Magic Lanthon

               

ইব্রাহীম খলিল

প্রকাশিত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চলচ্চিত্রে সেন্সরশিপ : সময় গেলেও রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায়নি কিছুই

ইব্রাহীম খলিল


এ এক আজব কারখানা!

নায়িকার স্তনের ভাঁজ, বোমা হামলা, দাড়ি-টুপি পরা নায়কএ ধরনের দৃশ্য সম্বলিত ভারতীয় চলচ্চিত্র পাকিস্তানের দর্শকদের জন্য নিষিদ্ধ; হোক সেটা যৌক্তিক কিংবা অযৌক্তিক। ফলে প্রতিবেশী দেশ ভারতে নির্মিত বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত পাকিস্তানিরা। অবশ্য নিষিদ্ধ হওয়ার এই পরম্পরার শুরুটা অনেক আগেই। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে পাক-ভারত যুদ্ধের পর সব ধরনের ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পাক সরকার। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে আরো জোরালো হয় এ নিষেধাজ্ঞা, যখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জিয়াউল হক দেশটিতে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সব ধরনের বিনোদন, বিশেষ করে ভারতীয় বিনোদন মাধ্যমগুলোকে অশালীন বলে অভিহিত করেন। ফলে বিভিন্ন বেড়াজালে পড়ে তার শাসনামলে পাকিস্তানি চলচ্চিত্রশিল্পেও ধস নামে। দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে পাক-ভারত সম্পর্ক খানিক উষ্ণ হলে ভারতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার কালো পর্দা উঠিয়ে নেয় পাক সরকার। সম্পর্কের সেই সূত্র ধরেই ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে মহেশ ভাটের পাপ মুক্তি পায় করাচিতে। এর এক বছর পর পাকিস্তানি অভিনেত্রী মিরাকে নিয়ে মহেশ ভাট নির্মাণ করেন নাজার

২০১০ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রুপাত্মক কমেডি তেরে বিন লাদেন-এ অভিনয় করে মুম্বাইতে খ্যাতি পান পাক অভিনেতা আলি জাফর। কিন্তু নিজ দেশেই চলেনি তার এ চলচ্চিত্র। অভিযোগ উঠেছিলো, চলচ্চিত্রটিতে নাকি পাকিস্তানি আইন ব্যবস্থাকে দুর্বল হিসেবে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে অতিমাত্রায় যৌনতার অভিযোগে পাকিস্তানে মুক্তি পায়নি বিদ্যা বালান অভিনীত দ্য ডার্টি পিকচার। এছাড়া ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ ওঠে অক্ষয় কুমারের খিলাড়ি সেভেন এইট সিক্স-এর বিরুদ্ধেও। কারণ হিসেবে বলা হয়, সেভেন এইট সিক্স সংখ্যাগুলো ইসলাম ধর্মে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগুলো নাম থেকে বাদ দিয়ে চলচ্চিত্রটি পাকিস্তানে মুক্তি দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, প্রেমনির্ভর রানঝানাও নিষিদ্ধ করা হয় পাক দেশে। কারণ এখানে হিন্দু ছেলের সঙ্গে মুসলমান মেয়ের প্রেম দেখানো হয়েছে! সম্প্রতি সব শর্ত উতরে পাকিস্তানে রমরমা ব্যবসা করে সালমান খানের বাজরাঙ্গি ভাইজান। কিন্তু পাকিস্তানি শিশু আর ভারতীয় যুবকের নির্ভেজাল এই গল্পেও কাঁচি চালায় পাক সেন্সর বোর্ড।

তবে চলচ্চিত্র বিষয়ে পাকিস্তানের ভয়ানক এ মূর্তি দেখে ভারতকে সাধু ভাবারও কারণ নেই। দেশটির অধিকাংশ চলচ্চিত্র জুড়েই থাকে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব। আবার নিজ দেশেও চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে ভারতের জুড়ি মেলা ভার। দেশটিতে সমকামিতার বৈধতা থাকলেও কাহিনিতে তা উপস্থিত থাকায় ফায়ার (১৯৯৬) ও আনফ্রিডম (২০১৫) নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ভারতীয় সেন্সর বোর্ড। শুধু তা-ই নয়, ফায়ার-এ অভিনয়ের কারণে শাবানা আজমি ও নন্দিতা দাসকে ক্রমাগত প্রাণনাশেরও হুমকি দেয় উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। আবার চলচ্চিত্রে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু থাকলেও অনেক সময় অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক সনদ দিয়েও অজ্ঞাত কারণে তা মুক্তি না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে দেশটির সেন্সর বোর্ডের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও এ নজির ভূরি ভূরি। রাজনীতি, সংঘাত, ধর্ম, যৌনতা, অশ্লীলতা, ভয়াবহতা, নিষ্ঠুরতা, জঙ্গিবাদ, আইন-শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ধুয়াতুলে অনেক চলচ্চিত্রে কাঁচি চালিয়েছে সেন্সর বোর্ড। এমনকি অনেক চলচ্চিত্রকে ছাড়পত্রও দেয়নি তারা। শুধু তা-ই নয়, এমনও চলচ্চিত্র রয়েছে যেটা সেন্সর বোর্ড দেখানোর অনুমতি দিলেও স্বয়ং রাষ্ট্রই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে সেন্সর বোর্ড মেহেরজান মুক্তি দিলেও কয়েকদিন পর অজ্ঞাত কারণে দেশের কোনো প্রেক্ষাগৃহেই এটা আর প্রদর্শন করতে দেওয়া হয়নি। বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রই প্রগতিশীলতার কথা বলে দাপিয়ে বেড়ালেও তার স্বরূপ পরিবর্তন করে না। ফলে সেন্সর বোর্ড কখন কিসের বিরোধী নয় বা কাকে নস্যাৎ করতে চায় না, সেটা বলা খুবই মুশকিল। কারণ এটা দাঁড়িয়েই আছে কতোগুলো হ্যাঁ-নার ওপর। হয়তো রাষ্ট্র বিশ্বাসই করে, কোনো কিছুর সামগ্রিক সমাধান নেই; টুকরো টুকরো ইস্যুগুলোকে চিহ্নিত করো; সেগুলো উপশমের চেষ্টা করো, এই পর্যন্ত; অসুখ পুরোপুরি সারানোর  দরকার নেই।

সেন্সর থেকে গ্রেডেশন : তাল গাছটা আমার

সেন্সরশিপ হচ্ছে যে কোন ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক অথবা নৈতিক আদেশের ব্যাপারে দেয়া হুমকি, মতামত এবং বিশ্বাসের প্রতিবন্ধক বা নিষেধাজ্ঞা। এ নিষেধাজ্ঞা মানব সভ্যতার মতোই সুপ্রাচীন। ব্যক্তির আচরণ ও অভিমতের ওপর অল্প হলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নিএমন সমাজব্যবস্থা প্রায় অস্তিত্বহীন বলেই ধরে নেওয়া যায়। ফলে রাষ্ট্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দ্বন্দ্বে সেন্সরের ইতিহাস বেশ উৎকীর্ণ। খ্রিস্টপূর্ব চারশো ৪৩-এ প্রাচীন রোমের রিপাবলিক যুগে প্রতি পাঁচ বছরে দুই জন কৌঁসুলি সেন্সর পদে নির্বাচিত হতেন। সেই সেন্সর পদ থেকেই সেন্সর শব্দের উৎপত্তি। সেসময় রোমে সেন্সর শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক পদ হিসেবে বিবেচিত হতো এবং রোমান সাম্রাজ্যের একনায়কের পরেই তার স্থান ছিলো। মূলত কী করা যাবে আর কী করা যাবে না, তারাই সেটা নির্ধারণ করে দিতেন।

কালের বিবর্তনে ধর্ম, যোগাযোগ, সংবাদপত্র, বেতার, টেলিভিশন, পুস্তক, চলচ্চিত্র, নাটকে নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে নানা বাধ্যবাধকতা থাকায় মানুষের জীবনধারায় সেন্সর যেনো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়ে। তবে এটা অনেকাংশে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক ধারা ও পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেন্সরের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে চলচ্চিত্রের আবির্ভাব মানুষকে অবাক করলেও বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই এর প্রভাবিত করার ক্ষমতা শাসকশ্রেণিকে ভীত ও বিচলিত করে। ফলে এর বিভিন্ন দৃশ্য ও বক্তব্যের ওপর বিধিনিষেধ শুরু হয়।

চলচ্চিত্রে সেন্সরশিপের গল্পের শুরু লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের চলচ্চিত্র আবিষ্কারের ঠিক দুই বছর পরেই। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নাভানা রাজ্যে দুই মুষ্টিযোদ্ধা জেমস কর্বেট ও ফিটসিমন্স-এর মধ্যে খেলা হয়। সেই লড়াইটি অনিয়ম করে জয় লাভের মাধ্যমে শেষ হয়। ঘটনাক্রমে সেসময় খেলার পুরোটা ইনোচ জে. রেকটর নামের একজন ১১ হাজার ফিট রিলে ধারণও করেন। ফলে বিপুল টাকার বিনিয়োগ এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুষ্টিযুদ্ধ খুব জনপ্রিয় হওয়ায় ধারণকৃত দৃশ্য বিভিন্ন রাজ্যে প্রদর্শন হলে এ অনিয়ম বেশ বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে মজার বিষয় হলো, মুষ্টিযুদ্ধের যে অনিয়মটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, সেটি নাভানা রাজ্যে বৈধ ছিলো।

ফলে ধারণ করা সেই দৃশ্য নিয়ে অন্য রাজ্যে বিস্তর সমালোচনা হলেও চলমান চিত্র প্রদর্শন সম্পর্কিত কোনো বিধি না থাকায় সেটার প্রদর্শনী বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছিলো না। তাই ঘটনার তিন দিন পর মেইন (Maine) রাজ্য আইনসভা এ অবৈধ ফুটেজ প্রদর্শনীর ওপর একটি আইন পাশ করে। মুষ্টিযুদ্ধ ধারণ করা এ ফুটেজ প্রদর্শন করলে পাঁচশো ডলার জরিমানারও বিধান করা হয়। এরপর নিউ জার্সি, নিউইয়র্কসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যও একই পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু খেলাটি সেসময় এতোটাই জনপ্রিয় ছিলো যে, প্রদর্শনকারীরা নিমিষেই আইনটি ভেঙে ফেলে এবং এ আইনের কথা মানুষ ভুলেও যায়।

তারপর অবশ্য ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে শিকাগো রাজ্যসরকার প্রথম চলচ্চিত্র নিয়ন্ত্রণাদেশ জারি করে। এরপর দেশে দেশে কখনো সেন্সর, কখনো গ্রেডিং পদ্ধতির কথা বলে চলচ্চিত্রের ওপর সেই নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত আছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মতো কিছু দেশ উদারতার কথা বলে চলচ্চিত্রে সেন্সর আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করলেও গ্রেডিং পদ্ধতির আড়ালে সেটা ঠিকই চালু রেখেছে। এখন প্রশ্ন হলো, সেন্সর ও গ্রেডিং পদ্ধতিতে কী হয়? সাধারণত প্রায় সব দেশেই চলচ্চিত্রে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, নৈতিকতাহীনতা, অশ্লীলতা, বর্বরতা, অপরাধ, নকল ছবিসহ সরকারি নীতিমালা, দেশীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে সেন্সর করে। সেন্সর বলতে কোনো সংলাপ, দৃশ্য, সঙ্গীত কেটে ফেলার নির্দেশ দেওয়া অথবা কখনো পুরো চলচ্চিত্রকেই প্রদর্শনের অযোগ্য ঘোষণা করাকে বোঝায়।

আবার অনেক দেশের চলচ্চিত্রে সেন্সর বোর্ড উদারীকরণের মাধ্যমে গ্রেডেশন প্রথার প্রচলন করে। কারণ চলচ্চিত্রের প্রধান সমস্যা কেবল রাষ্ট্রীয় ও অশ্লীলতা নয়, এর সঙ্কট সার্বিক। গ্রেডিং পদ্ধতির ক্ষেত্রে বিশেষ চিহ্নের সাহায্যে প্রদর্শনে বাধ্যবাধকতা আরোপ করে ছাড়পত্র প্রদান করা হয়। যেমন : জি চিহ্ন মানে জেনারেল। এই ক্যাটাগরির চলচ্চিত্র সবার জন্য উন্মুক্ত। পি জি মানে প্যারেন্টাল গাইডেন্স। এই ধরনের চলচ্চিত্র একজন প্রাপ্তবয়স্কের সান্নিধ্যে কম বয়সিদের জন্য দর্শনযোগ্য। আর মানে রেস্ট্রিক্টেড। ১৭ বছর বয়সিরা বাবা-মায়ের সঙ্গে এসব চলচ্চিত্র দেখতে পারবে। এন সি ১৬ মানে নট ফর চিলড্রেন আন্ডার সিক্সটিন। এ চলচ্চিত্রগুলোতে কিছুটা নগ্নতা ও সহিংসতা থাকায় ১৬ বছরের নীচে কেউ এটা দেখতে পারবে না। ব্যান্ড মানে সব ধরনের দর্শকের জন্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ। তবে এতো সেন্সর কিংবা গ্রেডেশন পদ্ধতির পরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়; বেধে দেওয়া অসংখ্য নিয়মনীতি অনুসরণ করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও আদৌ কি রাষ্ট্র সবসময় সেটা মুক্তি দেয়? দেয় না। কারণ শত নিয়মের পরও রাষ্ট্রের অলিখিত নিয়ম আছেসর্বোপরি রাষ্ট্র যদি মনে করে কোনো চলচ্চিত্র ব্যক্তি, সংস্কৃতি, ধর্ম কিংবা স্বয়ং রাষ্ট্রের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তখন সেটা নিষিদ্ধ করতে পারে। ফলে কোনো চলচ্চিত্র মুক্তির কিছুকাল পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্র যখনই মনে করে সেটা তার জন্য হুমকি স্বরূপ, তখনই তার ওপর নিয়ন্ত্রণারোপ করে। 

হলিউডি চলচ্চিত্র এবং চলচ্চিত্রে বাধ্যবাধকতা

হলিউডের চলচ্চিত্র মানেই কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র নয়। যদিও হলিউডি চলচ্চিত্র বলতে যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্রকেই বোঝানো হয়। তবে অন্য দেশে নির্মিত অনেক চলচ্চিত্রও কিন্তু হলিউডি চলচ্চিত্র। কারণ সেসব চলচ্চিত্র যুক্তরাজ্য কিংবা ফ্রান্সে নির্মাণ হলেও, সেগুলো আসলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের এবং সেগুলো মুক্তিও পায় হলিউডি চলচ্চিত্র হিসেবে। ফলে হলিউডি চলচ্চিত্রের সেন্সর বা গ্রেডেশন পদ্ধতি যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর, তাই হলিউডের সেন্সর বা গ্রেডেশন পদ্ধতির আদি-অন্ত বলতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্রের কথাই বলতে হবে। কারণ ব্রিটেন কিংবা ফ্রান্সের চলচ্চিত্রের জন্যও আলাদা আলাদা সেন্সর বা গ্রেডেশন পদ্ধতি রয়েছে। আবার সেন্সর সংক্রান্ত তাদের ইতিহাসও হলিউডে সেন্সর প্রথা প্রচলনের অনেক পরে শুরু।

তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আইন করে চলচ্চিত্রে সেন্সর প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা হলেও এর অতীত কিন্তু চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতি উদারতার কথা বলে না। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো রাজ্য তখন দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম চলচ্চিত্র বাজার। সদ্য জনপ্রিয় হওয়া মাধ্যমটি জনসাধারণের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও, রাজ্যসরকার সেটা নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। ফলে নিয়ম করা হয়, রাজ্যের পুলিশ প্রধান কোনো চলচ্চিত্র নৈতিকতা বিরোধী মনে করলে সেটার প্রদর্শন নিষিদ্ধ করতে পারবে। তবে এর জন্য নৈতিকতার মানদণ্ড ঠিক কী হবে, তা সুস্পষ্ট ছিলো না। যদিও এটাই ছিলো তখন পর্যন্ত চলচ্চিত্রের ওপর প্রথম কোনো সেন্সর প্রথা আরোপের ঘটনা।

১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে শিকাগো রাজ্যসরকার পুলিশ প্রধানের মতামতের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি নিয়ন্ত্রণাদেশ জারি করে। সে বছরই নিউইয়র্কের বিভিন্ন সংগঠন মিলে চলচ্চিত্রের মঙ্গলের জন্য প্রতিষ্ঠা করে নিউইয়র্ক বোর্ড অব মোশন পিকচার্স সেন্সরশিপ নামের একটি সংগঠন। ফেডারেশন চার্চ, পৌর মহিলা সমিতি ও অপরাধ নিরোধক সমাজসহ ১০টি সংগঠনের সমন্বয়ে এটা গঠন করা হয়। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে আরো ব্যাখ্যা সহকারে পেনসিলভেনিয়া রাজ্যে চালু করা হয় সেন্সর প্রথা। এরপর আস্তে আস্তে যুক্তরাষ্ট্র্রের বিভিন্ন রাজ্যে এ প্রথা বাস্তবায়ন হতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের ওপর নির্মিত বিশ্বের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ডি. ডব্লিউ গ্রিফিথ-এর বার্থ অব অ্যা নেশন ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বিশেষ করে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালি, সুইডেন ও কানাডা সেন্সর প্রথা আরোপ করতে থাকে। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে টি. পি. ও. কনর-এর পরিচালনায় ৪৩টি বিধি নিয়ে ব্রিটিশ বোর্ড অব সেন্সরস প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার মধ্যে ১৯টি বিধিই ছিলো যৌনাবেদন সম্পর্কিত। এর বাইরে বিতর্কিত রাজনীতি প্রসঙ্গ, পুঁজিবাদী ও শ্রমিকদের মধ্যে সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠিত জননেতা ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নিন্দাত্মক ঘটনা, যুদ্ধের বীভৎসতা, ভারত পরিস্থিতি বিষয়ক ঘটনাযাতে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের অশ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে দেখানো হয় বা এ জাতীয় রাজ্যের আনুগত্য থেকে বিচ্যুতির ইঙ্গিত দেয়, অথবা ব্রিটিশ মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেএমন বিধিগুলো অন্যতম। কনরের পরিচালনায় তৈরি বিধি অনুযায়ী ব্রিটিশ সেন্সর বোর্ড দ্য ব্যাটলশিপ পটেমকিন, দ্য এন্ড অব সেন্ট পিটারসবার্গ, মাদার, অক্টোবর, নিউ ব্যাবিলন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে এসব চলচ্চিত্রের অধিকাংশ ফ্রান্সেও নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দ্য ব্যাটলশিপ পটেমকিন ফ্রান্সে নিষিদ্ধই ছিলো।

নির্বাক যুগে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে হলিউডে যৌন কেলেঙ্কারি, মাদক, সমকামিতার আধিক্য দেখা দিলে মার্কিন কংগ্রেসে এসব সমস্যা দূরীকরণ এবং চলচ্চিত্র উন্নয়নের জন্য প্রায় একশোটি বিল পাশ হয়। তার পরও সেন্সরশিপের বিধির চেয়ে রাষ্ট্র যা বলতো তাই ছিলো শেষ কথা। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে দ্য মোশন পিকচার প্রোডিউসারডিস্ট্রিবিউটর অব আমেরিকা (এম পি পি ডি এ) স্টুডিও দুটি একসঙ্গে কাজ শুরু করে। এরপর তারা সেন্সরবিষয়ক সমস্যার সমাধানে সরকারের প্রতিনিধি উইলিয়ামস এইচ. হেইস-এর কাছে যায়। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে হেইস কী করা যাবে, আর কী করা যাবে না, তার একটি তালিকা তৈরি করেন। যার অধিকাংশই আঞ্চলিক সেন্সর বোর্ড কর্তৃক আগে থেকেই নিষিদ্ধ। তবে এর মধ্যে ১১টি নিয়ম একেবারেই ট্যাবু এবং ২৫টি নিয়ম কিছুটা নমনীয় ছিলো। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে এম পি পি ডি এ একটি নিয়ম প্রণয়ন করে, যেটা দ্য মোশন পিকচার প্রোডাকশন কোড বা হেইস কোড নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে চলচ্চিত্র রিভিউয়ের জন্য জুরি বোর্ডও তৈরি করা হয়। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে শি ডান হিম রঙ চলচ্চিত্রে Why don't you come up sometime and see me. I'm home every evening (তুমি কেনো মাঝে মাঝে আসো না, আমাকে দেখো না। আমি তো প্রতি রাতে বাড়িতেই থাকি) এই সংলাপের জন্য সেন্সর বোর্ড আপত্তি তোলে এবং তা বাদ দিতে বাধ্য করে।

১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে যখন যুক্তরাষ্ট্রের রোমান ক্যাথলিক চার্চ ও প্রোটেস্টেন্টদের সংগঠন চলচ্চিত্রের অশ্লীল বিষয়কে অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা দেয়, তখন সেন্সর বোর্ড অনেক নিয়মনীতি প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়। এরপর জোসেফ আই. ব্রিন নামের একজন ক্যাথলিককে নিয়ে হেইস প্রোডাকশন কোড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (পি সি এ) প্রতিষ্ঠা করেন। এই পি সি এ অনুমোদিত সিলের মাধ্যমে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনুমতি দেয়; স্টুডিওগুলোও এই শর্ত মেনে নেয়। এমনকি চলচ্চিত্র নির্মাণের আগে মূল চিত্রনাট্য ও নির্মাণের পর তা ছাঁচিকরণের এখতিয়ারও পি সি এ কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়। এই সময় চলচ্চিত্রে বিতর্কিত বিবাহ, যৌনতা, গল্পের প্রয়োজনে ধর্ষণ, পতিতাবৃত্তি, মাদকতা, যৌন সুড়সুড়ি দায়ক নৃত্যের দৃশ্য রাখারও অনুমতি দেওয়া হয়। তবে চলচ্চিত্রের শেষে অবশ্যই এসবের জন্য শাস্তি দেওয়ার দৃশ্য দেখানোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়।

হলিউডের চলচ্চিত্রে গ্রেডেশন পদ্ধতি চালু হয় মূলত ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে। মোশন পিকচার অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার সভাপতি জ্যাক ভেলেন্টি চার স্তরের রেটিং সিস্টেম চালু করেন। জি (সাধারণ দর্শক), এম (পক্ক দর্শক), আর (১৬ বছরের বড়ো বয়সি, পরে অবশ্য এটা ১৭ বছর করা হয়) ও এক্স (প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য) এই চারটি গ্রেডে চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর থেকে গ্রেডেশন পদ্ধতিতেই হলিউডে চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়া হয়। তবে এর মধ্যে মোশন পিকচার অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা কর্তৃক এই রেটিং পদ্ধতি চালু হলেও তারা কিন্তু এক্স গ্রেডের ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা করেনি। ফলে নির্মাতারা নিজে থেকেই গল্প বা দৃশ্য অনুযায়ী তাদের চলচ্চিত্র এক্স গ্রেডে মুক্তি দিতো। কিন্তু ৮০র দশকে ভিডিও টেপ ও পর্নোগ্রাফির বৃহৎ বাজার তৈরি হলে এক্স গ্রেড নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। তখন বলা হয়, যদি একটি এক্স চিহ্ন দিয়ে যৌন উত্তেজক (hot) বোঝায়, তাহলে তিনটি এক্স চিহ্ন হলে বেশি যৌন উত্তেজক (really steamy) হবে।

এরপর ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন এক্স গ্রেডের চলচ্চিত্র এন সি-১৭ (নো চিলড্রেন আন্ডার ১৭) গ্রেডে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে হলিউডি চলচ্চিত্রে সেন্সরের কথা তেমন না শোনা গেলেও এর গ্রেডেশন পদ্ধতি যে একেবারেই বিতর্কের বাইরে, তা নয়। বর্তমানে তা অত্যন্ত গোপনে সম্পন্ন হয়। অনেক সময় দেখা যায়, একই ধরনের দুটি চলচ্চিত্র কিন্তু রেটিং পদ্ধতি আলাদা। আসলে এর মধ্যে একধরনের নীরব অর্থনৈতিক সেন্সরশিপ চালু রয়েছে। ফলে অনেকেই এন সি-১৭ রেটিং পদ্ধতিতে চলচ্চিত্র মুক্তি না দিয়ে পার পেয়ে যায়। তবে ৯০-এর দশক পর্যন্ত হলিউডি চলচ্চিত্রের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা, সেটার তালিকা কিন্তু বেশ দীর্ঘ। এর মধ্যে ন্যাচারাল বর্ন কিলারস (১৯৯৪) চলচ্চিত্রে গ্রাফিকের মাধ্যমে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই অতিরিক্ত সহিংসতা দেখানোর অভিযোগে সেই দৃশ্যগুলো কেটে বাদ দিতে বলা হয়। কিন্তু পরিচালক অলিভার স্টোন সেটা করতে অস্বীকৃতি জানালেও চলচ্চিত্রটির চার মিনিটের ভিডিও ফুটেজ বাদ দিয়ে এন সি-১৬ গ্রেডে মুক্তি দেওয়া হয়। অবশ্য এতো কাটাছেঁড়ার পর চলচ্চিত্রটি বেশ মুনাফা করলেও আয়ারল্যান্ডে একই অভিযোগে তা আজও নিষিদ্ধ।

আবার কারনাল নলেজ-এ (১৯৭১) চরিত্রগুলো অতি সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলা হলেও এর সুড়সুড়ি দেওয়া নাম ও যৌনাবেদনের কারণে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে তা নিষিদ্ধ করা হয়। সেই নিষিদ্ধাদেশ উপেক্ষা করে সেটা দেখানোর অভিযোগে জর্জিয়ার একজন থিয়েটার ব্যবস্থাপককে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে দ্য লাস্ট পিকচার শো-তে (১৯৭১) একজন কঙ্কালসার মেষপালকের দৃশ্য দেখানোর জন্য ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। পরে চলচ্চিত্রটি কোনোভাবেই অশ্লীল নয় বলে রায় দেন ফেডারেল কোর্ট। এছাড়াও হলিউডে এই তালিকায় লাস্ট ট্যাম্পটেশন অব ক্রিস্ট (১৯৮৮), ইফ ইউ লাভ দিস প্লানেট (১৯৮২), দ্য টিন ড্রাম (১৯৭৯), বনি অ্যান্ড ক্লাডি (১৯৬৭), দ্য লাভারসসহ (১৯৫৮) প্রায় অর্ধ শতাধিক চলচ্চিত্র রয়েছে। যেগুলোর কখনো কোনো দৃশ্য, সংলাপ আবার কখনো পুরো চলচ্চিত্রই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

ঔপনিবেশিক সেন্সর নীতি থেকে বর্তমানের ভারতীয় চলচ্চিত্র

যুক্তরাজ্যে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে টি. পি. ও. কনর-এর পরিচালনায় ৪৩টি বিধি নিয়ে ব্রিটিশ বোর্ড অব সেন্সরস প্রতিষ্ঠার এক বছর পরে ভারতীয় উপমহাদেশে চলচ্চিত্রে নিয়ন্ত্রণারোপে দ্য সিনেমাটোগ্রাফ অ্যাক্ট ১৯১৮ চালু হয়। পরে ১৯১৯ ও ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে সংশোধনীর মাধ্যমে আরো পাকাপোক্ত করা হয় এই অ্যাক্টকে। তবে তখনো কনরের তৈরি করা বিধির ৪৩টির মধ্যে ৪২টিই এ নিয়মাবলীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলো। পরে ঔপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষার্থে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দেই সিনেমাটোগ্রাফ অ্যাক্ট অনুসারে মুম্বাই (বোম্বাই), কলকাতা, চেন্নাই (মাদ্রাজ) ও রেঙ্গুনে পৃথক পৃথক বোর্ড অব ফিল্ম সেন্সরস প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে বার্মা টাউন অ্যাক্ট ও বার্মা ভিলেজ অ্যাক্ট-১৯০৭ ইংরেজ সরকার ঘোষণা করে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি চলচ্চিত্র প্রদর্শন করতে পারবে না। যখন বিদ্যুতের মাধ্যমে প্রক্ষেপণ যন্ত্র চালনা শুরু হয়, তখন অ্যাক্ট অব ইন্ডিয়ান ইলেক্ট্রেসিটি-১৯১০ অনুযায়ী চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য জেলা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতির প্রয়োজন হতো। দ্য সিনেমাটোগ্রাফ অ্যাক্ট ১৯১৮-এর পাঁচ নম্বর ধারায় বলা হয়, কেউ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত অনেক মানুষের ভীড়ে চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী করতে পারবে না। তিন নম্বর ধারায় বলা হয়, সেন্সরশিপের চিঠিতে উল্লিখিত নির্দিষ্ট স্থান ব্যতীত জনসমক্ষে কেউ কিছু প্রদর্শন করতে পারবে না। এছাড়া ধারা চার অনুযায়ী জেলা প্রশাসন কিংবা পুলিশ কমিশনারই কেবল চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনুমতি প্রদান করবে বলে জানানো হয়।

মুম্বাইয়ের সেন্সর বোর্ড ছয় সদস্য নিয়ে গঠন করা হয়, যার সভাপতি ছিলেন একজন পুলিশ কমিশনার, সঙ্গে ছিলেন বন্দরের কাস্টমস কালেক্টর, শিক্ষা বোর্ডের একজন সদস্য, সনাতন ও ইসলাম ধর্মের প্রতিনিধিত্বকারী দুই জন এবং এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন পার্সিদের প্রতিনিধিত্বকারী একজন। কলকাতার আট জনের সেন্সর বোর্ডে ছিলেনসভাপতি হিসেবে পুলিশ কমিশনার, একজন স্টেশন স্টাফ অফিসার (সেনাবাহিনীর মুখপাত্র), একজন ইউরোপিয়ান নারী, বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধি, কলকাতা ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি, একজন ইহুদি বণিক এবং কলকাতা পৌরসভার একজন হিন্দু আইনজীবী। অন্যদিকে চেন্নাইয়ের সেন্সর বোর্ডের সদস্য ছিলো ছয় জন। তবে মুম্বাই কিংবা কলকাতার মতো সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের তেমন বাধ্যবাধকতা ছিলো না। সভাপতি হিসেবে পুলিশ কমিশনার, সেনাবাহিনী ও ইসলাম ধর্মের দুই জন মুখপাত্র ছাড়া কারো ব্যাপারে তেমন বাধ্যবাধকতা ছিলো না। রেঙ্গুনের সেন্সর বোর্ড ছিলো আট সদস্য নিয়ে গঠিত। এর সভাপতি ও সেক্রেটারি ছিলেন পুলিশ কমিশনার ও সহকারী পুলিশ কমিশনার। এছাড়া সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র, ইউরোপিয়ান একজন ডাক্তার এবং সুশীল সমাজের চার জন প্রতিনিধি, যাদের মধ্যে কমপক্ষে একজন হলেও নারী সদস্য থাকতেন।

জাতীয়তাবাদের উত্থানে ভারতীয় চলচ্চিত্র ক্রমশ রাজনৈতিক মত ও আদর্শ প্রচারের দিকে ঝুঁকে পড়লে ব্রিটিশ শাসকরা বেশ শঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফলে শুরু হয় নীতিমালার আওতায় চলচ্চিত্র নিষিদ্ধকরণের প্রক্রিয়া। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে কোহিনূর ফিল্মস-এর ভক্ত বিধুর এবং ভারতীয় পটভূমিতে নির্মিত মার্কিন চলচ্চিত্র ত্রিশত্রম সাহিক বোর্ড অব সেন্সরস নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এর আগে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে মুসলমান জনগণ সম্পর্কে সরকারের মনোভাব নিয়ে নির্মিত ভার্জিন অব ইস্তামবুল নিষিদ্ধ করা হয়। আর এটাই ছিলো ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম কোনো চলচ্চিত্র নিষিদ্ধের ঘটনা। এরপর আইজেনস্টাইনের দ্য ব্যাটলশিপ পটেমকিন ভারতে নিয়ে আসলে বোম্বের (বর্তমানে মুম্বাই) তৎকালীন পুলিশ কমিশনার তা দেখে বলেছিলেন, এই ছবি বিশেষভাবে বলশেভিক বিপ্লবের সমর্থনে এবং সাধারণভাবে সরকারকে উচ্ছেদ করতে ইঙ্গিত দিচ্ছে।১০ ফলে চলচ্চিত্রটি ভারতীয় উপমহাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে কোনো চলচ্চিত্র তারা অবাঞ্ছিত মনে করলে, সব রাজ্যসরকারকে সেটা নিষিদ্ধের নির্দেশ দিতেন। এমনকি ভারতে ব্রিটিশদের জন্য হানিকর কোনো চলচ্চিত্র সম্পর্কে অন্য দেশের রাষ্ট্রদূতরা আপত্তি জানালেও তা নিষিদ্ধ করা হতো। ১৯২১ থেকে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতায় ৬১টি, মুম্বাইয়ে ৩৯টি ও রেঙ্গুনে ১৭টি চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করে ঔপনিবেশিক সরকারের সেন্সর বোর্ড।১১

১৯৪৭-এ ভারত স্বাধীনের পাঁচ বছর পর ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে দেশটির তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় চলচ্চিত্র নিয়ন্ত্রণারোপের জন্য সিনেমাট্রোগ্রাফ অ্যাক্ট-১৯৫২ প্রণয়ন করে। ভারতে বর্তমান সেন্সর বোর্ডের নাম সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন (সি বি এফ সি)। চলচ্চিত্রবিষয়ক এ প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর মুম্বাইয়ে হলেও সারাদেশে এর নয়টি কার্যালয় রয়েছে। ভারতে মূলত দ্য সিনেমাটোগ্রাফ (সার্টিফিকেশন) রুলস-১৯৮৩ প্রণয়নের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে গ্রেডেশন পদ্ধতি চালু হয়। বর্তমানে চারটি গ্রেডে প্রতিষ্ঠানটি ছাড়পত্র দেয়। এর মধ্যে ইউ গ্রেডের চলচ্চিত্র মানে সেটা সব ধরনের দর্শকের জন্য উন্মুক্ত, ইউ এ ১২ বছরের কম বয়সি শিশুদের বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রদর্শনযোগ্য, শুধু প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য এবং সর্বশেষ এস গ্রেডের চলচ্চিত্র চিকিৎসক বা বিজ্ঞানীদের মতো বিশেষায়িত দর্শকের জন্য প্রদর্শনযোগ্য।১২

লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, সবকিছুর পরও রাষ্ট্র যদি মনে করে কোনো চলচ্চিত্র ক্ষতিকর তাহলে সেটা সে বন্ধ করতে পারে। আর এই বিষয়টাই ভারতের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ঘটেছে অহরহ। ব্যান্ডিট কুইন (১৯৯৪), ভারতের কুখ্যাত নারী ডাকাত ফুলন দেবীকে নিয়ে নির্মিত। ফুলনের কাছ থেকে অনুমতি না নেওয়া এবং চলচ্চিত্রে রঙ লাগিয়ে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা ও অপ্রয়োজনীয় নগ্ন দৃশ্য দেখানোর অভিযোগে চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ করে সেন্সর বোর্ড। এরপর দিপা মেহতা তার ফায়ার-এ (১৯৯৬) দুই নারীর মধ্যে সমকামিতার সম্পর্ক দেখালে ভারতীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশেষত শিবসেনা এর বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন শুরু করে। এমনকি চলচ্চিত্রের নির্মাতা, অভিনেত্রী শাবানা আজমী ও নন্দিতা দাসকে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকিও দেয় তারা। একপর্যায়ে এ চলচ্চিত্রটিও নিষিদ্ধ করে ভারতীয় সেন্সর বোর্ড। একই বছর ভারতে ষোড়শ শতাব্দীর পটভূমিতে নির্মিত কামাসূত্রা : অ্যা টেল অব লাভ সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও সেন্সর বোর্ড তা জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ করে। সেন্সর বোর্ডের অভিযোগ ছিলো চলচ্চিত্রটি নাকি অনৈতিক, ব্যভিচার ও কুরুচিপূর্ণ নগ্ন দৃশ্যে পরিপূর্ণ। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে এক কাশ্মীরি ফুটবলপ্রেমীকে নিয়ে নির্মিত ইনশাল্লাহ ফুটবলকে নিষিদ্ধ করে ভারতের সেন্সর বোর্ড। যেখানে দেখানো হয়, শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে কাশ্মীরে সংঘটিত বিদ্রোহের একজন জঙ্গি বলে তার বাবাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। ফলে ছেলেটির স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। কাশ্মীরের নানা অজানা কারণ এবং স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয় থাকার অভিযোগে চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ করা হয়।১৩

২০১০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত গাণ্ডু নিষিদ্ধ করে কলকাতা সেন্সর বোর্ড। অশ্লীল সংলাপ ও যৌনতার অভিযোগে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও ইন্টারনেটের কল্যাণে তা ছড়িয়ে পড়লে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মতামতই উঠে আসে; কিন্তু চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধই থেকে যায়। অন্যদিকে ২০১২ খ্রিস্টাব্দে বাউল-ফকিরদের দেহতত্ত্ব নিয়ে নির্মিত অমিতাভ চক্রবর্তীর কসমিক সেক্সও নিষিদ্ধ করে ভারতীয় সেন্সর বোর্ড। চলচ্চিত্রটির ৩১টি জায়গায় কাঁচি চালিয়ে ও বিভিন্ন জায়গা ঝাপসা করে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। কিন্তু এতো কাটাকাটি ও দৃশ্য ঝাপসা করার নির্র্দেশ অমিতাভ মেনে নিলেও শেষ পর্যন্ত সেই অশ্লীলতার কারণেই মুক্তির ব্যাপারে চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেয়নি সেন্সর বোর্ড। পরে সেন্সর বোর্ডের ধৃতাত্মার প্রতিবাদ হিসেবে ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে অনলাইনেই মুক্তি পায় কসমিক সেক্স। নিষিদ্ধ হওয়ার এই তালিকা কিন্তু বেশ দীর্ঘ। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে প্রগতিশীলতার কথা বলে গেলেও এ তালিকা দিনকে দিন বৃদ্ধিই পাচ্ছে। এতে রয়েছে উফফ প্রফেসর (২০০০), ফিরাক (২০০৮), আনফ্রিডম (২০১৫), দ্য পিঙ্ক মিরর (২০০৩), পাঁচ (২০০৩), ব্লাক ফ্রাইডে (২০০৭), ফারজানিয়া (২০০৫), সিনস্ (২০০৫) ও ওয়াটার-এর (২০০৫) মতো বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র।

বিভিন্ন গ্রেডে চলচ্চিত্র মুক্তির কথা থাকলেও সেন্সরের ভূত কিন্তু ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষের মাথা থেকে যায়নি। যেমন সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া উড়তা পাঞ্জাব (২০১৬) থেকে ৯০টি দৃশ্য কেটে ফেলার দাবি করে সেন্সর বোর্ড। পরে বলিউডে এটা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা শুরু হলে হাইকোর্টের নির্দেশে মাত্র দুইটি দৃশ্য কাটার মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। অন্যদিকে অসাধারণ চিত্রনাট্যের আরেকটি চলচ্চিত্র আলিগড় (২০১৬)। ভারতের সেন্সর বোর্ড চলচ্চিত্রটির কোনো দৃশ্যের ওপর কাঁচি না চালালেও এক্ষেত্রে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। শুধু হোমোসেক্সুয়ালিটি শব্দটি ব্যবহারের কারণে আলিগড়কে গ্রেডে (শুধু প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য) মুক্তি দেওয়া হয়। আর যশরাজ ফিল্মস-এর দম লাগাকে হাইসাতে (২০১৫) নিঃশব্দ করে দেওয়া হয় লেসবিয়ান শব্দটি। তবে ব্যতিক্রম যে একেবারেই নেই তা নয়। এ বছরেই নির্মিত ক্যায়া কুল হ্যায় হাম থ্রি কোনো বিতর্ক ছাড়াই গ্রেডে মুক্তি দেন সেন্সর বোর্ডের প্রধান পহলাজ নিহালানি। কিন্তু চলচ্চিত্রটির ট্রেলর মুক্তি পাওয়ার পর নাকি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে সেন্সর বোর্ডের প্রধানকে ভর্ৎসনা করা হয়; বলা হয়, এমন ভালগার ট্রেলর কীভাবে মুক্তি দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো?

এতোকিছুর পরও একটি বিষয় বারবার ঘুরপাক খায়। ভারতে কিন্তু হোমোসেক্সুয়ালিটি মোটেই আইনিভাবে নিষিদ্ধ নয়। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে ফায়ার কিংবা আনফ্রিডমকে নিষিদ্ধ করা হলো কেনো? আর কেনোইবা হোমোসেক্সুয়ালিটি শব্দটি থাকার কারণে আলিগড়কে গ্রেডে ও দম লাগাকে হাইসাতে শব্দটি নিঃশব্দ করে মুক্তি দেওয়া হলো! বলিউডে যদি এ সম্পর্কিত কোনো চলচ্চিত্র এর আগে মুক্তি না দেওয়া হতো বা আইনিভাবে নিষিদ্ধ থাকতো তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। এমনকি সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া সোনালি বোসের মার্গারিটা উইথ অ্যা স্ট্রতে (২০১৪) কিন্তু হোমোসেক্সুয়ালিটির উপস্থিতি ছিলো। শারীরিক প্রতিবন্ধী একটি মেয়েকে নিয়ে নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি সমালোচকদের অনেক প্রশংসাও পায়। হোমোসেক্সুয়ালিটি নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও চলচ্চিত্রটি কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ হয়নি এবং গ্রেডেও মুক্তি দেওয়া হয়নি।

আসলে এসব চলচ্চিত্র নিষিদ্ধের মূল কারণ কিন্তু মোটেও হোমোসেক্সুয়ালিটি নয়। কারণ আলিগড় সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। আর সেই ঘটনার সঙ্গে রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ একটি মহল যে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, সেটাও প্রমাণিত। ফলে চলচ্চিত্রটি কেনো জনসাধারণের জন্য মুক্তি না দিয়ে গ্রেডে মুক্তি দেওয়া হয়, সেটা সহজেই অনুমেয়। অন্যদিকে মার্গারিটা উইথ অ্যা স্ট্রতে যেভাবে একজন প্রতিবন্ধীর চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তাতে চলচ্চিত্রটি সেন্সর ছাড়া মুক্তি না দিলে রাষ্ট্রের উদারতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতো!

অন্যদিকে ইনশাল্লাহ ফুটবলহায়দার (২০১৪) কাশ্মীরের পটভূমিতে নির্মিত। কিন্তু ইনশাল্লাহ ফুটবলকে নিষিদ্ধ ও হায়দারকে মুক্তি দেয় সেন্সর বোর্ড। কারণ ইনশাল্লাহ ফুটবল-এ রাষ্ট্রের চলমান পরিস্থিতির বর্ণনা আর হায়দার-এ রাষ্ট্রের জয়ধ্বনি করা হয়েছে। চলমান পরিস্থিতি বলতে, এখানে কাশ্মীরে ঘটে যাওয়া রাষ্ট্রের নিত্যদিনের জঙ্গি-জঙ্গি খেলার চিত্রটিই সেখানে তুলে ধরা হয়েছিলো মাত্র। কিন্তু রাষ্ট্র সেটুকুও কাউকে জানতে দিতে চায় না। ফলে গত তিন মাসে কাশ্মীরে শুধু সরকারি হিসাব মতেই ৯০ জন নিহত ও প্রায় ১০ হাজার মানুষ আহত হওয়ার খবর১৪ পাওয়া গেলেও সঠিক তথ্য হয়তো গোপনই থেকে যায়। আবার ফারজানিয়াভাগ মিলখা ভাগ (২০১৩) চলচ্চিত্রের মূল বিষয়বস্তুও কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। একটিতে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে গুজরাট এবং আরেকটিতে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিষয় উঠে এসেছে। কিন্তু ভাগ মিলখা ভাগ ছাড়পত্র পেলেও ফারজানিয়াকে নিষিদ্ধ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে ভারতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওই দাঙ্গায় প্রত্যক্ষ মদদ থাকারও। এছাড়া উপরের নির্দেশে ওই দাঙ্গায় পুলিশ বাহিনীর নিষ্ক্রিয় থাকার প্রমাণও রয়েছে।

ফলে এই চলচ্চিত্রগুলোর ছাড়পত্র না দেওয়ার কারণ ঠিক কী হতে পারে, সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। আবার সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া পাকিস্তান সরকারের অমানবিকতার শিকার ভারতের এক নিরীহ মানুষকে নিয়ে নির্মিত সর্বজিৎ (২০১৬) কিংবা মুম্বাই হামলায় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে নির্মিত দ্য অ্যাটাক অব ২৬/১১ (২০১৩) ভারতের সেন্সর বোর্ডে বিনা বাধায় মুক্তি পাওয়ার কারণও কিন্তু দুর্বোধ্য নয়। ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে হেয় বা সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে অনেক আগে থেকেই। ফলে সেই একই কারণে ভারতের এসব চলচ্চিত্র পাকিস্তান সেন্সর বোর্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে মজার বিষয় হলো, যেসব চলচ্চিত্র পাকিস্তানে নিষিদ্ধ করা হয়, তার অধিকাংশই আবার ভারতে দুহাত ভরে পুরস্কার পায়!

ধর্মভিত্তিক নৈতিকতা : রাষ্ট্রীয়ভাবে ইরানের সেন্সরদারি

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ইরানি চলচ্চিত্রে সেন্সরশিপ চালু হয়। তবে তখন এর জন্য ধরাবাঁধা কোনো আইন ছিলো না। কিন্তু রাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত লাগে এমন কিছু চলচ্চিত্রে থাকলে সেই অংশ বাদ দেওয়া হতো। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, কর্তৃপক্ষকে না দেখিয়ে কোনো চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা যাবে না। ফলে তখন থেকেই ইরানে প্রি-রিভিউ প্রক্রিয়া চালু হয়। বর্তমানে চলচ্চিত্রে সেন্সরশিপের বিষয়টি ইরানের মিনিস্ট্রি অব কালচার অ্যান্ড ইসলামিক গাইডেন্স-এর ওপর ন্যস্ত। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবের পর ইরানে ইসলামি সরকার ব্যবস্থা চালু হলে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রেও অনেক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ফলে ইরানি চলচ্চিত্রের সঙ্গে ধর্ম ও রাজনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়ে। আর সেটা এতোটাই ভয়াবহ রূপ নেয় যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রথম চার বছরে (১৯৭৯Ñ১৯৮২) ইরানে নির্মিত বিপ্লব পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের দুই হাজার দুইশো আটটি চলচ্চিত্রের মধ্যে এক হাজার নয়শো ৫৬টিই নিষিদ্ধ করা হয়।১৫

অন্যদিকে তখন পর্যন্ত ইরানে চলচ্চিত্র সেন্সরের জন্য লিখিত কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকায় তা অনেকাংশে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। প্রথম দিকে ইসলামের নিয়মনীতিকে ছোটো কিংবা বিশ্বাসে আঘাত করে এমন বিষয়ে সেন্সর বোর্ড নিয়ন্ত্রণারোপ করতো। তবে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে সেন্সরের জন্য একটি নির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করে ইরানের চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড। সেই নির্দেশনায় বলা হয়, চলচ্চিত্রে নারীদের চাপা পোশাক, মুখমণ্ডল ও হাত ছাড়া শরীরের অন্য অঙ্গ প্রদর্শন বা হিজাব ছাড়া অভিনয়, নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো ধরনের শারীরিক স্পর্শ বা স্পর্শকাতর শব্দের ব্যবহার, পুলিশ, সামরিক বাহিনী, পরিবারের ঐক্য সম্পর্কে কোনো প্রকার ঠাট্টা-কৌতুক প্রদর্শন, বিদেশি বা উত্তেজনামূলক সঙ্গীত এবং দাড়িওয়ালা কোনো নেতিবাচক চরিত্র প্রদর্শন করা যাবে না।১৬

তবে রাষ্ট্রের এতো বাধা সত্ত্বেও ইরানের চলচ্চিত্রশিল্প কিন্তু তার অবস্থান বেশ পাকাপোক্ত করেছে। এমনকি রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা সাংস্কৃতিক অনেক বাধা পেরিয়ে দারিউস মেহেরজুই, আব্বাস কিয়ারোস্তামি, মহসিন মাখমালবাফ, জাফর পানাহি, সামিরা মাখমালবাফ, ফারহাদির মতো বিখ্যাত সব চলচ্চিত্রনির্মাতা উঠে এসেছেন। কিন্তু তারা কেউই কখনো নিজেদের চলচ্চিত্রে সেন্সরশিপ প্রথা নিয়ে খুশি হতে পারেননি। ইরানের সেন্সর নিয়ে সদ্য প্রয়াত আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে একবার প্রশ্ন করা হলে তিনি খানিকটা কৌশলী উত্তর দেন,

আমি যখন ইরানের বাইরে যাই বিশেষত পাশ্চাত্যে, তখন আমাকে সেন্সরশিপ সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, যা আমাকে খুবই বিব্রত করে। ... আমার বাবা বলতেন তোমার মাথা যদি ভাঙ্গে তবে তা যেন তোমার টুপির ভেতরেই ভাঙ্গে। কাজেই সেন্সরশিপ নিয়ে দেশের বাইরে আমি যতই কথা বলি না কেনো তা কখনো কোন সমাধান এনে দেবে না। আর তাই এই বিষয় নিয়ে দেশের বাইরে আমি কখনো কথা বলি না বা বলতে চাই না বিশেষত সাংবাদিকদের সাথে। বরং উল্টো তাদের প্রশ্ন করিতোমাদের নিজেদেরও কী কোন সেন্সরশীপ নেই? তাছাড়া আমাদের সরকার সেন্সর আরোপের সঙ্গে ছবি নির্মাণের জন্যে আর্থিক সহায়তাও প্রদান করে থাকে। ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনে সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে সেন্সরের ব্যাপারে আমার খুব বেশি অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় না।১৭

আব্বাসের এ বক্তব্যে সহজেই বোঝা যায়, ইরানের নির্মাতারা কতোটা নিরুপায়। এটাও বোঝা যায়, দিনের পর দিন সেই সেন্সরশিপ চলতে থাকলে, কীভাবে আব্বাস কিয়ারোস্তামির মতো নির্মাতারাও সেটা মানিয়ে চলতে বাধ্য হন। অবশ্য এতোকিছুর পরও সবাই যে সবকিছু মানিয়ে চলেন, তা কিন্তু নয়। জাফর পানাহির কথাই ধরা যাক। তার চলচ্চিত্রে সরাসরি রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতির সমালোচনা থাকায় সরকার ও তার মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিলো শুরু থেকেই। এ কারণে তিনি কয়েকবার গ্রেপ্তার হন। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত জেলেও ছিলেন তিনি। এ সময় অনশন করলে তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু সে বছরই জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিসন্ধি নিয়ে সমাবেশ ও ষড়যন্ত্রে যুক্ত হওয়াসহ বেশকিছু অভিযোগ তুলে তাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেন দেশটির আদালত। এছাড়া ২০ বছরের জন্য চিত্রনাট্য লেখা, চলচ্চিত্র-নির্মাণ, সাক্ষাৎকার দেওয়া কিংবা দেশত্যাগের মতো নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, ইরানে তিনি একপ্রকার গৃহবন্দি অবস্থাতেই জীবন নির্বাহ করেন। এমনকি তার সহকারী মোহাম্মদ রাসুলভকেও একই সাজা দেওয়া হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো এতোকিছুর পরও তাকে থামাতে পারেনি ইরান সরকার। নিষেধাজ্ঞায় থেকেই তিনি ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে ক্লোজড কার্টেন নির্মাণ করেন। যদিও ইরান সরকার এটাকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

অবশ্য জাফরের এ দুরবস্থার পিছনে সরকার পক্ষের চলচ্চিত্রনির্মাতারাও যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। রক্ষণশীল নির্মাতাদের বরাবরই অভিযোগ ছিলো, স্বাধীনধারার নির্মাতারা আন্তর্জাতিক উৎসবে চলচ্চিত্র পাঠিয়ে ইরানের শত্রুদের কাছ থেকে নানাধরনের সুবিধা নিচ্ছে। ফলে তারা সরকারের কাছে স্বাধীনধারার নির্মাতাদের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর আধেয় অন্ধকারাচ্ছন্ন দাবি করে সেগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করার আহ্বানও জানিয়েছিলো। ফলে দিন দিন নির্মাতাদের ওপর যেনো ইরানি সরকারের দমনপীড়ন বেড়েই চলেছে। আর সেই সূত্র ধরেই বি বি সির পক্ষে কাজ করার অভিযোগে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে ইরান সরকার ছয় জন প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতাকে গ্রেপ্তার করে। বি বি সি সেই অভিযোগ অস্বীকার করার পরও তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হয়। এছাড়া একই বছর মারজিয়েহ ভাফামেহের নামে ইরানি এক অভিনেত্রীকে মাই তেহরান ফর সেল চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অপরাধে এক বছরের কারাদণ্ড ও ৯০টি বেত্রাঘাতের আদেশ দেয় দেশটির আদালত। ইরানে শিল্পীদের ওপর যে সরকারি বিধিনিষেধ আছে, সেটাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ওই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিযোগে তাকে এ শাস্তি দেওয়া হয়। চলচ্চিত্রটি অবশ্য ইরানে কখনোই মুক্তি দেওয়া হয়নি।১৮

আগেই বলেছি, ইরানে চলচ্চিত্র নিষিদ্ধকরণের তালিকাটা কিন্তু বেশ দীর্ঘ। জাফর পানাহি, মহসিন মাখমালবাফ, সোহরাব শহীদ সেলসসহ অধিকাংশ নির্মাতার চলচ্চিত্র মনঃপুত না হলেই নিষিদ্ধ করেছে ইরান সরকার। অন্যদিকে ইরানে আবার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক প্রেক্ষাগৃহও নির্মাণ হয়েছে। ইসলামি বিপ্লবোত্তর চলচ্চিত্রকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে চলচ্চিত্র উৎসবসহ বিভিন্ন কৌশলের অংশ হিসেবে এটা ছিলো একটা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। এমনকি ইরানি চলচ্চিত্র উন্নয়নে যা যা করণীয়, সরকার তার সবকিছুর চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একদিকে একের পর এক চলচ্চিত্র নিষিদ্ধকরণ, নির্মাতাদের নির্যাতন, অন্যদিকে চলচ্চিত্রে এমন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কেনো? আসলে এর উদ্দেশ্য হয়তো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানি চলচ্চিত্র তুলে ধরার মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্রের একধরনের জনসংযোগ করা; অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ হাসিলে প্রতিকূল কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করা! এজন্যই হয়তো এতো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাতেও ইরানি নির্মাতাদের মধ্যে তেমন আশা জাগানিয়া ভাব লক্ষ করা যায় না। কারণ তারা জানেন রাষ্ট্রের স্বরূপ কখনোই বদলায় না।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সেন্সর ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা

ক. পাকিস্তানি শাসনামলে বাংলা চলচ্চিত্রে সেন্সর প্রথা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সেন্সর বোর্ড নিয়ে আলোচনার আগে পাকিস্তান শাসনামলের সেন্সর প্রথা সম্পর্কে জানা আবশ্যক। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত-পাকিস্তান নামে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় ঠিকই, কিন্তু চলচ্চিত্রে ঔপনিবেশিক আমলের সেন্সরশিপের পরিবর্তন হয় না! ইংরেজদের তৈরি করা দ্য সিনেমাটোগ্রাফ অ্যাক্ট ১৯১৮ সামান্য সংযোজন-বিয়োজন করে চলচ্চিত্রে সেন্সরশিপ প্রথা চালু করে পাকিস্তান সরকার। সেন্সর বোর্ডের সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয় করাচিতে। এরপর ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান সরকার চলচ্চিত্র তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করে। সেই কমিটি পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সেন্সর প্রথা প্রবর্তনের সুপারিশ করলে ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রণয়ন করা হয় চলচ্চিত্র সেন্সর বিধি। এ নীতিমালার আওতায় রাওয়ালপিন্ডিতে কেন্দ্রীয় বোর্ড এবং লাহোর ও ঢাকায় দুটি আঞ্চলিক বোর্ড গঠন করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা ও লাহোরে স্থানীয় এবং রাওয়ালপিন্ডিতে বিদেশি চলচ্চিত্রের ছাড়পত্র দেওয়া হতো। এক বছর মেয়াদে গঠিত এসব সেন্সর বোর্ডের সদস্য সংখ্যা ছিলো প্রতি বোর্ডে মোট ১১ জন। রাওয়ালপিন্ডিতে অবস্থিত বোর্ডের প্রধান ছিলেন সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সেন্সরস-এর সভাপতি। আর ঢাকা ও লাহোরের প্রধান ছিলেন বোর্ডের সহ-সভাপতি। পাকিস্তান আমলে সেন্সর বোর্ডের কঠোরতা বিভিন্ন মহলে ব্যাপক বির্তক ও অসন্তোষের জন্ম দেয়। একসময় সেই অসন্তোষ এতোটাই তীব্র আকার ধারণ করে, ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম পাকিস্তানে ১২ দিন এবং পূর্ব পাকিস্তানে একদিন সেন্সর বোর্ডের নীতির বিরুদ্ধে ধর্মঘট পালন করে নির্মাতারা। পাকিস্তান আমলে নিষিদ্ধ চলচ্চিত্রের পুরো সংখ্যা জানা সম্ভব না হলেও ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে কেন্দ্রীয় সেন্সর বোর্ড ৩০টি বিদেশি চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।১৯

খ. স্বাধীন দেশে চলচ্চিত্রে সেন্সর প্রথা

স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তান আমলের সেন্সর নীতি ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রপতির আদেশে সংশোধন করে বাংলাদেশ। অবশ্য সেই সংশোধনীটি ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের করা অ্যাক্টেরই অনুরূপ। এরপর ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে এই বিধিকে সেন্সরশিপ অব ফিল্ম অর্ডিন্যান্স-১৯৭৬ নামকরণ করা হয়। ১৯৭৭ ও ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে সেন্সর নীতিমালায় বেশ রদবদল হলেও ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে সরকার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনে পরীক্ষা ও ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য আটটি নির্দেশনা জারি করে। যার নাম দেওয়া হয় দি সেন্সর কোড ১৯৮৫। জারি করা সেই নির্দেশনাগুলো হলোনিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, নৈতিকতাহীনতা বা অশ্লীলতা, বর্বরতা, অপরাধ, নকল ছবি ও বিবিধ।২০ এরপর ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে সরকার ১৯১৮র ব্রিটিশ সিনেমাটোগ্রাফি আইন সংশোধন করে আরেকটি নতুন অধ্যাদেশ জারি করে। এতে বলা হয়, সেন্সর সার্টিফিকেটবিহীন অথবা সেন্সর সার্টিফিকেট বাতিল করা কোনো চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে অথবা ভিসিআরে প্রদর্শন করলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা তিন বছর কারাদণ্ড হতে পারে। এমনকি এই অপরাধে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের লাইসেন্স বাতিলসহ উভয় প্রকার সাজা হতে পারে। চলচ্চিত্র সেন্সরশিপ আইন ও বিধি সংক্রান্ত সর্বশেষ সংশোধন আসে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে। সেন্সরশিপ অব ফিল্মস (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০০৬ নামের এই সংশোধনীটি মূলত চলচ্চিত্র শিল্পের চরম অবনমন, অশ্লীলতা ও অনুমোদনহীন কাটপিস সংযোজন ও প্রদর্শনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য করা হয়।২১

বর্তমানে বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের কার্যকাল এক বছর। এই বোর্ড সরকারি ও বেসরকারি স্তরের বিশিষ্ট ১৫ জন ব্যক্তি নিয়ে গঠিত। সেন্সর বোর্ডের নীতি অনুযায়ী এ বোর্ডের সভাপতি পদাধিকার বলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সচিব। আর সহ-সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের একজন সরকারি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি চলচ্চিত্র সেন্সর আপিল কমিটিও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এই কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প বর্তমানে তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড বর্তমানে স্থানীয়ভাবে নির্মিত এবং বিদেশি কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, তথ্যচিত্র, খণ্ডচিত্র (ট্রেইলর), বিজ্ঞাপনচিত্র, এমনকি পোস্টারেরও সেন্সর করে থাকে। চলচ্চিত্রের ছাড়পত্র বোর্ডে সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতের ভিত্তিতে দেওয়া হয়। আবার তারা মনে করলে, কোনো চলচ্চিত্রের ছাড়পত্র প্রত্যাহারও করে নিতে পারে। তবে মূল বিষয় হলো, বাংলাদেশের সেন্সর বোর্ড পুরোপুরি সরকার নিয়ন্ত্রিত। যখন যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, সে-ই তার নিজের মতো ব্যবহার করেছে। এটা কিন্তু স্রেফ কথার কথা নয়। চোখে আঙুল দিয়ে তার নজিরও তারা দেখিয়েছে, দেখাচ্ছে।

গ. বলো দেখি এ জগতে সাধু বলি কারে

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের শিকার হয় জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০)। ভাষা আন্দোলন ও আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্র নিয়ে নির্মিত এ চলচ্চিত্র শুরু থেকেই হুমকির মুখে পড়ে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রটির শুটিং শুরু হলে তা বন্ধ করে সকাল ১০টায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এসে জহির রায়হান ও অভিনেতা রাজ্জাককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়। বিকেল চারটায় তাদেরকে ছেড়ে দিলেও জহির রায়হানকে বন্ড সই করে প্রতিজ্ঞা করতে হয়, যদি চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়, তাহলে তার সব দায়ভার তাকেই বহন করতে হবে। শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রটি সেন্সর বোর্ডে গেলে ব্রিগেডিয়ার রাও ফরমান আলী ও মেজর মালেক সেটা আটকে দেয়। কিছুদিন পর জহির রায়হান চলচ্চিত্রটি মুক্তি দিতে আবারও সেন্সর বোর্ডে আবেদন করেন। তবে এ পর্যায়ে সাধারণ মানুষের আন্দোলন এবং সেন্সর বোর্ডে থাকা বাঙালি কয়েকজন সদস্যের চাপে চলচ্চিত্রটি মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সরকার। তবে মুক্তির প্রথম দিনই জীবন থেকে নেয়ার প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি ঘটনার পরদিন দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ থেকে এর সব রিল জব্দ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। পরে গুলিস্তানে বিক্ষোভ শুরু হলে পরদিন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সব সদস্যের উপস্থিতিতে আবারও সেন্সর বোর্ড বসানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী আটকাতে পারেনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী।২২

পাকিস্তানি শাসকদের হাত থেকে নিস্তার পেলেও এই শিল্পমাধ্যমটি কিন্তু আজও স্বস্তিতে নেই। কারণ দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত দেশের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আগামী (১৯৮৪) আটকে দেয় সেন্সর বোর্ড। মোরশেদুল ইসলামের ভাষায়, ‘‘ছবিটি দেখার পর সেন্সর বোর্ড সদস্যরা আপত্তি তুললেন। অনেকে বললেন, ছবিটির বক্তব্য আপত্তিকর, কারণ এখন আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। এই মুহূর্তে কে রাজাকার আর কে মুক্তিযোদ্ধা সেই প্রশ্ন না তোলাই ভালো।’’২৩ পরে সেন্সর বোর্ড কর্তৃক চলচ্চিত্রটি থেকে অশ্লীল গ্রাম্য গালি ও কিছু অন্তরঙ্গ দৃশ্য বাদ দিতে বলা হলেও নির্মাতা তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। একপর্যায়ে সারাদেশে সেন্সর বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকলে, তারা চলচ্চিত্রটি মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। শুধু তা-ই নয়, ওই একই বছর শামসুল হক সিরাজীর নেমকহারাম-এ (১৯৮৪) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ থাকায় দৃশ্যটি অশোভন আপত্তিকর আখ্যা দিয়ে কেটে ফেলতে বলে তৎকালীন সেন্সর বোর্ড। সেন্সর বোর্ডের যুক্তি ছিলো আন্তর্জাতিক সুসম্পর্কের খাতিরে চলচ্চিত্রে এটা উল্লেখ না করাই শ্রেয়!

এর কয়েক বছর পর তানভীর মোকাম্মেলের স্মৃতি ৭১ (১৯৯১) ও নদীর নাম মধুমতি (১৯৯৫) আটকে দেয় সেন্সর বোর্ড। অভিযোগ ওঠে, স্মৃতি ৭১ স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনাবলির ভুল চিত্রায়ণের প্রচেষ্টা। আর নদীর নাম মধুমতিতেও একই অভিযোগসহ বেশকিছু নৌকার উপস্থিতি থাকায় সেটা আটকে দেওয়া হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, এটা নাকি আওয়ামী আদর্শে বিশ্বাসী নির্মাতার চলচ্চিত্র। তা না হলে চলচ্চিত্রে এতো নৌকার উপস্থিতি কেনো!২৪ একই দশকে নির্মিত হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র আগুনের পরশমণি (১৯৯৪) নিয়েও প্রশ্ন তোলে বাংলাদেশের সেন্সর বোর্ড। হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়,

সেন্সর বোর্ডের সদস্যরা ছবি দেখলেন। তাদের অনেকের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। তারা আমাকে বোর্ড রুমে ডেকে পাঠালেন। বোর্ডের সভাপতি বললেন, ছবি ঠিক আছে তবে কয়েকটি ব্যাপারে কিছু পরিবর্তন করতে হবে। প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পরেই ছাড়পত্র পাওয়া যাবে। শেখ মজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠ বাদ দিতে হবে, নগ্ন করে দুটি মানুষকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে সেটা বাদ দিতে হবে, পাকিস্তানি মিলিটারি কথাটা বাদ দিতে হবে। আমরা সার্কভুক্ত দেশ, আমরা এমন কিছু করতে পারি না যা সার্কের চেতনা ক্ষুণ্ন করে।২৫

এটা তো গেলো ৮০ ও ৯০ দশকের কথা। শূন্য দশকেও এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। তারেক মাসুদ নির্মিত মাটির ময়না (২০০২) প্রথম দিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সেন্সর বোর্ড। এ চলচ্চিত্রে তিনি ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস, উগ্রতা, গোঁড়ামি আর সাম্প্রদায়িকতার সমালোচনা করলেও সেন্সর বোর্ড নিষিদ্ধ করার কারণ হিসেবে যুক্তি দিয়েছিলো, চলচ্চিত্রটি নাকি প্রদর্শনের জন্য একটু বেশি স্পর্শকাতর। পরে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ মামলা করলে চলচ্চিত্রটি মুক্তির আলো দেখে।

তবে শূন্য দশকের শুরুতে চলচ্চিত্রশিল্প অশ্লীলতা আর দুর্নীতির কবলে পড়ে সেন্সরশিপ অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এ সময় চলচ্চিত্রে অশ্লীল দৃশ্য, নৃত্য, গল্প, সংলাপ সবকিছুই যেনো অনাপত্তিকর ছিলো! ফলে কিছু অসাধু নির্মাতা ও সেন্সর বোর্ডের সদস্যরা এটাকে নিজের ইচ্ছা মতো ব্যবহার করে ছাড়পত্র দিতে থাকে। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে আইন করে এসব চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ করে। এমনকি অশ্লীলতার অভিযোগে কিছু নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীকেও বিভিন্ন মেয়াদে নিষিদ্ধ করা হয়। সেসময় চলচ্চিত্রে দর্শকের আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও চলচ্চিত্রে সেন্সরশিপ প্রথা কিন্তু মোটেও পরিবর্তন হয়নি, কেবল ধরন বদলেছে।

২০১৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, নাটকে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে! পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশনা জারি করা হয়, কোনো নেতিবাচক বা হাস্যরসাত্মক চরিত্রে পুলিশকে উপস্থাপন করা যাবে না। এমনকি পুলিশের কোনো চরিত্র থাকলে, সেটা আগে থেকেই চিত্রনাট্য দেখিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।২৬ ২০১১ খ্রিস্টাব্দে গাজী মাজহারুল আনোয়ার তার হৃদয় ভাঙা ঢেউ-এ খলনায়কের পোশাক হিসেবে মুজিব কোট ব্যবহার করায় তা নিষিদ্ধ করে সেন্সর বোর্ড। সেন্সর বোর্ডের সহ-সভাপতি এস কুমার সরকার এর কারণ হিসেবে জানান, নীতিমালা লঙ্ঘন করায় হৃদয় ভাঙা ঢেউ-এর ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে চলচ্চিত্রটির বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক দর্শনের বিরোধী বলেও জানান তিনি।২৭

আবার সম্প্রতি নজরুল ইসলাম খান নির্মিত রানা প্লাজা (২০১৫) ভয়ঙ্করহিংসাত্মক দৃশ্যের জন্য আটকে দেয় সেন্সর বোর্ড। পরে নির্মাতা আদালতে আপিল করলে ১৮ বার নিরীক্ষা করে সেই দৃশ্যগুলো কেটে ফেলে ছাড়পত্র দেয় তারা। কিন্তু এর পরও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের এক নেতার করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন ও সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে উচ্চ আদালত। পরে সেই রায় সুপ্রিম কোর্টে স্থগিত হয়। খুলে যায় মুক্তির বাধাও। সেসময় চলচ্চিত্রটি নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও নাকি আপত্তি আসে সেন্সর বোর্ডের কাছে।২৮ তবে সমস্ত বাধা পেরিয়ে চলচ্চিত্রটি যখন মুক্তির প্রহর গুণছে, ঠিক তখন মুক্তির আগের দিন চলচ্চিত্রটি আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করে সরকার। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর আপিল কমিটির তথ্য বিবরণীতে বলা হয়

জনসমক্ষে প্রদর্শনের উপযোগী নয় বলে বিবেচিত হওয়ায় চলচ্চিত্র সেন্সরশিপ আইন, ১৯৬৩ অনুযায়ী বাংলাদেশে চলচ্চিত্রটি সেন্সর সনদবিহীন ঘোষণা করা হয়েছে। ... চলচ্চিত্রটি কোথাও প্রদর্শিত হলে ছবি বাজেয়াপ্তসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।২৯

এখন প্রশ্ন হলো কী ছিলো রানা প্লাজায়, যার জন্যে সরাসরি রাষ্ট্রের নাক গলানোর প্রয়োজন পড়লো? চলচ্চিত্রটি ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার সাভারে আট তলা পোশাক কারখানা রানা প্লাজা ধসে পড়ার ঘটনা নিয়ে নির্মিত। সেই দুর্ঘটনায় এক হাজার একশো ৩৫ জন নিহত ও কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়। ঘটনার ১৭ দিনের মাথায় রেশমা আক্তার নামে এক কর্মীকে উদ্ধার করা হয়। চলচ্চিত্রে মূলত এই রেশমাকে উদ্ধার ও রানা প্লাজা ধসে নিহতদের স্বজনদের আহাজারি উঠে এসেছে। এখন দেখা দরকার, রাষ্ট্র যে ভয়ঙ্করহিংসাত্মক দৃশ্যের কথা বলে চলচ্চিত্রটি আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করেছে তার বিপরীতে নির্মাতার বক্তব্য কী। নির্মাতা নজরুল ইসলাম খান বলেন

সিনেমাটিতে আমি প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। আমি সেন্সর নীতিমালা সম্পর্কে ভালভাবেই জানি। আমি সিনেমাটিতে এমন কোনো দৃশ্যই রাখিনি, যা ভীতিকর। গার্মেন্টস ধসের ঘটনাকে আমি সাধারণভাবে দেখাতে চেয়েছি। আর এখানে পুলিশের নামটিও আমি সতর্কতার সঙ্গে উপস্থাপন করছি।৩০

এখানে কিছু বিষয়ে সন্দেহ উদ্রেক করে। আমরা আগেই দেখেছি যে, সেন্সর বোর্ড বলেছে, তারা ১৮ বার দেখে সব ভয়ঙ্করহিংসাত্মক দৃশ্য কেটে ছাড়পত্র দিয়েছে। নির্মাতাও বলছেন, তিনি এমন কোনো দৃশ্যই রাখেননি, যার কারণে সরকার এটাকে নিষিদ্ধ করতে পারে। তার মানে যদি তেমন কোনো দৃশ্য থেকেও থাকে সেটা সেন্সর বোর্ড কেটে দিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, সরকার চলচ্চিত্রটি আজীবন নিষিদ্ধ করার মতো ভয়ঙ্করহিংসাত্মক দৃশ্য কোথায় পেলো? নির্মাতার একটি কথায় অবশ্য সেই ধন্ধটা খানিকটা কেটে যায়, সিনেমাটিতে আমি প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে চেয়েছিলাম! মনে রাখা দরকার, চলচ্চিত্রটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে মামলা করেছেন সরকার দলীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা। যিনি আবার বাংলাদেশ ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি। ফলে সেন্সর বোর্ড হাজার বার কাটাকুটি করলেও সেই নেতা যদি অসন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে তার দল যে সন্তুষ্ট হবে না, সেটা জানা কথা!

আবার হবে তো দেখা ...

বিংশ শতাব্দী হোক কিংবা একবিংশ, জাতি সভ্য কিংবা অসভ্য, সেন্সর বোর্ডের কাজ কিন্তু সেই একই। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারে বাধা, নৌকার দৃশ্য কর্তনে চাপ সৃষ্টি, সার্কের প্রতি আলগা দরদে আগুনের পরশমণির দৃশ্যে আপত্তি, অদৃশ্য কারণ ছাড়া ছাড়পত্র দিয়েও রানা প্লাজাকে নিষিদ্ধকরণ; কসমিক সেক্সকে ছাড়পত্র না দিয়ে বিকল্প পন্থা হিসেবে অনলাইনে মুক্তি দিতে বাধ্য করা৩১ কিংবা হলিউডে গোপনে সেন্সর করে উদারতার কথা বলে গ্রেডেশন পদ্ধতিতে ছাড়পত্র দেওয়াতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। কারণ পৃথিবীর নানা মানুষ, প্রথা, সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও রাষ্ট্রের চরিত্র কিন্তু সেই একই! হাজারটা নিয়ম করে শেষ পর্যন্ত যখন নিয়মে কাজ হয় না, তখন সে তার ভয়ঙ্কর রূপটি-ই দেখায়।

লেখক : ইব্রাহীম খলিল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি অনলাইন সংবাদপত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।

[email protected]

তথ্যসূত্র

১. http://bangla.bdnews24.com/glity/article1008498.bdnews; retrieved on 09.09.2015

২. http://bangla.bdnews24.com/glity/article1008498.bdnews; retrieved on 09.09.2015

৩. কাদের, মির্জা তারেকুল (১৯৯৩ : ৪৮৩); বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প; বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

৪. প্রাগুক্ত; কাদের (১৯৯৩ : ৪৮৩)।

৫. প্রাগুক্ত; কাদের (১৯৯৩ : ৪৮৪)।

৬. http://ncac.org/resource/a-brief-history-of-film-censorship; retrieved on 16.08.2016

. http://filmmakeriq.com/lessons/the-history-of-hollywood-censorship-and-the-ratings-system/; retrieved on 16.08.2016

. http://ncac.org/resource/a-brief-history-of-film-censorship; retrieved on 16.08.2016

. http:/ww/w.iosrjournals.org/iosr-jbm/papers/Vol17-issue6/Version-1/F017613848.pdf; retrieved on 05.10.2016

১০. প্রাগুক্ত; কাদের (১৯৯৩ : ৪৮৫)।

১১. http:/ww/w.iosrjournals.org/iosr-jbm/papers/Vol17-issue6/Version-1/F017613848.pdf; retrieved on 05.10.2016

12. http://cbfcindia.gov.in/html/uniquepage.aspx?unique_page_id=20; retrieved on 05.10.2016

13. http://banglahub.net/indian-movies-that-got-banned-by-the-censor-board/; retrieved on 05.10.16

14. https://goo.gl/87vdBF; retrieved on 05.10.16

1 ৫. মিঠু, মাজিদ; আহমেদিনেজাদের কাল ও ইরানি চলচ্চিত্রের উদ্ভট সময়; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হয়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ষ ৫, সংখ্যা ১০, জুলাই ২০১৬, পৃ. ১০৮।

১৬. প্রাগুক্ত; মিঠু (২০১৬ : ১০৮)।

১৭. ww w.goo.gl/6Z5xJb; retrieved on 11.10.2016

১৮. পারভেজ, রুবেল; দেশে দেশে ইলমাজ গুনে; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হয়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, বর্ষ ১, সংখ্যা ২, জানুয়ারি ২০১২, পৃ. ১০২।

১৯. প্রাগুক্ত; কাদের (১৯৯৩ : ৪৮৬)।

২০. প্রাগুক্ত; কাদের (১৯৯৩ : ৪৮৭)।

২১. নাসরীন, গীতি আরা ও ফাহমিদুল হক (২০০৮ : ৯২); স্লো মোশন : সরকার সেন্সরবোর্ড ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র; বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প : সংকটে জনসংস্কৃতি; শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা।

২২. http:/ww/w.somewhereinblog.net/blog/tirthokahsan/29604750; retrieved on 11.10.2016

২৩. আমিনুল ইসলাম, আহমেদ (২০১৪ : ২১১); বাংলাদেশের চলচ্চিত্র চলচ্চিত্রে বাংলাদেশ; ভাষাচিত্র, ঢাকা।

২৪. প্রাগুক্ত; আমিনুল ইসলাম (২০১৪ : ২১০)।

২৫. হুমায়ূন আহমেদ, উদ্বৃত; আমিনুল ইসলাম, আহমেদ (২০১৪ : ২১১-২১২); বাংলাদেশের চলচ্চিত্র চলচ্চিত্রে বাংলাদেশ; ভাষাচিত্র, ঢাকা।

26. https://goo.gl/TgwXKE; retrieved on 22.10.2016

27. https://goo.gl/yEbpgX ; retrieved on 22.10.2016

28. http://bangla.bdnews24.com/glity/article1015928.bdnews; retrieved on 24.08.2015

29. http://bangla.samakal.net/2016/01/05/184359; retrieved on 22.10.2016

30. http://bangla.bdnews24.com/glity/article1015928.bdnews; retrieved on 24.08.2015

31. http://eisamay.indiatimes.com/entertainment/cinema/cosmic-sense/articleshow/25489448.cms#write; retrieved on 24.08.2014

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন