মানচিত্রে দাগ টেনে একই মাটি ও মানুষকে ভাগ করা হয়েছিলো ৪৭-এ। কিন্তু মানুষের আবেগ-অনুভূতি, আশা-ভরসা, স্মৃতি-ভালোবাসা, সুখ-দুঃখ এগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট বেড়ির মধ্যে আটকানো বা ভাগ করা তো দুঃসাধ্য ব্যাপার। কারণ এই সম্পর্ক তো সীমানার মতো দেখা যায় না, তারকাঁটা কিংবা কোনো শক্ত ধাতু দিয়ে গড়াও নয়। অথচ জীবনের জন্য সম্পর্কের এই অনুভূতি কিন্তু একান্ত প্রয়োজন। এই অনুভূতিগুলো আছে বলেই হয়তো মানুষ এতো বছর পরেও এই ভাগ নিয়ে কষ্ট পায়, কষ্টে থাকে। সীমান্তরেখা, প্রতিবেশী রাষ্ট্র, স্মৃতি, ইতিহাস এসব কিছু তাই এই উপমহাদেশে নানা সময় চলচ্চিত্রের বিষয় হয়ে উঠেছে।


ঋত্বিক দিয়ে শুরু হওয়া সীমানারেখা, দেশভাগের আলোচনাকে একসময় অনেকে বাড়াবাড়ি মনে করেছিলো; তারপর গৌতম, বুদ্ধদেব, বাপ্পাদিত্য ও হালের সৃজিত নানা সময় এই আলোচনায় ঘি ঢেলেছেন। এই পথে নতুন সংযোজন কৌশিক গাঙ্গুলির বিসর্জন। বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে বিসর্জন ভারতের ৬৪তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে। এর গল্প সরাসরি সীমান্ত নিয়ে না হলেও প্রতিক্ষণে সীমানাকে ছুঁয়ে যায়। এই প্রবন্ধের বিষয় বিসর্জন-এর সেই সীমানা ছুঁয়ে যাওয়া ন্যারেটিভ, যা খুব বেশি গতানুগতিক নয়।


কী আছে বিসর্জন-এ


চোরাকারবারি ব্যবসায়ী ভারতীয় যুবক নাসের আলী। প্রতিমা বিসর্জনের রাতে বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন ইছামতি নদীতে এবং জ্ঞান হারান। পরের দিন বাংলাদেশের পদ্মা নামের এক হিন্দু বিধবা (জয়া) তাকে নদীর ধারে পড়ে থাকতে দেখেন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বি জি বি) ও গ্রামের সবার চোখ এড়িয়ে পদ্মা নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন নাসেরকে। পায়ে আঘাত পাওয়া নাসেরের সেবা চলতে থাকে পদ্মার বাড়িতে। এভাবে এক দেশের প্রান্তিক এক সংখ্যালঘু মানুষের জীবন বাঁচায় অন্য দেশের প্রান্তিক এক সংখ্যালঘু মানুষ। এরপর নাসেরের সঙ্গে চলতে থাকে পদ্মার সংসার-সংসার খেলা। যদিও সেই খেলাটা শেষ পর্যন্ত আর খেলা থাকে না। একটা সময় নতুন দিকে মোড় নেয় দুজনের সম্পর্ক।


পদ্মার বাড়িতে নাসেরের জায়গা হয়েছিলো তার ভাইয়ের পরিচয়ে। কারণ বিধবার ঘরে অচেনা-অজানা পুরুষের আশ্রয় মেনে নেয় না এই সমাজ। তবে সময়ের সঙ্গে নাসেরের প্রতি পদ্মার মায়া বাড়তে থাকে। নিজের অজান্তেই পদ্মা একটু একটু করে তার স্বামীর জায়গায় বসিয়ে ফেলেন নাসেরকে। স্বামীর পরা জামাগুলো তাকে পরতে দেন, সিগারেট এনে দেন। নাসের সিগারেট খান, পদ্মা সন্তর্পণে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন; আড়াল থেকে চোখ বুঁজে অনুভব করেন সেই ধোঁয়ার গন্ধ। সাদা ধোঁয়ার গন্ধে মিশে থাকে ভিতরে জমা ভালোবাসা আর কামনার রঙ। অন্যদিকে লক্ষ্মীর ছবির সামনে নাসেরের মুখ থেকে উড়ে আসা ধোঁয়াগুলোকে আরতির ধোঁয়ার মতো মনে হয়। পদ্মার কাছে হয়তো এই ধোঁয়া অনেক বেশি পবিত্র, আর ধোঁয়ার পিছনের মানুষটাও।


অন্যদিকে পদ্মার গ্রামের গণেশ মণ্ডল (কৌশিক) বড়ো ব্যবসায়ী, ক্ষমতাধর মানুষ। তিনি বিধবা পদ্মাকে যেকোনো মূল্যে বিয়ে করতে চান। পদ্মাকে নানাভাবে বিষয়টা বোঝাতেও চান তিনি। পদ্মা বোঝেন, কিন্তু কিছুই বলেন না। ঘটনাক্রমে নাসেরকে তার দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য গণেশের ক্ষমতার হাতে ধরা দিতে হয় পদ্মাকে। গণেশের ক্ষমতায় নাসেরকে তার দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়। এজন্য অবশ্য গণেশের সেই না বুঝতে চাওয়া কথাগুলো শেষ পর্যন্ত বুঝতে হয় পদ্মাকে।


ক্যামেরাটা যেনো ঠিক বাংলাদেশের দিকে তাক করানো


চলচ্চিত্রজুড়ে মনে হয়, ক্যামেরাটা ভারত থেকে বাংলাদেশের দিকে তাক করানো; অথচ চলচ্চিত্রটি ভারতীয়। কিন্তু সেখানে ভারত নেই বললেই চলে। কেবল নাসেরের প্রেম নিয়ে দু-চারটি কথার বাইরে সেখানে ভারত হাজির থাকে না। চলচ্চিত্রের গল্পটাও এক পাশের; বাংলাদেশের এক বিধবার জীবন নিয়ে। সেই বিধবার জীবনে ভারতীয় এক পুরুষের আগমন-প্রেম-প্রস্থান এবং স্থানীয় এক ক্ষমতাধরের প্রভাব; অন্যদিকে অসুস্থ শ্বশুরকে নিয়ে সেই বিধবার জীবন সংগ্রাম। চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে আছে বাংলাদেশ। কিন্তু কেন্দ্রকে ধরে নড়াচড়া করছে ভারত।


বিসর্জন-এর আট মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে দেখা যায়, বি জি বি সদস্যরা চাঁটাই দিয়ে মোড়ানো লাশ বাঁশে ঝুলিয়ে কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে কোমরে দড়ি বাঁধা আরো কয়েকজন। এ দৃশ্য বি জি বি সম্পর্কে দর্শককে প্রাথমিক ধারণা দেয়। আবার নাসেরকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর (১৫ মিনিট ১০ সেকেন্ড) পদ্মা মুসলমান নাসেরকে বি জি বির ভয় দেখিয়ে হিন্দু নাম শিখিয়ে মুখস্থ করতে বলেন! পদ্মাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি ইন্ডিয়ার লোক, জাল কইরে এইহানে আছেন, এইটা জানাজানি হয়ে গেলে সব শ্যাষ। তার মানে বি জি বি এতো কড়া-নির্মম যে, কোনো কারণে নাসের ধরা পড়লে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া নাসেরকে এমনভাবে পদ্মা ভয় দেখান, ভারতীয় নাগরিক ধরা আর গুলি করে মারা ছাড়া বি জি বির যেনো আর কোনো কাজ নেই।


গণেশ মণ্ডল শেষ পর্যন্ত অবশ্য পদ্মার অনুরোধে নাসেরকে বি জি বির ‘চোখ ফাঁকি দিয়ে তার দেশে ফিরে যেতে সাহায্য করেন। এতে বুঝতে কষ্ট হয় না, বি জি বির সঙ্গে স্থানীয় ক্ষমতাশালী গণেশের ভিন্ন কোনো সম্পর্ক আছে। এর মধ্য দিয়ে বি জি বির নৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।


চলচ্চিত্রজুড়ে বাংলাদেশকে দেখে হিন্দু প্রাধান্যশীল মনে হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। গ্রামের ক্ষমতাবান গণেশ-যার কথায় সব হয়-যার ক্ষমতার জোরে নাসের বি জি বির চোখ ‘ফাঁকি দিয়ে দেশে ফিরতে পারেন। সত্যিই কি বাংলাদেশে হিন্দুদের এমন ক্ষমতা ছিলো কখনো! বরং এর উল্টো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত যেতে হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের। এমনকি পুরো চলচ্চিত্রে দুই-তিনটার বেশি মুসলমান চরিত্রও অনুপস্থিত।


বিসর্জন-এ পদ্মার বৃদ্ধ শ্বশুরকে (রমেন হালদার) বেশ কয়েকবার রেডিও শুনতে দেখা যায়। সেখানে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারের উন্নয়নের খবরই শোনা যায় বার বার; সঙ্গে বিরোধী দলের নেতিবাচক সব কার্যক্রমের খবর তো আছেই। কিন্তু এই গতানুগতিক আলোচনার বিপরীতে বাংলাদেশের আর কোনো চিত্র পাওয়া যায় না চলচ্চিত্রজুড়ে। ফলে বুঝতে কষ্ট হয় না, নির্মাতা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সবকিছুই মেনে নিয়েছেন। অবশ্য এই মেনে নেওয়ার একটা রাজনীতি আছে। সেই রাজনীতির সঙ্গে শুধু রাজনীতি জড়িত নয়, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা শাখা জড়িত। শিল্পী কৌশিক হয়তো কোনো না কোনোভাবে এতে জড়িয়ে পড়েছেন। 


এখন দেখা যাক, বি জি বির বিপরীতে ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বি এস এফ) চলচ্চিত্রে কীভাবে এসেছে। বি এস এফ-সীমান্তে যাদের গুলিতে প্রায় প্রতিনিয়ত মানুষের প্রাণ যায়, সে বিষয়ে নির্মাতা কৌশিক গাঙ্গুল এখানে একদম চুপ ছিলেন। যেখানে তিনি বি জি বি নিয়ে এতো কথা বলেছেন; সেখানে বি এস এফ নিয়ে চুপ থাকাটা খানিকটা বেমানানই লাগে। অথচ সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে গত কয়েক দশকে বি এস এফ-এর যে রেকর্ড সেটা মোটেও চুপ থাকার মতো নয়। কারণ ২০০৭ থেকে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বি এস এফর গুলিতে চারশো ৯৪ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও চারশো ৮৪ জন আহত হয়েছে। এর মানে হলো ভারত তার ‘জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাতে প্রতিবছর গড়ে ৪৯ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। শুধু তা-ই নয়, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিপীড়নের শিকার প্রায় ১০ লক্ষ নির্যাতিত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। বিপরীতে যে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা ভারতে আশ্রয় নিয়েছে, তারা মুসলিম হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে রাতের আঁধারে বাংলাদেশে জোর করে পাঠিয়ে দিচ্ছে বি এস এফ। এমন অনেক জরিপ উপস্থাপন করা যাবে যা নির্মাতার দেখানো চিত্রের বিপরীত কথা বলে।


নির্মাতা বাংলাদেশ নিয়ে এতো কথা বললেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি (তাদের স্বার্থনির্ভর), তিস্তার পানি চুক্তি থেকে শুরু করে ফেলানি হত্যা, রামপাল প্রকল্প নিয়ে তেমন কোনো ইঙ্গিতই করেননি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া টপকানোর সময় বি এস এফ-এর গুলিতে বাংলাদেশি ফেলানি খাতুনের মৃত্যু হয় ২০১১ খ্রিস্টাব্দে, সেই হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার পায়নি বাংলাদেশ। অন্যদিকে তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে তো মহাজনদের মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হতে চায় না। নাসের এক ঘণ্টা ২৬ মিনিটে পদ্মাকে বলেন, ‘কতো বয়স আপনার, আপনি ওখানে (বাবার বাড়ি) ফিরে যান; আবার নতুন করে জীবন শুরু করুন। এর উত্তরে পদ্মাকে বলতে শোনা যায়, ‘পদ্মায় চর পড়ছে গো সুভাষ দা, জল কই!’


নাসেররা কিন্তু সবই বোঝে, পদ্মার ডুবে যাওয়া থেকে শুরু করে চর পড়া; বোঝে না কেবল পদ্মার ভাষা-পদ্মার চাওয়া। তার ভাষা বোঝার সময় আসলে তারা নির্বাক হয়ে যায়। যদিও নানা সময়ে তাদের মুখ থেকে পদ্মার জন্য সহানুভূতির কথা বের হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কেবল কথাতেই থাকে।


গণেশ, নাসের যেনো ভারত


নির্মাতা কৌশিক বিসর্জন-এ যে পদ্মাকে উপস্থাপন করেন, তা দেখে অনেক ক্ষেত্রেই মনে হয়েছে তা যেনো বাংলাদেশেরই প্রতিরূপ। বাংলাদেশ থেকে শুধু গোপন ভালোবাসাটা নিয়ে যান নাসের। বিনিময়ে পদ্মাকে দিয়ে যান কষ্ট, স্মৃতি আর ভালোবাসার দায়। যে দায়ের চিহ্ন মুছে ফেলা হয়তো পদ্মার পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। এই চিহ্ন মুছতে না পারার পরিণতি চলচ্চিত্রের শেষে পদ্মাকে মা বলে ডাকা ছেলেটা আর ওই ছেলের পিঠের জন্ম দাগটা। নাসেররা সবসময় তাদের দায়টায় চাপিয়ে দেয়, আর সেই দায়ের ভারে কার কী হলো, না হলো তা দেখার দরকার বা সময় কোনোটাই তাদের নেই। নিজের প্রাপ্যটুকু পেলেই তারা খুশি। যে প্রাপ্যটুকু বুঝে নেওয়ার জন্য হয়েছিলো ফারাক্কা বাঁধ। যে বাঁধ নির্মাণের ফল বাংলাদেশের শত শত নদীর মৃত্যু; আর বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা। এসবে অবশ্য নাসেরদের খুব বেশি কিছু যায় আসে না।


বিসর্জন-এর এক ঘণ্টা ৪৩ মিনিটে দেখা যায়, নাসের পদ্মাকে বলেন, ‘তুমি কিন্তু এ রকমই থেকো পদ্মা। যদিও সেই সংলাপের উত্তরে পদ্মার মুখ থেকে একটি বহুল আলোচিত প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়-‘ধুর, আপনারা পদ্মার জল ছাড়তাসেন না। আমি ক্যামন কইরা একই রকম থাকুম? আমার কথা বাদ দ্যান।’ পদ্মা তার কথা বাদ দিতে বললেও কিন্তু তারা বাদ দেয় না। কারণ পদ্মাকে বাদ দিলে তো তারাই বাদ পড়ে যায়। আর পদ্মা, সে তো অসহায়; ভারত যেভাবে রাখবে সেভাবেই তাকে থাকতে হয়; তার তো ‘জলবতী হয়ে ওঠার ইচ্ছা থাকতে নেই। পদ্মাকে জলহীন দেখতেই নাসেরদের সুবিধা, অন্যথায় তাদের সব ভালো মানুষি যে শেষ হয়ে যাবে। সব দরদ দেখানোর অধ্যায়ও হয়তো থাকবে না।


বাস্তবে কি বাংলাদেশের পদ্মাকে নিয়ে ভাবার একটুও সময় আছে নাসেরদের, নাকি শুধু কাটা ঘায়ে মলম লাগানোর জন্যই তারা সর্বক্ষণ মলম বিক্রেতা হয়ে থাকে! সেটার প্রমাণও কৌশিক দেন কৌশলে। নাসের তার পরের সংলাপেই বলেন, ‘তুমি একদম বদলাবে না পদ্মা। তার জন্য যদি দরকার হয় সারাজীবন ওই সাদা থান পরেই থাকবে। পদ্মা তো সেই সাদা থান পরেই আছে। তার জলময় রঙিন দিনগুলো অনেক আগেই ধুয়ে মুছে গেছে। পদ্মার বুকে এখন শুধু ধু-ধু বালু ছাড়া কিছুই নেই। পাল তোলা নৌকা তো সেখানে আগের মতো বয়ে যায় না। পদ্মার চাওয়াগুলো এখন কেবলই কাকতাড়ুয়ার মতো।


পদ্মার মধ্য দিয়ে কথা বলে, বিশ্বের কাছে দেনার দায়ে লাঞ্ছিত একটা দেশ, যাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজেকে সমর্পণ করতে হয় গণেশ মণ্ডলের মতো ব্যবসায়ী, ক্ষমতাধরের কাছে। যে ব্যবসায়ী তার আধিপত্যকে পুঁজি করে দায়গ্রস্ত একটি দেশকে কৌশলে নিয়ন্ত্রণে রাখে। গণেশ প্রভাবশালী মাছ ব্যবসায়ী; তিনি আপাতদৃষ্টিতে খারাপ না হলেও আদতে পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজের প্রতিনিধি। গণেশ মনে করেন, তিনি চাইলেই গ্রামের যেকোনো মেয়েকে বিয়ে করতে পারেন; এমন ক্ষমতা তার আছে। কিন্তু তিনি তা করেন না। কারণ পদ্মার মতো সুন্দর-বিনয়ী-কর্তব্যনিষ্ঠ মেয়েই তো গণেশের দরকার। যে তার সব অন্যায় আবদার মুখ বুজে সহ্য করে নেয়; যে নিজেকে নিয়ে না ভেবে অন্যের উপকারের জন্য নিজেকে বিসর্জন দেয়।


তাই গণেশ সর্বক্ষণ পদ্মার ওপর নজরদারি করেন। পদ্মার সবকিছু তার নখদর্পণে। পদ্মা কী করে, কোথায় যায়, কে তার বাড়ি আসে, এমনকি তার ঘরের আলো কখন বন্ধ হয়, কখন জ্বলে সব জানেন গণেশ! গণেশ পদ্মার ওপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করেন, তাতে মিশেল ফুকোর ক্ষমতা কাঠামোর কথা মনে পড়ে যায়। কারণ নজরদারির সঙ্গে গণেশ সব তথ্য রাখেন পদ্মার। ফুকোর প্রশাসনিকতায় যেমনটা বলা হয়, প্রশাসন ক্ষমতা প্রয়োগ করবে জনগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য। তবে তা সর্বজনীন কল্যাণ নয়, বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠীর বিশেষ বিশেষ কল্যাণ। আধুনিক সমাজে যতোই প্রশাসনিকতা বিস্তৃত হবে, ততোই গড়ে উঠবে জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে শ্রেণিবদ্ধ করে তাদের সম্বন্ধে সরকারি তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থাসমূহ। কারণ অধিকতর নির্দিষ্ট ও পরিসংখ্যানগত নির্ভুল তথ্য ক্ষমতা ব্যবস্থাকে অধিকতর টেকসই করে। তবে এটা সবসময় কোনো রাষ্ট্রের মধ্যেই ঘটে এমন নয়। রাষ্ট্রের বাইরেও বৃহৎ রাষ্ট্র থাকে, যারা ছোটোদের ওপর প্রশাসনিকতা প্রয়োগ করে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও বন্ধু রাষ্ট্রের নামে একই কাজ করে তার প্রতিবেশীদের ওপর। তারা বিশেষ কল্যাণের নামে বাংলাদেশের সবকিছু জেনে যায়; ঠিক যেমন পদ্মার সব কর্মকাণ্ড, তথ্য জানা থাকে গণেশের। যদিও সেটা গণেশের ভাষায়, পদ্মার মঙ্গলের জন্যই।


পদ্মার ইচ্ছা না থাকলেও ক্ষমতাধর ব্যবসায়ীর কাছে তাকে মাথা নিচু করে এই দরদ দেখানোর নামে ‘অত্যাচার মেনে নিতে হয় নীরবে। তার নীরবতার মাঝে ফুটে ওঠে অসহায়ত্বের কালো ছাপ। তবে অপরিচিত মানুষকে বাড়িতে আনা, তার সেবা করা, ভারতীয় নম্বরে কথা বলা, এমনকি অন্যের সন্তান গর্ভে ধারণ করা-পদ্মার কেনোকিছুতেই রেগে যান না গণেশ। কারণ তার উদ্দেশ্য পদ্মাকে নিজের করে নেওয়া, যা মোটেও গায়ের জোর খাটিয়ে নয়।


তবুও কেটে যায় সময়


চলচ্চিত্র বিসর্জন সাধারণ ঘটনার গল্প, যে ঘটনাগুলো ঘটে, ঘটছে। যে গল্পে একে অন্যকে ব্যবহার করে, শোষণ করে আবার শোষিতের মুখ বন্ধও রাখে। এই ছন্দে তাল মিলিয়েই চলচ্চিত্রনির্মাতারা দেশপ্রেমী হয়ে ওঠে, কখনো মায়াকান্না কাঁদে শোষিতের জন্য। এ এক বিশাল রাজনীতির অংশ, যা সাদা চোখে উপলব্ধি করা কঠিন। তাই ভারত-প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া বিসর্জন-এর জন্য কৌশিক অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। সেই প্রশংসা তিনি পেয়েছেনও। এই প্রশংসা ভারতীয় চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে কৌশিককে হয়তো অনেক বড়ো করে, কিন্তু মানুষ, শিল্পী হিসেবে তাকে নিয়ে দর্শককে নতুন করে ভাবায়।

 

লেখক : প্রিয়াংকা দেবনাথ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি নিয়মিত সঙ্গীত চর্চা করেন।


[email protected]

 

 

তথ্যসূত্র


১.‘দেশভাগের কাঁটাতার; কবি দেবজ্যোতিকাজল-এর এই কবিতা পড়তে পারবেন এই লিঙ্কে গিয়ে https://golpokobita.com/golpokobita/article/12084/686/s; retrieved on: 25.4.18; 2:18pm.

2. http://bn.southasianmonitor.com/2017/11/07/17882; retrieved on: 26.4.18; 7:50pm.

৩. মামুন, আ-আল (২০০৬ : ৩২); ‘ভূমিকার বদলে; মানবপ্রকৃতি : ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা, মুখোমুখি নোম চমস্কি এবং মিশেল ফুকো; ভাব-ভাষান্তর : আ-আল মামুন; রোদ, রাজশাহী।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন