Magic Lanthon

               

মাহামুদ সেতু

প্রকাশিত ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

প্রসঙ্গ ডুব

শিল্পনির্দেশনা নিয়ে সচেতন কিন্তু অমনোযোগী ফারুকী

মাহামুদ সেতু


শিল্পনির্দেশনার সাতসতেরো


দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যম চলচ্চিত্রে ভিজ্যুয়ালাইজেশন বা চিত্ররূপ দেওয়াটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আসলে চলচ্চিত্রে চিত্রটাই তো মুখ্য। শুরুর দিকে চলচ্চিত্র যখন নির্বাক ছিলো, তখন গল্প বলা হতো চিত্র দেখিয়েই। পরে সময়ের প্রয়োজনে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে এতে যুক্ত হয় শব্দ। তবে চলচ্চিত্র সবাক হলেও চার্লি চ্যাপলিনের মতো অনেক নির্মাতাই শুরুতে এর পক্ষে ছিলো না। তারা পর্দায় শুধু সচল চিত্র দিয়েই মানুষকে গল্প বলতে চেয়েছে। ঠিক এ জায়গাতেই চলচ্চিত্রে শিল্পনির্দেশনার গুরুত্বটা সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়।


রুপালি পর্দায় দর্শক যা দেখে, তার সঙ্গে শিল্পনির্দেশনার খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। নির্মাতা তার ভাবনাকে কতোটা শৈল্পিকভাবে পর্দায় তুলে ধরতে পারছে, সেটা শিল্পনির্দেশনায় সফলতার ওপর নির্ভর করে। পর্দায় যা কিছু দেখানো হয়, তার প্রতিটি অংশেই শিল্পনির্দেশকের ছোঁয়া থাকে। অভিনয়শিল্পীদের পোশাক-পরিচ্ছদ, পায়ের জুতা থেকে মাথার চুলের শৈলী; বাড়িঘর, আসবাবপত্র এমন কিছু নেই যা শিল্পনির্দেশনার বাইরে।


সাধারণত চলচ্চিত্রের শুরুতেই নির্মাতা শিল্পনির্দেশককে পুরো গল্পের একটা স্ক্রিপ্ট দেন। সেটা পড়ে বা দেখে নির্দেশক তার দলের সঙ্গে বসে পরিকল্পনা করে। তারপর নির্মাতা, সিনেমাটোগ্রাফার ও শিল্পনির্দেশক মিলে আলোচনা হয়। চলচ্চিত্রটির সেট কেমন হওয়া উচিত, কী ধরনের রঙ ব্যবহার হবে, সবকিছুই ধীরে ধীরে নির্ধারণ করা হয়। এরপর শিল্পনির্দেশকের দল গল্পের প্রয়োজন অনুসারে সেট বানায়, কস্টিউম, প্রপস জোগাড় করে। এসব করার ক্ষেত্রে তাদেরকে চরিত্রের পেশা, শিক্ষা, সামাজিক অবস্থান-নানা বিষয় মাথায় রাখতে হয়। এতো কিছুর সমন্বয়েই সব শেষে কোনো গল্পকে চলচ্চিত্রের পর্দায় আকর্ষণীয় ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেখা যায়।


সেদিক থেকে বিবেচনা করলে গোটা চলচ্চিত্রের গ্রহণযোগ্যতা অনেকখানিই শিল্পনির্দেশনার ওপর নির্ভর করে। শিল্পনির্দেশক ব্যর্থ হলে চলচ্চিত্রটি পর্দায় দেখা যায় ঠিকই, তবে তা দর্শকের মনে আঁচড় কাটতে পারে না। কারণ দর্শক-মনে চলে সত্য-মিথ্যার এক বিশাল দ্বন্দ্ব। যদি কোনো রিকশাচালককে লুঙ্গির সঙ্গে কেডস পায়ে পর্দায় দেখা যায়, তবে তা দর্শককে বিব্রতই করে! আবার ডেইলি সোপগুলোতে যখন কাউকে কড়া মেকআপ আর ভাঁজ না ভাঙা শাড়ি পরে রান্না করতে দেখা যায়, সেটাও অনেকখানি বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। ফলে দৃশ্যগত মাধ্যম সেটা চলচ্চিত্র কিংবা ডেইলি সোপ যাই হোক না কেনো, এর সফলতা নির্ভর করে দর্শক তা দেখে সেই চলচ্চিত্রের বাস্তবতায় কতোখানি বাস্তবের কাছাকাছি যেতে পেরেছে তার ওপর।


আর ঠিক এই পরিস্থিতিতেই নির্মাতা দ্বারস্থ হন শিল্পনির্দেশকের। কারণ কোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্যরূপ কেমন হবে তা সবার আগে নির্মাতার মাথাতেই কাজ করে। সেজন্যই হয়তো সত্যজিৎ রায়ের মতো নির্মাতাকে শুটিংয়ের আগে দৃশ্যকল্প স্কেচ করে শিল্পনির্দেশককে দিতে হতো। আবার এমন অনেক নির্মাতাও রয়েছে, যারা শিল্পনির্দেশনার পুরো দায়িত্বটাই ছেড়ে দেয় নির্দেশকের ওপর। তবে শেষ বিচারে সব দায় কিন্তু নির্মাতার ওপরই বর্তায়।


যাই হোক, শিল্পনির্দেশনার এমন নানা দিক থেকে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ডুব দেখার চেষ্টা থাকবে এই লেখায়। ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার ডুব-এ শিল্পনির্দেশক ছিলেন নাজমুল নাঈম।


ডুব দিয়ে কাল পাড়ি


যেকোনো ঘটনা বা গল্প বলার ক্ষেত্রে সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ঘটনা কখন ঘটেছে তার সঙ্গে ঘটনার বিশ্বাসযোগ্যতাও অনেক সময় জড়িয়ে থাকে। যদিও ডুব কোনো একক সময়ের গল্প বলে না। চলচ্চিত্রনির্মাতা জাভেদ হাসানের জীবনের বিভিন্ন সময় ডুব দিয়ে দেখানো হয়েছে এতে। কখনোবা ২০১০, কখনো ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের কোনো দিন। আর মুখে কাউকে ১৯৯০ বা ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের গল্প বলা যতো সহজ, সেই গল্পের দৃশ্যরূপ হাজির করাটা মোটেও ততো সহজ নয়। কারণ সময়ের সঙ্গে আমাদের চারপাশটাও বদলে যায়। আজ যেখানে হয়তো তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, কিছুদিন পর সেখানেই মাথা তুলবে সুরম্য অট্টালিকা কিংবা মোবাইলফোন সেটের আকাশচুম্বি টাওয়ার। ফলে বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতকে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তালগাছের দৃশ্যরূপ তৈরি করে দেখাতে চাইলে তালগাছই দেখাতে হবে, অট্টালিকা নয়। এটাই নির্মাতার চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জে সবাই সফল হয় না। ডুব-এ ফারুকীও সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন; মোটাদাগে তিনি সফলও।


১৯৯০ দশকের ঢাকার পথঘাট, থানা ভবন, পুলিশের পোশাক, গাড়ি, দোকানপাট, খাবার হোটেল সব বিশ্বাসযোগ্য করে দেখানো হয়েছে ডুব-এ। কিন্তু বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরোর মতো কিছু অসঙ্গতিও পর্দায় ঠিকই উঠে এসেছে। বর্তমানের ঢাকাকে পুরোপুরি আড়াল করতে পারেননি নির্মাতা। মায়া ও জাভেদের খোঁজে পুলিশ যখন মায়ার বাবাকে নিয়ে ঢাকার পথে ছুটে বেড়ায়, তখন দোকানের রঙিন পিভিসি ব্যানার ঠিকই চোখে লাগে। আবার ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শাখাও দেখানো হয় চলচ্চিত্রের ফ্রেমে।


এ তো গেলো পথের ব্যাপার। এসব ক্ষেত্রে নির্মাতারও হয়তো বেশি কিছু করার থাকে না। কারণ ঢাকার পরিবর্তন এতো দ্রুত ও সর্বগ্রাসী যে পুরনো রূপে তাকে তুলে ধরাটা অনেক বেশিই কঠিন। তবুও ফারুকী যতোটুকু তুলে ধরেছেন, তাতে তিনি বাহবা পেতেই পারেন। তবে ঘরের ভিতরে ১৯৯০ দশককে তুলে ধরাটা হয়তো অতোটা অসম্ভব নয়। সেটা ডুব-এও যথাযথই উঠে এসেছে। তবে মায়ার বাবার বাড়ির খাবার টেবিলের চামচ সেট আর বসার ঘরে দেয়ালে সাঁটানো বিদ্যুতের তারের ব্যাপারে আরেকটু খেয়াল রাখা উচিত ছিলো শিল্পনির্দেশকের। কারণ এ ধরনের চামচ সেট খুব সম্ভব ১৯৯০-এর দশকে ছিলো না। আর সেসময়ে বিদ্যুতের তার প্লাস্টিকের ক্লিপের বদলে চিকন লম্বা কাঠে বসানো থাকতো।


অন্যদিকে পুলিশের গাড়ি বা পোশাক নির্বাচনে ফারুকী বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেও থানা ভবন হিসেবে ব্যবহৃত বিউটি বোর্ডিংয়ের নামফলক কিন্তু ফ্রেমে চলে এসেছে। ফলে দর্শককে বার বার ১৯৯০ থেকে ধাক্কা খেয়ে শূন্য দশকে ফিরে আসতে হয়েছে। একই সঙ্গে তা চলচ্চিত্রের বাস্তবতায় প্রশ্নবিদ্ধ করেছে কালের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও।


স্থান নির্বাচন : আরো একটু সতর্ক থাকা যেতো


ডুব-এর আট মিনিট থেকে ১৫ মিনিট পর্যন্ত ২০১০ এ ডুব দিয়ে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে চলে গেছেন নির্মাতা। এ সময়কে ফুটিয়ে তুলতে স্থান নির্বাচনে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। মায়ার বাবা সেনাবাহিনীর কর্নেল। তার পেশা ও সামাজিক অবস্থানের বিষয়টি মাথায় রেখেই বাড়ি ও অন্দরসজ্জা নির্বাচন করা হয়েছে। সোফা সেট, টেলিভিশন, শোকেস, দেয়ালে প্লাস্টিক পেইন্টের বদলে চুনকাম সবকিছুই ৯০ দশকের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। আবার ওয়াসিমের খাবার হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত ভবনটিও চলচ্চিত্রের গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। তারপর সময়ের সঙ্গে মিল রেখে দেখানো থানা ভবনটিও চলচ্চিত্রের সময়কে সমর্থন করে। যদিও তা করতে গিয়ে নির্মাতার চালাকি ক্যামেরার ফ্রেমের ভুলে ধরা পড়ে গেছে। তবুও থানা ভবন হিসেবে এ ধরনের ভবন নির্বাচন করে ফারুকী গল্পটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন।


কিন্তু কিছু জায়গায় নির্মাতার আরো বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিলো। ডুব-এর ২৩ মিনিটের দিকে সাবেরি কলেজ ফাঁকি দিয়ে বাইরে বের হয়। এ পর্যায়ে সবই ঠিক ছিলো, শুধু ফুট ওভার ব্রিজের চলন্ত সিঁড়িটা বাদে। কারণ ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার কোনো ফুট ওভার ব্রিজে চলন্ত সিঁড়ি ছিলো না। ফুট ওভার ব্রিজে এ ধরনের সিঁড়ি প্রথম চালু করা হয় ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে বনানীতে।তারপর ২৬ মিনিটে যখন ২০১০ খ্রিস্টাব্দে মায়ার বাবার বাড়ি দেখানো হয়, সেখানেও সেই ২০ বছর আগের আসবাবপত্রই রেখে দিয়েছেন নির্মাতা। সেই একই চেয়ার, টেবিল, শোকেস, এমনকি খাবার টেবিলের উপরের কাপড়টাও! শুধু দরজা-জানালার পর্দা ও টেলিভিশনটি পাল্টিয়েই শিল্পনির্দেশনার কাজ সেরেছেন তিনি।


এছাড়া চলচ্চিত্রের ২৩ মিনিট ও ৩০ মিনিটে সাবেরির কলেজের সেটে একই হলরুমকে বার বার দেখানো হয়েছে, যা বিরক্তিকর ও অপ্রাসঙ্গিক বলেই মনে হয়। প্রথম ও তৃতীয় বার ওই হলরুম দেখানোর যুক্তি থাকলেও, সাবেরির কলেজ থেকে পালানোর দৃশ্যে ওই হলটি দেখানো জরুরি ছিলো না।


শিল্পনির্দেশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, ঘটনার পাত্র-পাত্রীর পেশা, সামাজিক অবস্থান, আয়সহ নানা দিক বিবেচনায় নিয়ে পোশাক-পরিচ্ছদ, বাড়ি-ঘর নির্বাচন করা। কিন্তু ডুব-এ এই দিকগুলো খুব বেশি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়নি। ৯০-এর দশকে কর্নেল শওকতের বাড়ি তার পেশা ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে মানানসই হলেও ২০১০-এর চলচ্চিত্রনির্মাতা জাভেদ হাসানের ক্ষেত্রে তা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য হয় না। জাভেদ ও মায়ার বাড়ি, পরে শুটিং-বাড়ি হিসেবে দেখানো বাড়িটি যথেষ্ট বিলাসবহুল। বাংলাদেশি কোনো চলচ্চিত্রনির্মাতার এতো আলিশান বাড়ি থাকতে পারে তা ডুব না দেখলে দর্শক জানতেই পারতো না! কারণ বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের বিষয়ে যাদের ন্যূনতম ধারণা আছে, এমন যেকোনো দর্শকই জানেন, ৯০ দশক থেকে এখন পর্যন্ত ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে ঢালিউড মোটেও ভালো অবস্থায় নেই। বিশেষ করে কোনো নির্মাতার একাধিক সুরম্য বাড়ি থাকতে পারে, সেটা গ্রহণযোগ্য নয়।


এ জায়গাটিতে বলিউডের শিল্পনির্দেশক সাদেক আলীর একটি কথা মনে পড়ে যায়। চলচ্চিত্রে কোনো কিছু হলেই আমি ব্ল্যাংক চেক দিয়ে দিলাম, যতো খুশি ভরে নাও, (উপস্থিত সবার হাসি) তার অ্যাকাউন্টে কতো টাকা আছে আমি জানি না, কিন্তু চেক দিয়ে দেয়। কিংবা কথায় কথায় চার কোটি দিয়ে দিলাম, পাঁচ কোটি দিয়ে দিলাম! এইগুলো শুনতে ভালো লাগে বা যাদের হয়তো পয়সা নেই, তারা অন্তত এইটা শুনেও খুশি যে, পাঁচ কোটি টাকার একটা চেক দেখলাম। এটাতে একটা ফিল্মের ব্যাপার কাজ করে আর কী।


ডুব-এও নিশ্চয় নির্মাতা এভাবেই দর্শককে দৃষ্টিসুখ দিতে চেয়েছেন। বাস্তবে চলচ্চিত্রনির্মাতাদের অবস্থা যেমনই হোক না কেনো, পুঁজির কাছে বন্দি চলচ্চিত্রে ভোগের উপস্থাপনটা হয়তো একান্তই জরুরি!


প্রপস-কস্টিউম : নজরটা অনেক খুঁটিনাটি বিষয়েও ছিলো


পোশাক শুধু লজ্জাই নিবারণ করে না। বরং কারো সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থান, বয়স, লিঙ্গ, ধর্মের মতো বিষয়গুলোও নির্দেশ করে। আবার উল্টোভাবে এসব মাপকাঠি অনুসারেই মানুষ পোশাক ও রঙ নির্বাচন করে। শিল্পনির্দেশনার ক্ষেত্রে এগুলোও মাথায় রাখতে হয়। শিল্পনির্দেশক নাজমুল নাঈম এসব মাথায় রেখেছেনও। তাইতো সময়ের ব্যবধানে সাবেরি ও নিতুর পোশাকে পরিবর্তন দৃশ্যমান। ২০১০-এ কলেজ পড়ুয়া সাবেরিকে বয়সের সঙ্গে মানানসই পোশাক পরিয়েই হাজির করেছেন শিল্পনির্দেশক। ফলে সাবেরি রূপী তিশাকে প্যান্ট, শার্ট, টপস, ট্রাউজার, টি-শার্টে কিশোরী হিসেবে বিশ্বাস করতে বেগ পেতে হয়নি। একইভাবে নিতুকেও কমবয়সি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পরে অবশ্য জাভেদ হাসানের সঙ্গে বিয়ের পর নিতুর কস্টিউমে পরিবর্তন আসে। প্যান্ট, শার্টের পরিবর্তে সালোয়ার কামিজ ও শাড়িতে উপস্থাপন করা হয় তাকে। অন্যদিকে তরুণী সাবেরিকেও আর প্যান্ট-শার্টে দেখা যায় না।


শুধু সাবেরি বা নিতুর বেলাতেই নয়, মায়ার ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন চোখে পড়ে। শুধু বয়সের সঙ্গেই নয়, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ীও পোশাকে পরিবর্তন দেখা যায় মায়ার। ডুব-এর ৩১ মিনিটে জাভেদ হাসানকে সপরিবারে প্রাতঃভ্রমণে দেখা যায়। এ সময় মায়ার পোশাক দেখে দৃশ্যটিকে অনেক বেশি বাস্তবের কাছাকাছি মনে হয়। মায়ার পাশাপাশি তার ছেলে-মেয়ের কস্টিউমও বিশ্বাসযোগ্য ছিলো চলচ্চিত্রজুড়ে।


কস্টিউম বা পোশাক-আশাকের মতো শিল্পনির্দেশকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে প্রপস বা চলচ্চিত্রে দেখানো সামগ্রীগুলো বাছাই করা। শুধু বাছাই করা না, সেগুলো কীভাবে পর্দায় দেখানো হবে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের আসবাবপত্র, দরজা-জানালার পর্দা, এমনকি চরিত্রদের ব্যবহৃত গাড়ি, সবকিছুই প্রপসের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, ১৯৯০ দশকের পুলিশের গাড়ি, ওয়াকিটকি নির্বাচনে শিল্পনির্দেশক বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। আবার সে সময়ের বিবেচনায় মায়ার বাবার বাড়ির কাঠের আসবাবপত্রগুলোও যথাযথভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। কিন্তু শিল্পনির্দেশক নাঈম হয়তো ২০ বছরের ব্যবধানে ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ওই বাড়ির পুরনো আসবাব পাল্টাতে ভুলে গেছেন! মায়ার বাবা কর্নেল শওকতের যে সামাজিক অবস্থান, তাতে তার বাসায় দীর্ঘ সময় ধরে এতো পুরনো আসবাব রাখার কথা না!


তবে এর বাইরে অন্যসব ক্ষেত্রে যথাযথ কস্টিউম ও প্রপস নির্বাচনের জন্য নাজমুল নাঈম বাহবা পাওয়ার দাবি রাখেন। বিশেষত, সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সাবেরি ও মায়ার নাকফুল, কানের দুল, ঘরের ও বাইরের জন্য আলাদা পোশাক নির্বাচনে তিনি সচেতন ছিলেন। যে জন্য কলেজ পড়ুয়া সাবেরিকে একধরনের নাকফুলে দেখা গেলেও ভার্সিটি পড়ুয়া সাবেরি হাজির হন ভিন্ন নাকফুলে। আবার কোচিংয়ে ক্লাস নেওয়ার সময় মায়া যে দুল পরেছিলেন, পরে তা দেখা যায় না। এমন খুঁটিনাটি নানা বিষয়ে নজর দেওয়াটাও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।


শিল্পনির্দেশনায় সফল ফারুকী?


সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম দুর্বল দিক এর শিল্পনির্দেশনায়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ শাখাটির ব্যাপারে বাংলাদেশের নির্মাতাদের অমনোযোগিতা প্রকটভাবে চোখে পড়ে। যতোদূর মনে হয়, গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপনের গুরুত্ব সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহালই নয়। এজন্যই চরিত্রের বয়স-পেশা, সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় না নিয়েই যেমন ইচ্ছা কস্টিউম, প্রপস পরিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করাতে দেখা যায়। আসলে চলচ্চিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনির্দেশনা, সিনেমাটোগ্রাফি, সম্পাদনার মতো টেকনিকাল বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকাটা এসবের জন্য অনেকখানি দায়ী। তার পরও সব নির্মাতাই যে এসব বিষয়ে নজর দেন না, তেমনটাও নয়। অনেক নির্মাতাই গল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী যতোটুকু পারে শিল্পনির্দেশকের পরামর্শ নেন।


যৌগিক শিল্প-মাধ্যম চলচ্চিত্রে নির্মাতাই সর্বাধিনায়ক। তার নির্দেশ ছাড়া সেখানে একটি গাছের পাতাও নড়ে না। সেজন্য চলচ্চিত্রের অভ্যন্তরীণ যেকোনো শাখায় কোনো ভুল-ত্রুটি হলে সেটার দায়ও তাকে নিতে হয়। অন্যদিকে প্রশংসাটাও তারই প্রাপ্য। ফলে ডুব-এর শিল্পনির্দেশনার সফলতা-ব্যর্থতা উভয়ের জন্যই ফারুকীকে দায়ী করতে পারে দর্শক।


লেখক : মাহামুদ সেতু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বর্তমানে তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একাত্তর টিভিতে কর্মরত আছেন।


[email protected]

 

তথ্যসূত্র


1. http://www.poriborton.com/poriborton-special/65866; retrieved on: 11.05.2018

২. আলী, সাদেক ও অন্যান্য; ‘সেখানে ছবি আঁকাটা বা মূর্তি বানানোটা যেমন জানতে হয়, সঙ্গে ফিল্মটাকেও বুঝতে হয়’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ৩য় বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৩, পৃ. ২১১।

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন