Magic Lanthon

               

প্রদীপ দাস

প্রকাশিত ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জন-জাতির নয়

প্রদীপ দাস


প্রাক-কথন ও অন্যান্য


বাংলা ভূখণ্ড পাকিস্তান মুক্ত হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত- দেশটি একটু একটু করে নিজেকে গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করছে তখন। শাসক, শোষক, ধর্ষক, দুর্নীতিবাজ, দখলদার কেবল তো পাকিস্তানিরাই নয়, বিশ্বের সব মানবজাতির মধ্যেই এই বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান। বাঙালিও এর বাইরে নয়। ফলে পাকিস্তান মুক্ত হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের নামেও চলে লুটপাট, কাঁড়ি কাঁড়ি সম্পত্তির মালিক হওয়া, নব্য-ক্ষমতাসীনদের এক শ্রেণির স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি-সবমিলিয়ে ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়ে ওঠায় দুর্ভিক্ষ নেমে আসে দেশে। এখানে থেমে গেলেও হতো, কিন্তু তা হয়নি। পাকিস্তানমুক্ত হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি যারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আছে, তারা কেউই এই বৈশিষ্ট্যগুলো পরিহার করেনি।


ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে গেলে অনেকে সেই মোহ ছাড়তে পারে না ঠিকই, এটাও ঠিক অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কিছু মানুষ সেই ক্ষমতাবানদের ক্ষমতার জাল ইঁদুরের মতো কুটকুট করে কাটতে থাকে। যারা মানুষের কথা, পশুপাখির কথা, বন-নদী-জঙ্গল-পাহাড়, বায়ু-শব্দ-মাটি-জল প্রকৃতির কথা বলে যায় প্রতিনিয়ত। ক্ষমতাবানদের কাছে নয়; প্রকৃতির কথা বলে, প্রকৃতির অধিকার নিয়ে কাজ করে, তাদের কথা-কাজে-চিন্তা-চেতনায় আশ্রয় হয় জন-মানুষের। এইসব চিন্তা-চেতনা জন-মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম চলচ্চিত্র। এমন অনেক চলচ্চিত্রও পাওয়া যায়, যেগুলো বন-জঙ্গল-পশুপাখি-মানুষ-প্রকৃতির কথা বলে। কিন্তু রাষ্ট্রের বেড়াজাল এতোই মজবুত যে, অনেকের পক্ষেই তা থেকে বেরিয়ে চলচ্চিত্রে মানুষ-প্রকৃতির কথা বলা সম্ভব হয় না। তখন বাধ্য হয়েই অনেকে চলচ্চিত্রকে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের হাতিয়ার করে তোলে। আবার অনেকে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগের লোভে সেই বেড়াজালের বাইরে আসার চিন্তাভাবনাই করে না। সবাই যেনো কাজটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যায়, রাষ্ট্র সেজন্য ব্যবস্থা করে থাকে নানাধরনের প্রণোদনাও। এই বিষয়গুলো শুধু চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 


এরকম পরিপ্রেক্ষিতে জনসাধারণের টাকায় রাষ্ট্র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দিলে দ্বন্দ্বের জন্ম হয় এই ভেবে যে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে কাজ করা রাষ্ট্রীয় চলচ্চিত্রগুলো পুরস্কার পাবে নাকি প্রকৃতির পক্ষে কাজ করাগুলো। এই আলোচনায় সৃষ্ট দ্বন্দ্বের কিছুটা হলেও সমাধান দেওয়ার চেষ্টা থাকবে এই প্রবন্ধে। এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক অন্যান্য আলোচনার সঙ্গে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া বাপজানের বায়স্কোপকে।


জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কথন


কোনো প্রতিষ্ঠান, সংগঠন যাত্রা শুরুর কালে অতোটা সমৃদ্ধ থাকে না, দীর্ঘ পথ চলার পর তারা কোনো একটা অবস্থায় গিয়ে দাঁড়ায়। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও ঠিক একইভাবে আগের তুলনায় বর্তমানে বেশি কিছু ধারণ করে, যেমন : ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে যোগ হওয়া আজীবন সম্মাননা বিভাগ। বর্তমানে মোট ২৮টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়া হয়। এগুলো হলো-আজীবন সম্মাননা, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রধান চরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী নারী, প্রধান চরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী পুরুষ, শ্রেষ্ঠ নারী অভিনয়শিল্পী পার্শ্বচরিত্রে, শ্রেষ্ঠ পুরুষ অভিনয়শিল্পী পার্শ্বচরিত্রে, শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী খলচরিত্রে, শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী কৌতুক চরিত্রে, শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী, শ্রেষ্ঠ শিল্পী শাখায় বিশেষ পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক, শ্রেষ্ঠ নৃত্য পরিচালক, শ্রেষ্ঠ নারী সঙ্গীতশিল্পী, শ্রেষ্ঠ পুরুষ সঙ্গীতশিল্পী, শ্রেষ্ঠ গীতিকার, শ্রেষ্ঠ সুরকার, শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার, শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার, শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা, শ্রেষ্ঠ সম্পাদক, শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশক, শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক, শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক, শ্রেষ্ঠ পোশাক সাজসজ্জা, শ্রেষ্ঠ মেক-আপম্যান।


এই বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগ। কারণ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে যেটি পুরস্কৃত হয়, সেই চলচ্চিত্র অন্যান্য বিভাগেও পুরস্কার জিতে থাকে। যেমন : ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে মোট ১৭টি বিভাগে পুরস্কার জিতে নেয় গাজী রাকায়েত পরিচালিত মৃত্তিকা মায়া। তাছাড়া এই সবগুলো বিভাগে ভালো করলেই তো একটি ভালো চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে। তাই অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়ারপ্রসঙ্গ আসলেই আলোচনা ঘুরপাক খায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে।


লাঠিয়াল ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপায়। এরপর ১৯৭৬-এ মেঘের অনেক রঙ, ১৯৭৭-এ বসুন্ধরা, ১৯৭৮-এ গোলাপী এখন ট্রেনে, ১৯৭৯-তে সূর্য দীঘল বাড়ী, ১৯৮০-তে এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে কোনো চলচ্চিত্র বা বিভাগকে পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য মনে না করায় ব্যক্তি বা কর্মকে পুরস্কার দেওয়া থেকে বিরত থাকে জুরি বোর্ড। পরের বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়া হলেও শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। পরে ১৯৮৪-তে ভাত দে, ১৯৮৫, ১৯৮৭ ও ১৯৮৯-তে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হয়নি, ১৯৮৬-তে শুভদা, ১৯৮৮-তে দুই জীবন, ১৯৯০-এ গরিবের বউ, ১৯৯১-এ পদ্মা মেঘনা যমুনা, ১৯৯২-এ শঙ্খনীল কারাগার, ১৯৯৩-এ পদ্মা নদীর মাঝি, ১৯৯৪-এ আগুনের পরশমণিদেশপ্রেমিক, ১৯৯৫-এ অন্য জীবন, ১৯৯৬-এ পোকা মাকড়ের ঘর বসতি, ১৯৯৭-এ দুখাই, ১৯৯৮ ও ২০০৩-এ শ্রেষ্ঠ চলচিত্র পুরস্কার দেওয়া হয়নি, ১৯৯৯-এ চিত্রা নদীর পাড়ে, ২০০০-এ কিত্তনখোলা, ২০০১-এ লালসালু, ২০০২-এ হাসন রাজা, ২০০৪-এ জয়যাত্রা, ২০০৫-এ হাজার বছর ধরে, ২০০৬-এ ঘানি, ২০০৭-এ দারুচিনি দ্বীপ, ২০০৮-এ চন্দ্রগ্রহণ, ২০০৯-এ মনপুরা, ২০১০-এ গহীনে শব্দ, ২০১১-তে গেরিলা, ২০১২-তে উত্তরের সুর, ২০১৩-তে মৃত্তিকা মায়া, ২০১৪-তে নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ এবং ২০১৫-তে যৌথভাবে অনিল বাগচীর একদিন ও বাপজানের বায়স্কোপ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।


পুরস্কারের এই তালিকায় একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নির্মিত চলচ্চিত্র খুব কমই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছে। তাই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তাদের পুরনো অভিযোগ, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে বিকল্পধারার চলচ্চিত্রনির্মাতাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়, তারা বৈষম্যের শিকার। এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে বিকল্পধারা বিষয়ে কিছু কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছি। বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতরা ৮০’র দশকে যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন, তখন তা বিকল্পধারা হিসেবে পরিচিতি পায়। যার যাত্রা শুরু হয় মোরশেদুল ইসলামের ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে আগামীর মধ্য দিয়ে। বোদ্ধা মহলে প্রশংসিত এই ধারার চলচ্চিত্রকে অনেকে নাটক বলতেও ছাড় দেয় না। তবে চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক মাহমুদুল হোসেন বিকল্পধারা বলতে কেবল সেইসব চলচ্চিত্রকেই বোঝেন, যেগুলো বিকল্প প্রকল্প উপস্থাপন করে।


বিকল্পধারা নিয়ে এসব কথার প্রাসঙ্গিকতা এখানেই যে, পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের তালিকায় শুধু বিকল্পধারাই নয়, বাণিজ্যিক প্রাধান্যশীলতার বাইরে গিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র এবং সরকারি অনুদান পাওয়া চলচ্চিত্রও রয়েছে। তাছাড়া পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে বিকল্পধারা ও বাণিজ্যিকধারা মোটেও মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে না। বরং বাণিজ্যিক প্রাধান্যশীল ধারা (মূলধারা হিসেবেও পরিচিত)ও বিকল্পধারা বিতর্কে পড়ে থাকলে সরকারি অনুদানে পাওয়া চলচ্চিত্রের পুরস্কার লাভের নানা বিষয়-আশয় আড়ালে চলে যায়। তবে তারেক মাসুদ এর সমাধান দিয়েছেন এভাবে-


একই মানদণ্ডে সৃজনশীল ও বাণিজ্যমূল্য ছবির বিচার সম্ভব নয়। এ কারণেই প্রতিবেশী দেশে নান্দনিক বিচারে আয়োজিত জাতীয় পুরস্কারের মূল প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ‘শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় ছবি’র শাখা প্রবর্তিত হয়েছে। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই উদাহরণকে কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয় ছবিকে পুরস্কার প্রদানের ধারা প্রবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছি।


কিছু প্রশ্ন


সব প্রতিষ্ঠান, সংগঠনের সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা থাকে; হতে পারে তা লিখিত বা অলিখিত। ওইসব প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন যদি পুরস্কারও প্রদান করে, সেটারও কিছু নীতিমালা থাকে। পুরস্কারের জন্য কাকে নির্বাচন করা হচ্ছে, কেনো করা হচ্ছে কিংবা কেনইবা অন্যদের বাদ দেওয়া হলো-এই সবকিছুর পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকে পুরস্কার সংশ্লিষ্টদের কাছে। বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও এর ব্যতিক্রম নয়; এরও রয়েছে সুর্নিদিষ্ট কিছু নীতিমালা। যে নীতিমালা বা ছাঁকনি দিয়ে প্রত্যেক বছর বেরিয়ে আসে বর্ষ সেরা চলচ্চিত্রসহ অন্য সেরারা। সুনির্দিষ্ট ছাঁকনি থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে প্রদান করে আসা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক প্রচলিত রয়েছে বাজারে। তাই প্রশ্ন তোলার অবকাশ থেকে যায়, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদানের যে ছাঁকনি জনতার সামনে ঝুলিয়েরেখেছে কর্তৃপক্ষ, বাস্তবে কি সেই ছাঁকনির মধ্য দিয়েই সেরাটা নির্বাচন করে জুরি বোর্ড? নাকি এর পিছনে কাজ করে অন্য কোনো ছাঁকনি? এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা থাকবে এখন।


এক.


জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মানদণ্ড কী? কী ধরনের চলচ্চিত্রকে জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হয়? এক্ষেত্রে পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের চলচ্চিত্র অধিশাখায় কী বলা হয়েছে তা দেখা যাক। পুরস্কারের জন্য বিবেচ্য বিষয়সমূহের পাঁচ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘পুরস্কারযোগ্য প্রতিটি শাখায় গুণগত ও শৈল্পিক মানে শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হবে’ এবং ছয় নম্বর ধারায় বলা আছে, ‘দেশীয় প্রেক্ষাপট, পরিচালকের মৌলিকত্ব ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর বহনকারী চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবে।’


এসব বক্তব্যের সঙ্গে এ কথা সাংঘর্ষিক হবে না যে, রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, মানে দেশের সব নাগরিকের প্রদান করা পুরস্কার এটি। তাই যে চলচ্চিত্রটি দেশের নাগরিকদের মঙ্গলে ভূমিকা রাখবে এবং নাগরিকদের উপেক্ষা করে যা কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য সাধন করবে না বা ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবে না, সেটিই জনগণের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণের দৌড়ে এগিয়ে থাকবে। রাষ্ট্রীয় যেকোনো পুরস্কারের ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। এখন দেখার বিষয়, এসব ক্ষেত্রে জাতীয় পুরস্কার কতোটা নৈর্ব্যক্তিক থাকতে পেরেছে।


২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি নির্মলেন্দু গুণ ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন, যার কিছু অংশ এমন-


আমার একদা সহপাঠিনী, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার দৃষ্টে আমি প্রথম কিছুকাল অবাক হয়েছিলাম-কিন্তু আজকাল খুবই বিরক্ত বোধ করছি। অসম্মানিত বোধ করছি। ক্ষুব্ধ বোধ করছি। ... শেখ হাসিনা স্বাধীনতা পদকের মুলোটি আমার নাকের ডগায় ঝুলিয়ে রেখেছেন। কিন্তু কিছুতেই সেটি আমাকে দিচ্ছেন না। উনার যোগ্য ব্যক্তির তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হতে হতে আকাশ ছুঁয়েছে। কিন্তু সেই তালিকায় আমার স্থান হচ্ছে না।


এমন স্ট্যাটাসের ১০ দিন পর নির্মলেন্দু গুণকে স্বাধীনতা পদক দেওয়ার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ সরকার। নির্মলেন্দু গুণ স্বাধীনতা পদক পাওয়ার যোগ্য কি যোগ্য নন, এমন প্রশ্নের অবতারণা করার জন্য এই প্রসঙ্গ টানা নয়। এই আলোচনা এজন্য করা, পুরস্কার কে পাবে-কে পাবে না, তা নির্ভর করে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর।


দুই.


তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মানুযায়ী, এর অতিরিক্ত সচিবকে সভাপতি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সহসভাপতিকে সদস্য-সচিব এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বি এফ ডি সি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক, বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র বিভাগের একজন শিক্ষক, একজন চলচ্চিত্র পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক, চিত্রগ্রাহক, নারী অভিনয়শিল্পী, পুরুষ অভিনয়শিল্পী, নারী/পুরুষ সঙ্গীতশিল্পী ও একজনচলচ্চিত্র গবেষক/সমালোচককে সদস্য করে একটি কমিটি করা হয়; এদের সুপারিশে গঠিত হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য জুরি বোর্ড। যাচাই-বাছাইয়ের পর জুরি বোর্ড শিল্পী ও কলা-কুশলীদের নাম সুপারিশ করে এবং সেই সুপারিশমালা জাতীয় পুরস্কার সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করা হয়। কমিটি অনুমোদন করলে নির্বাচিতরা পুরস্কারের জন্য চূড়ান্ত হয়।


এতক্ষণ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য শ্রেষ্ঠদের বাছাইয়ের প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হলো। প্রশ্ন উঠতে পারে, বাছাই প্রক্রিয়া বর্ণনার যৌক্তিকতা কোথায়? বিস্তারিতভাবে উত্তর দিতে হলে বলতে হয়, যাদের একটু-আধটু চোখ-কান খোলা আছে তারা লক্ষ করে থাকবে, এদেশে যখন কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যায়, তখন যেকোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদ থেকে বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থক-অনুগতদের সবার আগে প্রত্যাহার করা হয়। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যোগ্য কি অযোগ্য, সেই বাছ-বিচার না করেই তাকে সরিয়ে বসানো হয় ক্ষমতাসীন দলের পছন্দ মতো বা অনুগত ব্যক্তিকে। এমনকি নতুন যে দল ক্ষমতায় আসে, তারা আগে যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে তাদের চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও বাদ দেওয়ার নজির দেখা যায়। মুছে ফেলা হয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে থাকা ক্ষমতাহীন দলের নামফলকও।


এরকম রাজনৈতিক বাস্তবতায় পাঠকরা নিশ্চয় একমত হবে, যেসঙ্গীত পরিচালকক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য সাধনে কাজ করবেন, কেবল তিনিই জুরি বোর্ডের সদস্য নির্বাচনের সুযোগ পাবেন। ঠিক একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নারী/পুরুষ অভিনয়শিল্পী, নারী/পুরুষ সঙ্গীতশিল্পী, চলচ্চিত্র গবেষক/সমালোচক, চলচ্চিত্রনির্মাতা কিংবা অন্য, যারা জুরি বোর্ডের সদস্য নির্বাচনের দায়িত্বে আছে তারাও ক্ষমতাসীনদের আনুগত্য বা উদ্দেশ্য সাধনকারীই হবে।তাহলে দেখা যাচ্ছে, জুরি বোর্ডের সদস্যদের নাম যারা ঘোষণা করবে, তারাই পক্ষপাত দোষে দুষ্ট বা ক্ষমতাসীনদের প্রতিনিধি। অর্থাৎ গোড়ায় গলদ দিয়ে যাত্রা শুরু। তারা যখন জুরি বোর্ডের সদস্য সুপারিশ করবে, সেসব সদস্য নিশ্চয় ক্ষমতাসীনদের বাইরের কেউ হবে না।ফলে এই জুরি বোর্ড যখন চলচ্চিত্র নির্বাচন করে, তখন‘গুণগত ও শৈল্পিক মানে শ্রেষ্ঠ’ বা ‘দেশীয় প্রেক্ষাপট, পরিচালকের মৌলিকত্ব ও সৃজনশীলতার’ মানদণ্ড উবে যায়। সেখানে এসে হাজির হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা এজেন্ডা। আর চলচ্চিত্রের সারমর্ম বা এজেন্ডা যখন ক্ষমতাসীনদের এজেন্ডার সঙ্গে মিলে যায়, এক হয়; তখনই কেবল সেটি শ্রেষ্ঠ জাতীয় চলচ্চিত্রের ভূষণ পায়।


তাই বলতে বাধা নেই, যারা বৃহন্নলা-কাণ্ডে জুরি বোর্ডের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তারা বোকার স্বর্গে বাস করে,নয়তো বুঝেও না বোঝার ভান করে। বৃহন্নলা-কাণ্ড নিয়ে একটু কথা বলে নেওয়া যাক। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে মুরাদ পারভেজ পরিচালিত বৃহন্নলা জাতীয় চলচ্চিত্রপুরস্কার পেলে চলচ্চিত্রটির বিরুদ্ধে গল্প ও গান চুরির অভিযোগ ওঠে। পরে প্রমাণিত হয়, সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের ‘গাছটি বলেছিল’ গল্পটি চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন নির্মাতা মুরাদ পারভেজ। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও দেবেশ রায়ের মতো ব্যক্তিরা এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী বরাবর চিঠি লেখেন। গণমাধ্যমে শিরোনাম হয় ‘লজ্জার নাম বৃহন্নলা’, “‘বৃহন্নলা’ চলচ্চিত্রের ইতিহাসে লজ্জাজনক ঘটনা”। জুরি বোর্ডের সদস্যদের গল্প-গান চুরির ঘটনা ধরার ক্ষমতা থাক আর না থাক, তাদের এই ক্ষমতা আছে-কমিউনিটি ক্লিনিক, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুতায়নসহ বৃহত্তর অর্থে ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডার ইতিবাচক প্রচারে চলচ্চিত্রটির ভূমিকা বুঝতে পারা। রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বিষয়টি বুঝতে পারাই জুরি বোর্ডের সদস্য হওয়ার প্রধান যোগ্যতা। তাই জুরি বোর্ডের সদস্যদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরক্ত করবেন না প্লিজ! তবে কেউ কেউ বিচারকদের ‘যোগ্যতার’ মূল্যায়ন করেনএভাবেও-‘...বিচারকমণ্ডলীকে ধন্যবাদ দিতে হয় ৬৯টি ছবি দেড় মাসের মধ্যে দেখে ফেলার শারীরিক ও মানসিক স্ট্যামিনার জন্য।’


তিন.


বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারিলিমিটেড কোম্পানিইমপ্রেস টেলিফিল্মযাত্রার বছরই প্রতিষ্ঠানটির প্রযোজিত চলচ্চিত্র জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। প্রখ্যাত পরিচালক মো. ফজলুল হক ও কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের সন্তান ফরিদুর রেজা সাগরের এই প্রতিষ্ঠান ২০০০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ১৭ বার দেওয়া শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কারের মধ্যে আটবারই তা লাভ করে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যঙ্গ করে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে তারেক মাসুদ বলেন, ‘অভিনন্দন জানাতে হয় ইমপ্রেস টেলিফিল্মকে গত চার বছরে প্রায় ১০০ ভাগ ছবির পুরস্কার পাওয়ার জন্য। তবে কমিটি সে ক্ষেত্রে সব পুরস্কার ফরিদুর রেজা সাগরকে দিয়ে দিতে পারতেন। তিনি তাঁর ছবিগুলোর নির্মাতা-কলাকুশলীদের ভাগ করে দিতেন এবং বিচারকমণ্ডলী অহেতুক বিতর্ক থেকে বেঁচে যেতে [যেতো]।’


শুধু জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কেনো, বাংলাদেশ থেকে অস্কারের জন্য মনোনিত চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে অস্কারে বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশ; কেবল তারেক মাসুদের মাটির ময়না বাদে সব চলচ্চিত্রই ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত।


অস্কারে প্রতি বছর ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত ছবি মনোনীত হওয়ার যে রেওয়াজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাকে কেউ কেউ ‘সংঘবদ্ধ অপপ্রয়াস’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। ... বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাবিবুর রহমান খান। তিনি ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ছবি নির্মাণে জড়িত এবং অস্কার বাংলাদেশ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ... (এক) প্রশ্নে জনাব হাবিবের উত্তর: ‘(অস্কারে) ছবি জমা দেয়ার ক্ষেত্রে যেসব ক্রাইটেরিয়া থাকে, সেগুলো ইমপ্রেসই ফুলফিল করে, আর কেউ করে না। ফলে এটা নিয়ে কোনো কথা নেই।


এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এমন জায়গায় গেলো কী করে, যেখানে প্রশ্ন তুলতেও মানা? এক্ষেত্রে বলতে হয়,সব বিষয়ে রাষ্ট্র সবসময় সরাসরি নজরদারি করে না, তাই রাষ্ট্রের দৃশ্যত উপস্থিতিও লক্ষ করা যায় না। রাষ্ট্র এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে রাখে বা এমন সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রাখে, যেগুলোর সঙ্গে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট হতে পারে। ওইসব প্রতিষ্ঠান-ব্যক্তি রাষ্ট্রের সেসব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেনিজেদের আখের গোছানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে চলে। তাছাড়া দেশীয় মিডিয়া ব্যক্তি, বিশেষজ্ঞ, মোড়লদের সঙ্গে ইমপ্রেসের সখ্য তো আছেই।


তবে সবসময়ই যে ইমপ্রেস তাদের এই অবস্থান ধরে রাখতে পারবে, তা হয়তো নয়। সেই অবস্থানে হয়তো আসবে অন্য কেউ; তবে যেই আসুক না কেনো, তাকে হতে হবে সমসাময়িক মিডিয়া মোড়ল। বর্তমানে এমন উপসর্গ লক্ষ করা যায় প্রযোজনা-পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়ার মধ্যেও। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ভারত-বাংলাদেশ ব্যানারে যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রে আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ প্রেক্ষাগৃহ জাজের নিয়ন্ত্রণে থাকায়, এই পরিবেশনা প্রতিষ্ঠানটি না চাইলে দেশে কোনো চলচ্চিত্র ব্যবসাসফলও হতে পারে না। ইমপ্রেস পুরস্কারের দিকটা দখল করে আছে আর জাজ প্রেক্ষাগৃহ, যৌথ প্রযোজনা। বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো মিলেমিশে ভাগ করে নেওয়াও চলচ্চিত্রশিল্পের পুরস্কার প্রাপ্তিসহ অনেক জায়গা থেকে অন্যদের গণতান্ত্রিক অধিকার আপনা-আপনি হটেছে সবার অন্তরালে। বস্তুতপক্ষে স্বার্থ রক্ষার্থে রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়ী একে অন্যের পরিপূরক।


চার.

সূর্য দীঘল বাড়ী, পদ্মা নদীর মাঝি, লালসালুর মতো বেশকিছু চলচ্চিত্র পাওয়া যাবে যেগুলো দলবাজি, দালালি করে না, যাদের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও তৎকালীন প্রেক্ষাপটে মিডিয়া মোড়ল নয়। হ্যাঁ, এই ঘরানার কিছু চলচ্চিত্র জাতীয় পুরস্কার পায়, তবে এগুলোকেও রাজনীতির বাইরে গিয়ে ভাবার অবকাশ নেই। বিষয়টি পরিষ্কার হতে বিশ্বের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী পুরস্কার অস্কারের গল্প শোনা যাক। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রের নোবেল খ্যাত অস্কার প্রদান করা হয় প্রথম। তারপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও অস্কার কমিটির চোখে পুরস্কার দেওয়া যায়, এমন কোনো মুসলিম অভিনয়শিল্পীর সেরা অভিনয় তাদের চোখে ধরা পড়েনি। তবে ৮৮ বছরের মাথায় অস্কার কমিটির চোখের খরা কেটেছে, অভিনয়শিল্পী হিসেবে না হলেও সেরা সহ-অভিনয়শিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম মাহেরশালা আলি। মুসলিম তার ওপর আবার কৃষ্ণাঙ্গ অভিনয়শিল্পী নির্বাচনের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্রনির্মাতা আনোয়ার শাহাদাত। তার মতে,


দেশটির রাজনীতিতে যখনই কোন বড় বিরোধ, দ্বিমত বা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তখন লিবারেলরা সেটি ‘কনপেনসেট’ করে হলিউডের মাধ্যমে। ... এবছর (২০১৭) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসী ও মুসলিম বিরোধী নানা বক্তব্য এবং পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে যে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে, তারই এক ধরণের সান্ত্বনা দেয়া হয়েছে (কৃষ্ণাঙ্গ-মুসলিম অভিনেতাকে দিয়ে) ...। ... গত বছরের অস্কার পুরস্কারে শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্যের কারণে তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। ফলে এ বছর সে সমালোচনা যাতে না হয়, সেজন্য আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের একটি প্রাধান্য থাকবে।


আশা করা যায়, রাজনীতির বিষয়টি এতক্ষণে বেশ পরিষ্কার। তবে এই ধরনের রাজনৈতিক আনুকূল্য সবার ভাগ্যে জোটে না। তাই ক্ষোভ প্রকাশ করে তারেক মাসুদ বলেন,


জোট সরকারের আমলে ২০০২ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে মাটির ময়না কাজী হায়াতের অন্ধকার-এর কাছে পরাজিত হয়। ... ব্যক্তিগতভাবে আমি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কমিটির সব সদস্যকেই শ্রদ্ধা করি। তার পরও মাটির ময়নার তিক্ত অভিজ্ঞতার পর অন্তর্যাত্রা ছবিটি জাতীয় পুরস্কারের জন্য জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকি। আমি এখন আরও নিশ্চিত কাজটি ঠিকই করেছি। ... আমার মনে হয়, ... অচিরেই সৃজনশীল স্বাধীন ধারার তরুণ নির্মাতারা জাতীয় পুরস্কারের জন্য ছবি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবেন।১০


প্রসঙ্গ বাপজানের বায়স্কোপ


নির্দিষ্ট বছরে দেশের সেরা চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে সেরাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়া হয়।জাতীয় চলচ্চিত্রের বিধিমালার পাঁচ নম্বর শর্তে বলা আছে, যদি জুরি বোর্ড মনে করে পুরস্কার পাওয়ার মতো কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি, তাহলে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার না দেওয়া থেকে তারা বিরত থাকবে।বাংলাদেশে এমন নজির ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে পাওয়া যায়; জাতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই একবারই মানসম্মত চলচ্চিত্র ও অন্যান্য বিভাগে পুরস্কার পাওয়ার মতো যোগ্যতা না থাকায়, তা দেওয়া থেকে বিরত থাকে বোর্ড। কিন্তু উপরের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার, বিধিমালার যে ছাঁকনি জনগণের সামনে হাজির আছে তা নামেমাত্র; এক্ষেত্রে কাজ করে অন্য ছাঁকনি। তাই এই নীতিমালায় পুরস্কার দেওয়া না-দেওয়া প্রাসঙ্গিকতা হারায়। তবে সেই ছাঁকনিটা কী, সেটাও আলোচনায় অনেকটা পরিষ্কার। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হতে নমুনা হিসেবে ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে যৌথভাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া বাপজানের বায়স্কোপকে (অন্যটি অনিল বাগচীর একদিন) উদ্দেশ্যমূলকভাবে বেছে নেওয়া হলো। এবার সেই‘সেরা’ চলচ্চিত্রের দিকে নজর ফেরানো যাক।


পরিমিতিবোধ, ক্ষমা করো!


চলচ্চিত্রে জীবন সরকার চর ভাইগনায় বিয়ে করে নতুন বিবিকে নিয়ে এলে ওই রাতে গানের আসর বসে। প্রথম গান শেষ হলে স্থানীয় এক লোক চরে নবাগত বিবিকে বরণ করে নিতে গায়েনকে একটি গানের অনুরোধ জানান। এমন সময় সাত্তার নামে এক ব্যক্তি বলে উঠেন, ‘চরে কতো বিবি আইলো-গ্যালো।’ এই কথা কানে আসে জীবন সরকারের। বিবিকে নিয়ে এমন মন্তব্যে ক্ষিপ্ত জীবন সরকার মন্তব্যকারীকে সন্ধানের চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হয়ে জীবন সরকার মন্তব্যকারীকে সৎ সাহস নিয়ে উঠে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘সৎ সাহসী’ সাত্তার উঠে দাঁড়ান এবং তিনি বলেন, ‘ভুল হইছে সরকার, ক্ষমা করে দাও’!


যিনি এমন সাহসী মন্তব্য করতে পারেন, সৎ সাহস নিয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে দাঁড়াতে পারেন, তিনি সরকারের চোখ রাঙানিতেই নিজের অবস্থান থেকে সরে যান! শুধু তাই নয়, এই ঘটনার পর যখন আবার গান শুরু হয়, সাত্তার সব অপমান-ক্ষোভ ভুলে গিয়ে তখন মাথা ঝাঁকিয়ে, হেলেদুলে গান উপভোগ করতে থাকেন। তার অঙ্গভঙ্গি দেখে মনেই হয় না, কিছুক্ষণ আগেই তিনি পুরো গ্রামবাসীর সামনে অপমানিত হয়েছেন! বস্তুতপক্ষেসাত্তার কোনো প্রতিবাদী চরিত্র নন, তার ওপর এই বৈশিষ্ট্য আরোপের চেষ্টা হয়েছে মাত্র। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, জীবন সরকারের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে নয়া বিবিকে নিয়ে মন্তব্য করেন সাত্তার। কিন্তু সরকারের মনোভঙ্গি দেখলে মনে হয়, জনাকীর্ণ মজলিশে, কোনো মতে শব্দটা শুধু তার কানে এসেছে! তাহলে পুরো বিষয়টির এমন উপস্থাপন কেনো? হয়তো এলাকাবাসীর সামনে জীবন সরকারের ক্ষমতা তুলে ধরতেই এমন নাটকের আশ্রয় নেন নির্মাতা। যদিও সেটা আরো যুক্তিযুক্ত, পরিমিতভাবে তুলে ধরার হয়তো যথেষ্ট সুযোগ ছিলো।


এখানেই বিষয়টির শেষ হলে হতো। সাত্তারের এমন মন্তব্যের পর গানের আসরে উপস্থিত অন্য একজনের অনুরোধে গায়েন গান ধরেন। এক্ষেত্রে গায়েনের বৈশিষ্ট্যটা একটু বলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি। গায়ে কমলা রঙের পাঞ্জাবি, একই রঙের থান পরা। মাথায় ওই রঙেরই কাপড় বাঁধা। চুল লম্বা, দাড়ি-গোঁফ রয়েছে। বিভিন্ন মাজারে, উরসে এই শ্রেণির শিল্পীদের দেখা যায়। যাদেরকে বলা যায় বাউল, ফকির। তারা সাধারণত আধ্যাত্মিক, ফকিরি, বৃহৎ অর্থে লোকগীতি গেয়ে থাকে। তেমনই একটি গান দিয়েই গায়েন শুরু করেন। কিন্তু তিনি যখন নয়া বিবিকে নিয়ে অনুরোধের গানটি শুরু করেন, তখন তিনি বিবির পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা দেন। যেখানে বিবির শরীর, রূপ, যৌবনই মুখ্য। অত্যন্ত বিশ্রিভাবে বিবিকে উঠোনে দাঁড় করিয়ে তার উপর-নিচ, চারপাশ গলাধঃকরণ করে হেলেদুলে গান করেন গায়েন। বাংলার মানুষের ফকির-বাউলদের গান শোনার অভিজ্ঞতা অনেক আছে, এভাবে নববধূকে বরণ করে নেওয়ার অভিজ্ঞতা না থাকারই কথা। এর মধ্য দিয়ে বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতি, এমনকি বাউল-ফকির শ্রেণিকেও নেতিবাচকভাবে রিপ্রেজেন্ট করা হয়/হয়েছে।


‘তারকা আর চরিত্রের কস্টিউম এক নয়’


চলচ্চিত্রের শুরুর গানের শেষে নৌকা তীরে ভেড়ে। প্রথমে নৌকা থেকে নামেন জীবন সরকারের সবসময়ের সঙ্গী, পোষা-গুণ্ডা সোহরাব। নামার পর তিনি হাতে থাকা লাঠিটি এমনভাবে মাটিতে রাখেন, যেনো তিনি যুদ্ধ করতে নামছেন। যদিওতার চোখে-মুখে সেই কঠোরতার বা ক্ষমতার ভয়াবহতা নেই।এই পালোয়ানের যে বেশভুষা-সবসময়ই হাতে লাঠি, মাথায় টুপি, অনেকটা চৌকিদারের মতো পোশাক-তা বর্তমানে খুঁজে পাওয়া যায় না।বর্তমান প্রসঙ্গ আনা এজন্য যে, চলচ্চিত্রটি পটভূমি মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়, অর্থাৎ বর্তমানের বাংলাদেশ। নৌকায় পালোয়ান সোহরাবের মতো নয়, জীবন সরকারের সঙ্গে আরো দুইজন কর্মচারী ছিলো-সাধারণ পোশাকে। এখনকার সময় ক্ষমতাবানদের সঙ্গে লাঠি ছাড়াই স্বাভাবিক দেখতে ভয়ঙ্কর সব পোষা-সহচর থাকে।


চলচ্চিত্রের ২১ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে হাসেন বায়স্কোপ পরিষ্কার করছেন, বারান্দায় চুল আচড়াচ্ছেন পঞ্চ। পঞ্চ’র চুল সফট-হালকা রঙিন। অথচ চুলের এতো যত্ন-আত্তি করার সুযোগ-সুবিধা, কৌশল সবকিছুই চরাঞ্চলের নারীদের প্রতিকূলে।আবার এক ঘণ্টা ছয় মিনিট ১৪ সেকেন্ডের দৃশ্যে লবণ চাইতে যান প্রতিবেশী এক নারী। বলেন, ‘ও বুবু, একটু লবণ দ্যাও। তিন-চার বাড়ি গেলাম, একটুও লবণ পাইলাম না। লবণ ছাড়া গরিবের খাওন অয় বুবু।’ নিজেকে গরিব দাবি করা নারীর গায়ের উজ্জ্বলতা, পরনের শাড়ি দেখে বোঝার উপায় নেই, তিনি গরিব বা চরাঞ্চলের নারী। কিন্তু যে নারীর কাছে লবণ চাইতে যায়, তাকে দেখে তিনি চরাঞ্চলের নারী কি না-এমন প্রশ্নেরই উদ্রেক হয় না। চরাঞ্চলেরনারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধের সঙ্গেশহুরে নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশুদের নিঃসন্দেহে পার্থক্য আছে। আবহাওয়া, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ, অর্থনৈতিক অবস্থা, নানাধরনের সুযোগ-সুবিধা, এই পার্থক্য তৈরি করে। তাই শহুরেদের চরাঞ্চলের মানুষের ভূমিকায় অভিনয় করাতে হলে সেটা বাস্তব করে তোলা একটু কঠিনই হয়।


দিব্যালোকে চোখ বন্ধ করে ‘ক’ ভাবে

তাকে কেউ দেখছে না


চলচ্চিত্রের শুরুতে কয়েকজন গ্রামবাসী ‘লবণ দে, লবণ দে’ বলে হাসেনকে ঘিরে ধরে। সেখানে একটু খেয়াল করলেই ধরা পড়বে, এক নারী ও পুরুষ হাসছেন। গ্রামবাসীর ঘরে লবণ নেই, লবণের অভাবে ভাত খেতে পারছে না, অসহ্য যন্ত্রণায় তারা হাসেনকে চরের মধ্যে ‘লবণ দে’ বলে উন্মত্তের মতো চিৎকার করে ঘিরে ধরার দৃশ্যে নারী-পুরুষ হাসছে! এক ঘণ্টা ৪১ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে ইনসানের লাশ গাছের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। জীবন সরকারের নির্দেশে পালোয়ান সোহরাব খুন করে ইনসানকে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন, যাতে করে সবাইকে বলতে পারে সে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু ঝুলন্ত লাশের গলা যখন দেখানো হয়, তখন স্পষ্ট দেখা যায় গলাতে রশি নেই! অন্য কোনো উপায়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ইনসানকে। সন্তানের লাশ দেখে মায়ের আহাজারির সময় গ্রামের ভিড় করা মানুষদের মধ্যে কয়েকজনকে হাসতেও দেখা যায়! একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, লাশের নিচে ভিড় করা মানুষগুলো ইনসান মারা গেছে এজন্য আসেনি, তারা শুটিং দেখতে এসেছে!


প্রশান্তিহীন দৃশ্যায়ন


চলচ্চিত্রের একেবারে শুরুর দৃশ্যে বিরান চর, বাপজান, বায়স্কোপ, পরে সন্তান হাসেন মোল্লাকে দেখা যায়। হাসেনের কাছে গ্রামবাসী লবণ চাইতে আসে, কাট টু’তে মানচিত্র, চর, ‘ওরে আয় আয়’ সুরে বায়স্কোপ দেখানো এবং পরে গানের দৃশ্যায়ণ শুরু। ‘ওরে আয় আয়’ দৃশ্যটুকু বাদ দিলে চর থেকে গানের শেষ পর্যন্ত দৃশ্যায়ণের বেশিরভাগ সময়ই চোখ প্রশান্তি পায় না। দৃশ্যায়ণগুলো অনেকটা বিক্ষিপ্ত। বাঁকা করে ফ্রেম বসানো, অনেক সময় ফোকাস ঠিক না থাকা, ক্লোজ থেকে লঙ, লঙ থেকে ক্লোজ বা ক্লোজ থেকে মিড ক্লোজ শটে মসৃণভাবে না যাওয়া; ঠিক মতো প্যান না হওয়া, ক্যামেরার হালকা জার্ক, কোনো কোনো শট্ প্রয়োজনের তুলনায় অল্প সময় দেখানো, ক্রেন শট্ মসৃণভাবে না নেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়। শুধু শুরুর এইটুকুতেই নয়, পুরো চলচ্চিত্রেই এই সমস্যাগুলো লক্ষণীয়। ফলে চলচ্চিত্রজুড়ে দৃশ্য ধারণ, ধারাবাহিক শট্ বিভাজন না হওয়ার কারণে চোখকে প্রশান্তি দিতে পারেনি বাপজানের বায়স্কোপ।


যে ‘যোগ্যতা’ বাপজানের বায়স্কোপ-এর


এতো সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কোন যোগ্যতা বলে বাপজানের বায়স্কোপ শ্রেষ্ঠ জাতীয় চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেলো? যেসব যোগ্যতা বলে চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়, এরকম চারটি ছাঁকনি আলোচনা করা হয়েছে। এই ছাঁকনিগুলোর মধ্য দিয়েই বাপজানের বায়স্কোপ বেরিয়ে আসে কি না, বিবেচনা করা যেতে পারে।


মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশের জন্য যুদ্ধ করতে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন ধলপুরে গ্রামের যুবক ইসব। অন্যদিকে বাঙালিদের শত্রু, রক্তচোষা স্বভাবের সিকান্দার শান্তি কমিটি গঠন করেন। ধলপুরের পাশের গ্রামের স্কুলে মিলিটারি ক্যাম্প করে। ইসব মুক্তিযুদ্ধে গেছে শুনে ক্ষুব্ধ সিকান্দার পাশের গ্রামের মিলিটারি ক্যাম্পে গিয়ে তাদেরকে নিয়ে এসে ধলপুরে আগুন দেয়, মা-বোনদের ধরে নিয়ে যায়। এরপর ধলপুরে মুক্তিবাহিনী আসলে তারা সিকান্দারকে আটক করে। মুক্তিবাহিনীতে থাকা ইসবের হাত-পা ধরে সিকান্দার কান্নাকাটি করে এবং রাজাকারি ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুক্তি পায়। প্রাণে বেঁচে গিয়ে ইসবকে ডাল-ভাতের দাওয়াত দেন সিকান্দার। সরল বিশ্বাসে দাওয়াত খেতে গেলে ইসবকে মিলিটারির হাতে তুলে দেন সিকান্দার। এরপর ইসবকে মাঠে নিয়ে মিলিটারি গুলি করে হত্যা করে।


সেই ইসবের ভাতিজা হাসেন,বাপের রেখে যাওয়া বায়স্কোপ দিয়েচাচার আত্মত্যাগ ও রাজাকারের নির্মমতার কাহিনি সবাইকে দেখানোর সিদ্ধান্ত নেন। এতদিন মানুষ বায়স্কোপ বাফুচকি খেলায় রবীন্দ্র, নজরুল, ঢাকা শহরের পীর-আউলিয়ার মাজার, নায়ক-নায়িকাদের দেখলেও হাসেন দেখাবেন মুক্তিযুদ্ধের এই গল্প। আর এতেই বিভক্ত হয়ে যায় পুরো চর। যার একদিকে সেই সিকান্দারের ভাগিনাক্ষমতাধর জীবন সরকার এবং তার ঘনিষ্ঠ দুই সহচর-সোহরাব ও মুসা। অন্যদিকে হাসেনসহ পুরো চরবাসী।


এক ঘণ্টা ৪৯ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে দেখা যায়, এই দুই পক্ষের চরম দ্বন্দ্বের মধ্যে জীবন সরকারের গোপন তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছেন মুসা। হাসেনকে জানিয়ে দেন মুসা, সরকার লাঠিয়াল নিয়ে আসছে তার বায়স্কোপ ভাঙার জন্য, সেই সঙ্গে জীবন বাঁচাতে তার (হাসেনের) উচিত পালিয়ে যাওয়া। এমন তথ্য দেওয়ার জন্য মুসাকে ধন্যবাদও দেন হাসেন। বিশ্বাসঘাতক হিসেবে নয়, চলচ্চিত্রে এভাবে ভালোর দলে ভেড়ানো হয় মুসাকে। বাকি থাকেন জীবন সরকার ও সোহরাব। বাপজানের বায়স্কোপ-এর শেষ দৃশ্যে জীবন সরকারকে ‘কত্তা’ অভিহিত করে একইভাবে সোহরাবও বিদ্রোহ করেন। জীবন সরকারকে ‘কুত্তা পিটা’ করতে তাড়া করে সোহরাবও ভালোর দলে যোগ দেন।


বাকি থাকেন শুধু জীবন সরকার, যিনি ভালোর দলে ভেড়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন অনেক আগেই-শিশুবেলায় কিংবা জন্মের আগে! কীভাবে যোগ্যতা হারালেন? সেটা হলো তিনি রাজাকার সিকান্দার বক্সের ভাগিনা। রাজাকার কখনো ভালো হতে পারে না; আর মুক্তিযোদ্ধা, তাদের বংশধর, মুক্তিযুদ্ধে সমর্থনকারী কিংবা আপামর বাঙালি কখনো খারাপ হতে পারে না! তাই সোহরাব ও মুসা ভালোর দলে ভিড়লেও জীবন সরকার পারেন না।


এবারে লাভ-ক্ষতির হিসাবটা কষে নেওয়া যাক। রাজাকারের সন্তান, উত্তরাধিকাররাই শুধু রাজাকার, খুনি, দখলদার, দুর্নীতিবাজ, খারাপ হয়; এই শ্রেণি বাদে বাকি সবাই ধোয়া তুলসী পাতা, দেশের জন্য শুভ। এই ধারণা প্রতিষ্ঠা হওয়ায় তারাই লাভবান হয়, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কেবলই নিজেদের অর্জন মনে করে এবং অশুভ রাজাকারদের বংশধরদের হাত থেকে দেশকে রক্ষার দায়িত্বও স্বপ্রণোদিত হয়ে তারাই নিয়েছে। বাপজানের বায়স্কোপ কী প্রশ্ন তুলেছে-স্বাধীনতার এতো বছর পর এসেও শত শত মানুষ ফুটপাতে ঘুমায় কেনো,চরবাসীর কুড়ে ঘর কেনো,চিকিৎসার অভাবে শত শত মানুষ মারা যায় কেনো, লাখ লাখ মানুষ নামেমাত্র শিক্ষিত কেনো, ক্রসফায়ার-গুম-খুন হয় কেনো,মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের উৎপাতে শহরে-বন্দরে-গ্রামে-গঞ্জে-পাড়ায়-মহল্লার মানুষ অতিষ্ট-আতঙ্কিত কেনো, দেশ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে কেনো, দিনরাত পরিশ্রম করেও আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয় না কেনো, ধনী-গরিব বৈষম্য এতো প্রকট কেনো, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষ রক্ত শুষে কেনো? এসব প্রশ্ন তোলেনি।


এবার আপনারাই বলুন, বাপজানের বায়স্কোপ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাবে না কেনো?


গল্পে সমাপন


I saw a man on a bridge about to jump.

I said, `Don’t do it!’

He said, `Nobody loves me.’

I said, `God loves you. Do you believe in God?’

He said, `Yes.’

I said, `Are you a Muslim or a non-Muslim?’

He said, `A Muslim.’

I said, `Shia or Sunni?’

He said, `Sunni.’

I said, `Me too! Deobandi or Barelvi?’

He said, `Barelvi.’

I said, `Me too! Tanzeehi or Tafkeeri?’

He said, `Tanzeehi.’

I said, `Me too! Tanzeehi Azmati or Tanzeehi Farhati?’

He said, `Tanzeehi Farhati.’

I said, `Me too! Tanzeehi Farhati Jamia ul Uloom Ajmer, or Tanzeehi Farhati Jamia ul Noor Mewat?’

He said, `Tanzeehi Farhati Jamia ul Noor Mewat’.

I said, `Die, kafir!’ and I pushed him over.11

I saw a man on a bridge about to jump.

I said, `Don’t do it!’

He said, `Nobody loves me.’

I said, `God loves you. Do you believe in God?’

He said, `Yes.’

I said, `Are you a Muslim or a non-Muslim?’

He said, `A Muslim.’

I said, `Shia or Sunni?’

He said, `Sunni.’

I said, `Me too! Deobandi or Barelvi?’

He said, `Barelvi.’

I said, `Me too! Tanzeehi or Tafkeeri?’

He said, `Tanzeehi.’

I said, `Me too! Tanzeehi Azmati or Tanzeehi Farhati?’

He said, `Tanzeehi Farhati.’

I said, `Me too! Tanzeehi Farhati Jamia ul Uloom Ajmer, or Tanzeehi Farhati Jamia ul Noor Mewat?’

He said, `Tanzeehi Farhati Jamia ul Noor Mewat’.

I said, `Die, kafir!’ and I pushed him over.11

I saw a man on a bridge about to jump.

I said, `Don’t do it!’

He said, `Nobody loves me.’

I said, `God loves you. Do you believe in God?’

He said, `Yes.’

I said, `Are you a Muslim or a non-Muslim?’

He said, `A Muslim.’

I said, `Shia or Sunni?’

He said, `Sunni.’

I said, `Me too! Deobandi or Barelvi?’

He said, `Barelvi.’

I said, `Me too! Tanzeehi or Tafkeeri?’

He said, `Tanzeehi.’

I said, `Me too! Tanzeehi Azmati or Tanzeehi Farhati?’

He said, `Tanzeehi Farhati.’

I said, `Me too! Tanzeehi Farhati Jamia ul Uloom Ajmer, or Tanzeehi Farhati Jamia ul Noor Mewat?’

He said, `Tanzeehi Farhati Jamia ul Noor Mewat’.

I said, `Die, kafir!’ and I pushed him over.11


এক্ষেত্রে ‘আই’কে (ও) রাষ্ট্র এবং ‘হি’কে (ঐব) চলচ্চিত্রের ভূমিকায় বিবেচনা করা যেতে পারে। রাষ্ট্র সেই চলচ্চিত্রের প্রতিই সমব্যথী, মহানুভব বা পুরস্কৃত করে; যেটি তার আদর্শ-মত-উদ্দেশ্যকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পূরণ করে। যদি এর সামান্যতমও ব্যত্যয় ঘটে, তাহলেই তার অবস্থা হয়ে যায় ‘হি’য়ের মতো-‘pushed that film over’।


লেখক : প্রদীপ দাস, অনলাইন সংবাদপত্র প্রিয়.কম-এর প্রতিবেদক।


Pradipru03@gmail.com

 

তথ্যসূত্র ও টীকা

১. ‘পুরস্কারে এগিয়ে ভিন্নধারার ছবি’, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৩ মার্চ ২০১৬।

২. ‘পুরস্কারে এগিয়ে ভিন্নধারার ছবি’, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৩ মার্চ ২০১৬।

৩. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৯৭); ‘চলচ্চিত্রে মতানৈক্যের কণ্ঠস্বর : বিকল্প চলচ্চিত্র’; সিনেমা; ফ্ল্যাট ১/বি, বাড়ি ২৮, সড়ক ১৫ (নতুন), ধানমণ্ডি, ঢাকা-১২০৯।

৪. মাসুদ, তারেক; ‘প্রসঙ্গ : জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’; প্রথম আলো, ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৮।

5.http://www.bbc.com/bengali/news/2016/03/160320_nirmalendu_goon_facebook_status_award; retrieved on 28.11.17

৬. প্রাগুক্ত; মাসুদ, ২০০৮।

৭. প্রাগুক্ত; মাসুদ, ২০০৮।

৮. ‘অস্কারের দরজা বাংলাদেশের সব নির্মাতার জন্য খোলা নয়’; বণিক বার্তা, ১১ অক্টোবর ২০১৭।

৯. ‘মুসলিম অভিনেতার অস্কার জয় কেবল রাজনীতি’; বিবিসি বাংলা, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭।

১০. প্রাগুক্ত; মাসুদ, ২০০৮।

11. Roy, Arundhati (2017 : 169); THE MINISTRY OF UTMOST HAPPINESS; Penguin Random House, India.

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন