আইয়ুব আল আমিন
প্রকাশিত ২৫ আগস্ট ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
কী করছি আমরা
আইয়ুব আল আমিন

এই ছবিটি প্রম্পট ব্যবহার করে চ্যাটজিপিটি দিয়ে তৈরি করা
৯০ দশকের শুরুর কথা। আমার বয়স তখন সাত কি আট। ছোটো চাচা আমাদেরকে সিনেমা দেখতে নিয়ে যাবেন। তখনো বুঝি না কিছু, সিনেমা কী? আমাকে আর ছোটো বোনকে চাচা নিয়ে গেলেন সিনেমা দেখাতে। দেখলাম, কিন্তু বুঝলাম না কিছুই। এখন আর বিশেষ কিছুই মনে নেই, কী সিনেমা ছিলো সেটা। শুধু মনে আছে সিনেমার শেষ দৃশ্যে ছিলো মুষলধারে বৃষ্টি, তারপর সিনেমা শেষ। চাচাকে বললাম, আমরা এখন বাড়ি যাবো কীভাবে? চাচা বললেন কেনো? আমি বললাম, বৃষ্টি হচ্ছে যে। চাচা হাসলেন। বাইরে এসে দেখি ঝকঝকে রোদ, বৃষ্টি নেই! কিছু না বুঝলেও, এক বুক অবাক নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। সেই অবাক আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো অনেক বছর। তারপর থেকে সিনেমা দেখতে যাওয়া মানেই ছিলো এক গভীর উদ্দীপনার বিষয়। সিনেমা দেখতে যাওয়া, সিনেমা দেখা, দেখে বাড়ি ফেরা; এরপর কয়েক দিন সেই সিনেমার রেশ মনের মধ্যে ঘুরতেই থাকতো। বারবারই মনে পড়তো সেই সিনেমার এক একটা দৃশ্যের কথা। সিনেমার নায়িকাকে তো নিজের নায়িকা-ই ভাবতাম। আর গানগুলো ফিরতো সবার মুখে মুখে।
সেই সময় পাবলিসিটি হতো ব্যান্ড-পার্টিসহ মাইকিংয়ের মাধ্যমে, যা শুনে সিনেমা না দেখে উপায় ছিলো না। স্কুল পালানো ছিলো একটা নৈমিত্তিক ব্যাপার, আর এর প্রধান উদ্দেশ্য মূলত সিনেমা দেখাই। বিভিন্ন বয়স, নানা পেশা আর দূর-দূরান্তের মানুষে মানুষে গম গম করতো সিনেমাহলগুলো।
সেসব কথা এখন শুধুই ইতিহাস। স্কুল পালিয়ে দূরের কথা, এখনকার ছেলে-মেয়েদের জোর করেও আর সিনেমাহলে নিয়ে যাওয়া যায় না। সেসব নিয়ে অবশ্য বিস্তর আলোচনা ইতোমধ্যে হয়েছে, হচ্ছে। সেসব বলতেও আর ভালো লাগে না। তবে আক্ষেপ হয়। একটা শিল্প এভাবে ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো এতো তাড়াতাড়ি! কীভাবে? এতো বড়ো একটা শিল্পমাধ্যম, এতো সম্ভাবনাময়, এতো স্বপ্নীল, সারা দুনিয়াকে যেটা প্রতিনিয়ত অবাক করেই যাচ্ছে; আর এদিকে আমাদের তল্পি গোছানো সারা। মনে হয়, সময়ের সঙ্গে আমাদের সিনেমা এগোয়নি, নয়তো আমরাই সময় টপকে অনেক দূর চলে গেছি। অথবা পুরো ব্যাপারটা এর উল্টো।
শিল্প মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। জীবন যেমন প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল ঠিক তেমনই শিল্পও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিবর্তন সামাজিক অবস্থার ওপরও নির্ভর করে। সেই হিসেবে আমাদের সিনেমা কিন্তু একেবারেই নির্দোষ।
প্রজ্ঞা আর গড়িমা ছাড়া কোনো শিল্পই হয় না। আর জোর করে যদি কেউ সেটাকে শিল্প বলেও, তবে তা শেষ পর্যন্ত ধোপে টিকে না; হারিয়ে যায় কালের গহ্বরে। আমাদের সংস্কৃতি বিনষ্ট হতে শুরু করেছে ঠিক তখন থেকে, যখন আমরা আমাদের অস্তিত্বকে ভুলতে শিখেছি। নানা উপনিবেশ শিখিয়েছে বিদেশি ধর্ম-সংস্কৃতি; সেটা ঘটেছে হাজার বছর ধরে। ফলে নিজের শেকড়ের রঙ কী আমরা জানি না; জানি না পরদেশি সেই আচার-অনাচারের ইতিবৃত্তও। ফলে আমরা পারছি না নিজের খুতি থেকে কিছু বের করতে কিংবা অন্যের শেখানো বুলি থেকে সৃজনশীল কিছু আওড়াতে। ফলে যা হওয়ার হয়েছেও তাই।
এতো স্মার্ট আমরা এস এস সি পাস করে নিজের নামের ইংরেজি অনুবাদ করতে পারি না! তাহলে আমরা কী দেখি ওইসব ইংরেজি সিনেমায়। কীভাবে, কীসের জন্য এতো বুদ হই জাস্টিন বিবার, শাকিরার গানে! আমি ঠিক বুঝি না।
টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। কমবেশি সবার বাড়িতেই এখন টেলিভিশন আছে। টেলিভিশনে যেসব নাটক হয় তার কমবেশি আমরা দেখি। কিন্তু কয়জন কয়টা নাটকের নাম মনে রাখে বা মনে রাখা যায়? আর আমার যে বয়সে নাটক দেখার শুরু, সেসময়ের এক একটা নাটক তো আজকেও সুখস্মৃতি। বাকের ভাইকে তো আমি এখনো ভুলতে পারিনি। ‘‘আজ রবিবার’-এর বড়ো চাচা কিংবা ‘‘রূপনগর’’-এর শামীমকে কি আমরা ভুলতে পেরেছি? এখন অমন কোনো চরিত্রের কথা কি আমরা বলতে পারবো?
‘শুভেচ্ছা’, ‘‘ছায়াছন্দ’, ‘‘ইত্যাদি’র মতো অনুষ্ঠানগুলো নিয়ে মানুষের মধ্যে যে পাগলামি ছিলো, তা কি আর আছে? এখন সিনেমা, নাটক বা অ্যালবামে যেসব গান হয়, সেগুলো কয়জন শোনে? আর শুনলেও তা মস্তিষ্কে কতোক্ষণ স্থায়ী হয়। দুর্বলতাটা কোথায়? প্রাতিষ্ঠানিক, লোকবল নাকি মস্তিষ্কে? ধরে নিলাম, তখন আমরা যারা শ্রোতা, আমাদের মস্তিষ্ক বিকৃত ছিলো। না হলে, ‘‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘‘এই পৃথিবীর পরে’, ‘পাগল মন মন রে’’ এই গানগুলো আমরা ভুলিনি কেনো?
কোনো শিল্প সার্থক হয়ে ওঠে তার শিল্পীর দক্ষতা ও সততায়; সততা বিনষ্ট হলে মুখ থুবড়ে পড়ে সেই শিল্প। এটা জেনেও নানাবিধ অসততা আর অদক্ষতায় পরিপূর্ণ আমাদের শিল্প। নকলবাজি আগেও হতো। পৃথিবী এগিয়েছে, কিন্তু এখন নকল করলেও তো সেই আগের পদ্ধতিতেই করছি আমরা। ফলে সেটাতেও মার খাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। হলিউড-বলিউড-টলিউডও নকল করে। কিন্তু তারা সফল হয়, আমরা হই না। নকলের প্রতিযোগিতায়ও পাল্লা দিতে পারছি না আমরা। আমাদের দক্ষতা তবে কীসে? এভাবে চলতে চলতে কি আমরা শূন্যের দিকে যাচ্ছি ক্রমাগত?
আমার ইতিহাস ঐতিহ্যের ভাণ্ডার কি বুড়িয়ে গেছে; সেখানে কি কিছুই নেই আর? একটা সিনেমা বানালে সেটা নকল, একটা গান করলে সুর নকল, ছবি আঁকায় নকল, কবিতা লেখায় নকল, গল্প-উপন্যাস নকল! এমন হওয়ার কারণ আসলে কী? একটা সমাজের সব ক্ষেত্রেই আমরা যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, সেখানে থেকে ফেরার আদৌ কি কোনো পথ আমাদের সামনে আছে?
‘অশ্লীল-অশ্লীল’’ করে আমরা পর্নোগ্রাফির গর্তে ঢুকে গেছি। অশ্লীলতা তো আগে শুধু সিনেমা-নাটকে ছিলো। এখন আমরা সেখান থেকে বের হয়ে তা শুরু করেছি নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে। শুধু পরিধেয় বস্তু খুলে ফেলা, মুখে খিস্তিখেউড় করাকেই অশ্লীলতা বলে না। অন্যের পরিধেয় বস্ত্র জোর করে টান দিয়ে খুলে ফেলা, অনাহারির মুখের খাবারে থাবা বসানোও অশ্লীলতা। আবার নিজের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার নামও কিন্তু অশ্লীলতা।
সিনেমা, নাটক, গান, যাত্রাপালা সবই মোটা দাগে বিনোদন মাধ্যম। আমরা না পারছি এগুলো দিয়ে মানুষকে বিনোদিত করতে, না পারছি কোনো শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরতে। হয়তো না পারাটাই স্বাভাবিক। বরং এখন থেকে কোনো কিছু আশা করাটাই হবে চরম বোকামি। কারণ এইসব বিষয়ের যারা কর্ণধার তারাও গণ্ড অশিক্ষিত, আর এই বিষয়গুলো যাদেরকে উপলব্ধি করানোর জন্য এতো কিছু, তারাও এর সমতুল্যই।
শিক্ষক মূর্খ, ছাত্র মূর্খ, বাবা মূর্খ, মা মূর্খ, কর্মক্ষেত্রগুলোর সবাই মূর্খ। তাহলে আর পায় কী? আমরা সবাই একসঙ্গে ভুলে গেছি— শিক্ষাটা আসলে কী? আর শিক্ষার সংজ্ঞা-ই যদি না থাকে, তাহলে শিল্প নিয়ে লাফঝাঁপ করা আর বানরের খেলা তো সমঅর্থপূর্ণ।
লেখক : আইয়ুব আল আমিন, দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় চিত্রশিল্পী হিসেবে কর্মরত। পাশাপাশি তিনি নিয়মিত প্রচ্ছদের কাজ করেন।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন