Magic Lanthon

               

ইব্রাহীম খলিল

প্রকাশিত ২৯ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চিত্রার পাড় থেকে দীনবন্ধু কলোনি দেশহীন মানুষের বেঁচে থাকার গল্প স্থানীয় সংবাদ

ইব্রাহীম খলিল


যদি ঘর ছেড়ে কেউ জঙ্গলে যায়,

স্বপ্নদোষ কি হয় না সেথায়

কোনো দেশে যখন মহামারি, যুদ্ধবিগ্রহ, দুর্ভিক্ষ আসে, তখন মানুষ বাঁচার জন্য সাময়িকভাবে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পালিয়ে যায়। যখন বিপদের আশঙ্কা কেটে যায়, তখন তারা আবার নিজ গৃহে ফিরে আসে। হয়তো এই সময়ের ব্যবধানে চিরদিনের জন্য তাকে হারাতে হয় কোনো প্রিয় মানুষ, প্রিয় বস্তু। তবে সেই স্মৃতিও সময়ের বিবর্তনে ভুলে যায় মানুষএটাই হয়তো তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু মানুষের এমন কিছু স্মৃতি থাকে, যা শত চেষ্টাতেও সে ভুলতে পারে না। কারণে-অকারণে অচেতন মনে থাকা সেই স্মৃতি বারবার ফিরে আসে তার চেতনে। এই উপমহাদেশের মানুষের কাছে তেমনই এক স্মৃতির নাম ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের হিন্দু-মুসলিম-শিখ সম্প্রদায়ের দাঙ্গা,দেশভাগ।

৪৭-এর এই পালানোটা হয়তো আকস্মিক ছিলো, কিন্তু সাময়িক ছিলো না। ফলে যারা অমৃতসর থেকে মুম্বাই; মুম্বাই থেকে লাহোর, কিংবা ঢাকা থেকে কলকাতায় পালিয়েছিলো তারা আর ফিরে আসতে পারেনি। কারণ অন্য প্রান্তে তার জীবন সংহারের জন্য অপেক্ষা করছিলো তারই কোনো প্রতিবেশী। যার সঙ্গে তার কেটেছে শৈশব, কৈশোর কিংবা জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়। দুঃসহ এই স্মৃতি নিয়ে অনেকে হয়তো নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশে ঘুরে দাঁড়িয়েছে; কিন্তু বেশিরভাগই ফেলে আসা স্মৃতি ভুলতে পারেনি। বরং সেই স্মৃতি ক্রমেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। মনের গভীরের ক্ষতকে করেছে আরো অসহনীয়।

আসলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাস মহৎ কোনো সংগ্রামের ইতিহাস নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, উপনিবেশ টিকিয়ে রাখার দম শেষ হওয়া এবং ধর্মের আবরণে অর্থনৈতিক স্বার্থ, জমির লড়াই, বাজার দখলের খেলা, সঙ্গে উচ্চবর্গের স্রোতে গা ভাসানোএর সবই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণ। তবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত প্রতিশোধ যেমন প্রত্যক্ষ সহিংসতার কারণ হয়, তেমনই এসব দাঙ্গা ও হত্যাযজ্ঞের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও থাকে। সমাজের অন্তরে দাঙ্গা যে অমানবিকতা, যে ক্ষত, যে ক্ষতির সৃষ্টি করে, তার প্রভাব বহুকাল থাকতে পারে এবং তার ফলাফল ফিরে আসতে পারে আরো বৃহৎ আকারে। তাই ৪৭-এর সহিংসতা সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি, বরং সমাজের অন্তরে শিকড় গেড়েছে ডালপালা মেলে বিষবৃক্ষ হয়ে। আসলে শরীরে শ্বাসপ্রশ্বাসের আনাগোনা থাকলেই তাকে জীবন বলে না; হৃদয় থেকে সুখ, আর মন থেকে আশা নষ্ট হয়ে গেলে তাকেই মৃত্যু বলে। ঠিক তেমনই দাঙ্গায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো তারা বেঁচেছিলো অনেকটা জিন্দা মরা হিসেবে। সেই সময় সামর্থবানরা কোনোভাবেই তাদের ক্ষতকে নিবারণ করার চেষ্টা করেনি। বরং ৪৭-এর স্মৃতি ও যুক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছে তারা বারবার। সে কারণেই ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বানিয়েছে লক্ষ্যবস্তু; পবিত্র কিংবা পুরনো ধর্ম বিপন্ন স্লোগান তুলে উসকে দিয়েছে এক প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে অন্য প্রতিবেশীকে। বহু ক্ষেত্রে বর্বর ব্যবহারকে তুলনা করেছে বদলা হিসেবে।

আসলে যখন কোনো ইক্ষু থেকে রস বের করে নেওয়া হয়, তখন ইক্ষুর আর কোনো মাহাত্ম্য থাকে না। ঠিক তেমনই অনেক সংগ্রামের পর স্বাধীনতাকামী মানুষের কাছ থেকে যখন তার প্রিয় মানুষ কিংবা বস্তুকে কেড়ে নিয়ে ধর্মের ঘোল খাইয়ে বলা হয় এটাই স্বাধীনতা, তখন তারা সেই স্বাধীনতার মর্মই উপলব্ধি করতে পারে না। বরং প্রতিনিয়ত পতিত হয় অজানা শঙ্কায়। ৪৭ ও পরবর্তী সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় একটু নিশ্চয়তার আশায় পালিয়ে যাওয়া এবং পালিয়ে ঢাকা কিংবা কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করা মানুষের বর্তমান অবস্থা কীসেটাই এ প্রবন্ধে দেখার বিষয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলের চিত্রা নদীর পারে (১৯৯৮) এবং ভারতের তরুণ চলচ্চিত্রনির্মাতা অর্জুন গৌরিসারিয়া ও মৈনাক বিশ্বাসের স্থানীয় সংবাদকে (২০১৫) ঘিরে আলোচনা এগিয়ে যাবে। চিত্রা নদীর পারেতে দেশভাগ ও পরবর্তী সময়ে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় বাংলাদেশ থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়া এবং স্থানীয় সংবাদ-এ বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া মানুষের ভারতে বর্তমান অবস্থার কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। আলোচনায় যাওয়ার আগে চলচ্চিত্র দুটির কাহিনি সংক্ষেপ জেনে নিই।

চিত্রার পাড় থেকে দীনবন্ধু মিত্র কলোনি

সময়টা ১৯৪৭; তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তর যশোর জেলার অন্তর্গত নড়াইল। চিত্রা নদীর পাড়ে শশীকান্ত সেনগুপ্ত নামের এক হিন্দু উকিলের বাস। বিধবা বোন অনুপ্রভা, মেয়ে মিনতি ও ছেলে বিদ্যুতকে নিয়ে তার সংসার। ততোদিনে হিন্দু-মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে দেশভাগের উত্তেজনা শুরু হয়ে গেছে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে হিন্দুরা দেশত্যাগ করে পাড়ি জমাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। তবে শশীকান্তের ওপর চাপ থাকলেও তিনি বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে পরদেশে পাড়ি না জমানোর সিদ্ধান্তে অনড়। কিন্তু ছোটো ছেলে বিদ্যুৎ তার মুসলমান বন্ধুদের দ্বারা উৎপীড়িত হয়ে কলকাতা চলে যাওয়ার বায়না শুরু করে। অগত্যা বিদ্যুতকে পড়াশোনার জন্য কলকাতা পাঠান শশীকান্ত। সময় পেরিয়ে যায়; ১৯৬৪-তে শশীকান্তের মেয়ে মিনতি অবশ্য ততোদিনে বড়ো হয়ে গেছে। ছোটোবেলার খেলার সঙ্গী বাদলের সঙ্গে মিনতির প্রেমের সম্পর্ক। বাদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে জড়িয়ে পড়েন আইয়ুব খানের জারি করা মার্শাল ল বিরোধী আন্দোলনে। একদিন মিছিলে পুলিশের অতর্কিত গুলিতে নিহত হন বাদল। এর মধ্যে কাশ্মীরে এক মসজিদ নিয়ে গোলমালের ঘটনায় পূর্ব পাকিস্তানের চারিদিকে শুরু হয়ে যায় হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।

দাঙ্গার মর্মান্তিকতায় শশীকান্তের বিধবা ভাতিজি বাসন্তী ধর্ষিত হয়ে চিত্রা নদীতে আত্মাহুতি দেন। ফলে একদিকে ভাতিজির আত্মাহুতি, অন্যদিকে দেশ ছেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাকোনোটাই মেনে নিতে পারেন না শশীকান্ত। একসময় অসুস্থ শশীকান্ত সেই চিত্রা নদীর পাড়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আর নিশ্চয়তার খোঁজে দেশ ছেড়ে কলকাতায় পাড়ি জমান শশীকান্তের মেয়ে মিনতি ও বিধবা বোন অনুপ্রভা।

অন্যদিকে মিনতি ও অনুপ্রভা কলকাতায় যাওয়ার প্রায় ৫০ বছর পরে তাদের মতো চলে যাওয়া মানুষের বর্তমান অবস্থা নিয়ে নির্মাণ হয়েছে স্থানীয় সংবাদ। দক্ষিণ কলকাতার দীনবন্ধু কলোনি; যেখানে ৪৭ ও পরবর্তী সময়ের দাঙ্গায় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষের বসবাস। জায়গার অভাবে কোনোরকমে এক-একটি পরিবার মাত্র একটি ঘরে কুণ্ডলী পাকিয়ে রাত্রিযাপন করে। অতিন নামের এক স্বপ্নমাখা তরুণ কবির পরিবার নিয়ে এ কলোনিতেই বাস। যিনি বাড়িতে স্বল্প জায়গা থাকায় সারাদিন বাইরে কাটিয়ে কেবল রাতে ঘুমানোর জন্য ঘরে ফেরেন। কিন্তু এলাকায় ক্লাবের লোকজনের সহায়তায় অন্যদের সঙ্গে তাদের ঘরটিও কেড়ে নিয়ে বহুতল ভবন বানাতে চায় পল অ্যান্ড পল নামের বহুজাতিক কোম্পানি।

অতিনের ভালোবাসা কবিতা আর গানে। তিনি পছন্দ করেন এলাকার অনন্যা নামের এক মেয়েকে। যিনি আসন্ন বসন্তবরণে এলাকার অনুষ্ঠানে অতিনের সঙ্গেই গানের প্রস্তুতি নেন। একদিন অনন্যা বাজারে গেলে তার চুলের বিনুনি কেটে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ফলে ঘটনার পরদিন গানের রিহার্সেলে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন অনন্যা। আর রিহার্সেলে তাকে না দেখে চিন্তায় পড়ে যান অতিন। কলোনির বন্ধু ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎসাহদাতা দীপঙ্কর দা রাতে অনন্যাকে শহরে যেতে দেখেন, তারা দুজনে বের হন অনন্যার খোঁজে। একসময় অনন্যাকে খুঁজে পেয়েও তার কাছে যান না তারা। সারারাত তারা ঘুরে বেড়ান তিলোত্তমা নগরীর নানা জায়গায়। সাক্ষাৎ হয় নিজের ঘর কেড়ে নেওয়া মি. পলের সঙ্গেও। কিন্তু কিছুই বলা হয় না তাকে।


কী বলবো সেই প্রেমের বাণী

কামে থেকে হয় নিষ্কামী!

সাধারণত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিংবা যারা এটাকে পরিচালনা করে, তাদের অধিকাংশই যে নিজ সম্প্রদায় নিয়ে খুব সচেতন এমন নয়। যেসব ধর্মানুরাগীরা অন্য ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে হামলা চালায় কিংবা তার স্ত্রী সন্তানকে মারধর করে, তাদের অনেকেই হয়তো সেই ধর্মের শাস্ত্রানুশীল (practicing worshiper) নয়। তার পরও তারা ধর্মের টানে একজন অন্যজনকে মানুষ হিসেবে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না; মুহূর্তেই হিংস্র পশুতে পরিণত হয়। ফলে একদিকে নির্যাতিত মানুষ যেমন কখনোই নিপীড়নকারীদের ভুলতে পারে না তেমনই তারাও সুযোগ পেলে প্রতিশোধ নিতে উন্মাদ হয়ে ওঠে। নিজের দুঃখই তখন হয়ে ওঠে সর্বেসর্বা। এভাবেই বাড়তে থাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রসারতা।

স্থানীয় সংবাদ-এ নয় মিনিট ১৪ সেকেন্ডে এক দোকানি, জনৈক ব্যক্তি ও অতিনের বাবার ক্ষণিক কথোপকথনের মধ্যেও কিছু বিষয়ের আঁচ পাওয়া যায়

জনৈক ব্যক্তি : কই যাইবা? যদি ভাইঙ্গা ফেলায়? (সবাই নীরব। চিন্তাগ্রস্ত অতিনের বাবার নীরবে প্রস্থান।)

জনৈক ব্যক্তি : নারায়ণগঞ্জ ছাড়ার কথা অখনও মনে পড়ে। তখন আমার বয়স কতো হইবো, ১৩ কি ১৪। যশোর দিয়া আমাগো দল ঢুকছিলো। চারদিকে শুধু আগুন জ্বলতাছে।

দোকানদার : আমরা আইলাম আরেকটু পরে, ৫৬ সালে। তখন এইখানে সব পুকুর, ডোবা, পতিত জমি।

জনৈক ব্যক্তি : কেউ থাকতো না। মুসলমান চাষা আছিলো কতোগুলা, মার খাইয়া পলাইলো।

দোকানদার : ও এইখানে না। এইখানে না।

জনৈক ব্যক্তি : হ, এইখানেই তো (দোকান অবস্থানের জায়গাকে নির্দেশ করে)।

তার মানে দাঙ্গার সময় প্রতিপক্ষ যে শ্রেণিরই হোক, তখন সে হয়ে ওঠে একজন আরেকজনের শত্রু; সুযোগসন্ধানী। যারা বাংলাদেশ থেকে জীবন রক্ষায় ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো, তারাও ভারতে গিয়ে সেখানকার মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছিলো। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে তারা গরিব মুসলমান চাষাদেরও বাড়িঘর কেড়ে নিয়েছিলো। সময় পেরিয়ে গেলে তারা যে একসময় এসবের কোনো কিছুর সঙ্গে জড়িত ছিলো সেটাও দোকানদারের মতো বেমালুম চেপে যান। কারণ তিনি আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেটা হয়তো সংখ্যালঘুদেরই কোনো একসময়ের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই ছিলো। কিন্তু সবকিছুর পরও মৃত্যুর ভয়ে পালিয়ে যাওয়া এ মানুষের কপালে দুশ্চিন্তার বক্ররেখা বছরের পর বছর পার হলেও দূর হয় না। তাইতো দোকানে জনৈক ব্যক্তি বাড়ি ভেঙে ফেললে কোথায় যাবেন জিজ্ঞাসা করলে, অতিনের বাবাকে নীরব থাকতে দেখা যায়। হয়তো বাংলাদেশ ছেড়ে এসে ভারতে আশ্রয় নেওয়া এ মানুষগুলো আবারও তাদের অতীত খুঁজে ফেরেন। একসময় মুসলমানদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে সুযোগ বুঝে মুসলমানদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে প্রতিশোধ নিয়েছেন। কিন্তু আজ তারা আরো অসহায়। কারণ হিন্দু হয়েও সে দেশে তারা এখন সংখ্যালঘু

এখন দেখার বিষয় কলকাতার দীনবন্ধু কলোনিতে যারা বাংলাদেশ থেকে দেশভাগের সময় আশ্রয় নিয়েছিলো, সেই সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অবস্থা এ দেশে কেমন ছিলো। অর্থাৎ কোন পরিস্থিতিতে তারা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলো। চিত্রা নদীর পারের ১৫ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে দেখা যায়, সামসুদ্দিন নামের একজন উকিল শশীকান্তের সঙ্গে দেখা করতে আসে। তখন তাদের কথোপকথন

সামসুদ্দিন : তারপর বলো, খবর-টবর কী? কিছু ভাবলে-টাবলে নাকি?

শশীকান্ত : দেখো সামসুদ্দিন, তোমাকে তো আমি বহুবার বলেছি, আমি যাচ্ছি না কোথাও।

সামসুদ্দিন : চাপ টের পাও কিছু?

শশীকান্ত : পাইনে আর! গেলে তো বাঁচে। বাড়িটার দিকে তো আর কম লোকের নজর নেই। ... অথচ দেখো প্রতিবেশী মানুষ, দুই বাড়ির ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে খেলাধুলা করে, সেও কিনা!

সামসুদ্দিন : দেশ জুড়ে তো এখন এই চলতেছে। কোর্টে তো এখন জমি আর বাড়ি দখল ছাড়া কোনো মামলাই নেই। ওপার থেকে যারা আসতেছে তারা কেউ কেউ বাড়িঘর এক্সচেঞ্জ করে আসতেছে বটে, কিন্তু অনেকেই তো খালি হাতে। বাড়ি দেখলেই ঠেইলে উঠতেছে। আর কিনলেও কিনতেছে দেদার সস্তায়।

আসলে এ তো গেলো শুধু জমি আর বাড়ি দখলের চিত্র। এছাড়াও তখন সংখ্যালঘুদের বাড়িতে রাতের আঁধারে ঢিল ছোড়া, তাদেরকে কারণে-অকারণে হেনস্তা করাও ছিলো নৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু যখন সময় প্রতিকূলে চলে যায়, তখন শুরু হয় একজন আরেক জনের জীবন কেড়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতা। এমনকি দেশভাগ হওয়ার আগেই ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গার সঙ্গে বাংলাদেশের নোয়াখালীতেও ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সেই দাঙ্গা এতোটাই ভয়াবহ ছিলো যে, দাঙ্গাপীড়িত সেই সব এলাকায় সম্প্রীতি স্থাপনের আশায় স্বয়ং মহাত্মা গান্ধীও এসেছিলেন। কিন্তু সেই সম্প্রীতি শেষ পর্যন্ত আর বজায় থাকেনি। এক প্রতিবেশীর আচরণে সহমর্মিতা কিংবা বিশ্বাসের ছায়াও দেখা যায়নি। তাই একসময় শূন্য হাতে নিজের জীবনটুকু নিয়েই তাদেরকে একটু নিশ্চয়তার আশায় ঘর ছেড়ে উঠতে হয়েছে দীনবন্ধু কলোনির মতো জায়গায়। বাল্যকাল থেকে দেখে আসা নদী, গাছগাছালি, সবুজ মাঠ, বাবা-মার রেখে যাওয়া একমাত্র কোনো স্মৃতি কিংবা নিজে না খেয়ে বড়ো করা ছোটো বিড়ালটিও মুহূর্তেই হয়ে গেছে সোনালি অতীত।

তবে এতো কিছুর পরও শশীকান্তরা মাতৃভূমিতে থেকে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা আর শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। দেশভাগের ভয়াবহতা কাটিয়ে যখন পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলো, তখন যেনো এর ভয়াবহতা আরো বহু গুণে বৃদ্ধি পেলো। ৬৪-তে আইয়ুব খানের শাসনামলে কাশ্মীরে এক মসজিদ নিয়ে গোলমাল শুরু হলে তার রেশ ছড়িয়ে পড়ে নড়াইলেও। শুরু হয় আবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দাঙ্গার একপর্যায়ে ভাতিজি বাসন্তী ধর্ষিত হলে আরো ভেঙে পড়েন শশীকান্ত। তার পর সেই পরিস্থিতি মেনে নেওয়া না-নেওয়ার মধ্যেই ধরাধাম ত্যাগ করতে হয় তাকে। একপর্যায়ে সব ছেড়ে যশোরের পথ ধরে চলে যেতে হয় পরিবারের অবশিষ্ট দুই সদস্যকেও।

স্থানীয় সংবাদ-এ দোকানদার ও জনৈক ব্যক্তি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকানে বসে তাদের জীবনের নানা উত্থান-পতন নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। কোথায় কে ভালো যাত্রা দেখেছে, কোন শিল্পীর গলায় মন কেমন করা গান, কার শরীরে কেমন যৌবন, দোকানে বসে দোকানি কী কী অভিজ্ঞতার মধ্যে গেছেন, সব। বৃদ্ধ দোকানদার আর জনৈক ব্যক্তির কথোপকথন দেখে মনে হয়,তারা জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যের জন্যই অপেক্ষা করছেন। আর সেই লক্ষ্য কেবল মৃত্যু। যাকে কখনোই এড়ানো যায় না, কেবল অপেক্ষা করাই সম্ভব। হয়তো অনুপ্রভা এতোদিনে এই কলোনিতেই না ফেরার দেশে গমন করেছেন; আর মিনতি বেঁচে থাকলে তিনিও হয়তো দোকানি আর জনৈক ব্যক্তির মতো মৃত্যুর প্রহর গুণছেন। আর নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ে তার রেখে যাওয়া স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে দেখছেন,আর ভাবছেন,জীবন কতো বৈচিত্র্যময়!

মৌ-লোভী মৌলবি কিংবা স্বর্গের পাতি দেবতারা

স্থানীয় সংবাদ-এর ৪১ মিনিটে ট্রলি শটে কলোনির সারিবদ্ধ ঘরগুলোতে দেখানো হয়,সন্ধ্যায় মেয়ে হিন্দি গান গাইছে আর বাবা-মা রাধা-গোবিন্দর পূজা করছে। পাশের ঘরে একজন বৃদ্ধ তার জামা-কাপড় গুছিয়ে রাখছেন। তার পরেরটিতে বিবাহযোগ্য বোন লেখাপড়া আর ভাই চিরুনি দিয়ে চুল পরিপাটি করছে। এর পরের ঘরে জীবনের সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়া স্বামী-স্ত্রীর একজন সেতার বাজিয়ে চলেছেন, আরেকজন টেবিলে বসে কোনো কিছুর হিসাবে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। পরের ঘরটিই অতিনদের। অল্প জায়গার মধ্যে তার বাবা-মা বিভিন্ন জিনিস নেড়েচেড়ে দেখছেন। ওই একটি ঘরেই বাবা-মার সঙ্গে অতিন ও তার বড়ো ভাইকে ঘুমাতে হয়। এর আরেকটু সামনে কোনো ঘর দেখানো হয় না। শুধু ঘরের পাশে খোলা নোংরা জায়গায় মশারি টাঙানো দেখায়। বোঝা যায়, ওই মশারিওয়ালা বেচারার কোনো ঘরই নেই। হয়তো এখানেই বাংলাদেশ থেকে যাওয়া দোকানে বসে থাকা জনৈক ওই বৃদ্ধ নিদ্রায় যান। আসলে কলোনির অন্য পরিবারগুলোর চিত্রও ঠিক একই রকম; এটাই দেশছাড়া ওই মানুষগুলোর বর্তমান অবস্থা।

পরিস্থিতি এখানে শেষ হলেও ভালো হতো। কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও কেড়ে নিতে পল অ্যান্ড পল গ্রুপের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৎপর। তাতে যদি দু-একটি প্রাণও যায়, তবে যাক না! দেশের উন্নয়নে এতোটুকু ত্যাগ স্বীকার তো তাদের করতেই হবে! শুধু তা-ই নয়, অতিন যে অনন্যাকে পছন্দ করেন তার বাবাও বিলাসবহুল ভবনে অ্যাপার্টমেন্ট নেওয়ার জন্য গোপনে টাকা জমা দেন পাড়ার ক্লাবের ছেলেদের কাছে। একবারও তিনি ভাবেন না,বাড়ির পাশে যে মানুষেরা এতোদিন কোনো রকম বেঁচে আছেন,ওই ঘর ভাঙলে তারা কোথায় যাবেন?

বাংলাদেশে যারা শরণার্থী হিসেবে আছেন তাদের অবস্থাও খুব সুখকর নয়।৭১-এ স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় যেসব বিহারিরা বাংলাদেশে আটকা পড়েছিলেন তাদের পরিস্থিতিও শোচনীয়। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিরপুরের কালশী বিহারি ক্যাম্পে আগুন ধরিয়ে দেয় স্থানীয়রা। সেই ঘটনায় ১০ বিহারি আগুনে পুড়ে প্রাণ হারান। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক নারী বিবিসিকে সেসময় জানিয়েছিলেন,তারা ঘটনার সময় দেখেছিলেন পুলিশ সেখানে এসেই গ্যাস,বোমা ও গুলি ছোড়া শুরু করে। আর সন্ত্রাসীদের বলতে থাকে আগুন ধরাও! বাংলাদেশে ১৩টি অঞ্চলে ৬৬টি ক্যাম্পে প্রায় পাঁচ লক্ষ বিহারির দীর্ঘদিন আন্দোলনের ফল হিসেবে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে তাদেরকে ভোটাধিকার দেয় বাংলাদেশ সরকার। তবে ভোটাধিকার পেলেও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার কথা তারা বরাবরই অভিযোগ করে এসেছেন। ক্যাম্পের একটি ঝুপড়ি ঘরেই রান্না,খাওয়া ও ঘুমাতে হয় একই পরিবারের ১০-১৫ জন সদস্যকে। একদিকে অর্থনৈতিক সঙ্কট, অন্যদিকে স্থানীয় থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিদের নিপীড়নে বেহাল দশা ক্যাম্পে অবস্থান করা এ বিহারিদের।

এ তো গেলো বিহারিদের কথা। এবার বাংলাদেশে অবস্থান করা রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে আসি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ফিজিশিয়ান্স ফর হিউম্যান রাইটস বলেছে,মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ নিরুৎসাহিত করতে বাংলাদেশ সরকার ধরপাকড় ও নির্যাতন করছে। সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশে যেসব অস্থায়ী ক্যাম্পে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বাস করছে,সেখানে সরকার মানবিক সাহায্যে বাধা দিচ্ছে। ফলে ক্যাম্পে মানবিক বিপর্যয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনাহারে,রোগ-বালাইয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে অনেকে। যদিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এটা বাস্তবতা বিবর্জিত। তাহলে এক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের অভিমত কী একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে।

এদেশে কোনো দাম নাই, কতার লগে বলে বার্মাইয়া। চলে যাও। মারলে কোনো বিচার নাই, কুত্তার মতো মারি ফেলি রাখলেও কোনো বিচার হয় না এখানে।কাঁদতে কাঁদতে বিবিসিকে বলছিলেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া সখিনা নামের এক রোহিঙ্গা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ২৮ হাজার নিবন্ধিত এবং প্রায় দুই লক্ষ অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরো বেশি। যাদের প্রায় সবার অবস্থাই দীনবন্ধু কলোনি কিংবা বিহারি ক্যাম্পের মতোই। তবে বিজাতি কিংবা অবৈধ দাবি করে স্থানীয় থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত প্রতিনিয়ত এদের ওপর যেভাবে নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে তা নানাভাবে উঠে এসেছে বিভিন্ন সমীক্ষায়। নিশ্চয়তা বা নিরাপত্তার জন্য স্বজাতি কিংবা স্বধর্মের মানুষের কাছে ছুটে এসেও রক্ষা নেই কোনো উদ্বাস্তুর!

মিনতি ও অনুপ্রভার মতো দেশভাগ কিংবা অন্যান্য সময়ের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় বাংলাদেশ ও ভারতে আশ্রয় নেওয়া মানুষকে আজও  কারণে-অকারণে ডাকা হয় রিফিউজি। আর মায়ানমার থেকে আসা মুসলমানদের ডাকা হয় বার্মাইয়া। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলেও তাদের পরিচয় এখন আর হিন্দু কিংবা মুসলমান নয়। তারা এখন একই ধর্মের হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যেও সংখ্যালঘু। সময়ের পরিক্রমায় স্বধর্মের জন্য জীবন দিতে আগ্রহী হওয়া মৌলবি কিংবা দেবতার দূতদের উত্তরসূরিরা আজ সামান্য স্বার্থের জন্য স্বধর্মের বিনাশকারী। মনে পড়ে চিত্রা নদীর পারেতে মাঝে মাঝে দেখানো এক পাগলের কথা। যিনি হঠাৎ পথচারীদের পথ আগলে জিজ্ঞাসা করেন,কিযাচ্ছিস নাকি আসতিছিস? ওই একই, যাওয়াও যা,আসাও তা। আট আনা পয়সা দে বড়ো খিদে। আসলে তখনকার পরিস্থিতি এমন একটি পর্যায়ে গিয়েছিলো যে, দেশান্তর হওয়ার পরিণাম কী হবে সেটা একটা পাগলও বুঝতে পেরেছিলো। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায়ও শাসকরা সেটা বুঝতে চাননি। কারণ তাদের আত্মার ক্ষুধা পাগলের মতো আট আনায় সীমাবদ্ধ ছিলো না। একসময় সেই ক্ষুধা বিধর্মীদের রক্ত দিয়ে মেটানোর চেষ্টা করা হয়েছিলো। কিন্তু তাদের থেকে যাওয়া অবশিষ্ট ক্ষুধাটুকু আজও  নিস্তেজ হয়ে যায়নি। তাইতো সেই ক্ষুধা মেটাতে তাদেরই স্বধর্মী এ সংখ্যালঘুরা এখন একমাত্র পাথেয়।

কাক নিজের মাংস না খেলেও মানুষ কেনো ...

স্থানীয় সংবাদ-এর ছয় মিনিট তিন সেকেন্ডে পল অ্যান্ড পল গ্রুপের একটি বুলডোজার দীনবন্ধু মিত্র কলোনির নোংরা ঘরগুলো ভেঙে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট বানানোর জন্য নিয়ে যেতে দেখা যায়। কিন্তু কলোনির বাসিন্দারা সেটা মেনে নিতে পারেন না। কারণ তারা এতোদিনে বুঝে গেছেন,বাবুদের তৈরি করা অ্যাপার্টমেন্ট তাদের আশ্রয়হীন করে তুলবে। কিন্তু কলোনির ক্লাবের লোকজন আর পলের চুনোপুঁটিরা তাদের কোনো কথাই শোনে না। ২১ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে কলোনির বাসিন্দাদের সঙ্গে কথোপকথন দেখলেই তাদের ক্ষমতার কিছু আঁচ পাওয়া যায়

ক্লাবের সদস্য ১ : শুনুন,শুনুন। এভাবে গলাবাজি করে আপনারা কিছুই করতে পারবেন না।

কলোনির বাসিন্দা ১ : কেনো,আমরা কি জানোয়ার,নাকি বানের জলে ভেসে এস্ছি?

পলের লোক : হ্যাঁ,আপনারা কী সভ্য লোক? আপনারা সভ্য লোক, কী করেন এই বাড়িটাতে? কী করেন এই বাড়িতে রাতে বেরাতে?

কলোনির বাসিন্দা ২ :মলমূত্র ত্যাগ করি। তোমাগো কল্যাণে এমন একটা পাকা পায়খানা পাইলাম ...।

ক্লাবের সদস্য ২ :যতোসব অসামাজিক ও অশালীন কথাবার্তা।

ক্লাবের সদস্য ১ :শুনুন,শুনুন। বিষয়টা মীমাংসা করতে দিন। এইভাবে পরিস্থিতি আওতার বাইরে যেতে দিবেন না।

কলোনিবাসী :এইতো এইতো। (এ সময় কলোনির জনৈক ব্যক্তি কোর্টের কাগজ নিয়ে আসেন)

পলের লোক :আরে মশাই,এইসব কাগজপত্রের কোনো দাম নেই। আমরা এসব মানি না। আপনারা না পারলে আমাদের ছেড়ে দিন (ক্লাবের লোকজনকে উদ্দেশ্য করে)।

কলোনির বাসিন্দা ৩ :দেখুন,থ্রেট করলে কিন্তু আদালতে দেখা হবে। (কলোনিবাসী অবাক হয়ে বলতে থাকে,আপনি আইন মানেন না!আইন মানে না!)

আসলেই পল অ্যান্ড পলেরা কোনো আইন মানে না। কারণ যারা আইন রচনা করেন তারা পলদের টাকায় চলেন। ফলে পলরা যদি বেজার হন তাহলে সে দেশের সরকার বড়োই বেকায়দায় পড়বেন। তাইতো পলের সামান্য ছা-পোনাও আইন মানে না;জোর করে কলোনির বাসিন্দাদের কাছ থেকে কোর্টের আদেশপত্র ছিঁড়ে ফেলে বলেন,এইসব কাগজপত্রের কোনো দাম নেই। আমরা এসব মানি না। কলোনির সহজ মানুষ হয়তো তার কোর্টের আদেশপত্র ছিঁড়ে ফেলা ও আইন না মানার ঘোষণা শুনে হতবাক হন।কারণ যে আইন তাদেরকে নিজেদের মাতৃভূমি,শৈশব থেকে শুরু করে সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে,এরা সেই আইনই মানে না; এটা হতে পারে না!কলোনির এ মানুষগুলো নিজেদের পীড়াদায়ক স্মৃতির সঙ্গে লড়াই করতে করতে হয়তো ভুলেই গিয়েছেন,সময় বদলেছে;সময়ের পরিক্রমায় মানুষও। তা না হলে বাড়ি ভাঙা নিয়ে কথা বলতে গেলে কলোনির ক্লাবের সদস্যদের কাছেই শুনতে হঅসভ্য, জানোয়ার, অশালীন, অসামাজিক!

চলচ্চিত্রের শেষে দেখা যায়, পল অ্যান্ড পল গ্রুপের বুলডোজার দিয়ে কলোনির বাড়িগুলো রাতের আঁধারে ভেঙে দিতে। তাদের বাড়ি ভেঙে দেওয়ার আগে (এক ঘণ্টা ২৩ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে) পল অ্যান্ড পল গ্রুপের মালিক পলকে দেখানো হয়। যিনি স্বপ্ন দেখেন ভারতে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের উন্নত করার! তিনি ভালোবাসেন নদী, কবিতা। তার পৈত্রিক নিবাস বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ। তার মানে পল নিজেও একসময় শরণার্থী হয়ে ভারতে গিয়েছেন। তিনিও কলোনির বাসিন্দাদের মতোই একজন। কিন্তু পরিস্থিতি আজ ভিন্ন। পল এখন শাসক আর কলোনির বাসিন্দা, স্বজাতি কিংবা স্বধর্মীরা তার শোষিত।

আবার চলচ্চিত্রে অনেকটা সময় পাড়ার পাঁচ বেকার যুবককে রাস্তার ধারে বসে থাকতে দেখা যায়। যারা রিহার্সেলে আসা পাড়ার মেয়েদের গান শোনা এবং রাস্তায় বিরক্ত করার জন্য একই সঙ্গে গলাগলি করে বসে থাকে। কিন্তু ৪০ বছর কিংবা তারও কিছু আগে-পিছে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার কারণে একজন আরেকজনকে ‘রিফিউজি’ বলে গালি দেয়। অথচ তারা সবাই একই কলোনির ছেলে! সবার পরিবারই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটে চলে। কিন্তু তারা কেউই পল গ্রুপের বাড়ি ভাঙা ঠেকাতে যায় না। আবার অনন্যার চুলের বিনুনি যে দুই জন চুরি করে, সারাদিন-রাত এখানে-সেখানে পইপই করে বিক্রির জন্য ঘুরে বেড়ায়, তারাও বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থী পরিবারেরই সদস্য।

অন্যদিকে বয়সের কাছে হার মানা, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা কলোনির জনৈক দোকানদারও এই কলোনির লোকজনের কাছে বেশি দামে জিনিস বিক্রি করেন, এমনকি তার সঙ্গে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে গল্প করা জনৈক ব্যক্তির কাছেও। তার মানে অনুপ্রভা কিংবা মিনতি ভারতে যাওয়ার আগে তাদের যেসব আত্মীয়রা সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদেরই সন্তানরা মিনতির সন্তানকে রিফিউজি বলে! এরাই একজন আরেকজনকে শোষণ করে, এদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ জীবনে সফল হওয়ার আশায় কারো মাথার যত্নের বিনুনি চুরি করে বিক্রি করে। চিত্রা নদীর পারের ৩১ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে দেখানো হয়, উকিল শশীকান্ত কোনো এক উচ্চবর্গের হিন্দু বাবুর বাড়ি গেলে তাকে সন্দেশ খেতে দেওয়া হয়। শশীকান্ত যখন বলেন, আবার এগুলো কেনো? তখন সেই বাবু তাকে বলেন

আরে খাও খাও। সন্দেশটা এখনো ভালোই বানাচ্ছে হরিপদ। আমার তো আবার ডায়বেটিস। বামন, কায়েথ (কায়েস্থ) আর থাকবে না। কিছু ধোপা, নাপিত আর গানের মাস্টার রেখে দেবে। আর বাকি সব ওপার। ও হ্যাঁ, আর কিছু মিষ্টির কারিগর রেখে দেবে। এই যেমন ধর হরিপদ, কালিপদ।

বাবুর এ যুক্তিকে হেসে সমর্থনও দেন শশীকান্ত। একসময় এ বক্তব্যের প্রমাণও দেন নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল। ৪৪ মিনিট ৫০ সেকেন্ড থেকে ৪৬ মিনিট পাঁচ সেকেন্ড পর্যন্ত পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় নড়াইলে থেকে যাওয়া মিষ্টির কারিগর কালিপদ, মুচি কেষ্ট দা ও নরসুন্দর লক্ষণের সঙ্গে। যারা দেশভাগের সময় থেকে পাকিস্তান শাসন পর্যন্ত বহাল তবিয়তেই আছেন! নেই শুধু সেই বাবুরা। কিন্তু যে বাবুরা একসময় একটু নিরাপত্তার আশায় ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো তারাও যে পরম আনন্দে নেই, সেটা স্থানীয় সংবাদ-এ ভালোভাবেই বোঝা যায়। কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হলো, এসব মানুষের ভালো না থাকার কারণও কি এরা নিজেরাই? যারা ও দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন কিংবা সেখানকার শাসকদের এ মানুষদের ভালো না থাকা, শোষিত হওয়ার পিছনে কোনো দায় নেই? কিন্তু তা স্থানীয় সংবাদ-এ একেবারেই অনুপস্থিত। চলচ্চিত্রে যে পলকে সর্বোচ্চ শাসক, নিপীড়নকারী, দেশের আইন অবজ্ঞাকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে তার পিছনে যে সে দেশের কোনো কাকপক্ষীর সমপরিমাণও সমর্থন আছে, সেটা বেমালুম চেপে যান নির্মাতারা।

যা ঘটে তার সবকিছুই কি অনর্থক?

চিত্রা নদীর পারের চার মিনিট ৫৮ সেকেন্ডে বোন মিনতিকে উদ্দেশ্য করে বিদ্যুৎ বলে,‘জানিস সালমারা কেচিকে বলে না কাঁইচি।’ এর বিপরীতে সালমারাও আবার মিনতিদের কিছু শব্দের ব্যবহার নিয়ে হাসিঠাট্টা করে। চলচ্চিত্রে বড়ো হওয়ার পর এক ঘণ্টা ৩৪ মিনিটে সে কথা স্বীকারও করেন সালমা। তিনি মিনতিকে বলেন,‘জানিস, ছোটোবেলা তোকে আর বিদ্যুতকে আমি আর নাজমা বু আড়ালে খুব খ্যাপাতাম। মিনতি সেটার কারণ জানতে চাইলে সালমা বলেন,‘তোরা কাঁইচিকে কেচি বলতিস। আরো কী সব অদ্ভুত! না, থাক।’ মিনতি যখন আরো জানতে চান,তখন সালমা তাকে বলেন,শুনলে হাসবি না তো? আমরা মনে করতাম কালো পিঁপড়াগুলো ভালো। ওগুলো কামড়ায় না, তাই মুসলমান। আর লাল পিঁপড়াগুলো হিন্দু, ওগুলো কামড়ায় তো। আসলে সমাজে কালো-লাল পিঁপড়ার মতো এ রকম নানাধরনের কোড চালু রয়েছে। যেগুলো একজন আরেকজনকে চিহ্নিত করতে সহায়তা করে; যার মধ্য দিয়ে নানাধরনের অর্থ তৈরি হয়। দৃশ্যত এসব কোড সরাসরি কোনো অর্থ তৈরি করে না, কিন্তু শব্দের অর্থ তৈরিতে সহায়তা করে। এসব কোডের কারণে একই বাক্যের অর্থ অবস্থা ভেদে ভিন্ন হতে পারে। পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতিতে নানাধরনের চর্চার মধ্য দিয়ে এসব কোডের ধারণা তৈরি হয়। ব্যক্তির বেড়ে ওঠা এবং সৃষ্ট বিভিন্ন পরিস্থিতিতেও ভিন্ন ভিন্ন কোড সিস্টেম তৈরি হতে পারে। এসব কোড বিভিন্ন বিধি-নিয়মের সমাহার যা কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তার ইঙ্গিত দেয়। আবার কখনো কখনো এসব কোডই বিশৃঙ্খলা, দ্বন্দ্ব বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে ধর্মের জায়গা থেকে ভাবলে, একেক ধর্মের অনুসারীরা একেক রীতিনীতি মেনে চলেন। কোনো মুসলমান হয়তো কোনো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে খেতে ইতস্তত বোধ করেন। আবার কোনো সনাতন ধর্মাবলম্বীর বাড়িতে কোনো মুসলমান খেলে তারা হয়তো তাদের থালা-বাসন নিজ হাতে স্পর্শই করেন না। তাই বলে সেটা কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা নয়। এটা হলো একধরনের ‘ধর্মীয়’ আচারবিচার। কিন্তু যখন কেউ সেই আচারবিচার নিয়ে একজন অন্যজনকে অবজ্ঞা কিংবা অশ্লীল ভাষায় কথা বলেন, তখন সেটা সাম্প্রদায়িকতার দিকে পা বাড়ায়। চিত্রা নদীর পারের ১৯ মিনিট দুই সেকেন্ডে বিদ্যুৎ খেলার সঙ্গীদের সঙ্গে কবরের পাশে প্রস্রাব করায়, জনৈক টুপি পরিহিত ব্যক্তি তার কান টেনে ধরে বাবার নাম জানতে চান। বিদ্যুৎ যখন তার বাবার নাম উকিল শশীকান্ত সেনগুপ্ত বলে, তখন ওই ব্যক্তি বলেন,ও মালায়ন’ (মালাউন)। আপাত মালাউন শব্দটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সমার্থক হলেও সামাজিক কোডের কারণে এর অর্থ কিন্তু আর কেবল ধর্মে সীমাবদ্ধ থাকে না। ফলে যে পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের কান টেনে মালাউন বলা হয়, তা ভিন্ন অর্থ সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে মালাউন-এর আভিধানিক অর্থটা দেখা যেতে পারে। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে মালাউন-এর অর্থ দেওয়া আছেলানতপ্রাপ্ত, অভিশপ্ত, বিতাড়িত, কাফের, শয়তান, মুসলমান কর্তৃক ভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের লোককে দেওয়া গালিবিশেষ।

ফলে জনৈক ওই ব্যক্তির কথার অর্থ দাঁড়ায়, মালাউন হওয়ার কারণেই বিদ্যুৎ কবরস্থানে প্রস্রাব করেছে! অথচ বিদ্যুতের সঙ্গে যে মুসলমান শিশুরা কবরস্থানে প্রস্রাব করেছে, তাদের নিয়ে তিনি কিছুই বলেননি। তবে এ কথাও ঠিক যে, অনেক সময় সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে মুসলিমরা হিন্দুদের সম্বোধনেও ‘মালাউন’ শব্দটি ব্যবহার  করে থাকে; পরিস্থিতি ভেদে তখন হয়তো সমস্যা হয় না। কোন পরিস্থিতিতে কোন শব্দের ব্যবহার হচ্ছে সেটি বোঝা জরুরি। আগেই বলেছি, কোনো রীতি বা শব্দের ব্যবহার কখনো কখনো আর আচার থাকে না, সাম্প্রদায়িকতায় মোড় নেয়। ছোটো থেকে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চর্চা পরিবার, সমাজের নানা ক্ষেত্রে বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডের উৎপত্তির কারণ হিসেবে কাজ করে।

স্থানীয় সংবাদ-এর ৫৭ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে অতিন ও দীপঙ্করের কথোপকথন আবার একটু ভিন্ন ধরনের।

অতিন : দীপঙ্কর দা, মৌসুমি তো এক মেয়ের নাম।

দীপঙ্কর : হ্যাঁ, আমাদের ছেলেবেলায় ওই নামটা খুব পপুলার ছিলো।

অতিন : আমাদের পাড়ায় কিন্তু কোনো মৌসুমি নেই। অথচ ওই ডাক্তারদের বাড়ির ওই বোয়াখে ছেলেগুলো আমাকে দেখলেই বলে শুধু মৌসুমির পাগল।

দীপঙ্কর : ঋতু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে হয়তো। কোডটা নোট করতে হবে।

অতিন : ওরা নাকি মৌসুমি নামে চিঠি দেয়। আমি বললাম, মৌসুমি কে? বললো, হাওয়া।

এখানে মৌসুমি বলার সঙ্গে সঙ্গে অতিন বুঝতে পারেন না পাড়ার ওই ছেলেগুলো কার দিকে ইঙ্গিত করে কথা বলছে। কারণ এটা তখনো কেবল ওই ছেলেগুলোর মধ্যেই ব্যবহার করা কোনো শব্দ। হতে পারে তারা মৌসুমি বা হাওয়া বলে পাড়ায় গানের চর্চা করতে আসা মেয়েগুলোকেই সম্বোধন করে। যারা তাদের কলোনিতে মৌসুমি হাওয়ার মতোই, স্থায়ী নয়। মৌসুমি বায়ুর যেমন কোনো ঠিকানা নেই, ঠিক তেমনই এ মেয়েগুলোরও নেই। তাদের পরিবারও দেশভাগ কিংবা অন্য সময়ে বাংলাদেশ থেকে সেখানে আশ্রয় নেওয়ার ৫০ বছর অতিবাহিত হলেও আজও সেখানে মৌসুমি থেকে স্থায়ী হতে পারেনি। সেজন্যই হয়তো এ মেয়েদের রাস্তায় নানাভাবে বিরক্ত কিংবা নানাধরনের অঙ্গভঙ্গি করা যায়। কারণে-অকারণে সকাল থেকে রাত অবধি রাস্তার ধারে দল বেঁধে বসে থেকে তাদের চলাচলে নজর রাখা যায়।

পাড়ায় যে ক্লাবের লোকজন কলোনির গরিব মানুষগুলোর বাড়ি ধ্বংসে ইন্ধন জোগান, তারাও এদের কিছু করে না। কারণ এরা তো আর ‘ক্লাবের’ স্বার্থে আঘাত হানছে না! মাঝে মাঝে নিরীহ এ মেয়েদের অভিযোগ শুনে পথিমধ্যে নাড়ু দা’র মতো কিছু লোকেরা এগিয়ে আসেন বটে, কিন্তু তাদের সংঘবদ্ধে এ দাদারা ঠিক সুবিধা করতে পারেন না। ফলে ওই মেয়েদের অভিযোগ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। অন্যদিকে মৌসুমির কাছে চিঠি পাঠানোর কথা বলে অতিনকে অবজ্ঞাও করা হয়। কারণ ওই মেয়েদের সঙ্গে অতিন গান-কবিতার চর্চা করলেও ওদের কাউকে মনের কথা বলার সাহস তার নেই। কলোনির বাসিন্দা হলেও অতিন ওই মৌসুমিদের নাগাল কোনোদিনই পাবে না! তাইতো পাড়ার ওই ছেলেগুলো অতিনকে কখনো কখনো ভাই মজনু সম্বোধন করে লাইলি কিংবা ইউনিকের খোঁজ চেয়ে নিজেদের মধ্যে হাসিঠাট্টা করে। কিন্তু সেই লাইলি বা ইউনিকের কোনো কিছুই বোঝেন না অতিন। ফলে একান্ত হাসিঠাট্টার মাধ্যমে বলা এ শব্দগুলোও নতুন অর্থ উৎপাদনের মাধ্যমে কোডে পরিণত হয়। যা কোনো না কোনোভাবে ওই অতিন কিংবা মৌসুমিদের ওপর গিয়েই পড়ে।   

বন্ধু! তোমরা দিলেনাক দান

রাজ সরকার রেখেছেন মান

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে বিশ্বহিন্দু পরিষদ ও বজরং দলের কর্মীভর্তি একটি ট্রেন কে বা কারা থামিয়ে দেয় গোধরা স্টেশনের কাছে, রাতের অন্ধকারে। এই কর্মীরা অযোধ্যা যাচ্ছিলো রামমন্দির নির্মাণ কর্মসূচিতে যোগ দিতে। একটা গোটা কম্পার্টমেন্ট জ্বালিয়ে দেয়া হয়, জীবন্ত দগ্ধ হয় ৫৮জন মানুষ। প্রকৃত সত্যটা কেউই জানে না, এই নির্মম হত্যাকান্ডের জন্য কে দায়ী? কিন্তু গোধরার ঘটনার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংগঠিত গণহত্যা। কমপক্ষে ২০০০ মুসলমানকে হত্যা করা হয়, উদ্বাস্তু হয় অন্তত ৫০ হাজার। নারীদের প্রকাশ্য রাস্তায় গণধর্ষণ করা হয়। শিশুদের সামনে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মা-বাবাকে। অন্তঃসত্ত্বা নারীর পেট চিরে ফেলা হয়।

২০০২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের গুজরাটে সংঘটিত হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কথা এভাবেই বর্ণনা করেন ভারতের প্রখ্যাত মানবাধিকারকর্মী ও লেখক অরুন্ধতী রায়। অরুন্ধতী আরো বর্ণনা করেন, ওই দাঙ্গার পিছনে কীভাবে সরাসরি ইন্ধন দিয়েছিলেন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় মানুষ সেই সব মানুষদের ভুলে যায়, যারা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে (আসলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারা কি আদৌ ভুলতে পারেন?)। আর সেটা যদি না-ই হয়, তাহলে নরেন্দ্র মোদি কীভাবে ক্ষমতার মসনদে বসেন!

আসলে মোদির মতো রাজনীতিবিদ কিংবা নিরীহ মানুষগুলোর রক্ত চুষে বড়ো হওয়া পলের মতো পেটিবুর্জোয়াদের দ্বারা সবই সম্ভব। কারণ তারা মুহূর্তের মধ্যে রঙ বদলান। স্থানীয় সংবাদ-এ মি. পল একদিকে রাতের আঁধারে সাধারণ মানুষের ঘর ভেঙে যেমন নিঃস্ব করেন, তেমনই প্রয়োজন পড়লে অতিনের ভাইয়ের মতো যে কাউকে নিখোঁজ বানান। আবার সকাল হলে অতিনের মতো যুবকদের চাকরি দেওয়ার আশ্বাসও দেন। সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা সংস্কৃতির জন্য পলরা যে কতো নিবেদিত সেটা একের পর এক বিলাসবহুল ভবন বানিয়ে, কবিতার চর্চা করে প্রমাণ করারও চেষ্টা করেন। কখনো কখনো কোনো রাতে হত্যার খেলায় মেতে ওঠেন, আবার কখনো অসাম্প্রদায়িকতা বোঝানোর জন্য রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যার আয়োজন করেন। প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে প্রতিবেশীকে উসকে দিয়ে এরাই আবার এগিয়ে আসেন ভ্রাতৃত্ববোধের আহ্বান নিয়ে!

ফলে দেশহীন বাস্তুহারা এ মানুষগুলোর সঙ্গে তাদের কখনোই ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি হয় না। প্রকৃতপক্ষে তৈরি করতে দেওয়া হয় না। তারা শুধু ৪০ বছর নয়, কয়েকশো বছর পেরিয়ে গেলেও সেই শরণার্থীই থেকে যায়। যুগে যুগে তারা সারা পৃথিবীতে উদ্বাস্তু হয়েই থাকে।

 

লেখক : ইব্রাহীম খলিল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি অনলাইন সংবাদপত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।

[email protected]

তথ্যসূত্র

১. মাহ্মুদ, এ কে এম গিয়াস উদ্দিন;মহাত্মা গান্ধীর শান্তির জন্য পদযাত্রা;ভারত বিচিত্রা; সম্পাদনা : নান্টু রায়; ভারতীয় হাই কমিশন, বর্ষ ৩৭, অক্টোবর ২০১০, পৃ. ৭।

2. http://www.bbc.com/bengali/news/2014/06/140617_mh_mirpur_bihari_camp_clashes; retrieved on 10.04.2016

3. http://www.bbc.com/bengali/news/2010/03/100309_sarohingya; retrieved on 10.04.2016

4. http://www.bbc.com/bengali/news/2016/02/160218_bd_rohingya_myanmar; retrieved on 17.04.2016

5. Berger, Asa (1991: 23); Media analysis Techniques; sage publication, Nwe Delhi.

6. http://istishon.com/?q=node%2F14744#sthash.tXtsUb6l.Dg2fSLxo.dpbs; retrieved on 03.05.2016

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন