Magic Lanthon

               

মফিজ ইমাম মিলন

প্রকাশিত ০৩ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ধারাবাহিক পাঠ

সিনেমা দেখার গল্প

মফিজ ইমাম মিলন


বিদ্যুৎকে মানুষ লোহার তার দিয়া বাঁধিয়াছে, কিন্তু কে জানিত মানুষ শব্দকে নিঃশব্দের মধ্যে বাঁধিতে পারিবে। কে জানিত সঙ্গীতকে, হৃদয়ের আশাকে, জাগ্রত আত্মার আনন্দধ্বনিকে, আকাশের দৈববাণীকে সে কাগজে মুড়িয়া রাখিবে। কে জানিত মানুষ অতীতকে বর্তমানে বন্দী করিবে? অতলস্পর্শ কালসমুদ্রের উপর কেবল এক একখানি বই দিয়া সাঁকো বাঁধিয়া দিবে।

-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


শৈশবে পাঠ্যপুস্তকে পড়া বিশ্বকবির ‘লাইব্রেরী, এখনো ঝরঝরা মুখস্থ বলতে পারি। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি অনেক কিছুই ভুলি না। যদিও একদিক থেকে অনেক জিনিস ভুলে যাওয়া ভালো। কোন শৈশবে সিনেমা দেখেছি, তা নিয়ে এখন লিখতে বসেছি। লেখার বিষয়বস্তু যদি বই হতো, তা এক কথা। অবশ্য আমাদের ছেলেবেলায় ‘সিনেমাকে বই-ই বলতো সবাই। ‘যাই বই দেখে আসি বা বই দেখতে যাবা নাকি?’ তার মানে সিনেমাহলকে বোঝানো হতো। অবশ্য সিনেমার আগে টকি, বায়োস্কোপ বলতে শুনেছি অনেক প্রবীণকে।


আমি কথা বলতে ভালোবাসি। সে প্রমাণ বিভিন্নভাবে বৈঠকে আড্ডায় দিয়েছি। কিন্তু লেখা খুব কষ্টের কাজ। বুকের মধ্যে কথারা কথা বলে, কলমের আগা দিয়ে বেরোতে চায় না। ছোটোবেলায় বাবার চাকরির সুবাদে ঢাকায় ছিলাম। ফলে সিনেমা শুধু দেখা না, সিনেমাতে যারা অভিনয় করতো তাদের অনেককেও সামনাসামনি দেখেছি। আমাদের বাসার কাছেই থাকতেন শক্তিমান অভিনেতা শওকত আকবর। গেন্ডারিয়ায় উনাদের একতলা বাড়ি ছিলো। আমরা টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলতাম। বল তাদের বাসার ভিতর চলে গেলে তিনি হাসতেন আর বল ছুড়ে ফেরত পাঠিয়ে দিতেন। তাকে দেখে আমরা পুলকিত হতাম।


আবার গুলিস্তান সিনেমাহলের সঙ্গে ‘সুইট হ্যাভেন নামের একটা রেস্তোরাঁ ছিলো। খুব নামিদামি লোকদের আনাগোনা ছিলো তাতে। এর মালিক ছিলেন এহতেশাম। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তার যথেষ্ট সুখ্যাতি ছিলো। এদেশ তোমার আমার (১৯৫৯), রাজধানীর বুকে (১৯৬০), চান্দা (১৯৬২), সাগর (১৯৬৫), চকোরী (১৯৬৭), চাঁদ আওর চাঁদনী (১৯৬৮), দাগ (১৯৬৯), পীচ ঢালা পথ (১৯৭০) এমন অসম্ভব জনপ্রিয় সিনেমা নির্মাণ করেছিলেন তিনি। সুইট হ্যাভেনে গেলে এহতেশামকে দেখা যেতো। গুলিস্তানের ঠিক বিপরীত দিকেই ছিলো ‘বেবী আইসক্রিম। এর মালিক ছিলেন সিনেমার নায়ক হারুন। চান্দা, সঙ্গম-এর মতো সিনেমার নায়ক ছিলেন তিনি। হারুন ছিলেন কিংবদন্তি অভিনয়শিল্পী দিলীপ কুমারের চাচাতো ভাই। ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে দিলীপ কুমার ঢাকায় এলে হারুন সাহেব কবি ফজল শাহাবুদ্দীন, আমাকে ও আরো কয়েকজনকে রাতের খাবারের দাওয়াত করেছিলেন।


৬০-এর দশকের শেষের দিকে যখন আমরা ঢাকায় থাকতাম; তখন মাঝে মাঝে ফরিদপুর নানাবাড়ি ও কালুখালী দাদাবাড়িতে আসলে সিনেমা দেখা নিয়ে খুব গর্ব করতাম। সেসময় কতো যে সিনেমার গল্প বানিয়ে বানিয়ে বলতাম আর বাহবা পেতাম! বড়োদের নাম নেওয়া বেয়াদবি হয় বিধায় নায়ক-নায়িকাদের নামের পরে বিশেষণ জুড়ে দিতাম-সুমিতা দেবী, সুজাতা খালা, সুচন্দা খালা, রোজী ভাবি, কবরী আপা এমন আরকি। আমার বলা সিনেমার গল্প শোনার জন্য সবাই আমাকে ঘিরে ধরতো। কারণ আমরা তখন ঢাকায় থাকি। ঢাকায় বসবাস করা চাট্টিখানি কথা না। ঢাকার বাসাবাড়িতে তখন ছাই বিক্রি হয় থালা-বাসন মাজা আর মাছ কুটবার জন্যে। ঢাকা তখন সব ভালো-মন্দের উৎপত্তিস্থল। কারো প্রমোশন অথবা ডিমোশন, তদবির, বদলি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বড়ো নেতা হওয়া অথবা হাওয়াই জাহাজে চড়া এসবের জন্য ঢাকা যেতে হতো। অবশ্য এজন্য পকেটে টাকা থাকতে হতো। আর টাকা কামানোর জন্যেও ঢাকাতেই থাকা দরকার। এ অবস্থা আগেও ছিলো, এখনো আছে তেমনই। সিনেমার নায়ক-নায়িকা হওয়ার জন্যেও ঢাকার বিকল্প নেই। ব্যবসা জেলা শহর, বিভাগীয় শহর এমনকি উপজেলাতেও করা সম্ভব। কিন্তু সিনেমা সংশ্লিষ্ট সবকিছুই কেবল ঢাকা এবং ঢাকা।


দুই.

জীবনের প্রথম ইংলিশ মুভি দেখার একটা স্মৃতি এখনো মনে পড়লে নিজে নিজেই পুলক অনুভব করি, আবার শরমও লাগে। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ, ঢাকায় দোতলা বাস আনা হলো। বন্ধুরা মিলে স্কুল ফাঁকি দিয়ে গুলিস্তান গিয়ে বাসে চড়লাম। দোতলা বাসে চড়ে ফার্মগেট আসার সে কী শিহরণ! ওই বছরই কমলাপুর রেলস্টেশন উদ্বোধন করা হয়। এর আগে গুলিস্তানের অদূরে নবাবপুরের মাথায় ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনই ছিলো ঢাকার প্রধান স্টেশন। বলা হলো, এশিয়ার বৃহত্তম রেলস্টেশন কমলাপুর। সেদিনও স্কুল ফাঁকি দিয়ে বন্ধুরা গেলাম কমলাপুর রেলস্টেশন দেখতে। কিন্তু বাবার মুখে কলকাতার শিয়ালদহ আর হাওড়া স্টেশনের যে গল্প শুনেছি, তাতে কমলাপুর এশিয়ার বৃহত্তম রেলস্টেশন মেনে নিতে কষ্ট হলো। এর কয়েকদিন আগেই মতিঝিলে ‘মধুমিতা নামে একটা নতুন সিনেমাহল চালু হয়েছে এবং তাতে ইংলিশ সিনেমা ক্লিওপেট্রা দেখাচ্ছে। তিন বন্ধু উপস্থিত হলাম মধুমিতায়। সিনেমাহলে ঢুকতেই চোখে পড়লো, দেয়ালের ভিতর দিয়ে গানের আওয়াজ বের হচ্ছে। এর আগে সব সিনেমাহলে দেখেছি মাইকে গান বাজে। কিন্তু এই প্রথম দেখলাম দেয়ালের ভিতর থেকে সাউন্ড আসছে। টিকিট কাউন্টারে টিকিট নেই; এক সপ্তাহ পরের অগ্রিম টিকিট বিক্রি হচ্ছে। আমরা ১২টার শো দেখবো। তখন ১২, তিন, ছয় ও নয়টায় মোট চারটি শো চলতো। রবিবার সাপ্তাহিক সরকারি ছুটির দিনে ছিলো পাঁচটি শো।


টিকিট না পেয়ে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে অন্য সিনেমার পোস্টার দেখছি। এমন সময় আমার বন্ধু জানালো, পাশের একজন টিকিট এনেছে ব্ল্যাকে। ব্ল্যাকে শুনেছি মালপত্র, বিদেশি জিনিস বিক্রি হয়, কিন্তু সিনেমার টিকিট! একসময় ব্ল্যাকারের সন্ধান পেলাম। টিকিট চাইতেই সে উর্দুতে জিজ্ঞেস করলো, ড্রেস সার্কেল, রিয়ার সার্কেল না মিডল সার্কেল কোন টিকিট চাই? বুঝতে পারলাম এই তিন ক্লাসের টিকিট পাওয়া যায়। বললাম সবচেয়ে কম টাকার টিকিট। ব্ল্যাকার বললো, তো লে লো মিডল সার্কেল। বললাম, দে দো তিনঠো। বললো আরে রুপিয়া ফেকো। তখন পয়সা ও আনার হিসাব। ২৫ পয়সায় চার আনা বা এক সিঁকি, ৫০ পয়সায় আট আনা (এক আধুলি) আর ১৬ আনায় এক টাকা। মিডল সার্কেল টিকিটের দাম ৬২ পয়সা; কিন্তু তার কাছ থেকে নিলে এক টাকা করে দিতে হবে। তিনটে টিকিট তিন দোস্তের জন্যে কিনে ফেললাম মহা আনন্দে। খবরের কাগজ, পুরনো খাতাপত্র বেচেও আমি এক টাকা জোগাড় করতে পারিনি। বন্ধু দুলালের অনেক টাকা, তার সাহসেই সিনেমা দেখতে আসা। স্কুল কামাই করার সাহসটা জোগাতো আরেক বন্ধু মতিন।


যথারীতি শো শুরু হওয়ার বেল বেজে উঠলো। তিন জন এগিয়ে গেলাম মিডল সার্কেল গেটের দিকে। শ্রেণির নাম ইংরেজি, সিনেমার নাম ইংরেজি, সিনেমাহলের কর্মচারীরা সব উর্দুভাষী, টিকিট ব্ল্যাকারও উর্দুভাষী। সবমিলে কেমন জানি একটা শূন্যতা অনুভব করলাম। কিছুটা ভয় ভয়ও লাগছে। কারণ তিন জনই স্কুল ড্রেস পরা-নেভি ব্লু প্যান্ট, সাদা ফুলহাতা শার্ট, বুকের বামপাশে স্কুলের মনোগ্রামখচিত নাম লেখা। যা ভেবেছি তাই হলো; গেটে যে লোকটি টিকিট অর্ধেক ছিঁড়ে রেখে সবাইকে ভিতরে ঢোকাচ্ছে, সে ‘ছোটা আদমি বাহার যাও বলে টিকিট তিনটা রেখে আমাদের ঢুকতে দিলো না।


ক্লিওপেট্রা কী তা যেমন বুঝিনি, তেমনই টিকিট রেখে দিলো কেনো, তাও সেসময় বুঝতে পারিনি। এখন কী করবো, জিজ্ঞেস করলো দুই বন্ধু। আমিও ঠিক করতে পারছি না, কী করা উচিত। এতো কষ্টের টাকার টিকিট এমন বেহাত হয়ে যাবে, তা সহজে মেনে নেওয়া যায় না। চল ম্যানেজারের কাছে যাই। দোতলায় উঠতেই একধরনের মিষ্টি গন্ধ এসে নাকে লাগলো। কিছুই বুঝতে পারলাম না। ‘গুলিস্তান, ‘শাবিস্তান, ‘স্টার, ‘রুপমহল, ‘নাগরমহল এসব সিনেমাহলে আমরা সিনেমা দেখেছি। কোনো মিষ্টি গন্ধ তো দূরের কথা, স্বাভাবিক অবস্থাই থাকে না। খালি ‘গুলিস্তান, ‘নাজ আর ‘বলাকা সিনেমাহল বাদে সবগুলোতেই প্রস্রাবের দুর্গন্ধ। ছারপোকা নেই এমন সিনেমাহল এখনো চোখে পড়েনি। কিন্তু ‘মধুমিতার ভিতর এমন মিষ্টি সেন্ট, দেয়ালের ভিতর দিয়ে সাউন্ড সবকিছুই নতুন নতুন লাগছে। এছাড়া টিকিট রেখে আমাদের ঢুকতে দিলো না-এ ঘটনাও নতুন। তিন বন্ধুর আজ অগ্নিপরীক্ষা চলছে-কী হবে, কী করা উচিত তা নিয়ে। ম্যানেজারের রুমের সামনে দারোয়ান। তার ব্যবহারও খারাপ। ‘কিয়া মাংতা বলে সামনে দাঁড়ালো। ম্যানেজার সাহেব ভদ্রলোক, তিনি ইশারায় আমাদের ঢুকতে বললেন। দারোয়ান পথ ছেড়ে দিয়ে তখন ‘যাইয়ে আপ আন্দার যাইয়ে বলে বিনয়ী ভাব দেখালো। ম্যানেজার সাহেব আমাদের স্কুল ড্রেসের দিকে বার বার তাকাচ্ছেন, তাতেও ভয় পেলাম। কারণ তার পাশে রাখা টেলিফোন। টেলিফোন তখন খুবই প্রেস্টিজিয়াস বিষয়। খুব বড়ো অফিসার না হলে তার রুমে টেলিফোন থাকতো না।  


ম্যানেজার সাহেব হঠাৎ আমাদেরকে আপনি সম্বোধন করে কথা বলতে শুরু করলেন। আপনারা কেনো এসেছেন-বাংলাতেই বললেন কিন্তু পুরান ঢাকাইয়া উর্দুর একটু গন্ধ পেলাম। আবার যখন জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের কী লাগবে? তখন তাকে খুলে বললাম, আমরা তিন বন্ধু সিনেমা দেখতে এসেছি। এবং ব্ল্যাকে এক টাকা করে মিডল সার্কেলের টিকিট কিনেছি। কিন্তু গেটম্যান আমাদের টিকিট রেখে ঢুকতে দেয়নি। ক্লিওপেট্রা দেখার আমাদের খুব ইচ্ছা। সব শুনে ম্যানেজার বললেন, আমরা ভুল করেছি, অন্যায় করেছি, প্রাপ্তবয়স্কদের সিনেমা দেখতে এসে। এরপর শুরু করলেন, আমাদের বাবার পরিচয় নেওয়া। একরকম ইন্টারভিউ শুরু হলো-আপনার আব্বাজির নাম কী আছে, বাসা কোথায়? আমি তো বাবার নাম, অফিসের ঠিকানা সব বলে দিলাম হড়হড় করে-বাবা মঞ্জুরুল ইসলাম, ওয়াপদা অফিসে হিসাবরক্ষকের চাকরি করেন, রুপলাল হাউজ, ফরাশগঞ্জে অফিস। তিনি খুশি হলেন না বেজার হলেন, কিছু বুঝতে পারলাম না। শুধু একবার উচ্চারণ করলেন, ইমাম সাহেব আছেন আপনি।


এরপর দুলালের পর্ব। আপনার আব্বাজি কী কাম করে, নাম কী আছে? দুলাল ঘাবড়ে গেছে। কিছুতেই তার বাবার নাম বলবে না, ম্যানেজারও ছাড়বে না-বোলিয়ে বোলিয়ে আব্বাজি কিয়া কাম করতা ঠিকঠাক বাতলাইয়ে। এদিকে সিনেমা শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। অথচ ম্যানেজার সাহেব ইন্টারভিউ নেওয়া শেষ করছেন না। ততোক্ষণে দুলালের কাকুতিমিনতি শুরু হয়ে গেছে, আপনি আব্বাকে বলবেন না প্লিজ। আমরা আর আসবো না সিনেমা দেখতে, আর স্কুলও ফাঁকি দেবো না। ম্যানেজার সাহেব বললেন, আপনার আব্বাকে তো আমি চিনিই না। আপনি নামও বলতেছেন না, তো তাকে কেমনে বলবো?


কিছুতেই ম্যানেজার সাহেব দুলালের বাবার নাম না জেনে ছাড়বেন না। শেষ পর্যন্ত আমি বললাম, দুলালের আব্বার নাম ওয়াসেফ আলী খান, পুলিশের ডি এস পি। মুখে সাদা পাহড়পরা (শ্বেতি রোগ) আছে-সবাই চেনে। ম্যানেজার তো আঁতকে উঠলেন। বলেন কী? ওয়াসেফ সাহেবের ছেলে আপনি! বাইঠে বাইঠে বলে দুলালকে বসতে বললেন। দুলাল যখন নিশ্চিত হয়ে গেলো যে, ম্যানেজার ওর বাবা ডি এস পি সাহেবকে চিনে ফেলেছে, তখন কাঁদো কাঁদো সুরে বলা আরম্ভ করলো-ও নাকি সিনেমা দেখতে আসতে চায়নি। আমি ওকে নিয়ে এসেছি। ওরা এর আগে কোনোদিন স্কুল ফাঁকি দেয়নি, আজই প্রথম ফাঁকি দিয়েছে।


আমি কিছু বলতে চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু তিনি ঠিক হ্যায়, ঠিক হ্যায় বলে আমাকে চুপ করিয়ে দিলেন। কলিংবেল টিপ দিয়েছেন, বুঝতে পারলাম দারোয়ান ঢোকা দেখে। জি সাব, জি সাব করতে করতে দারোয়ান ঢুকতেই ম্যানেজার বললে¬ন, তিন ফান্টা লে আও। দুলাল এবার কেঁদেই ফেললো, আমার বাবাকে বলবেন না তো? ম্যানেজার নিশ্চয়তা দিলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ বলবো না। ফান্টা এসে গেলো। তিনি বললেন, ‘ড্রেস সার্কেলে তিন কুরসি ভেজো ইনকে লিয়ে। আমরা বুঝতে পারলাম আমাদের জন্য চেয়ার লাগাতে বলেছে। তার মানে নিশ্চিত সিনেমা দেখা যাবে। ফান্টা খাওয়া শেষ হতে না হতেই ম্যানেজার সাহেব নিজে উঠে দাঁড়ালেন-চালিয়ে। আমরা তাকে অনুসরণ করলাম। ড্রেস সার্কেলের সামনে এনে সেখানে দাঁড়ানো চেকারকে বসিয়ে দিতে বললেন আমাদের।


অন্ধকার সিনেমাহলের ভিতরে বিশাল পর্দায় সিনেমা দেখাচ্ছে। সিনেমাহলের বাইরের চেয়ে ভিতরে সেই সুগন্ধির কড়া সুবাস নাকে এসে লাগলো। কিন্তু মন খারাপ দুলালের; তার বাবার নাম কেনো ম্যানেজার সাহেবকে বললাম। যদি বাবাকে বলে দেয়, তা হলে কী হবে। আমার সঙ্গে বন্ধুত্বই রাখবে না-এমন হুমকি দিলো দুলাল। আমারও মন খারাপ দুলালের হুমকিতে। কিছুক্ষণ ক্লিওপেট্রা দেখলাম। কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে এক নারীর ফিনফিনে ড্রেস পরা দেখে শরমে মরে যাই আমরা। মিশরের শাসক ক্লিওপেট্রার জীবন নিয়ে তৈরি এই সিনেমা। কতোক্ষণ দেখেছিলাম মনে নেই, তবে বিরতির ঘণ্টা পড়ার পরপরই বেরিয়ে এসেছি, আর সিনেমাহলে ফিরিনি।


পরে সেই ম্যানেজার সাহেব বাসায় বলেছিলেন কিনা জানি না। তবে বাসায় ফিরে সবাইকে দেখেই মনে হচ্ছিলো, এরা বুঝি আমাদের ক্লিওপেট্রা দেখার গল্প জেনে গেছে। একসময় বলেই ফেলি, আম্মা কেউ কিছু বলেছে? ‘কে কী বলবে, কোথাও কিছু হয়েছে নাকি-বলে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন আম্মা। রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। পরের দিন বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলে দেখা হয়, কিন্তু কথা হয় না দুলালের সঙ্গে। দুলাল কিছুতেই কথা বলবে না। সেঁধে সেঁধে আমিই কথা বললে দুলাল জানায়, বাসায় ফিরে সে নিজেই মা-বাবাকে সব ঘটনা খুলে বলেছে। সঙ্গে এও বলেছে, আমি তাকে সিনেমা দেখতে নিয়ে গিয়েছি। বাবা-মা এসব কথা শুনে তাকে কিছুই বলেনি, শুধু ওয়াদা করিয়েছে খারাপ ছেলেদের সঙ্গে না মিশতে। আমি যেহেতু খারাপ ছেলে, তাই সে আমার সঙ্গে মিশবে না। দুলাল কয়েকদিন পরে ঠিকই আমাদের সঙ্গে আবার মিশতে শুরু করলো, কিন্তু ওর বাবা-মায়ের সামনে আমার আর যাওয়া হয়নি।


তিন.

বিগত শতাব্দীর ৬০-এর দশককে উপমহাদেশে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে। শুধু সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে তা নয়, নায়ক-নায়িকা সৃষ্টির বেলাতেও এর সফলতা আছে। পরিচালক আব্দুল জব্বার খান ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন পাকিস্তানের প্রথম বাংলা সিনেমা মুখ ও মুখোশ। এই সিনেমার নায়িকা হয়ে আসেন চট্টগ্রামের মঞ্চ অভিনয়শিল্পী পূর্ণিমা। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফ ডি সি)। এই প্রতিষ্ঠান থেকে ফতেহ লোহানী আর নাজির আহমদ তৈরি করেন আসিয়া। আসিয়াতে নায়িকা হয়ে আসেন মাদারীপুরের মেয়ে হেনা লাহিরী (সুমিতা দেবী)। সুমিতাই হন ঢাকা চিত্রজগতের ফার্স্টলেডি। এরপর নায়িকাদের সারিতে একে একে উঠে আসে কবরী, সুচন্দা, সুচরিতা, অঞ্জু ঘোষ, রোজিনা, অলিভিয়া। সময়ের পরিক্রমায় এই নায়িকারা আমাদের রুপালি পর্দায় ছিলেন মহারাণীর ঐশ্বর্য নিয়ে। আমরা অনেক সময় সিনেমা দেখতে যেতাম নায়িকার নাম দেখে। নায়িকাদের অনেকেই তাদের অভিনয় দিয়ে দর্শক টানতেন। অনেক ক্ষেত্রে সিনেমার গল্পও প্রাধান্য পেতো দর্শকের কাছে। কোনো কোনো বাণিজ্যিক সিনেমার পরিচালক এমন সব ড্যান্স আর দৃশ্য রাখতো সিনেমায়, এক শ্রেণির দর্শক সেটা দেখার জন্যে হামলে পড়তো। তবে এটা ঠিক, বিনোদনের জন্য সে সময়ে ওই সিনেমা ছাড়া আর কিছু ছিলোও না। টেলিভিশন এসেছে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে; সেটা বেলা তিনটা থেকে রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত চলতো। সপ্তাহে না, মাসে একটি সিনেমা দেখানো হতো। আর ছিলো রেডিও। অনুরোধের আসরে একটা প্রিয় গান শুনতে হা করে বসে থাকতে হতো। তবে তখনকার নাটকগুলো ছিলো খুবই জনপ্রিয়। রেডিওতে তো আর দেখা যেতো না, শুধু আওয়াজ শুনেই মানুষ তৃপ্ত থাকতো। জসীম উদ্দীনের ‘বেদের মেয়ে নাটক শুনে মা-নানীদের কাঁদতে দেখেছি।


কান্নাকাটি আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নেওয়ার মতো সেসময় এক সিনেমা দেখেছিলাম, নাম রূপবান। আহারে কষ্ট! সিনেমাহলে উপচে পড়া ভিড় থাকলেও দর্শক নিশ্চুপ হয়ে সব উপভোগ করতো। তবে রূপবান-এ পুরুষ দর্শকের চেয়ে নারীদের সংখ্যা বেশি হতো। গ্রাম বাংলার প্রচলিত ও জনপ্রিয় লোককাহিনির রূপায়ণ রূপবান। একাব্বর বাদশাহ আঁটকুড়ে বলে তার রাজ্যে শান্তি নেই। বাদশাহ তার নিজ সম্পর্কে প্রজাদের প্রকৃত মনোভাব জানতে ছদ্মবেশে বেরিয়ে পড়েন। তিনি শুনতে পান আঁটকুড়ে বাদশাহর নিন্দা হাটে-মাঠে-ঘাটে প্রজাদের মুখে মুখে।


বাদশাহ মন খারাপ করে নদীর পাড় ধরে হাঁটতে থাকেন। নৌকা ধরে নদীর অন্য পাড়ে যান। গভীর জঙ্গলে এক দরবেশের ধ্যান ভঙ্গ করায় তিনি তাকে অভিশাপ দেন-আঁটকুড়ে নাম ঘুচতে বাদশাহর ছেলে হবে, কিন্তু ছেলের আয়ুষ্কাল হবে মাত্র ১২ দিন। তবে ১২ বছরের কোনো মেয়ের সঙ্গে তাকে বিয়ে দিয়ে রাতেই বনবাসে পাঠিয়ে দিলে, ছেলে বাঁচবে। আরো অনেক ঘটনা আছে, তবে রূপবান-এর গানগুলো মানুষের মুখে মুখে ফিরতো।


কীসের লেখা, কীসের পড়া গো

ও দাইমা কিছুই ভালো লাগে না

ও মোর দাইমা, দাইমা গো

যৈবন জ্বালায় জ্বলে মরি গো

ও দাইমা, সহিতে না পারি গো



রূপবানের বয়স মাত্র ১২ বছর, তার আবার ‘যৈবন জ্বালা। কিন্তু করার কিছু নেই, যেহেতু সিনেমার গান লোকে তো শুনবে, গাইবে এটাই স্বাভাবিক। এই সিনেমায় রূপবান ছাড়াও বেশ কয়েকটি চরিত্রের মুখে সঙ্গীতের আধিক্য দেখা যায়। ভাটিয়ালি সুরের কয়েকটি গান লোক জীবনেরই সন্ধান দেয়। এই সিনেমায় কবি জসীম উদ্দীনের দুইটি গান ব্যবহার হয়। বহুল জনপ্রিয় গান দুটি হচ্ছে-‘আমার হাড় কালা করলাম রে/ আমার দেহ কালার লাইগারে এবং ‘আমার বন্ধু বিনোদিয়া/ আমার প্রাণ বিনোদিয়া। মূলত বনবাসের বেদনা, শিশু স্বামীর সঙ্গসুখ না পাওয়ার বিরহ, তাজেলের সঙ্গে রহিমের প্রেমের সম্পর্ক এবং বাঘের মুখ থেকে রহিমকে বাঁচানো এসব ঘটনার অনুভূতি রূপবান গানে গানে প্রকাশ করে।


শোনো তাজেল গো/ মন না জেনে প্রেমে মইজো না-রূপবান-এর গান কী শহর, কী গ্রাম দর্শকের মুখে মুখে ফিরতো। কারণ মন তো সবারই আছে, তাই ঠিকঠাক না জেনে প্রেম করতে বারণ করছে। আর প্রেম-বিরহের অন্তর্জ্বালা তো কমবেশি সবার মধ্যেই আছে, থাকে। ফলে বিরহের গান সবার মনেই দাগ কাটে।


চার.


আমরা একবার টানা এক মাস সিনেমা দেখেছিলাম। আমাদের শহরে একটাই সিনেমাহল, নাম ‘ছায়াবাণী (অবশ্য বিভিন্ন সময় এই সিনেমাহলটির নাম মালিকানার সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে)। যেকোনো সিনেমা মুক্তি পেলেই সেখানে ভিড় লেগে যায়। শুনেছি তখন সিনেমা দেখিয়ে প্রচুর লাভ হতো। ঠিক এই সময় ‘অ্যাপেক্স ক্লাব অব ফরিদপুর নামে স্বেচ্ছাসেবামূলক একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। সবার মত নিয়ে, চিকিৎসা সেবার পরিকল্পনা নিয়েই ক্লাবের কাজ শুরু হলো। ফরিদপুর শহরের উপকণ্ঠে অম্বিকাপুর ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করলেন, তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী; দিনটি ছিলো ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুলাই। এই অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনার জে ই এইচ ফয়েলই এসেছিলেন। ক্লিনিক পরিচালনায় অর্থের প্রয়োজন, তাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয়ই পরামর্শ দিলেন সিনেমাহলে সিনেমা দেখিয়ে তা সংগ্রহের।


তখন ফরিদপুরের এ ডি সি জেনারেল ছিলেন মো. আব্দুর রশিদ। তিনি এবং ভেনাস ফার্মেসির মালিক টোকন হাজী সাহেবই সব ব্যবস্থা করলেন। আমরা ছিলাম স্বেচ্ছাসেবক। শেখ নজরুল ইসলাম পরিচালিত এতিম এবং ইবনে মিজানের তাজ ও তলোয়ার সিনেমা দুইটি প্রদর্শনীর জন্যে আনা হলো। এই সিনেমা দুইটি মুক্তি পেয়েছিলো ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে। সরকারি রাজস্ব মুক্ত এই সিনেমার টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হলো। আমরা বন্ধুরা টিকিট চেক করা থেকে শুরু করে সব কাজই করি। এমনকি চেয়ার-বেঞ্চ ঠিকঠাক করে দিই দর্শকের বসার জন্য। শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা স্বাস্থ্যসেবার সাহায্যার্থে সিনেমা দেখতে আসে। কলেজ হোস্টেলের মেয়েরা অধ্যক্ষের পারমিশন নিয়ে চলে আসে দলবেঁধে কলকল করতে করতে সিনেমাহলে। সবকিছুতেই একটা ফুর্তি-ফুর্তি ভাব। আর আমরা প্রতি শোতে বসেই সিনেমা দেখি। আমাদের বন্ধুদেরও বিনা টিকিটে সিনেমা দেখতে দিই। আবার ছেলে-ছোকরারা বিনা পয়সায় সিনেমা দেখতে আসলে দাপটের সঙ্গে তাদের সিনেমাহল থেকে বেরও করে দিই। আমাদের তখন অসীম ক্ষমতা। 


কিন্তু সমস্যা বেঁধে গেলো আমাদের পাড়ার শেখ মাহাতাব আলী মিঠুকে (মিঠু অবশ্য বর্তমানে ফরিদপুর পৌরসভার মেয়র) নিয়ে। তখন সে পুরোদস্তুর পাড়ার মাস্তান; কিছু মানে না, শহরের মাঝখানে ঝিলটুলিতে বাড়ি, দলেবলেও ভারি। সে তার দলবল নিয়ে বিনা পয়সায় এতিম দেখবে। দু-এক কথায় তার সঙ্গে বচসা হয়ে গেলো। সিনেমাহলের শেষ শো শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে বেশ কয়েকজন লোহার রড, হকিস্টিক নিয়ে দাঁড়িয়ে। সেকালে সিনেমাহলকে ঘিরে মারামারির এক মহড়াও হতো। মূল বিষয় ছিলো আধিপত্য। যার আধিপত্য বেশি থাকতো, টিকিট কালোবাজারিরা তাকে বেশি বখরা দিতো, বিনা পয়সায় এদের লোককে সিনেমা দেখতে দিতো-এমন সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যেতো। যাহোক, কপাল ভালো এ ডি সি জেনারেল সাহেব খোঁজখবর নিতে সেদিন সিনেমাহলে এসেছিলেন। এসেই শুনতে পেলেন গোলমালের কথা। তিনি আমাদের তার গাড়িতে নিয়ে গেলেন এবং পরে এমন ব্যবস্থা করলেন যে মাস্তানরা আমাদের কাছে মাফ চাইলো। সেই এক মাসে সিনেমা দেখিয়ে ৬৯ হাজার টাকা পাওয়া গিয়েছিলো সব খাই-খরচা বাদে। আর আমরা তো সিনেমার আদি অন্ত দেখেছিই।


কারো সাহায্যার্থে সিনেমা এনে প্রদর্শন করা হলে, তাতে ভালোই লাভ হতো। কারণ সিনেমা দেখাও হতো সঙ্গে সাহায্য করাও! চিকিৎসা সেবার জন্য কাজ করা তো ভালো। এমনি সিনেমা দেখতে গেলে তো গুনাহ হয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের সাহায্যার্থে সিনেমা দেখা, এর চেয়ে ভালো কাজ আর হয় না। একসময় গ্রামেগঞ্জে চেয়ারম্যানরা স্কুল-কলেজের উন্নয়নের জন্য যাত্রাপালার আয়োজন করতো। মাসব্যাপী যাত্রা, সঙ্গে ষোলোগুটি ও জুয়াখেলা চলতো। এতে যে টাকা পাওয়া যাবে তাতে স্কুল বানানো না হলেও ছেলে-মেয়ের বসার জন্য হাইবেঞ্চ বানানো যাবে। এমন হাজারো নজির রয়েছে আমাদের উপজেলার স্কুল কি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাতেও।


ফরিদপুর শহরের ডা. মোহাম্মদ জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময় নানান জন নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে। চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী হিসেবে সাহায্য করেন। আবার সিনেমা দেখিয়ে আয় করার পরামর্শও দেন। বাংলাদেশ রেডক্রস সোসাইটি শুরু করে ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিক। সেখানে প্রচুর রোগী হতে থাকে। মা ও শিশুরা ওষুধের জন্য ভিড় জমায়। তখন পৌর চেয়ারম্যান রকিব উদ্দীন আহমেদ প্রস্তাব করেন সিনেমা দেখানোর। আজিজুর রহমান পরিচালিত অশিক্ষিত নিয়ে আসা হয়। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ৫ অক্টোবর সিনেমাটি চালানো হয়। ১৫ দিনে সব খরচ বাদে ৩৫ হাজার টাকা লাভ হয়। ফরিদপুর ডায়াবেটিক এসোসিয়েশনের সাহায্যার্থেও সিনেমাহলের টিকিট প্রতি ১০ পয়সা হারে তিন মাস দেওয়ার জন্য বোর্ড অব রেভিনিউয়ের চেয়ারম্যান আদেশ দিয়েছিলেন। তাতে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা পাওয়া গিয়েছিলো। এই সব জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় আমাদের সিনেমার একটা বড়ো অবদান রয়েছে।


পাঁচ.

আমাদের বাড়ির পাশে ছিলেন মোমিন ভাই। তার যেমন স্বাস্থ্য তেমন বল, আর ছিলো দুঃসাহস। মোমিন ভাইয়ের শখ ছিলো সিনেমা দেখার। কোনো সিনেমা মুক্তি পাওয়ার প্রথম শোটা তার দেখা চাই চাই। আর যদি ভালো লেগে যায়, তবে তিনি একসঙ্গে পরপর দুই শো দেখবেন। মোমিন ভাইয়ের বেদম দাম সিনেমাহল এলাকায়। তার আবার একদল চেলা-চামুণ্ডা, শিষ্য-সাগরেদও আছে। সিনেমাহলের টিকিট কাউন্টারের পাশেই ছিলো তার সাগরেদদের ঘোরাফেরা। ওস্তাদের কোনো মুশকিল দেখলেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়তো সদলবলে। মোমিন ভাই যখন টিকিট কাটার জন্যে হাত ঢুকাতো কাউন্টারে, তখন পিছন থেকে ব্লেড দিয়ে তার পিঠ চিড়ে ফেললেও টিকিট না নিয়ে তিনি হাত বের করতেন না!


মোমিন ভাই যখন ব্ল্যাকারদের সঙ্গে পেরে উঠতেন না, তখন দাঁতে ঘষা গুল ফুঁ দিয়ে মানুষের চোখ-মুখে লাগিয়ে দিতেন। সবাই হাঁচি-কাশিতে অস্থির হয়ে গেলে, তিনি আরামসে টিকিট কিনে ফিরে আসতেন। সিনেমা দেখা নিয়ে মোমিন ভাইয়ের অনেক গল্প আছে। উর্দু-হিন্দি নায়ক-নায়িকাদের নাম তার মুখস্থ। কোনো সিনেমায় দুঃখের কোনো গল্প থাকলে তিনি সবাইকে তা ডেকে শোনাতেন। তার হাতে একটা মাউথ অর্গান থাকতো সবসময়। সেখানে যেকোনো গানের সুর তুলতে পারতেন অনায়াসেই। তবে ‘আপনা দিল তাওয়ারা না জানে কি সিসে পেয়ার হো গায়্যা এই গান তিনি সবসময় বাজাতেন। আমাদের মহল্লার সবার আশ্রয়স্থল ছিলো মোমিন ভাই। যেকোনো শো, যেকোনো দিন দেখতে চাইলেই মোমিন ভাই। তিনি টিকিট কাটার কৌশল কীভাবে যেনো রপ্ত করেছিলেন! আবার সিনেমাহলওয়ালারাও তাকে সমীহ করতো। আমাদের মহল্লায় কী নিয়ে যেনো একটা দরবার, সবাই মোমিন ভাইকে খুঁজতে লাগলো। একসময় সবাই একমত হলো আজ তাকে পাওয়া যাবে না; কারণ শুক্রবার নতুন সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। আসলে হলোও তাই।


ছয়.

সিনেমাহলের সামনে তখন ভিড়-ভাট্টা হতো। আর ভিড় দেখলেই টুটকা-ফাটকা চিকিৎসকেরা তাবিজ-কবজ বেচার জন্য মজমা বসাতো। কয়েকটা ম্যাজিক দেখানো বা গানের পরেই শুরু হতো স্বপ্নে পাওয়া গাছ-গাছড়ার গুণাগুণ আর তার তাবিজ বেচাকেনা। বিফলে পয়সা ফেরতব্যর্থ প্রেমিকদের জন্যে সুখবর, প্রেমিকা দেখা করবে, খবর নিতে ছুটে আসবে। এমন গল্পে তাবিজ বেচাকেনা হতো। সন্ধ্যায় কাবুলিওয়ালারা চলে আসতো ‘ছিলাজাত হালুয়া নিয়ে। ছিলাজাত বেচবার জন্য তারা প্লাস্টিকের উপর পাহাড়ের দৃশ্য আঁকা বড়ো একটা বোর্ড নিয়ে আসতো। তাতে দেখা যেতো, পাহাড়ের গায়ের ঘাম নিয়ে হনুমানজী নিচে নেমে আসছে। পাহাড়ের এই ঘাম দিয়ে নাকি তৈরি হয় ছিলাজাত। তারা বলতো, ‘বাচ্চালোক ঘর যাও, ইয়ে বড়ো আদমিকা কাম হ্যায়। বিবি লোক খায়ে গা তো মরদ বান যায়েগা। এই তেজী হালুয়া বেদম বেচাকেনা হতো ।


যদি কোনো লোক এর প্রতিবাদ করতো-এই কাবুলিওয়ালা মাউরা তোমার হালুয়া খাইছি, কিন্তু কাম হয় নাই, পয়সা ফেলাও। কাবুলিওয়ালা তখন তাদের আঞ্চলিক ভাষায় খিস্তি-খেওর করতো। পয়সা তো ফেরত দিতোই না, বরং উল্টো বুঝ দিতো, ‘আপনারে খাইতে বলছি মিষ্টি আপনি খাইছেন পানি, তাইলে ফল হইবে কী চেডডা?’ আবার সিনেমাহলের আশপাশে মাখন, পাউরুটি, ডিমপোচ, দুধের মালাই, মিকচার নানান পদের বলকারী খাবার বেচাকেনা হতো। কারণ সিনেমাহলকেন্দ্রিক একধরনের খারাপ ব্যবসাও জমজমাট হয়ে উঠতো। মদ, জুয়া, পকেটমার, পতিতাপল্লীর মেয়েদের আনাগোনা, মেয়ে ভাড়া করা এমন অনেক ঘটনা হতো। টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত মাস্তানরা এসব অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকতো বেশি। আবার অনেক রিকশাচালক সিনেমাহলের দর্শক ছাড়া তুলতো না। কারণ ফেরার পথে তার সঙ্গে সিনেমার কিছু দৃশ্য নিয়ে গল্প করা যেতো।


সাত.

সিনেমা দেখা আসলে একটা নেশার মতো। যেসব সিনেমায় নায়ক-নায়িকার মিল হয় না, ওই সব পরিচালককে দর্শক মোটেই পছন্দ করে না। সিনেমায় নায়ক-নায়িকার মিল হবে, মা-বাবা আত্মীয়স্বজন দুই জনকে মেনে নেবে, তবেই তো সিনেমা সার্থক। তা না সিনেমার শেষে মিল নাই। তো চেয়ার, বেঞ্চি ভেঙে ফেলো-শেষে মিল দেয় নাই ক্যা!


এই নায়ক-নায়িকার মিল নিয়ে একটা সিনেমা দেখেছিলাম বেহুলা। বেহুলা গোসল করছেন আর তার সখিরা তাকে ঘিরে জলের মধ্যে নৃত্য করছে। এই গান এখনো কানে বাজে।

                                  

ও বেহুলা সুন্দরী

ও বেহুলা নাচনী

তোর রূপের কথা দেশ-দেশান্তর জানেন সকলে।।

তোর কুচবরণ কন্যা রে

তোর মনে কতো রঙ ।।

ডাঙর ডাঙর দেহখানি নরম চিকন অঙ্গ রে।


প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক জহির রায়হান নির্মাণ করেছিলেন বেহুলা। এটি মুক্তি পায় ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে। আমাদের কমলাপুরের বাড়ির পাশে ছিলো ছাত্তার মামা। তিনিও বিয়ে করেন ওই বছর। সেকালে মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে হানিমুন বলে কিছু ছিলো না। যা ছিলো তা হচ্ছে, শালা-শালি আত্মীয়-কুটুম্ব নিয়ে সিনেমা দেখা। আর ছিলো স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তোলা। বিনোদনে এর চেয়ে দামি আর সৌখিন কিছু ছিলো না। ছাত্তার মামার নতুন বউ আমাকে খুবই আদর করতেন। আমি নাকি তার বাপের মতো দেখতে। তা নতুন বউ দেখতে যাবে সিনেমা, আবদার তার বাপকেও নিয়ে যাবে। সেকালে ইচ্ছে করলেই কিছু করা যেতো না। যে পর্যন্ত না বাড়ির মুরুব্বিরা অনুমতি দেন। আমার মায়ের কাছ থেকে অনুমতি আদায় করলেন নতুন বউ নিজে এসে। সৌভাগ্য দেখা দিলো অজান্তেই। সেজেগুজে তেল-পানি নিয়ে চললাম তাদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে। কী সিনেমা তা জানিনে, কিন্তু সিনেমা দেখতে গেলাম। ফরিদপুর শহরের একমাত্র সিনেমাহল ‘মায়া। তখন হাফ টিকিটের প্রচলন ছিলো। আমার জন্য হাফ টিকিট কিন্তু সিট বরাদ্দ নেই। কোলের সঙ্গে হেলান দিয়ে সিনেমা দেখতে হবে, তাই দেখলাম। কখনো দাঁড়িয়ে, কিছুক্ষণ কোলে চড়ে কতোক্ষণ মামির গা ঘেঁষে। মামা ভীষণ বিরক্ত হচ্ছেন আমার ওপর বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু সে মুহূর্তে কিছুই করার ছিলো না। বেহুলা-লখিন্দর হচ্ছে সুচন্দা আর রাজ্জাক। একসময় তারা দুজন দুজনকে প্রেম নিবেদনে মত্ত হয়ে ওঠে। ভাব বিনিময়ে একে অন্যকে আলিঙ্গন করতে এগিয়ে যায়। দুজনের প্রেমের এ নিবেদন গানের কথায় ফুটে ওঠে-

নাচে মন ধিনা ধিনা,

প্রাণেতে বাজে বীণা, বাজে রে।

সখা বাজে না বাজে না বাজে না রে

তোমার সঙ্গ বিনা, আমার মনের বীণা

সখা বাজে না বাজে না বাজে না রে।।

চাতক চোখে প্রেমের ধারা

দোহার মন পাগলপারা

না ... ধরা দেবো না দেবো না দেবো না রে।।

তোমার মধুর মধুর চরণতলে।।


এই গানের শিল্পী কে, আজও জানিনে। তবে শৈশবে শোনা সেই মধুর কণ্ঠ এখনো আমাকে আন্দোলিত করে। অচেতন মনেই কখনো গেয়ে উঠি, ‘নাচে মন ধিনা ধিনা/ প্রাণেতে বাজে বীণা বাজে রে।


বেহুলার সংলাপ লিখেছেন আমজাদ হোসেন। তিনি ওই সিনেমায় অসাধারণ এক চরিত্রে অভিনয় করেন। চাঁদ সওদাগর বেহুলার বাসরঘর বানানোর দায়িত্ব দেন বিশু মিস্ত্রীকে (আমজাদ হোসেন)। মা মনসার নির্দেশে লোহার ঘরের ফুটো করে রাখেন বিশু মিস্ত্রী, যেখান দিয়ে সাপ বাসরঘরে ঢোকে। বিশু মিস্ত্রীর ঘরে অভাব ছিলো আর ছিলো স্ত্রীর নানান গঞ্জনা। তার স্ত্রীর প্রতি কষ্ট পেয়ে একটা মজার গান গেয়েছিলেন সিনেমায়-


মরি হায়রে হায়, দুঃখে পরান যায়,

দিবানিশি জ্বইলা মরি বউয়ের যন্ত্রণায়।

আলতা দিলাম, আয়না দিলাম, গয়না দিলাম গায়

কাউয়ার মতো কা কা কইরা আমারে ঠেঙায়।

(চলবে)


লেখক : মফিজ ইমাম মিলন, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক। তিনি ফরিদপুর থেকে ‘উঠোন নামে একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন।


[email protected]

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন