Magic Lanthon

               

শফিকুল ইসলাম

প্রকাশিত ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

মালায়লাম চলচ্চিত্র 'আইন'

মগজ ধোলাইয়ে নিমার্তা সিদ্ধার্থ-এর কারিশমা

শফিকুল ইসলাম


বদলে যাওয়া রাষ্ট্রের সুর


রাষ্ট্র তার ক্ষমতাকে পোক্ত করার জন্য যুগ যুগ ধরে জনগণকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। সেই নিয়ন্ত্রণ একসময় প্রকাশ্য, নির্মম হলেও সময়ের সঙ্গে তাতে পরির্বতন এসেছে। ফরাসি তাত্ত্বিক মিশেল ফুকো আধুনিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা-কাঠামো নিয়ে যেমনটা বলেন, জনগণকে লাঠিসোঠা-বন্দুকের ভয়ে নয়, বরং নানারকম নজরদারি ও অনুশাসনে নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র। এই অনুশাসনের বাইরে যেমন কেউ পড়ে না, আবার এ থেকে কেউ সহজে বেরও হতে পারে না। স্বাভাবিকভাবেই শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত মানুষরাও এর বাইরে যেতে পারে না। আর তাদের নির্মিত শিল্প-সাহিত্যও থাকে অনুশাসনের ঘেরাটোপে। আর যখনই রাষ্ট্রীয় অনুশাসনের বিষয়টি মগজে ঢুকে যায়, তখন কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্র জিতে যায়। ফলে রাষ্ট্র যা বলতে চায়, তাই নির্গত হয় শিল্পের মধ্য দিয়ে। এর মধ্যেও কিছু মানুষ চেষ্টা করে ওই অনুশাসনকে ভাঙতে। কিন্তু একদিকে রাষ্ট্র অন্যদিকে পুঁজির তোড়ে তা আর হয়ে ওঠে না। তার পরও যতোটুকু হয়, তা নিতান্তই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতায় ঝাঁকুনি দেয় মাত্র, ভাঙতে পারে না।


শিল্পের অন্যতম মাধ্যম চলচ্চিত্রও এর বাইরে খুব বেশি যেতে পারেনি। সেটাতেও কোনো না কোনোভাবে প্রতিষ্ঠানের সুর ভেসে এসেছে। ভারতের কেরালা রাজ্যে নির্মিত চলচ্চিত্র আইন (২০১৫) এই প্রবন্ধের আলোচনার বিষয়। আইন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা-কাঠামোর নজরদারি ও অনুশাসনের বাইরে যেতে পেরেছে কি না তা এই আলোচনায় উঠে আসবে; সঙ্গে বলিউডের মতো একটি বৃহৎ ইন্ডাস্ট্রির প্রতিবেশী হিসেবে মালায়লাম চলচ্চিত্র ঠিক কী করছে সেটাও পর্যবেক্ষণে থাকবে।


ঈশ্বরের নিজের দেশ


ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণঘেঁষা রাজ্য কেরালা; যা ‘ঈশ্বরের নিজের দেশ নামে পরিচিত। সনাতন ধর্ম, ইসলাম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ ভারতের প্রায় সব ধর্মের মানুষের বসবাস এ রাজ্যে। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের এ রাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি মুসলমান বসবাস করে কেরালায়। নানা ধর্ম-বর্ণ-মত-পথের মানুষের বসবাস থাকা সত্ত্বেও এ রাজ্যে ধর্মীয় সংঘাতের খবর খুব একটা পাওয়া যায় না। শিল্প-সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি-সবমিলিয়ে রাজ্যটি ভারতের শান্তিপ্রিয় রাজ্যের তালিকায় শীর্ষে। ২৯টি রাজ্যের মধ্যে এর শিক্ষার হারও সর্বোচ্চ। আরেকটি ব্যতিক্রমী দিক হলো, এখানে পুরুষ ও নারীর গড় অনুপাতে নারীর সংখ্যা বেশি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে কেরালায় গণতান্ত্রিক উপায়ে মার্কসবাদী সরকার নির্বাচিত হয়। এ রাজ্যে কমিউনিস্ট মতাদর্শের একটি শক্তিশালী প্রতিপত্তি বর্তমানেও লক্ষ করা যায়।


পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা সময় এ অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের আগমন ঘটেছিলো। ফলে এখানকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ভারতের অন্য রাজ্যের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। কেরালার অধিকাংশ মুসলমান এসেছে আরব এবং খ্রিস্টানরা ইউরোপ থেকে। এই মুসলিমরা কেরালায় এসে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। আর এদের হাতেই প্রতিষ্ঠা হয় এই উপমহাদেশের প্রথম কোদুঙ্গাল্লুরে মসজিদ।


ভারতজুড়ে যেখানে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা অহরহ ঘটে, সে তুলনায় কেরালায় এ ধরনের কিছু হয় না বললেই চলে। এখানে ধর্মকে ব্যবহারের প্রবণতাও অনেক কম। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে কেরালায় স্কুলের ভর্তি ফরমে দেখা যায়, প্রায় এক লক্ষ ২৮ হাজার শিক্ষার্থী তাদের ধর্মের নামই উল্লেখ করেনি। শুধু তাই নয়, ভারতে যেখানে গরুর মাংস খাওয়া ও বহনের জন্য রীতিমতো মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে, সেখানে কেরালার রেস্টুরেন্টে বিনা বাধায় গরুর মাংস বিক্রি হয়। কেরালায় একটি দামি রেস্টুরেন্টের শেফ মনোজ নায়ার গো-মাংসকে রীতিমতো সেক্যুলার মিট বা ধর্মনিরপেক্ষ মাংস বলেও আখ্যা দিয়েছেন। এ রাজ্যে একই টেবিলে বসে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টানদেরকেও গো-মাংস ভক্ষণের খবরও পাওয়া যায়! সবমিলিয়ে এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অপেক্ষাকৃত একটা সম্প্রীতির আবহ বিরাজ করে। এমন রাজ্যকে তো ‘ঈশ্বরের নিজের দেশ বলাই যায়!


ঠিক এ রাজ্যেই নির্মিত হয়েছে সিদ্ধার্থ সিভার চলচ্চিত্র আইন। যদিও এর সঙ্গে কেরালার অনেক কিছুরই মিল খুঁজে পাওয়া মুশকিল। যে রাজ্যে গরুর মাংস খেতে কোনো বাধা নেই। অথচ সেই রাজ্যেই নির্মিত চলচ্চিত্রটি দেখলে মনে হয়, ওই অঞ্চলে আদতে গরুর কোনো অস্তিত্বই নেই। চলচ্চিত্রজুড়ে দেখানো হয়েছে, কেবল মহিষ। কখনো সেটা মহিষের হাট, আকিকার অনুষ্ঠান, কসাইখানার দোকানে। মানু (কেন্দ্রীয় চরিত্র) যখন গ্রাম ছেড়ে শহরে যান, তখনো একটি মহিষ ভর্তি ট্রাকেই যান। এমনকি চলচ্চিত্রের একেবারে শেষে মানু আকিকার জন্য রাখা একটি মহিষই ছেড়ে দেন।


আইন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে মালায়লাম চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে খানিকটা জানা জরুরি। কেননা, মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রি এখন বলিউড, টালিউড, তামিল, তেলেগুসহ ভারতের অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিকেও নানাদিক দিয়ে চ্যালেঞ্জ করছে। এখানে নির্মিত চলচ্চিত্র একদিকে যেমন ব্যবসা করছে, অন্যদিকে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্রসহ দেশ-বিদেশের নানারকম পুরস্কারও পাচ্ছে। এমনকি এই ইন্ডাস্ট্রির চলচ্চিত্র, অন্য ইন্ডাস্ট্রিতে রিমেক পর্যন্ত হচ্ছে।


মালায়লাম চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির বেড়ে ওঠা


১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। তারপর থেকেই চলে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রচেষ্টা। সেই প্রচেষ্টাতেই ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে দাদাসাহেব ফালকে নির্মাণ করেন রাজা হরিশচন্দ্র। এরপর থেকে ভারতে নির্মিত হতে থাকে একের পর এক চলচ্চিত্র। ভারতে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় থেকেই অবশ্য কেরালা রাজ্যে জস কাটুককারন-এর বিদ্যুৎচালিত প্রজেক্টরের মাধ্যমে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রেক্ষাগৃহে তামিল, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র দেখানো হলেও কেরালার সংস্কৃতির সঙ্গে তামিল ভাষা-সংস্কৃতির মিল থাকায় তামিল চলচ্চিত্র কেরালায় বেশ জনপ্রিয়তা পায়। তবে তখনো কেরালার নিজস্ব কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি। ফলে চলচ্চিত্র নির্মাণে তাদের মধ্যে একধরনের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়। যদিও এই আকাঙ্ক্ষার পূরণ এতো সহজ ছিলো না।



তারপরও সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে কেরালায় প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ভিগাদাকুমারন নামে এ নির্বাক চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন জে সি ডানিয়েল।চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত সবাই ছিলেন কেরালার। তবে শেষ পর্যন্ত ভিগাদাকুমারন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা যায়নি। এরপর এখানে নির্মাণ হয় মার্থান্ডা ভার্মা (১৯৩৩) নামে আরেকটি চলচ্চিত্র। কিন্তু সমস্যা হলো মার্থান্ডা ভার্মা কেরালায় নির্মিত হলেও এর সব কলাকুশলী ছিলো তামিল। প্রথম দুটি চলচ্চিত্র নির্বাক হলেও সবাক চলচ্চিত্রের জন্য কেরালাবাসীকে অপেক্ষা করতে হয় আরো ১০ বছর।


১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে বালান নামে সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন কেরালার নির্মাতা এস নোটাই। এর দু-বছর পর জ্ঞানাম্বিকা ও প্রহ্লাদ নামে আরো দুটি চলচ্চিত্রের মুখ দেখে এ ইন্ডাস্ট্রি। এই চলচ্চিত্রগুলোর প্রযোজক ছিলেন তামিল ব্যবসায়ী টি আর সুন্দরম। মালায়লাম বাজার দখলে তামিলরা একধরনের বিনিয়োগ কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। অবশ্য এর প্রমাণ মেলে ৪০-৫০-এর দশকে নির্মিত চলচ্চিত্রের দিকে তাকালেই। এ দুই দশকের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের নির্মাতা-প্রযোজক-পরিবেশক ছিলো তামিল ভাষাভাষী মানুষ। থেমে থেমে চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও তখনো কেরালায় কোনো চলচ্চিত্র স্টুডিও ছিলো না। কেরালা তো দূরের কথা দক্ষিণ ভারতের কোথাও কোনো চলচ্চিত্র স্টুডিও তখনো নির্মাণ হয়নি। তখন কেবল ভারতবর্ষের মাদ্রাজেই শুধু চলচ্চিত্র স্টুডিও ছিলো।


১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে কেরালার আলেপ্পি ও ত্রিবান্দ্রামে নামে দুটি চলচ্চিত্র স্টুডিও যাত্রা শুরু করে। স্টুডিও নির্মাণের ফলে স্বতন্ত্র পরিচয়ে মালায়লাম চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে। হরিশ্চন্দ্র, নাল্লাথঙ্ক, জীবিথানৌকা ছিলো সেই সময়কার চলচ্চিত্র। সেসময়ের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের গল্পই ছিলো পৌরাণিক ও লোকসাহিত্য নির্ভর। এসব চলচ্চিত্র এমনভাবে নির্মাণ করা হতো, যাতে কোনো সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত না লাগে। ৬০-এর দশকে নির্মিত চলচ্চিত্রের বেশিরভাগের গল্প ছিলো নর-নারীর প্রাক-বৈবাহিক প্রেমঘটিত সঙ্কট। অবশ্য এ পর্যন্ত প্রায় সব চলচ্চিত্রই ছিলো বাণিজ্য প্রাধান্যশীল। আর কেরালার দর্শক ছাড়া এ ইন্ডাস্ট্রির চলচ্চিত্র সম্পর্কে অন্যরা তেমন জানতোই না।


নতুনের অবগাহন


মালায়লাম চলচ্চিত্র সর্বপ্রথম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি পায় রামু কারিয়াত-এর চেম্মিন (১৯৬৫) এর মাধ্যমে। ‘চেম্মিন উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি সে বছর ভারতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। এর পর থেকে কেরালার চলচ্চিত্রে বিখ্যাত সব উপন্যাস, সাহিত্য চলচ্চিত্রাকারে নির্মিত হতে থাকে। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় পি এন মেনন-এর ওলভুম থেরওয়াম। চলচ্চিত্রটি আগে নির্মিত সব চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভ ভেঙে দেয় এবং ধরে নেওয়া হয় ৭০ দশকের শুরুতে মালায়লাম চলচ্চিত্রের যে আন্দোলন হয়, তা এর মধ্য দিয়েই শুরু হয়।


১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের শুরু থেকেই মালায়লাম চলচ্চিত্রে একটা মৌলিক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এর নির্মাণশৈলীসহ চলচ্চিত্রের ভাষায় নানা পরিবর্তন আসে। বিশ্ব চলচ্চিত্রের নিউ ওয়েভ-এর ঢেউ তখন এখানে এসেও নাড়া দেয়। এ সময় ইন্ডাস্ট্রিতে দেখা মেলে তরুণ নির্মাতাদের। যাদের কেউ কেউ পুনের ফিল্ম ইন্সটিটিউট থেকে সবে পড়াশোনা করে এসেছেন। এদের অন্যতম আদর গোপালকৃষ্ণ। অবশ্য তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের আগেই কেরালায় প্রথম চলচ্চিত্র সংগঠন ‘চলচ্চিত্র ও ফিল্ম কো-অপারেটিভ সোসাইটি ‘চিত্রলেখা প্রতিষ্ঠা করেন। তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র সুয়ামভারাম (১৯৭২) জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। এছাড়া তরুণ নির্মাতা জি অরোভিনদাম-এর উত্তরায়ানাম (১৯৭৪), কাঞ্চন সীতা (১৯৭৭), থাম্বু (১৯৭৮) এবং জন আব্রাহাম-এর বিদ্যার্থী কালি ইথাইল ইথাইল (১৯৭১), আগ্রহরাথিল কাজহুথাই (১৯৭৭) অন্যতম। এই নির্মাতারাই মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রির ভিত শক্ত করতে থাকে।



অপেক্ষাকৃত মৌলিক গল্প অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ৮০-৯০-এর দশকে এই ইন্ডাস্ট্রি একটি শক্ত জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়। এ সময়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে নিদ্রা (১৯৮১), পোস্ট মর্টেম (১৯৮২), ভিসা (১৯৮৩), চিদাম্ববরম (১৯৮৫), পিরাভি (১৯৮৮), কাথাপুরোশান (১৯৯৫), ভানাপ্রাস্থাম (১৯৯৯), শানথাম (২০০০) অন্যতম। এ দুই দশকে পাঁচটি মালায়লাম চলচ্চিত্র ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়; যেখানে টালিউড পায় সর্বোচ্চ আটটি।



একবিংশ শতাব্দীতে এসে এ ইন্ডাস্ট্রির গতি যেনো আরো বেড়ে গেছে। নানারকম থ্রিলার, মেলোড্রামা দিয়ে ভারতের অন্যান্য চলচ্চিত্রকে রীতিমতো টক্কর দিয়ে যাচ্ছে মালায়লাম। তবে তাদের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই নির্মিত হয় অপেক্ষাকৃত কম বাজেটে। কম বাজেটের চলচ্চিত্রগুলোতে নেই কোনো তারকা অভিনয়শিল্পী বা পর্দা কাঁপানো আইটেম সঙ। তবে দর্শক টানার জন্য তাদের আছে মৌলিক গল্পের সমাহার; যা চলচ্চিত্রগুলোকে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ব্যবসায়িক সফলতা এনে দিচ্ছে। ফলে এখানকার চলচ্চিত্র বলিউডসহ ভারতের অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতে হরহামেশাই পুনর্নির্মাণ হচ্ছে। এই ইন্ডাস্ট্রির সিদ্ধার্থ সিভা নির্মিত আইন ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে মালায়লাম ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়।


আইন-এর আখ্যান


আইন-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র মানু, কেরালার এক গ্রামের সহজসরল, লক্ষ্যহীন যুবক। কসাইয়ের ছোটোখাটো কাজ করা তার পেশা। আর এই কাজের বাইরে অন্য কোনো কাজে তার মন যেনো ঠিক বসে না। মানু একদিন তার এক বন্ধুর মোবাইলফোন সেটে মানুষ জবাইয়ের ভিডিও দেখে এসব বিষয়ে আগ্রহী হন। এ নিয়ে নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখলেও কোনো কিছু জবাইয়ের সঙ্গে ভিডিওর ওই দৃশ্য মেলাতে থাকেন তিনি।


এরই মধ্যে এক রাতে ঘরে ফেরার পথে মানুর সামনে একটি খুনের ঘটনা ঘটে। কিছু মানুষ একজনকে কুপিয়ে হত্যা করে। মানু সেটা দেখে ফেলেন। খুনিরাও মানুকে দেখে ফেলে। মানু তাদের তাড়া খেয়ে কোনোরকমে বাড়িতে ফিরে আসেন। পরদিন ভোরে জীবন রক্ষার্থে গ্রাম ছেড়ে তিনি শহরে পালিয়ে যান। শহরে মানুর আশ্রয় হয় মাজারের পাশের এক বৃদ্ধ দোকানি হাসানের বাড়িতে। একপর্যায়ে মানুর কাছে শহরে আসার কারণ জানতে চান হাসান ও তার বিধবা পুত্রবধূ সায়রা। মানু তাদেরকে খুনের ঘটনা সম্পর্কে বলেন। ঘটনাচক্রে মানু জানতে পারেন, হাসানের ছেলে স্থানীয় রাজনীতির শিকার, তাকে খুন করা হয়েছিলো। এবং হাসান সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গিয়েও সেই খুনের বিচার পাননি, শুধু একজন সাক্ষীর অভাবে।


মানুর সব কথা শুনে সায়রা তাকে বাড়ি ফিরে সব ঘটনা পুলিশকে জানাতে প্রভাবিত করেন। মানুও বাড়ি ফিরে আসেন; পুলিশ ও স্থানীয় সাংবাদিকদের ঘটনাটি খুলে বলেন। কিন্তু এরপরই মানু বুঝতে পারেন, এটা কোনো সাধারণ খুনের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুলিশ, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্র। ফলে বিচারপ্রার্থী মানু উল্টো খুনিদের হাতে মারধরের শিকার হন; এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও আসে। এসব ঘটনায় মানুর ভিতরের মানুষটার আমূল পরিবর্তন ঘটে। কসাইয়ের কাজে মানু আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। হত্যা, সে মানুষ-পশু যাই হোক, মানুর কাছে নতুন অর্থ তৈরি করে। ফলে প্রতিবেশীর সন্তানের আকিকায় উৎসাহ নিয়ে আর মানুকে উপস্থিত হতে দেখা যায় না। বরং জ্যোৎস্নার মায়াবী আলোয় মানু আকিকায় জবাইয়ের জন্য রাখা মহিষটি সবার অগোচরে মুক্ত করে দেন। একটি প্রাণির জীবন বাঁচিয়ে মানু যেনো অপার শান্তির খোঁজ পান।


হত্যার বিচারহীনতা এবং


আইন-এর এক ঘণ্টা নয় মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে ভারতে বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ডের বয়ান শোনা যায়, সায়রার শ্বশুরের মুখে। তার ভাষায়, ‘১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে রাধাকৃঞ্চ হত্যাকাণ্ডে আজ পর্যন্ত অপরাধীরা শাস্তি পায়নি। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে রমেশ সাথিয়ান হত্যা মামলার সঠিক প্রমাণের অভাবে অপরাধীরা মুক্ত। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে সিথালাভি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত আজও চলছে। এ রকম বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে স্থান-কাল ভেদে। সায়রার শ্বশুরের বক্তব্যের বাস্তবতা বিদ্যমান বর্তমান ভারতে, বাংলাদেশে, আরো অনেক দেশে। ভারতে প্রতিবছরই অসংখ্য হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বললেই চলে। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গালুরুতে সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশকে হত্যা করা হয়। গৌরী হিন্দুত্ববাদ নিয়ে নিয়মিত প্রশ্ন তুলতেন। এর আগে ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রে কমিউনিস্ট বিধায়ক ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সক্রিয় গোবিন্দ পানসারেকে হত্যা করা হয়। একই বছর আগস্টে হত্যা করা হয় দক্ষিণপন্থিদের বিরুদ্ধে সরব লেখক ও যুক্তিবাদী নেতা এম এম কুলবর্গীকে।১০ এছাড়া ভারতে রয়েছে ‘গো-রক্ষার্থে মানুষ হত্যার মতো রাজনীতি। যেটা সবকিছুকে ছাপিয়ে বর্তমান ভারতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কেননা, গো-রক্ষার নাম করে শুধু ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত মোট একশো ৩৭টি হামলার ঘটনা ঘটে, যাতে নিহত হয়েছে ২৯ জন, যাদের ৭৫ শতাংশ মুসলমান ও ১২ শতাংশ দলিত শ্রেণির।১১


অবশ্য ‘গো-রক্ষা নিয়ে রাজনীতি সাম্প্রতিক কোনো বিষয় নয়। বহু বছর আগে থেকেই এ উপমহাদেশের রাজনীতিতে বড়ো প্রভাব বিস্তারকারী প্রাণির নাম গরু। ভারত, বাংলাদেশ, নেপালসহ অনেক দেশে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অনুঘটক হিসেবে অসংখ্যবার গরু ব্যবহৃত হয়েছে।১২ ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ব্রিটিশবিরোধী সিপাহি বিদ্রোহে কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহার করে হিন্দু-মুসলমানকে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের অনুসারীরা গো-হত্যাকে নিষিদ্ধ হিসেবে জানে। অন্যদিকে মুসলমানরা গরু কোরবানিকে তাদের ধর্মের পুণ্যাংশ হিসেবে মানে। সে হিসেবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা গরুকে যে দৃষ্টিতে দেখে; মুসলমানরা সেভাবে দেখে না।


ভারতে ‘গো-রক্ষার্থে এসব হত্যা-হামলা-বিশৃঙ্খলা আরো তীব্রভাবে শুরু হয় ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে বি জে পি (ভারতীয় জনতা পার্টি) ক্ষমতায় আসার পর থেকে। গরু নিয়ে হত্যাকাণ্ডের এ রকম পরিস্থিতিতে ভারত সরকার বিচারের কোনো কথা না বলে উল্টো আরো কঠোর নতুন আইন করে। নতুন আইনে গরু জবাইয়ের দায়ে সাত বছরের স্থলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া জরিমানা ধার্য করা হয় এক লাখ টাকা পর্যন্ত। গরুর মাংস পাচার, সরবরাহে ব্যবহৃত গাড়িও বাজেয়াপ্ত হবে বলে আইনে বলা হয়।১৩ অবশ্য আইনটি উচ্চ আদালতে স্থগিত হয়ে আছে। তবে আইন স্থগিত থাকলেও সহিংসতা কিন্তু থেমে নেই, বরং বেড়েই চলেছে।


শুধু তাই নয়, ভারতে ‘গো-রক্ষার্থে রয়েছে সরকার সমর্থিত বেশকিছু সংগঠন-রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আর এস এস), বিজরং দল এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। রাষ্ট্র ও আইন একতরফাভাবে স্ব-ঘোষিত ‘গো-রক্ষকদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদেরকে ‘গো-রক্ষায় পরিচয়পত্রও দিচ্ছে। এমনকি পুলিশ-প্রশাসনও সাহায্য করছে তাদের।১৪ অথচ যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িতরা ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে পেহেলু খান নামে এক মুসলিমকে গরু বহনের সময় হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ রকম অসংখ্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও চলচ্চিত্রের হাসান, সায়রার মতোই বিচার পায় না বেশিরভাগ পরিবার। দিনশেষে বিচারহীনতার সংস্কৃতির ইতিহাস দীর্ঘ হতে থাকে।


ভারতে গো-হত্যা বন্ধে সরকার এমনই নীতি গ্রহণ করেছে যে, ‘গো-রক্ষার নামে মানুষ হত্যাকাণ্ডগুলো একরকম জায়েজ হয়ে গেছে। রাষ্ট্রের এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকার প্রধানেরও তেমন জোরালো বক্তব্য পাওয়া যায় না। দায়সারাভাবে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘গো-রক্ষার নাম করে মানুষ হত্যা গ্রহণযোগ্য নয়। এ বক্তব্যের ঘণ্টাখানেক পরেই যখন গরুর মাংস বহনের জন্য ঝাড়খণ্ডে এক মুসলিমকে হত্যা করা হয়;১৫ তখনই বোঝা যায়, প্রতাপশালী এ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কতোটা প্রতাপ ছিলো!


তাহলে কি মানুষের চেয়ে গরুই বড়ো? প্রশ্নটি মোটেও অস্বাভাবিক নয়! কেননা, ভারত সরকার এ মুহূর্তে প্রাণী রক্ষার্থে বেশ তৎপর। প্রাণী বলতে অবশ্য সব প্রাণী নয়, শুধু গরু। তারা গরুর পরিচয়পত্র করছে! রাজস্থানে গরুর জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় খোলা হয়েছে। আর দিল্লিতে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে গরুর গোয়ালে বিদ্যুৎ বিলের ভর্তুকি দেওয়ার।১৬ ভারতজুড়ে যখন গরু নিয়ে এ রকম কাণ্ড চলছে, ঠিক সেখানে সরকারিভাবে রপ্তানি জোন তৈরি করে বিশাল ব্যবসা করা হচ্ছে গরুর মাংসের। এক পরিসংখ্যানে পাওয়া যায়, গোটা পৃথিবীতে গরুর মাংসের ১৬ শতাংশই ভারত থেকে রপ্তানি করা হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার একটি সমীক্ষা বলছে, ‘গরুর মাংস সরবরাহকারী দেশের তালিকায় ভারত তিন নম্বরে। পরিসংখ্যানে ব্রাজিল প্রথম ও অস্ট্রেলিয়া রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে।১৭


এমনকি ‘গো-রক্ষায় তৎপর রাষ্ট্রের ৩০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।১৮ অনেক রাজ্যের মানুষ তিনবেলা খেতে পর্যন্ত পায় না। রাজ্যে রাজ্যে কৃষকরা আত্মহত্যা করছে। অনেক মানুষের স্থায়ীভাবে থাকার ঘর পর্যন্ত নেই! তবে গল্পের শেষ এখানেই নয়-গরু জবাইয়ের দায়ে যেখানে একজনকে পাঁচ থেকে ১৪ বছরের সাজা দেয় ভারতের আদালত; অথচ বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যার শাস্তি সেখানে মাত্র দুই বছর!১৯


রাষ্ট্র হিসেবে ভারতে যখন গরু নিয়ে এই রাজনীতি চলছে; তখন পৃথিবীজুড়েই চলছে নানা ইস্যু নিয়ে হরেক রকম রাজনীতি। বাংলাদেশের ‘ক্রসফায়ার-এর কথাই যদি বলা হয়। এদেশে বিচারবহির্ভূত এ হত্যাকাণ্ড শুরু করেছিলো জনগণের মঙ্গলের ধুয়া তুলে। সময়ের সঙ্গে জনগণের এই মঙ্গল জনগণের জন্য এতোটাই নির্মম হয়ে ধরা দিয়েছে যে, শুধু ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি-অক্টোবর পর্যন্ত র‌্যাব, পুলিশ ও যৌথবাহিনীর ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে একশো সাতজন।২০ এখানে রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের কথা হলো, তারা অপরাধী। কিন্তু কথা হলো, অপরাধী হলেই কি বিচারবহির্ভূত কাউকে হত্যার অধিকার রাষ্ট্রের আছে?


আইন-এর এক ঘণ্টা ১৮ মিনিটে সায়রা ও মানুকে ঘরের চালা ঠিক করতে দেখা যায়। মানুর চোখে তখন কিছু একটা পড়লে, সায়রা বলে উঠেন, ‘তোমার চোখ থাকার দরকার আছে? যদি তোমার চোখ থাকতো, তুমি তো সাক্ষ্য দিতে। এভাবে প্রতিদিনই নানারকম কথায় ও কাজে মানুকে সাক্ষ্য দিতে প্রভাবিত করতে থাকেন সায়রা। এরপর একদিন সংবাদপত্র দেখিয়ে মানুকে সায়রা বলেন, তোমার এলাকার সেই হত্যাকাণ্ডের খুনিরা শনাক্ত হয়েছে। পত্রিকায় তাদের ছবি দেখে মানু অবাক হন, কারণ সেই ছবি মানুর দেখা খুনিদের নয়। মানু অবাক হলেও এ ঘটনায় সায়রাকে অবাক হতে দেখা যায় না। সায়রা যেনো জানতেনই এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের বিচার এ রকমই হয়। সায়রা তারপরও মানুকে বোঝাতে থাকেন, কারণ তিনিই এই খুনের একমাত্র সাক্ষী। আর তার সাক্ষ্য ছাড়া নিরপরাধ মানুষগুলো ফেঁসে যাবে। এভাবে চলচ্চিত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে যেমন তুলে ধরা হয়েছে, তেমনই উঠে এসেছে বিচারপ্রক্রিয়ার নোংরা রাজনীতিও।


আইন-এ এক ঘণ্টা ২০ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে মানুকে সায়রা বলেন, নিরপরাধ মানুষকে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হলো প্রকৃত খুনিদের স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানো। তখন মানু বলে উঠেন, ‘তারা (হত্যাকারীরা) সব মানুষকে তো হত্যা করে না। তিনি (হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি) অবশ্যই কোনো ভুল কিছু করেছেন। বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের পর পরই যেকোনো ব্যক্তি সম্পর্কেই এ রকম বক্তব্য পাওয়া যায়। ভারতে হয়তো সেটা গো-রক্ষায় মুসলমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে, আর বাংলাদেশে ‘ক্রসফায়ার কিংবা অন্য কোনো হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে। আর এভাবে একসময় দেখা যায়, খুন হওয়া ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি খুঁজে সেই হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করা হয়।


আইন-এর তো পুরস্কার পাওয়ারই কথা


মুসলমান মানু পশু জবাইয়ের কাজ পছন্দ করেন। তাই তিনি কসাইয়ের কাজ কিংবা প্রতিবেশীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এ ধরনের কাজে অতি উৎসাহে যান। একদিন মানুর এক বন্ধু তাকে মোবাইলফোন সেটে জঙ্গিদের হাতে মানুষ জবাইয়ের দৃশ্য দেখান। এই ভিডিও দেখার পর মানু ঠিক তা মেনেও নিতে পারেন না, আবার ভুলতেও পারেন না। তবে উপভোগ করেন। মানু নিয়মিতভাবে এসব বিষয় নিয়ে রাতে দুঃস্বপ্নও দেখতে থাকেন। ভিডিওটির সঙ্গে কখনো কখনো তিনি বাস্তবের পশু জবাইয়ের দৃশ্য মিলিয়ে ফেললেও তা তাকে খুব বেশি তাড়িত করে না। কেননা, তিনি পশু জবাই থেকে দূরে থাকতে পারেন না, থাকার চেষ্টাও করেন না। তাছাড়া মুসলমান মানুর হালাল পশু জবাইয়ের বাইরে যাওয়ার তেমন সুযোগও নেই। কারণ ইসলামি শরিয়া মোতাবেক মানুষ হত্যার বদলে হত্যা, চুরির দায়ে হাতকাটা, পাথর ছুঁড়ে মানুষ হত্যার মতো নানা বিধান রয়েছে। তারা এটাকে পবিত্র কাজ বলেই মনে করে। আর পৃথিবীজুড়ে ইসলাম ধর্ম রক্ষায় যে জিহাদ চলছে, মুসলমান হিসেবে সেটা সমর্থনেরও একটা ধর্মীয় বাস্তবতা আছে।


আইন-এর ৫১ মিনিট ১৩ সেকেন্ডে কিছু মানুষ অন্য একজনকে এলোপাথারি কুপিয়ে হত্যা করে। মানু এই নির্মম হত্যাকাণ্ডটি দেখে ফেলেন। একপর্যায়ে এর বিচারের জন্য মানু পুলিশকে জানালে অপরাধীরা তো ধরা পড়েই না, উল্টো মানু মারধরের শিকার হন। নানা দিক বিবেচনায় মানুর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং পশু জবাইয়ের মতো (আকিকার জন্য ইসলাম ধর্ম অনুসারে পশু কোরবানি দিতে হয়) ধর্মীয় ‘হত্যাকাণ্ড আর পবিত্র থাকে না। তিনি এর বিরুদ্ধে দাঁড়ান। কিন্তু প্রকাশ্যে সেই প্রতিবাদের ক্ষমতা তার নেই। রাতের আঁধারে মানুকে তাই আকিকার জন্য রাখা মহিষ ছেড়ে দিতে দেখা যায়। এর মধ্য দিয়ে ইসলাম ধর্মকে প্রশ্নের মুখে ফেলেন নির্মাতা।


নির্মাতা সিদ্ধার্থ এমন একসময় এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন যখন ভারতজুড়ে গো-হত্যা বন্ধে আন্দোলন চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্যগুলোতে গো-হত্যা বন্ধে কড়াকড়ি বাড়ছে। আর এ সময়ে ‘গো-রক্ষার ধুয়া তুলে মুসলমানদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। এ হত্যা বন্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো ‘গো-রক্ষাকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্র। ঠিক এ রকম পরিস্থিতিতে আইন ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। কিন্তু যে রাষ্ট্র এই পুরস্কার দিচ্ছে, সেই রাষ্ট্রে পশু হত্যার প্রতিবাদ চলছে মানুষ হত্যার মধ্য দিয়ে!


ভালো মুসলমানদের কাছে রাষ্ট্র থাকে নিরাপদ


চলচ্চিত্রের শুরুতে মানুকে দেখা যায়, মহিষের হাটে একটি গাছে রশি বাঁধতে। এমন সময় হঠাৎ আবহে ভেসে আসে আযানের সুর। মানু কাজ বন্ধ করে নামাজে যেতে উদ্যত হন। পিছন থেকে একজন মাঝপথে কাজ ফেলে না যাওয়ার জন্য মানুকে অনুরোধ করে। মানু সে দিকে সাড়া না দিয়ে চলে যান নামাজ পড়তে। তিনি অজু করে নামাজের জন্য পরিষ্কার সাদা কাপড় পরেন। আইন-এ মানুর এ রকম নামাজ পড়ার দৃশ্যের দেখা মেলে নয় মিনিট, ৩৮ মিনিট ও এক ঘণ্টা ছয় মিনিটে। এমনকি এক ঘণ্টা ১৮ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে সায়রার নামাজ পড়ার দৃশ্যও দেখানো হয়। খালি গায়ে নামাজ পড়ার বিধান ইসলাম ধর্মে না থাকলেও মানুকে দুবার খালি গায়েও নামাজ পড়তে দেখা যায়।


আইন-এ দেখা যায়, কসাইয়ের কাজ করা মানু গ্রামের যেকোনো অনুষ্ঠানে মহিষ-মুরগি জবাইয়ে খুবই আগ্রহী। এই কাজে তার পছন্দের মাত্রা এমন পর্যায়ে যে, চলচ্চিত্রের ৩০ মিনিট ১০ সেকেন্ডে দেখা যায়, ব্যাংকের বুথে দায়িত্বরত মানু মুরগি জবাইয়ের জন্য বন্ধুর সঙ্গে চলে যান। এছাড়া নানা সময়ে তাকে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে আকিকা, খাবার অনুষ্ঠানে অতি উৎসাহের সঙ্গে যেতেও দেখা যায়।


এদিকে চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা সাত মিনিটে মানু বৃদ্ধ হাসানকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি সুন্নি নাকি মুজাহিদ?’ হাসান অনেকটা সহজভাবে উত্তর দেন, ‘সুন্নি, মুজাহিদ কী? সবাই আল্লাহর সৃষ্টি, তাই না?’ এছাড়া শেষ দৃশ্যে মহিষ ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের শরিয়া মানুকে দিয়ে ভঙ্গ করান নির্মাতা। হাসান-সায়রা ও মানুর ধর্ম বিশ্বাসেও পার্থক্য দেখান। এভাবে নির্মাতা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের রাষ্ট্র ভারতে ইসলাম ধর্মের বিভাজনকে চিহ্নিত করেন মানু-সায়রা-হাসানকে দিয়ে। দর্শক মনে তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, মুসলমানের এ অবস্থা কেনো কিংবা আসল/ভালো মুসলমানইবা কে?


আইন-এ মানু নানাভাবে প্রভাবিত হন সায়রার দ্বারা। গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা অচেনা-অজানা একজন পুরুষ, যে কিনা একটি হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী, তাকে নিঃসঙ্কোচে আশ্রয় দেন সায়রা। তিনি সংসার চালানোর জন্য শিক্ষকতা করেন। শ্বশুরের সেবা যত্নের পাশাপাশি সায়রা হাসপাতালের কয়েকজন রোগীর জন্য খাবারও পাঠান। ইবাদতেও তার একনিষ্ঠতা দেখা যায়। এভাবেই সায়রাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয় একজন ‘ভালো মুসলমান হিসেবে। তাই হয়তো সায়রার আচরণ ও কর্মকাণ্ডে মানুও প্রভাবিত হন।


আইন-এর এক ঘণ্টা ২৪ মিনিট ১০ সেকেন্ডে এক সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে মানুকে কিছু একটা ভাবতে দেখা যায়। সায়রা জানতে চাইলে মানু বলেন, আমি আপনার মৃত স্বামীর কথা ভাবছি। সায়রা বলেন, ‘মৃতদের নিয়ে ভাবলে আর কোনো কাজ করাই হবে না। বরং যারা বেঁচে আছে তাদের নিয়েই ভাবতে হবে। আমি যেমন আমার শ্বশুর, শিক্ষার্থী, হাসপাতালের মানুষগুলোকে নিয়ে ভাবি। তুমি তোমার দাদা, মা, বোনকে নিয়ে ভাববে। এ পর্যায়ে চাঁদের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে মানুকে উদ্দেশ করে সায়রাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি যখন কোনো ভালো কাজ করে চাঁদের দিকে তাকাই, সেখানে আমি ফেরেশতা দেখতে পাই।


মানু এভাবেই সায়রার নানা কথা, কাজে প্রভাবিত হয়ে বাড়ি ফেরেন। তবে মানু পুলিশ-প্রশাসনের কাছে খুনের ঘটনা বলার পরও বিচার পান না। বরং উল্টো খুনিদের হাতে মারধরের শিকার হন। মানুর ওপর হুমকি-ধামকি আসে; খুনিরাও দেদার ঘুরে বেড়ায়। এই অবস্থায় মানুও বুঝে যান, এ হত্যাকাণ্ডের বিচার আর হবে না।


এই যখন পরিস্থিতি, ঠিক তখন মানুর কাছে এক আকিকা অনুষ্ঠানে যাওয়ার ডাক আসে। কিন্তু একসময়ের চঞ্চল মানু সে ডাকে আর সাড়া দেন না। কেননা ততোদিনে মানুর চিন্তা-চেতনা-মননে পরিবর্তন এসেছে। মানুর কাছে তখন মানুষ আর পশু হত্যার মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা বিলীন হয়ে গেছে। তার কাছে তখন জীবন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই তো আইন-এর এক ঘণ্টা ৫১ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে দেখা যায়, একাকী মানু ভরা পূর্ণিমায় হাজির হয়েছেন সেই আকিকা বাড়ির আঙ্গিনায়। একটি মহিষ বাঁধা। নিস্তব্ধ চারপাশ, আবহে কেবল শিশুর কান্নার শব্দ। মানু মহিষটির দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকান। সেই তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে আবহে বেজে ওঠে বাঁশির মায়াবী সুর। এমন আবহে জবাইয়ের জন্য রাখা মহিষটি ছেড়ে দেন মানু; বলে ওঠেন, যা যা, দূরে চলে যা। এরপর চরম প্রশান্তি নিয়ে তাকান ভরা পূর্ণিমার চাঁদের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণিমার আলোও মেঘ কেটে আলোকিত হয় মানুর মুখমণ্ডলসহ চারপাশ। মানুও যেনো অন্য এক নতুন জগতে প্রবেশ করেন। এ যেনো এক ভিন্ন মানু, যার কাছে পশুর জীবন আর মানুষের জীবন একাকার হয়ে গেছে। ব্যক্তিমানুষ বিচারে মানুর এ পরিবর্তন তাকে নতুন মহিমায় দর্শকের কাছে হাজির করে। মানুও তার কাজকে ‘ভালো মনে করে চাঁদের দিকে তাকান। সায়রার কথামতো মানু চাঁদে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ‘ফেরেশতা গোছের কিছু দেখতে পান। 


অবশ্য মহিষ ছেড়ে দেওয়ার আগে আইন-এর এক ঘণ্টা ৪৭ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে একটি স্বপ্ন দেখেন মানু। মানু এর আগে স্বপ্নে বার বার যে পাহাড়ের উপর নিজেকে দেখেন, সেই পাহাড়েই ঝুলে আছেন তিনি। প্রাণরক্ষার জন্য ছটফট করছেন আর পাহাড়ের উপর থেকে ভেসে আসছে এক পুরুষ কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠ মানুকে জিজ্ঞাসা করে, তিনি যে খুনের ঘটনাটি দেখেছেন, তা সত্য কি না? মানু জবাবে বলেন, আমি ঘটনাটি নিজের চোখে দেখেছি। গায়েবি সেই কণ্ঠটি জিজ্ঞাসা করে, তুমি কী দেখেছো? খুনের ঘটনার বিবরণে মানু এবার পশু জবাইয়ের বর্ণনা করতে থাকেন-‘মঞ্জুর প্রথমে পা বাঁধে ও শক্ত করে টানা দেয়। মহিষটি মাটিতে পড়ে যায়। এরপর ফিরোজ আর জালাল মহিষটির উপর উঠে বসে এর শিঙ ধরে। তারপর ওস্তাদ এসে মহিষের মাথা কাটে। সবাই এগুলো বাড়ি নিয়ে যায় এবং খায়। এই স্বপ্ন দিয়েই নির্মাতা শেষমেষ পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন, আত্মশুদ্ধি হওয়া একজন মানুষের কাছে মানুষ হত্যা আর পশু হত্যার কোনো পার্থক্য নাই। নির্মাতা মানুকে দিয়ে মহিষ মুক্ত করার মধ্য দিয়ে তার যে পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, তা মানুকে ভারত রাষ্ট্রের একজন ‘ভালো মুসলমান হিসেবে পর্দায় হাজির করে।


চলচ্চিত্রজুড়ে মানুর পরিবর্তন, স্বপ্ন দেখা এবং তারপর আকিকার জন্য রাখা মহিষ ছেড়ে দেওয়াটা বাস্তবে রাষ্ট্রও চায়। তারা চায় সবাই মানুদের মতো ‘ভালো মুসলমান হয়ে উঠুক, সবার পরিবর্তন হোক। যারা রাষ্ট্রের ইচ্ছায় নিজ ধর্মকে, বিশ্বাসকে ‘অপবিত্র মনে করে ‘গো-রক্ষায় শামিল হবে। আর এ প্রচারণায় নির্মাতাও স্পষ্টভাবে জড়িয়ে পড়েছেন।


আসলে ‘ভালো আর ‘খারাপ মুসলমানের প্রশ্নটি এখন গোটা পৃথিবীতেই ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষ করে ৯/১১-এর পর মুসলমানকে এই দুই ক্যাটাগরিতে ট্যাগ লাগানো হয়।২১ মার্কিন মুল্লুকের নির্দেশনা অনুযায়ী যারাই চলেন, তারাই পেয়ে যান ‘ভালো মুসলমানের সার্টিফিকেট। আর ওই মুল্লুকের বিরুদ্ধে অবস্থান মানেই ‘খারাপ মুসলমান। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের রাষ্ট্র ভারতেও মুসলমানদের সেই একই অবস্থা। এখানেও যারা ভারত রাষ্ট্রের সুরে গো-রক্ষা করবে, এর প্রতিবাদ জানাবে-তারাই ভালো মুসলমান। একই সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠের এই হিন্দু রাষ্ট্রের কাছে ভালো মুসলমানরা/মানুরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এই মানুদের ব্যবহার করেই ফ্রিজের মধ্যে গো-মাংস রাখার দায়ে কোনো মুসলিম/মানুষকে হত্যা করানো যায়। এবং তাদের সমর্থনেই তা জায়েজও হয়। নির্মাতা সিদ্ধার্থ সিভা সেই বিষয়টি অত্যন্ত ‘সচেতনভাবেআইন-এ তুলে ধরেছেন।


তবুও বলতে হয় ...


চলচ্চিত্র মানেই একটা গল্প একরৈখিকভাবে বলে যাওয়া নয়; বরং তার চেয়ে বেশি কিছু। আর এজন্য চলচ্চিত্রের কাহিনি উপস্থাপনে নির্মাতাকে বহু টেকনিকের আশ্রয় নিতে হয়। নানারকম শট্, মোটিফ, ন্যারেটিভের সঠিক উপস্থাপন, ইমেজের ঠিকমতো প্রয়োগ করে সম্পাদনা পর্যন্ত নির্মাতাকে থাকতে হয় সজাগ। আর এসব বিষয়ে সজাগ থাকলে একটি সাদামাটা গল্পেও উপস্থাপনের গুণে দুর্দান্ত হয়ে উঠতে পারে। সিদ্ধার্থ সিভার আইন-এর উপস্থাপনও অনেকটা সেরকমই। বলা চলে তিনিও একটি সাদামাটা কাহিনিকে উপস্থাপনের মাধ্যমে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। তার প্রমাণ মিলে চলচ্চিত্রজুড়েই।


আইন-এর শুরুতে নির্মাতা বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের শটের মাধ্যমে গাছের ডাল ও গোঁড়ায় বাঁধা এলোমেলো কয়েকটি রশি দেখান। রশিগুলো দেখে মনে হয়, কারো ফাঁসির জন্য তৈরি হচ্ছে হয়তো। এরপর ধীরে ধীরে পর্দায় ভেসে আসে মাটিতে পুঁতে রাখা লোহা ও বাঁশের ছোটো ছোটো খুঁটি। এ শট্ যেতে না যেতেই পর্দায় দেখা মেলে গোবর ও মাছের মাথা। এর সঙ্গে সঙ্গে বাজে দারুণ আবহসঙ্গীতও। তখন অবশ্য দর্শকের বুঝতে কষ্ট হয় না, এটা কোনো গরু-মহিষের হাট। হাট দেখানোর জন্য নির্মাতা যে মিড-ক্লোজ-টপ শটের ব্যবহার দেখিয়েছেন, তা চলচ্চিত্রের দুর্দান্ত এক আবহ তৈরিতে সহায়তা করে। আর এর মধ্য দিয়েই চলচ্চিত্রটি গতিশীল হয়।


ক্যামেরার দক্ষ শটের হদিস মেলে চলচ্চিত্রের ২৭ মিনিটেও। সেখানে দেখা যায়, মানু পাহাড়ঘেরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। পিছন থেকে ব্যাংকার টাকা নেওয়ার জন্য ডাকছেন। এখানে মানুর পিছন থেকে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল শটে পাহাড়ঘেরা আকাশ দেখানোর পর লঙ ও টপ শটের সমন্বয়ে আকাশের বিশালতার সঙ্গে সঙ্গে মানুর স্বপ্নও দারুণভাবে ফুটে ওঠে। এখানে নানারকম শটের মিশ্রণে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও মানুকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন নির্মাতা।


এছাড়া ৩৯ মিনিট ১২ সেকেন্ডে টপ শটে মানুর আরেকটি স্বপ্ন দেখান নির্মাতা। খুনের ঘটনা দেখার পর মানু যখন বাঁচার জন্য দৌড়ান তখন ক্যামেরাও তার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যায়। ক্যামেরা একবার মানুর দিকে আরেকবার খুনিদের দিকে ধরা হয়। ক্যামেরার এ রকম নড়াচড়ায় চলচ্চিত্রে টান টান উত্তেজনা দর্শককে শিহরিত করে। আবার শহরে গিয়ে মানুর লক্ষ্যহীনভাবে হাঁটার সময় ক্লোজ ও লঙ শটের মাধ্যমে মানুর অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। এ ধরনের চলচ্চিত্রিক ভাষার ব্যবহার নির্মাতা পুরো চলচ্চিত্রেই দেখিয়েছেন।


মানু ব্যাংকের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কাউকে না জানিয়েই ইউনিফর্ম পরে মুরগি জবাইয়ের জন্য চলে যান। নিজের অজান্তেই মানুর ইউনিফর্মে রক্তের দাগ লাগে। ঠিক এ মুহূর্তে মানুর এক বন্ধু বলে উঠেন, হায় মানু তুমি ইউনিফর্ম পরে মুরগি জবাই করছো? মানুর তখন খেয়াল হয়, তিনি ইউনিফর্ম পরে আছেন। মানুর পরা ইউনিফর্ম ওয়াচম্যানের ইউনিফর্ম হলেও কোনো প্রতিষ্ঠানের ইউনিফর্ম আসলে কোনো না কোনোভাবে প্রশাসনের প্রতীক। ইউনিফর্মে রক্তের দাগ মানে প্রশাসনের গায়ে রক্তের দাগ। প্রাণিহত্যা করলে রাষ্ট্রের গায়ে, প্রশাসনের গায়ে রক্তের দাগ লাগে; কিন্তু মানুষ হত্যা করলে তা হয় না। আইন-এ নির্মাতা দারুণভাবে এ বিষয়টি তুলে ধরেছেন; যা দর্শককে হয়তো ভাবিয়ে তোলে।


আইন-এ বিভিন্ন সময় নির্মাতা নানা আকৃতির চাঁদ দেখিয়েছেন। শুক্ল পক্ষের প্রথম চাঁদ দেখানোর পর চলচ্চিত্রটি শেষ হয় পূর্ণিমার বড়ো চাঁদ দেখানোর মধ্য দিয়ে। আক্ষরিক অর্থে ১৫ দিনকে নির্দেশ করে। তবে চলচ্চিত্রটির ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যায়, এটি মাত্র ১৫ দিনের ঘটনা নয়, অর্থাৎ এখানে চাঁদকে রূপক অর্থে হাজির করা হয়েছে। মূলত চলচ্চিত্রজুড়ে চাঁদ মোটিফ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এভাবে বার বার বিভিন্ন আকৃতির চাঁদ দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে নির্মাতা মানুর চরিত্রের দারুণ একেকটি পট পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। যেনো চাঁদের পরির্বতনের সঙ্গে সঙ্গে মানুর জীবন-দর্শনও পরিবর্তন হয়। আর সেটার পরিপূর্ণতা পায় চলচ্চিত্রের একেবারে শেষে পূর্ণিমার আলোকিত চাঁদ দেখানোর মাধ্যমে। যেনো মানু তখন একজন পরিপূর্ণ ‘মানুষ হয়ে ওঠেন।


অবশ্য হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, মানু হলো মানব জাতির প্রথম মানুষ। আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, ক্ষত্রিয়দের চতুর্দশ রহস্যময় শাসকের নাম মানু। আরেক পুরাণে বলা হয়েছে, মানু হচ্ছে আধ্যাত্মিক পুত্র ব্রহ্ম। চলচ্চিত্রজুড়ে মানুর যে উপস্থাপন, তাতে মনে হয় মানু হয়তো মানুষই ছিলো না। শেষ দৃশ্যে আকিকার জন্য রাখা মহিষ ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ‘মানুষ হয়ে ওঠেন মানু!

 

লেখক : শফিকুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি অনলাইন সংবাদপত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।


[email protected]

 

তথ্যসূত্র


1. http://www.bhorerkagoj.net/print-edition/2016/04/09/83677.php; retrieved on: 08.03.2018

2. https://bengali.mapsofindia.com/kerala/; retrieved on: 08.03. 2018

3. http://archive.li/eTGsR; retrieved on: 08.03.2018

4. https://www.bbc.com/bengali/news/2016/07/160718_india_kerala_beef_love; retrieved on: 12.04.2018

5. http://cinema-malayalam.tripod.com/id26.html; retrieved on: 10.03.2018

6. http://www.chintha.com/keralam/malayalam-cinema-history.html; retrieved on: 11.03.2018

৭. বন্দ্যোপাধ্যায়, সূর্য (২০০৯ : ৪০৫); ‘দক্ষিণ ভারতের ছবি : ক্রমবিকাশের চিত্র; শতবর্ষে চলচ্চিত্র দ্বিতীয় খণ্ড; সম্পাদনা : নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লি., ভারত।

8. http://www.chintha.com/keralam/malayalam-cinema-history.html; retrieved on: 16.03.2018

9. https://www.bbc.com/bengali/news-41168506; retrieved on: 14.03.2018

10. https://www.bbc.com/bengali/news-41170818; retrieved on: 14.03.2018

11. http://archive.li/jUAqZ; retrieved on: 14.03.2018

12. http://www.shaptahik.com/v2/print_publication/index.php?DetailsId=10861; retrieved on: 28.03.2018

13. http://www.kalerkantho.com/home/printnews/481164/2017-03-31; retrieved on: 08.04.2018

14. http://archive.li/jUAqZ; retrieved on: 14.03.2018

15. http://archive.li/zJKTt; retrieved on: 14.03.2018

16. http://www.bd-pratidin.com/mixter/2017/09/16/264555; retrieved on: 24.03.2018

17. http://www.kalerkantho.com/online/miscellaneous/2017/07/29/525319; retrieved on: 10.04.2018

18. http://old.dhakatimes24.com/2015/02/04/52681; retrieved on: 24.03.2018

19. http://archive.li/QDorX; retrieved on: 22.03.2018

20. http://archive.li/Ro5Ro; retrieved on: 22.03.2018

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন