হালিমা খুশি
প্রকাশিত ৩১ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
কাদম্বরী’র সত্য-মিথ্যা এবং সুমন ঘোষের দায়
হালিমা খুশি

উত্তরে পদ্মা আর দক্ষিণে গড়াই নদী ঘেরা শিলাইদহ কুঠিবাড়ি। প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভরপুর গ্রামটিতে বাবার সঙ্গে প্রথম আসেন বালক রবীন্দ্রনাথ, তখন তার বয়স ১০ বছর। সময়টা ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ। তার পর দীর্ঘ বিরতি শেষে আবার কুঠিবাড়ি; এবার জমিদারি (১৮৯১—১৯০১) তদারক করতে। এই বিরতি একদিকে যেমন তার কবি মানস গঠন করেছে, অন্যদিকে এই ১০ বছর সেই মানসকে করেছে পুষ্ট। স্বগতোক্তিতেই তার প্রমাণ মেলে—‘আমার যৌবন ও প্রৌঢ় বয়সের সাহিত্যরস-সাধনার তীর্থস্থান ছিলো পদ্মা-প্রবাহচুম্বিত শিলাইদহ পল্লীতে।’১ গীতাঞ্জলি’র অনুবাদও করেছিলেন এখানে বসেই, ১৯১২-তে।
কুঠিবাড়িতে আমি গিয়েছি ২০১৫-তে। এতো বছর পরে গিয়েও কেনো জানি না আমি তার অরূপের মাঝে তাকে স্বরূপে দেখছিলাম। ভিতরে কেমন অদ্ভুত একটা গৌরবের আনন্দ স্রোত অনুভব করছিলাম! তার চেয়ার, সোফা, খাটে তার পরশ যেনো আমি স্পর্শ করছিলাম। কিন্তু হঠাৎ আমার মনোযোগ ভিন্ন স্রোতে বইলো। সেখানে ইন্দিরা দেবী, মহাত্মা গান্ধীসহ অনেকে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একই ফ্রেমে বাঁধা, আর কাদম্বরী দেবী রয়েছেন ছবিতে একলা দাঁড়িয়ে। কেনো জানি আমার চোখটা আটকে গেলো কাদম্বরী দেবীর ছবির ওপর। তার পাশে, পিছে কেউ নেই; হয়তো নেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গেও তার কোনো ছবি। দেয়ালে সাঁটানো ওই ছবিটি কীভাবে যেনো আমাকে জানান দিলো কাদম্বরীর জীবনের কথা; বললো তার সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ একাকিত্বের কথা। তখনই ভেবেছিলাম কাদম্বরীকে নিয়ে। এর কয়েক মাস পর হাতে এলো সেলুলয়েডের কাদম্বরী। একে পেয়ে নতুন করে শুরু হলো আমার কাদম্বরী সন্ধান। এই আলোচনা তারই ফল কুঠিবাড়ির ছবির একাকী দেবী, সঙ্গে সুমন ঘোষের কাদম্বরী।
২.
‘১২৭৫ বঙ্গাব্দের তেইশে আষাঢ়; রবিবার, আমার বিয়ের দিন। পুকুরপাড়ের ছোট্ট চৌহদ্দি থেকে হঠাৎ করে সাত সমুদ্দুরের ঢেউয়ের মাঝে এসে পড়লে যেমনটা হয়, ঠাকুরবাড়ির বউ হয়ে আসার পর প্রথম প্রথম আমার অনেকটা তেমনই দশা হয়েছিলো।’ এমনি করেই কাদম্বরীতে শ্বশুরালয়ে আগমনের বর্ণনা শোনা যায় কাদম্বরীর নেপথ্য কণ্ঠে। ঠাকুরবাড়িতে কাদম্বরী পা রাখেন নয় বছর বয়সে। বয়সের মাপকাঠিতে অল্প হলেও বুঝতে পারতেন, এ বাড়ির তীরে ভেড়া বোধ হয় হবে না তার! কথায় তারই রেশ পাওয়া যায়—‘বেশ বুঝতে পারতাম আমি ঠাকুরবাড়ির ঘরের বউ হয়ে উঠতে পারবো না কোনোদিন। আমি ঘরের হয়েও শেষমেষ সেই বাইরেরই।’ পুরো চলচ্চিত্রে কাদম্বরীর এই দুঃখবোধ বিকশিত হয়। Pure and complete sorrwo is as impossible as pure and complete joy২— টলস্টয়ের এই উপলব্ধির সফল রূপায়ণ যেনো কাদম্বরী দেবী। তাই ওই সমুদ্দুরের মধ্যে এক পশলা অবলম্বন পেয়ে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘অনেক মন খারাপের মাঝে ঠাকুরপো ছিলেন এক ঝলক টাটকা বাতাসের মতো।’ কিন্তু মানুষ হিসেবে কাদম্বরী কোনো অংশে কম যোগ্য ছিলেন না ঠাকুরবাড়ির। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো একটু বেশিই ছিলেন। যদিও কাদম্বরীতে উপস্থিত কাদম্বরীকে এমন চরিত্র নিয়ে হাজির হতে দেখা যায় না। সেখানে তাকে বাড়ির অন্য বউদের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে গান, সাহিত্যচর্চা, স্বসৃষ্ট নন্দনকাননে সাহিত্যসভা নিয়ে আগ্রহী হতেই বেশি দেখা যায়!
বাস্তবিকই সাহিত্যচর্চার আসরে সাহিত্যানুরাগী হিসেবে কাদম্বরী সমাদৃত ছিলেন। ‘বাংলা বই তিনি যে পড়িতেন কেবল সময় কাটাইবার জন্য, তাহা নহে— তাহা যথার্থই তিনি সমস্ত মন দিয়া উপভোগ করিতেন।’৩ তার মানে গৃহের সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে তিনি যে কেবল সাহিত্য আবিষ্ট হয়ে থাকতেন এমনটিও নয়। গবেষক চিত্রা দেবের কথাতেও তার প্রমাণ মেলে—‘... মেয়েলি কাজে কাদম্বরীর সুতীব্র আগ্রহ ছিল। সুপুরি কাটতেন নিয়মিত। প্রতিদিনের তরকারি কাটার আসরে তিনি যেমন উপস্থিত থাকতেন তেমনি দেখাশোনা করতেন বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের। কারুর জ্বর হলে আর রক্ষে নেই, কাদম্বরী গিয়ে বসতেন তার শিয়রে।’৪ কিন্তু তবুও জা মহলে তিনি ছিলেন তিরস্কারের পাত্র। কেননা একদিকে তার বাবা ছিলেন ঠাকুরবাড়ির ফায়ফরমাশ খাটা বাজার সরকার, অন্যদিকে তার নিজের সন্তানহীনতা। স্বামী জ্যোতির কাছ থেকেও খুব একটা আগ্রহ পেয়েছেন বলে মনে হয় না। অথচ তিনি ছিলেন ভারতী-গোষ্ঠীর মক্ষিরানি। আসলে ‘ফুলের তোড়ার ফুলগুলিই সবাই দেখিতে পায়, যে-বাঁধনে তাহা বাঁধা থাকে, তাহার অস্তিত্বও কেহ জানিতে পারে না। মহর্ষি-পরিবারের গৃহলক্ষ্মী শ্রীযুক্ত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্নী ছিলেন এই বাঁধন।’৫ ‘‘ভারতী’’তে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে শরৎকুমারী চৌধুরানী এভাবেই কাদম্বরীকে মূল্যায়ন করেছেন।
কিন্তু নিজের মূল্যায়নে হয়তো কাদম্বরী ছিলেন একাকী পথের যাত্রী। সে কারণে তিনি যখন চারপাশ থেকে একাকিত্বের সঙ্গীগুলোকে দূরে সরে যেতে দেখেছেন, তখন নিজেকে হয়তো মনে হয়েছে কষ্টের পাহাড়ের পাদবিন্দুতে দাঁড়ানো ক্ষুদ্র কীট; উপলব্ধি করেছেন জীবনের আনন্দ আলোকে, বাতাসের মাঝখানে থাকা আলোর মতো নিবুনিবু করতে করতে। একসময় ঝুপ করে অন্ধকার নেমেছে মনের চারিদিকে। হয়তো মনে হয়েছে জীবনাবসান বুঝি অনেক কিছুর অবসান। বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক কষ্টের অনুভূতি। শূন্যতা নাকি প্রকৃতি বরদাস্ত করে না মোটেও! কিন্তু আসলেই কি প্রকৃতি সব শূন্যতা পূরণ করে? সবার একাকিত্ব ঘোচে? প্রত্যেক মানুষই নিজের ভিতরে একটা প্রকৃতিকে ধারণ করে। প্রত্যেকে থাকে একা। কিন্তু এই সত্য বোধটাই তাকে হয়তো দহন করতে থাকে। জীবনটা থমকে দাঁড়ায়। প্রশ্ন ওঠে, যার মৃত্যু একটা পত্রিকার (‘‘ভারতী’’ পত্রিকার সাংগঠনিক দিকটা কাদম্বরী দেবী দেখাশোনা করতেন) মৃত্যুর আশঙ্কা বয়ে আনতে পারে, নিজের মূল্যায়নে তিনি এতোটাই অসহায়-অবলম্বনহীন? সাহিত্যরস তার জীবনে উদ্দীপনা জাগাতে পারেনি এতোটুকুও? সাহিত্যাশ্রয়ের ঊর্ধ্বে তিনি কি কেবলই মানবিক আশ্রয় খুঁজেছেন? হয়তো হ্যাঁ, হয়তো না। কিন্তু এই পরিণতি কি প্রচলিত নারী কাঠামোরই সাহিত্য সমাদরের চাদরে মোড়ানো ফল? কিন্তু তাহলে, কী করেইবা সাহিত্যাঙ্গনে এতো সমাদৃত হন তিনি?
৩.
ঠাকুরবাড়িতে সম্পর্কের নানামাত্রিক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে কাদম্বরীর কেন্দ্রীয় চরিত্র কাদম্বরীর জীবনের আখ্যান। প্রথানুসারে বাল্যবয়সেই ছাদনাতলায় বসতে হয় কাদম্বরীকে। ভাসুর সত্যেন ঠাকুর কাদম্বরীকে জ্যোতির অনুপযুক্ত মনে করলেও ভাসুরকে ভুল প্রমাণ করতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি তার। তাছাড়া ওই বয়সের সুবাদে বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন দু’বছরের ছোটো দেবর রবীন্দ্রনাথকে। কাদম্বরীর স্বগতোক্তিতেই তাই শোনা যায়, ‘‘ওই বিশাল বাড়িতে মন খুলে দুটো কথা বলার জন্য হাঁসফাঁস করতো যে নতুন বউঠান, সে অবশেষে একজন বন্ধু পেলো, রবী।’ প্রশান্তকুমার পালের ‘রবিজীবনী’তেও এর প্রমাণ মেলে”... বাড়িতে আমি ছিলুম একমাত্র দেওর, বউদিদির আমসত্ত পাহারা, তা ছাড়া আরও পাঁচরকম খুচরো কাজের সাথি। পড়ে শোনাতুম বঙ্গাধিপ পরাজয়।’৬
কাদম্বরীতেও দুজনে যেনো মিশে গিয়েছিলেন অন্য এক জগতের আলো হাওয়ায়। সে জগতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কাদম্বরীর দুঃখ-সুখের আশ্রয়, আর কাদম্বরী ছিলেন রবীর ‘হেকেটি’। সুমন ঘোষ হয়তো রবীন্দ্র জীবনের প্রত্যেকটি ভাঁজে কাদম্বরীর অবাধ, সাহসিক বিচরণকে তুলে ধরতে এই গ্রিক পুরানের ত্রিমুণ্ড দেবীর সঙ্গে কাদম্বরীকে তুলনা করেছেন। এ নিয়ে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ভাষ্য ছিলো এমন— কাদম্বরী দেবীর নারীহৃদয় ত্রিবেণীসংগম ক্ষেত্র ছিলো। কবি বিহারীলালকে শ্রদ্ধা, স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রকে প্রীতি ও দেবর রবীন্দ্রনাথকে স্নেহদ্বারা তিনি আপন করিয়া রাখিয়াছিলেন। সেইজন্য অন্তরঙ্গ আত্মীয়রা বলিতেন ত্রিমুণ্ডী ‘‘হেকেটি’।”৭ তবে একেবারে ভিন্ন কথা বলেন প্রশান্তকুমার পাল। কারণ ‘‘হেকেটি ঠাকরুন’’ নামটি রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘‘নূতন ঊষা’’ কবিতার পাণ্ডুলিপিতে, তখন পর্যন্ত বিহারীলালের সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিলেন পরিচয়হীন। হেকেটির ব্যাখ্যাতে তিনি বলেন, ‘‘... ম্যাকবেথ নাটকের ডাইনী-প্রধানা হেকেটির সূত্রেই কাদম্বরী দেবীর উক্ত নামকরণ এবং সম্ভবত দেবর-বউদির ঠাট্টার সম্পর্ক থেকেই তিনি উক্ত অভিধা লাভ করেছিলেন।’৮
কিন্তু সুমন ঘোষের নির্মাণে রবীন্দ্রনাথ-কাদম্বরীর উপস্থাপন প্রচলিত চটকদার গল্পের বাইরে কেবল ঠাট্টা সম্পর্কের মধ্যে সীমানা পেয়েছে কি? সেখানে চন্দননগরের মোরান সাহেবের বাগান বাড়িতে বৃষ্টির রাতের উপস্থাপন কিংবা মাঝ পদ্মায় কাদম্বরী দেবীর চাহনি; কিংবা কাদম্বরীর লেখা চিঠি কাদম্বরীকেই ফেরত দেওয়ার দৃশ্য— এসব তো ভিন্ন প্রশ্ন জাগায়।
আবার রবীর লেখার প্রথম পাঠক ও সমালোচক হিসেবে কাদম্বরী একদিকে যেমন তার লেখার গতিপ্রকৃতি নির্ধারক, তেমন অন্যদিকে ছিলেন আশ্রয় ও অনুপ্রেরণা। সে কারণে ঠুনকো অজুহাতে বিলেত যাত্রা পণ্ড হওয়াতে উচ্ছ্বসিত হয়েছে রবী হৃদয়। সুমন ঘোষের রবী উপস্থাপন ভিন্নতা পায় ‘‘রবিজীবনী’’তেও... সে (সত্যপ্রসাদ) নব-বিবাহিত ফিরিতে ব্যাকুল। ভান করিল অসুখ-রক্ত আমাশয়। সব কথাই বিশ্বাস করিয়াছিলাম। মাদ্রাজে গিয়াই বলিল ‘চল ফেরো।’ তাহার সঙ্গেই ফিরিলাম। জাহাজের পার্সা বাধা দিলেন। সত্যর এই আচরণে বিরক্ত হইয়াছিলাম কিন্তু কিছু বলি নাই। আরও ফিরিলাম রাগে ...।”৯ প্রশ্ন হতেই পারে কেনো পরিচালক এই ভিন্নতার আশ্রয় গ্রহণ করলেন? হতে পারে বৃষ্টির রাতের উপস্থাপন কিংবা মাঝপদ্মার দৃশ্যের একটা ভিত্তি নির্মাণের উদ্দেশ্যে। তাহলে পরিচালকের এতে লাভটা কোথায়? এর উত্তরটা না হয় দর্শক-পাঠকই খুঁজে নেবেন।
৪.
মাদ্রাজ থেকে বাড়ি না ফিরে রবীন্দ্রনাথ সোজা যোগ দেন চন্দননগরের বাগান বাড়িতে। কাদম্বরীও যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন! গান, গল্পে কী সুন্দর সময় কাটে তাদের! রবীন্দ্রনাথের বচনেও প্রকাশ পায় তেমনই উচ্ছ্বাস—... কত বেড়িয়েছি নতুনবউঠান আর আমি বন জঙ্গলে, কত কুল পেড়ে খেয়েছি। বিদ্যাপতির অনেকগুলি গানে সুর দিই আমি সে সময়। ‘এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর’—এ গানে এখানেই সুর দিই। সুর দিয়েই নতুনবউঠানকে শোনাতুম।’১০ কিংবা ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’’তে—
আমার পাঠকদিগের মধ্যে একজন লোককে বিশেষ করিয়া আমার এই ভাবগুলি উৎসর্গ করিতেছি।—এ ভাবগুলির সহিত তোমাকে আরও কিছু দিলাম, সে তুমিই দেখিতে পাইবে! সেই গঙ্গার ধার মনে পড়ে? সেই নিস্তব্ধ নিশীথ? সেই জ্যোৎস্নালোক? সেই দুই জনে মিলিয়া কল্পনার রাজ্যে বিচরণ? সেই মৃদু গম্ভীর স্বরে গভীর আলোচনা? ... এক দিন সেই ঘনঘোর বর্ষার মেঘ, শ্রাবণের বর্ষণ, বিদ্যাপতির গান? তাহারা সব চলিয়া গিয়াছে! কিন্তু আমার এই ভাবগুলির মধ্যে তাহাদের ইতিহাস লেখা রহিল। ... আমার এই লেখার মধ্যে লেখা রহিল—এক লেখা তুমি আমি পড়িব, আর এক লেখা আর সকলে পড়িবে।১১
রবীন্দ্রনাথকে যিনি মাতৃস্নেহে আগলে রেখেছেন, কবি সত্তা নির্মাণে যিনি ছিলেন অগ্রগামী, তার উদ্দেশ্যে এই উৎসর্গবাণীকে আড়চোখে মূল্যায়ন কতোটা যৌক্তিক তা প্রশ্ন জাগায়। তথাপি সমাজের এতে চক্ষুশূল! কিন্তু সদ্য মাতৃহারা বালকের ভার যখন এই বালিকা বধূ কাদম্বরী নিজের কাঁধে তুলে নেন, সমাজ তখন দুপাটি দাঁতের শোভা দেখিয়ে স্তুতি বন্দনায় ভোলাতে ভোলে না। সময়ের ব্যবধানে সেই একই সমাজ একই মানুষকে-সম্পর্ককে ধিক্কারে, অপমানে জর্জরিত করতেও ছাড়ে না। সেখানে সম্বন্ধের থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শরীরী পরিবর্তন। কিন্তু শরীর দিয়ে কি সব সম্পর্কের বিচার করা যায়, নাকি সেটা উচিত?
কিন্তু জা মহলে কাদম্বরী-রবীর সম্পর্ক চর্চা কিংবা দেবেন্দ্রনাথের—‘নানান কথাবার্তা কানে আসছে তো! তোমার বোধ হয় এসবের থেকে দূরে থাকাই ভালো’—রবীর প্রতি এই আদেশ বাক্য কীসের ইঙ্গিত তা বুঝতে বাকি থাকে না। অথচ যখন রবীর জীবনে এই মানুষগুলোর প্রয়োজন ছিলো, তখন কি তারা ছিলেন? কিংবা দেবেন্দ্রনাথও কি একেবারে বাদ পড়েন সে দায় থেকে? সেই জীবনের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘‘বাড়িতে যিনি কনিষ্ঠা বধূ ছিলেন তিনিই মাতৃহীন বালকদের ভার লইলেন। তিনিই আমাদিগকে খাওয়াইয়া পরাইয়া সর্বদা কাছে টানিয়া, আমাদের যে কোনো অভাব ঘটিয়াছে তাহা ভুলাইয়া রাখিবার জন্য দিনরাত্রি চেষ্টা করিলেন।’’১২ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্মৃতি হয়তো ধুলোমলিন হয়ে যায়; আর সজীব থাকলেইবা কী? পৈতা ফেলে দেবেন্দ্রনাথ সংস্কারের বিরোধিতা করলেও কোথাও কোথাও আটকে রাখেন নিজেকে সংস্কারের জালে। সেটাও হয়তো সময়েরই প্রয়োজনে! তাই পুত্র রবীন্দ্রনাথকে নতুন দিশার সন্ধানে বিদেশে ব্যারিস্টারি পড়তে যাওয়ার আদেশ তার। তবে শ্রদ্ধাস্বরূপ অপারগতা প্রকাশ করতে না পারলেও রবী এলেবেলে অজুহাতে ফিরে আসে তার নতুন বউঠানের কাছে। কিন্তু কাদম্বরীর চিরচেনা সেই রবী বিয়ে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য, অপরিচিত এক পুরুষ চরিত্র নিয়ে হাজির হন। লেখেন ‘‘হেথা হতে যাও পুরাতন, হেথায় নূতন খেলা আরম্ভ হয়েছে’’; ফেরত দিয়ে যান তাকে লেখা কাদম্বরীর সমস্ত চিঠি। অথচ ত্রিপুরার রাজকবি হওয়ার কথা বলায় এই রবীই একদিন কাদম্বরীকে অভিমানের সুরে বলেছিলেন, ‘‘তোমাকে ছেড়ে আমি কোত্থাও যাবো না।’’ অবশ্য কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে ‘‘পুরাতন’’ শিরোনামের কবিতাতেও কবির একই ভাবাবেগ প্রকাশ পায়। কিন্তু আদৌ তাদের মধ্যে এমন লুকোচুরি করা চিঠি চালাচালি ছিলো কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে!
আবার ‘মৃত্যুশোক’’-এ এই রবীন্দ্রনাথই লেখেন,
চারি দিকে গাছপালা মাটিজল চন্দ্রসূর্য গ্রহতারা তেমনি নিশ্চিত সত্যেরই মতো বিরাজ করিতেছে, অথচ তাহাদেরই মাঝখানে তাহাদেরই মতো যাহা নিশ্চিত সত্য ছিল, এমনকি, দেহ প্রাণ হৃদয় মনের সহস্রবিধ স্পর্শের দ্বারা যাহাকে তাহাদের সকলের চেয়েই বেশি সত্য করিয়াই অনুভব করিতাম সেই নিকটের মানুষ যখন এত সহজে এক নিমিষে স্বপ্নের মতো মিলাইয়া গেল তখন সমস্ত জগতের দিকে চাহিয়া মনে হইতে লাগিল, এ কী অদ্ভুত আত্মখণ্ডন! যাহা আছে এবং যাহা রহিল না, এই উভয়ের মধ্যে কোনোমতে মিল করিব কেমন করিয়া।১৩
কিন্তু সুমন ঘোষ যে ইঙ্গিতপূর্ণ কৌশলী সম্পর্ক উপস্থাপন করলেন তার ভিত্তি খুঁজে পাওয়া গেলো কাদম্বরীর টাইটেল কার্ডে। তবে রবী-কাদম্বরীর সম্পর্ককে সুমন ঘোষ যে মাত্রা দিয়েছেন তার বিরোধিতা করে ইন্দিরা দেবীর উক্তি— ‘পূর্বপ্রথানুসারে রবিকাকার কনে খুঁজতেও তাঁর বউঠাকুরাণীরা, তার মানে মা আর নতুন কাকিমা, জ্যোতিকাকামশায় আর রবিকাকাকে সঙ্গে বেঁধে নিয়ে যশোর যাত্রা করলেন।’’১৪ অথচ কাদম্বরীতে রবীন্দ্রনাথের বিয়েকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেনোবা কাদম্বরী-রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার শাস্তিস্বরূপ বিয়ে দেওয়া হচ্ছে রবীর!
৫.
‘‘কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি ঠাকুরবাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে গড়ের মাঠে স্বামীর পাশাপাশি বেড়াতে যাবো ঘোড়া ছুটিয়ে। বাহনের লাগাম থাকবে আমারই হাতে। তিনি ছিলেন মুক্ত মনের মানুষ। কোনো রকম গোঁড়ামি ছিলো না তার। আমার ঘোড়ায় চড়া শেখা তারই উৎসাহে।’ —’ এভাবেই কাদম্বরীতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে পরিচয় করিয়ে দেয় কাদম্বরীর নেপথ্য কণ্ঠ। সমর্থন মেলে চিত্রাদেবের কথাতেও—
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে কিছুটা গোঁড়ামির পরিচয় দিলেও সত্যেন্দ্র-জ্ঞানদানন্দিনীর প্রভাবে নব্যভাবের নেশায় মেতে উঠলেন। সাবেকী সংস্কার ত্যাগ করে তিনি কাদম্বরীকেও ঘোড়ায় চড়া শিখিয়েছিলেন এবং গঙ্গারধারে নির্জনে শিক্ষাপর্ব শেষ হলে কাদম্বরী প্রতিদিন স্বামীর সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে যেতেন।১৫
তাই গর্ব করে কাদম্বরীকেও বলতে শোনা যায়, ‘‘তিনি শুধু আমার স্বামীই ছিলেন না; ছিলেন আমার প্রকৃত অভিভাবকও।’’ উৎসাহ জুগিয়েছেন সাহিত্য পাঠেও। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে কথোপকথনে তা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে— ‘বৈষ্ণব কবিদের পড়তে খুব ভালো লাগছে জানো! কী রকম জানি একটা আলাদা রকমের অনুভূতি দেয়। এখন কিন্তু তুমি আর বলতে পারবে না, আমি শুধু সস্তার উপন্যাস নিয়ে পড়ে আছি।’’ কাদম্বরীর ২০ মিনিট ১৪ সেকেন্ড অতিবাহিত হয় নালিশবিহীন কাদম্বরী-জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সম্পর্ক। হিসাবটা কষলাম এ কারণে যে, এর পরবর্তী উপস্থাপনে পাল্টাতে থাকে তাদের সম্পর্কের চরিত্র। মিল পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের প্রশ্নের উত্তরে; ২৭ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে কাদম্বরী যখন বলেন, ‘‘তোমার জ্যোতিদাদার কি আর থিয়েটার আর ব্যবসা ছেড়ে আমার জন্য সময় আছে?’’ কিন্তু এই অভাববোধ তাকে তাড়িত করেনি খুব বেশি। সে সময়টায় রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি তার সঙ্গী ছিলেন ঊর্মিলাও। সরলা দেবীর (স্বর্ণকুমারী দেবীর মেয়ে) কথাতে রয়েছে তারই সমর্থন। ‘‘ঊর্মিলা ছিলো নতুন মামীর [কাদম্বরী দেবী] আদুরে। তিনিই তাকে দেখতেন শুনতেন খাওয়াতেন পরাতেন। তাঁর সঙ্গে সে বাইরের তেতলাতেই থাকত ...। নিঃসন্তান নতুন মামীর মেয়ে যেনো সে।’’১৬ কিন্তু ঊর্মিলার মৃত্যু কিংবা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কাদম্বরীর মানসিক বিচ্ছেদ, কোনো ঘটনার সঙ্গেই কাদম্বরীতে কেনো জানি আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ মিললো না। অনেক সময় বাদে দেখা মিললো বিনোদিনীর থিয়েটারের দর্শকসারিতে। একদিকে কাদম্বরী কষ্টের চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছেন; অন্যদিকে জ্যোতি ভাসছেন স্বসৃষ্ট আনন্দ জগতে! ঘরে ঢুকছেন কণ্ঠে নিয়ে ‘‘হায় রে হায়! প্রেমিক যে জন/সে কেনো চায় ভালোবাসা।’’ সেখানে জ্ঞানদা দেবীও প্রয়োজন মতো ঢুকে পড়ছেন ফ্রেমে। কিন্তু যে জ্যোতি লোকচক্ষুকে তোয়াক্কা না করে স্ত্রীকে ঘোড়ায় চড়ালেন, উজ্জীবিত করলেন সাহিত্য পাঠে, সেই তিনিই কিনা এই সবকিছুতে থাকলেন অনুপস্থিত! প্রশ্ন জাগে, তিনি কি মন থেকেই চাইলেন কাদম্বরী নিজেকে আবিষ্কার করুক, নাকি আধুনিকতা জাহিরে ব্যবহার করলেন কাদম্বরীকে? কেননা তখন ‘য়ুরোপিয় শিক্ষার অঙ্গ হিসেবে আধুনিকারা ঘোড়ায় চড়া শিখতেন। সাহেবদের অনুকরণ করতেন দেশী সাহেব অর্থাৎ ভারতীয় আই. সি. এস. অফিসারেরা।’১৭
এদিকে জ্ঞানদা যখন জ্যোতির কুর্তা দুহাতে ঠিক করতে করতে বলতে থাকেন, ‘ঠিক করে বলো তো, কোন অভিনেত্রী তোমাকে এতোক্ষণ আটকে রেখেছিলো?’সেটাও ভাবায়। সম্পর্কের মাত্রা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে রবী যখন জ্যোতিকে প্রশ্ন করেন, ‘‘তুমি আজ চন্দননগরে ফিরবে না? ওদিকে নতুন বউঠান যে একা থাকবেন।’’ দৃষ্টি স্থির না করে কণ্ঠে জড়তা নিয়ে জ্যোতি বলেন, ‘‘তুই বরং ফিরে যা। নতুন বউঠানকে গিয়ে বলিস যে, আমার এখানে একটা জরুরি কাজ পড়ে গেছে, তাই আজ ফিরতে পারলাম না।’’ অথচ সেদিন ছিলো কাদম্বরীর জন্মদিন। অন্যদিকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে কাদম্বরী-রবীর সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে জ্যোতি যখন বলেন, ‘‘এই রবী, পলতার কাছাকাছি চলে এসেছি মনে হয়। চল সাঁতরে দুজন গুনে দাদার সঙ্গে দেখা করে আসি।’’ রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে কাদম্বরী চট করে বলে বসেন, ‘‘না না, তুমি যেতে পারবে না, এখন, এখন না।’’ তারপর বিব্রত হওয়া তিন জোড়া দৃষ্টি। যদিও ভিন্ন দিকে দৃষ্টি ফেরায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে ‘‘উপহার’’-এ লেখা রবীন্দ্রনাথের ‘‘চণ্ডীমঙ্গল’’ কাব্যগ্রন্থটি—
ছেলেবেলা হ’তে, ভাই, ধরিয়া আমারি হাত
অনুকক্ষণ তুমি মোরে রাখিয়াছ সাথে সাথ।
তোমার স্নেহের ছায়ে কত না যতন ক’রে
কঠোর সংসার হতে আবরি রেখেছ মোরে।১৮
অন্যদিকে কাদম্বরীতে রবীন্দ্র-কাদম্বরী সম্পর্কের মোড় ঘোরানো; কাদম্বরীর চিঠি রাখতে অপারগতার দৃশ্যের অব্যবহিত পরে, অন্ধকার ঘরে তলানিতে থাকা প্রদীপটির প্রজ্জ্বালন কাদম্বরীর বক্তব্যকে ভিত্তি দেয়, অন্যার্থে করে ভাবের পুনরাবৃত্তি। চলচ্চিত্রে কাদম্বরী বলেন, ‘‘আজ নতুনভাবে নতুন সাজে কুণ্ঠাহীন দাঁড়াবো আমার স্বামীর পাশে; নিজের অধিকার নিয়ে। তাকে নিয়েই তো আমার বর্তমান। তাকে নিয়েই তো আমার ভবিষ্যৎ। তিনিই তো আমার পরম আশ্রয়।’’ যদি তাই হবে, তাহলে এতোদিন জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে সম্পর্কের রকমফের কী ছিলো কিংবা চলচ্চিত্রের শুরুতে জ্যোতির প্রশংসায় ‘‘প্রকৃত অভিভাবক’’ বলিয়ে নেওয়ার অর্থটাইবা কী? নির্মাতা সুমন কি আসলেই কোনো চরিত্রকে স্পষ্ট করে হাজির করলেন? ধন্ধটা কাটে না বরং বাড়তেই থাকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের উদ্দেশে লেখা নটী বিনোদিনীর চিঠিতে এবং তিন মিনিট নয় সেকেন্ডে কাদম্বরীর প্রাণহীন দেহের সামনে রবীন্দ্রনাথের অভিযোগী আর জ্যোতির স্বীকারোক্তিমূলক অবনত দৃষ্টিতে। দৃশ্য পরম্পরায় এই দায়ভার কি রবীন্দ্রনাথের ঘাড়েও পড়ে না? এরই মিল খুঁজে পাওয়া গেলো প্রশান্তকুমার পালের কথায়,
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিলেন বিচিত্রকর্মা পুরুষ। নাট্য-রচনা ও অভিনয়, সঙ্গীত-চর্চা, ভারতী-প্রকাশ ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কাজকর্মের সঙ্গে পাট, নীল ও জাহাজী ব্যবসায়ের বিপুল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি আত্মহারা ভাবে জড়িত ছিলেন। ... অপরপক্ষে কাদম্বরী দেবী ছিলেন নিঃসন্তান; মহর্ষির পুত্র ও কন্যাদের ঘর যখন শিশুর কলকাকলিত মুখর, তখন তিনি বাহির-তেতালার ছাদে উদ্যান-রচনা, পশুপক্ষী-পালন ইত্যাদির মধ্যে নিজেকে ব্যাপৃত রাখতে চেয়েছেন। মধ্যে কিছুদিন স্বর্ণকুমারী দেবীর কনিষ্ঠা কন্যা ঊর্মিলাকে নিজের মেয়ের মতো করে তিনি লালন করেছিলেন, কিন্তু তার অকালমৃত্যুতে সেই সান্ত্বনার আশ্রয়টুকুও দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। মাতৃহারা দেবর রবীন্দ্রনাথকে তিনি প্রায় মাতার স্নেহেই যত্ন করেছেন, স্নেহ-বুভুক্ষু রবীন্দ্রনাথও তাঁকে এক সময়ে একান্তভাবেই আশ্রয় করেছিলেন—কিন্তু তাঁর ক্রমবর্ধমান কবিখ্যাতি, জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর পরিবারের মুক্ত আবহাওয়া তাঁকেও ধীরে ধীরে কাদম্বরী দেবীর স্নেহচ্ছায়ার বাইরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এই অবস্থায় স্বামীর প্রতিমুহূর্তের সাহচর্য তাঁর কাছে অপরিহার্য ছিলো। ... আর ঠিক সেই সময়েই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ জাহাজ নির্মাণ ও চালু করার ব্যাপারে প্রচণ্ড রকম ব্যস্ত।১৯
জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে সরাসরি ইঙ্গিত করে, বর্ণকুমারী দেবীর (রবীন্দ্রনাথের বোন) কথা অমল হোমের বরাত দিয়ে কাজী আব্দুল ওদুদ বলেন,
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ধোপার বাড়িতে দেওয়া জোব্বার পকেটে সেইদিনের একজন বিখ্যাত অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গতার পরিচায়ক কতকগুলো চিঠি পাওয়া যায়। সেই চিঠিগুলো পেয়ে কাদম্বরী দেবী ক’দিন বিমনা হয়ে কাটান। সেই চিঠিগুলোই তাঁর আত্মহত্যার কারণ এই কথা নাকি কাদম্বরী দেবী লিখে গিয়েছিলেন। তাঁর সেই লেখাটি ও চিঠিগুলো সবই মহর্ষির আদেশে নষ্ট করে ফেলা হয়।২০
কিন্তু পাদটিকায় ওদুদই আবার লিখেছেন, ‘যে মহিলার সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গতা জন্মেছিলো তিনি অভিনেত্রী ছিলেন না, এবং তাঁর সঙ্গে এই অন্তরঙ্গতার জন্য কাদম্বরী দেবী আরও একবার (রবীন্দ্রনাথের বিবাহের পূর্বে) আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।’২১
এদিকে আবার ওদুদকে খারিজ করে প্রশান্তকুমার পাল বলেন,
এ-বিষয়ে অমল হোমের কোনো লেখা আমরা দেখি নি, সুতরাং বর্ণকুমারী দেবীর মুখে তাঁর শোনা কথা এবং তাঁর মুখে ওদুদ সাহেবের শোনা কথা—যার কিছু গুরুতর অংশ সম্বন্ধে ঠাকুরবাড়িরই একজন অনুল্লিখিত ‘‘খ্যাতনামা ব্যক্তি’’ অন্যরকম বলেছেন—কতখানি নির্ভরযোগ্য সে-সম্বন্ধে সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক। ... মহর্ষি পুত্রদের মধ্যে নৈতিকতার এমন একটি উচ্চ আদর্শের পরিচয় পাওয়া যায় যে, সেখানে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের চারিত্রিক দুর্বলতার সম্ভাবনা কোনো সুনিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের কাছে অবাস্তব বলে মনে হয়। তাছাড়া সেক্ষেত্রে ব্রাহ্মসমাজেরই দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শাখা ও গোঁড়া হিন্দুদের মুখপত্রসমূহ এমন ছিদ্রান্বেষণের সুযোগ সহজে হাতছাড়া করত না।২২
এ ব্যাপারে ইন্দিরা দেবী তার অপ্রকাশিত স্মৃতিকথায় বলেন,
নতুন কাকিমার মৃত্যু আমাদের যোড়াসাঁকোর বাল্যজীবনে প্রথম শোকের ছায়া ফেলে বলে মনে হয়। ... রবিকাকাকে খুব বিমর্ষ হয়ে বসে থাকতে দেখতুম। আর শুনেছিলুম (তখন না পরে?) যে তিনি আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। কেন তা পরে অনুসন্ধান করেও জানতে পারিনি। তবে একবার শুনেছিলুম যে, জাহাজে যাওয়া নিয়ে কি এক মনোমালিন্য ঘটেছিলো। জ্যোতিকাকামশায় যে জাহাজের ব্যবসা ধরেছিলেন, সেই জাহাজে একদিন গান-বাজনা আমোদ প্রমোদ কি হবে, তাই নতুনকাকিমাকে পরে নিয়ে যাবার কথা ছিল ; কিন্তু ভাটা পড়ে যাওয়াতে জ্যোতিকাকামশাই বুঝি নিতে আসতে পারেন নি। শুধু এইটুকুর জন্য অমন প্রচণ্ড আঘাত ও অভিমান ত আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে স্বাভাবিক বলে মনে হয় না।২৩
৬.
ঠাকুরবাড়িতে কতো লোকের আনাগোনা; ঘরনিরা ঘরকন্নায় ব্যস্ত। অবশ্য অতোগুলো সদস্যের দেখভাল করাওতো চাট্টিখানি কথা নয়। তাই তাদের মধ্যে থেকে কেউ ঘরে বসে সাজবে-গুজবে, সাহিত্যচর্চা করবে তাতে আর যাই হোক গা-সওয়া হয় না। হয়তো সেটাই স্বাভাবিক! তাই চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রাজ্যের শত রাগ ঢেলে কাদম্বরীকে উদ্দেশ্য করে এক জা বলেন, ‘‘নীচের তলায় তো নামোও না আজকাল। আঁচলে তেল হলুদের দাগ নিয়ে আমরা সারাদিন খেটে মরছি। আর তুমি সক্কালবেলা সেজেগুজে সাহিত্যচর্চা করছো, পুতুল খেলা করছো।’’ যদিও চিত্রা দেবের বয়ানে কাদম্বরীকে দেখা যায় রন্ধনশালায় সামিল হতে— ‘‘সকাল থেকে তাঁদের বসত তরকারি বানানোর আসর, সেই সঙ্গে মেয়েলি আড্ডা—এই আসরে যোগ দিতেন সৌদামিনী, শরৎকুমারী, বর্ণকুমারী, প্রফুল্লময়ী, সর্বসুন্দরী, কাদম্বরী আরো অনেকে।’’২৪ বরঞ্চ স্বর্ণকুমারীর মেয়েলি আড্ডা বিমুখতার প্রসঙ্গে এসব কথা বলেন চিত্রা দেব। মূলত স্বর্ণকুমারীর আড্ডা ছিলো ‘‘নন্দনকানন’’-এ। সেখানে ‘‘... সন্ধ্যেবেলা বসত গান ও সাহিত্যপাঠের আসর। ... জ্যোতিরিন্দ্রাথ; রবীন্দ্রনাথ ও স্বর্ণকুমারী ছিলেন এ সভার স্থায়ী সভ্য।’২৫
অথচ কাদম্বরীতে এ আসরের প্রাণ ছিলেন এই নন্দনকানন স্রষ্টা স্বয়ং কাদম্বরী দেবী। অক্ষয় চৌধুরীর কথায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—‘আমি ক’দিন ধরে নতুন বর্ষা কবিতাগুচ্ছ লিখেছি, আপনাকে না শোনালে সেই বর্ষার জলধারা ঠিক প্রাণ পাচ্ছে না।’’ সাহিত্যাঙ্গনে সমাদৃত হলেও গোটা বাড়ি সুদ্ধ নারী মহলে কাদম্বরী ছিলেন উপেক্ষার পাত্র। কেবল ননদ স্বর্ণকুমারীরই সখ্য ছিলো তার সঙ্গে। হয়তো সেটা সাহিত্যানুরাগের জন্য। তাদের আলোচনা চলতো উপন্যাসের চরিত্রের অবস্থান, তাদের ভালোলাগা মন্দ লাগা, সমাজে তার প্রভাব নিয়ে। সে কারণে হয়তো স্বর্ণকুমারী ছিলেন প্রচলিত নারীচর্চার ঊর্ধ্বে। তাই কাদম্বরী যখন অবাঞ্চিত তার পিতৃপরিচয় আর সন্তানহীনতার জন্য তখন সমব্যথী হয়ে পাশে ছিলেন স্বর্ণকুমারী। তাই এক জা যখন বলেন, ‘‘এই যে সবাই তোমাকে বাঁজা বলে, তোমার খারাপ লাগে না?’’ এই ভর্ৎসনার জবাব দিয়ে স্বর্ণকুমারী বলেন, ‘‘নতুন বউ, আজ থেকে ঊর্মিলা তোমার মেয়ে। তুমি ওকে মানুষ করো।’’ কিন্তু যে সাহিত্যরস স্বর্ণকুমারীকে শক্তি দেয়, অনুপ্রাণিত করে তা কাদম্বরীর কাছে শক্তি হয়ে ধরা দেয় না। তার প্রচলিত নারী সত্তা তাকে আঁকড়ে থাকে। সে কারণে স্বর্ণকুমারীকে উদ্দেশ্য করে কাদম্বরীকে বলতে শোনা যায়, ‘‘ঊর্মিলাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে সাহিত্য আলোচনা করার জোর আমার নেই।’
৭.
‘‘বাড়ির মেয়েরা সকলেই জানে মেজদাদার মত সহায়, বন্ধু তাহাদের আর কেহই নাই, তাঁহার উপর সকলেরই অসীম বিশ্বাস। মেজদাদার স্বভাবে স্ত্রী সম্মান এতই ওতঃপ্রোতভাবে বর্তমান, কোন ভদ্র পুরুষে যে স্ত্রীজাতির প্রতি অসম্মান দৃষ্টিতে চাহিতে পারে, ইহা তিনি অন্তরে ধারণা করিতে অক্ষম।’’২৬ স্বর্ণকুমারী দেবী ‘‘আমাদের গৃহে অন্তঃপুরশিক্ষা ও তাহার সংস্কার’’ শিরোনামের প্রবন্ধে সত্যেন্দ্রনাথকে নিয়ে গর্ব করে এসব কথা বলেন। সত্যেন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে তাকেই উদ্ধৃত করে স্বর্ণকুমারী ওই প্রবন্ধে বলেন, ‘‘একরাশ পুরুষের সভায় কেন দু একটি মেয়ে লইয়া যাইব না? যাঁহারা স্ত্রীকে লইয়া বাহিরে যান না, তাঁহাদের নিকট স্ত্রীকে বাহির না করিলে তাঁহাদের শিক্ষা হইবে কিসে? অভ্যাস পরিবর্তন হইবে কেমন করিয়া?’২৭
সত্যেন্দ্রনাথের নারী স্বাধীনতার লড়াইয়ের কথা সবাই কায়মনোবাক্যে স্বীকার করে। বিলেতযাত্রা পরবর্তী সময়ে যে তার এই দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম ও বিকাশ লাভ করেছে এমন নয়। স্বর্ণকুমারী দেবীর কথায় তারও সদুত্তর আছে— ‘‘আশৈশব ইনি মহিলা বন্ধু; স্ত্রীশিক্ষা স্ত্রী-স্বাধীনতা পক্ষপাতি।’’২৮ তিনি এও বলেন, ‘‘অন্তঃপুরের অবস্থা সংশোধনের জন্য মাতাকেও ইনি ক্রমাগত ভজাইতেন।’২৯
ধন্দটা লাগে সে কারণেই! যিনি এ উপমহাদেশের প্রথম আই সি এস কর্মকর্তা, যিনি অসমসাময়িক, আচারবিরোধী; এমনকি পরিবারের মধ্যেও নাকি নারী স্বাধীনতার জন্যে একঘরে থাকতে স্বীয় সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন—সেই তিনিই আবার কাদম্বরীতে নারীর মূল্যায়ন করেন পারিবারিক মর্যাদায়। তাহলে আধুনিক পুরুষ হিসেবে নারীর কি কোনো আলাদা সংজ্ঞায়ন ছিলো তার একান্ত নিজের! কাদম্বরীতে সত্যেন্দ্রনাথের বিচরণ অবাধ না হলেও উপস্থিতির মূল্যায়ন কিছু কম নয়। এখানে তার উপস্থিতি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আর কাদম্বরীর বিয়ের বিরুদ্ধাচারী হিসেবে। তাকে বলতে শোনা যায়,
কতোবার বাবুমশাইকে বলেছি এ বিয়ে না দিতে। জ্যোতির এখন নিজেকে গড়ে তোলার বয়স। বিলেত যাবে, নানান অভিজ্ঞতা হবে, নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করবে তা না কী! আর এদের বংশ সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বাজার সরকার শ্যামের মেয়ে। শ্যামের নামে যে দুর্নামও আছে বাবুমশাই কি তা জানতেন না? আমরা পিরালী ব্রাহ্মণ বলে কি আর কোনো মেয়ে পাওয়া যেতো না। যোগ্য মেয়ে আসেনি আমাদের বাড়ি?
আবারও প্রশ্ন জাগে, যোগ্য মেয়ের সংজ্ঞায়ন কী তার কাছে? বিয়ের আগে কি তাদের বাড়ির নতুন বউদের কারো অক্ষরজ্ঞান খুব বেশি ছিলো?
সুমন ঘোষের এই উপস্থাপনের সত্যতা মেলে প্রশান্তকুমারের কথায়। ‘‘রবিজীবনী’’তে তিনি বলেন, ‘‘শ্যাম গাঙ্গুলির ৮ বৎসরের মেয়ে— আমি যদি নতুন হইতাম, তবে কখনই এ বিবাহ সম্মত হইত [হইতাম] না। কোন্ হিসাবে যে এ কন্যা নতুনের উপযুক্ত হইয়াছে জানি না।’’৩০ জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বিয়ের প্রায় এক মাস আগে অর্থাৎ ৮ জুন স্ত্রীকে লেখা চিঠিতে তিনি এ কথা বলেন। আবার বিয়ের সাত দিন বাদে লেখা আরেক চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘শ্যামবাবুর মেয়ে মনে করিয়া আমার কখনই মনে হয় না যে ভালো মেয়ে হইবে—কোন অংশেই জ্যোতির উপযুক্ত তাহাকে মনে হয় না।’’৩১ অথচ এই কাদম্বরীই একদিন সাহিত্যের ভালো সমঝদার বনে যান। প্রশান্তকুমার তাই বলেন, ‘‘... আপন অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবেশের প্রভাবে কয়েক বৎসরের মধ্যেই [তিনি] একটি সাহিত্যগোষ্ঠির মক্ষীরানীতে পরিণত হয়েছিলে ...।’৩২
৮.
‘‘কথাবার্তায় হোক বা পোশাক-আশাকে, মেজদি ছিলেন সবার থেকে আলাদা। ... তিনি মনে করতেন পড়াশোনার পাশাপাশি বাঙালি মেয়ে-বউরা এরকমভাবে বেশভূষা করলে তবেই ঘটবে তাদের ব্যক্তিত্বের আত্মপ্রকাশ।’’ জ্ঞানদানন্দিনী দেবী সম্পর্কে ঘাঁটতে গেলে অবশ্যম্ভাবীরূপে হাজির হয় কাদম্বরীতে উপস্থাপিত তার এ গুণের কথা। আসাটাই স্বাভাবিক। এই সময়ে দাঁড়িয়ে নারীদের বিচরণের উৎস খুঁজতে গেলে জ্ঞানদা দেবীকে পাশ কাটানোর সাধ্য কারো নেই। সূচনা বিকাশ সবই যে হয়েছে এই নারীর হাতেই। অন্তঃপুরের বাসিন্দাদের বাহির উপযোগী পোশাক তিনি কেবল আবিষ্কারই করলেন না, সঙ্গে বিজ্ঞাপনও প্রচার করলেন তা পরানো শেখানোর। কতোশত রকমের পরীক্ষা চালিয়েও দেবেন্দ্রনাথ যখন পছন্দসই পোশাক তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন, সেই ব্যর্থতা ঘোচালেন জ্ঞানদা। স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রবন্ধ সে কথাই বলে—
পিতা মহাশয় ছবি দেখিয়াছেন, আর আমাদের কাপড় ফরমাস করিয়াছেন; দরজি প্রতিদিনই তাঁহার কাছে হাজির, আর আমরাও। কিন্তু এত পরীক্ষাতেও তিনি আমাদের জন্য বেশ পছন্দসই পোষাক ঠিক করিয়া উঠিতে পারেন নাই। মেজ বধূঠাকুরাণী বোম্বাই হইতে গুর্জ্জর মহিলার অনুকরণে সুশোভন সুদর্শন পরিচ্ছদে আবৃত হইয়া যখন দেশে প্রত্যাগমন করিলেন তখনই তাঁহার ক্ষোভ মিটিল। দেশীয়তা, শোভনতা ও শীলতার সার্বঙ্গী সম্মিলনে এ পরিচ্ছেদ তিনি যেমনটি চাহিয়াছিলেন, ঠিক সেই রকম মনের মতনটি হইয়া, বঙ্গবালাদিগের ঐকান্তিক একটি অভাবমোচনে তাঁহার অনেক দিনের বাসনা পূর্ণ হইল।৩৩
বেশবাস ছাড়াও বিকেলে বেড়াতে বেরোনো, জন্মদিন পালনও প্রবর্তন করেছেন জ্ঞানদা দেবীই। ঠাকুরবাড়ির ছোটো ছেলে-মেয়েদের কথা ভেবে তিনি ১৮৮৫-তে ‘‘বালক’’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। ছবি আঁকায় উৎসাহ জোগাতে চালু করেন লিথো প্রেস। ‘‘সাত ভাই চম্পা’ ও ‘‘ডুমাডুমডুম’’ রূপকথা দুটির নাট্যরূপও দেন। তিনি ‘রাজা ও রাণী’ নাটকে রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে অভিনয় করেন রানি সুমিত্রার চরিত্রে। অথচ কাদম্বরীতে এই জ্ঞানদার উপস্থিতি নেই, বরং জ্ঞানদা এখানে একেবারে প্রচলিত নারী কাঠামোর ‘ভদ্রোচিত’ চরিত্র নিয়ে হাজির থেকেছেন। আর সেখানে তার দ্বন্দ্বের জায়গা কেবল কাদম্বরী।
‘নন্দনকাননে’ সাহিত্যসভার আয়োজনে কাদম্বরীর প্রশংসাতে তিক্ত হয়ে জ্ঞানদা দেবী, কবি অক্ষয় চৌধুরীকে তাই বলেন, ‘‘আপনার এখানে অনেক মুগ্ধ পাঠক-পাঠিকা আছে, আমার না থাকলেও চলবে।’’ এই কথার পিঠে জ্যোতি যখন বলেন, ‘‘বসো না মেজো বউঠান, তুমি না থাকলে আসর জমবে না।’’ প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, ‘‘তোমরা আসর জমাও।’’ আসলে দ্বন্দ্বটা কেনো? তাকে ছাপিয়ে কাদম্বরী প্রশংসিত হচ্ছেন বলে, নাকি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী বলে? কিন্তু দ্বিতীয়টির সম্ভাবনাকে তেমন শক্তিশালী মনে হয় না কাদম্বরীর উপস্থাপনায়। তাহলে আধুনিক নারী হয়ে ওঠার পথিকৃৎ হয়ে উঠলেও তিনি কি চাননি কেউ তার স্থানে স্থান পাক! তা না হলে এতো লড়াকু একজন নারী অন্য একজন নারীর বাঁজা সম্বোধনকে কী করে সমর্থন করেন! কী করে বলেন, ‘‘দেখো নতুন বউ, তুমি সবার থেকে দূরে দূরে থাকো, বাইরের লোকেদের সঙ্গে রোজ মেলামেশা করছো। ... এসব সবাই ভালো চোখে নিতে পারছে না। পর্দা তো আমিই ভেঙেছি বাইরের পুরুষদের সঙ্গেও যথেষ্ট মেলামেশা করি, কিন্তু বাড়ির মহিলাদের সঙ্গেও মিলেমিশে থাকি।’
অথচ বিলেত থেকে এসে তিনি আর ঠাকুরবাড়িতে থাকেননি। আলাদা থেকেছেন স্বামী-সন্তান নিয়ে। সুমন ঘোষ তাহলে কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে জ্ঞানদাকে নির্মাণ করলেন? যদিও চিত্রা দেব বলছেন,
... জোড়াসাঁকো থেকে চলে এলেও ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে জ্ঞানদানন্দিনীর যোগ কিছুমাত্র শিথিল হয়নি। ... যখন যার যা প্রয়োজন নিঃসংকোচে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন মেজ বৌয়ের কাছে। ... জোড়াসাঁকোয় প্রফুল্লময়ী বুক-ভারা কান্নার বোঝা নামিয়ে হাল্কা হবেন কার কাছে? না, মেজদির কাছে। রেণুকা অসুস্থ, মাতৃহীন দুটি শিশুকে রবীন্দ্রনাথ কোথায় রেখে যাবেন? কেন জ্ঞানদানন্দিনী তো রয়েছেন। ... সব দায়িত্ব সব ভার তাঁকে দিয়ে সবাই নিশ্চিন্ত।৩৪
৯.
২০১৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ হয় কাদম্বরী। ততোদিনে কাদম্বরীর বিদায়ের একশো ৩১ বছর পার হয়ে গেছে; রবীন্দ্রনাথ-কাদম্বরী সম্পর্কের বাজারও তৈরি হয়ে গেছে অনেকখানি। নারী-পুরুষের সেই সম্পর্কের মাত্রা—প্রেম, কাম, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব—নিয়ে রচিত হয়েছে গল্প, উপন্যাস গাদা গাদা। আর এ থেকে সৃষ্টি হয়েছে তিন ধরনের পাঠকের। এদের এক দল বিশ্বাস করছে, রবীন্দ্রনাথ-কাদম্বরী সম্পর্ক চটকদার ছিলো; অন্য দলটি আবার এতে খানিকটা আহত হয়েছেন। তারা রবীকে নিয়ে অন্যভাবে চিন্তা করেন। আর তৃতীয় পক্ষটি এসব কিছুর বাইরে করতে চেয়েছে সত্যের অনুসন্ধান।
কিন্তু এতো সহজে কি কোনো ঘটনার সত্য, মিথ্যা বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়? কিংবা জগতে সত্য-মিথ্যা বলে কি আদৌ কিছু আছে? উত্তরকাঠামোবাদ অবশ্য এর উত্তরে কেবল ব্যাখ্যা খোঁজে। তবে আশার কথা এই যে, রবী-কাদম্বরী সম্পর্কে গালগল্প যেমন আছে, তেমনই ‘‘নথি-প্রমাণযুক্ত’’ টেক্সটও আছে। ফলে এ নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বাকি দায়িত্বটুকু পাঠকের নিজের বিবেচনার। সেই আলোচনায় সুমন ঘোষের কাদম্বরী ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠবে কি না তা সময়ই বলে দেবে।
লেখক : হালিমা খুশি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে সম্প্রতি স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। তিনি দৈনিক বর্তমান পত্রিকায় শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। পাশাপাশি তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত করেন।
তথ্যসূত্র
১. http://bn.banglapedia.org/index.php?title= kwjvB`n-KzVwevox; retrieved on 21.11.2015
২. টলস্টয়, উদ্ধৃত; মুখোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার (১৮৮২ : ১৮১); রবীন্দ্রজীবনী-১; বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, কলকাতা।
৩. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০১৪ : ৭২); ‘সাহিত্যের সঙ্গী’’; জীবনস্মৃতি; বুকস্ ফেয়ার, ঢাকা।
৪. দেব, চিত্রা (৭১, এন ডি); ঠাকুরবাড়ির অন্দর মহল; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৫. শরৎকুমারী চৌধুরানী, উদ্ধৃত; পাল, প্রশান্তকুমার (১৩৯১ [১৯৮৪] : ২০৪); রবিজীবনী দ্বিতীয় খণ্ড; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উদ্ধৃত; পাল, প্রশান্তকুমার (১৩৮৯ [১৯৮২] : ১৬৯); রবিজীবনী প্রথম খণ্ড; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৭. প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, উদ্ধৃত; পাল, প্রশান্তকুমার (১৩৮৯ : ২৬৮); রবিজীবনী প্রথম খণ্ড; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৮. পাল, প্রশান্তকুমার (১৩৯১ [১৯৮৪] : ২৬৮); রবিজীবনী দ্বিতীয় খণ্ড; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৯. প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, উদ্ধৃত; পাল, প্রশান্তকুমার (১৩৯১ : ১০০); রবিজীবনী দ্বিতীয় খণ্ড; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
১০. রানী চন্দ, উদ্ধৃত; পাল, প্রশান্তকুমার (১৩৯১ : ১০৭); রবিজীবনী দ্বিতীয় খণ্ড; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
১১. প্রাগুক্ত; পাল (১৩৯১ : ১১৮)।
১২. প্রাগুক্ত; ঠাকুর (২০১৪ : ১৩৪)।
১৩. প্রাগুক্ত; ঠাকুর (২০১৪ : ১৩৫)।
১৪. ইন্দিরা দেবী, উদ্ধৃত; পাল, প্রশান্তকুমার (১৩৯১ : ১৭৭); রবিজীবনী দ্বিতীয় খণ্ড; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
১৫. প্রাগুক্ত; দেব (৭০ : এন ডি)।
১৬. সরলা দেবী ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, উদ্ধৃত; পাল, প্রশান্তকুমার (১৩৯১ : ৫৬ ); রবিজীবনী দ্বিতীয় খণ্ড; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
১৭. প্রাগুক্ত; দেব (৭০ : এন ডি)।
১৮. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উদ্ধৃত; পাল, প্রশান্তকুমার (১৩৯১ : ১০১); রবিজীবনী দ্বিতীয় খণ্ড; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
১৯. প্রাগুক্ত; পাল (১৩৯১ : ২০৫)।
২০. প্রাগুক্ত; প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, উদ্ধৃত; পাল (১৩৯১ : ২০৪ )।
২১. প্রাগুক্ত; পাল (১৩৯১ : ২০৪ )।
২২. প্রাগুক্ত; পাল (১৩৯১ : ২০৪—২০৫)।
২৩. প্রাগুক্ত; ইন্দিরা দেবী, উদ্ধৃত; পাল, প্রশান্তকুমার (১৩৯১ : ২০৫)।
২৪. প্রাগুক্ত; দেব (৪৩ : এন ডি)।
২৫. প্রাগুক্ত; দেব (৭২ : এন ডি)।
২৬. http://www.abasar.net/uniold_Articles_swarnakumareedevi.htm; retrieved on 19.05.2016
২৭. http://www.abasar.net/uniold_Articles_swarnakumareedevi.htm; retrieved on 19.05.2016
২৮. http://www.abasar.net/uniold_Articles_swarnakumareedevi.htm; retrieved on 19.05.2016
২৯. http:/ww/w.abasar.net/uniold_Articles_swarnakumareedevi.htm; retrieved on 19.05.2016
৩০. সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, উদ্ধৃত; পাল, প্রশান্তকুমার (১৩৮৯ : ৮৬); রবিজীবনী প্রথম খণ্ড; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৩১. প্রাগুক্ত; সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, উদ্ধৃত; পাল (১৩৮৯ : ৮৬)।
৩২. পাল, প্রশান্তকুমার (১৩৮৯ : ৮৭); রবিজীবনী প্রথম খণ্ড; আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৩৩. http://www.abasar.net/uniold_Articles_swarnakumareedevi.htm; retrieved on 19.05.2016
৩৪. প্রাগুক্ত; দেব (৩৫ : এন ডি)।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন