Magic Lanthon

               

সারা মনামী হোসেন

প্রকাশিত ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

জীবনের গল্প বলে মিশুকের ক্যামেরা

সারা মনামী হোসেন


১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ; ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালেদ তার নিপুণ ভঙ্গিমায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে ফুটিয়ে তুলছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। দৃপ্ত শপথে দাঁড়িয়ে থাকা তিন যোদ্ধার প্রতিকৃতি-অপরাজেয় বাংলা। কী রাত, কী দিন; খালেদ আপন মনে কাজ করে চলেছেন একটানা। হঠাৎ একদিন লক্ষ করলেন, ২০-২২ বছরের এক তরুণ আপন মনে তার সৃষ্টি ক্যামেরায় বন্দি করছেন। দিনে তো তাকে দেখা যায়ই, রাতেও মাঝে মাঝে তার উপস্থিতি চোখে পড়ে। তারও যেনো ক্লান্তি নেই এই কাজে! কৌতূহল হলে, একদিন খালেদ ডাকলেন সেই তরুণকে। কথা হলো; ধীরে ধীরে এই তরুণই হয়ে উঠলেন তার কাজের অন্যতম সঙ্গী; সঙ্গে ইতিহাসের অংশও। সেই সঙ্গে ধারণ করলেন ইতিহাসকেও।


সেই তরুণের নাম আশফাক মুনীর চৌধুরী। মিশুক মুনীর নামেই যিনি পরবর্তী সময়ে বেশি পরিচিত। যিনি বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতা জগতের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। যার পদচারণা কিছু সময়ের জন্য দেখা গেছে চলচ্চিত্রেও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদের সঙ্গে জুটি বেঁধে যিনি ক্যামেরা-ভাষাকে নিয়ে গেছেন অন্য পর্যায়ে। যা দেখে পর্দার বাইরের মানুষেরা কখনো শিহরিত হয়েছে, কখনো ঘটনার সঙ্গে একাত্ম হয়েছে আবার কখনোবা হয়েছে মুগ্ধ।

 

.

চলচ্চিত্রের রঙিন দুনিয়ার গল্পকে যে মিশুক মুনীর ফ্রেমে ফ্রেমে সাজিয়েছিলেন, চলচ্চিত্রের বাইরে তার রয়েছে এক বর্ণাঢ্য কর্মজীবন। শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর দ্বিতীয় সন্তান আশফাক মুনীর চৌধুরীর জন্ম ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা শেষের পর ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি সেখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এর আগে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে এক শিক্ষা কার্যক্রমে কানাডায় একটি জাদুঘরে শিশুশিক্ষা বিভাগের চিত্রগ্রাহক ও সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। এরপর জাতীয় জাদুঘরের অডিও-ভিজ্যুয়াল কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশে তার কর্মজীবন শুরু হয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি একই সময়ে মিশুক বিবিসি’র ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে বিভাগে তিনি ‘ভিডিও জার্নালিজম’ কোর্স চালু করেন এবং পরের বছর শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোপুরিভাবে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন।


১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে মিশুক বাংলাদেশের প্রথম টেলিস্ট্রিয়াল চ্যানেল ‘একুশে টেলিভিশন’-এর হেড অব অপারেশন্স হিসেবে যোগ দিয়ে গড়ে তোলেন দুর্দান্ত এক সংবাদ টিম। যা বাংলাদেশের সম্প্রচার সাংবাদিকতার খোলনলচে পাল্টে দেয়। ২০০২ থেকে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ‘বিবিসি’, ‘ডাবলুটিএন’, ‘এআরডিএনওয়ান’, ‘চ্যানেল ফোর’, ‘সিবিসি’ এর সঙ্গে কাজ করেন তিনি। সেই সঙ্গে তিন বছর তিনি ‘ডিসকভারি চ্যানেল’-এর মেডিকেল সিরিজ সিচুয়েশন ক্রিটিক্যাল প্রোগ্রামের হেড অব ফটোগ্রাফি হিসেবেও কাজ করেন। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে মিশুক রিটার্ন টু কান্দাহার নামে একটি তথ্যভিত্তিক ডকুমেন্টরির চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন। এটি জেমিনি অ্যাওয়ার্ড পায়।


পেশাদার সাংবাদিক হলেও চলচ্চিত্রে সিনেমাটোগ্রাফারের কাজটি কিন্তু মিশুক শুরু করেছিলেন অনেক আগে। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে তারেক মাসুদের আদম সুরত প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ। তাদের এই যুগলবন্দি পরবর্তী সময়ে অবশ্য বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আলাদা একটি মাত্রা দিয়েছে। সেই সঙ্গে চলচ্চিত্র নিয়ে জন্ম দিয়েছে নতুন কিছু ভাবনারও। আদম সুরত ছাড়াও তারেকের মুক্তির কথা, নরসুন্দর ও রানওয়েতে মিশুক কাজ করেছেন। এছাড়া ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে মিশুকের সিনেমাটোগ্রাফি ও সহপরিচালনায় ঢাকা টোকাই নামের চলচ্চিত্রটি জার্মানির ওবারহাউজেন উৎসবে পুরস্কার জেতে। আর এনায়েত করিম বাবুলের পরিচালনায় ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে ১৬ মিলিমিটার ক্যামেরায় তোলা মিশুকের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ছিলো চাক্কি।


.

নির্মাতা ও সিনেমাটোগ্রাফারের ভালো সম্পর্ক সবসময়ই ভালো কিছু সৃষ্টি করেছে। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তাই নির্মাতা ও সিনেমাটোগ্রাফারের যুগলবন্দি অনেকটা দুই দেহ এক প্রাণের মতো। চলচ্চিত্রের জন্য একজন সিনেমাটোগ্রাফার কতোখানি গুরুত্বপূর্ণ তা আমেরিকার প্রখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার গর্ডন উইলস-এর একটি কথা থেকেই বোঝা সম্ভব। যা ফিল্ম অ্যান্ড ডিজিটাল টাইমসের প্রকাশক ও সম্পাদক জন ফায়ুরের এর ‘রিমেম্বারিং গর্ডন উইলস’ লেখায় পাওয়া যায়; উইলস তাকে বলেছিলেন, ‘একজন সিনেমাটোগ্রাফার হলো ভিজ্যুয়াল সাইকিয়াট্রিস্টের মতো। যিনি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের পরিচালিত করেন। যেভাবে তিনি তাদের ভাবাতে চান সেভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করেন। ... এটি অনেকটা অন্ধকারে ছবি আঁকার মতো একটি বিষয়।’ 


তাই চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, শক্তিশালী ও অপরিহার্য অংশ হিসেবে এসেছে সিনেমাটোগ্রাফির ধারণা। অর্থাৎ চলচ্চিত্রের ভাষায় কথা বলা। ক্যামেরার চোখ গল্পগুলোকে পৌঁছে দেয় নতুন এক স্তরে। যেখানে একজন দর্শক অনুভব করে পর্দায় যা কিছু ঘটছে তার চোখের সামনেই ঘটছে। সেটি বাস্তব বা অবাস্তব যেকোনো ঘটনাই হোক! টানা ওলেন যেমনটি বলেন, জগতের নানাধরনের দৃশ্য চোখের সামনে তুলে আনার ক্ষমতার পাশাপাশি বিভিন্ন অসম্ভব ও অকল্পনীয় বিষয়কে তুলে ধরার ক্ষমতাও চলচ্চিত্রের আছে। আর সেটা নির্মাতার সহায়তায় করেন সিনেমাটোগ্রাফার। তাই বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা না থাকলে ভালো সিনেমাটোগ্রাফার হওয়া যায় না। কারণ জীবনকে যেভাবে দেখা হয়, সেভাবেই সিনেমাটোগ্রাফিতে তুলে ধরা হয়। এছাড়া সিনেমাটোগ্রাফি কোনো গল্পের জন্য কেমন হবে তা কোনো দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করে। সিনেমাটোগ্রাফারকে সেজন্য সৃজনশীল হতে হয়। সাদা চোখে যা দেখা যায় না, তাকেই সহজভাবে, ভিন্ন মাত্রায় সামনে নিয়ে আসেন সিনেমাটোগ্রাফাররা।  


সিনেমাটোগ্রাফার জন হোরা’র কাছে সিনেমাটোগ্রাফি কেবল স্বাভাবিক কোনো ঘটনার সাদামাটা রেকর্ডিং নয়, বরং এটি সৃজনশীল এবং ব্যাখ্যামূলক প্রক্রিয়া। যা এর স্রষ্টাকে কোনো মৌলিক কাজের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়। একজন সিনেমাটোগ্রাফার তার শৈল্পিক দৃষ্টি ও কল্পনাশক্তির সমন্বয়ে ইমেজকে পর্দায় তুলে ধরেন। ঠিক যেমনভাবে তিনি নিজ দক্ষতা দিয়ে তার সহযোগী কলাকুশলীদের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতা নিয়ে কাজ করেন। রজার ডিকেন্স, যিনি শশাঙ্ক রিডেমশন, অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড-এর মতো নামকরা চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন; তিনি ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে বিবিসি’তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাজ শুরুর আগে সহযোগী বাছাই যত্নের সঙ্গে করা উচিত বলে পরামর্শ দেন। তার মতে, তা না হলে নতুন নতুন পরীক্ষা চালানোর আগ্রহও জন্মাবে না। ভালো কোনো কাজও সৃষ্টি হবে না।


নির্মাতা-সিনেমাটোগ্রাফার সম্পর্ক নিয়ে আরো একধাপ এগিয়ে কথা বলেছেন বিখ্যাত নির্মাতা ইঙ্গমার বার্গম্যান। তিনি জানান, ইমেজে কী যোগ করতে হবে তা নিয়ে তার ও চিত্রগ্রাহকের মধ্যে চুক্তি হতো। আলো ও পরিবেশের পুরো পরিকল্পনা তারা আগেই করে ফেলতেন। এরপর তারা দুজনে যেভাবে একমত হয়েছেন, সে হিসেবে সিনেমাটোগ্রাফার তার কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতেন। ইঙ্গমার বার্গম্যানের সঙ্গে তাই হয়তো ২০টি চলচ্চিত্রের সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন স্বেন নিকভিস্ট। এর মধ্যে দ্য ভার্জিন স্প্রিং, থ্রু অ্যা গ্লাস ডার্কলি, টাচ-এর মতো চলচ্চিত্র রয়েছে। এদিকে স্টিফেন স্পিলবার্গের সঙ্গে সিনেমাটোগ্রাফার Janusz Kaminskiকাজ করছেন ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে। তিনবার অস্কারজয়ী সিনেমাটোগ্রাফার রবার্ট রিচার্ডসন কাজ করেছেন মার্টিন স্করসিস, কোয়েন্টিন টারান্টিনো ও অলিভার স্টোন-এর সঙ্গে। সিনেমাটোগ্রাফারের কাজই হচ্ছে নির্মাতার কল্পনাকে তার মতো করে বাস্তবে রূপ দেওয়া। নির্মাতা কাহিনির প্রয়োজনে কোথায় কোন শট্ হবে তা বুঝিয়ে দেবেন, আর সিনেমাটোগ্রাফার সে অনুযায়ী তা ফুটিয়ে তুলবেন। কাগুজে শব্দগুলোকে ছবি হিসেবে ফুটিয়ে তোলার বিষয়ে ‘সি সিনেসেøট’ নামের একটি অনলাইন জার্নালে সি জে পেরির লেখা ‘দ্য আর্ট অব কোলাবোরেশন : দ্য ইমপর্টেন্স অব ডিরেক্টর অ্যান্ড সিনেমাটোগ্রাফার’ প্রবন্ধে সিনেমাটোগ্রাফার গর্বেট যেমনটি বলেছেন, ‘অনেক শব্দ দিয়ে একই অনুভূতি প্রকাশ করা সম্ভব। কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ কী হবে, তা নির্ভর করবে আপনি যেটিকে নির্বাচন করবেন তার উপর।’ চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে পর্দায় দেখানো ইমেজের অনেক কিছু নির্মাতার সহায়তায় নির্বাচন করেন একজন সিনেমাটোগ্রাফার।


সিনেমাটোগ্রাফার ও নির্মাতা হিসেবে মিশুক ও তারেকের মধ্যে মনে হয় এই ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে বন্ধু ছিলেন তারেক ও মিশুক। তারেক একবার বলেছিলেন, তার সঙ্গে মিশুকের বোঝাপড়া এমনই যে, তার চোখের দিকে তাকালেই মিশুক বুঝে যেতেন কী করতে হবে। তাদের এই জুটি গড়ে ওঠে প্রথম চলচ্চিত্র আদম সুরত থেকেই। এমনও বলা হয়েছে, তারেকের চলচ্চিত্রে মিশুক না থাকার মানে হলো তিনি তখন নিশ্চয় দেশেই ছিলেন না।


.

সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে মিশুক মুনীরের শুরুটা বেশ মজার। তরুণ বয়সেই তারেক মাসুদ ঠিক করেছিলেন চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ওপর একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে শুরুতে আনোয়ার হোসেনের তাতে কাজ করার কথা ছিলো। কিন্তু আনোয়ার হোসেন হঠাৎ দেশের বাইরে একটি কাজের সুযোগ পেয়ে যান। তারেক তখন পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে বৃত্তি পেয়েছেন। কিন্তু এরশাদ সরকার ক্ষমতায় আসায় ভারতের সব বৃত্তি বাতিল হয়ে যায়। এরপর তিনি ঠিক করেন নিউইয়র্কে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করতে যাবেন। আনোয়ার হোসেন এ সময় তাকে জানান, সুলতান খুবই অসুস্থ। সুতরাং চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাইলে এখনই তাতে হাত দেওয়া উচিত। ঢাকার জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে তিনি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেন, নিউইয়র্ক যাওয়ার টাকা দিয়ে তিনি ওই চলচ্চিত্র তৈরি করবেন।


এর কয়েকদিন পর তারেক ঢাকার পুরনো পল্টন দিয়ে রিকশা করে যাওয়ার সময় পথে বন্ধু মিশুককে পেয়ে যান। মিশুক তখন স্টিল ফটোগ্রাফার। তারেক রিকশা আটকিয়ে মিশুককে জানান, সুলতানের ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা। এ নিয়ে সুলতানের সঙ্গে তার কথা হয়েছে বলেও তিনি জানান। মিশুক, তারেকের সঙ্গে কাজটি করতে আগ্রহ দেখান। তারেকের ভাষায়, মিশুক সেসময় তাকে বলেছিলো, ‘আমি তো ক্যামেরা চালাতে জানি না।’ পরে সুলতানের এলাকায় যাওয়ার পথে বাসে বসে মিশুক আমেরিকান সিনেমাটোগ্রাফার ম্যানুয়েল পড়ে ক্যামেরা চালানো শেখা শুরু করেন। হাতে ধরা একটি ক্যামেরা তারা সঙ্গে নিয়েছিলেন। দম দেওয়া সেই ক্যামেরা চলতো এক থেকে দুই মিনিট। ফিল্মের স্পুল ছিলো দুশো ফিট। দুই মিনিট পার হলেই তাতে নতুন ফিল্ম ভরতে হতো। এ রকম একটি ক্যামেরা দিয়েই শুরু হয় মিশুকের চলচ্চিত্রযাত্রা।


আদম সুরত বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে তারেক জানান, ১৬ মি.মি. প্রজেক্টরে প্রথমবার আদম সুরত দেখে মিশুক বেশ লজ্জিত ছিলেন। কারণ, অনেক দৃশ্যই ছিলো কাঁপা কাঁপা। কিন্তু মিশুকের অ্যাক্সোপোজারের ধারাবাহিকতা, ফোকাস, লাইটিং এর কাজ দেখে তারেক তাকে বলেছিলেন, ‘আই অ্যাম মোর দ্যান হ্যাপি।’ আদম সুরত এ সুলতানকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে চিত্রায়ণ করা হয়। কখনো হাই অ্যাঙ্গেল শট্, যাতে ধরা পরে সুলতানসহ তার দৈনন্দিন কাজের আবহ। কখনো মিড শট্, ক্লোজ শটের ব্যবহারও আছে প্রচুর। মূলত সুলতানের সাক্ষাৎকারের সময় এ ধরনের শট্ ব্যবহার করা হয়। এতে তার অভিব্যক্তিটা বুঝতে কষ্ট হয়নি। এ ছাড়া একটি দৃশ্যে দেখানো হয় একজন বৃদ্ধ কারিগরকে। যিনি একমনে একটি হাড়ি রঙ করছিলেন। এ দৃশ্যের পর পরই সুলতানকে এক্সট্রিম ক্লোজ শটে দেখানো হয়। সরাসরি ক্যামেরার চোখের দিকে তাকিয়ে সুলতান যেনো বোঝানোর চেষ্টা করছেন, তিনি এইসব শ্রমজীবী মানুষের প্রতিচ্ছবি। 



সেই সঙ্গে হাই অ্যাঙ্গেল শটে সুলতানের ক্যানভাসের রঙ আর ছবিতে তুলির আঁচড় দেওয়ার দৃশ্যগুলো দর্শককে আগ্রহী করে তোলার মতো। এছাড়া এতে মিশুকের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে গ্রামের কৃষক, সাধারণ মানুষ। সুলতান যে দর্শনে বিশ্বাস করতেন সেটিকে আরো জোরদার করা হয়েছে ক্লোজ শট্ ও লঙ শটের মাধ্যমে। কোথাও কৃষক তার জমিতে হালচাষ করছে, কোথাওবা তার গরুটিকে গোসল করাচ্ছে-এ ধরনের শট্ নেওয়া হয়েছে। আমরা শহুরে মানুষগুলো যে এই পাড়া-গাঁয়ের মানুষের জন্যই বেঁচে আছি তাই উপলব্ধি করায় মিশুকের ক্যামেরা। 


মাঝি নৌকা চালাচ্ছে, বাঁশের সাঁকোর নিচে গোসল করছে মানুষ, বাড়ির পাশের খালে কিছু নৌকা অলস পড়ে আছে কিংবা গ্রামীণ বধূ তার শিশু কোলে ছায়াঘেরা পথে হাঁটছে-এ ধরনের ডিটেইল আদম সুরতকে আলাদা প্রাণ দিয়েছে। প্রথম কাজ হিসেবে আলো বা রঙের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট পরিমিতভাব দেখা গেছে মিশুকের মধ্যে। তবে ক্লোজ শটে অস্পষ্ট হয়ে গেছে কিছু দৃশ্য। যেমন, ধান তোলার দৃশ্যের শুরুতে কৃষকের মাথা ফ্রেমের ভিতরে বাইরে উঠানামা করছিলো। আবার বাউল গানের আসরে বৃদ্ধের কলকে টানা আর নারীদের নাচের সময়ের দুটি শট্ হালকা ঝাপসা। ক্যামেরাও কিছুটা কাঁপছিল। বৃদ্ধ কারিগরের আশপাশের জিনিসের শটটির সময়ও ক্যামেরা সামান্য কাঁপছিলো বলে মনে হয়েছে। তার পরও প্রথম কাজ হিসেবে তারেক ও মিশুক দুইজনের কাজেই অনন্যতা ছিলো।


দীর্ঘ বিরতি দিয়ে এরপর তারেক-মিশুকের দ্বিতীয় কাজ মুক্তির কথা। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় এটি। মিশুক ছিলেন এর প্রধান সিনেমাটোগ্রাফার। ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র মুক্তির গান দেশের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে প্রদর্শনী ও তার প্রতিক্রিয়ায় গ্রামবাসীদের কাছ থেকে পাওয়া যুদ্ধের নানা অভিজ্ঞতার গল্প নিয়ে নির্মিত মুক্তির কথা। সাধারণত চলচ্চিত্রে যেমনটি থাকে, এই কাজটি ছিলো তা থেকে খানিকটা ভিন্ন। এখানে একজন ন্যারেটর আছেন। গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের নিজস্ব জবানিতে অভিজ্ঞতার গল্প আছে।



মিশুক মুক্তির কথায় ক্লোজআপ, বিগ ক্লোজ আপ, মিড ও লঙ শটের ব্যবহার করেছেন প্রচুর। আবহমান গ্রামের শান্ত পরিবেশ তুলে আনতে ল্যান্ডস্কেপ ভিউ নিয়েছেন। বেশকিছু শটে তিনি কাজ করেছেন ক্যামেরা হাতে নিয়ে। ফরিদপুরের কোদালিয়া গ্রামের মানুষ পাকিস্তান আর্মি এলে ঠিক কোন জঙ্গলে লুকোতেন, তা দেখানো হয় ক্যামেরা হাতে নিয়ে। সামনে বেশ ঘন জঙ্গলে যখন ক্যামেরা এগিয়ে যেতে থাকে, দর্শকের তখন মনে হতে পারে ক্যামেরা নিজেই হাঁটছে। তবে একটু দ্রুত চলার কারণে হঠাৎ হঠাৎ খুব তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে এমন একটা অনুভূতিও জাগে। কিংবা গল্পের ন্যারেটর তাজুল যখন তার দ্ইু সঙ্গীসহ বাসে করে গ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন, তখন বাসের সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরাটিও অবস্থান পরিবর্তন হতে থাকে। তাও আবার এমনভাবে যেনো মনে হয় ক্যামেরাটি স্থির আছে। শুধু বাসটাই নড়ছে।


চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ক্লোজ আপ শট্ দিয়ে মিশুক মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনিয়েছেন। তিনি একের পর এক ক্লোজ আপ শট্ দিয়ে দৃশ্যের রূপান্তর ঘটিয়েছেন। কোদালিয়ায় গণহত্যার ঘটনার যারা সাক্ষী, তাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে বিগ ক্লোজ আপ শটে। এছাড়া মুক্তির গান দেখে স্মৃতিরেখা নামের এক দর্শক যখন ’৭১-এ তাদের পুরো পরিবারের শরণার্থী হওয়ার ঘটনাটি বলছিলেন, মিশুক তখন তার হাতের ক্লোজ আপ দেখাচ্ছিলেন। তাতে আবেগ-অস্থিরতা দুটোই প্রকাশ পাচ্ছিলো। 


দৃশ্য ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ আলোকেই মিশুক বেশি ব্যবহার করেছেন। শেরপুরের কর্নাছড়ায় মুক্তির গান-এর এক দর্শককে দেখা গেছে আলো-আঁধারির মধ্যে। এর মধ্যেই দুইটি ক্লোজ আপ শট্ পাওয়া যায়। যেখানে একটি শটে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের অভিব্যক্তি যেমন তিনি দেখিয়েছেন, একইভাবে মুক্তিযোদ্ধারা যখন মুক্তির গান প্রজেক্টরে দেখছিলেন, তখন পর্দায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্লোজ শটের মুহূর্তটিও তুলে ধরেন। এই শটগুলো দিয়ে মিশুক পর্দার বাইরের ও ভিতরের মানুষগুলোর একাত্মতা অসাধারণভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা যখন কথা বলছেন, তখন উজ্জ্বল আলো ব্যবহার করা হয়েছে; আর প্রশ্নকর্তা ছিলেন আধা আলো, আধা অন্ধকারে। 


মুক্তির কথায় গেরিলা ঘাঁটিতে দর্শনার্থীদের নেওয়ার দৃশ্যে লঙ শটের ব্যবহার করেছেন মিশুক। আবার ওই এলাকায় দর্শনার্থীদের নিয়ে যাওয়ার সময় কাঁদামাটিতে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য এসেছে ক্লোজ শটে; কেউ খালি পায়ে, কেউ মলিন একজোড়া স্যান্ডেল পায়ে। বয়স আর দারিদ্রের সঙ্গে থাকা এসব মুক্তিযোদ্ধারা এখনো যে মনের দিক থেকে তরুণ, তা তাদের হাঁটার দৃঢ়তা দেখে বোঝা সম্ভব হয়েছে।


যেহেতু লঙ শটের মূলভাবই হলো মূল চরিত্রের সঙ্গে অন্যান্য চরিত্রগুলোকে একই ফ্রেমে নিয়ে আসা, সেহেতু মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার বর্ণনার দৃশ্যে ১২ থেকে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ফ্রেমে রাখা হয়েছে। ওই মুহূর্তে তাদের একজন লোকগীতি গাইছিলেন। পিছনে ছিলো বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা।


মুক্তির কথায় অল্পস্বল্প লো অ্যাঙ্গেল শটের ব্যবহারও আছে। তবে সেটি দৃশ্যগত বা ভাবগত দিক তুলে ধরার ক্ষেত্রে খুব একটি কার্যকরী হয়নি বলেই মনে হয়েছে। আবার সাদাকালো পটভূমিতে কর্নাছড়া গ্রামের গণহত্যা পুনর্নির্মাণে হাই অ্যাঙ্গেল বা জুম আউট শটগুলোর মাধ্যমে যতোটা নাটকীয়তা সৃষ্টির সম্ভাবনা ছিলো, ততোটা দেখা যায়নি। পুরো চলচ্চিত্রে ডিটেইলসের দিকে মিশুক ভালোভাবেই লক্ষ রেখেছেন। আর সেগুলো নেওয়া হয়েছে আশপাশ থেকেই। বাস টার্মিনালের ভিড়-ভাট্টা, প্রদর্শনীতে প্রজেক্টরের আলো, মাটির ঘর, প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার করে বাস্তবতাকে আরো পোক্ত করেছেন তিনি।


সিনেমাটোগ্রাফিতে কম্পোজিশন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণভাবে কম্পোজিশনের অর্থ ‘সংগঠন’। অর্থাৎ চারিত্রিক উপাদানগুলোকে এক জায়গায় করা। আবার আভিধানিক অর্থে এও বলা যায়, কম্পোজিশন হলো, ‘ÔThe arrangment of elements in artistic form’, যার কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই (১৯৮৭)।এ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা চারপাশের পরিবেশ থেকেই জন্ম নেয়। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন চরিত্র ও তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাই পরস্পরের সঙ্গে সঠিক এবং সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সম্পর্কিত করা জরুরি। তবেই কম্পোজিশন ছবিতে আলাদা প্রাণের সঞ্চার করবে। মুক্তির কথায় প্রকৃতিগত কম্পোজিশনে আবহমান গ্রাম-বাংলার চিত্রের সঙ্গে চরিত্রগুলোর উপস্থিতি ছিলো সামঞ্জস্যপূর্ণ। ল্যান্ডস্কেপ ভিউয়ে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য, সোনালি ধানের ক্ষেতের মতো কিছু দৃশ্য চিত্রায়িত হয়েছে। মুক্তির কথায় যুদ্ধের ভয়াবহার মধ্যে এই দৃশ্যগুলো যেনো মুক্তিরই ইঙ্গিত দেয়।


.

১৫ মিনিটের চলচ্চিত্র নরসুন্দর। এখানেও মুক্তিযুদ্ধের একটি ঘটনার চিত্রায়ণ। সরলভাবে কিন্তু গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভকে চ্যালেঞ্জ করে একটি বার্তা এখানে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পাকিস্তানি বিহারী হওয়ার পরও একজন মুক্তিযোদ্ধাকে রক্ষার প্রচেষ্টা দিয়ে বোঝানো হয়েছে-মানবিকতা, শত অবিশ্বাস আর দ্বন্দ্ব-সংঘাতের উর্ধ্বে।

 

নরসুন্দর-এর সিনেমাটোগ্রাফির চমৎকার দিকটি হলো, এতে ট্রাইপড ব্যবহার না করে ক্যামেরা হাতে রেখে চিত্রগ্রহণ করা হয়েছে। যা চলচ্চিত্রটির প্রতি মুহূর্তের যে টানটান উত্তেজনা সেটা ফুটিয়ে তুলতে সহায়তা করেছে। চলচ্চিত্রের শুরুটা একটি হাই অ্যাঙ্গেল শট্ থেকে। এ ধরনের শট্ সাধারণত চরিত্রের কোনো বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা তার অবস্থা প্রকাশ পায়। সাধারণত চরিত্রের ক্ষুদ্র বা অসহায় অবস্থা প্রকাশের জন্য ব্যবহার করা হয় এ ধরনের শট্। তাই চলচ্চিত্রের শুরুতে একজন রাজাকারের সাহায্যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়েক অফিসার যখন এক মুক্তিযোদ্ধাকে খুঁজতে আসে, তখন তার পরিবারের অসহায় অবস্থা দেখানো হয়। এরপরই দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা যুবকের প্রাণ হাতে নিয়ে পালানোর দৃশ্য। এখানে মিশুক তার ক্যামেরা এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যা উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে প্রতি মুহূর্তে। ক্যামেরা কখনো হাতে, কখনো বা হাতে নিয়ে দৌড়ে বেড়িয়েছেন যুবকের পিছু পিছু। এই ছুটন্ত দৃশ্যের পরেই সবকিছু কালো পর্দায় ঢাকা পড়ে, ফলে টেনশন আরো বাড়ে।


মুক্তিযোদ্ধা যুবকটিকে ঢুকে পড়তে দেখা যায়, পুরান ঢাকার এক বিহারীদের সেলুনে। উদ্দেশ্য একটি ক্ষণস্থায়ী আশ্রয়, সঙ্গে চেহারা পরিবর্তন। কিন্তু বিপদ সেখানেও ওঁত পেতে থাকে। প্রথমে পুরো সেলুনটিকে দেখানো হয়েছে আয়নার মাধ্যমে। যেনো দর্শকও ওই সেলুনের মধ্যে ঢুকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন। সেলুনের চরিত্রগুলোকেও আয়নার কাঁচের ভিতর দিয়েই স্পষ্ট দেখা যায়। অথচ ক্যামেরাকে একবারের জন্যও দেখা যায় না। পরিস্থিতি আরো ভালোভাবে বোঝাতে সেলুনে একজন বৃদ্ধকে পত্রিকা পড়া অবস্থায় দেখানো হয়, পরবর্তী সময়ে মিড শটে বোঝা যায়, সেটি ‘দ্য পাকিস্তান অবজারভার’। সেই সঙ্গে সেলুনের মালিককেও দেখা যায়, উর্দু ভাষার পত্রিকা হাতে।


মুক্তিযোদ্ধা যুবক এবং অন্য দুটি চরিত্রকে একই আয়নার তিনটি ভাগে একই সঙ্গে দেখানো হয়েছে। সেখানে সবার ডানে ছেলেটি, তার বাম পাশে দুইজন বিহারী নাপিতকে দেখে খানিকটা অশনি সঙ্কেত অনুভূত হয়। সেলুনের ভিতরে মিড শট্ ও ক্লোজ শটের ব্যবহার করা হয়েছে বেশি। পার্শ্ব চরিত্রগুলোকে অনেক সময় এক ফ্রেমে রাখা হয়েছে আয়নার মাধ্যমে-কখনো যুবক ও সেলুনের মালিক, কখনো দুই নাপিত ও গ্রাহক আবার কখনো তিনটি চরিত্র একসঙ্গে। মূলত ক্লোজ শটে ছেলেটির ভীত-সন্ত্রস্ত মুখ, সেখানে বিন্দু বিন্দু ঘাম, মুক্তিযোদ্ধা যুবকের গলার কাছে ক্ষুর নিয়ে দাড়ি কামানোর দৃশ্য দর্শককে আচমকা ধেয়ে আসা কোনো বিপদের আশঙ্কায় ফেলে।


কিছু ক্ষেত্রে এক্সট্রিম ক্লোজ শটের ব্যবহার করে মিশুক গল্পকে আলাদা গতি দিয়েছেন। নাপিত যুবকের গলায় ক্ষুর চালানোর সময় গলা কেটে মেরে ফেলার আশঙ্কায় ছেলেটির চমকে ওঠা, অনেক দর্শককেই চমকে দিয়েছে নিঃসন্দেহে। এই ক্ষুর চালানোর প্রতিটি মুহূর্ত কিংবা জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তানের সভাপতির নাম শুনেই ভিতরে ভিতরে অস্থির মানুষটির যে অভিব্যক্তি তা অন্যদেরকে প্রভাবিত করে। এছাড়া লো অ্যাঙ্গেল শটের মাধ্যমে দুর্বৃত্তদের ক্ষমতার প্রকাশ ফুটে উঠেছে যথার্থভাবেই। যুবকের বাবা পাকিস্তানি আর্মির গুলিতে আহত হওয়ার পর তার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ বিভিন্ন শটে একইভাবে উঠে এসেছে।


ক্লোজ ও এক্সট্রিম ক্লোজ শট্ বেশি ব্যবহারের ফলে কম সংলাপে, শুধু অভিব্যক্তি দিয়ে চরিত্রগুলো বোঝা সম্ভব হয়েছে। সেই সঙ্গে নরসুন্দর-এর ফ্রেমিং-এর কথা না বললেই নয়। প্রতিটি ফ্রেম এখানে ঘটনার গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ক্যামেরা প্যান ও লঙ শটের ব্যবহারও করেছেন মিশুক। নরসুন্দর-এর গল্প অনুযায়ী মিশুক যে ধরনের কম্পোজিশন করেছেন, তাতে চলচ্চিত্র পাকাপোক্ত অবস্থান নিতে পেরেছে। বিশেষ করে ‘৭১-এর ইতিহাসকে গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের বাইরে গিয়ে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে দেখানোর যে চেষ্টা তারেক করেছেন, তার ভাষা দর্শকের মনে গেঁথে দিতে কম্পোজিশনটি নিঃসন্দেহে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো।


চলচ্চিত্রে আলো ও রঙের উপস্থিতিও লক্ষ করার মতো। সাধারণত চলচ্চিত্রে রঙের ব্যবহার করতে গেলে মনে রাখতে হয়, রঙ মানে শুধু প্রকৃতির রঙ না, রঙের অর্থও অনুভব করা যায়। মানুষের মনের ইচ্ছা, কল্পনার জগৎকে এই রঙ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব। স্থান, কালভেদে, ঐতিহ্যগতভাবে রঙের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। আবার এক এক সমাজ ও সংস্কৃতিতে রঙের অর্থও ভিন্ন হয়। একজন সিনেমাটোগ্রাফারকে এই বিষয়টিও মনে রাখতে হয়।১০ নরসুন্দর-এ উজ্জ্বল কোনো রঙের ব্যবহার নেই; আধা ফিকে টোনের ব্যবহার আছে। এছাড়া আলোর ব্যবহারও হয়েছে পরিস্থিতি অনুযায়ী। ফলে উদ্বেগজনক, ভীতিকর ও মলিন একটি আবহ ছিলো চলচ্চিত্রজুড়েই। যেহেতু হালকা টোনের বিষয়বস্তু সহজে চোখে পড়ে, সেজন্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বা বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের টোন ব্যবহার করা হয়।


পরিকল্পিত গতিশীলতা চলচ্চিত্রের ভাষাকে অর্থবহ করেছে। অর্থাৎ, সিনেমাটোগ্রাফার যেদিকে দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে চেয়েছেন, সেদিকেই ধরে রাখতে সক্ষম হওয়া আর কী। এজন্য মুক্তিযোদ্ধা যুবক ও তার দাড়ি কাটতে থাকা নাপিতের সঙ্গে ফ্রেমে অন্য কেউ থাকলেও তা কোনো সমস্যা তৈরি করেনি। আবার এখানে ডিটেইলের কাজও আছে। ছোটো ছোটো উপাদান ও উপকরণগুলো এক সুতোয় গেঁথে সিম্বলিক বা লিরিকাল অথবা সুররিয়ালিস্টিক বা ডকুমেন্টারি সৃষ্টি করা হয়েছে এর মাধ্যমে। এটি চরিত্র বা মুহূর্তগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।১১ অ্যাটমোসফেয়ারিক ডিটেইল হিসেবে ফ্রেমের মধ্যে ঘরের দেয়ালে টানানো সুকান্ত ভট্টাচার্যের ছবি, পুরনো সোফা, মুক্তিযোদ্ধা পালানোর সময় পাশ দিয়ে কখনো রিকশার যাওয়া, রাস্তার ধারে একজন বৃদ্ধার বসে থাকা কিংবা মুক্তিযোদ্ধার সাইকেলওয়ালার পাশ কাটানোর মতো শট্ সংযোজিত হয়েছে। তবে নরসুন্দর-এর প্রায় শেষের দিকে পাকিস্তানি সেনাকর্মকর্তাদের সেলুনে প্রবেশের পর মুক্তিযোদ্ধার খোঁজ করতে থাকা শটটি একটু দীর্ঘ হয়েছে বলে মনে হয়।


.

চলচ্চিত্রের একটি প্রধান দিক হলো, তা নিত্যকার বিষয়গুলো ভিন্নভাবে, ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করতে পারে। অধিকাংশ দর্শকের কাছে চলচ্চিত্র মানে শুধু কাহিনির বর্ণনা। কিন্তু আসলে চলচ্চিত্র সেই গল্প বা কাহিনিকে ব্যাখ্যাও করে। এই ব্যাখ্যা যতো বেশি সুস্পষ্ট সেই চলচ্চিত্র ততো বেশি ভালো। সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে মিশুকের সর্বশেষ কাজ তারেকের রানওয়ে। চলচ্চিত্রটির পটভূমি রচিত হয়েছে বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে। এর মূল চরিত্র রুহুল আমিন নামের এক বেকার তরুণ। বিমান বন্দর সংলগ্ন এলাকায় একটি একচালা ঘরে মা, দাদা ও বোনকে নিয়ে তার সংসার। মাদ্রাসায় দাখিল পর্যন্ত পড়া রুহুল কীভাবে ধীরে ধীরে জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তার একটি চিত্রায়ণ রানওয়েতে পাওয়া যায়। রাষ্ট্র যখন কোনো শ্রেণির প্রতি অন্যায়, অবিচার বা পক্ষপাতমূলক আচরণ করে, তখনই অনিষ্ট জন্ম নেয়। তাই রুহুল ‘জঙ্গি’ হলে সমাজ হৈ হৈ করে ওঠে; কিন্তু কেনো সে এ পথে পা বাড়ালো তার কারণ কেউ জানতে চায় না।


রানওয়েতে মিশুক এক্সট্রিম লঙ শট্, লঙ শট্, রিভার্স শট্, লো অ্যাঙ্গেল, হাই অ্যাঙ্গেল, টিল্ট ডাউন-অবস্থা পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের বিবিধ শটের ব্যবহার করেছেন। আধুনিক প্রযুক্তির সিনে-আল্ট্রা ক্যামেরায় দৃশ্যগুলো ধারণ করেছেন মিশুক। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে এ ধরনের একটি ক্যামেরা মিশুক আমেরিকা থেকে নিয়ে আসেন।১২ চলচ্চিত্রের শুরুতেই বিমানের উঠানামা এবং সেই সঙ্গে বিমানের শব্দে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে থাকা রুহুলদের ঘরের দুর্বল তাকের উপর রাখা গ্লাস ও অন্যান্য জিনিস কেঁপে ওঠার দৃশ্যতে পেশাদারিত্বের ছাপ পাওয়া যায়। 



এছাড়া বিভিন্ন সময়েই দেখা যায়, ঘটনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিমান উড়ে চলেছে আকাশে। এ ধরনের শটের মূলভাব থাকে সামাজিক বৈষম্যের উপস্থাপন দেখানো। বিমানবন্দরের পাশেই বাস করা রুহুলের পরিবার যতোটা ক্ষুদ্র অসহায়, বিমানে থাকা মানুষগুলো ততোটাই ক্ষমতাশালী। এই বৈষম্য তারেক নানাভাবে তুলে ধরেন। শহরে একদিন রুহুলকে বহন করা রিকশাটি ব্যক্তিগত একটি গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খায়। দোষ গাড়ি চালকের থাকলেও মার খায় রুহুল। কারণ একে সে গরীব, তার ওপর গাড়ি চালক রিকশাচালককে মারতে উদ্যত হওয়ায় সে প্রতিবাদ করে। ব্যাপারটা এমন, রুহুল যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে তারা প্রতিবাদ করলেও মার খায়, প্রতিবাদ না করলেও মার খায়। মিশুক এই পরিস্থিতিতে যে শটটি নেন, সেখানে দেখা যায়, আকাশের দিকে ছুটে চলা অতিকায় যন্ত্র বিমান, নিচে মার খাওয়া বিক্ষুব্ধ রুহুল। যদিও এই প্রতিবাদ থেমে থাকে না। পরের শটেই ছোটো এক বাচ্চাকে দেখা যায়, উড়োজাহাজের দিকে গুলতি ছুঁড়ে মারতে। রুহুল তা হাসিমুখে দেখতে থাকে।  


রানওয়েতে কথোপকথনের বেশকিছু জায়গায় মিশুক রিভার্স শটের ব্যবহার করেছেন। সেই সঙ্গে অনেক সময় ফোকাস ও ডি-ফোকাসের মাধ্যমে যোগ করেছেন আলাদা মাত্রা। একটি দৃশ্যে দেখা যায়, অস্থির রুহুল আয়নার সামনে বসে। যে পথটি সে বেছে নিয়েছে, সেটি ঠিক না বেঠিক তা নিয়ে সে বিভ্রান্ত। সামনে দুটি আয়না। দু’টি প্রতিবিম্বের মধ্যে তর্ক চলছে। এখানেও ক্যামেরার উপস্থিতি একবারের জন্যও টের পেতে দেন না মিশুক।


কম্পোজিশন যেহেতু চিত্রগত উপাদানগুলোর বিন্যাস। তাই ফ্রেমে কোন জিনিসটি থাকবে, কোনটি থাকবে না কিংবা কতোটা থাকবে ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে বিন্যাস করা হয়।১৩ রানওয়ের প্রকৃতিগত কম্পোজিশন চমৎকার। রুহুলের মায়ের কাপড় কাচার দৃশ্যের সঙ্গে দর্শক মাছ ধরার দৃশ্যও দেখেন। বাঁশ দিয়ে জাল ফেলে মাছ ধরার দৃশ্যে একটি টিল্ট ডাউন শট্ আছে। কিংবা রুহুল একমনে তাকিয়ে থাকে পানির দিকে। পানিতে ভাসে রুহুল আর থোকা থোকা মেঘের ছায়া। চারপাশে বিকেলের আলো; দর্শক যেনো এই অস্থির পরিবেশে একটু স্বস্তি পায় প্রকৃতির স্পর্শে। সুন্দর কিছু ল্যান্ডস্কেপ ভিউ পাওয়া যায় এখানে। রুহুলের বন্ধু আরিফ হলুদ ফুলে ছেয়ে যাওয়া সরিষা ক্ষেতের ভিতরের রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতে থাকে, তারপর একসময় বিন্দু থেকে বিন্দুতে মিলিয়ে যায়। ‘জিহাদে’ অংশ নিয়ে ‘শহীদ’ হওয়ার চেষ্টায় সে বেরিয়ে পড়েছিলো। অনন্ত সেই যাত্রার একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় এ দৃশ্যে।


রানওয়েতে ঘটনা ও চরিত্রের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রঙের ব্যবহার দেখা যায়। দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ফিকে, আধা ফিকে টোনের ব্যবহার হয়েছে। পুরো চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্র রুহুলকে হালকা রঙের পোশাকে দেখা যায়। গল্পের প্রয়োজনে কখনো আরিফ চরিত্রটির ওপরও এই টোন ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রকৃতিকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার হয়েছে পুরো চলচ্চিত্রে। সেই সঙ্গে ফ্রেমিং-এর কথা যদি বলা হয়, তবে তাতেও মিশুক সফল। চলচ্চিত্রের প্রায় প্রতিটি ফ্রেম গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দৃষ্টিনন্দন। 


এছাড়া রানওয়ে শেষ হওয়ার কয়েক মুহূর্ত আগে নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিত কিছু ডিটেইলের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। খুঁটিনাটি, ছোটোখাটো বিষয়গুলো চিত্রায়ণের সময় সিনোমাটোগ্রাফার বিষয়গুলো লক্ষ রেখেছেন বলে মনে হয়েছে। ভাঙা হাড়ি, আধা চ্যাপ্টা টিন যেমন প্রয়োজনে ফ্রেমে থাকে, তেমনি ফুলের উপর ফড়িং, পিঁপড়ার সারি কিংবা মাছ ধরার জালে বিছিয়ে থাকা সোনার মতো পানির বিন্দু-দর্শক যেনো বুঝতে পারে, চারপাশের ছোটো ছোটো সৌন্দর্য জীবনকে আনন্দময় করে তোলে। 


রানওয়েতেও পরিস্থিতি অনুযায়ী আলোর ব্যবহার করেছেন মিশুক। রাতের অন্ধকারে সারি সারি আলোর মধ্যে থেকে বিমান উড়ার সময় একরকম আবহ। অন্যদিকে রুহুলদের বাড়ির আলো আর দশটা ঘরের মতোই-সকাল-সন্ধ্যা-রাত। কখনো উজ্জ্বল, আবার কখনোবা আলো-আঁধারি। কখনো পানিতে রুহুলের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে সূর্যাস্তের মিষ্টি আভা। আবার জঙ্গিদের জিহাদি নির্দেশনার আসরে যে আলো, তাতে পরিবেশটাকে অশুভ বলেই মনে হয়।


শেষ দৃশ্যে নবজীবনের প্রকাশ বোঝাতে রুহুলকে দুধ দিয়ে মুখ ধুইয়ে দেওয়ার বিষয়টি খানিক দুর্বলই মনে হয়েছে। এছাড়া জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করতে থাকা আরিফকে যখন চিকিৎসকেরা নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন আলো-আঁধারিতে হঠাৎ আলোর ঝলকানি চোখে পড়ে। বিষয়টি স্পষ্ট নয়, এই আলোর উৎস কী? সাংবাদিকরা তার ছবি তুলছে নাকি মাথার উপরের বাল্ব থেকে আলোটি আসছে।  


৭.

তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের যৌথ মননের প্রকাশ পাওয়া যায় তাদের নির্মিত প্রতিটি চলচ্চিত্রে। সেই সঙ্গে ক্যাথরিন মাসুদের সৃজনশীল সম্পাদন এতে সবসময় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। ক্যামেরা চালাতে না জানা মিশুক একসময় হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ভিডিওগ্রাফার। সমাজ ও রাজনীতিকে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠে উল্টে দেখার চেষ্টা করতেন তারেক মাসুদ। আর মিশুক মুনীর তাকেই প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ও মুভমেন্টের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও ব্যবহারিক জ্ঞানের সমন্বয়ের একটি প্রচেষ্টা দেখা গেছে তার কাজে। নতুন নতুন চিন্তার খোরাকও যুগিয়েছেন তিনি। তাই এসব চলচ্চিত্র শুধু চলচ্চিত্র-ই থাকেনি, হয়ে উঠেছে সমাজ, সংস্কৃতি ও বৈষম্যকে তুলে ধরার হাতিয়ার। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মৃত্যু না হলে দেশের চলচ্চিত্র যে নতুন কিছু পেতো, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।


লেখক : সারা মনামী হোসেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনে পড়ান।


[email protected]

 

তথ্যসূত্র ও টীকা


১. http://www.fdtimes.com/2014/05/20/remembering-gordon-willis-asc/; retrieved on 13.11.2017

২. ওলান, টানা (২০০২ : ২২); ‘সিনেমাটোগ্রাফির বর্তমান ও ভবিষ্যত : সিনেমাস্কোপ থেকে আইম্যাক্স’; মুভি ফটোগ্রাফি; সম্পাদনা : ধীমান দাশগুপ্ত, বাণীশিল্প, কলকাতা।

3.goo.gl/pDuuXK; retrieved on 19.10.2017

4.http://www.bbc.com/news/entertainment-arts-26987466?ocid=socialflow_twitter; retrieved from 19.10. 2017

৫. প্রাগুক্ত; ওলান (২০০২: ১৯)।

6.goo.gl/SML7MK; retrieved from 19.10. 2017

7. goo.gl/oSuAQQ; retrieved on 13.11.2017

8.goo.gl/WUH6Qq; retrieved on 30.10.2017

৯.দাশগুপ্ত, ধীমান (১৯৮৭ : ৭); কম্পোজিশন; বাণীশিল্প, কলকাতা।

১০. দাশগুপ্ত, ধীমান (১৯৮৮ : ৬৭); ‘ইমেজ, কম্পোজিশন ও মনতাজ’; চলচ্চিত্রের টেকনিক ও টেকনোলজি; সম্পাদনা: ধীমান দাশগুপ্ত; বাণীশিল্প, কলকাতা।

১১. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত (১৯৮৮ : ৬৪)।

12.goo.gl/W3CcGp; retrieved on 2.11.2017

১৩.প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত (১৯৮৮ : ৪৭Ñ৬৯)।

১৪. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত (১৯৮৮ : ৫০)।

15.goo.gl/dov99L; retrieved on 19.10.2017

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন