মাসুদ পারভেজ
প্রকাশিত ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ফরীদি : এক শিল্পীর অভিনয়ের ‘ব্যর্থ’ আখ্যান
মাসুদ পারভেজ

জনশ্রুতি আছে একজন অভিনয়শিল্পীকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, আপনি অভিনয়ে কীভাবে এলেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, প্রথমে হেঁটে হেঁটে, তারপর রিকশায়, তারপর কার-এ। উত্তরটা তিনি কৌতুকোচ্ছলে দিলেও এই কথার ভিতরে কিন্তু অনেক কথা আছে। এই কথা ধরেই একজন অভিনয়শিল্পীর ক্যারিয়ার সম্পর্কে অনুমান করা যায়। কিংবা বলা যায়, কথাটা তার অভিনয়ের রূপান্তরের একটা পথরেখা। আবার এই রূপান্তর নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। কেননা সেই অভিনয়শিল্পীর নাম হুমায়ুন ফরীদি। যার অভিনয়ের জগৎটা ছিলো বিস্তৃত-যিনি মঞ্চ, যাত্রা, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র সব শাখাতেই নিজের জাত চিনিয়েছেন।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, হুমায়ুন ফরীদি আসলেই কি পরিপূর্ণতা পেয়েছিলেন? কিংবা তার যে অভিনয় গুণ সেটার কতোটাইবা প্রদর্শিত হয়েছিলো পর্দায়? কিংবা নির্মাতারা কি পেরেছিলেন হুমায়ুন ফরীদির অভিনয়-সত্তার গভীরতা অনুযায়ী তাকে চরিত্র দিতে? এমন নানারকম প্রশ্ন আসে এই অভিনেতার নাম এলে। কারণ তিনি একক কোনো মাধ্যমে নিজেকে আটকে রাখেননি, আবার নির্দিষ্ট কোনো ইমেজ নিয়েও অভিনয় করেননি। দর্শক তাকে দেখেছে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে এবং নায়ক, খলনায়ক, কমেডিয়ান এসবের কোনোটির মধ্যেই একক তকমা না দিয়ে অভিনয়শিল্পী হুমায়ুন ফরীদিকেই গ্রহণ করেছে।
২.
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহণ করা হুমায়ুন ফরীদি প্রথম অভিনয় করেন মাদারীপুরে ‘মুখোশ যখন খুলবে’ নামের একটি মঞ্চনাটকে। সময়টা ১৯৬৭-১৯৬৮ এর দিকে। তারপর যুদ্ধপরবর্তী সময়ের হতাশা, রাজনৈতিক অবক্ষয়, স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট, তরুণ বয়সের একগুয়েমি এসব থেকে জন্মানো নৈরাশ্য নিয়ে তিনি যাত্রার দল গঠন করেন। তবে সেটার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাত্র একবছর। সেই সময়ে দীর্ঘ পাঁচ বছর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটে। তারপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৭৬-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃহল নাট্য প্রতিযোগিতায় তার নাটক মঞ্চস্থ হয়। ওই প্রতিযোগিতার আগে অর্থাৎ যাত্রা ছাড়ার পর দীর্ঘ চার বছর তিনি অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। পরে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর প্রস্তাবে ঢাকা থিয়েটারে যুক্ত হন ফরীদি। ঢাকা থিয়েটারে তার প্রথম মঞ্চস্থ নাটক সেলিম আল দীন রচিত ‘শকুন্তলা’। যেখানে তিনি তক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করেন।১
এই শুরু, এরপর তিনি একে একে অভিনয় করেন সেলিম আল দীন রচিত ‘কিত্তনখোলা’, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’, ‘কেরামতমঙ্গল’সহ আরো অনেক মঞ্চনাটকে। মঞ্চে অভিনয়কালীন ১৯৮০’র দিকে আতিকুল হক চৌধুরীর ‘নিখোঁজ সংবাদ’ নাটক দিয়ে তার টেলিভিশনে অভিনয় শুরু। তারপর তিনি অভিনয় করেন ‘নীল নকশার সন্ধানে’, ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’, ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’, ‘সংশপ্তক’, ‘কোথাও কেউ নেই’-এর মতো আরো অনেক টেলিভিশন নাটকে। মঞ্চ আর টেলিভিশনে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি একপর্যায়ে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। ফরীদি অবশ্য শেষবারের মতো মঞ্চে অভিনয় করেন ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে।
ফরীদি অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র তানভীর মোকাম্মেলের হুলিয়া (১৯৮৫)। তারপর কাজ করেন শেখ নিয়ামত আলীর দহন (১৯৮৬) ও নাসির উদ্দীন ইউসুফের একাত্তরের যীশু (১৯৯৩)-তে। এসব চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে করতে ফরীদি একসময় পুরোপুরিভাবে বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন নির্মাতা শহীদুল ইসলাম খোকনের হাত ধরে। ফরীদি অভিনীত প্রথম বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্র দিনমজুর; তবে প্রথম মুক্তি পায় সন্ত্রাস।২ এরপর অভিনয় করেন লড়াকু, লম্পট, বিশ্বপ্রেমিক, আজকের হিটলার, ভণ্ড, পালাবি কোথায়, পাহারাদারসহ আরো অনেক চলচ্চিত্রে।
৩.
নারী-পুরুষ যেকোনো অভিনয়শিল্পীর জনপ্রিয়তা কিংবা দর্শকপ্রিয়তার প্রসঙ্গ এলে একটা প্রশ্ন ওঠে-কাদের কাছে জনপ্রিয় মানে এই দর্শক কোন শ্রেণির? অর্থাৎ বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা যখন অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর নিম্নজীবী শ্রেণি নির্ধারণ করে, তখন সেটার ভিত্তিতেই সাংস্কৃতিক অভিরুচি নির্মাণের এবং বিচারের একটা প্রবণতা তৈরি হয়। তখন সাংস্কৃতিক বিভাজনটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে আর ভোক্তার রুচি নিয়ে ওঠে নানা প্রশ্ন। এই সাংস্কৃতিক বিভাজন ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কালচারাল হেজিমনি বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ ব্যাপারটার সঙ্গে সামাজিক স্তরবিন্যাস সরাসরি জড়িত। সমাজের শাসক শ্রেণি তার আচারকেই মূলত মানদণ্ড হিসেবে ধরে আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি চালু করে। আর এই শাসক গোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ-মধ্যবিত্ত ঘরানার প্রেক্ষাপটটা লক্ষণীয়। তারা সংস্কৃতিকে ব্যক্তি ফায়দার একটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
ফলে দেশীয় সংস্কৃতির লোকজ আবহ কিংবা ভৌগোলিক যে ঘরানা, সেটার সঙ্গে যারা যুক্ত থাকে, তাদের নিম্নশ্রেণির কিংবা নিম্নরুচির ভোক্তা হিসেবে পরিচিত করানো হয়। তখন প্রশ্ন ওঠে, এই নিম্নজীবী ভোক্তা শ্রেণিটার সংস্কৃতিচর্চার ধরনটা আসলে কেমন? তখন বাংলার লোকসঙ্গীত এবং পালাগানের দিকে নজর দিতে হয়। আর তখন দেখা যায়, নিম্নজীবীর সংস্কৃতিচর্চা মূলত তাদের জীবনচর্চারই একটা দিক। আর তাই তাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত আঞ্চলিক ভাষা দিয়েই তারা গান বানায়। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এই শ্রেণির মানুষের সংখ্যাই অধিক। তো এই শ্রেণিটা যখন তার ঘরোয়া গান বা পালার বাইরে চলচ্চিত্রের ভোক্তা হয়, তখন তারা কেমন চলচ্চিত্র দেখে? কিংবা প্রশ্ন করা যেতে পারে, তারা চলচ্চিত্রের ভিতর কী চায়? প্রথমত বলা যায়, তারা মোটেও আটপৌরে জীবনকে চলচ্চিত্রে দেখতে চায় না। তারা চায় আনন্দ। তারা চায় প্রমোদভিত্তিক চলচ্চিত্র। ‘এ ধরনের চলচ্চিত্রের অভীষ্ট লক্ষ্য থাকে প্রতিনিয়ত সাধারণ দর্শককে মানবিক আবেগের উপরিতলের আশা-আকাক্সক্ষা, উদ্বেগ ও উত্তেজনাকে চলচ্চিত্র মাধ্যমে প্রতিফলিত করা।’৩ হুমায়ুন ফরীদির চলচ্চিত্রের দর্শক ছিলো এই শ্রেণিটা। ফরীদি যেহেতু মঞ্চনাটক ও টেলিভিশনেও অভিনয় করেছেন, তাহলে ওই দুই মাধ্যমের দর্শক কারা?
৪.
অভিনয়শিল্পী ফরীদির দর্শক কারা, এটা দিয়ে তার অভিনয় সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে। ফরীদি মঞ্চনাটক, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র তিন মাধ্যমেই অভিনয় করেছেন। এই তিন মাধ্যমকে ধরে দর্শকের ক্যাটাগরি করা হলে মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, টেলিভিশনের ক্ষেত্রে শহর এবং গ্রামের নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণি; আর চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে গ্রামের নিম্নবিত্ত; নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি উঠে আসে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের খুব কম দর্শকই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির। ফরীদি এই তিন মাধ্যমেই অভিনয় করেছেন; ফলে তার দর্শক শ্রেণিবিভক্ত সমাজের সব জায়গাতেই থাকার কথা।
ফরীদির মঞ্চনাটকের যাত্রা শুরু ছাত্রজীবন থেকে। অভিনয়ে তার দক্ষতা সেখান থেকেই লক্ষ করা যায়। তার অভিনয়ের ভিত মূলত থিয়েটার। ঢাকার থিয়েটারে ৭০ দশকের শেষের দিকে অভিনয় করা ফরীদি সমাজের শিক্ষিত শ্রেণির সামনে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। এই শ্রেণিটা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণি যারা একটা রাবীন্দ্রিক বলয়ের মধ্যে নিজেরা নিজেরা সংস্কৃতিচর্চা করে কিংবা সংস্কৃতির ভোক্তা হয়। ঢাকার ছায়ানট এমন এক প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ। এই শ্রেণির দর্শক মঞ্চনাটকের ফরীদিকে গ্রহণ করে। মঞ্চনাটকের এই ফরীদি যখন ৮০’র দশকের শুরুতেই টেলিভিশন নাটকে অভিনয় শুরু করেন, তখন তার দর্শকসারিতে আরেকটা অংশ যুক্ত হয়। এই অংশটাও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণি। তখন বিটিভি ছাড়া আর অন্য কোনো টেলিভিশন চ্যানেল না থাকায় এবং টেলিভিশন খুব সহজলভ্য না হওয়ায় নিম্নজীবী মানুষেরা তখনো টেলিভিশনের পুরোপুরি দর্শক হতে পারেনি। আর ওই সময়ে বিটিভিতে যারা নাটক নির্মাণ করতো তাদেরও মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত থাকার একটা প্রেক্ষাপট পাওয়া যায়।
৯০-এর দশকের শুরুর দিকে টেলিভিশন বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে যায়; ফলে ফরীদির দর্শকসারিতে আরেকটা অংশ এসে যুক্ত হয়। এই দর্শক গ্রামীণ নিম্নজীবী খেটে খাওয়া মানুষ এবং কিছুটা স্বচ্ছল কৃষক পরিবার। তখন প্রশ্ন জাগে, যে ফরীদি রাজধানীর শিক্ষিত মধ্যবিত্তকে তার মঞ্চনাটকের দর্শক বানালেন, সেই ফরীদি টেলিভিশন নাটকে কীভাবে গ্রামীণ আরেকটা দর্শক শ্রেণিকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করালেন? এখানেই ফরীদির অভিনয়-সত্তার খোঁজ পাওয়া যায়। মঞ্চনাটকের ফরীদি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করতে আগ্রহী হননি। আতিকুল হক চৌধুরীর অনুরোধে ফরীদি প্রথম টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেন। তারপর ফরীদি টেলিভিশন নাটকে যেসব চরিত্রে অভিনয় করে তুমুল জনপ্রিয়তা পান, সেগুলো ছিলো তার বয়সের তুলনায় বেশি বয়সি চরিত্র।
‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’ নাটকে সেরাজ তালুকদার নামে বয়স্ক এক গ্রাম্য টাউটের চরিত্রে অভিনয় করেন ফরীদি। তো এই গ্রাম্য টাউটকে দর্শক আপন করে নেয়। আর এই আপন করে নেওয়া দর্শক কিন্তু গ্রামীণ কৃষক-সত্তার মানুষ। এরপর ফরীদি বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন ‘সংসপ্তক’ নাটকের কানকাটা রমজান চরিত্র দিয়ে। কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সার-এর ‘সংসপ্তক’ উপন্যাস অবলম্বনে নাটকটি রচিত। এই নাটকের কানকাটা রমজান চরিত্রটির ভিতর বাংলাদেশের কৃষিজীবী সমাজের মানুষেরা একাত্মবোধ করে। যদিও সেই চরিত্রটি ছিলো একজন খারাপ মানুষের, যে কিনা সমাজের সব কুকর্ম করে বেড়ায়। এখানেই অভিনয়শিল্পী ফরীদি তার খেলা দেখান। নাটকের নায়ক-নায়িকা চরিত্রের বাইরে গিয়ে দর্শক খলচরিত্র নিয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠে; তখন তার ইমেজটা নায়ক কিংবা খলচরিত্রে আটকে থাকে না। আবার ফরীদিকে কানকাটা রমজান চরিত্রটির জন্য সরাসরি খল-অভিনয়শিল্পীও বলা যায় না। বরং তিনি হয়ে ওঠেন অ্যান্টি-হিরো। তার এই অ্যান্টি-হিরো ইমেজ আরো গভীর হয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে। সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি।
তো কানকাটা রমজান চরিত্রটা দিয়ে ফরীদি বাঙালি কৃষক সমাজের মন জয় করলেন। প্রশ্ন আসতে পারে, ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’ কিংবা ‘সংসপ্তক’ দুটো নাটকেই গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজকে তুলে আনা হয়েছে বলেই কি হুমায়ুন ফরীদি কৃষক-সত্তার কাছে জনপ্রিয় হলেন? তখন নির্ধিদ্বায় বলা যায়, বিষয়টা মোটেও তা নয়। কারণ ফরীদি মঞ্চনাটকে অভিনয় করে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত দর্শকের কাছেও কিন্তু জনপ্রিয়। ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’-এর মতো ওই সব মঞ্চনাটকের কাহিনিতেও কিন্তু গ্রামীণ আবহ ছিলো। ফলে বলা যায়, টেলিভিশন নাটকের গ্রামীণ দর্শক কিংবা মঞ্চনাটকের শিক্ষিত শহুরে দর্শক, সবাই ফরীদির অভিনয়-সত্তাটাকে গ্রহণ করেছে।
‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের কথা বলা যেতে পারে। যেখানে ফরীদি অভিনীত চরিত্রটির আবির্ভাব ঘটে একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে; যখন দর্শক ক্যাথারসিসে পড়ে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে। সেখানে ফরীদির চরিত্রটি ছিলো একজন অ্যাডভোকেটের। দর্শকের কাছে এই চরিত্রটির দুই ধরনের মাহাত্ম্য আছে। প্রথমত, নির্দিষ্ট করে কেবল ওই নাটকটির জন্য; অন্যদিকে তার অভিনীত অন্য চরিত্রগুলোর সঙ্গে তুলনার ক্ষেত্রে। যে ফরীদি ‘সংসপ্তক’ নাটকে কানকাটা রমজান নামের একজন খারাপ লোকের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের কাছে খল হিসেবে নিজের ইমেজ তৈরি করছে, সেই ফরীদিকে যখন একজন ন্যায়বিচার প্রত্যাশী অ্যাডভোকেটের চরিত্রে অভিনয় করতে যান, তখন কিন্তু তাকে আগের সেই খল ইমেজটাকে তুলে ফেলতে হচ্ছে দর্শকের মন থেকে। আর তখনই তার সামনে অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রমাণের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ উঠে আসছে।
ফরীদি সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন এবং সফলও হয়েছেন। একজন অভিনয়শিল্পী যখন খলচরিত্র রূপদান করে দর্শকের মনে আসন গেঁড়ে বসেন, সেই ব্যক্তি আবার এর ঠিক বিপরীত কোনো চরিত্রেও দর্শকের মধ্যে একটা বিমোক্ষণ তৈরি করেন, তখন তার সম্পর্কে প্রখ্যাত রুশ নাট্যতাত্ত্বিক স্তানিস্লোভস্কির একটা কথা মনে পড়ে যায়। ‘তুমি যে চরিত্রে অভিনয় করবে আগে দেখো তোমার নিজের ব্যক্তি চরিত্রের থেকে ঐ অভিনয়ের চরিত্রের দূরত্ব কতটুকু। তারপর নেমে পড় সেই দূরত্ব ঘোচাতে।’৪ স্তানিস্লোভস্কির এই কথার প্রসঙ্গ ধরে যদি ফরীদির অভিনয়-সত্তার বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে উপলব্ধি করা যাবে তিনি কেমন অভিনয়শিল্পী ছিলেন?
বাস্তব জগতের মানুষ আর অভিনয়ের মানুষটার মধ্যে বিপরীত দুটি সত্তা বিরাজমান-এই প্রেক্ষাপটে চার্লি চ্যাপলিনের প্রসঙ্গ উঠে আসে। চ্যাপলিন অভিনীত চরিত্রগুলোকে উপরিতলে কৌতুকোচ্ছলে হাস্যরসাত্মক কিংবা লঘু কমেডির দৃশ্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু এর গভীরতলে আছে অন্য এক অর্থ। ‘তার চলচ্চিত্রে চ্যাপলিন অত্যন্ত সরল এক উপস্থাপনার ভাঁজে ভাঁজে অদ্ভুত কৌশলে গুঁজে দেন জীবনের জটিল ঘাত প্রতিঘাতের অভিজ্ঞতাকে।’৫ চ্যাপলিনের এই যে চরিত্রায়ণ, সেটা তো তার বাস্তব থেকে যোজন যোজন ফারাকের। তাহলে চ্যাপলিনের অভিনয়-সত্তার যে লক্ষ্য সেখানে তিনি ঠিক করে নিয়েছেন পর্দায় তাকে কী করতে হবে, কী করতে হবে না। ফলে চ্যাপলিন তার নিজের চলচ্চিত্র নিয়ে বলেন, ‘আমি ট্রাজেডি সৃষ্টি করি না সৌন্দর্য সৃষ্টি করি।’৬ তখন তার দ্য গ্রেট ডিক্টেটর চলচ্চিত্রটির প্রসঙ্গ আসে, যেখানে তিনি একই সঙ্গে দুটি বিপরীত চেতনাধারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন। একটি চরিত্রে তাকে তুলে ধরতে হয়েছে এক ফ্যাসিস্ট শাসককে, অন্যটিতে এক নিরীহ নাপিতকে। অস্বীকার করার উপায় নেই চ্যাপলিনের এই অভিনয় গুণ ফরীদির মধ্যে ছিলো। কিন্তু তিনি তেমন চলচ্চিত্রনির্মাতা পাননি। তবে তার পরও চলচ্চিত্রের যে ফরীদি, তার খোঁজ করা দরকারি হয়ে পড়ে।
ফরীদির চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রেক্ষাপট কিংবা অবস্থাকে দুটি ধারায় ফেলা যায়। একটি এফ ডি সি ঘরানার, অন্যটি এর বাইরের অর্থাৎ যাকে বিকল্পধারা কিংবা স্বাধীনধারা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চলচ্চিত্রাভিনেতা ফরীদিকে মূলত বাঙালি কৃষক-সত্তার দর্শক খলচরিত্র হিসেবেই বেশি চেনে। কিন্তু ফরীদি এফ ডি সির বাণিজ্য প্রাধান্যশীল ঘরানার চলচ্চিত্রের বাইরে দহন-এ নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন। সেখানে তিনি হাজির হন বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করা এক বেকার যুবকের চরিত্রে। যে যুবক মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আবর্তিত সমাজ সঙ্কটে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পেরে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ফরীদি এই চরিত্রটিকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন তার মাপা অভিনয় দিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন তখন পর্যন্ত এই ঘরানার চলচ্চিত্রের সঙ্গে অভ্যস্ত না হওয়ায় দহন এবং ফরীদির এই অভিনয় দক্ষতা কোনোটাই তেমন আলোচনায় আসে না। এই পরিস্থিতিতে দুইটি বিষয় চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতা এবং দ্বিতীয়ত, দর্শক সম্পৃক্ততা। প্রথমটিকে আলোচনায় নিয়ে বলা যায়-নাচ, গান, মারামারি, আবেগ, লঘু হাস্যরসপূর্ণ দৃশ্য দিয়ে নির্মিত এফ ডি সি ঘরানার যে চলচ্চিত্র তার বাইরে অন্য কোনো চলচ্চিত্র বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে বিকশিত হতে পারেনি। আর দর্শকের ক্ষেত্রে বলা যায়, যে দর্শক ফরীদির মঞ্চনাটকের তারা দহন-এর দর্শক হতে পারতো। কিন্তু তারাও তা হয়নি। কারণ ঢাকাই চলচ্চিত্র বলতেই এই শ্রেণিটা একধরনের নাক সিটকানো ভাব দেখায়। ফলে দহন-এর ফরীদিকে পরে আর পাওয়া গেলো না। এর বিপরীতে তাকে পাওয়া গেলো এফ ডি সির নাচ, গান, মারামারি, আবেগ, লঘু হাস্যরসপূর্ণ দিয়ে মোড়ানো চলচ্চিত্রে। তখন একটা প্রশ্ন আসে, ফরীদির মতো মঞ্চাভিনেতা, টেলিভিশন নাট্যাভিনেতা কেনো এফ ডি সির বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করলেন? তখন অবশ্য একটা নতুন বিষয়ের অবতারণা হয় চলচ্চিত্রে পুঁজি বিনিয়োগ।
ফরীদি অভিনীত হুলিয়া, দহন, একাত্তরের যীশু চলচ্চিত্রগুলো বাণিজ্যিকভাবে সফল ছিলো না। ফলে এই ঘরানার চলচ্চিত্র থেকে বিনিয়োগ তুলে আনা সম্ভব না হওয়ায় নির্মাতা, প্রযোজক, অভিনয়শিল্পী সবাইকে হতাশ হতে হয়। আর ফরীদি তো অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এর বাইরে অর্থ উপার্জনের জন্য অন্তত তিনি তেমন কিছু করতে চাননি। ফলে বাংলাদেশ টেলিভিশনে নাটক কিংবা মঞ্চনাটকে অভিনয় করে যে উপার্জন, তাতে তার পক্ষে জীবনযাপন করা সম্ভব ছিলো না-এমনটাই তিনি নিজেও মনে করেন। ফলে এটা বলতে হয়তো দ্বিধা নেই যে, ‘বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে অভিনয় তিনি শুধু অর্থ উপার্জনের জন্যই করেছেন।’৭ ফরীদির এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বখ্যাত অভিনেতা মারলন ব্রান্ডো’কে স্মরণ করা যেতে পারে। চলচ্চিত্রে অভিনয় করা নিয়ে ব্রান্ডো বলেছিলেন, ‘চিত্রাভিনেতা হওয়ার কোনো পরিকল্পনা বা উচ্চাকাক্সক্ষা-ই নাকি তাঁর ছিল না। তিনি নাকি জীবিকার একটা উপায় হিশেবেই একে নিয়েছিলেন এবং পরে দেখলেন অল্প সময়ের মধ্যে অনেক টাকা রোজগারের এটাই শ্রেষ্ঠ উপায়।’৮ ব্রান্ডোর সৌভাগ্য যে, তিনি পর্দার ব্যক্তিত্ব আর নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে একপর্যায়ে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। মারলন ব্রান্ডো এবং হুমায়ুন ফরীদি দুজনেই মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে আসেন; কিন্তু ফরীদির বরাতে তেমনটা জোটেনি, যেমনটা পেয়েছিলেন ব্রান্ডো। ‘প্রতিভা, পৌরুষ আর মৃদু কমিকগুণ তার অভিনীত চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য এই তিনটি।’৯ এদিকে ফরীদির বেলায় চলচ্চিত্রে তার অভিনীত চরিত্রগুলো কেমন ছিলো, সেটা এখন খোঁজ করা যেতে পারে।
৫.
এফ ডি সি কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রে নতুন এক ফরীদিকে পাওয়া যায়। আর এই ফরীদি পুরো সম্পূর্ণ নিম্নজীবী দর্শকের। ফরীদির এফ ডি সি ঘরানার বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন শহীদুল ইসলাম খোকনের পরিচালনায়। ফরীদি অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র দিনমজুর হলেও প্রথম মুক্তি পায় সন্ত্রাস। সেই যে ফরীদির যাত্রা শুরু হলো তারপর থেকে তিনি অসংখ্য চলচচ্চিত্রে অভিনয় করে গেছেন। ঢাকাই চলচ্চিত্রে ফরীদি খলচরিত্রে অভিনয়ে নতুন একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করেন। তিনি ‘গতানুগতিক খলচরিত্র’ না হয়ে, হয়ে উঠলেন অ্যান্টি-হিরো। তার এই অ্যান্টি-হিরো ইমেজ নায়কের চেয়ে অধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠলো দর্শকের কাছে। ফরীদির এই অ্যান্টি-হিরো ইমেজটা ধরার জন্য তার অভিনীত চলচ্চিত্রের কয়েকটি চরিত্রকে আলোচনা করা দরকার। তবে সেক্ষেত্রে ঢাকাই চলচ্চিত্রের গতানুগতিক যে কাহিনি সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে, শুধু ফরীদি যে চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন সেটাকে আমলে নেওয়া যাক।
এফ ডি সি ঘরানার চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, তার কাহিনিতে নায়ক-নায়িকা ও প্রধান খলচরিত্র মূল ভূমিকা পালন করে অর্থাৎ কাহিনিকে গতিশীল রাখে। সাধারণত এই গল্পে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নায়ক-নায়িকাই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র; কিন্তু এর বাইরে গিয়ে যদি কোনো খলচরিত্র দর্শকের কাছে নায়ক-নায়িকার চেয়েও গুরুত্ব পায়, তখন সেটাকে কাহিনির সঙ্গে সেই অভিনয়শিল্পীর বিশেষ গুণ হিসেবেই ধরতে হয়। আর এমন ব্যাপারই ঘটে অভিনয়শিল্পী ফরীদির বেলায়। এই পরিস্থিতিতে তিনি আর খলঅভিনয়শিল্পী থাকেন না, হয়ে যান অ্যান্টি-হিরো। ফরীদি অভিনীত লম্পট চলচ্চিত্রটির কথা বলা যেতে পারে। লম্পট-এ ফরীদি যে চরিত্র রূপদান করেন, তার মধ্যে তিনটি সত্তার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। চলচ্চিত্রের শুরুতে তাকে রজব নামধারী এক পাগল চরিত্রে পাওয়া যায়, যে কিনা হিউমারযুক্ত কথা বলেন আর লুকিয়ে অন্যের বাসররাত দেখে বেড়ান। আরেক চরিত্রে তাকে দেখা যায় দয়াল বাবা হিসেবে; যিনি ভণ্ড বাবা সেজে থাকেন। তৃতীয় চরিত্রে তিনি খলচরিত্রের চামচা; যিনি তার মালিকের কথা মতো সব কাজ করেন। এই তিন চরিত্রেই ফরীদির অভিনয় কতোটা মানানসই ছিলো কিংবা চরিত্রের গভীরে কতোটা প্রবেশ করতে পেরেছেন তা দেখার বিষয়। এসব ক্ষেত্রে অভিনয়শিল্পীর শারীরিক কসরৎ, কণ্ঠস্বর এসবও বিবেচনায় রাখা দরকার।
চলচ্চিত্রটির নাম লম্পট, যা নেতিবাচক শব্দ এবং চারিত্রিক স্খলন বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়। তো এমন একটা শব্দ দিয়ে যখন চলচ্চিত্রের নাম, তখন বোঝাই যাচ্ছে নেতিবাচক চরিত্রকে প্রাধান্য দিয়েই কাহিনি নির্মিত হয়েছে। লম্পট-এ নাম ভূমিকার সেই চরিত্রে অভিনয় করেন ফরীদি। এ ধরনের চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে তখন কেবল এফ ডি সির চলচ্চিত্রের যে দর্শক নায়ক-নায়িকা প্রধান চলচ্চিত্র দেখে অভ্যস্ত ছিলো, তারা সেটা থেকে বের হয়ে আসছে। আর দর্শককে সেখান থেকে বের করে আনার মধ্য দিয়ে অভিনয়শিল্পী ফরীদি অনন্য হয়ে উঠলেন। এফ ডি সির চলচ্চিত্রের কাহিনিতে নায়ককে মহাকাব্যিক গুণপনা দিয়ে নির্মাণ করা হয় এবং নায়কের সেই কার্যকলাপ দেখে নিম্নজীবী দর্শকের না পাওয়ার যে যন্ত্রণা তা একধরনের স্বস্তি পায়। কিন্তু সেই দর্শক যখন নায়ক অপেক্ষা খলচরিত্রকে অধিক গুরুত্ব দিতে থাকে এবং পর্দায় খলচরিত্রের উপস্থিতি তাদেরকে আমোদিত করে, তখন সেই খলচরিত্র প্রচলিত ডিসকোর্স থেকে বেরিয়ে পায় অ্যান্টি-হিরো তকমা। আর এফ ডি সির চলচ্চিত্রে এই কাজটাই করেছেন ফরীদি।
পর্দার বাইরেও ফরীদি অভিনীত চরিত্রের সংলাপ দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হতে থাকে, যেমন : অপহরণ-এ ‘আই আই ও’, আজকের হাঙ্গামায় ‘ওই ওই’ সংলাপ দর্শকের মুখে মুখে ঘুরতে থাকে। মজার বিষয় হলো, পর্দার বাইরে এই সংলাপগুলোকে কিন্তু মোটেও নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করেনি দর্শক। বরং বলা যায়, ফরীদির অভিনয় দর্শকের অচেতন মনে একটা স্তর তৈরি করেছিলো। ফলে তাদের চেতন মন এটা বিবেচনা করতেই চায়নি যে, চলচ্চিত্রে সংলাপটা যিনি ব্যবহার করেছেন সেই মানুষটার চরিত্রটা খারাপ ছিলো। আর তখনই বোঝা যায়, ফরীদি তার অভিনয় দিয়ে দর্শকের ভিতরের জগৎটাকে স্পর্শ করতে পেরেছিলেন। ফলে নায়কের অতিমানবীয় গুণের চেয়ে, ফরীদির বাস্তবধর্মী ‘শয়তানি’টাই দর্শক আপন হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফরীদি তার অভিনয় দিয়ে পর্দায় একটা নিখুঁত বাস্তবতাকে ধারণ করতে পেরেছিলেন বলেই হয়তো এমন ঘটেছে।
এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা জরুরি, ফরীদি তার বাস্তব চরিত্রের একেবারে বিপরীতধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে সেটা ফুটিয়ে তুলেছেন এবং দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। এখানেই তার ন্যাচারালিস্টিক অভিনয়ের প্রসঙ্গ আসে। Ôone of the most important attributes in naturalistic acting is that of seeming to be unconscious of anybody watching or listening.’10 তো ফরীদি সেই দূরত্ব ঘোচাতে পেরেছিলেন, ফলে দর্শক তার অভিনীত চরিত্রের সংলাপ পর্দার বাইরেও আওড়েছে। আর তখন ফরীদি না-নায়ক, না-খল কোনোটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, হয়ে উঠেছেন অভিনয়শিল্পী।
বিশ্বপ্রেমিক চলচ্চিত্রে ফরীদির সাইকো কিলার চরিত্রটির প্রসঙ্গে আসা যাক। যে চরিত্রটি মেয়েদের বুকে কালো তিল দেখলেই তাদের হত্যা করে। চরিত্রটির সাইকো হওয়ার কারণ হিসেবে একটা কাহিনিও উপস্থাপন করা হয় চলচ্চিত্রে। ওই কাহিনির রেশ ধরে ফরীদিকে সাইকো চরিত্রে অভিনয় করতে হয় এবং সেখানে খুবই গুরুত্ব সহকারে তাকে ট্রাজেডির একটা ভাব আনতে হয়। কারণ এখানে একই সঙ্গে ফরীদিকে দুটি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে। প্রথমত, যে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চরিত্রটি সাইকো কিলার হয়েছে; দ্বিতীয়ত, ওই চরিত্রটি যে মেয়েটির প্রেমে পড়ে তাকেও ঠিক একই কারণে তাকে খুন করতে উদ্যত হতে হয়। ফলে ব্যাপারটা চরিত্র আর পরিস্থিতি নির্ভর হয়ে পড়ে। অথচ চরিত্রের এই দুটো দিকই দুর্দান্তভাবে তুলে ধরেন ফরীদি। বিশেষ করে চরিত্র আর পরিস্থিতি অনুযায়ী মুখাবয়বের অভিব্যক্তি আর অঙ্গভঙ্গি দিয়ে তিনি পুরো পরিস্থিতিকে এমন এক দিকে নিয়ে যান, তাতে দর্শক ক্যাথারসিস হয়ে পড়ে। যে মেয়েটির প্রেমে সাইকো কিলার চরিত্রটি পড়ে, তাকে তিনি খুন করতে চান বুকে কালো তিল থাকার কারণে। তার সাইকো কিলার হয়ে ওঠার ঘটনার সঙ্গেও তার মায়ের বুকের কালো তিলের বিষয়টি জড়িত। এই ধরনের পরিস্থিতিতে দর্শকের ক্যাথারসিস ভাবনার জাগরণ অভিনয়শিল্পীর অভিনয়ের ওপর নির্ভর করে। ফলে সংঘর্ষমূলক বিরুদ্ধতার পাশাপাশি একটা পরিবর্তন আনা অভিনয়শিল্পীর দক্ষ অভিনয় ছাড়া প্রায় অসম্ভব। ফরীদি সেখানে নিঃসন্দেহে সফল ছিলেন।
ফরীদি অভিনীত খলচরিত্রগুলো অন্যান্য খলচরিত্রগুলো থেকে আলাদা ছিলো। আর এই আলাদা হওয়ার ব্যাপারটাও ফরীদির স্বতন্ত্র অভিনয়-সত্তার পরিচয় বহন করে। ফরীদির খলচরিত্রগুলোতে হাস্যরসের একটা ব্যাপার থাকতো। এ প্রসঙ্গে পালাবি কোথায়-এর গার্মেন্ট ম্যানেজারের চরিত্রটির কথা বলা যেতে পারে। ফরীদি অভিনীত আরেকটি চরিত্র সাহিত্যিক আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত বাঙলা চলচ্চিত্রের কানা মোক্তার। বাঙলায় ফরীদির উপস্থিতি মাত্র কয়েকটি দৃশ্যে; কিন্তু দর্শক এক চোখ কানা ফরীদিকে দেখে সেখানে ‘সংসপ্তক’-এর সেই কানকাটা রমজানকে অনুভব করে; যদি প্রেক্ষাপট থাকে ভিন্ন। এ রকম অসংখ্য চরিত্রে ফরীদি তার অভিনয়ের মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। কিন্তু আফসোস, ফরীদির ওই সব চলচ্চিত্র সমাজের নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির দর্শকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো! দুর্দান্ত এই অভিনয়শিল্পী তাই কোনো মাধ্যমেই সবার হয়ে উঠতে পারেননি। তো ফরীদির মতো অভিনয় প্রতিভার সদ্ব্যবহার করতে না পারাটা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের দীনতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
লেখক : মাসুদ পারভেজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়ান। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থের নাম ‘ঘটন অঘটনের গল্প ’(২০১১), ‘বিচ্ছেদের মৌসুম’(২০১৫) ও কাব্য ‘জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক’(২০১৬) এবং প্রবন্ধগ্রন্থ ‘সংশয়ের সাহিত্য’(২০১৭)।
তথ্যসূত্র
1.https://www.youtube.com/watch?v=kAbBMqcdwCU&t=50s; retrieved on 20.11.17
2.https://www.youtube.com/watch?v=kAbBMqcdwCU&t=50s; retrieved on 20.11.17
৩. হায়দার, কাজী মামুন; ‘চলচ্চিত্রের শ্রেণিকরণ ও তার চর্চা’; ম্যাজিক লন্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; সংখ্যা ১০, বর্ষ ৫, জানুয়ারি ২০১৬, পৃ. ৪৯।
৪. শাহাদুজ্জামান (২০১৭ : ১১০); কথা চলচ্চিত্রের; চৈতন্য, সিলেট।
৫. প্রাগুক্ত; শাহাদুজ্জামান (২০১৭ : ১৩)।
৬. প্রাগুক্ত; শাহাদুজ্জামান (২০১৭ : ১৯)।
7. https://www.youtube.com/watch?v=kAbBMqcdwCU&t=50s; retrieved on 28.11.17
৮. দাশগুপ্ত, ধীমান (সম্পা.) (২০০৬ : ৩৩৮); চলচ্চিত্রের অভিধান; বাণীশিল্প, কলকাতা।
৯. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত (২০০৬ : ৩৩৯)।
১০. সেনগুপ্ত, গোপা (২০০৬ : ২৯); ‘অভিনেতা’; চলচ্চিত্রের অভিধান; সম্পাদনা : ধীমান দাশগুপ্ত; বাণীশিল্প, কলকাতা।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন