Magic Lanthon

               

সুশান্ত সিনহা

প্রকাশিত ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

'প্রসঙ্গ সম্প্রচার সাংবাদিকতা' টিকার বা স্ক্রল : গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে অবহেলিত

সুশান্ত সিনহা


কোথায়, কী হচ্ছে-তাৎক্ষণিক জানতে অনেকের হাত চলে যায় টেলিভিশনের রিমোট কন্ট্রোলে। সেসময় স্ক্রিনে হয়তো কোনো একটি সংবাদ সম্প্রচার হচ্ছে। শুরু থেকে না দেখায় পুরো সংবাদটি হয়তো আপনি জানতে পারেননি। এজন্য অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী খবর সম্প্রচার পর্যন্ত। কিন্তু এ সময় আপনি যদি টেলিভিশন স্ক্রিনের নিচের অংশে চোখ রাখেন, তাহলে দেখবেন দিনের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলোর সংক্ষিপ্ত লিখিত রূপ। সম্প্রচার সাংবাদিকতার ভাষায়, একে বলে টিকার বা স্ক্রল নিউজ; যা স্ক্রিনের নিচের অংশে ডান থেকে বামে যায়।


একনজরে শিরোনাম আকারে জাতীয়, আন্তর্জাতিক, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা খবর দর্শকের কাছে তুলে ধরার প্রধান মাধ্যম হলো টিকার। দ্রুত সময়ে সংবাদ জানানোর কার্যকর মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কাছে স্ক্রল বা টিকারের বিকল্প কিছু নেই। তাই ধরন যেমনই হোক না কেনো, প্রতিটি চ্যানেলেই টিকার দিতে হয়। সম্প্রচার সাংবাদিকতার ধারাবাহিক আলোচনার পঞ্চম পর্বে থাকছে টিকার বা স্ক্রলের নানা দিক। এর আগে সম্প্রচার সাংবাদিকতার ব্রেকিং নিউজ, প্রতিবেদন ও পি টি সি, সরাসরি সম্প্রচার এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ হয়েছে।


প্রতিদিন-প্রতিক্ষণ অসংখ্য টিকার দিয়ে থাকে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। ফলে এ সংক্রান্ত আলোচনায় সবদিন সবগুলো চ্যানেলের টিকার পর্যবেক্ষণ করা অসম্ভব। সংবাদভিত্তিক চ্যানেলগুলোতে তুলনামূলক টিকারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় আটটি সংবাদভিত্তিক এবং দুটি অনুষ্ঠানভিত্তিক চ্যানেলের-এটিএন নিউজ, ‘সময়, ‘ইন্ডিপেনডেন্ট, ‘একাত্তর, ‘চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, ‘যমুনা টেলিভিশন, ‘ডিবিসি, ‘নিউজ টোয়েন্টিফোর এবং ‘এসএ টিভি ও ‘বাংলাভিশন-টিকার দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। অপেক্ষাকৃত নতুন হওয়ায় সংবাদভিত্তিক চ্যানেলগুলোর বিনিয়োগ, লোকবল ও প্রযুক্তিগত দিক অনুষ্ঠাননির্ভর চ্যানেলগুলোর চেয়ে এগিয়ে। বানান ভুলসহ বড়ো ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি-অসামঞ্জস্যতা-অসঙ্গতিগুলো চেষ্টা করা হয়েছে খতিয়ে দেখার। তবে এর উদ্দেশ্য মোটেও ভুল ধরা নয়, গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সম্প্রচার সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নেওয়া।


টিকার কেনো


প্রতিমুহূর্তে দেশে-বিদেশে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার সংবাদ দর্শকের কাছে তুলে ধরছে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। প্রাথমিকভাবে কোনো তথ্য পেলেই তা সংবাদাকারে সম্প্রচারের জন্য সংবাদ বুলেটিনে যাওয়া  সম্ভব হয় না। সংশ্লিষ্ট ঘটনা সম্পর্কিত যথাযথ ছবি-তথ্য জোগাড়েও খানিকটা সময় লাগে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদটি দর্শক-শ্রোতাকে জানিয়ে দিতে টিকারই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার সারাদেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনা-মৃত্যু, খুন-জখম, হামলা-মামলাসহ অনেক কিছুই সংবাদ বুলেটিনে সম্প্রচারের সুযোগ থাকে না। কিন্তু ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা ও মফস্বলের এসব ঘটনার সংবাদমূল্য থাকায় তা সম্প্রচার করতে হয়। এক্ষেত্রে সংবাদগুলো স্ক্রল বা টিকার আকারে চালালেই চলে। ফলে দ্রুত দর্শকের কাছে তথ্য পৌঁছানোর সহজ ও কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে টিকার। সংবাদের গুরুত্ব, সময় ও ব্যাপ্তির বিবেচনায় স্ক্রল বা টিকারের তিনটি ধরন রয়েছে :


১. সাধারণ টিকার বা স্ক্রল

২. জাস্ট ইন

৩. ব্রেকিং নিউজ


যে সংবাদটি অপ্রত্যাশিতভাবে সংবাদকক্ষে আসে এবং যার প্রভাব পুরো সমাজের মধ্যেই পড়ে সেটাই সাধারণত ব্রেকিং নিউজ হয়। আর ব্রেকিং এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ, এমন তাৎক্ষণিক সংবাদ দেওয়া হয় সদ্য সংবাদ, সবশেষ, এই মাত্র পাওয়া বা জাস্ট ইন নামে। আর সাধারণ টিকার তাকেই বলে, যেখানে সংবাদের গুরুত্ব খুব বেশি নয়, তাই দর্শককে সাদামাটাভাবে জানালেই চলে। তবে নির্দিষ্ট সময় পরে ব্রেকিং ও জাস্ট ইন দুটোই আবার সাধারণ টিকারে পরিণত হয়। টিকার পরিবেশনে বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো টেলিভিশনের ধরন একই রকম। জাতীয়/দেশ, বাণিজ্য/অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক/বিদেশ, খেলা টাইটেলে ভাগ করে তা ২৪ ঘণ্টাই চলতে থাকে টেলিভিশনের পর্দায়।


টিকার বা স্ক্রল কেনো গুরুত্বপূর্ণ


একটি টেলিভিশনের সংবাদ সম্পৃক্ত লোকবল বা বার্তাকক্ষ কতোটা সতর্ক, তা বোঝার ক্ষেত্রে মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে টিকার। প্রতিযোগিতার বাজারে যেকোনো সংবাদ মাধ্যমের জন্য এটা বড়ো চ্যালেঞ্জ। টিকার আরো গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, টেলিভিশনে কোনো সংবাদ তাৎক্ষণিক প্রকাশের জন্য সহজ মাধ্যম হিসেবে টিকারের বিকল্প আর নেই। নির্ভুল ও দ্রুততার সঙ্গে সংবাদটি স্ক্রল বা টিকার আকারে দেওয়াটা তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভুল টিকার দেখেই মূলত বোঝা যায়, সংশ্লিষ্ট বার্তাকক্ষ কতোটা সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল। সঠিক তথ্য ও নির্ভুল বাক্যের টিকার যেমন বার্তাকক্ষের ওপর আস্থা বৃদ্ধি করে; তেমনই ভুল বানান, তথ্যগত বিভ্রান্তি ও অসম্পূর্ণ বাক্যের টিকার চ্যানেলের মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।


টিকার টেলিভিশন চ্যানেলের দর্পণ হিসেবে কাজ করে। গণমাধ্যমের তথ্য-উপাত্তকে সঠিক ধরে নিয়ে অথোরিটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটা ভুল বানানে শিক্ষার্থীসহ সবারই বিভ্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে। একটা সময় পর্যন্ত টেলিভিশনে দর্শক-শ্রোতার ফিডব্যাক বা প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ ছিলো না বললেই চলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ফেইসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠায় টেলিভিশনের সংবাদ, টিকার, সংবাদকর্মীদের আচরণসহ সবকিছু নিয়েই দর্শকের প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ব্রেকিং, জাস্ট ইন ও সাধারণ টিকারের মাধ্যমে দ্রুত দর্শককে যেমন আকৃষ্ট করা যায়, তেমনই ভুলগুলো ধরা পড়ে সহজে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তাকক্ষগুলোর আরো সতর্ক ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে। বিশেষ করে টিকার ডেস্কের ঘাটতিগুলো দূর করতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।


সমস্যা যখন শব্দ ও বাক্যে


প্রায় চার ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর গাইবান্ধার কুপতলা রেল স্টেশন থেকে শান্তাহার থেকে দিনাজপুরগামী দোলনচাঁপা এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরু (১৬ এপ্রিল ২০১৭)। একটু খেয়াল করলে বাক্যটির ভুল ধরা পড়ে। এ প্রসঙ্গে আলোচনার আগে বাক্য গঠনের নিয়মাবলি নিয়ে সামান্য আলোচনা জরুরি মনে করছি।


আকাক্সক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতা হলো বাক্যের মৌলিক তিন গুণ। আকাক্সক্ষা হলো একটি অসম্পূর্ণ বাক্য; যা বলা বা লেখার পরও শ্রোতা অপেক্ষা করে, ভাবতে থাকে হয়তো আরো কিছু আছে। এমন ক্ষেত্রে বাক্য হলেও ব্যাকরণ অনুযায়ী তা যথার্থ হয় না। কারণ তা সম্পূর্ণ অর্থ বা ভাব প্রকাশ করে না। যেমন : আমি তোমার বাসায় বসে। এখানে  ক্রিয়া বা কাজ সম্পর্কে জানার আকাক্সক্ষা জন্মায়। এ কারণে এটাকে বাক্য মনে হলেও তা অর্থবোধক হয় না। একইভাবে আসত্তি হলো, বাক্যের শব্দগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র, অর্থাৎ শব্দের যথার্থ বিন্যাস। যেমন : আমি খেয়ে মাঠে ভাত যাব। পূর্ণ ভাব প্রকাশের জন্য এই বাক্যে যেখানে যে শব্দ ব্যবহারের কথা ছিলো, তা হয়নি। ফলে বাক্যটি আসত্তি হারিয়েছে। আবার ‘জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে মহাজোটে হট্টগোল। এখানে মহাজোট একটা সংখ্যাগত অবয়ব বা জোট, যেখানে হট্টগোল হওয়ার সুযোগ নেই। মিছিল, সভা বা সমাবেশে হট্টগোল হতে পারে এবং কেবল সেখানেই এ শব্দটি ব্যবহারের যোগ্যতা রাখে। মহাজোট কোনো মিছিল বা সমাবেশ নয়। পরিস্থিত যাই হোক না কেনো ব্যাকরণের নিয়ম ভাঙার সুযোগ নেই।


ফলে ‘চার ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর গাইবান্ধা থেকে দিনাজপুর-শান্তাহারগামী দোলনচাঁপা এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরু লিখলেই বাক্যটি শুদ্ধ হতো। একই সঙ্গে দর্শক তার প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে যেতো এখান থেকেই। দর্শকের কাছে গাইবান্ধার কুপতলা স্টেশনের নাম জানা জরুরি নয়। কারণ টিকারে সব তথ্য দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মূল তথ্যটা জানালেই হয়।


বাক্যের মতোই সঠিক শব্দ ব্যবহারে চ্যানেলগুলোর আরো সর্তক হতে হবে। ‘ম্যাচসেরা তামিম ইকবাল, সিরিজ সেরা সাকিব আল হাসান (১৯ মার্চ ২০১৭)। এখানে এক টিকারে একই ধরনের শব্দের দুই রকমের ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তিকর। ‘ম্যাচসেরা দুটো আলাদা শব্দ, তাই একসঙ্গে ব্যবহার না করাই উচিৎ। কিন্তু যদি সংশ্লিষ্ট বার্তাকক্ষের নিয়মরীতি বা সম্পাদকীয় শৈলী এমন হয় যে, তারা ‘ম্যাচসেরা এক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করবে, তাহলে তা করতে পারে। যদি তাই হয়, তাহলে ওই টিকারের ‘সিরিজ সেরা আলাদাভাবে লেখার কথা নয়। ফলে এ ধরনের ভুল হয়েছে যতোটা না জানার জন্য, তার চেয়ে বেশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবেহলা ও উদাসীনতার কারণে। একটু সতর্ক হলে হয়তো তা সংশোধন সম্ভব ছিলো। একইভাবে কখনো ‘শহীদ দিবস আবার কখনো ‘শহীদদিবস, কখনো ‘বাণিজ্যমন্ত্রী আবার কখনো ‘বাণিজ্য মন্ত্রী লেখা হচ্ছে টিকারে। এতে কোনটা ভুল আর কোনটা ঠিক তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়। একই শব্দের আলাদা আলাদা ব্যবহার দেখে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।


আইসিসির প্রশাসনিক পুনর্গঠন প্রস্তাবে ৮-২ ও নতুন আর্থিক নীতিমালা প্রস্তাবনায় ৯-১ ভোটে হেরেছে বিসিসিআই (২৭ এপ্রিল ২০১৭)। এই টিকারেও একই জিনিস দুই জায়গায় দুভাবে ব্যবহার করতে গিয়ে বড়ো ধরনের ভুল হয়েছে। ‘প্রস্তাব শব্দের অর্থ হলো কোনো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত তুলে ধরা বা জানানো। আর ‘প্রস্তাবনা হলো কোনো কিছু উপস্থাপনের ভূমিকা বা শুরু করা অথবা প্রারম্ভিক বক্তব্য। শুনতে এক রকম মনে হলেও প্রস্তাব ও প্রস্তাবনা দুটো ভিন্ন জিনিস। হরহামেশাই চ্যানেলগুলোতে প্রস্তাব আর প্রস্তাবনা গুলিয়ে ফেলতে দেখা যায়। যেহেতু উপরের টিকারে দুটো তথ্যই নির্বাচনের ফলাফল সংক্রান্ত, তাই দুটো শব্দ যে একই হবে তা যে কেউ বুঝতে পারার কথা। একটু গুরুত্ব দিলেই হয়তো এই ভুল এড়ানো সম্ভব ছিলো। দর্শকের কাছে নিজ চ্যানেলের ভাবমূর্তি রক্ষার সুযোগও ছিলো টিকার ডেস্কের।


সমস্যাটা বোধের


চ্যানেলগুলোর টিকারে শুধু বাক্য ও শব্দগত ভুলই নয়, মাঝে মাঝে এমনসব ভাষা ব্যবহার করা হয় যা রীতিমতো অবমাননাকর, আপত্তিকর। যা কখনো কখনো ভুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে ‘অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। যেমন : ‘লক্ষ্মীপুরে সনাতন শিশুকে যৌন নিপীড়নের চেষ্টাকালে বখাটে আটক (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন এই টিকার কয়েক ঘণ্টা চলেছে সংবাদভিত্তিক একটি চ্যানেলে। নিজের ও সমাজের প্রতি ন্যূনতম দায়দায়িত্ব থাকলে কোনো সংবাদকর্মীর এই ভাষা না ব্যবহার করারই কথা। প্রতিষ্ঠান হিসেবে টেলিভিশনের দর্শক দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বয়সি কোটি মানুষ। তাই সাধারণভাবে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বেশি। আর তা একজন সংবাদকর্মীর জানার কথা। ফলে টেলিভিশনের একটা ছোটো শব্দ লেখা বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সচেতন থাকতে হয়। এবং তা সর্বক্ষণ, সবদিন। আমরা মাসের ২৯ দিনই অন্যদের চেয়ে সঠিকভাবে লিখেছি বলে, ৩০তম দিনে বেখেয়ালি হয়ে ভুল করার সুযোগ নেই। আক্রান্ত শিশুকে ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচিতির এই মানসিকতা নিঃসন্দেহে অনৈতিক। আর একটি বিষয় এক্ষেত্রে লক্ষণীয়, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত যেকোনো ধরনের সংবাদে কেবল ইসলাম ধর্মাবলম্বী বাদে অন্যদের ক্ষেত্রে নিয়মিতভাবেই এ ধরনের ‘পরিচিতিমূলক নানা ভাষার ব্যবহার দেখা যায়।


সংবাদ ও অনুষ্ঠান দেখার সময় একটু খেয়াল করে টেলিভিশনের টিকারগুলো দেখলেই চোখে পড়বে অসংখ্য ভুল, ত্রুটি-বিচ্যুতি আর অসঙ্গতি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব কিন্তু সহজেই এড়ানো সম্ভব এবং হাতের কাছে বাংলা অভিধান তো রয়েছেই। এছাড়া ইন্টারনেটের মাধ্যমেও সব তথ্য জানার সুযোগ আছে বার্তাকক্ষে। কিন্তু তার পরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে ত্রুটিপূর্ণ এসব টিকার। আগেই বলেছি, ব্যাকরণ না মেনে, নিজের মতো লিখতে গিয়ে কারো নামসহ মূল জিনিস পরিবর্তনের অধিকার কারো নেই।


প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা বাতিল : গণিত বিভাগের প্রধান নুরুল ইসলামসহ ৩ জন সাময়িক বরখাস্ত (৬ মার্চ ২০১৭)। এই ঘটনায় অন্য একটি সংবাদভিত্তিক চ্যানেলও লিখেছে ‘কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ...’। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় কেউ যদি এভাবে বলে, তাতে খুব বেশি সমস্যা নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত যোগাযোগে এটা চললেও গণমাধ্যমের জন্য তা গ্রহণযোগ্য নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া। তাই টিকারে সঠিকভাবেই লেখা উচিৎ। একইভাবে ‘বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় না লিখে অবলীলায় লেখা হচ্ছে ‘ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়! প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণের বিশেষ বিশেষ যৌক্তিকতা রয়েছে। বাংলাদেশে কৃষি বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা ও পড়ালেখার জন্য প্রতিষ্ঠিত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ময়মনসিংহে, কিন্তু এর নাম ‘বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ এমনই এবং এভাবেই লেখা হয়। আবার রংপুরে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর নাম কিন্তু ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর। একইভাবে টাঙ্গাইল বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এর নাম ‘মাওলানা ভাসানী  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে জেলায় প্রতিষ্ঠিত হলেও সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম তা দিয়েই হবে এমন কোনো কথা নেই। হাতের কাছে ইন্টারনেটে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে নিতে পারে টিকার ডেস্কের লোকজন। 


টিকারে স্থানের নাম বাক্যের ঠিক জায়গায় না লিখলেও বড়ো ধরনের ভুল হতে পারে; তা দর্শককে ফেলতে পারে বিভ্রান্তিতে। ‘রাজশাহী মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার সরফরাজ আহমেদের মৃতদেহ অফিসার্স কোয়ার্টার থেকে উদ্ধার (৩০ এপ্রিল ২০১৭)। এখানে দর্শক খানিকটা বিভ্রান্ত হতে পারে ঘটনাস্থল নিয়ে। কারণ একজন পুলিশ কর্মকর্তা অন্য কোথাও দায়িত্ব পালনে যেতে পারেন। অন্য কোনো জায়গার অফিসার্স কোয়ার্টারে গিয়েও মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে তাতে ঘটনাস্থল অত্যন্ত জরুরি। ফলে ‘রাজশাহী অফিসার্স কোয়ার্টার থেকে পুলিশের সহকারী কমিশনার সরফরাজ আহমেদের মৃতদেহ উদ্ধার লিখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হতো। আবার কখনো কখনো জেলার নামের সঙ্গে ‘র বা ‘য় জুড়ে দিলে বাক্যের পুরো অর্থ পাল্টে যেতে পারে। যা জন্ম দিতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভুলের। ‘সিলেটের সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলা মামলায় ফাঁসির আসামি রিপনের রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা (২৭ মার্চ ২০১৭)। সিলেটের সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার হওয়ার সুযোগ নেই। আর বড়ো ধরনের এ ভুল বোঝার জন্য সংবাদকর্মী হওয়ার দরকার নেই, যে কারো চোখেই এটা ধরা পড়বে। এমন নয়, শত শত টিকারের ভিড়ে কেউ এটা খেয়াল করতে পারেনি। কারণ ওই দিন সবমিলিয়ে নমুনায়িত চ্যানেলটিতে টিকার ছিলো মাত্র ২০-২২টি। কিন্তু তার পরও ওই চ্যানেলের বার্তাকক্ষের কারো চোখে বিষয়টি পড়েনি, যা খুবই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার। হামলার ঘটনাস্থল সিলেট আর আক্রান্ত ব্যক্তি সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার; তাই ‘সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ...’ লিখলেই চলতো।


১৯ মে ২০১৭ দুটি সংবাদভিত্তিক চ্যানেলের টিকারের ভাষা ছিলো-‘ভারতের গোয়ায় সেতু ধসে কমপক্ষে ১০ জন নিহত এবং ‘ভারতের গোয়ার পশ্চিমাঞ্চলে সেতু ধসে নিহত ২, অনেকে নিখোঁজ। এক দেশের বুলি অন্য দেশের গালি, বহুল প্রচলিত একটি প্রবচন। যা টিকার ডেস্কসহ বার্তাকক্ষের লোকজনদের মাথায় রাখা দরকার। আয়তনে বিশাল ভারতের একটি রাজ্যের নাম গোয়া। সেই রাজ্যের একটি এলাকায় সেতু ধসের ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে ‘ভারতের গোয়া রাজ্যে ...’ লেখাই সমীচীন। সংবাদ বুলেটিনে ‘ভারতের গোয়ায় লেখা হলে তা সংবাদ উপস্থাপক ও দর্শক-শ্রোতা উভয়ের জন্যই হয়তো অস্বস্তিকর-অশোভন হতো। নিশ্চয়, বার্তা সম্পাদকরা সংবাদে এই ভাষা ব্যবহার করে না। তাহলে ওই চ্যানেলে এ ধরনের টিকার যেতে পারে কীভাবে? বিপত্তি কেবল রাজ্য বা জায়গার নামের বেলায় নয়। সচেতন না হলে দেশ ও জাতির নাম একাকার হয়ে যেতে পারে। পাল্টে দিতে পারে টিকারের ভাষাও।


ব্রিটিশ নির্বাচনের প্রথম টিভি বিতর্কে অনুপস্থিত প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ও লেবার নেতা জেরেমি করবিন (১৯ মে ২০১৭)। আন্তর্জাতিক সংবাদে ‘ব্রিটেনের নির্বাচন লিখতে গিয়ে লিখেছে ‘ব্রিটিশ নির্বাচন। দেশ ব্রিটেন বা যুক্তরাজ্য; আর সে দেশের জাতিগোষ্ঠী হলো ব্রিটিশ। ফলে ব্রিটিশ নির্বাচন লেখা গুরুতর ভুল। যদিও এই ভুল দিনভর চললেও তা সংশোধন করা হয়নি।


জাতি ও দেশের নাম গুলিয়ে ফেলার মতো ব্যক্তির নাম ও উপাধি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সমস্যার অন্ত নেই।  ‘চলতি বছর শেষে ভাতিজা রাফায়েল নাদালের কোচ থাকবেন না চাচা টনি নাদাল (১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। চ্যানেল সম্পর্কে দর্শকের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিতে এ টিকারই যথেষ্ট। ‘ভাতিজা রাফায়েল নাদাল ...’ সংবাদের এ ভাষা দেখে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন! তার পরও ত্রুটিমুক্তির অংশ হিসেবে আলোচনা জরুরি। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রাফায়েল নাদাল, সারাবিশ্বে তার খ্যাতি-পরিচিতি রয়েছে। তার কোচ সম্পর্কে চাচা, এটা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ‘... রাফায়েল নাদালের কোচ থাকছেন না তার চাচা টনি নাদাল লিখলেই চলে। পরীক্ষায় উত্তর লেখা শেষে রিডিং বা রিভিশন দেওয়ার মতো একনজর দেখলেই হয়তো এ ধরনের ভাষার ব্যবহার এড়ানো যেতো। কিংবা বিষয়টি দুই-দশ মিনিটি বা দুই-এক ঘণ্টা সম্প্রচারের পরও সংশোধন হতো। কিন্তু বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোর টিকার দেখে তা বোঝার উপায় নেই। জানা-বোঝা নয়,  টিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতার ঘাটতির কারণে কর্তৃপক্ষের উপলব্ধিতে এসব ধরা পড়ছে না বলে মনে হয়।


এমনই একটি টিকার হলো-‘রাজধানীর রামপুরা থেকে দুদকের দুই ভুয়া উপ-পরিচালককে গ্রেফতার করেছে দুদক (১৯ এপ্রিল ২০১৭)। অভিজ্ঞ না হওয়ার পরও সংবাদকর্মী হিসেবে এতোটুকু জানার কথা যে, কোনো প্রতিষ্ঠানে ভূয়া কর্মকর্তা থাকে না। সাধারণত জালিয়াতি করে টাকাপয়সা হাতিয়ে নিতে দুদক কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অনেকে প্রতারণা করতে পারে। এমনই দুই প্রতারক-জালিয়াতকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক। ‘রাজধানীর রামপুরা থেকে দুদকের উপ-পরিচালক পরিচয়দানকারী দুই প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে দুদক লিখলেই তা যথেষ্ট ছিলো। একই ধরনের ভুল করেছে আরেকটি সংবাদভিত্তিক চ্যানেল। তারা লিখেছে-‘দুদকের দুই ভুয়া উপ-পরিচালক নজরুল ইসলাম খান ও খোরশেদ আলমকে রাজধানীর মিরপুর থেকে গ্রেফতার করেছে দুদক (১৯ এপ্রিল ২০১৭)। এখানে গ্রেপ্তার দুই প্রতারকের নাম লিখে তারা যেমন বাড়তি তথ্য দিয়েছে, তেমনই বাড়তি একটি ভুলও করেছে। গ্রেপ্তারের স্থান রামপুরার জায়গায় লিখেছে মিরপুর। একই টিকারে দুটি বড়ো ভুল দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না, ভাষাগত দুর্বলতার সঙ্গে তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও মনোযোগের অভাব রয়েছে এই ডেস্কের কর্মীদের। এমনকি পর পর দুটি টিকারে একই ব্যক্তির পদবি দুইভাবে লেখার ঘটনাও আছে দেশের চ্যানেলগুলোতে!


২৭ মার্চ ২০১৭ সংবাদভিত্তিক একটি চ্যানেল লিখেছে-‘... তিস্তা চুক্তির শর্ত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারকে না জানালে তাতে স্বাক্ষর করবেন না মমতা বন্দোপাধ্যায়। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি সংক্রান্ত পরের টিকারটি ছিলো-‘... পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস। একই সময়ে এক ব্যক্তির দুই ধরনের পদবি ব্যবহার কতোটা যুক্তিযুক্ত সে প্রশ্ন কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্দ্যোপাধ্যায় পদবি ইংরেজিতে লেখা হয় ব্যানার্জি; তেমনই মুখোপাধ্যায় হলো মুখার্জি, চট্টোপাধ্যায় হলো চ্যাটার্জি, গঙ্গোপাধ্যায় গাঙ্গুলী। মমতা নিজের নামে পদবি হিসেবে বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যবহার করেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর নামের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই লিখতে হবে। তবে কেউ সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী মমতা ব্যানার্জিও লিখতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই সবখানে একই পদবি ব্যবহার করতে হবে। পদবি ছাড়াও দেশের নাম নিয়েও মতভেদ আছে চ্যানেলগুলোতে। যেমন কেউ লেখে সাউথ আফ্রিকা, কেউ দক্ষিণ আফ্রিকা। সাউথ এর বাংলা হিসেবে অনেকে দক্ষিণ আফ্রিকা বলতে পারে। কিন্তু পাল্টা যুক্তি হলো, আফ্রিকার তো নর্থ ও সাউথ বলে ভাগাভাগি নেই। যেমন আছে উত্তর কোরিয়া আর দক্ষিণ কোরিয়া। ফলে সাউথ আফ্রিকার নাম দক্ষিণ আফ্রিকার লেখা বা বলার সুযোগ নেই।


প্রতিটি চ্যানেলেই আন্তর্জাতিক সংবাদের বেশ কয়েকটি টিকার প্রতিদিন চালানো হয়। অনেক সময় এসব টিকার তথ্য ও ভাষা বিভ্রাটের জন্ম দেয়। যেমন : ‘সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে দোকানে ট্রাক ঢুকে কয়েকজন আহত (৭ এপ্রিল ২০১৭)। তাৎক্ষণিক ঘটনা হিসেবে ওই চ্যানেলটি জাস্ট ইন বা সদ্য সংবাদে ছিলো এই টিকার। মজার ব্যাপার হলো, একই সময়ে ওই চ্যানেলের সাধারণ টিকারে ছিলো-‘সুইডেনের স্টকহোমে রাস্তায় পথচারীদের ওপর গাড়ি, আহত কয়েকজন। এখানে একবার বলা হচ্ছে, দোকানে ট্রাক ঢুকেছে আবার বলা হচ্ছে রাস্তায় পথচারীদের উপর গাড়ি! বিজ্ঞান বলে, নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ঘটনার সত্যি একটাই। যদি জাস্ট ইনের তথ্য ঠিক হয়, তাহলে টিকারে তা সংশোধন করতে হবে। আর যদি বিশ্ব গণমাধ্যমেই এ সংক্রান্ত সংশোধন থাকে, তাহলে তা সংশোধন করবে টিকার ডেস্ক। কিন্তু এক্ষেত্রে চ্যানেলটির সেই মনোযোগ দেখা যায়নি।


দুই ধরনের তথ্য ছাড়াও চ্যানেলটির টিকারের ভাষাও বিভ্রান্তিকর। ‘... দোকানে ট্রাক ঢুকে কয়েকজন আহত এই লাইন দেখে কী বোঝার উপায় আছে সন্ত্রাসী হামলা নাকি নিছক দুর্ঘটনা? প্রাথমিকভাবে মনে হবে, ট্রাক চলতে চলতে দোকানে ঢুকে পড়েছে। এটা দুর্ঘটনা এবং দায় ওই ট্রাকচালকের। একইভাবে জাস্ট ইনের ভাষাও স্পষ্ট নয়। ‘... রাস্তায় পথচারীদের ওপর গাড়ি, লেখা দেখে মনে হতে পারে এটা দুর্ঘটনার তথ্য। কিন্তু নিছক দুর্ঘটনা হলে তা তো জাস্ট ইন বা সদ্য সংবাদ হওয়ার কথা নয়? নিশ্চয় এমন কোনো ঘটনা আছে যাতে সংবাদটি বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে? সন্ত্রাসী হামলার অংশ হিসেবে স্টকহোমে রাস্তায় সেই ঘটনা হয়, যেখানে প্রাণ হারায় বেশ কয়েকজন। সুইডেনের মতো দেশে পথচারীদের ওপর এমন আক্রমণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আবার পথচারীদের উপর ব্যক্তিগত গাড়ি আর  ট্রাক বা লরির চাপা দেওয়ার ঘটনা সমান নয়। ফলে একবার ট্রাক আরেকবার গাড়ি বলার মাধ্যমে একই টিকারে তৃতীয় বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে চ্যানেলটি। মনে রাখতে হবে, দুর্ঘটনা আর হত্যাকাণ্ডের পার্থক্য গড়ে দেয় সংবাদমূল্য। ঘটনার ফলোআপের ক্ষেত্রে সে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। যেমন : ‘সুন্দরগঞ্জ ১ আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য লিটনের বোনের গাড়ীবহরে হামলা করেছে দুর্বৃত্তরা (২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। সাধারণত বয়সের কারণে স্বাভাবিক মৃত্যু হলে লেখা হয় প্রয়াত। আর কাউকে মেরে ফেললে তা হয় হত্যাকাণ্ড। সড়কসহ যে কোনো দুর্ঘটনায় মারা গেলে বলা হয় নিহত। সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন নিজ বাড়িতে আততায়ীর গুলিতে মারা যান। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যকে মেরে ফেলার ঘটনা বেশ বিরল। তাই নিহত না লিখে প্রয়াত লেখার সুযোগ নেই। এতে ভুল বার্তা পেতে পারে দর্শক।


একটা শব্দের ভুলে পাল্টে যেতে পারে পুরো ঘটনা; ধোঁয়াশা তৈরি করতে পারে। ক্রিকেটে বাংলাদেশের শততম টেস্টে গৌরবের জয়ে এমনই বিপত্তির জন্ম দিয়েছিলো বেশ কয়েকটি চ্যানেল। ‘বাংলাদেশের শততম টেস্ট জয়ের প্রশংসা ছিলো বিশ্ব গণমাধ্যমগুলোতেও; ওই দিন আরেকটি টিকার ছিলো এমন-‘শততম টেস্ট জয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠে দেশের ক্রিকেট ভক্তরা (১৯ মার্চ ২০১৭)। নিজ দেশের জয়ে আনন্দ সত্যিই অন্যরকম। কিন্তু আনন্দের অতিশয্যায় ‘শততম টেস্টে জয়ের জায়গায় ‘শততম টেস্ট জয় লেখার সুযোগ নেই। সূক্ষ্ম বিষয়, পার্থক্য কিন্তু আকাশ-পাতাল। অথচ আরো দুটি চ্যানেল লিখলো-‘শততম টেস্ট জিতে ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ এবং ‘পি সারা ওভালে ইতিহাস গড়ে শততম টেস্ট জিতল বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কাকে হারালো ৪ উইকেটে


ক্রিকেট ইতিহাসে বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচ খেলেছে একশোটি। এর মধ্যে শততম ম্যাচে ঐতিহাসিক জয়ের পর সর্বসাকুল্যে টেস্ট জয়ের সংখ্যা দাঁড়ালো নয়টি। শততম টেস্ট জয় লেখার মানে দাঁড়ায় বাংলাদেশ একশোটি টেস্ট জিতেছে! টেস্ট জয় আর টেস্টে জয় এক নয়-এই পার্থক্যটুকু খেয়াল রাখেনি বেশ কয়েকটি চ্যানেল। কখনো কখনো খেলার টিকারে দেশ আর ব্যক্তিকে গুলিয়ে ফেলা হয়। যেমন : ‘ম্যালাহাইডে নিজের ৩য় ম্যাচে আজ স্বাগতিক আয়ারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ (১৯ মে ২০১৭)। মূলত ‘নিজেদের ৩য় ম্যাচ খেলতে নামবে বাংলাদেশ। কিন্তু টিকারে লেখা হয়েছে ‘নিজের-ভাবটা এমন যেনো দেশ নয়, খেলতে নামছে ব্যক্তি। একটু সর্তক হলেই এ ধরনের বিষয় এড়ানোর সুযোগ থাকে।


সঙ্কট নাম ও তার সংক্ষেপকরণেও


একটি চ্যানেলের পুরো দিনের সংবাদের শিরোনাম টিকারে সম্প্রচার হয়। এর বড়ো একটি অংশ জুড়ে থাকে প্রধানমন্ত্রী, বিচারপতি, মন্ত্রী, রাজনৈতিক দলের নেতা, মেয়রসহ বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তির মন্তব্য-বক্তব্য। তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে গিয়ে কখনো কখনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুরো নাম ব্যবহার করে না চ্যানেলগুলো। ডাকনাম উল্লেখ করেই তা টিকারে চালানো হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেই তার কথা, মন্তব্য বা বক্তব্য টিকারে স্থান পায়। কিন্তু পরিচয়হীন ডাকনাম ব্যবহারের মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে প্রকারান্তে ছোটোই করা হয়। যা মোটেও কাম্য নয়। আর টিকার যেহেতু একটার পর একটা আসতে থাকে; তাই চট করে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া কঠিন হয় দর্শকের জন্য। কিন্তু এসব বিষয় আমলে না নিয়ে হরদম চ্যানেলগুলো ডাকনাম দিয়েই লিখছে টিকার। 


মোস্তাফিজ যদি চান তবে আইপিএল খেলতে যেতে পারবেন : পাপন (৭ এপ্রিল ২০১৭)। স্বাভাবিকভাবেই দর্শকের মনে হতে পারে পাপন কে? অথবা ভেবে নিতে পারে পাপনই বুঝি তার পুরো নাম। এমনকি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির মতো সম্মানজনক ও প্রভাবশালী পদে থাকা ব্যক্তির ডাকনাম ব্যবহারে তার মানহানি পর্যন্ত হতে পারে। একই দিনে আরেকটি চ্যানেল টিকারে লিখেছে-‘তিস্তাসহ অন্যান্য অমীমাংসিত চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি : নোমান (৭ এপ্রিল ২০১৭)। গুরুত্বপূর্ণ এই টিকারে অনেকটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ঢঙে নোমান নামটি ব্যবহার করা হয়েছে। বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান সাবেক মন্ত্রীও বটে। ফলে শুধু ‘নোমান লেখা, তার জন্য অপমানজনক। ‘হাওর এলাকায় ত্রাণের নামে লুটপাট করছে সরকার : রিজভী (৩০ এপ্রিল ২০১৭)। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা রিজভী আহমেদের নাম হরহামেশাই শুধু ‘রিজভী লেখা হয় টিকারে। ‘দেশে এখন মানুষরে ধর্ম পালনেরও স্বাধীনতা নেই : ফখরুল (৯ জুন ২০১৭)। বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের একটি বিএনপি। আর সেই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অথচ সংবাদভিত্তিক চ্যানেলটির টিকার লেখা হয়েছে ‘ফখরুল। নামের এমন অপব্যবহারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও দল উভয়ের প্রতি প্রকারান্তে অবজ্ঞাই করা হয়।


একইভাবে মাহবুব উল আলম হানিফকে ‘হানিফ; মওদুদ আহমদকে ‘মওদুদ; মোহাম্মদ নাসিমকে ‘নাসিম লিখতেও কার্পণ্য করে না চ্যানেলগুলো। রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম নিয়ে এমন উদাসীনতা যেনো ডাল-ভাতে পরিণত হয়েছে। দর্শকের কাছে তাদের কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা নিয়ে মাথাব্যথা টিকার ডেস্কের আছে বলেও মনে হয় না। দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদের টিকারেও এ সমস্যা প্রবল। ‘উত্তর কোরিয়াকে আর কোনোভাবেই সহ্য করবে না যুক্তরাষ্ট্র : সিউল সফরে বললেন পেন্স; উত্তর কোরিয়ার যে কোনো হুমকি মোকাবেলায় দক্ষিণ কোরিয়াকে সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি (১৭ এপ্রিল ২০১৭)। ২৫ শব্দের এই টিকারে তিন দেশের নামসহ উল্লেখ করা অনেক কিছু। কিন্তু যার কথার ভিত্তিতে এ টিকার সেই মাইক পেন্স-এর পুরো নাম লেখা হয়নি। মাইক পেন্সকে সবাই জানে বা চেনে এমন ধরে নেওয়ারও সুযোগ নেই। তাই অন্তত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্স লিখলেও দর্শকের কাছে স্পষ্ট হতো।


সুইডেনের স্টকহোমে ট্রাক হামলার ঘটনায় আটক ব্যক্তির দায় স্বীকার : আইনজীবী (৮ এপ্রিল ২০১৭)।  ঢালাওভাবে ‘আইনজীবী বলে টিকার দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি কার বা কোন পক্ষের আইনজীবী তা উল্লেখ করতে হবে। যেমন : রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আইনজীবী লিখতে হবে। আবার ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উদ্ধৃতি ছাড়া কোনো তথ্য দিলেও তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। ‘অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে আনা ধর্ষণ মামলা বন্ধ করে দিচ্ছে সুইডেন (২০ মে ২০১৭)। প্রথমত, কারো কোনো উদ্ধৃতি নেই এ টিকারে। যা সংবাদের গুরুত্ব খানিকটা কমিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, মার্কিন লক্ষ লক্ষ গোপন নথি ফাঁস করে সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে শুধু অ্যাসাঞ্জ লেখা হয়েছে। যা বেশ দৃষ্টিকটু এবং অনেকের কাছে বোধগম্য নাও হতে পারে।


ফ্লিনের বিরুদ্ধে তদন্ত বন্ধে কোমিকে নির্দেশ দেন ট্রাম্প : নিউইয়র্ক টাইমস (১৮ মে ২০১৭)। এ টিকারের অর্থ বুঝতে হলে দর্শককে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দলিল দস্তাবেজ নিয়ে বসতে হবে। কারণ টিকারে থাকা তিনজনের নামের কেবল একাংশ ব্যবহার করা হয়েছে। টিকারে বহু ব্যক্তি ও দেশের নাম থাকলে তা অবশ্যই স্পষ্টভাবে এবং যথাযথ পরিচয়ে উল্লেখ করতে হবে। তাই এখানে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগের বিষয় থাকায় ফ্লিন, কোমি ও ট্রাম্প লেখার সুযোগ নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিন; দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফ বি আই-এর প্রধান জেমস কোমিকে দেশের মানুষ একনামে চেনে; অথবা তাদের পদত্যাগ ও বহিষ্কারের ঘটনা সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল আছে এটা মনে করার সুযোগ নেই। তাই বৃহত্তর দর্শকের জন্য টিকারে ছোটো ছোটো বিষয়গুলো স্পষ্ট করার বিকল্প নেই।


প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকর্মের নামের ক্ষেত্রেও এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। অপরিচিত বা নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পুরো নাম না হলেও এমনভাবে লিখতে হবে, যাতে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ব্লগার ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা বেড়েছে : ইউএসসিআইআরএফ (২৮ এপ্রিল ২০১৭)। যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের সংক্ষিপ্ত রূপ ইউ এস সি আই আর এফ। যা বেশ অপরিচিতই দেশের মানুষের কাছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন ইউ এস সি আই আর এফ লিখলে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতো।

অপরাজেয় ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক (২১ মে ২০১৭)। ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদের অমর সৃষ্টি ‘অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্য। মুক্তিযুদ্ধের এ ভাস্কর্য শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো জাতির গর্বের সম্পদ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রেরণার অনন্য প্রতীক এই ‘অপরাজেয় বাংলা। বিভিন্ন পরীক্ষায় এই ভাস্কর্য ও ভাস্করের নাম নিয়ে প্রশ্ন আসে। ফলে টিকারে ভাস্কর্যটির পুরো নাম সঠিকভাবে লেখা জরুরি। আশার কথা হলো, ঘণ্টা দুয়েক পর টিকারটি সংশোধন করে সংবাদভিত্তিক চ্যানেলটি লিখেছে ‘অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর ...


হাওরে অনিয়মের সঙ্গে যেই জড়িত হোক ব্যবস্থা নেয়া হবে-দুদক তদন্ত দল (২১ এপ্রিল ২০১৭)। লক্ষণীয় হলো, হাওরে কিন্তু অনিয়মের সুযোগ নেই। যা অনিয়ম হয়েছে তা হাওরে বাঁধ নির্মাণে। ‘সফর সংক্ষিপ্ত করে রোববার দেশে ফিরছেন হাওর উন্নয়ন কর্মকর্তারা (২৭ এপ্রিল ২০১৭)। প্রতিষ্ঠানটির নাম হাওর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। তাই হাওর উন্নয়ন কর্মকর্তা বলে কিছু নেই। ফলে শুদ্ধ করেই লেখা উচিত।


বিশেষণের অতি ব্যবহার


রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকা থেকে বিদেশি পিস্তলসহ একজন পেশাদার ছিনতাইকারীকে আটক করেছে র‌্যাব (২০ মার্চ ২০১৭)। টিকারে হাজারীবাগের পর এলাকা বলার প্রয়োজন আছে কী! তেমনই ছিনতাইকারী বলার পর একজন বলারও দরকার নেই। আর ছিনতাইকারীর সঙ্গে ‘পেশাদার বিশেষণ জুড়ে দেওয়াও বাহুল্য। ‘জেনেভা ক্যাম্প কমিটির চেয়ারম্যান মাদক সম্রাট জিলানী ও তার সহযোগি মোহাম্মদপুর থানায় আটক (১ জানুয়ারি ২০১৭)। এখানেও সেই একই সমস্যা। র‌্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বর্ণনায় ডাকাত সর্দার, জঙ্গিনেতা, ইয়াবা সম্রাট ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের সেই তকমা হুবহু ব্যবহারে সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে লিখতে হবে জঙ্গি সন্দেহে, মাদক ব্যবসার দায়ে আটক বা গ্রেপ্তার।


সময় মাথায় না রাখা


রাজশাহী ইসলামি ব্যাংক মেডিকেলের ছাত্রী মালদ্বীপের মডেল রাউধা আতিফকে রাজশাহীতেই দাফনের সিদ্ধান্ত পরিবারের (১ এপ্রিল ২০১৭)। সংবাদভিত্তিক চ্যানেলটি দুপুর দুইটায় রাউধা আতিফকে রাজশাহীতে দাফন এবং সন্ধ্যার সংবাদে সেই দাফনের সংবাদ সম্প্রচার করে। অথচ ঘটনার পাঁচ ঘণ্টা পরও ‘... রাজশাহীতেই দাফনের সিদ্ধান্ত পরিবারের টিকারটি সংশোধন করা হয়নি। বার্তাকক্ষের সঙ্গে টিকার ডেস্কের সমন্বয়হীনতার কারণেই টিকার ও সংবাদের এই সমস্যা। আর রাউধা শুধু মেডিকেল শিক্ষার্থী নন, তিনি ভিনদেশি এবং একজন জনপ্রিয় তারকাও। তাই সময়ের সঙ্গে ঘটনার সবশেষ অবস্থা টিকারে সংযোজন-বিয়োজন করা দরকার। তাই আপডেট টিকারের ক্ষেত্রে চ্যানেলগুলোর বিশেষ করে সংবাদভিত্তিক চ্যানেলের আরো সর্তক হওয়া জরুরি। সময় খেয়াল না রাখলে নিজেদের জাস্ট ইন বা সদ্য সংবাদের সঙ্গে টিকারের বিরোধ দেখা দিতে পারে।


নিজের বহিষ্কারাদেশ চ্যালেঞ্জ করে রিট করলেন সাময়িক বরখাস্ত হওয়া রাজশাহীর মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল (৪ এপ্রিল ২০১৭)। এই জাস্ট ইন যখন যাচ্ছে, তখন নিচে স্ক্রলে যাচ্ছে-‘আজ রিট করবেন সাময়িক বরখাস্ত হওয়া রাজশাহীর মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। আগে থেকে দেওয়া টিকারের আপডেট তথ্য পেয়ে তা সদ্য সংবাদে চলছে। অথচ টিকারে তা সংশোধন করা হয়নি। প্রতিটি চ্যানেলেই ব্রেকিং, জাস্ট ইন ও সাধারণ টিকার সবই দেখভাল করে টিকার ডেস্ক। নিজ দায়িত্বে কতোটা উদাসীন হলে এমন ভুল হতে পারে, সেই প্রশ্ন খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।


একইভাবে মধ্যরাতেও টেলিভিশনের টিকারে লেখা থাকে-‘... দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করছে নর্থ জোন (৭ মার্চ ২০১৭)। খেলা শেষ হয়েছে সন্ধ্যার আগে, অথচ রাতেও চলছে সেই টিকার। ক্রিকেট খেলার খবরে এমন ভুলের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি থাকে। শুধু দিনের ঘটনা রাতে নয়, পরদিন পর্যন্ত চলতেও দেখা যায় অনেক টিকারে। ‘সন্ত্রাসী হামলা মামলায় ভূমিমন্ত্রীর ছেলেসহ ১১ জনকে পাবনার ঈশ্বরদী থেকে গ্রেপ্তার (২০ মে ২০১৭)। অথচ ১৯ মে ভূমি প্রতিমন্ত্রীর ছেলেসহ গ্রেপ্তার হওয়া ১১ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি নীতিনির্ধারকদের সন্তান গ্রেপ্তারের ঘটনা বেশ আলোচিত। ফলে ওইদিন সন্ধ্যা থেকেই সংবাদটি গুরুত্ব দিয়ে সম্প্রচার হয়। কারাগারে পাঠানোর সংবাদ সম্প্রচার করলেও সংবাদভিত্তিক চ্যানেলটি প্রায় ১২Ñ১৩ ঘণ্টা পরও আগের দেওয়া টিকারই চালিয়েছে পরদিন সকাল নয়টা পর্যন্ত। হালনাগাদ তথ্য জানাতে না পারলে চ্যানেলটিকে প্রতিযোগিতায় যেমন পিছিয়ে পড়তে হবে, তেমনই দর্শকেরও সঠিক তথ্য না পেয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকে। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনগুলোর ফলোআপ রাখা ও তা জানানো চ্যানেলটির জন্য খুবই জরুরি। কিন্তু তার ব্যত্যয় প্রতিনিয়ত ঘটছে দেশের চ্যানেলগুলোতে।


ভুল আছে বানানেও


দেশের চ্যানেলগুলোর টিকারের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা বানান ভুল। কঠিন বা একটু কম ব্যবহৃত শব্দ নয়, সাধারণ ও বহুল প্রচলিত শব্দের বানান ভুলের তালিকা বেশ লম্বা। মাঝে মাঝে এমন কিছু বানান থাকে যা দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হতে হয়। সবচেয়ে বড়ো কথা চ্যানেলের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বানান ভুলের সংখ্যা যেনো বাড়ছে! কেবল সাধারণ টিকার নয়, জাস্ট ইন, ব্রেকিং নিউজ, এস্টোন (প্রতিবেদনে বক্তার নাম ও পদবি তুলে ধরার নাম এস্টোন), সুপার (প্রতিবেদন চলাকালে সংবাদের মূল বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরার নাম সুপার) প্রতিবেদনসহ সবখানেই চোখে পড়ে ভুল বানান। সংবাদ মাধ্যম সঠিক তথ্য ও শুদ্ধ বানানের চর্চা করবে, যা শিক্ষার্থীসহ সবধরনের দর্শকের জন্যই কাম্য। সংবাদের তথ্য যতোই সঠিক হোক না কেনো, একটি যতিচিহ্নের ব্যবহার না করা কিংবা ভুল বানান পুরো সংবাদের গুরুত্ব নষ্ট করে দিতে পারে।


রিক্সার চাকার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে নোয়াখালীতে এইচএসসি পরীক্ষারর্থীর মৃত্যু (৪ এপ্রিল ২০১৭)। চ্যানেলে পরীক্ষার্থী বানান ভুল করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এ জাতীয় ভুলের শেষ নেই। ‘চলছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বানিজ্য মেলা (১৬ জানুয়ারি ২০১৭); কিংবা অনুষ্ঠানের নামের লেখা হয়েছে, ‘অর্থ ও বানিজ্য (২৫ আগস্ট ২০১৬)। ছবির মতো স্পষ্ট এই বানান দেখলেই বোঝা যায়, এখানে ভুল হয়েছে। অথচ ‘ন আর ‘ণর ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রায়শই এই ভুল দেখা যায় চ্যানেলগুলোতে-‘লালমনিরহাটে ক্ষুদে ফুটবলারদের সংবর্ধণা (৭ মার্চ ২০১৭)। একটু আন্তরিক হলেই এই ভুল এড়ানো যেতো।


এছাড়া ‘... শিক্ষার বাণিজ্যিকিকরণ বন্ধে রাষ্ট্রপতির আহবান (১৯ এপ্রিল ২০১৭) টিকার সম্প্রচারের মিনিট দশেক পরে বানানটি শুদ্ধ করে ‘বাণিজ্যিকীকরণ লেখে চ্যানেলটি। যদিও এমন সংশোধন অন্যান্য ভুলের ক্ষেত্রে খুবই কম চোখে পড়ে। এমনকি ভুলগুলো অফিসের অন্যান্য সংবাদকর্মীরও চোখে পড়ে না। ফলে দিনভর চলে এই ভুল। ‘সুনামগঞ্জের বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে দুর্নীতি হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, প্রমান পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে : পানি সম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ (২৩ এপ্রিল ২০১৭)। একই দিনে ওই চ্যানেলের টিকার ছিলো-‘... আগামী নির্বাচন সুষ্ঠ করতে যাবতীয় পদক্ষপ নেয়া হবে, সাভারে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার (২৩ এপ্রিল ২০১৭)। প্রমাণ ও সুষ্ঠু বহুল ব্যবহৃত ও পরিচিত শব্দ। তাই এসব বানান ভুল হওয়া খুবই দুঃখজনক।


ব্যক্তির নামের ক্ষেত্রেও ভুল বানান চোখে পড়ে। যেমন : ‘ডোনাল ট্রাম্পের আমন্ত্রণে ৩ এপ্রিলে ওয়াশিংটন সফরে যাচ্ছেন মিশরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ... ’ (২০ মার্চ ২০১৭)। ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়ে গেছে ডোনাল ট্রাম্প। আবার অনেক সময় টিকারে একই শব্দ এমন করে লেখা হয়, দেখে মনে হবে দুটি শব্দ। যেমন : ‘কৃমি নাশক ওষুধ খেয়ে আশুলিয়ার রুস্তমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষার্থী হাসপাতাল ভর্তি (৪ এপ্রিল ২০১৭)। এখানে কৃমিনাশক শব্দটি যেমন ভেঙে দুটি করা হয়েছে, তেমনই কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছে মতো দুই শব্দ মিলে এক শব্দ কিংবা এক শব্দ আলাদা করে লেখা হচ্ছে টিকারে। যেমন : একই চ্যানেল কখনো লিখছে ‘বাণিজ্য মন্ত্রী কখনো ‘বাণিজ্যমন্ত্রী ইত্যাদি।


এছাড়া একটা অক্ষর বদলে গেলে টিকারের গণেশ উল্টে যেতে পারে। ‘... চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ৪৫ ভাগ এডিবি বাস্তবায়ন হয়েছে : যা টাকার অঙ্কে ৫৩ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা, গত বছরের তুলনায় এক শতাংশ বেশি : পরিকল্পনা মন্ত্রী (১১ এপ্রিল ২০১৭)। এখানে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এ ডি পি বাস্তবায়নের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। হয়তো সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক ফোনে এ ডি পি-ই বলেছেন, কিন্তু টিকারের লোকজন শুনতে একইরকম মনে হওয়ায় এ ডি বি লিখেছে। সামান্য দায়িত্বশীল হলেই এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সংক্ষিপ্ত রূপ এ ডি বি এবং এ ডি পির পার্থক্য বুঝে তা ত্রুটি মুক্ত করা সম্ভব ছিলো। এক্ষেত্রে টিকার ডেস্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির দায়ই মুখ্য, কিন্তু প্রতিবেদকও দায় এড়াতে পারে না। কারণ অফিসে ফিরে নিজের দেওয়া টিকার দেখা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু তা হয়নি বলেই মারাত্মক ভুল নিয়ে টিকারটি দুপুর থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলেছে চ্যানলেটিতে।ফোনে বলা ছাড়াও প্রতিবেদকরা এখন স্মার্ট ফোনসেটের মাধ্যেমেও টিকার লিখে দিচ্ছে। ফলে সেখানেও সঠিক বানান লেখার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।  এতে টিকারে ভুলের পরিমাণ অনেকটা কমতে পারে। কখনো কখনো শব্দের মাঝখান থেকে অক্ষর হারিয়ে যাওয়ার মতো ভুলও চোখে পড়ে। ‘হাতিরঝিলে বিজিএমই ভবন ভাঙতে তিন বছরের সময় আবেদনের পরবর্তী শুনানি ১২ মার্চ (৯ মার্চ ২০১৭)। মজার ব্যাপার হলো, ভুল বানানের স্ক্রলটি যখন যাচ্ছে, তখন ওই সংবাদটি সম্প্রচার হচ্ছে, যেখানে বি জি এম ই এ বানানটি শুদ্ধভাবে যাচ্ছে। কিন্তু তার পরও তা সংশোধন করা হয়নি।


চাপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২ (২ মে ২০১৭)। জেলার নামে এমন ভুল খুবই আপত্তিকর। টিকারটি কয়েক ঘণ্টা চললেও সংশোধন করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ লেখা হয়নি। ‘চুয়াডাঙ্গার ইসলামপাড়ায় হিটস্ট্রোকে এক ব্যাক্তির মৃত্যু (২০ মে ২০১৭)। একইভাবে ‘ব্যাক্তি বানানটিও ঠিক করেনি টিকার ডেস্ক সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে কিছু শব্দ ঈ-কারের বদলে ই-কার লেখা হচ্ছে বাংলা অ্যাকাডেমির রীতি অনুযায়ী। কিন্তু বিপত্তি হলো, একই চ্যানেলে একই বানান কখনো ই-কার আবার কখনো ঈ-কার ব্যবহার করছে। ‘দেশীয়  শিল্পকে বাঁচাতে ভ্যাট আইন নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করছে সরকার : অর্থমন্ত্রী (৩০ এপ্রিল ২০১৭)। যদিও একই দিনে চ্যানেলটির অন্য একটি টিকারে লেখা হয়েছে ‘দেশিয়। বানান রীতি নিশ্চয় যখন যেমন, তখন তেমন হওয়ার মতো বিষয় নয়। কেউ আবার সেই র-ফলা সংক্রান্ত ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৌতুকের মতো ‘দ্রিমু যখন তখন সবটাতেই দ্রিমুর মতো যেখানে দরকার নেই, সেখানেও পরিবর্তন করছে নিজের মতো। ‘উন্নয়ন কেবল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদেরই হচ্ছে, সাধারণ মানুষ গরিব থেকে আরো গরিব হচ্ছে-মির্জা ফখরুল (৩০ এপ্রিল ২০১৭)। সবার কাছেই গরীব অতিপরিচিত শব্দ। টিকারের প্রতি কতোটা অবহেলা থাকলে সংবাদভিত্তিক একটি চ্যানেল ‘গরিব বানানটিও ভুল লিখতে পারে!


আবার যতিচিহ্ন সঠিক স্থানে ব্যবহার না করলে পুরো বাক্য লেজে-গোবরে হয়ে যেতে পারে। শততম টেস্টে জয়ের পর সংবাদভিত্তিক একটি চ্যানেলে টিকার ছিলো-‘... শততম টেস্ট বাংলাদেশের গৌরবের জয় ৪ উইকেটে পরাজিত শ্রীলংকা; ম্যাচ সেরা তামিম ইকবাল ম্যান অব দ্য সিরিজ সাকিব আল হাসান মুশফিক ও সাকিবকে প্রধানমন্ত্রীর ফোন তোমরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছ-জয় বাংলা ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, স্পীকার ও বিএনপি চেয়ারপার্সন ... চ্যানেলের শুভেচ্ছা (২০ মার্চ ২০১৭)। পরদিন সকাল পর্যন্ত চলেছে যতিচিহ্নবিহীন ভুলে ভরা এই বিশালাকার টিকার। যথাযথ যতিচিহ্ন ব্যবহার করলে টিকারটি হতো-‘ ... শততম টেস্ট বাংলাদেশের গৌরবের জয় (,) ৪ উইকেটে পরাজিত শ্রীলংকা; ম্যাচ সেরা তামিম ইকবাল (,) ম্যান অব দ্য সিরিজ সাকিব আল হাসান (;) বা (।) মুশফিক ও সাকিবকে প্রধানমন্ত্রীর ফোন (,) (‘) তোমরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছ (’)-জয় বাংলা ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও বিএনপি চেয়ারপার্সন (,) ... চ্যানেলের শুভেচ্ছা। টিকারের শুরুতেই এখানেও সেই ‘শততম টেস্ট জয় লেখা হয়েছে। অথচ এটা হবে, ‘শততম টেস্টে জয়

লিবিয়া উপকূল থেকে ইতালি যাওয়ার পথে প্রায় ১২শ, অভিবাসী উদ্ধার (২০ মার্চ ২০১৭)। এখানে ঊর্ধ্বকমা বদলে কমা ব্যবহারের কারণে বাক্যটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এছাড়া ‘... বিএনপি জামায়াত গণহত্যা দিবস পালন করে না : প্রধানমন্ত্রী (২৭ মার্চ ২০১৭)। এখানে বিএনপি, জামায়াত দুটি আলাদা দল বা তাদের জোট বোঝাতে গেলেও অবশ্যই হাইফেন ব্যবহার করতে হবে। ছোটো মনে হলেও এ অনেক বড়ো ভুল।


টেনে লম্বা করা


সাধারণভাবে টিকারে প্রয়োজনীয় সব তথ্য থাকে, তবে তা সংক্ষিপ্তাকারে। তাই অল্প কথায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সম্প্রচারে সচেতন থাকতে হয়। কিন্তু কোনো কোনো চ্যানেলে টিকার পড়লে মনে হয়, পুরো লিঙ্ক কপি করে তুলে দিয়ে দায় সেরেছে টিকার ডেস্ক। তারা ন্যূনতম মাথা খাটিয়ে লেখার প্রয়োজন বোধ করে না। ‘১ জুন থেকে ইংল্যান্ডে শুরু হওয়া আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দল ঘোষনার শেষ তারিখ ২৫ এপ্রিল, ভারত এখনও দল ঘোষনা করেনি, ২৪ এপ্রিল আইসিসির সভায় ভারতীয় বোর্ডের বেশী লভ্যাংশ পাওয়ার বিষয়টি নিস্পত্তি না হলে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নাও খেলতে পারে ভারত (২৩ এপ্রিল ২০১৭)। চিনের মহাপ্রাচীরের মতো লম্বা টিকার পড়লে আর এ সংক্রান্ত সংবাদ দেখার প্রয়োজন পড়বে না। ৪০ শব্দের টিকারটি প্রতিবেদনের লিঙ্ক বা ইন্ট্রো এবং পি টি সির চেয়ে লম্বা করা হয়েছে অহেতুক। সঙ্গে বাড়তি পাওনা হিসেবে দুবার ‘ঘোষনা বানান ভুল লেখা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, ওই দিনে অনুষ্ঠানভিত্তিক চ্যানেলটিতে আরো একটি ঢাউশ টিকার ছিলো। ‘জ্যামাইকা টেস্টের দ্বিতীয় দিনে বৃষ্টির কারণে খেলা হয়েছে ১১ ওভার তিন বল, পাকিস্তানি স্ট্রাইক বোলার মোহাম্মদ আমিরের পাঁচ উইকেট শিকারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ২৭৮/৯ (ডেল ৬৩, ডরউইচ ৫৬, হোল্ডার ৫৫, আমির ৫/৪১)’ (২৩ এপ্রিল ২০১৭)। এতো কিছু না লিখে বৃষ্টির কারণে খেলা হয়েছে ১১ ওভার বললেই চলে। আর যেহেতু স্কোরে আমির ৫/৪১ লেখা হয়েছে, তাই আবার ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিলো না।


বাড়তি কথা লেখার প্রবণতা আছে সব চ্যানেলেরই কমবেশি। ‘পটুয়াখালীতে একাধিক হত্যাসহ বেশ কয়েকটা মামলার আসামি আনোয়ার খন্দকারকে তিতকাটা এলাকা থেকে গ্রেফতার (২৩ এপ্রিল ২০১৭)। এখানে মূল কথা হলো, পটুয়াখালীতে হত্যা মামলার আসামি আনোয়ার খন্দকার গ্রেপ্তার। গ্রেপ্তারের স্থান, কাল কিংবা ‘হত্যাসহ কয়েকটি মামলার আসামী বলারও দরকার নেই। একইভাবে ‘ফেসবুকে এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে ময়মনসিংহের আরকে মিশন রোড থেকে একজনকে আটক করেছ র‌্যাব (২৯ এপ্রিল ২০১৭)। এখানেও আরকে মিশন রোড থেকে গ্রেপ্তারের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘গাজীপুরের মাস্টারবাড়ী এলাকায় একটি তুলার কারখানায় আগুন : নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসসহ ৬টি ইউনিট (২৪ জানুয়ারি ২০১৭)। গাজীপুরের মাস্টারবাড়ী বললে এলাকা লেখার দরকার নেই। ‘গাইবান্ধার জুগিপাড়ায় পুকুরের পানিতে ডুবে একই পরিবারের ২ শিশুর মৃত্যু (২৯ এপ্রিল ২০১৭)। মর্মান্তিক এই সংবাদের টিকারেও রয়েছে বাড়তি কথা। পুকুরে ডুবে বা নদীতে ডুবে মৃত্যু বললেই সবাই বোঝে পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার কথা। বিশদ বলতে গিয়ে দর্শককে এতোটা বোকা ভাবার কারণ নেই। আর নিশ্চয় কেউ লিখবে না ‘সাগরের লোনা পানিতে ডুবে মারা গেছে কিশোর! সবধরনের দর্শকের জন্য জাতীয়-আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার খবর যতো স্বল্প কথায় সম্ভব তুলে ধরতে হবে। কারণ অল্প কথায় স্পষ্টভাবে লিখলে তা ঝরঝরে হয়।


জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৫ ঘোষণা : যুগ্মভাবে শাকিব খান ও মাহফুজ আহমেদ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা এবং জয়া আহসান শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী নির্বাচিত : নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘বাপজানের বায়োস্কোপ ও অনিল বাগচীর একদিন, শ্রেষ্ঠ পরিচালক রিয়াজুল মওলা রিজু ও মোরশেদুল ইসলাম, শ্রেষ্ঠ গায়ক গায়িকা নির্বাচিত হয়েছেন সুবীর নন্দী, এসআই টুটুল ও প্রিয়াংকা গোপ : আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন অভিনেত্রী শাবানা ও সংগীত শিল্পী ফেরদৌসী রহমান (১৯ জুন ২০১৭)। রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত সেতুর মতোই ৫৮ শব্দের এই টিকারে বার বার নির্বাচিত শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যা বেশ বিরক্তিকর। “জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৫ ঘোষণা : যুগ্মভাবে শাকিব খান ও মাহফুজ আহমেদ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা এবং জয়া আহসান শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী; শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘বাপজানের বায়োস্কোপ ও অনিল বাগচীর একদিন; শ্রেষ্ঠ পরিচালক রিয়াজুল মওলা রিজু ও মোরশেদুল ইসলাম; শ্রেষ্ঠ গায়ক গায়িকা সুবীর নন্দী, এসআই টুটুল ও প্রিয়াংকা গোপ; আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন অভিনেত্রী শাবানা ও সংগীত শিল্পী ফেরদৌসী রহমান লিখলেই ঝরঝরে হতো। শব্দও খরচ হতো কম।


অস্পষ্টতাও আছে অনেক ক্ষেত্রে


টিকারে যেমন টেনে লম্বা করার প্রবণতা আছে; উল্টোভাবে সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে আংশিক তথ্য উপস্থাপন করতেও দেখা যায়। খণ্ডিত বাক্যে পরিপূর্ণ তথ্য থাকে না বলে দর্শক বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকে। ‘ভারতে ভিআইপিদের গাড়ীতে লাল বাতি খুলে ফেলার নির্দেশ (২০ এপ্রিল ২০১৭) এখানে কে নির্দেশ দিয়েছে সে সম্পর্কে কিছুই বলা নেই। ভারতে কেন্দ্র ও রাজ্য দুই ধরনের শাসন ব্যবস্থা বহাল। ফলে এটা কেন্দ্র সরকারের না বিশেষ রাজ্যের সিদ্ধান্ত তাও স্পষ্ট নয়। ‘আর কাউকে কেমিকেল বা দাহ্য পদার্থের লাইসেন্স নয় : সাঈদ খোকন (১২ মার্চ ২০১৭)। কোথায় দাহ্য পর্দাথের লাইসেন্স দেওয়া হবে না এই টিকার দেখে বোঝার উপায় আছে কি!


এ ধরনের আরো কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে-‘ঢাকা ছাড়ার আগে গুলশানে গণমাধ্যমের সাথে নিশা দেশাইর বৈঠক (১২ জুলাই ২০১৬);  ‘রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে বাংলাদেশ-ভারতের চুক্তি সই (১২ জুলাই ২০১৬); ‘যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ঢাকায় পৌঁছেছেন (২৭ এপ্রিল ২০১৭)। এছাড়া ২০ মার্চ ২০১৭ একটি টিকার ছিলো এমন-‘ম্যানহোলে মৃত্যু : পল্টন থানার ২ কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ডিএমপি কমিশনারকে হাইকোর্টের নির্দেশ। এখন প্রশ্ন, দুই কর্মকর্তা না হয় থানার, প্রকৌশলীও কী থানার!


বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের সামনে ঢাবির শিক্ষার্থীদের সাথে এলাকাবাসীর সংঘর্ষ; আহত ২০ (১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কটি কোথায় তা বলা হয়নি। অথচ টিকারের শুরুতে ‘গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু সাফারি ...’ লিখলেই সহজেই বুঝতে পারতো দর্শক। আসলে একটু মনোযোগ দিয়ে লিখলেই টিকারের উদ্দেশ্য ও কার্যকরিতা অনেকাংশে বেড়ে যায়। ফলে অল্পের মধ্যে কীভাবে সহজবোধ্য টিকার লেখা যায়, সেদিকে আরো মনোযোগ দেওয়া জরুরি।


তথ্যগত ভুলও আছে


১ জুন ইংল্যান্ডে শুরু হবে ওয়ানডে র‌্যাংকিং এর শীর্ষ ৮ দেশের টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি : সেখানে চ্যাম্পিয়ন দল ২.২ মিলিয়ন ডলার, রানার্সআপ ১.১ মি. ডলার, সেমিফাইনালিস্ট দল ৪.৫ মি. ডলার এবং গ্রুপের সর্বনিম্ন দল ৬০ হাজার ডলার প্রাইজমানি পাবে (১৫ মে ২০১৭)। ৩৭ শব্দের এই টিকারে ডলারের অঙ্কে বড়ো ধরনের তথ্যগত ভুল রয়েছে। চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপের সম্মিলিত প্রাইজমানির চেয়েও বেশি টাকা পাবে সেমিফাইনালিস্ট দল! টিকার অনুযায়ী, চ্যাম্পিয়ন আর রানার্সআপ দলের সম্মিলিত প্রাইজমানি তিন দশমিক তিন মিলিয়ন ডলার আর সেমিফাইনালিস্ট দল পাবে চার দশমিক পাঁচ মিলিয়ন ডলার! তথ্যগত ভুলের সঙ্গে অসঙ্গতি রয়েছে বাক্য গঠনেও। ‘শীর্ষ আট দেশের টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি নয়, হবে ‘আট দেশের অংশগ্রহণে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। আর মিলিয়ন-বিলিয়নের হিসাবনিকাশ খানিকটা কঠিনই সাধারণ মানুষের কাছে। ফলে টাকার অঙ্কে লেখাই ভালো। দুটি ভুলসহ টিকারটি দীর্ঘ সময় চললেও সংশ্লিষ্ট চ্যানেলের কেউ তা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়নি।


৫৬০ উপজেলায় ৯ হাজার ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হবে মডেল মসজিদ (২৫ এপ্রিল ২০১৭)। বাংলাদেশে উপজেলার সংখ্যা মোট চারশো ৯১টি, যা সকাল-বিকাল পরিবর্তন হয় না। জেলা ও উপজেলা মিলিয়ে পাঁচশো ৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ করবে সরকার; তার মানে এই নয়, উপজেলার সংখ্যা পাঁচশো ৬০টি। একটু সচেতন হলেই ইন্টারনেট থেকে এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য জেনে নেওয়া সম্ভব ছিলো। ‘ভারতের সঙ্গে তিস্তাসহ ৫৮টি অভিন্ন নদীর পানির বন্টনের বিষয়টি জাতিসংঘে তোলার আহবান মির্জা ফখরুলের (১৯ এপ্রিল ২০১৭)। আন্তঃসীমান্ত নদী বাংলাদেশে আছে ৫৭টি। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪টি। কোনো ব্যক্তির মন্তব্যে এমন তথ্য থাকলেও টিকারে সেই ভুল তথ্য দেওয়ার সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে ‘ভারতের সঙ্গে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর ...’ লেখা যেতো।


স্কোর : অস্ট্রেলিয়া ৪৫১ ও ভারত ৬০৩/৯ (ডিক্লে) ২৩/২ (২০ মার্চ ২০১৭)। টেস্ট ক্রিকেটে কোনো দল যথেষ্ট রান করলে ইনিংস ঘোষণা করে। এক্ষেত্রেও ভারতের প্রথম ইনিংস ঘোষণার পর, অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে দিন শেষে দুই উইকেট হারিয়ে ২৩ রান করে। ফলে সঠিকভাবে স্কোরটা হবে-‘অস্ট্রেলিয়া ৪৫১ ও ২৩/২, ভারত ৬০৩/৯ (ডিক্লে.)’। অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ভারতের সঙ্গে যাওয়া গুরুতর ভুল। জায়গা মতো লিখলেও সতর্ক থাকতে হবে, তথ্যটা সঠিক যাচ্ছে কি না তা নিয়েও। যেমন : ‘...  স্কোর অস্ট্রেলিয়া ৪৫১ ও ২৩/৩, ভারত ৬০৩/৯ (ডিক্লে)’ (৭ এপ্রিল ২০১৭)। অথচ দ্বিতীয় ইনিংসে দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ছিলো ২৩/২। কিন্তু টিকারে ভুলভাবে লেখা হয়েছে ২৩/৩।


টিকার ডেস্ক : কেনো এমন হয়?


যতো দক্ষ ও অভিজ্ঞই সংবাদকর্মী হোন না কেনো, টেলিভিশন চ্যানেলে এককভাবে কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। এখানে প্রতিটি কাজে ধাপে ধাপে ন্যূনতম তিনÑচার জনের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। এ কারণেই টেলিভিশন চ্যানেল হলো যৌথ কাজের ক্ষেত্র। কিন্তু একমাত্র টিকারের ক্ষেত্রেই এর ব্যতিক্রম দেখা যায় কমবেশি সব চ্যানেলেই। বার্তাকক্ষসহ চ্যানেলের অন্যরা যতোটা ব্যস্ত থাকে সংবাদ, সংবাদ বুলেটিন ও অনুষ্ঠান নির্মাণে, তার চেয়ে কম সময় বা নজর দেয় টিকারে। এই ডেস্কের ভুলকে তারা কেনো জানি কেবল সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মীদের ভুল বা সমস্যা হিসেবেই দেখতে চায়! ফলে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সবার চোখ থাকে তার সময়ে সংবাদ বুলেটিন যেভাবে সাজানো হয়েছে সেভাবে গেলো কি না, লাইভ ঠিকঠাক হলো কি না, অন্যরা সেসময় কে কী দিচ্ছে, ব্ল্যাক গেলো কি না (হুট করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে কয়েক সেকেন্ড পর্দা কালো হয়ে যাওয়া) এসবের দিকে।


বার্তাকক্ষের লোকজনের এসব বিষয় নিয়ে যতোটা নজরদারি থাকে, তার কানাকড়িও টিকারের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। অথচ সবধরনের সংবাদ, এমনকি বিজ্ঞাপন, ঘোষণা সবকিছুই যায় টিকারের মাধ্যমে। যদি বিশেষ কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ে সংবাদ বুলেটিন সম্প্রচার না করা যায়, সেই ঘোষণাও আসে টিকারে। ফলে চ্যানেলের সবগুলো বিভাগের মধ্যে টিকারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু চ্যানেল বা বার্তাকক্ষে সেই টিকার ডেস্কে অযত্নের ছাপ পরতে পরতে।


আবার টিকার ডেস্কে যারা বসে তারা কতোটা দক্ষ, পেশাদারি বা দায়িত্বশীল তাও খতিয়ে দেখা জরুরি। রাজনীতি, আদালত, অপরাধ, আন্তর্জাতিক ব্যবসা-অর্থনীতি, খেলাধুলা, সংস্কৃতিবিষয়ক সংবাদের জন্য বিটভিত্তিক সাংবাদিক রয়েছে। তাদের সবার দেওয়া সংবাদ, তথ্য নিতে ও দিতে হয় টিকার ডেস্কের কর্মীদের। সঙ্গে সারাদেশের জেলা প্রতিনিধিদের সংবাদ তো রয়েছেই। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে টিকার ডেস্কে দায়িত্ব পালনের সময় একজন সংবাদকর্মীকে মোটাদাগে সবধরনের বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে হয়। সঠিক টিকার যেমন তাদের হাত দিয়ে যায়, তেমনই ভুলে ভরা টিকারও তাদের মাধ্যমেই যায়।


সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার সকালে থেকে রাত পর্যন্ত ভুল টিকার চলার পরও তা সংশোধন না হওয়া। টিকার ডেস্কের বাইরেও সংবাদকর্মীসহ অনেক লোক কাজ করে একেকটি চ্যানেলে। কেউ একজন দেখলেই তা ঠিক করা সম্ভব। কিন্তু তা হয় না বললেই চলে। ২৪ ঘণ্টায় পর্যায়ক্রমে টিকারের দায়িত্বে থাকে কয়েকজন। রিলে দৌড়ের মতো একজন আরেকজনের হাতে দায়িত্ব অর্পণের কথা। ফলে দিনে-রাতে যখনই হোক না কেনো, ডেস্কে বসে প্রথমে একনজরে সব টিকার দেখে নেওয়া একজন সংবাদকর্মীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এতে ভুল থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ যেমন থাকে, তেমনই আগের সময়ের ঘটনাবলি সম্পর্কে একটা সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু টিকার ডেস্কের কর্মীদের ক্ষেত্রে এই চর্চার যথেষ্ট ঘাটতি চোখে পড়ে।


একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, কে বা কার হাতে ভুল হয়েছে সেটা দর্শক জানতে বা বুঝতে চাইবে না। ভুল মানে সেটাকে তারা চ্যানেলের ভুল হিসেবে দেখে। আর একজন টিকার ডেস্কের কর্মী একটু সচেতন ও কাজের প্রতি দায়িত্বশীল হলেই ভুলের পরিমাণ সিংহভাগ কমানো সম্ভব। তার পরও কেনো উপরের ভুলগুলো ধরতে পারছে না সংবাদকর্মীরা! যাদের বেশিরভাগই উচ্চ শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে এসেছেন। সেই প্রশ্নের অনুসন্ধানও সময়ের দাবি। এটা ঠিক এখনো বাংলাদেশের সম্প্রচার সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে। টিকার ডেস্কের কর্মীদের মধ্যেও এক ধরনের প্রবণতা রয়েছে ঘণ্টা-চুক্তির মতো কাজ করে চলে যাওয়ার। নিজেদের সংবাদকর্মী তথা চ্যানেলের অংশ মনে করে, টিকারে কাজ করার ক্ষেত্রেও ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। তবে টিকার ডেস্কের সংবাদকর্মীদের সঙ্গে বার্তাকক্ষের নীতি নির্ধারকদেরও এ দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ টিকারসহ কোনো চ্যানেলের মান উন্নয়নের দায়িত্ব এই নীতি নির্ধারকদের ওপরই বর্তায়। প্রয়োজনে টিকার ডেস্কের কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।


তাই সম্প্রচার সাংবাদিকতার অর্জন, সম্মান ও পেশাদারিত্বের বিষয়ে এখনই নজর দিতে হবে; তা না হলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী ধাপে উত্তরণ সম্ভব হবে না।

 

লেখক : সুশান্ত সিনহা, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টেলিভিশন-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক।


[email protected]


[email protected]

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন