ফারুক আলম
প্রকাশিত ২৮ জুলাই ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সংবিধিবদ্ধ যৌনজীবন ও কালপুরুষ-এর আলোছায়া
ফারুক আলম

ঝামু সুগন্ধ নিবেদিত কালপুরুষ, কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চলচ্চিত্র। অভিনয়ে মিঠুন চক্রবর্তী, রাহুল বোস, সামিরা রেড্ডি, লাবনি সরকার, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, সাগ্নিক চৌধুরী প্রমুখ। যুগল সুগন্ধ প্রোডাকশন্স প্রযোজিত কালপুরুষ-এর কাহিনি, চিত্রনাট্যও বুদ্ধদেবের। প্রথম দেখার পর থেকেই বার বার মনে হয়েছে, চলচ্চিত্রটি সংবেদনশীল দর্শকের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করতে পারে। প্রশ্ন তুলতে পারে সমাজ-সংসার নিয়ে; সংবিধিবদ্ধ যৌনজীবন নিয়ে। আর তা থেকেই আলোচনার সূত্রপাত।
২.
সমাজ জীবনের প্রতিবিম্বিত প্রতিরূপ শিল্পকর্মের দর্পণে যখন কালপুরুষ-এর আলোছায়া হয়ে প্রচলিত সংবিধিবদ্ধ যৌনব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও তাড়িত করে; শতভাগ প্রতিশ্রুত স্বামীর একগামীতাকে অস্বীকার করে; এমনকি নিজের আত্মজের কালো চোখে নিরিখ ধরা দুর্বল হাতের দো-নলা বন্দুকের ব্যারেলের সামনে পড়ে ঔরসদাতা জনকের অন্তর জুড়ে হাহাকার ওঠে—আহা! যদি সে অপরিচিত কেউ হতো, যদি আমার কোনো দোষ থাকতো—এতো কষ্ট পেতাম না। হায়! তার গুলি যদি সুনির্দিষ্ট তাক বজায় রাখতো, এতো দুঃখ পেতাম না। সমাজের প্রচলিত ও নির্ধারিত নিয়ামক এবং এ সম্পর্কিত ধারণাগুলি সাধারণ অর্থে সংজ্ঞাবিহীন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থহীন হয়ে থাকে। চরিত্রবান-লম্পট, সতী-পতিতা, সৎ-অসৎ, সত্য-অসত্য—এসব গভীর দ্যোতক শব্দসম্ভার রাতে দিনে স্থান, কাল, পাত্রভেদে পবিত্র ধর্ম গ্রন্থের অর্থ ও ব্যাখ্যার মতো পরিবর্তনশীল। অথচ এসব মহান ঐশী বাণী বা সৃষ্টিকর্তার নাম বা কার্যক্রমের রহস্যময়তাকে আঁকড়ে ধরেই আমাদেরকে বেঁচে থাকতে হয়। এই বেঁচে থাকার কতোটুকু জীবন আর কতোটুকু মৃত্যু, কতোটুকু সত্যিকারের বেঁচে থাকা তা নির্ণয় করতে অনেকেই খুঁজে ফেরে মানুষের জীবন। প্রভাত বেলায় কালপুরুষ-এর কাকের ডাক, সে অনুসন্ধানের আলোকবর্তিকাকে ডাকতে থাকে কা কা শব্দে।
৩.
নদীর পাড় ভেঙে পড়ার মতো সমাজের ভাঙনের শব্দ আমাদের কর্ণকুহরে প্রথিত হয় না বটে, তবে হৃদয় গভীরে অনুরণন সৃষ্টি করে। সমাজ অভ্যন্তরের সবকিছু বদল হয়, ভেঙে যায়—নিরন্তর ভাঙাগড়ার মধ্যে আমাদের বসবাস। আমার মধ্যেও আমি ভেঙে যাই, সৃষ্টি হই প্রতিদিন। তাহলে কী ভাঙতে চেয়েছে কালপুরুষ? সামাজিক প্রথা, নাকি প্রচলিত চিন্তা-কাঠামো, নাকি পুরুষতান্ত্রিকতার অসহায়ত্ব, নাকি সংবিধিবদ্ধ যৌনজীবন? সব সরল প্রশ্নের মধ্যে তার উত্তরের প্রতিধ্বনি, মনোযোগী দর্শক-শ্রোতাকে আকৃষ্ট করে।
কালপুরুষ-এর আবির্ভাব দৃশ্যে বৈদ্যুতিক তারের ইন্দ্রজালিক রহস্যময়তা যেনো নানা মুনির নানা মতের জটিল বুননে আটকে পড়া মানব প্রজাতি। সাধারণত যৌনজীবন ও নারীর অবস্থানকে সমাজ-সভ্যতার মাপকাঠি ধরা হয়। সমাজ ভেদে এর আচার-আচরণও আলাদা, গড়ে উঠেছে নানান সংস্কৃতি, চলছে সংস্কৃতির জটিল পথ চলা। যৌনতা উৎপাদনের ক্রিয়াকলাপ বলে, এ বিষয়ে আদি বা আদিম ধারণা মনুষ্য প্রজন্ম বৃদ্ধির অনুকূলে ক্রিয়াশীল। পক্ষান্তরে সমাজ পরিবর্তনের ধারায় মনুষ্য উদ্ভাবিত সভ্যতা অগ্রায়ণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ যেমন ক্ষমতা বলয়ের কব্জায় থাকে, তেমনই যৌনতার বিধিমালাও ক্ষমতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারা মন্দির যেমন বানায়, তেমনই তার সেবাদাসীও রাখে।
শিল্প কলকারখানা থেকে পতিতাপল্লি সবই তাদের সৃষ্টি—দাসী, বাঁদি, পত্নী, উপপত্নী, গোপন পত্নী—সেই আরব্য উপন্যাসের আমল থেকে কালপুরুষ-এর কাল পর্যন্ত। উৎপাদনের জন্য যৌনাচার, এটা আসক্তি বা মোহে মত্ত আসক্তি নয়; প্রাকৃতিক নিয়ম নয়, সাংস্কৃতিক আইন নয়, অন্য কিছু; যাতে টাকা আসে, ক্ষমতা থাকে, ভোগ-লিপ্সার বাড়বাড়ন্ত হয়। ফলে উৎপাদনের তাগিদ আর থাকে না—বিকৃতরুচি দিয়ে মানবসমাজকে দখল, নিষ্পেষিত করা; নিয়ম বলয় বা আইনের নামে অসভ্যতার ধারায় মানুষকে পরিচালিত করা মানুষের চিন্তা, শরীর, মনন, সৃষ্টি সবই গণ্ডিবদ্ধ করা হয়।‘কান্দে হাসন রাজার মন ময়নায় রে’—পিঞ্জরাবদ্ধ হয়ে প্রকৃতির সবকিছুই রাজা-প্রজা, শক্তিমান-শক্তিহীন, গাছপালা, নদীনালা প্রকৃতিপুঞ্জ সবই সোনার শিকলে বাঁধা পড়ে নিরন্তর কাঁদতে থাকে।
মানুষের চিন্তা, তার সৃষ্ট চিন্তা-কাঠামোতে বাঁধা পড়ে। মানুষের আইনে প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক আইনকে বেঁধে রাখাটাই সংস্কৃতি। মানুষ তার সংস্কৃতির সংস্কারে এমনভাবে আবদ্ধ ও আসক্ত হয়ে পড়ে, তার সেই দৈনন্দিন জীবনাচার ঠেকিয়ে রাখতে জীবন বাজি রেখে লড়াই করতে হয়। কিংবা সংস্কৃতির কুসংস্কারে বা সংস্কারে জীবন চলে যায়। যখন পকেটমারকে ধাওয়া করে ধরে সুমন্ত জানতে চায়, তার বউ তাকে খুব বেশি ভালোবাসে কি না? তখন ভালোবাসার প্রশ্নে নিজের অজান্তে হাত শিথিল হয়ে যায়, ছুটে যায় পকেটমার। ভালোবাসা বুঝি পকেট মারার মতো? এটা একটা খেলা। মানুষের পকেটের টাকার থলিতে তার অবস্থান! ভালোবাসা বজায় রাখতে টাকার থলি হাতড়ে বেড়ানো যেনো ভালোবাসার কর্মক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত।
৪.
কালপুরুষ পুঁজিবাদী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-বাস্তবতায় যৌনজীবনের সামাজিক শৃঙ্খলার শৃঙ্খল-চিত্র। চলচ্চিত্রটির পটভূমি, চিত্রায়ণ, শিল্পকর্ম, চরিত্রায়ণ, আলোছায়ার খেলা—সবকিছু খোন্তা দিয়ে খুঁচিয়ে তোলার মতো করে মানুষের অন্তরের ভিতরে থাকা সমাজ-বাস্তবতা ও চিন্তা-কাঠামোর অসাড়তার গেঁড়ে রাখা খুঁটিকে উপড়ানোর চেষ্টা করেছে। এখানে নারীরা খানিকটা স্বাধীন, কর্তৃত্বপরায়ণ। তিন নারী—পুতুল, আভা ও সুপ্রিয়া। পুতুল তার স্বামীকে ভালোবাসে। কিন্তু স্বামীর মন একটু ‘খেয়ালি’। তার (স্বামীর) ভালোবাসায় পুতুল তৃপ্ত নয়। তাই পুতুলের অতৃপ্ত অন্তর অনুসন্ধান করতে চায়, এর কারণ খুঁজে পেতে চায়। চিকিৎসক স্বামী অশ্বিনীর ভালোবাসায় সে ভাসতে চায়। নিজ হাতে খাবার তৈরি করে; চিরাচরিত বাঙালি বধূর মতো পুতুলও খাবার টেবিলে বসে স্বামীকে খাওয়ায়, নিজে খায় না, তাতেই তৃপ্ত হয়।
পুরনো ভালোবাসা ভুলে অশ্বিনী ভালোবেসেছে নতুন করে। পূর্বের প্রেমিকাকে সে আর চায় না। পুতুল এখন তার অর্ধাঙ্গিনী, তাকে বাদ দিয়ে সে তার জীবনকে কল্পনা করতে পারে না। তাকে নিয়ে সে স্বপ্নের দেশে যাবে। অশ্বিনী সামাজিক সংস্কার বোধসম্পন্ন মানুষ। যৌনাচারের সংবিধিবদ্ধ জীবন যাপনে অভ্যস্ত সে। কিন্তু তাতে তার শেষরক্ষা হয় না। একবার ভালোবাসলে যে সেই ভালোবাসায় মরে যেতে হয়, তা তার জানা ছিলো না। নগর ভালোবাসার আভা, চিত্রজগৎ ছাড়িয়ে এখন যাত্রার রঙ্গমঞ্চের নায়িকা। অশ্বিনী যতো জোরেই গ্রামের রাস্তায় গাড়ি চালাক না কেনো, আভার ডাকে তাকে থামতে হয়। যৌবনের প্রেম তাকে জাপটে ধরে। আভার বজ্র আলোয় পুড়ে ছাই হয়ে যায় তার সংসার। মায়ের চোখের জলে ছেলের অন্তরাত্মা বিদ্রোহ করে। দো-নলা বন্দুক হাতে নিয়ে আপন জনককে হত্যার পণ করে সে।
ছেলের হাতে কালো মারণাস্ত্র দেখে বিস্মিত অশ্বিনী তাকিয়ে থাকে। সবাই জানে এটা মারণাস্ত্র। ছোটো সুমন্তও জানে। সে সাইকেল চালিয়ে বাবার মটরগাড়ির সঙ্গে পাল্লা দেয়। কিন্তু আজ সে কী করলো! বাবাকে খুন করার জন্য গুলি করলো! গুলির শব্দে পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি খান খান হয়ে যায়। কিশোর মনে বাবার প্রতি এই ঘৃণা সমাজব্যবস্থার জঘন্য অসাড়তাকে তুলে ধরে। বিচার-বিশ্লেষণের অবকাশ কারও না থাকলেও কালপুরুষ-এর কালো ছায়া বিদ্যুৎবেগে সমস্ত মানব সভ্যতাকে বজ্রানলে ঝলসে দেয়; প্রশ্নবিদ্ধ করে। সমস্ত ভালোবাসায়, কষ্টে লালিত মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্ম কি পূর্বপুরুষদের হত্যার উদ্দেশ্যে? কাহিনির জটিল বুননে আমাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর নিজে নিজে, যে যার মতো করে খুঁজে নিতে হয়। আভা কী চেয়েছিলো? পুতুলের সংসারে ভাগ বসাতে? নাকি অশ্বিনীর প্রতি প্রতিশোধ নিতে? নাকি পুরনো প্রেমের পূর্বরাগে ভেসে-ভাসিয়ে অন্য কিছু সৃষ্টি করে, বিনোদন জগতের পথের মানুষ পথে পথে ঘুরে বেড়াতে?
৫.
তথাকথিত সভ্য সংস্কারের কালপুরুষ দর্শকদের মূল্যায়নে আভাকে নষ্টা-ভ্রষ্টাদের দলে ফেলতে হয়তো কসুর করবে না। আমার প্রশ্ন, সুপ্রিয়ার অবস্থান নিয়ে। সে কলকাতার স্কুলে পড়ায়, মন থাকে নিউইয়র্কে। বাংলায় বসে যার আমেরিকায় বিচরণ। লিখতেও পারে, সে লেখা লোকে পড়েও। সুমন্তের স্ত্রী সেজে সুপ্রিয়ার অন্যের সঙ্গে যৌন-যোগাযোগ, প্রেমিকের ঔরসে সন্তান ধারণ, আবার নির্দ্বিধায় সংসার যাপন। অন্যদিকে সুমন্তের সঙ্গে যৌনক্রিয়ায় অনাসক্তি। সুপ্রিয়া অবশ্য বলেছে, তার আর এ জীবন ভালো লাগে না। তার প্রেমিকের উদ্দেশ্য কী আমরা জানিনে। তবু ধরে নেওয়া যায়, সুপ্রিয়াকে শুধু সে দৈহিক কাজে ব্যবহার করবে, তাকে নিয়ে ঘর করলে অনেক আগেই হয়তো করতো।
আজকাল এ রকম কাকের বাসায় কোকিলের ডিম বিরল ঘটনার অন্তর্ভুক্ত নয়। এতে কারো কোনো ক্ষতি তো হচ্ছে না। সন্তান দুটি সুমন্তের পিতৃত্বে পরিতৃপ্ত। সুমন্তও বাৎসল্যে অকৃপণ। ‘নাক কামড়াই, কান কামড়াই, কামড়ে দিলাম মন ...’—সুমন্ত সবকিছু জেনে গৎবাঁধা জীবনের অসাড়তা অনুসন্ধানে পরিব্যাপ্ত। বাবার স্মৃতি সুমন্তকে তাড়িত করে। সে গ্রামে ঘুরতে যায়। যাত্রাদল তার চিন্তার মেঘদলকে সঞ্চালিত করে। শান্তনুর নিষ্পাপ মনে দোলা দেয় নির্মল বিনোদন। রক্তের সম্পর্কের বাইরে পরিবার গঠন—সবকিছু ছাপিয়ে আনন্দঘন পরিবেশ গড়ে ওঠে, যা আমাদেরকে আনন্দপূর্ণ অন্যরকম অনুভূতি দেয়।
৬.
মন্দিরতুল্য পবিত্রতায় গঠিত পরিবার নিয়ে মহাভারতীয় বিতর্ক হতে পারে। তবে সহজলভ্য এমন শোষণযন্ত্র সহজে এ রাষ্ট্রযন্ত্র হাতছাড়া করবে তা আশা করা যায় না। এমন চিন্তা প্লেটোর ভাবনায় থাকতে পারে, বার্নার্ড শ’র নাটকে থাকতে পারে; গোপনে গোপনে কোনো রমণী রমণ সঙ্গ নিতে পারে, কিন্তু সমাজ এসব মানবে না, রাষ্ট্র মানবে না। কারণ এতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে অস্তিত্বের ঝুঁকিতে পড়তে হয়। শোষণের এমন কার্যকরী হাতিয়ার নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে রাষ্ট্রযন্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়বে। তাইতো এতো আয়োজন, মানবসমাজের বড়ো পরিবার ধ্বংস করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে এখন।
পরশুরামের নিষ্ঠুরতার উদাহরণ না হয় নাই দিলাম। কুন্তির কাঙ্ক্ষা ও বিলাপ আমাদেরকে বিস্মিত না করে পারে কি? কুমারী কুন্তির গর্ভে কর্ণের জন্ম বলে লোকলজ্জায় সে তার পরিচয় গোপন রাখে। অথচ স্বেচ্ছায় সে তার পরিচয় দিতে গেলো কখন, যখন পঞ্চপাণ্ডব যুদ্ধে বিপন্ন। স্বেচ্ছায় পরমানন্দে যে সন্তান সে গর্ভে ধারণ করেছিলো, কিন্তু সমাজের সংবিধিবদ্ধ নিয়মে তার পরিচয় সে গোপন করে। অথচ সমাজ স্বীকৃত সন্তানদের সুরক্ষায় তার কাছে হাত পাততে সে কুণ্ঠা বোধ করেনি। রণাঙ্গনে সে তো নীরব থাকতে পারতো! কেনো সে নীরব থাকতে পারলো না? কালের এ প্রশ্ন মহাকালব্যাপী মানুষের অন্তরকে ব্যথিত করবে, মথিত করবে। কালপুরুষ-এর প্রত্যেকটা নারীচরিত্র আমাদের কুন্তিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। স্বস্থানে সবাই সঠিক। তাহলে কি দোষী শুধু অশ্বিনী আর সুমন্ত?
প্রসিদ্ধ সমস্ত চলচ্চিত্র, তা যাই হোক—পথের পাঁচালী, অপুর সংসার, দেবী কিংবা লালকুঠি নীল দরজা, তিতাস একটি নদীর নাম, সুবর্ণরেখা, পদ্মা নদীর মাঝিসহ অসংখ্য অপূর্ব সৃষ্টির প্রতিটি চরিত্র, তার যৌনজীবনে সমাজ-সংস্কার ও সংস্কার মুক্তির প্রচেষ্টায় পরিবার গঠন ও পরিবার জীবনের সুশৃঙ্খল বন্ধনের জীবন-গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সাড়া জাগানো চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বহুল আলোচিত আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় প্রেম, বিবাহ ও যৌনজীবন নিয়ে লিও তলস্তয়-এর ‘আন্না কারেনিনা’ (১৮৭৭) নিয়েও দুটি কথা বলতে হয়। রাশিয়ার অভিজাত পরিবারের কারেনিনা’র সুন্দরী বউ আন্না। সুদর্শন যুবক ভ্রনস্কি’র সঙ্গে তার প্রথাবিরোধী প্রণয় ও যৌনাচার। আন্না মুক্তি চাইলেও কারেনিনা সমাজে আত্মসম্মান বজায় রাখতে তাকে ডিভোর্স দেয়নি। আন্না ঘর ছেড়ে প্রেমিক ভ্রনস্কির সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে। ইতালি ঘুরে দেশে ফিরে সে ছেলে শেরিওজা’র জন্য কাতর হয়। এবার কারেনিনা তার উত্তরাধিকার হারানোর ভয়ে আন্নাকে ডিভোর্স দিতে চাইলেও, আন্না ছেলেকে কাছে পেতে সে পথ বন্ধ করে দেয়। ইতোমধ্যে প্রেমিকের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে আন্না। সমাজ-সংস্কার, স্নেহ-ভালোবাসা সবকিছু পরিত্যাগ করে শেষ পর্যন্ত আন্না আত্মহত্যা করে। একইভাবে ডলি ও আন্নার ভাই অবনস্কি’র দাম্পত্য জীবন খুবই সামান্য কারণে বিপর্যস্ত। আবার সহজ সরল আদর্শ ব্যক্তি লেভিন ও তার সর্বগুণে গুণান্বিত স্ত্রী কিটি, তাদের পরিবার সর্বময় সুখের হলেও ভালোবাসা ও সংশয় সেখানে সদা বিরাজমান। মানুষের ভিতরের যন্ত্রণা মানবজীবনকে দুর্বহ করে, যা আন্নার পরিণতিকে নিতান্তই স্বাভাবিক করে তুলেছে। সমাজ জীবনের গুঢ় রহস্য আমাদেরকে ক্লান্তিহীন জীবনের পথচলায় অবিচল সজাগ করে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, যার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নারীর ভিতরে অবস্থিত কঠিন-কঠোর পুরুষটির হাতে যেতে সময় লাগে না, তা কার্যক্ষেত্রে মারাত্মক ও জীবন হরণকারীও হতে পারে।
৭.
চলচ্চিত্রে সংসারের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের আলোছায়া সর্বদা, সর্বত্র। কালপুরুষ তারই এক টুকরা আলোকময় বিশ্লেষণ। যদিও সমাজের আঁধার এখানে জমাট বেঁধেছে, তার পরও সে আঁধারের জমাট কালো রঙ্গমঞ্চ মানবকুলকে নতুন করে মানব সভ্যতা নিয়ে ভাবতে শেখায়।
লেখক : ফারুক আলম, সাহিত্যিক ও ছড়াকার। একটি বেসরকারি কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। সম্প্রতি ‘গোলাপ-কাঁটা’ নামে তার একটি ছড়ার বই প্রকাশ হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন