Magic Lanthon

               

আমিনুল ইসলাম

প্রকাশিত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘হেমলক সোসাইটি’ : মৃত্যু নিয়ে তামাশার বিপরীতে জীবনের জয়গান

আমিনুল ইসলাম


ভূমিকা


মানবীয় সত্তার এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে মনোরোগ। এটি আসলে মানবীয় সত্তা থেকে আলাদা কিছু নয়। অন্যদিকে চলচ্চিত্র মানবীয় পরিসরে এক শক্তিশালী যোগাযোগ মাধ্যম। মানুষের আবেগীয় জগতের বর্ণিল বাস্তবতাকে তুলে ধরার প্রশ্নে এই মাধ্যমটি অনন্য। চলচ্চিত্র ও মনস্তত্ত্ববিদ্যার মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। উভয়ই মানুষের চিন্তা, আবেগ, আচরণ ও প্রণোদনা নিয়ে কাজ করে। বিশ্বে বহু চলচ্চিত্রনির্মাতা মানুষের মনের রহস্যময় জগতের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন; বিষয়টিকে সেলুলয়েডের ফিতায় রূপায়িত করেছেন বহুমাত্রিকতায়। মনস্তত্ত্ব বিষয়টি চলচ্চিত্রে কখনো ফুটে উঠেছে মূল বিষয়বস্তু হিসেবে। আবার কখনো অন্যান্য বিষয়ের পটভূমি হিসেবে। চলচ্চিত্রনির্মাতারা মনোরোগের জটিলতা, রহস্যময়তা, প্রকৃতি, সমাজ ও পরিবারে এর প্রভাব অনুসন্ধান করেছেন। ফলে চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন কিংবা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং মনোরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মনোজগতের রহস্যময় বাস্তবতা উপলব্ধির সুযোগ করে দিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে চলচ্চিত্রের ব্যবহার বাড়ছে। ব্যক্তির  মানসিক অবস্থা পরীক্ষানিরীক্ষা, বিচার-বিশ্লেষণ করে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসক-রোগীর মিথস্ক্রিয়ার মাত্রা ও ধরন নিরুপণ এবং পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারের মতো বিষয়গুলো হাতেকলমে বুঝানোর জন্য চলচ্চিত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। কেননা এর মাধ্যমে মনোরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণের সার্বিক প্রকাশভঙ্গি ও সাইকোপ্যাথোলোজিক বৈকল্য, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক মাত্রা এবং রোগীর আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের উপস্থাপন সম্ভব বাস্তবসম্মতভাবে। যাই হোক, আমাদের বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের হেমলক সোসাইটি


চলচ্চিত্রটির মূল বিষয়বস্তু হলো-দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা ও একাকিত্ব কীভাবে ব্যক্তিকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয় এবং যথাযথ সহায়তা পেলে ব্যক্তি কীভাবে নবজীবন লাভ করতে পারে। দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা ও একাকিত্ব একই সঙ্গে মনোরোগ এবং মনোরোগের লক্ষণ ও কারণ। বর্তমান আলোচনায় হেমলক সোসাইটিতে এই বিষয়গুলো উপস্থাপন বিশ্লেষণ করা হবে যোগাযোগ ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে। বলে রাখা ভালো, এই আলোচনা কেনোভাবেই হেমলক সোসাইটির শৈল্পিক ও আঙ্গিকগত বিশ্লেষণ নয়। বরং এই চলচ্চিত্রটিকে একটি লেন্স ধরে নিয়ে বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় একাকিত্ব, বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার মতো বিষয়গুলোকে বোঝার সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক প্রয়াস মাত্র। 


সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও মানসিক স্বাস্থ্য

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া একটি জটিল ও বহুমাত্রিক ধারণা। এই মিথস্ক্রিয়ার মানে হলো অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা, কথা বলা, আলাপ-আলোচনা করা; অন্যের অবাচনিক সঙ্কেতগুলো চিহ্নিত করতে পারা, বুঝতে পারা এবং সেই অনুযায়ী সাড়া দিতে পারা। এই অবাচনিক সঙ্কেতগুলোর মধ্যে রয়েছে মুখভঙ্গি, কণ্ঠস্বরের টোন ও চোখে চোখে সংযোগ ইত্যাদি। ব্যক্তি এসব কিছু করতে সক্ষম হলে সামাজিক জীবনেও সফল হয় এবং গড়ে তুলতে পারে শক্তিশালী আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক। মিথস্ক্রিয়ার এই দক্ষতা ব্যক্তি একদিনে শেখে না। জন্মের পর বিভিন্ন সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এগুলো তার চৈতন্য-বোধ-জেনেটিক কোডে প্রথিত হয়। কেননা মানুষের মস্তিস্কের স্নায়ুতন্ত্রের বিন্যাসটিই এমন যে তা সামাজিকভাবে সংযুক্ত হতে চায়।


ব্যক্তির শারীরিক ও  মানসিক স্বাস্থ্য এবং সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতের প্রশ্নে সামাজিক সহায়তা ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ কথা ঠিক অনেক ব্যক্তিই তাদের হৃদয়কে অন্যের সামনে ঠিকভাবে উন্মোচিত করতে পারে না। প্রকাশ করতে পারে না তাদের একান্ত আবেগ, অনুভূতি ও সমস্যাগুলো। সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এমন এক পরিসর যেখানে ব্যক্তি তার আবেগ, অনুভূতি ও সমস্যার কথা অন্যকে মন খুলে বলতে পারে। আর এই বলতে পারার বিষয়টি দেহ-মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। শুধু তাই নয়, এই মিথস্ক্রিয়া ব্যক্তির মস্তিস্কের স্নায়ুতন্ত্রের ওপরও প্রভাব ফেলে। সামাজিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই স্নায়ুতন্ত্রগুলো নতুন করে বিন্যাসিত হয়। যেসব মানুষের সঙ্গে ব্যক্তি বাস করে, কাজ করে, কথা বলে, ইমেইল পাঠায়, ফেসবুক-টুইটারে চ্যাট করে, মোড়ের চায়ের দোকানে আড্ডা দেয় তারা ওই ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতার প্রশ্নে ওষুধের মতো কাজ করতে পারে, আবার ক্ষতিও বয়ে আনতে পারে।

 

সামাজিক সম্পর্কগুলো একেবারে পরম নয়; বরং পরিবর্তনশীল। পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে যোগাযোগের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তির মধ্যে যোগাযোগ না থাকলে সম্পর্কটিও নাই হয়ে যায়। এই সম্পর্কগুলো প্রথিত থাকে একধরনের সামাজিক নেটওয়ার্কের মধ্যে। ব্যক্তির সামাজিক নেটওয়ার্কের আকার, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার সংখ্যা, আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা ও সম্পর্কের ধরন মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। দুই ব্যক্তির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনটি কতোটুকু শক্তিশালী, তা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো তাদের মিথস্ক্রিয়ার সংখ্যা। এই সংখ্যা বাড়লে বুঝতে হবে বন্ধন দৃঢ়; কমলে দুর্বল।


একাকিত্ব, বিষণ্নতা ও আত্মহত্যা


সামাজিক দুনিয়ায় কমবেশি সবাই একা। সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধ মারাত্মক নেতিবাচকভাবে ব্যক্তির দেহ-মনকে আক্রান্ত করে। একা থাকা মানেই কিন্তু একাকিত্ব নয়। অর্থবহ সামাজিক সংযোগ এবং এই সংযোগ না থাকার কারণে বেদনাবোধই মানবজাতিকে প্রাণিকুলের মধ্যে অনন্যতা দিয়েছে। মানবজাতির আদিম বংশধররা কেবল পেশীশক্তির জোরে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকেনি। বরং টিকে থেকেছে একে অন্যের প্রতি অঙ্গীকারের জোরে। এই অঙ্গীকার সামাজিক বন্ধনটিকে আরো জোরালো করেছে। মানবজাতি আবির্ভাবের লাখ লাখ বছর পর বিভিন্ন গবেষণায় এটাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, ব্যক্তি ও সমাজের কাছ থেকে প্রত্যাখান ও বিচ্ছিন্নতাবোধ দীর্ঘমেয়াদে কাজ করলে ব্যক্তির ডিএনএ-তে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়, ধ্বংস করে দেয় স্বাভাবিক চিন্তার ক্ষমতা, ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য, সামাজিক সঙ্কেত বোঝার সক্ষমতা এবং সামাজিক দক্ষতা। শুধু তাই নয়, ব্যক্তির অন্তর্জগতের আবেগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে। ফলে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা ও প্রত্যাখান বোধ আরো জোরালো হয়; মানসকিভাবে পড়ে যায় অন্ধকারময় গহীন এক ফাঁদে। আর সেই ফাঁদে আটকা পড়ে ব্যক্তির আচরণগুলো প্রতিনিয়তই পরাজিত করতে থাকে মানবিক সত্ত্বার অনন্যতাকে। নিঃসঙ্গতা ব্যক্তির মধ্যে জন্ম দেয় বিষণ্নতা এবং কমিয়ে দেয় আত্মমর্যাদাবোধ। দীর্ঘদিন ধরে একাকিত্বে ভুগলে শারীরিক যন্ত্রণা, বিষণ্নতা ও অবসাদের মাত্রা বাড়ে, শরীর ভেঙে পড়ে এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। প্রকৃত ও অনুভূত সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধ অগ্রীম মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদের একাকিত্ব ব্যক্তির মনের গহীনে বপন করে নেতিবাচক চিন্তার বীজ। এই নেতিবাচকতা গ্রাস করে তার অনুভূতি ও চৈতন্যবোধকে, যার সামগ্রিক প্রকাশ ঘটে আচরণে। এই একাকিত্ব এক ধরনের যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণা হলো একই সঙ্গে মানসিক ও সামাজিক। সামাজিক সংযোগের আকাক্সক্ষাটি মানবীয় সত্ত্বার এতো গভীরে প্রথিত যে, বিচ্ছিন্নতাবোধ ব্যক্তির সুস্পষ্ট চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। অন্যদিকে এই সামাজিক সংযোগ ব্যক্তির মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তির আদল দেয়।


অন্যের কাছে কোনো বার্তা পাঠানো, অন্যের বার্তা গ্রহণ এবং তা উপলব্ধি করে তার প্রতি আকাক্সক্ষা মানুষের হাজার বছরের। পারস্পরিক আন্তঃসংযোগের এই আকাক্সক্ষার ফসলই আজকের ব্যক্তিসমষ্টি। সামাজিক সংযোগের আনুভূতিক অভিজ্ঞতা তার মানবীয় অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে প্রথিত। এই অভিজ্ঞতা ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগীয় বাস্তবতায় ভারসাম্য আনে। সামাজিক পরিবেশ তার নিউরন ও হরমোনের সঙ্কেতগুলোকে প্রভাবিত করে। আর সেই সঙ্কেতগুলো নিয়ন্ত্রণ করে তার আচরণকে। অন্যদিকে বিভিন্ন আচরণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি চারপাশের সামাজিক পরিবেশে পরিবর্তন আনে। সেই পরিবর্তন আবার তার নিউরন ও হরমোনের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, সামাজিক সংযোগবোধ ও বিচ্ছিন্নতাবোধ উভয়ই দেহ ও আচরণকে প্রভাবিত করে। ব্যক্তি তার জাগতিক অভিজ্ঞতাগুলোকে কাঠামোবদ্ধ করে নিজস্ব অনুধাবনের নিরিখেই। আর এভাবে তারা নিজেরাই নিজেদের সামাজিক জগতের রূপকার হয়ে ওঠে। অন্যের সঙ্গে আন্তঃসংযোগের বোধটিকেই বলা হয় সামাজিক অবধারণ বা সোস্যাল কগনিশন। নিঃসঙ্গ অনুভূতি সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করে তখন ব্যক্তি সুখ বলে কিছু অনুভব করতে পারে না; নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না নিজেকে। সামাজিক সংযুক্তি ও সামাজিক পরিতুষ্টি থাকলে ব্যক্তি মানসিকভাবে কোনো ঝুঁকিবোধ করে না। যখনই তারা মনে করে, অন্যের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সংযুক্ত তখনই তাদের মধ্য থেকে সামাজিক যন্ত্রণাগুলো নাই হয়ে যায়। কেননা মানব সত্তা শরীরবৃত্তীয় ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে একে অন্যের সঙ্গে গ্রথিত এবং নির্ভরশীল।


একাকিত্ববোধ মানব প্রকৃতির সম্পূর্ণ বাইরে। একাকিত্ব অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা। এই একাকিত্ব দূর করার জন্য ব্যক্তি যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তত থাকে। ঈশ্বরের মানা সত্ত্বেও আদম ও হাওয়া পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলো। তাদের এই মিলন ছিলো একাকিত্বকে ঘোচানোর জন্যই। আর তা করতে গিয়েই তারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলো। একাকিত্বের তীব্র যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আশায় এখনো মানুষ পৃথিবী ছাড়তে চায়। আর সেজন্য বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ।

ব্যক্তির বিষণ্নতার প্রকাশকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় : মনস্তাত্ত্বিক, শারীরিক ও সামাজিক।১০ মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণগুলো হলো : দীর্ঘমেয়াদে আবেগ অনুভূতির সীমিত প্রকাশ ও দুঃখবোধ, হতাশা ও অসহায়ত্ব, নিম্ন আত্মমর্যাদাবোধ, সামান্যতেই কান্নাভাব বা কেঁদে ফেলা; প্রতিনিয়ত একধরনের অপরাধবোধে ভোগা, সবসময়ই বিরক্তিবোধ ও অন্যকে সহ্য না করা; কোনো বিষয়ে প্রণোদনা ও আগ্রহবোধ না করা; একা একা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারা; জীবনে কোনো আনন্দবোধ না থাকা, জীবন নিয়ে সবসময় শঙ্কাবোধ করা এবং দুশ্চিন্তায় মগ্ন থাকা; আত্মহত্যার চিন্তা করা এবং শারীরিকভাবে নিজের ক্ষতি সাধনের চিন্তা করা। অন্যদিকে শারীরিক লক্ষণসমূহ হলো : স্বাভাবিকের তুলনায় ধীরে চলাফেরা করা ও কথা বলা; ক্ষুধাবোধ ও ওজনে পরিবর্তন আসা;  দেহের বিভিন্ন অঙ্গে ব্যাখ্যাতীত বেদনা হওয়া বা ব্যথাবোধ করা; কোনোকিছুতে উদ্যোম না পাওয়া; যৌনানুভূতি ও যৌন আকাক্সক্ষা কমে যাওয়া; এবং স্বাভাবিক ঘুম না হওয়া। আর সামাজিক লক্ষণসমূহ হলো : অর্পিত দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করতে না পারা; বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ এড়ানো এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ একেবারেই কমিয়ে দেওয়া; নিজের শখ ও আগ্রহের বিষয়গুলো বাদ দিয়ে দেওয়া এবং পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সামলাতে ব্যর্থ হওয়া।


বিষণ্নতা এক ভয়াবহ রোগ। এটি ব্যক্তির সমস্ত শক্তি, ঘুম, স্মৃতি, মনোযোগ, সঞ্জীবনীশক্তি, আনন্দ, ভালোবাসার, কাজ ও খেলাধুলার সক্ষমতা, এমনকি কখনো কখনো বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে শুষে নেয়, নাই করে দেয়। এই বিষণ্নতা আসলে একরকমের ভয়াবহ নেতিবাচক চিন্তন প্রক্রিয়া। এই নেতিবাচক চিন্তা একবার মনে দানা বাধলে তা প্রতিনিয়তই ব্যক্তিকে একধরনের বেদনাবোধ, কষ্টবোধ, যন্ত্রণাবোধ ও একাকিত্ববোধে ঘুণের মতো কুরে কুরে খেতে থাকে। এই বিষণ্নতাবোধের সঙ্গে সামাজিক সংযোগ, আবেগ ও সম্পর্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ আছে। কোনো ব্যক্তির যদি সহায়ক সামাজিক সম্পর্কজালের ঘাটতি থাকে, তাহলে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে বেশি।


বিষণ্নতা ব্যক্তির চিন্তাকে একটি অন্ধকার, নির্দিষ্ট কাঠামোবদ্ধ ও পক্ষপাতমূলক ছকে আবদ্ধ করে ফেলে। আর তখন ব্যক্তির সমস্ত জাগতিক অনুভূতি চালিত হয় নেতিবাচকতার দিকে। বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তি তার জগৎটিকে দেখে সবচেয়ে অন্ধকার দৃষ্টিকোণ থেকে। তারা বিশ্বাস করে, জীবনের বর্তমান পরিস্থিতি কখনই বদলাবে না, ভালো হবে না। তাদের বদ্ধমূল ধারণা হলো জীবনের যন্ত্রণা কখনই শেষ হবে না। তাদের কাছে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির একমাত্র পন্থা হয় মৃত্যু। এ কারণে সারাবিশ্বে প্রতিবছর বিষণ্নতায় আক্রান্ত এক মিলিয়ন ব্যক্তি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বিশ্বের মোট আত্মহত্যার ৬০ শতাংশই ঘটে এশিয়ার দেশগুলোতে।১১


পত্রিকা খুললেই, রেডিও ও টেলিভিশন চালু করলেই এবং অনলাইনে গেলেই দেখা যায়, আত্মহত্যার মিছিল। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত থাকে। এদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ মানসিক রোগটি হলো বিষণ্নতা। এই বিষণ্নতার কারণে তারা নানান নেতিবাচক জীবন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। যেসব নেতিবাচক জীবন অভিজ্ঞতা ব্যক্তির মধ্যে বিষণ্নতার জন্ম দেয় এবং চূড়ান্তরূপে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয় সেগুলো হলো : আপনজনের মৃত্যু, সম্পর্কের ভাঙন (ডিভোর্স, সেপারেশন ও ব্রেকআপ), অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু হারানো (চাকরি, অর্থসম্পদ, বাড়ি কিংবা গাড়ি)। মোটাদাগে আত্মহত্যার লক্ষণগুলো : দুই সপ্তাহ বা তার বেশি দুঃখ ভারাক্রান্ত থাকা; এমন এক অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকা, যখন কোনোকিছুই ভালো লাগে না, কোনোকিছুতেই মনোযোগ দিতে না পারা; ঘুমের মাত্রা বেড়ে যায় কিংবা কমে যায়; খাওয়াদাওয়ার মাত্রা বেড়ে যায় কিংবা কমে যায়; নিজেকে একদম মূল্যহীন মনে করা; কোনোকিছুতেই আশা খুঁজে না পেয়ে অসহায়বোধ, হতাশাবাদী হয়ে ওঠা; পছন্দের কাজগুলোতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা; কারণে-অকারণে কেঁদে ফেলা; সামাজিক জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলা; ব্যক্তিগতভাবে কারো মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা না করা; সবসময় বিরক্তিবোধ ও সবকিছুতেই ক্ষুব্ধবোধ করা; প্রতিনিয়তই অপরাধবোধে ভোগা, সুস্পষ্টভাবে চিন্তা করতে না পারা এবং এমনকি ছোটোখাটো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারা।


ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পিছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হলো মনোরোগ বা মানসিক বৈকল্য। বিভিন্ন মনোবৈকল্যে আক্রান্ত হলে ব্যক্তি আত্মহত্যা করতে পারে। যেসব মনোরোগ ব্যক্তিকে আত্মহত্যার দিকে চালিত করে তার মধ্যে রয়েছে বিষণ্নতা, মুড ডিসঅর্ডার, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার, পোস্ট ট্রমাটিক ডিসঅর্ডার, ব্যক্তিত্ব বৈকল্য বা পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার এবং মাদকাসক্তি। এছাড়াও অর্থনৈতিক টানাপড়েন, নিকট জনের সঙ্গে সম্পর্কে ঝামেলা, গুরুতর কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়া, দীর্ঘমেয়াদে কোনো রোগে ভোগা, দুর্ঘটনার শিকার হওয়া, অতি তীব্র কোনো মানসিক যন্ত্রণায় ভোগা, জীবনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আশা হারিয়ে ফেলা, কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়া (পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণের শিকার হওয়া বা অন্য কোনোভাবে লাঞ্ছনার শিকার হওয়া), একান্ত আপনজন কেউ কোনো দুর্ঘটনার শিকার হলে (শিশু হত্যা, শিশু যৌন হয়রানির শিকার হলে, খুন হলে, কিডন্যাপ হলে, ধর্ষণের শিকার হলে), নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর কাক্সিক্ষত বিচার না পেলে, এমন মনে হওয়া যে বর্তমান জীবন অবস্থার উন্নতি কখনই হবে না, অসহায় বোধ করা, জটিল কোনো আইনি মারপ্যাঁচে পড়া, অনুমিত কোনো ব্যর্থতা মোকাবিলা করতে সক্ষম না হওয়া, মাদকের অপব্যবহার করা, অপমানজনক কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে না পারা; পরিবার, বন্ধুবান্ধব কিংবা সমাজের কারো কাছে কোনো গুরুত্ব নাই, গ্রহণযোগ্যতা নাই এমন বোধ করা, মারাত্মক কোনো অসন্তুষ্টি বোধ, প্রত্যাশা-মাফিক জীবনযাপন করতে না পারা কিংবা আশেপাশের লোকজন তুলনামূলক ভালো জীবনযাপন করলে এবং নিম্ন আত্মমর্যাদাবোধ থাকলে। আত্মহত্যার করার আগে ব্যক্তি যেসব মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে তা হলো : হতাশা, নিরান্দময় জীবনযাপন, বিষন্নতা ও উৎকণ্ঠা। এসব কারণে নিজেকে সে অন্যের কাছে বোঝা মনে করতে থাকে এবং সমাজের অংশ ভাবতে পারে না।


হেমলোক সোসাইটির আখ্যান


চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্রের দুজন, মেঘনা সরকার (কোয়েল মল্লিক) ও আনন্দ কর (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়)। মেঘনার বাগদত্তা শান্তনুর (সাহেব চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে তার সম্পর্ক ভেঙে গেছে। আর মা মারা গেছেন আগেই। তার বাবা ডা. বসু (দীপঙ্কর দে) নতুন বিয়ে করেছেন। সৎ মা নীহারিকার (রূপা গঙ্গোপাধ্যায়) আবির্ভাবকে মানতে পারছেন না মেঘনা। কর্মক্ষেত্রে ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে না পারার কারণে তার চাকরিটিও চলে গেছে। বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে মেঘনা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই তিনি অনুভব করছেন মৃত মায়ের অনুপস্থিতি। প্রিয় গায়ক সিদ্ধার্থ রায়ের (শিলাজিৎ মজুমদার) গানগুলো তিনি গুনগুন করে গান। এই সময় মেঘনা জীবনের কোনো মানে খুঁজে পান না। একপর্যায়ে বাবার প্রেসক্রিপশন নকল করে তিনি ঘুমের ওষুধ কিনতে যান দোকানে। এই ঘুমের বড়ি খেয়েই তিনি আত্মহত্যা করতে চান। ওষুধ কিনেও ফেলেন। তারপর আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে যখন ঘুমের ওষুধ খেতে যাবেন, ঠিক তখনই দেখা হয় হেমলক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক আনন্দ কর (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়)-এর সঙ্গে। আনন্দ তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান হেমলক সোসাইটিতে। ভর্তি করে দেন আত্মহত্যার কৌশল সম্পর্কিত একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে। আর এজন্য মেঘনাকে বোঝানো হয়, এই প্রশিক্ষণ না নিলে আত্মহত্যার বিষয়টি মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনবে। চলচ্চিত্রের বাকি অংশটুকু মেঘনার এক বিভীষিকাময় মৃত্যু উপত্যকার মধ্যে দিয়ে যাত্রার বয়ান। এই যাত্রায় মেঘনা বিভিন্ন ধাপে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছুক এমন কিছু নরনারীর মুখোমুখি হন। দেখানো হয় বিভিন্ন ধরনের আত্মহত্যার কৌশল। অন্যদিকে, মেঘনার বাবা ও সৎ মা মেঘনাকে নানান জায়গায় খোঁজে। তারা শেষ পর্যন্ত থানায় যায়।


যাই হোক, এই হেমলক সোসাইটির কাজ হলো আত্মহত্যা করতে চায় এমন ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে করে তারা সফলভাবে আত্মহত্যা করতে পারে। তিন দিনের কর্মশালায় আত্মহত্যার বিভিন্ন পদ্ধতি শেখানো হয়। এখানকার প্রশিক্ষকদের নামগুলো বেশ বিচিত্র। কোর্সের সঙ্গে শিক্ষকদের নামের বেশ মিল। যাহোক, এসব শিক্ষক বিভিন্ন কায়দায় আত্মহত্যার কৌশল শেখান। যেমন, ড. ধমনী ঘোষ (সব্যসাচী চক্রবর্তী) শেখান হাত কেটে মরার কৌশল। বিভিন্ন ওষুধ খেয়ে মরার কৌশল শেখান দয়াল খাসনবিশ (শ্রীজিত মুখার্জী); ফাঁসিতে ঝুলে মরতে শেখান ঝুলন গুপ্ত (সাবিত্রী চ্যাটার্জী); আগুনে পুড়ে মরতে শেখান শিখা গুন (সুদেশনা রায়); ব্রিজ থেকে লাফ দিয়ে মরতে শেখাবেন সেতু ভেঙ্কট রমণ (রাজ চক্রবর্তী) এবং ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যাওয়া শেখান ট্রেনলেট বিশ্বাস।


কর্মশালার একপর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা বুঝতে পারে, যেসব কারণে তারা আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলো তার থেকে ঢের বেশি দুঃখ নিয়ে অনেক মানুষ বেঁচে আছে। অন্যদিকে মেঘনাও তার জীবনের প্রতি ভালোবাসাকে অনুভব করতে শুরু করে। হেমলক সোসাইটির প্রকৃত উদ্দেশ্য কিন্তু তাই মানুষকে জীবনের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করানো। যাহোক, শেষদিনে মেঘনা বলেন, আনন্দকে তিনি ভালোবেসে ফেলেছেন। তখন আনন্দ জানান, তিনি 'লিম্ফোসাইটোপেনিয়া’য় ভুগছে; আর মাত্র দুই বছর বাঁচবেন। মেঘনা সোসাইটি ত্যাগ করেন। বেশকিছু দিন পর আনন্দ তার রক্ত-পরিবর্তনের পর বেঁচে যান। অন্যদিকে মেঘনার বাগদত্তা আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তাকেও হেমলক সোসাইটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে চলচ্চিত্রটি শেষ হয়।


হেমলক সোসাইটি ও বর্তমান সমাজ-বাস্তবতা


বর্তমান সময় ও সমাজ মনস্তত্ত্ব বোঝার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র হেমলক সোসাইটি। দার্শনিক সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিলো হেমলক পানের মাধ্যমে। এই চলচ্চিত্রটি মূলত ডেরেক হামফ্রি প্রতিষ্ঠিত হেমলক সোসাইটি নামে সংগঠনের সঙ্গে মিল রেখে নামকরণ করা হয়েছে। তিনি ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিলো জটিল রোগে আক্রান্ত এবং বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কম এমন ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় তথ্য সহায়তা ও আইনি পরামর্শ দেওয়া যাতে ওইসব ব্যক্তি চিকিৎসকের সহায়তায় মৃত্যুবরণ করতে পারে। স্বেচ্ছা মৃত্যুবরণের পক্ষে ওকালতি করে হামফ্রি ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ‘ফাইনাল এক্সিট’ শীর্ষক একটি গ্রন্থ লেখেন। তবে বর্তমান যুগের হেমলক হলো বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব ও বিষণ্নতা। যে বিষ ব্যক্তির শিরা-উপশিরায় ঢুকে পড়েছে। ব্যক্তি এমন এক সমাজে বাস করছে, যেখানে প্রতিদিনই পান করছে হেমলক।


যাহোক, এই চলচ্চিত্রে দেখা যায়, মেঘনা সম্পূর্ণ ভিন্ন কিসিমের একজন তরুণী। তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। জীবনের ভার তিনি আর বইতে চান না। আত্মহত্যা করতে চান। সবাই তাকে ঠিকমতো বুঝতে পারে না। তার মা মারা যাওয়ার পর বাবা আবার বিয়ে করেন। বাবা ও সৎ মায়ের বিভিন্ন আচরণে তিনি মানসিকভাবে আহত হন। মা-ই তার জীবনে ছিলো সবকিছু। এই মৃত্যুটি তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না। তাকে গ্রাস করে বিষণ্নতা। জীবনের বিভিন্ন দিক থেকে পিছিয়ে পড়তে শুরু করেন; চাকরি হারান। মেঘনা প্রতিনিয়তই দুঃখবোধ, শঙ্কাবোধ, শূন্যতাবোধ, হতাশাবোধ, অপরাধবোধ, মূল্যহীনতাবোধে ভুগে হারিয়ে ফেলেছেন বিভিন্ন কাজে আগ্রহ, কোনো ক্ষেত্রেই আনন্দ পাচ্ছেন না। উদ্যম হারিয়ে, জীবন থেকে ক্রমেই তিনি পিছিয়ে পড়তে থাকেন, কোনোকিছুতেই মনোযোগ দিতে পারেন না, কোনোকিছু স্মরণ করতে পারেন না, নিতে পারেন না কোনো সিদ্ধান্ত, ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না, খুব সকালেই তিনি ঘুম থেকে ওঠেন কিংবা বেশি মাত্রায় ঘুমান। তিনি  সবসময় আত্মহত্যার চিন্তা ও চেষ্টাও করেন। আনন্দের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকার লেশমাত্র কারণ খুঁজে পাননি মেঘনা। এদিকে আনন্দ পরিচালনা করেন হেমলক সোসাইটি। এই সংগঠনটি সঠিকভাবে আত্মহত্যা করার প্রশিক্ষণ দেয়। মেঘনা এই সংগঠনে যোগ দেওয়ার পর বুঝতে পারেন মৃত্যু ও জীবনের আসল মানে।


হেমলক সোসাইটিতে মেঘনা চরিত্রটির সঙ্গে সমাজের কোনো না কোনো চরিত্রের মিল পাওয়া যাবেই। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের খুব কম সংখ্যককে পাওয়া যাবে যে একাকিত্বে, বিষণ্নতায় ভোগে না; একবারের জন্য হলেও আত্মহত্যার চিন্তা করেনি। কিন্তু  কেনো এই  বিচ্ছিন্নতাবোধ, একাকিত্ব, বিষণ্নতা কিংবা আত্মহত্যা?


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুককে সূচক হিসেবে ধরলে পৃথিবীকে মনে হয় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ স্থান। একেকজন ফেইসবুক ব্যবহারকারী সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার বন্ধু বানাতে পারে। কিন্তু ফেইসবুক কোনো সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ দেয় না, দেয় কেবল সংযোগের সুযোগ। ব্রিটিশ মনস্তত্ত্ববিদ ডানবার জানাচ্ছেন, মানব মস্তিস্কের গড়নই এমন সর্বোচ্চ ১৫০টি অর্থবহ সম্পর্ক ধারণ করতে পারে।১২ অন্যদিকে অ্যারিস্টটলের মতে, কোনো ব্যক্তি যদি সবার বন্ধু হয়, প্রকৃতপক্ষে সে কারোই বন্ধু নয়। কাজেই শত শত সংযোগ থাকলেও সম্পর্ক নেই কারো সঙ্গে। ফলে চব্বিশ ঘণ্টায় হাজারো মানুষের সংযোগে থাকলেও শেষ বিচারে ব্যক্তি নিজেকে একাই বোধ করে। কেননা এখানে কেবল মিথস্ক্রিয়া হয়, সামাজিকতা হয় না। এই একাকিত্ব মানে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা, জাগতিক বাস্তবতা থেকে বিছিন্নতা। স্টফেন ইলারডি (২০০৯) সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধকে অভিহিত করেছেন আধুনিক যুগের প্লেগ রোগ হিসেবে। বিষণ্নতা মোকাবিলা করার প্রশ্নে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সমস্ত সামাজিক সংযোগ, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও সামাজিক সম্পদ প্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়া সবসময় স্বাস্থ্যের জন্য সুরক্ষামূলক নয়। অন্যদিকে নিয়মিত মুখোমুখি মিথস্ক্রিয়া মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা প্রশমন করে। সারাবিশ্বে আত্মহত্যা ডিসকোর্সটি উপলব্ধি করার প্রশ্নে হেমলক সোসাইটিতে এর উপস্থাপন খুবই সহায়ক। যদি হলিউডভিত্তিক কোনো চলচ্চিত্রে আত্মহত্যা উপস্থাপনার বিষয়টি খেয়াল করি, তাহলে দেখতে পাবো যে, যাপিত জীবন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি, শাস্তি থেকে রেহাই, ভালোবাসা হারানো, চরম নিঃসঙ্গতাই আত্মহত্যার মূল কারণ।


আত্মহত্যা বর্তমান সময়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রায় প্রতিদিন আত্মহত্যা সম্পর্কিত খবর দৈনিক সংবাদপত্রে পড়া, টেলিভিশনে দেখা হয়। কোনো সেলিব্রেটি কিংবা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল আত্মহত্যার ঘটনা না ঘটলে, পারিবারিক আলাপ-আলোচনা কিংবা অফিসের গল্পগুজবে এই বিষয়টি তেমন জায়গা পায় না। এসব খবর পড়ে, শুনে, দেখে কেবল আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির জন্য দুঃখবোধ হয়, আর বলা হয় আহারে বেচারা! তারপর ঘটনাটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। কিন্তু আত্মহত্যার বিষয়টি বুঝতে হবে আত্মহত্যাকারীর প্রেক্ষাপট থেকে। এক্ষেত্রে মূল প্রশ্নটি হলো, কোন পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তি নিজের জীবন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়? যারা আত্মহত্যা করে, মারা যায়, তারা আসলে জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটাতে চায় না বরং ঘটাতে চায় জীবন যন্ত্রণার পরিসমাপ্তি।


বর্তমানে ব্যক্তি মানুষ এমন এক দুনিয়ায় বাস করে, যেখানে পরিবর্তনের গতি কল্পনাতীত। চারপাশের সবকিছুই বদলে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। জীবনের অজানা লক্ষ্যে ব্যক্তি ছুটছে তো ছুটেই চলেছে। এই ছোটা একান্ত একা, সঙ্গে সাথি বলে কেউ নেই। এই একা ছুটতে গিয়ে ব্যক্তি খুব বেশি দূরেও যেতে পারছে না। এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াটা আজ বড়ো চ্যালেঞ্জ। আর খাপ খাইয়ে নিতে না পারার জন্য ব্যক্তি ভারসাম্য হারাচ্ছে দেহ-মন ও জাগতিক বাস্তবতার মধ্যে। এই ভারসাম্যহীনতাই তৈরি করছে নানান মনোবৈকল্যের।১৩ আলভিন টফলারের ‘ফিউচার শক’ ধারণা আজ বাস্তবতা। এই ধারণাটি তিনি দিয়েছিলেন আজ থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে। নতুন নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাবের ফলে ভিতরে-বাইরে সমাজকাঠামোর রূপান্তর ঘটছে। বলা যায়, ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। ক্রমেই ব্যক্তি একধরনের বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করছে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। এককভাবে জীবনের সার্বিক চাপ সামলাতে না পেরে ব্যক্তি ক্রমেই নিজেদের অসুখী মনে করছে। অর্থ, খ্যাতি ও ইমেজের পিছনে ছুটতে থাকার কারণে তারা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।


এছাড়া ব্যক্তি মানুষ প্রতিনিয়তই অন্যদের পিছনে ফেলতে ব্যস্ত। অন্যকে পিছনে ফেলে তারা এতোটাই এগিয়ে যেতে চায় যে, প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য চাইতে পারে না। সারাবিশ্বের যুদ্ধবিগ্রহ, আগ্রাসী জাতিবিদ্বেষ, পরিচয়গত ভীতিবোধ, তীব্র যৌনাকাক্সক্ষা, গোঁড়ামির মতো বিষয়গুলো সমাজে খুবই স্বাভাবিক হয়ে ওঠছে। ছড়িয়ে পড়ছে বন পোড়া আগুনের মতো। তীব্র উচ্চাকাক্সক্ষা, অযৌক্তিক প্রত্যাশা, সংক্ষিপ্ত সময়ে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা, লোভ -এসব পূরণ করতে না পারার কারণে গ্রাস করছে হতাশা ও বিষণ্নতা। ব্যক্তি সবাইকে একই সঙ্গে সুখী করার চেষ্টা করছে। এমন প্রত্যাশা করছে যে, তার মতো করে সবাই সুখী হবে। অন্যদিকে ক্রেডিট কার্ডের কিংবা অন্যভাবে ঋণের বোঝা, চাকরির চাপ, নানা বিষয়ে আসক্তি, সম্পর্কে সমস্যা, শারীরিক অসুস্থতা ব্যক্তির মনোজগতকে ক্রমাগত পঙ্গু করে ফেলছে।


ব্যক্তি মানুষ এমন এক সময়ে বাস করছে, যেখানে বেঁচে থাকার প্রশ্নে রয়েছে সম্পদের প্রাচুর্য, ঝুঁকির মাত্রা কম। এখন তারা মনে করছে, বিলাসবহুল পণ্য কেনার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ টাকা তাদের হাতে নেই। কিন্তু পণ্যটি তাকে কিনতেই হবে। কেননা তার আগের প্রজন্মে এটি সহজলভ্য ছিলো না। অবসর কাটানোর মতো সময় এখন তাদের হাতে নাই। প্রত্যেকেই নানাবিধ কাজের চাপে ন্যুজ। অন্যদিকে প্রযুক্তিও তার আবাসস্থলে আচ্ছাদিত। প্রতিনিয়তই ব্যক্তি মনে করে, অন্যরা তার চেয়ে উন্নতমানের জীবনযাপন করছে। কেননা ফেইসবুক খুললেই দেখতে পাওয়া যায়, কোন বন্ধু কোথায় বেড়াতে গিয়েছে, কে কোন পদের খাবার খাচ্ছে, কোন পণ্যটি কিনছে। ফলে প্রত্যেকের মনেই একধরনের নাই নাই ভাব; কুরে খাচ্ছে না পাওয়ার বেদনা। ফলে ব্যক্তি মনে করছে, যাপিত জীবন পূর্ণাঙ্গ নয়, পর্যাপ্ত নয়। এখন মানুষ নিজের জীবনযাপন করতে চায় না বরং এমন জীবনযাপন করতে চায়, যা অন্যকে দেখানো যায়। আসলে তারা অন্যের জীবনটিই যাপন করতে চায়। তাদের বোধটিই এমন যে সবাই তার চেয়ে ভালো করছে। ব্যক্তি এখন কর্ম ও তার ফল দিয়ে নিজেকে বিচার করে না। নিজের মূল্য নির্ধারণ করে, নতুন নতুন পণ্য কেনার সক্ষমতার নিরিখে।


বন্ধুত্বগুলো এখন একেবারে ম্যাড়মেড়ে, নীরস, পানসে, অর্থহীন এবং কেবল লোক দেখানো। এখন এমন এক যুগে মানুষ বাস করছে, যেখানে বন্ধুত্বগুলো তুলনামূলক কম যৌথ অভিজ্ঞতাভিত্তিক বরং বেশিমাত্রায় যৌথ দৃষ্টিভঙ্গিভিত্তিক। এখন মানুষ ফেইসবুকে হাজার হাজার বন্ধু বানাতে পারে। এদের মধ্যে একজনের সঙ্গেও সপ্তাহে একবার দেখা হয় না। ফেসবুক-টুইটারে তারা লাখ লাখ মানুষকে উদ্দেশ করে লেখে, সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতেও একজনের সঙ্গে দেখা হয় না, কথা হয় না, সাক্ষাৎ হয় না মোড়ের চায়ের দোকানে কিংবা ক্যাম্পাসের আড্ডায়। এখন মানুষ তার বন্ধুদের তালিকা ও সামাজিক সার্কেলকে সম্পাদনা করতে পারে খুব সহজেই। কম্পিউটার মাউস কিংবা মোবাইলফোনের বোতামের চাপে নিমিষেই নির্ধারণ করে কে তার বন্ধু, আর কে বন্ধু নয়। এর মাধ্যমে তারা ঠিক করে কোন কোন ব্যক্তির চিন্তা-মতবাদ-দর্শন তার সঙ্গে মেলে আর কাদেরটা মেলে না। কাকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করবো আর কাকে করবো না। দুনিয়া সম্পর্কে অন্যদের উপলব্ধি কী তা লিখিতরূপেই আটকে রাখে নিজেকে, অথচ বাস্তব জীবনের বন্ধুটিকে মনে হয় খুবই বিরক্তিকর।


বর্তমানের সামাজিক সম্পর্কের বন্ধনগুলো খুবই দুর্বল। সামাজিক জগৎটি ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে পারস্পরিক সংযুক্তিবোধের ধরনটি বদলে গেছে। দুই জগতের সংযুক্তিবোধ খাপ খাচ্ছে না একে অন্যের সঙ্গে। যেসব বিষয় সমাজকে একধরনের বন্ধসূত্রে আবদ্ধ রাখতো, তা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক রীতিনীতি সংস্কার, চর্চা, উপাসনালয়, সবকিছু গুরুত্ব হারাচ্ছে। কাজের জন্য আজ মানুষ বাড়ি থেকে বহুদূরে যাচ্ছে। ফলে পাড়ার রাজনীতি সংস্কৃতি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় তার হাতে আজ নেই। কাজেই সমাজকাঠামো বিন্যাসটি বদলে যাচ্ছে খুব দ্রুত। কেননা সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতার ফলে একধরনের  শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে। জগতের কোনো কিছুই আবার শূন্য থাকে না। পূর্ণ হয়ে যায় কোনো না কোনোভাবে। আর সমাজের এই শূন্যতাটি পূরণ হচ্ছে বিছিন্নতা, বিষণ্নতা ও একাকিত্ববোধ, লোভ, ঘৃণা ও চতুরতা দিয়ে। মানুষের চোখ ও মননের সম্পূর্ণটাই আজ নিবদ্ধ কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনের প্রতি। মানুষ নাম, যশ, খ্যাতি, অর্থ, কাক্সিক্ষত ব্যক্তি ইমেজ চায়। আর তারা মনে করে এগুলো পেলেই জীবনটি পূর্ণাঙ্গ হবে।


জীবনের লক্ষ্য ও কারণ সম্পর্কে ব্যক্তির সুস্পষ্ট ধারণা নেই। ফলে বস্তুগত প্রাপ্তিই তার কাছে খুব মূল্যবান মনে হয়। বর্তমানে তার প্রত্যাশাগুলো আকাশ ছোঁয়া। এর কারণ তারা একধরনের গল্পের মধ্য দিয়ে বড়ো হয়। তাদের বাবা-মা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, আত্মীয়স্বজন এবং শিক্ষক সবাই গল্প শোনায়। গণমাধ্যমও নানান রোমাঞ্চকর গল্পের পসরা নিয়ে হাজির হয়। সমস্ত গল্পের মূল সুর একই। আর তা হলো তুমি চাইলে সবকিছুই অর্জন করতে পারো। বিজ্ঞাপনগুলো প্রতিনিয়তই প্রলোভন দেখায় কাঙ্খিত জীবনের। এগুলোতে বলা হয়, নির্দিষ্ট কোনো পণ্য কিনলেই সেই কাক্সিক্ষত জীবন পাওয়া সম্ভব। অন্যদিকে ব্যক্তির সমাজবোধ ও তার বন্ধুসূত্রটি ফিকে হয়ে যায় এবং চারপাশ ও মনোজগৎ কৃত্রিম বন্ধুত্বে ভরে যাওয়ার কারণে একধরনের ইতিবাচক আত্ম-দর্শন গড়ে ওঠে। আধুনিক জীবন এতোটাই গতিশীল যে তার মানবিক সত্তা তাল মেলাতে হিমশিম খায়। ফলে ব্যক্তির মনোজগতে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যন্ত্রণা।


সম্প্রতি সমাজে ব্যক্তির বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক চাপের মাত্রা বেড়েছে। মানুষ এমন এক বাস্তবতায় বাস করছে, যেখানে তারা প্রতিনিয়ত অতি পাওয়ার চেষ্টা করছে। আর জাগতিক বস্তুগত প্রাপ্তির দৌড়ে শামিল হয়ে দুর্বল করে ফেলছে আপনজনের মধ্যে থাকা অদৃশ্য আঠার মতো বন্ধনটিকে। মানুষ প্রত্যেকেই নিজেদের মতো করে একা। আশেপাশের শত মানুষের মধ্যেও মানুষ একা। এই একাকিত্ব জন্ম দিচ্ছে নিঃসঙ্গতাবোধের। এই নিঃসঙ্গ জীবনযাত্রায় মানুষ শত শত বন্ধু গড়ছে, বন্ধুত্ব ভাঙছে, হারাচ্ছে; আবার প্রতিনিয়তই নতুন বন্ধুর সন্ধান করছে। নতুন পেশা গ্রহণ করছে, এক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যাচ্ছে কিংবা নিঃসঙ্গতার চাপে পিষ্ট হয়ে কর্মদক্ষতা হারাচ্ছে; হারাচ্ছে চাকরিটিও। কাজেই হেমলক সোসাইটির মেঘনা আর সমাজের সবাই একাকার; কেউ আলাদা নয়; কারো বাস্তবতা আলাদা নয়।


মুক্তির পথ : সামাজিক সম্পর্ক ও সামাজিক সহায়তা


সত্ত্বাগতভাবেই  মানুষের প্রকৃতি এমন যে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে সমাজের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সংযুক্ত থাকা তার জন্য অপরিহার্য।১৪ তিনটি তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সামাজিক সম্পর্ক ও সহায়তার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় : চাপ ও চাপ মোকাবিলা প্রেক্ষাপট; সামাজিক নির্মিত দৃষ্টিকোণ ও সামাজিক সম্পর্কগত দৃষ্টিকোণ।১৫ চাপ ও চাপ মোকাবিলা দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী ব্যক্তি যদি সামাজিক সহায়তা পায় তাহলে জীবনের যেকোনো চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে এবং সেই চাপ তার শরীরের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। অন্যদিকে সামাজিক নির্মিত দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, জগৎ সম্পর্কে মানুষের একান্ত ধারণা চূড়ান্ত বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায় না। বরং নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক প্রেক্ষাপটের নিরিখেই মানুষ জগৎ সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা তৈরি করে।


জর্জ হার্বার্ট মীড যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ব্যক্তির আত্ম-ধারণা ও সামাজিক জগৎ (সামাজিক সহায়তা) খুবই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ সমাজের অন্যরা ব্যক্তিকে কীভাবে দেখে তার ভিত্তিতেই ব্যক্তির আত্ম-ধারণা গড়ে ওঠে। অন্যদিকে সম্পর্কগত দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী সমাজিক সহায়তা হলো একধরনের সম্পর্ক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি সঙ্গী নির্বাচন করে, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে, পারস্পরিক সংঘাতের মাত্রা কমায় এবং একধরনের সংযুক্তি বোধ করে। আর এর মধ্য দিয়ে ব্যক্তির আবেগীয় ও অন্যান্য কল্যাণ নিশ্চিত হয়। কাজেই সামাজিক সহায়তা হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে ব্যক্তির সুস্থ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং কল্যাণ নিশ্চিত করে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি একান্ত আবেগ, বিভিন্ন তথ্য ও বস্তুগত উপাদান বিনিময় করে।


বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় ও বৃহত্তর পরিসরে সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয় এমন ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্য বিছিন্নভাবে বসবাসকারী ব্যক্তিদের তুলনায় ভালো থাকে। এসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি একধরনের আত্মমর্যাদা ও মূল্যায়িত বোধ করে, গুরুত্ব পায়, ভালোবাসা পায়। এর ফলে সে যাপিত জীবনের নানারকম মানসিক চাপ থেকে খানিকটা হালকা হয়। গোটলিয়েব১৬ দেখিয়েছেন, ব্যক্তি কোনো সমাজে বসবাস ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত থাকার কারণে ২৬ ধরনের সহায়তা পায়। এই সহায়তাগুলোকে তিনি সহায়ক আচরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই আচরণগুলোকে তিনি আবার চারটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন : আবেগীয় দৃষ্টিকোণ থেকে টিকে থাকার আচরণ, সমস্যা সমাধানের আচরণ, পরোক্ষ আন্তঃব্যক্তিক প্রভাব এবং সামাজিক পরিবেশগত ক্রিয়া। অন্যদিকে লেভি১৭ দেখিয়েছেন, সমাজে মানুষ ২৮ ধরনের সহায়তা বিনিময় করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিময় হয় নয় ধরনের সহায়তা। আর সেগুলো হলো : সমানুভূতি, পারস্পরিক স্বীকৃতি, ঘটনা-পরিস্থিতি-বিষয়ের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, কোনোকিছু বিনিময়, নৈতিকতা গঠন, আত্ম-উন্মোচন, ইতিবাচক কোনো ধারণাকে জোরদার করা, ব্যক্তিগত লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ভয়ভীতিমূলক অনুভূতি দূর করা। এছাড়াও দুঃসময়ে মানসিকভাবে কাছে থাকা বা আবেগীয় সহায়তা প্রদান, কোনো তথ্য কিংবা বস্তুগত কোনো উপকরণ দিয়ে সহায়তা করা। হেমলক সোসাইটিতে দেখা যায়, আনন্দ কর ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন; বাড়িয়ে দিয়েছিলের সহায়তার হাত। 


উপসংহার


হেমলক সোসাইটি বর্তমান সমাজ বাস্তবতার রূপকীয় চিত্রায়ণ। এই চলচ্চিত্রে মৃত্যু নিয়ে কৌতুক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মৃত্যুকে পরাজিত করার কথা। সফলভাবে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও এর মূল গল্প কিন্তু আত্মহত্যা নিয়ে নয়। মূল বক্তব্য নিহিত অন্যখানে। এখানে আসলে বলা হয়েছে আত্মার মুক্তির কথা। নাটকীয়তা, থ্রিল ও কমেডির মিশ্রণ ঘটিয়ে মৃত্যুকে নিয়ে কৌতুক করার এক অসাধারণ শিল্পিত প্রকাশ হেমলক সোসাইটি। এর গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হলো, জীবনের চেয়ে বড়ো আর কিছু নেই। এখানে আত্মহত্যার বিভিন্ন কলাকৌশল, সফল আত্মহত্যা নিয়ে বিভিন্ন লেকচার ও আত্মহত্যায় ব্যর্থ হলে কী ঘটতে পারে সবকিছু নিয়েই কৌতুক করা হয়েছে।  এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতীকী বয়ানটি হলো, মৃত্যু বনাম বেঁচে থাকার ইচ্ছা। বেঁচে থাকার তীব্র আকাক্সক্ষার চেয়ে শক্তিশালী আর কিছুই নেই জগতে। আসলে হেমলক সোসাইটিতে হেমলককে বিদায় জানানোর কথা বলা হয়েছে। বার্তা দেওয়া হয়েছে নবজীবনের। কেবল চলচ্চিত্রগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটি দর্শক হাসায়, কাঁদায় এবং জীবন সম্পর্কে ভাবায়, ভাবতে বাধ্য করে।


বিশ্বচলচ্চিত্রে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে আত্মহত্যা। এসব চলচ্চিত্রে জীবন যুদ্ধে ব্যর্থ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার, ধর্ষণের  শিকার, অন্য কোনো কারণে দুর্ভাগ্যের শিকার যেমন, পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যু, চাকরি হারানো, অর্থনৈতিক কিংবা সম্পদের ক্ষতির শিকারের কারণে মানুষ আত্মহত্যা করে। তবে কেবল আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা খুবই নগণ্য। এই হাতেগোনা কয়েকটি চলচ্চিত্রের একটি হেমলক সোসাইটি। আলোচনার সমাপ্তি টানা যাক, হেমলক সোসাইটির নায়ক আনন্দের নামের আভিধানিক অর্থ দিয়ে-সুখী হও। এই আনন্দ করদের আজ বড়োই প্রয়োজন।


লেখক : আমিনুল ইসলাম, রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে পড়ান। সম্প্রতি তার প্রকাশিত গ্রন্থ ‘মানবীয় যোগাযোগ’।


[email protected]

 

তথ্যসূত্র


1. Lieberman, D. (2013); Social: Why our brains are wired to connect, Oxford: Oxford University Press.

2. Umberson, D., Karas Montez, J. (2010); `Social Relationships and Health: A Flashpoint for Health Policy';  Journal of Health and Social Behavior, 51 (1): S54ÑS66.

3. Zorumski, Charles F., Rubin, Eugene H. (2010); Demystifying psychiatry: A resource for patients and families, New York: Oxford University Press.

4.Cacioppo, T., Patrick, W. (2008); Loneliness: Human Nature and the Need for Social Connection; New York London: W. W Norton & Company.

5. cÖv¸³,Cacioppo & Patrick (2008).

6. Huang, YJ., Wang, KY, and Chen, CM, (2010); `Loneliness: A concept analysis'; Journal of Nursing, 57 (5): 96Ñ101.

7. Jaremka, Lisa M., et. al (2014); `Depression and fatigue: Loneliness as a longitudinal risk factor'; Health Psychology, 33 (9): 948Ñ957.

8. Holt-Lunstad, J., et al. (2015); `Loneliness and Social Isolation as Risk Factors for Mortality: A Meta-Analytic Review'; Perspectives on Psychological Science, 10 (2): 227Ñ237.

9. De Jaegher, H., Di Paolo, E., and Gallagher, S. (2010); Trends in Cognitive Sciences, 14 (10): 441Ñ447.

Bandura, A. (2001); `Social Cognitive Theory: An Agentic Perspective'; Annual Review of Psychology, 1 (26): 1Ñ26.

10. Benazzi, F. (2006); Various forms of depression, Dialogues in Clinical Neuroscience, 8 (2): 151Ñ161.

11. Chen, YY., Chien-Chang WK., Yousuf, S. and Yip, PSF. (2012); Epidemiologic Reviews, 34 (1): 129Ñ144.

12. Dunbar, Robin (2010); How Many Friends Does One Person Need?: Dunbar’s Number and Other Evolutionary Quirks, Cambridge: Harvard University Press.

13. Toffler, A. (1984); Future Shock, USA: A Bantam Book/published by arrangement with Random House, Inc.

14.  cÖv¸³,Cacioppo & Patrick (2008).

Mellor, D., Stokes, M., Firth, L., Hayashi, Y., and Cummins, R. (2008); Need for belonging, relationship satisfaction, loneliness, and life satisfaction, 45 (3): 213Ñ218.

15. Cohen, Sheldon, Gottlieb Benjamin H., Underwood Lynn G. (2000); `Social Relationship and Health'; in Cohen Sheldon, Gottlieb Benjamin H., Underwood Lynn G., (Eds) Social Support Measurment and Interpretation: A guide for Health and Social Scientist, New York: Oxford University Press.

16. Gottlieb, Benjamin H. (1978); `The development and application of a classification scheme of informal helping behaviours'; Canadian Journal of Behavioural Science/Revue canadienne des sciences du comportement, 10 (2): 105Ñ115.

17. Levy, L. H. (1979); Process and activities in groups, In M. A. Lieberman and L. D. Borman (Eds) Self groups for couping with crisis, San Francisco: Jossey-Bass, 234Ñ271.

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন