Magic Lanthon

               

আসাদ লাবলু

প্রকাশিত ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

বাস্তবতার চিপাগলিতেও হাঁটা শিখতে হবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে

আসাদ লাবলু


শুরু

বিশ্বের প্রথম চলচ্চিত্র কোনটি, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। সে বিতর্কে না গিয়ে একথা নির্ভেজালভাবে বলা যায়, লুই লাঁ প্রিন্স-এর রাউন্ডলি গার্ডেন সিন কিংবা লুমিয়ের ভাতৃদ্বয়ের ওয়ার্কাস লিভিং দ্য লুমিয়ের ফ্যাক্টরি আক্ষরিক অর্থেই ইতিহাসের প্রথম দিককার চলচ্চিত্র। কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায় চলচ্চিত্র রূপে-গুণে যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, তাতে এ দুটি চলচ্চিত্রকে একবিংশ শতাব্দীর ‘সিসিটিভি ফুটেজ’ও বলা যায়। পরোক্ষভাবে বলা যায়, এখনকার প্রেক্ষাপটে এ দুটি চলচ্চিত্র এক অর্থে ”লচ্চিত্রই নয়। কেননা শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্র কেবল ক্যামেরার মাধ্যমে চোখের সামনের কোনো ঘটনার দৃশ্য ধারণই নয়। কবির মতো একজন চলচ্চিত্রনির্মাতার কাছেও একটি ফুল কেবল বৃক্ষের একটা অংশই নয়, আরো বেশি কিছু; বিশেষ কিছু। এই ‘বিশেষ কিছু’ কাকে বলে, তা বলাটা কঠিন। তবে কিছুটা আভাস মিলতে পারে সুইডিশ চলচ্চিত্রনির্মাতা ইঙ্গমার বার্গম্যানের ভাষায়,

যখনই আমি কোন ছবি নির্মাণ করছি, তখনই আমার অবচেতনে এই কথাটিই আসছে যে আমি ফিল্ম দেখানোর নাম করে দর্শককে রীতিমত প্রতারিত করছি, ঠকাচ্ছি। কেননা আমি প্রকাশের ক্ষেত্রে এমন একটি মাধ্যমকে বেছে নিয়েছি, মানুষের দৃষ্টি ক্ষমতার অসম্পূর্ণতার উপরই যার ভিত্তি এবং যে মাধ্যমের সাহায্যে দর্শকমনকে একমুহূর্তে এমন একটি ভাবজগতে নিয়ে যেতে পারি, যে মুহূর্তটি সৃষ্টির পূর্বে পর্যন্ত তার মনে আদৌ ছিল না, এমন কি যে ভাবজগতে দর্শকের মনটিকে নিয়ে গেলাম, কিছুক্ষণ পূর্বে পর্যন্ত এই ভাবজগতের বিপরীত ভাবমুহূর্তে হয়ত অবস্থান করছিল তার মনটি।

আবার এটাও বাস্তব যে, প্রত্যেক দর্শকই এই বিশেষ কিছু পেতে কিংবা বার্গম্যানের ভাষায় ‘প্রতারিত হতে’ প্রেক্ষাগৃহে যায়। আজ যেসব কারণে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে সবাই হায়-হুতাশ করছে, সেগুলোর মূলে রয়েছে এই ‘বিশেষ কিছু’র ঘাটতি। এই ঘাটতি নিয়ে আলোচনা করাই এ আলোচনার মুখ্য উদ্দেশ্য। এ ক্ষেত্রে দুটি পরিসরে এই ঘাটতি খোঁজা হবে। প্রথমটি হলো, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ‘সময়-সচেতনতা’। আর দ্বিতীয় পরিসরটি হলো, এর ষোলো কলার হাল-হকিকত। এখানে বলে রাখা দরকার যে, দুটি পরিসরেই চলচ্চিত্রকে পাঠ করতে হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার কারণে সৃষ্ট সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একটা অবিচ্ছিন্ন উপাদান হিসেবে। একই সঙ্গে এটাও মাথায় রাখা জরুরি যে, বিরাজমান সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে চলচ্চিত্র এমন এক সদস্য, যার কিনা শিল্প-সংস্কৃতির অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আত্মীয়তা রয়েছে। আত্মীয়তার এই সম্পর্কে চলচ্চিত্র যতোটা না দেয়, নেয় তার চেয়ে বেশি। ফলে একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অন্য সদস্যদের ‘অর্থনৈতিক’ অবস্থা কেমন, তার ওপরই অনেকখানি নির্ভর করে চলচ্চিত্রের ‘স্বচ্ছলতা’।   

সময়-সচেতনতা

স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য শিল্পের মতো প্রতিটি চলচ্চিত্রকেও সময় সম্পর্কে সচেতন হতে হয়। সচেতনতা বলতে সময়কে ধরার প্রবণতা, ইচ্ছা কিংবা সামর্থ্য থাকতে হয়। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত যতো আন্দোলন হয়েছে, তা সময়কে গ্রেপ্তারের জন্যই। রুশ চলচ্চিত্রনির্মাতা অঁদ্রে তারকোভস্কির দৃষ্টিতে, ‘শিল্পমাধ্যম হিশেবে চলচ্চিত্রের গূঢ় বৈশিষ্ট্য নিহিত তার সময় বা কালচেতনায়। এই সময় হলো তথ্যের মধ্য দিয়ে রূপায়িত সময় বা আলোকচিত্রিত কাল। বাস্তব কাল চলচ্চিত্রে এসে পরিবর্তিত হয় ও ভৌত সময়ের মধ্য থেকে চলচ্চিত্রের নিজস্ব বিমূর্ত সময় উঠে আসে।’

এখানে দেখতে হবে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ‘বাস্তব কাল’ কতোটা বিরাজমান। বাস্তবতা নানারকমের হয়। বউ-শ্বাশুড়ির ঝগড়াও সত্য কিংবা হালনাগাদ বটে, কিন্তু তা বিরাজমান সমাজ-বাস্তবতার কতোটুকুর প্রতিনিধিত্ব করে, সেটা এক মৌলিক প্রশ্ন। সমাজে যেসব অন্যায়-অত্যাচার চলছে, সেগুলোর বিপক্ষে ওকালতি করা একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা তথা শিল্পীর দায়িত্ববোধের মধ্যে পড়ে কি না, নাকি শিল্প কোনো শিল্পীর খেয়ালি সৃষ্টি, তা এক মৌলিক বিতর্কের বিষয়। আপেক্ষিক তো বটেই। কিন্তু আপেক্ষিকতার কথা তখনই আসে, যখন সাপেক্ষের আবির্ভাব ঘটে। সাপেক্ষ না থাকলে আপেক্ষিকতার প্রশ্নই আসে না। অর্থাৎ ‘পাপ-পূণ্য’ জিনিসটা কী, তা ‘ক’ ও ‘খ’-এর তুলনার বিচারে আপেক্ষিক; কিন্তু একান্ত একাকী ‘ক’-এর কাছে তা আপেক্ষিক নয়।

সমাজের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রত্যেক মানুষের, অবধারিতভাবে প্রত্যেক চলচ্চিত্রনির্মাতারও পাপ-পূণ্যের বোধ আছে এবং তা ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে আপেক্ষিক নয়। এখন তিনি সমাজের যা কিছুকে অন্যায় ভাবছেন, সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের সৃষ্টি দিয়ে তাকে লড়াই করতেই হবে, এমন জরুরি আইন শিল্পের সংবিধানে নেই বটে, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই শিল্পের মনোবাসনায় তা রয়েছে। আর শিল্পের মনোবাসনা মানে তা মানুষেরই মনোবাসনা, দর্শকেরই মনোবাসনা। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এখানকার দর্শকের ‘সমাজের অন্যায়-সংশ্লিষ্ট মনোবাসনা’ কতোটুকু পূরণ হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অবধারিতভাবেই দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়গুলো সামনে চলে আসবে। এসব বিষয় যেহেতু বিচ্ছিন্ন নয়, সেহেতু এগুলোকে আলাদা-আলাদা আলোচনা করাটা কঠিন। তারপরও আলোচনার একান্ত স্বার্থে এখানে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই। দেখতে চাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ‘সময়-সচেতনা’র ওপর এ দুটি বিষয়ের প্রভাব কতোটুকু। এও দেখতে চাই, প্রভাব থেকে থাকলেও তা ‘মনের বাঘ’ নাকি ‘বনের বাঘ’। এর বাইরে যে দুটি বিষয় থাকলো (সামাজিক ও অর্থনৈতিক), তা নিয়ে আলোচনা থাকবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ‘ষোলো কলার হাল-হকিকত’ অংশে।

এদেশে শিল্প-সাহিত্য থেকে শুরু করে যেকোনো কিছু করতে গেলেই ধর্মীয় অনুভূতির কথা মাথায় রাখতে হয়। চলচ্চিত্রও এর বাইরে নয়। এ অনুভূতিতে আঘাত হানার পরিণতি কী, তার নজির গত কয়েক বছরে একাধিক লেখক, ব্লগারের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই উঠে এসেছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ চলচ্চিত্রনির্মাতার মধ্যেই অবশ্য এ বিষয়ে এক ধরনের অনুশাসন রয়েছে। কেবল চলচ্চিত্রনির্মাতা বললে ভুল হবে, সংস্কৃতির সব শাখা-উপশাখায় এখন এ বাস্তবতা তৈরি হয়েছে যে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে কিছু করা যাবে না। আর স্বাভাবিকভাবেই এ অনুশাসন তৈরি করে ক্ষমতা, রাষ্ট্র, সরকার। যে কিনা ব্যক্তির নিরাপত্তা না দিতে পারার অক্ষমতা লুকানোর জন্য বলে, ‘পহেলা বৈশাখের নিরাপত্তার স্বার্থে ভুভুজেলা, মুখোশ পরা, বিকেল ৫টার পর উন্মুক্ত স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সড়ক বন্ধ করে কনসার্টকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।’

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার বাধা সবসময় কেবল ‘ধার্মিকদের’ পক্ষ থেকেই আসে না। খোদ সরকারও নিজের স্বার্থে ‘ধার্মিকদের’ খুশি রাখতে খলনায়ক হয়ে সামনে দাঁড়ায়। সর্বশেষ একুশে গ্রন্থমেলার (২০১৮) সময়ও সরকারের এরূপ স্পষ্ট হয়ে যায়, যখন কিনা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মানুষের ধর্মীয় অনভূতিতে আঘাত হানে ‘এমন বই প্রকাশ করা যাবে না। প্রকাশ করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় সরকার নজরদারি করবে।’ সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ‘গ্রিক দেবীর’ ভাস্কর্য অপসারণ করা নিয়েও কম নাটক হয়নি। হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের অব্যাহত দাবির মুখে শেষমেষ কোর্ট চত্বর থেকে ভাস্কর্যটি সরিয়ে নেওয়া হয়।

এখানে পরিষ্কার করা দরকার যে, উপরের আলোচনা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার পক্ষে ওকালতির জন্য করা হয়নি। একটা বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্যই মূলত এ আলোচনা। কেননা শিল্পী কিংবা চলচ্চিত্রনির্মাতার এই অধিকার বা স্বাধীনতা থাকবে কি থাকবে না, সে তর্ক অনেক জটিল ও আপেক্ষিক।

এ তো গেলো ধর্মীয় অনুভূতি। এবার আসা যাক ‘রাষ্ট্রীয় অনুভূতি’তে। এই অনুভূতি রক্ষা করা এখনকার শিল্প-সাহিত্যের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘুষ, দুর্নীতি, বিচারহীনতা, বিরোধী মতবাদকে দমন, গুম, খুন, ক্রসফায়ার, লোক-দেখানো নির্বাচন, বেকারত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে যতো রকমের অভিযোগ আছে, সেগুলো বলার মতো সুযোগ শিল্প-সাহিত্যে বা গণমাধ্যমে আছে কি না, তা এক মৌলিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবাক করা বিষয় হলো, এদেশের চলচ্চিত্রের সীমাবদ্ধতার বিশ্লেষণে এ বাস্তবতাকে এক রকম এড়িয়ে যাওয়া হয়; উপেক্ষা করা হয়। অথচ শিল্পের পাশাপাশি চলচ্চিত্র একটা শক্তিশালী গণমাধ্যম, একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মাথায় রাখতে হবে, যেসব কারণে মানুষ ‘বি টি ভি’ দেখে না, সেসব কারণে মানুষ চলচ্চিত্র থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। আর মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পরিণতি হিসেবে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাকে লুই বুনুয়েল বলছেন এভাবে, চলচ্চিত্র দর্শককে আলোড়িতও করতে পারে, বোকা বানিয়েও দিতে পারে। মানসিক শূন্যতা ও নৈতিক শূন্যতাকে মূল বিষয় করে সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র সেই বোকা বানানোর অশুভ খেলাতেই মেতেছে। আর দর্শক মানে তো দু ঘণ্টা সময় কাটাতে হবে, আর কোনোভাবে কাটাবার নেই, হলে গিয়ে ঢুকে পড়লো, এমন। কিংবা মেয়ে মানুষ সঙ্গে নিয়ে গেলো, অন্ধকারে খুব শরীর ছানাছানি হল, আরও কী হল বার্গম্যানের ঈশ্বর জানে।

এই ধর্মীয় অনুভূতি ও রাজনৈতিক অনুভূতি রক্ষা করার পর যেটুকু স্থান অবশিষ্ট থাকে, সেই পরিসরটুকুর মধ্যেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বর্তমানে হাঁসফাঁস করছে। ফলে চলচ্চিত্রে যেগুলো হচ্ছে, সেগুলো হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক, নয় তো আত্মকেন্দ্রিক। এসব চলচ্চিত্রে এমন কোনো কথা থাকে না, যে কথাটি কোটি-কোটি দর্শক বলতে চাচ্ছে, কিন্তু বলতে পারছে না। বড়োজোর গল্পটির বয়ান হয় এ রকম, ‘শ্রীযুক্ত ক বাড়িতে অসুখী, তাঁর সুখ বিশেষ কোন প্রেমিকার সঙ্গে সহবাসে, কিন্তু অবশেষে ওই প্রেমিকাকে ছেড়ে তাঁর সতীলক্ষ্মী স্ত্রীর কাছে আবার তিনি ফিরে এলেন-তখন গোটা ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ নীতিসঙ্গত ও উপদেশমূলক লাগলেও আমাকে তা আদৌ আকর্ষণ করতে পারে না।’

একটা চলচ্চিত্র যখন ক্ষমতা-কাঠামোকে প্রশ্ন করতে পারে না, তখন সে অবধারিতভাবে নিজের প্রশ্ন সংশোধন করে কিংবা বাতিল করে দেয়। আর বাতিল করে দিয়ে এমন সব গল্প হাজির করে, যেসব গল্পের সঙ্গে ক্ষমতার কোনো বিরোধ নেই। এই সেই পরিস্থিতি, যেখানে এসে এই প্রশ্নের উদয় ঘটে যে, ক্ষমতার সঙ্গে শত্রুতা না করেও চলচ্চিত্র করা যায় কি না? উত্তর খুবই সহজ-যায়। কিন্তু সে চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হলেও তাতে সময়-সচেতনতা থাকে না। তখন আরেকটি প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশে সম্ভব কি না? এককথায় জবাব দেওয়া কঠিন। সহজ করে যেটা বলা যায়, তারপরও এখানে বছরে দু-একটা ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র হচ্ছে। দু-একটা? অনেকগুলো নয় কেনো? কারণ, ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র করতেও ‘ষোলো কলার হাল-হকিকত’ ন্যূনতম একটা পর্যায়ে থাকতে হয়।

‘ষোলো কলার হাল-হকিকত’

ষোলো কলা এই অর্থে যে, শিল্পের প্রতিটি কলার সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক রয়েছে। চলচ্চিত্রের টাইটেল-কার্ডই বলে দেয়, এটি কতো বড়ো এক কর্মযজ্ঞ! এ কর্মযজ্ঞের প্রতিটি শাখার ওপর নির্ভর করে একটি চলচ্চিত্রের নিপুণতা। একটা কবিতা ভালো হবে না মন্দ, সেটা ভিন্ন বিষয়। তবে তা রচনা করতে একজন কবিই যথেষ্ট। এতে অন্য কারো হাত নেই। কিন্তু চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তা প্রায় অসম্ভব। পরিচালনা, ক্যামেরা, সম্পাদনা, সুর করা, গীত রচনা, গানে কণ্ঠ দেওয়া, শিল্পনির্দেশনা, চিত্রনাট্য রচনা, সংলাপ রচনা, পোশাক পরিকল্পনা, কাহিনি বিন্যাস ও অভিনয়সহ আরো কতো কিছু করার থাকে একটা চলচ্চিত্রে। একটা চলচ্চিত্রকে শৈল্পিকভাবে কিংবা ব্যবসায়িকভাবে সফল হতে হলে এসব শাখায় অবশ্যই ন্যূনতম একটা মান বজায় রাখতে হয়। বাংলাদেশে অনেক মানুষ ভালো চলচ্চিত্রের স্বপ্ন দেখে ঠিকই, কিন্তু ঝুলিটা তলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব সবাই করে না।

একটা ‘সফল’ চলচ্চিত্র নির্মাণ গেলে শিল্পের যতোগুলো শাখার সফল সমন্বয় দরকার, সেসব শাখায় বাংলাদেশ যথেষ্ট সামর্থ্যবান না কি সামর্থ্যহীন; সে রায় দেওয়া আজকের আলোচনার মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

চলচ্চিত্রের একটা ভালো কাহিনির সঙ্গে সাহিত্যের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, একথা প্রতিষ্ঠার জন্য বিতর্কের কোনো প্রয়োজনই নেই। সাহিত্য আর চলচ্চিত্রের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু এদেশের সাহিত্যচর্চা আশার না হতাশার, সেই প্রশ্নের মীমাংসাও চলচ্চিত্র সমালোচকদের করে নিতে হবে। কেননা সাহিত্যের পথ যদি সঙ্কুচিত হতে থাকে, তবে সেই সাহিত্য থেকে একটা ভালো কাহিনি পাওয়ার সম্ভাবনা দিন দিন কমতে থাকবে। কেবল কাহিনি বললে ভুল হবে, বাংলা চলচ্চিত্রের বিশেষ অনুষঙ্গ গানের সঙ্গেও সাহিত্যের সম্পর্কটা নিবিড়। এদেশের কবি-সাহিত্যিকের লেখা অনেক গান, কবিতা চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে; হচ্ছে। কিন্তু এখন বছরে এমন গান কয়টা হয়, যে গান একই সঙ্গে শহরেও বাজে, গ্রামেও বাজে, পাড়ার চায়ের দোকানেও বাজে শহরের কফি হাউজেও বাজে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একসময় প্রচুর গান হয়েছে, যেগুলো শৈল্পিক মানের দিক থেকেও ‘উত্তীর্ণ’, আবার ব্যাপক জনপ্রিয়ও বটে। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’, ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’, ‘গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে’ কিংবা ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’-এর মতো গান এখন কয়টা হয়! পরের দিকেও মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের মতো গীতিকারদের হাত ধরে ‘ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়’, ‘দুঃখ আমার বাসর রাতের পালঙ্ক’ বা ‘কিছু কিছু মানুষের জীবনে ভালোবাসা চাওয়াটাই ভুল’-এর মতো অনেক গানই জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু এখন তো ‘পড়ে না চোখের পলক/ কী তোমার রূপের ঝলক’-এর মতো ‘সস্তা’ গানও খুব একটা শোনা যায় না। গীতিকারের মতো সুরকার নিয়েও একই ধরনের কথা বলা যেতে পারে। একই কথা প্রযোজ্য কণ্ঠশিল্পীর ক্ষেত্রেও। এন্ড্রু কিশোর এখনো গায় বটে, কিন্তু কথায়-সুরে সেগুলো খুব কম দর্শকের কাছেই পৌঁছায়। আর এখন তো শিল্পী হতে সাধনার দরকার পড়ে না। সাধনার চর্চাটাও এখন নেই। এখন একটা শিশুকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই ভর্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হয়, রিয়্যালিটি শো’তে যেতে হয়-গান শেখার সময় তার হাতে নেই!

অভিনয়শিল্পীদের নিয়েও এ রকম কথা তোলার জায়গা আছে। বাংলাদেশে অভিনয় শেখার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ খুব একটা নেই বললেই চলে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে একটা দেশের অভিনয়শিল্পী তৈরি হওয়ার ভালো একটি উৎস হলো থিয়েটার বা মঞ্চনাটক। কিন্তু বাংলাদেশে মঞ্চনাটকের সংখ্যা এবং দর্শক, দুই-ই দিন দিন কমছে। এর কারণ হিসেবে বিশিষ্ট অভিনয়শিল্পী ও আরণ্যক নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা মামুনুর রশীদ বলেন,

আমরা মঞ্চনাটকের জন্য একটি পয়সা কাউকে দিতে পারি না, সেখানে টেলিভিশনে একজন অভিনেতা অনেক টাকা পান, এ ব্যাপারগুলো তো বিবেচনা করতে হবে। আমরা সরকারকে বিভিন্ন সময় বলেছি, মঞ্চনাটক কর্মীদের একটি নির্দিষ্ট বেতন বরাদ্দ করার জন্য, সেটা তো তারা করছেন না। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত আমাদের দেশ ছাড়া পৃথিবীর মঞ্চনাটক হয় না।

চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা মঞ্চের মতো জায়গা থেকে ব্যবহারিক শিক্ষা থাকতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু এমন একটা সামাজিক পরিমণ্ডল যেকোনো সংস্কৃতির জন্য অপরিহার্য, যেখানে সাংস্কৃতিক চর্চার একটা অনুকূল পরিবেশ থাকে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মীয় অনুশাসন এবং অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল এমন এক পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

আগেই বলেছি, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অনুভূতিতে আঘাত না করেও ‘ভালো’ চলচ্চিত্র সম্ভব। ইরান এক্ষেত্রে বড়ো উদাহরণ হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, ইরান পারলে বাংলাদেশ পারে না কেনো? মোটাদাগে দুটি জায়গা থেকে এ প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। প্রথমত, ইরানের ‘সাংস্কৃতিক পূর্বপুরুষ’ বাংলাদেশের পূর্বপুরুষের চেয়ে অনেক ‘ধনাঢ্য’ ও প্রতাপশালী ছিলো। ফলে তাদের পূর্বপুরুষদের সেই রাজত্ব না থাকলেও বংশ পরম্পরায় এখনকার চলচ্চিত্রনির্মাতাদের মধ্যে ‘আভিজাত্যের’ ভাবটা এখনো আছে। দ্বিতীয়ত, খেয়াল করলে দেখা যাবে, ইরানের চলচ্চিত্রনির্মাতারা নিজেদের কাজের পরিসরটা চিহ্নিত করতে পেরেছে। ইরানের চলচ্চিত্র এ কারণে বিশ্ব-দরবারে জায়গা করে নেয়নি যে, তা অন্য কোনো দেশের ‘সফল’ চলচ্চিত্রের সফল অনুকরণ। বরং তার সাফল্যের কারণ এই যে, ইরানের চলচ্চিত্র ইরানের চলচ্চিত্রই; অর্থাৎ সে চলচ্চিত্রের একটা স্বকীয়তা আছে, ব্যক্তিত্ব আছে। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আজ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিত্ব নিয়ে দাঁড়াতে পেরেছে কি না, তা এক মৌলিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীত খুঁজলে ব্যক্তিত্ব তৈরির এক প্রচেষ্টা চোখে পড়লেও পড়তে পারে, কিন্তু এখন সেই প্রচেষ্টার কোনো আলামতই দেখা যায় না। বরং অনুকরণের চেষ্টাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে বেশি করে পেয়ে বসেছে। কিন্তু তারা এটা ভাবে না যে, অনুকরণ করাও অনেক কঠিন। অনুকরণ বিদ্যায় ‘হুবহু’ করার একটা বাধ্যবাধকতা থাকে। ফলে, যাকে অনুকরণ করবেন, তার মতো আপনারও অনেক ‘গুণ’ থাকতে হবে। কিন্তু বলিউডের চলচ্চিত্র হুবহু নকল করার গুণ বাংলাদেশের কতোটুকুইবা আছে! একসময় ‘সাজন’ থেকে ‘স্বজন’ করে ব্যবসা করা গেছে। কিন্তু সেই দিন শেষ। তখন মানুষ ‘সাজন’ দেখতে পেতো না। ফলে নকল আর আসলের পার্থক্যটা ধরা পড়তো না।

চলচ্চিত্রের জন্মই প্রযুক্তির হাত ধরে। বিশ্বের সবচেয়ে প্রতাপশালী চলচ্চিত্রপাড়া হিসেবে পরিচিত হলিউডের মূল পুঁজি হলো এই প্রযুক্তি। বলিউড অনেক দেরিতে হলেও প্রযুক্তির দিকে মনোযোগী হয়েছে। কিন্তু এদেশে এখন পর্যন্ত এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই। চলচ্চিত্র সম্পাদনা করার মতো একটা ভালো স্টুডিও পর্যন্ত এখানে নেই। বেশিরভাগ নির্মাতাই চলচ্চিত্র সম্পাদনার জন্য পাশের দেশে দৌড়ান। এমন অভিযোগও বাজারে আছে যে, বি এফ ডি সি’তে ‘ভালো ভালো ক্যামেরা থাকলেও সেটি চালানোর জন্য নেই দক্ষ লোক।’

শেষ

তাহলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ‘মুক্তির পথ’ কী? প্রথম কথা হলো, এখনকার যে পরিস্থিতি, তাতে আশার আলো খুব একটা দেখা যায় না। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে হায়-হুতাশের বয়সও প্রায় দুই দশক হয়ে গেছে। কিন্তু ‘রোগীর’ অবস্থার এতোটুকু উন্নতি হয়নি। কারণ চলচ্চিত্রকে ‘সুস্থ-সবল’ করে তোলার জন্য গত দুই দশক ধরে কেবল রোগমুক্তির প্রার্থনাই হয়েছে। চিকিৎসা তো দূরের কথা, রোগ নির্ণয়ের কাজটাই ঠিকঠাক হয়নি। এই প্রশ্ন কেউ করতেই পারে যে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য গত দুই দশকে এমন কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে করে এটি তার গন্তব্যের দিকে এগোবে? এ প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি যে, তেলেগু চলচ্চিত্রে সংলাপের আগা-মাথা না বুঝেও কেনো মানুষ তা দেখছে? আর সব বুঝেও কেনো তারা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দেখছে না? কবিতা লিখে পাণ্ডুলিপি আকারে ঘরে রেখে দিলেও কবি অনেকটা ভাবমুক্ত হন। কিন্তু চলচ্চিত্র বানিয়ে তা নিজের কাছে রেখে দিলে নির্মাতা আবেগ থেকে মুক্তি পান না। চলচ্চিত্র দর্শক পর্যন্ত না পৌঁছানো পর্যন্ত তা চলচ্চিত্রই নয়। এ কারণে, সবার আগে এদেশের দর্শকের মনস্তত্ব বুঝতে হবে। আর চলচ্চিত্র বানাতে হবে সেই মনস্তত্ব ধরে। একথা আবারও বলতে হয়, নানা কারণে সেই মনস্তত্বের মনোবাসনা পুরোপুরি সম্ভব নয়। তার পরও ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অনুভূতি রক্ষার পর যতোটুকু অনুভূতি অবশিষ্ট থাকে, সেইটুকুতেই আঘাত হানতে হবে। খুবই সচেতনভাবে মাথায় রাখতে হবে ‘ষোলো কলার’ সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও। আর বিশেষ দ্রষ্টব্য হতে পারে চার্লি চ্যাপলিন; যিনি ইয়ার্কির উছিলায় ঠ্যাস দিয়ে কথা বলার ওস্তাদ ছিলেন।

 

লেখক : আসাদ লাবলু, দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

[email protected]

 

তথ্যসূত্র

১. বার্গম্যান, ইঙ্গমার (১৯৯৬ : ৪৯); ‘চলচ্চিত্র ও তার নির্মাণ’; নিজের কথা; সম্পাদনা : অতনু পাল; বাণীশিল্প প্রকাশনা, কলকাতা।

২. তারকোভস্কি, অঁদ্রে (১৯৯৬ : ৯৯); ‘আমি যা তারই প্রতিফলন আমার ছবি’; নিজের কথা; সম্পাদনা : অতনু পাল; বাণীশিল্প প্রকাশনা, কলকাতা।

3. http://www.banglatribune.com/national/news/95411/; retrieved on: 18.04.2018

4.  http://www.prothomalo.com/bangladesh/article/1071855/; retrieved on: 29.02.2018

৫. বুনুয়েল, লুই (১৯৯৬ : ৪১); ‘দুটি বিবৃতি’; নিজের কথা; সম্পাদনা : অতনু পাল; বাণীশিল্প প্রকাশনা, কলকাতা।

৬. প্রাগুক্ত, বুনুয়েল (১৯৯৬ : ৪৩)।

7. http://www.ittefaq.com.bd/print-edition/entertainment/2017/12/10/241865.html; retrieved on: 10.03.2018

8. https://www.jugantor.com/news-archive/online/entertainment/; retrieved on: 01.05.2018

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন