নাজমুল রানা
প্রকাশিত ০৪ মার্চ ২০২৩ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সত্যজিতের অপুর খোঁজে কৌশিক
‘সে আর লালন একখানে রয়, তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে’
নাজমুল রানা

১৯৪৬ সালে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে জন্ম নেয় ফুটফুটে এক শিশু। বাবা-মা তার নাম রাখেন সুবীর ব্যানার্জি। এর ঠিক নয় বছর পর মুক্তি পায় সত্যজিতের পথের পাঁচালী (২৬ আগস্ট ১৯৫৫)। ভারতের চলচ্চিত্রিক ইতিহাসের অনবদ্য এক চলচ্চিত্র। পথের পাঁচালী শুরুর ২০ মিনিটের মাথায় পর্দায় ছেঁড়া কাঁথার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় একটি শিশুর মায়াবী চোখ। সেই চোখ দেখার মধ্য দিয়ে জন্ম হয় এক অভিনেতার। অপুরূপী সেই অভিনেতার নাম সুবীর ব্যানার্জি, যিনি World’s most celebrated child artist-দের একজন।
পথের পাঁচালীর অপুরূপী সুবীরকে খুঁজে পাওয়া নাকি খুব সহজ ছিলো না সত্যজিতের জন্য। অপুর জন্য পাঁচ-সাত বছরের একটি শিশুপুত্র চেয়ে তিনি পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলেন। বহু শিশু এসেছিলো বিজ্ঞাপন দেখে, ‘তার মধ্যে ছিলো আবার একটি মেয়ে(ও), যার বাপ-মা সবেমাত্র তাকে সেলুন থেকে চুল ছাঁটিয়ে (তখনও ঘাড়ে পাউডার লেগে আছে!) ছেলের পোষাক পরিয়ে নিয়ে’১ এসেছিলো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিলো না। এরই মধ্যে একদিন পাশের বাড়ির ছাদে একটি শিশুকে খেলতে দেখেন সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায়। শিশুটিকে দেখেই অপুর জন্য মনে ধরে বিজয়ার।
পরে স্ত্রীর কাছে শিশুটির বর্ণনা শুনে সত্যজিৎ আগ্রহ নিয়ে যান তার বাসায়। কথা বলেন শিশুটির বাবার সঙ্গে। কিন্তু নিজের ছেলে বলে কথা, সঙ্গে চলচ্চিত্রের ‘অনিশ্চিত’ ভবিষ্যৎ-তাই প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না সুবীরের বাবা। সত্যজিৎ নাকি এ সময় বলেছিলেন, সুবীরের ভাষায়, ‘আজ আপনার ছেলে ও আমাকে কেউ চেনে না, কিন্তু আমি এমন এক চলচ্চিত্র বানাবো যেটা বাংলা চলচ্চিত্র ধারায় পরিবর্তন আনবে। তখন আমাদের দু’জনকেই সবাই চিনবে।’২ সত্যজিতের এ কথা শুনে নাকি সুবীরের বাবা আশ্বস্ত হয়েছিলেন।
এর পরের ইতিহাস সবার জানা, এখনো সবাই জানে। কিন্তু জানে না কেবল অপুরূপী সেই সুবীর ব্যানার্জির কথা। কারণ পথের পাঁচালীর পর সুবীর আর কোনো চলচ্চিত্রেই অভিনয় করেননি। অপুর মধ্য দিয়ে যে অভিনেতার জন্ম হয়েছিলো, হরিহরের সপরিবারে কাশী যাত্রার মধ্য দিয়ে তার ‘মৃত্যু’ হয়। এর পর আর কেউ খোঁজ নেয়নি সুবীরের! এমনকি পথের পাঁচালীর ৫০ বছর পূর্তিতে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবেও আমন্ত্রণ করা হয়নি সুবীরকে।
সর্বশেষ পথের পাঁচালীর অপু অর্থাৎ সুবীর ব্যানার্জির খোঁজ পাই ২০১৪ সালে নির্মিত কৌশিক গাঙ্গুলীর অপুর পাঁচালীতে। কৌশিক তুলে আনলেন পরিচিত থেকে ‘অপরিচিত’ হয়ে যাওয়া অপুর জীবনকাহিনি। সুবীর আর পাঁচজন শিশু-অভিনেতার মতো নয়, সেজন্যই হয়তো সত্যজিৎ তার মধ্যে অপুকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি মাত্র নয় বছর বয়সেই পথের পাঁচালীতে অভিনয় প্রতিভার বিস্ময়কর স্বাক্ষর রাখেন।
পথের পাঁচালী : এক নতুন ইতিহাস ও নতুন অধ্যায়ের নাম
‘জীবন এমন হওয়া চাই যেন মৃত্যুর মুহূর্তে বলতে পারা যায় যে, না, আমার জীবন বৃথা যায়নি।’৩ যে কয়জন বাঙালি এ কথা কোনো সংশয় ছাড়াই বলতে পারেন, সত্যজিৎ রায় তাদেরই একজন। এ কথায় কারো কোনো আপত্তি না থাকারই কথা, তবে একটু অন্যভাবে ভাবার জায়গাও হয়তো আছে। মানুষ, মানুষের মধ্যে ‘মানুষ’ হিসেবে বেঁচে থাকে তার কর্মের মধ্য দিয়ে। যদি ধরে নিই সত্যজিৎ ছাড়া পথের পাঁচালী সৃষ্টি হতো না, তবে এমনটাও বলা যায় পথের পাঁচালী ছাড়া সত্যজিৎ আজকের সত্যজিৎ হতেন না। অনেক সময় সৃষ্টি তার স্রষ্টাকে ছাড়িয়ে যায়, সৃষ্টির হাত ধরেই অমর হয়ে থাকেন তার স্রষ্টা।
সত্যজিৎ বিজ্ঞাপনের কাজ করলেও পথের পাঁচালীর আগে চলচ্চিত্রের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিলো না বললেই চলে। চলচ্চিত্র অঙ্গনে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ‘অপরিচিত’। সেই ‘আনাড়ি ও অপরিচিত’ মানুষটি প্রথম চলচ্চিত্রেই করলেন বাজিমাত, পরিচিত হয়ে উঠলেন বিশ্ব দরবারে! পথের পাঁচালীর পর সত্যজিৎ ২৩টি কাহিনিচিত্র নির্মাণ করেছেন, যার একটিও পথের পাঁচালীর মতো এতো সাড়া ফেলতে পারেনি। তাইতো কিছু না ভেবেই বলা যায়, পথের পাঁচালীর হাত ধরেই সত্যজিৎ অমর হয়ে রইলেন।
বলা হয়, সত্যজিৎ তার পথের পাঁচালী নির্মাণ করেছেন ‘নব্য-বাস্তববাদ’ ধারায়। তিনি তার চলচ্চিত্রে অপেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রী দিয়ে অভিনয় করিয়েছেন, স্টুডিওর বাইরে গিয়ে শুট করেছেন; সেট নির্মাণ করেননি বললেই চলে। তার পরও অভিযোগ আছে, ‘সত্যজিতের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেরই বিষয়বস্তু বহুদূরে ফেলে আসা অতীত, কিন্তু সেখানেও বাস্তবতার দেখা পাওয়া যায়, যা অনেকটা চলচ্চিত্রের কলারূপের নান্দনিক প্রয়োগের ফলে সহনীয় বাস্তব হয়েই রয়ে যায়।’৪ সে যাই হোক, পথের পাঁচালী যে গোটা ভারতীয় চলচ্চিত্র ধারায় পরিবর্তন এনেছিলো তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পথের পাঁচালীর মধ্য দিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস দুটো ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়—একটি পথের পাঁচালীর পূর্বের চলচ্চিত্র, অন্যটি পথের পাঁচালীর পরবর্তী চলচ্চিত্র। তাই পথের পাঁচালীর জন্য সত্যজিৎ যেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন, ঠিক তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন সর্বজয়া, ইন্দির ঠাকরুণ, হরিহর, দুর্গা ও অপু।
তাই পথের পাঁচালী একটি ইতিহাস, এক অনন্য অধ্যায়ের নাম। পথের পাঁচালীর হাত ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্র যেমন বিশ্বজনীন রূপ লাভ করেছে, তেমন দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ছোট্ট গ্রাম বড়াল, এমনকি যে ভাঙা বাড়িতে চলচ্চিত্রটির শুটিং হয়েছে, তার একটা নোনাধরা ইটও হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সেই গুরুত্ব সাধারণের চোখ এড়িয়ে যায়। সেজন্যই হয়তো বড়ালের ওই বাড়ি আজ অবহেলায় পড়ে থাকে।
তবে যে চোখগুলো একটু অন্যরকম, এই গুরুত্ব তাদের চোখ এড়িয়ে যায় না; তারা ছাই খুঁজে বের করে আনেন মূল্যবান জিনিসটুকু। অপুর পাঁচালীতে যেমনটা দেখা যায়, ‘সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট’-এর শিক্ষার্থী অর্ক পথের পাঁচালীর ভাঙা বাড়ির এক টুকরো ইট নিজের কাছে রাখতে পেরে গর্ব বোধ করেন। অর্ককে বলতে শোনা যায়, ‘ ... কী বলছেন জেঠু! ইতিহাস। পথের পাঁচালীর বাড়ির দেওয়ালের ইট।’ খানিক পরেই আবার অর্ক বলেন, ‘জানেন তো, ওখানে নাকি বার্লিন ওয়ালের ভাঙা ইটের টুকরো মেমেন্টো হিসেবে বিক্রি করা হয়। সে যতো দামই হোক না কেনো, আমি একখানা কিনবোই। তারপর বড়ালের ওই দেয়ালের ইটের টুকরোটার পাশে বার্লিন ওয়ালের টুকরোটা সাজিয়ে রাখবো।’
অখণ্ড জার্মানিকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলো বার্লিন ওয়াল, যার এপারে পুঁজিবাদ ওপারে সমাজতন্ত্র; তাই বিশ্ব ইতিহাসে বার্লিন ওয়ালের গুরুত্ব সদা অমলিন। বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে পথের পাঁচালী বড়ালের যে ভাঙা বাড়িতে নির্মাণ হয়েছিলো, তার ইটের সঙ্গে বার্লিন ওয়ালের ইটের তুলনা হয়তো চলে না। কিন্তু ভারতীয় চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আবেগী দৃষ্টিকোণ বা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ঐতিহাসিক দিক থেকে দেখলে, এটাকে ‘খুব বাড়াবাড়ি’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় কি? বার্লিন ওয়াল বিশ্বের জন্য যেমন এক ঐতিহাসিক অধ্যায়, পথের পাঁচালীও তো তেমন ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্য এক অনন্য অধ্যায়।
যাহা ছিলো নিয়ে গেলো সোনার তরী
মানুষ মরে যায়, কারণে-অকারণে বদলায়, আমাদের কাছ থেকে দূরে চলে যায়; কিন্তু তার কর্ম থেকে যায়। আর মানবসমাজের এক চিরায়ত ধর্ম, ব্যক্তি-মানুষের কর্মকে নিজের প্রয়োজনে যত্নে রেখে মানুষটিকে অদৃশ্য মহাকালের ভাগাড়ে নিক্ষেপ করা। ফলে মানুষ হারিয়ে যায়, কর্ম আর হারায় না। রবীন্দ্রনাথ বিষয়টি ভালো বুঝেছিলেন; আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘এতকাল নদীকূলে/ যাহা লয়ে ছিনু ভুলে/ সকলি দিলাম তুলে/ থরে বিথরে—এখন আমারে লহো করুণা করে/ ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোটো সে তরী ... শ্রাবণগগন ঘিরে/ ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে/ শূন্য নদীর তীরে/ রহিনু পড়ি—যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।’
ফলে কর্ম মানুষকে অমর করে ঠিকই, কিন্তু কেনো যেনো ব্যক্তি নিজেই অমর হতে পারে না; বিধ্বস্ত নীলিমায় ক্ষয়িষ্ণু জীবনটুকু শুধু ক্ষয়েই যায়। এই একই অবস্থার শিকার দীপু নাম্বার টুর (১৯৯৬) দীপু (অরুণ), মাটির ময়নার (২০০২) আনু (নুরুল ইসলাম বাবলু), বাইসাইকেল থিভস্-এর (১৯৪৮) ব্রুনো রিচি (এনজো স্তায়োলা) ও পথের পাঁচালীর অপুর (সুবীর) মতো আরো অনেকে। এদের কর্ম—দীপু, আনু, ব্রুনো রিচি ও অপু—অমর হলেও অমর হতে পারেননি অরুণ, বাবলু, এনজো স্তায়োলা ও সুবীরেরা।
দীপু নাম্বার টুর দীপুর কথা হয়তো মনে আছে অনেকের। শৈশবে যাকে দেখে দর্শকদের অনেকেই ‘দীপু’ হতে চাইতো, যার কষ্টে চোখে জল এসে যেতো, যার সাহসে শিহরিত হতো। হয়তো এখনো অনেকেই শৈশবে দীপু হতে চায়, যার আলো আজও সবার চোখে লেগে আছে। তবে অনেকেরই অজানা সেই দীপু আজ কোথায় আছেন, কী করছেন, কেমন আছেন? সপ্তম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে দীপু নাম্বার টুতে দীপু চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অরুণ সাহা। এর পর আর কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি তিনি।
তবে অরুণ চলচ্চিত্রকে স্বেচ্ছায় বিদায় জানাননি, দীপু নাম্বার টুর পর তিনি আর কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পাননি বলেই তাকে দাঁড়াতে হয়েছিলো হারিয়ে যাওয়া শিশুশিল্পীদের সারিতে।৫ এর পরে অরুণ সাহা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন, উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি নিয়ে ভারতে গেছেন; সেখান থেকে লেখাপড়া শেষ করে জ্বালানি খাতে কাজ করেছেন পাঁচ বছর। বর্তমানে অরুণ ঢাকায় পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করছেন।
অরুণ সাহা অভিনয়ের প্রস্তাব না পাওয়ায় চলচ্চিত্র থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন—এটা তারই ভাষ্য। তবে অন্যটাও হতে পারে, যে অরুণকে দর্শক দীপু হিসেবে চেনে, যে দীপু মানেই গোলগাল চেহারার এক মিষ্টি বালক; চোখের চাহনিতে যার ‘নিষ্পাপ’ দ্যুতি ঝরে, তাকে দর্শক হয়তো ওই ছোটো দীপু হিসেবে ভাবতেই ভালোবাসে। তারা হয়তো তাদের দীপুকে বড়ো হয়ে নায়ক অথবা খলনায়কের ভূমিকায় দেখতে চায়নি। ছোটো অরুণ বড়ো হয়ে পর্দায় মারদাঙ্গা চরিত্রে অভিনয় করবে কিংবা নায়িকার হাত ধরে রোমান্টিকতার স্রোতে ভেসে নেচে ঝড় তুলবে, এটা হয়তো দর্শক মন থেকে মেনে নিতে পারবে না; আর সেজন্যই হয়তোবা কোনো পরিচালক অরুণকে আর কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ডাকেননি।
আবার এটাও তো হতে পারে অরুণ জীবনের দৌড়ে ‘পিছিয়ে’ পড়তে চাননি, সেজন্য লেখাপড়া করেছেন, রেসের ঘোড়ার মতো দ্রুতবেগে সফলতার সিঁড়ি ভেঙে সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই দীপুকে হারিয়ে ফেলেছেন; সেজন্যই হয়তো দীপু হয়ে অরুণ সবার মধ্যে যে আলো ছড়িয়েছেন, তা থেকে নিজেই রয়ে গেছেন অনেক দূরে।
বাবলু, মাটির ময়নায় আনু চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তিনিও মাটির ময়নার পর হারিয়ে গেছেন রুপালি পর্দা থেকে, সেই একই কারণ—কোনো চলচ্চিত্রে কাজ না পাওয়া। এমনকি যে তারেক মাসুদের হাতধরে বাবলুর এই জগতে আসা (বাবলু পরবর্তী সময়ে তার ইউনিটে খুঁটিনাটি কাজ করতেন) তিনিও তাকে আর কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেননি। তবে অরুণের মতো বাবলু লেখাপড়া করে বেশি দূর যেতে পারেননি; তিনি এখন চট্টগ্রামের হাফিজ জুটমিল কলোনির ছোট্ট একটি দোকানে চা-পান বিক্রি করেন।৬
বাবলুর জন্ম ১৯৮৮ সালের ৩ এপ্রিল নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার কালিকাপুর গ্রামে। ১৯৯৯ সালে মামার সঙ্গে ঢাকায় আসেন বাবলু। এখানে এসে বাবলু প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন ইউসেপ স্কুলে, থাকতেন মগবাজার চেয়ারম্যানগলিতে। এ সময়ই মাটির ময়নার জন্য শিশুশিল্পী খুঁজছিলেন তারেক। বাবলুর সন্ধান তারেককে দিয়েছিলেন তারই ভাগ্নি পূর্বা। প্রথম দেখাতেই বাবলুকে ভালো লেগেছিলো তারেকের। এরপর একটি স্ক্রিপ্ট ধরিয়ে দিয়েছিলেন বাবলুর হাতে, এর ছয় মাস পর ২০০০ সালে শুরু হয় মাটির ময়নার শুটিং।
মাটির ময়নায় অনবদ্য ও সাবলীল অভিনয়ের জন্য বাবলু সেরা শিশুশিল্পী হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান, সাড়া ফেলেছিলেন কান চলচ্চিত্র উৎসবেও। ২০০২ সালের কান-এ প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে মাটির ময়না ‘ডিরেক্টরস্ ফোর্টনাইট’ জেতে। এতো কিছুর পরও বাবলুর প্রথম চলচ্চিত্রই এখন পর্যন্ত তার জীবনের শেষ চলচ্চিত্র। যদিও বাইসাইকেল থিভস্-এর পর এনজো স্তায়োলা চলচ্চিত্র থেকে বাদ পড়েননি, বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন; তবে সেটা শিশুশিল্পী হিসেবেই। তাই হয়তো অরুণ ও বাবলুর কথাগুলো তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, তবে একটু ভিন্নভাবে।
১৯৩৯ সালের ১৫ নভেম্বর রোমের ডার্বাটেলা ডিস্ট্রিক্টে জন্ম এনজো স্তায়োলা’র। এনজো ১৯৪৮ সালে নয় বছর বয়সে ভিত্তোরিও ডি সিকা’র বাইসাইকেল থিভস্-এ ব্রুনো রিচি চরিত্রের মধ্য দিয়ে অভিনয় জগতে পা রাখেন। ডি সিকা যে এনজোকে তুলে এনেছিলেন, সে ছিলো পথশিশু। ডি সিকা এনজোকে পছন্দ করেছিলেন তার ব্যতিক্রমধর্মী চলন বৈশিষ্ট্যের কারণে। বাইসাইকেল থিভস্-এর পর যা ঘটলো সে ইতিহাস সবারই জানা। এতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য পরবর্তী সময়ে এনজো হয়ে উঠলেন বিশ্ববিখ্যাত শিশু অভিনেতাদের একজন; তিনি পরিণত হলেন নব্য-বাস্তববাদ ধারার কিংবদন্তিতে। আর সেটা সম্ভব হয়েছিলো তার অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ততার জন্য, যা দর্শক হৃদয়ে এক অনন্য মানবিক আবেদনের উদ্রেক করেছিলো।
তবে এনজো অভিনীত প্রথম চরিত্রের মতো তার চলচ্চিত্রযাত্রা অতোটা দীর্ঘ হয়নি। এনজো বাইসাইকেল থিভস্-এর পর দ্য বারেফুত কনতেসা (The Barefoot Contessa, ১৯৫৪), টাইমস গন বাইসহ (১৯৫২) ১৯৪৮—১৯৫৪ পর্যন্ত প্রায় ১৩টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন; তবে এর কোনোটিতেই তিনি ব্রুনো রিচি’র মতো সাড়া ফেলতে পারেননি। ১৯৫৪’র পর কিছুদিন অভিনয় ছেড়ে দেন এনজো। এর পর মাঝে তিনি সোর্ড উইদাউট অ্যা কান্ট্রি (১৯৬১) ও লা রাগাজা দাল পিজামা গালো (La ragazza dal pigiama giallo, ১৯৭৭) এ নামে দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও ১৯৭৭ সালেই তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন। পরে নাকি ইতালির একটি স্কুলে গণিতের শিক্ষক হয়েছিলেন এনজো।
এই এনজোও হয়তো অরুণের মতো জীবনের স্রোতে ভাসতে গিয়ে হারিয়ে গেছেন সবার দৃষ্টির অলক্ষে; না হয় দর্শকরা তাকে অরুণ ও বাবলুর মতো ব্রুনো রিচি হিসেবে মূল্যায়ন করতেই ভালোবাসে। সেজন্যই ১৫টি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পরও তার চলচ্চিত্রযাত্রা থেমে গেছে, ব্রুনো রিচি’কে নিয়েই এনজো’কে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।
অরুণ, বাবলু ও এনজো’র কাহিনির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে ভারতীয় চলচ্চিত্রের আরেক কিংবদন্তি শিশু-অভিনেতা সুবীর ব্যানার্জির কাহিনি। সত্যজিতের পথের পাঁচালীর অপুরূপী সুবীর মাত্র একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এর পরের ঘটনা চমৎকারভাবে কৌশিকের অপুর পাঁচালীতে বর্ণনা হয়েছে নানা চলচ্চিত্রিক ভঙ্গিমায়। পথের পাঁচালী মুক্তির পর অপু হয়ে ওঠে সারাবাংলার শিশু চরিত্রের প্রতিচ্ছবি; তাই দর্শক এখনো অপুর মাঝে নিজের শৈশব খুঁজে ফেরে। তবে অপুরূপী সুবীর চলে গেছেন অনেক দূরে! আলোকে ছাড়িয়ে গভীর নির্জন অন্ধকারে, কিন্তু অপু তো দর্শক হৃদয়ে এখনো রাঙতার মুকুট পরে রাজারূপে ঘুরে বেড়ায়। সুবীরের দ্যুতি অপুর মধ্য দিয়ে বিশ্বচলচ্চিত্র, বিশেষ করে ভারতীয় চলচ্চিত্র আকাশে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিনিয়ত।
সুবীরও অপুকে হারিয়ে ফেলেছেন সেই শৈশবেই, তার থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছেন; অপু থেকে সদা নিজেকে আড়াল করেছেন। তিনিও হয়তো অরুণ, বাবলু ও এনজো’র মতো একই কারণে বাদ পড়েছিলেন। যেটা আরো স্পষ্ট হয় অপুর পাঁচালীতে সুবীরের এ কথায়,
‘কাকাবাবু লোক পাঠিয়ে ডেকেছিলেন আমায়, অপরাজিত’র সময়। এজটাও কারেক্ট ছিলো। যে রোলটা করলো ... পিনাকি, ওর এজটাও তখন ওই সেম। কিন্তু, অপুর যে ধারণাটা কাকাবাবুর ভাবনায় ছিলো, পিনাকির সঙ্গেই মিলে গেলো। আর আমি অপরাজিত থেকে বাদ।’
তার মানে বয়স ঠিক থাকার পরেও কাহিনির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় পথের পাঁচালীর অপুকে অপরাজিততে নিয়ে আসেননি সত্যজিৎ। এটাও হয়তো সত্যজিৎ করেছিলেন ওই দর্শকদের কথা মাথায় রেখেই। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্মাতাকে দর্শকদের চাহিদার কথা মাথায় রাখতে হয়।
তিন জীবনের হলো মেলা নদে এসে
চলচ্চিত্রে বর্ণনাত্মক ঢঙে শৈল্পিক রূপে গল্প বলার ধরন হলো ন্যারেটিভ। ন্যারেটিভের আদি-মধ্য-অন্ত পারম্পর্য, কাহিনির প্রকাশ, ক্রম পরিণতি, চরিত্র ও ঘটনা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আবেগ তৈরি করে। আবার অনেকে এ ন্যারেটিভকে ভেঙে ফেলেন ফ্ল্যাশব্যাক ও জাম্পকাট ইত্যাদি ব্যবহার করে, যা চলচ্চিত্রের কাহিনিতে সাময়িক একধরনের বিভ্রম সৃষ্টি করে। যে বিভ্রম চলচ্চিত্রের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দর্শকের চোখে লেগে থাকে।
কৌশিক অপুর পাঁচালীতে উমা সেনের (পথের পাঁচালীর দুর্গা চরিত্রের অভিনেত্রী) বর্ণনার সূত্র ধরে নিমাই ঘোষের (সত্যজিৎ রায়ের স্টিল ফটোগ্রাফার) কাছে গেলেন, আর নিমাই ঘোষের বর্ণনা দিয়ে প্রবেশ করলেন অপু, মানে সুবীরের জীবনে। অতঃপর সুবীরের খোঁজে পথে নামলেন অর্ক, শুরু হলো সুবীরের অতীত, মধ্য ও বর্তমান খোঁজা। কিন্তু সেটা মোটেও সাধারণ ন্যারেটিভের মতো ছিলো না।
ন্যারেটিভের প্রথা ভেঙে সুবীরের কাহিনি এগিয়ে চলে ফ্ল্যাশব্যাক, চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী-অপরাজিত-অপুর সংসার ও বর্তমানের সুবীরকে নিয়ে। এই কাহিনির বর্ণনায় সূত্রধরের ভূমিকা পালন করেন অর্ক। যিনি ‘সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট’-এর একজন শিক্ষার্থী। এর মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রের অপুর সঙ্গে ব্যক্তি-সুবীরের সম্পর্ক তৈরি হয়। একে একে বেরিয়ে আসে পথের পাঁচালীর অপু, যৌবনের সুবীর এবং প্রৌঢ় সুবীর।
কৌশিকের অপুর পাঁচালীর বিশেষত্ব হলো, পথের পাঁচালীর অপুকে তিনি এনে মেলালেন বাস্তবের সুবীরের সঙ্গে; শৈশব ও যৌবনের সুবীরের কথা বললেন প্রৌঢ় সুবীরের মুখ দিয়ে। আর এই তিন সুবীর একসঙ্গে অর্কের চোখ দিয়ে হাজির হলো পর্দায়। যদিও দর্শক সুবীর থেকে অপু, অপু থেকে সুবীরকে আলাদা করতে গিয়ে বিভ্রমে পড়ে যান। আবার একই সঙ্গে তিন সুবীরের খণ্ড খণ্ড কিন্তু প্রাসঙ্গিক উপস্থাপন এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি করে; দর্শকের দৃষ্টি আটকে থাকে পর্দায়; বিভ্রমই শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রটিকে পরিপূর্ণ করে। সবশেষে দর্শক তৃপ্ত অথচ বেদনার নিঃশ্বাস ফেলে, সুবীরের প্রতি নিজের অজান্তেই বাড়িয়ে দেয় সমানুভূতির হাত; আর কৌশিকের সার্থকতা সেখানেই।
ফেরারি সুবীর দূরে চলে যায়
তবুও অপু ফেরে পায় পায়
বাস্তবকে ক্যামেরার চোখে যতো কাছ থেকে দেখা যায়, মানে জীবন যে রকম ঠিক সেরকম তুলে ধরার প্রচেষ্টাই নব্য-বাস্তববাদ; এর মূলমন্ত্র ছিলো ক্যামেরা নিয়ে বাস্তবের যতো কাছে যাওয়া যায়। তাই এ ধারার নির্মাতারা ‘সম্ভাব্য’ বাস্তবতার কাছে যাওয়ার জন্য বেছে নিয়েছিলেন অপেশাদার অভিনেতা, বের হয়ে এসেছিলেন স্টুডিও থেকে; যতোদূর সম্ভব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন গল্প, সংলাপের অতি নাটকীয়তা। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ইতালিতে একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে জন্ম হয়েছিলো এই নব্য-বাস্তববাদের। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে স্টুডিওগুলো ছিলো ভাঙাচোরা, চারপাশ ছিলো অগোছালো, নির্মাতাদের পকেট ছিলো শূন্য। এক কথায় বললে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশের বাস্তবতাই নির্মাতাদেরকে ক্যামেরা হাতে পথের ধুলোয় নামতে বাধ্য করেছিলো।
বলা হয়ে থাকে ইতালিতে যে নব্য-বাস্তববাদ ধারার মৃত্যু হয়েছিলো, সত্যজিতের হাতে কলকাতায় তা আবার পুনর্জন্ম লাভ করে; তার প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালীতে এ ধারার বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট লক্ষণীয়। সত্যজিতও পথের পাঁচালীতে যতোটা সম্ভব বাস্তবের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, এ ক্ষেত্রে তিনি সফলও হন। পথের পাঁচালী বাস্তবের এতটা কাছে যেতে পেরেছিলো যে, এ চলচ্চিত্রটিকে ১৯৫৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘শ্রেষ্ঠ মানবিক দলিল’ হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হয়। তবে সত্যজিতও হয়তো ভাবেননি, বাস্তবের কাছে যেতে গিয়ে তিনি কারো জীবনের এতো কাছে চলে যাবেন!
পথের পাঁচালীতে অপু চরিত্রে অভিনয় করা সুবীরের বাস্তব জীবন মিলে যাবে অপু ট্রিলজির অপুর জীবনের সঙ্গে। অপুকে পথের পাঁচালীর পরই বিদায় জানিয়েছিলেন সুবীর, তার পর কখনো তিনি অপুর ছায়াও মাড়াননি; তবুও অপু তার পিছু ছাড়েনি। তাইতো অপুর পাঁচালীতে আক্ষেপ অথচ অভিমানের সুরে প্রৌঢ় সুবীর বলেন, ‘অপুর ওপর আমার রাগটা কেনো জানো? হতচ্ছাড়া সারাজীবন আমার পেছন ছাড়লো না। ছায়ার মতো লেগে রইলো।’
অপুর সঙ্গে সুবীরের এই মিল দর্শক প্রত্যক্ষ করেন অপুর পাঁচালীতে। সুবীরের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে সংসারের সব ভার পড়ে সুবীরের কাঁধে। সুবীর লেখাপড়া ছেড়ে কলকাতার মিলহ্যান্ড (millhand) ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানায় কেরানির কাজ নেন। কিন্তু একটু গুছিয়ে না উঠতেই আসে ট্র্যাজেডি, সুবীরের বাবার মৃত্যু হয়; এ ট্র্যাজেডি যেনো মিলে যায় অপরাজিতর অপুর সঙ্গে। আবার সব ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন সুবীর, বিয়ে করেন অসীমাকে (যদিও বাস্তবে সুবীরের বউয়ের নাম ছিলো মাধুরী); জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। তবে সেখানেও সুখ মেলেনি, শুধু আরেকটি ট্র্যাজেডির অপেক্ষা। অপুর সংসার-এর পুনরাবৃত্তি ঘটে সুবীরের জীবনে, বিয়ের বছর দু-একের মধ্যেই অসীমা মারা যান। তারপর অপুর মতোই সুবীরের আবারও একা ছুটে চলা।
তবে একটি জায়গায় অপু আর সুবীরের পার্থক্যটা রয়েই যায়, অপর্ণাকে হারানোর পর অপু সন্তান কাজলকে পায়; তাকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সুবীর! চিরতরে একা হয়ে যান, তার থাকে না কিছুই। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে ৬৯ বছর বয়সে কাজ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন সুবীর। এখন কিছু স্মৃতি-বিস্মৃতি আর অবসরভাতার টাকায় ভাড়া বাড়িতে বসবাস—এ যেনো শুধুই জীবনের জন্য ছুটে চলা।
বাদ তো দিলেন, আমি
বাদ গেলাম কই
প্রথম যেদিন সূর্য পৃথিবীর বুক আলোয় ভরিয়েছিলো, হিমশীতল পৃথিবীর বুক সেই আলোর পরশে পেয়েছিলো প্রথম উষ্ণতার স্বাদ। তারপর কালের অতল গর্ভে হারিয়ে গেছে তার প্রথম পদচারণার মুহূর্তটি; আসলেই কি প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে তার প্রথম আলোকরশ্মি? আজো যে সূর্যালোক পৃথিবীর বুক ভাসায়, সে কি তারই প্রতিচ্ছবি নয়! সে এখনো কি বলছে না, ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো, তবু আমারে দেবো না ভুলিতে।’ অপুর পাঁচালীতে যে সুবীরকে দেখি, সেও হয়তো পথের পাঁচালীর পর বাদ পড়েছিলেন কিংবা স্বেচ্ছায় ভিড়েছিলেন বাদ পড়াদের দলে। বাদ পড়েও কেনো যেনো বাদ পড়লেন না সুবীর! অপু হয়েই থেকে গেলেন বিশ্বদর্শক হৃদয়ে।
পথের পাঁচালীতে অপু (সুবীর) ‘যাত্রা দেখে দিদির পুতুলের বাক্স থেকে রাংতা চুরি করে যে রাজপুত্র সাজতে চেয়েছিলেন। গোঁফটা পড়ে যায়, কিন্তু মাথার মুকুটটা রয়েই যায়।’৭ সুবীর সিংহাসন ছাড়লেন ঠিকই কিন্তু রাজত্ব তারই থেকে গেলো। তাইতো অপু বলতে দর্শক হৃদয়ে এখনো তার দুষ্টুমিমাখা চোখ ও মায়াবী চেহারাই ভেসে ওঠে। যদিও পথের পাঁচালীর পর দর্শকের সঙ্গে অপরাজিত ও অপুর সংসার-এ আরো দুই অপুর (পিনাকি ও সৌমিত্র) পরিচয় ঘটে; এই অপুরা তো দর্শকের সামনে এসেছিলেন সুবীরের হাত ধরেই। আবার সুবীরের জীবনের সুরই তো পরতে পরতে মিলে গেছে অপুর জীবনের সঙ্গে, কিংবা অপুর জীবনের সুর মিলেছে সুবীরের জীবন-বীণার তানে। সেই দিক থেকে তো সুবীর বলতেই পারেন, ‘আমায় বাদ তো দিলেন। কিন্তু আমি বাদ গেলাম কই? অপুর ট্রিলজির চিত্রনাট্য তো আমার জন্যই যেনো লেখা।’
কৌশিকের নারী : পিছন থেকে আরো পিছনে
সত্যজিৎ ১৯৫৫ সালে যেটা করতে পেরেছিলেন, কৌশিক ২০১৪ সালে কেনো জানি সেটা পারলেন না! প্রায় ৬০ বছর আগে সত্যজিৎ পথের পাঁচালীতে যে নারীকে দেখিয়েছিলেন, তিনি ‘অশিক্ষিত’ কিন্তু দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী ও আত্মমর্যাদায় বলীয়ান। সর্বজয়া, যাকে আঁকড়ে এগিয়ে যায় পথের পাঁচালী। বিলাসিতা তো নয়-ই, মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারাটাই সর্বজয়ার কাছে স্বপ্নের মতো। জীবনের পদে পদে তিনি কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তবু বিপর্যস্ত জীবনের সামনে দাঁড়িয়েও সর্বজয়া পিছনে ফিরে তাকান না; আবেগ সামলে ‘কঠিন বাস্তবতা’র সামনে ইস্পাতসম কাঠিন্যে দাঁড়িয়ে থাকেন, এগিয়ে যান জীবনের সংগ্রামী পথে।
কৌশিক অপুর পাঁচালীতে খানিকটা সত্যজিতীয় ঢঙ অনুসরণ করলেও নারী চরিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে কেনো জানি অন্য পথে হাঁটলেন! সত্যজিৎ যে নারীকে বের করে এনেছিলেন প্রচলিত নির্মাণধারা থেকে, কৌশিক অপুর পাঁচালীতে তাকে আবার সেই নারী চরিত্রের প্রথাগত ফ্রেমে বেঁধে ফেললেন! সত্যজিতের ১৯৫৫’র নারী চরিত্র ২০১৪-তে কৌশিকের কাছে এসে তার দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদা সবই খোয়ালো! আপন অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে গেলো সে, মানুষ না হয়ে আবারও ‘নারী’ রূপেই থেকে গেলো। তিনি অপুর পাঁচালীতে যে অসীমাকে উপস্থাপন করলেন, সে সুবীর-এর (পুরুষ) চোখ দিয়ে দেখা অসীমা।
অসীমা গায়েহলুদের ছিঁড়ে যাওয়া শাড়ি দিয়ে জানালার পর্দা বানালে সুবীর বলেন, ‘রিসাইকেল’; আর উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ অসীমা রিসাইকেলকে শোনেন ‘রিসকা’! মানে এ অসীমা পুরুষ-কৌশিকের নির্মিত। কৌশিকের ‘পুরুষালি’ চোখের এই অসীমার রূপ নীচের আলাপচারিতায় আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অসীমা : ... রোজ বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যে ৭টা হয়ে যায়! হ্যাঁ গো, তুমি কি আমায় মিথ্যে কথা বলেছিলে?
সুবীর : হুঁ?
অসীমা : ওই, তোমার টাইপ স্পিড ৩০ থেকে ৭০ হয়ে গেছে?
সুবীর : হ্যাঁ, হয়েছে তো। তুমি একদিন অফিসে চলে এসো না, নিজের চোখে দেখে নাও তাহলে প্রমাণ হয়ে যাবে। ৭০ নয়, এবার আমি ওটা ৮০ করবো।
অসীমা : তাহলে রোজ বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যে ৭টা হয় কেনো?
সুবীর : উঁ, মানে?
অসীমা : যখন স্পিড ৩০ ছিলো, তখনো সন্ধ্যে ৭টা। এখন স্পিড ৭০, এখনো সন্ধ্যে ৭টা হয়? বুঝি না বাপু!
আবার অসীমাকে বাবার বাড়িতে রেখে ফিরে আসার সময় বিদায়ক্ষণে সুবীরকে আবেগ জড়ানো গলায় অসীমা বলেন,
শোনো, মা’র ডান হাতটা ব্যথা তো, তুমি একটু কয়লাটা ভেঙে দিও, কেমন? আর পারলে এক বস্তা গুড়ো এনে দিও। ... আর এই যে, সিগারেট, বাড়াবে না কিন্তু। শোনো, শোনো, ছাদে যখন কাচা জামাকাপড়গুলো মেলবে, তখন উল্টো করে মেলো। নাহলে না রঙ জ্বলে যায়। ... কেয়া দি বলছিলো, একটা ভালো রান্নার লোক আছে; দেখো যদি পারে। বাইরের হাবিজাবি কম খেয়ো। ... মায়ের শাড়িটা দিতে ভুলো না, হ্যাঁ? আর গাছের টবে জল দিও কিন্তু রোজ, হ্যাঁ?
অসীমার এ উদ্বেগ কি নিছক ভালোবাসার, নাকি ভালোবাসার মুখোশে অধস্তনতার? সংসারের সব কাজ যদি অসীমাকেই করতে হয়, সব বিষয়ে যদি অসীমাকেই খেয়াল রাখতে হয়—তবে সুবীরের দায়িত্বটা কী?
মেয়ে অন্য কারো বাগান থেকে না-বলে ফল আনলে সত্যজিতের সর্বজয়া তা ফেরত পাঠান। কারণ মেয়ে অন্যায় করলে তার আত্মমর্যাদায় বাধে। হরিহরের কাশী যাওয়ার পর সর্বজয়া আঁকড়ে ধরেন সংসার, দক্ষ চালকের মতো আত্মবিশ্বাসে মোকাবেলা করেন সব বিপর্যয়। স্বামীর বাড়ি ফিরতে দেরি হয়, সংসার চালাতে হিমশিম খান সর্বজয়া, কিন্তু স্বামীর অনুপস্থিতি তাকে দুর্বল করে না; বরং তিনি আরো দৃঢ় হন। আর কৌশিকের অসীমার কোনো অভাব নেই, পিছুটান নেই, তবুও স্বামীকে বিদায় দিতে গিয়ে সহসাই দুর্বল হয়ে পড়েন, চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে।
সত্যজিৎ তো ১৯৫৫-তেই দেখিয়েছিলেন, সর্বজয়া সন্তানের মৃত্যুর মুহূর্তে বা মৃত্যুর পর শোককে হাওয়ায় ভাসিয়ে, দায়মুক্ত হতে ঠুনকো চিৎকারে চোখের জল ফেলেন না। এমনকি সন্তানকে বাঁচানোর জন্য চোখের সামনে দৃশ্যমান গণেশকেও একবার ডাকেন না! তিনি শোককে মোকাবিলা করেন দৃঢ়তার সঙ্গে। কিন্তু কৌশিক যে নারীকে উপস্থাপন করলেন, তিনি তো সন্তানের প্রত্যাশায় মানত করেন, সন্তান মারা গেলে তিনিও সন্তানের শোকে মারা যান; যার মধ্যে দৃঢ়তার ছিটেফোঁটাও লক্ষ করা যায় না!
এখন কৌশিক যদি এ দাবি করে বসেন, তিনি সুবীরের কাছ থেকে অসীমার যে বর্ণনা পেয়েছেন, সেটাই তুলে ধরেছেন; তবুও কি তিনি দায় থেকে মুক্তি পান? তিনি তো প্রামাণ্যচিত্র বানাননি, ফিকশন বানিয়েছেন। আর এ ক্ষেত্রে তো পরিচালকের প্রত্যেকটি চরিত্রকে নিজের মতো করে নির্মাণের স্বাধীনতা আছে, আর সে স্বাধীনতাটুকুকে কাজে লাগিয়ে সফল চরিত্র নির্মাণ করাই নির্মাতার কাজ। যদিও সত্যজিৎ অপুর সংসার-এ যে অপর্ণাকে দেখিয়েছিলেন সেও নারী চরিত্রের প্রচলিত ফ্রেমে বাঁধা সেই নারীই। কৌশিক যদি সেই অর্পণাকে এখানে এনে অসীমা বানান, তবেও কি তিনি পার পেয়ে যান? শিল্পীর কাজ কি পিছিয়ে যাওয়া? শিল্পী কি নিজের দায় অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দায়মুক্ত হতে পারেন?
উপসংহার নয়, অপু সংহার
একটি পাতা ঝরে আরেকটি পাতা গজায়, ঝরা আর গজানোর এ খেলা চলে অবিরাম। সবাই হারিয়ে যায় আবার কেউই হারায় না এখানে, শুধু একজন চলে যায়, অন্য একজনকে জায়গা করে দিতে। একটি সম্পর্ক ভাঙার পরও যেমন আরেকটি সম্পর্ক থাকে, তেমন শেষ হওয়ার পরও এ নশ্বর পৃথিবীতে কিছু একটা যেনো থেকে যায়।
আমাদের মাঝ থেকে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যায় সুবীরেরা; আবার ফিরে আসে অন্য কোনো নামে, অন্য কোনো ঠিকানায়। কেউ তাদের মনে রাখুক আর নাই বা রাখুক, তাতে তাদের কী আসে যায়। তাদের কর্ম স্বমহিমায় তাদেরকে তুলে ধরে ঊর্ধ্বপানে, যেখানে সদা আলোকের ঝরণাধারা ঝরে, গান গায় সুদর্শনা। সুবীর এখন আমাদের ‘অপরিচিত’দের একজন, কিন্তু অপু? সে তো দর্শকদেরই একজন, তার মাঝেই তো বেঁচে আছেন সুবীর। তার পরও হয়তো একটা কথা থাকে, তাহলে অপুর মূল্য সুবীরের চেয়ে বেশি? এ প্রশ্নের উত্তর তো জানা—ফুল দেখে আনন্দে মাতি, হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখি, খোঁপায় পরি, সুবাস নিই চোখ বুজে; তাই বলে কি আমরা ঝরে যাওয়া শুকনো ফুলের খবর কেউ রাখি? সে গোলাপ, বকুল, চাঁপা, টগর যাই হোক না কেনো।
আগেই বলেছি, সমাজ শুধু সুবাসটুকুই নেয়, শুকনো নেতিয়ে পড়া ফুলকে নয়; মানুষের ক্ষেত্রেও একই কথার পুনরাবৃত্তি ঘটে। যদিও মাঝে মাঝে এ সমাজ মানুষকে মমি বানিয়ে নিজের প্রয়োজনে পিরামিডে, মোমের মূর্তি বানিয়ে মাদাম তুসোর জাদুঘরে রাখে! সেজন্য তো ব্যক্তিকে মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। হয়তো সুবীর-এনজো’রাও একদিন ‘সম্মানিত মমি’ হবেন, তাতে লাভ কী? সময়ের কাজ সময়ে না করে, অসময়ে সমাধিস্থলে পুষ্পার্ঘ্য দিলে বিদেহী আত্মারা শান্তি পায় কি না জানি না! তবে সুবীরেরা শান্তি পান না, যদিও সুবীরদের কাছে শান্তি পাওয়াটাই মুখ্য নয়; কারণ যে নদীতে সবসময় মিষ্টি পানির স্রোতধারা বহমান, সে শুকিয়ে গেলেও তৃষ্ণার্ত হয়ে কারো কাছে জল ভিক্ষা করে না।
তার পরও হয়তো প্রশ্ন থাকে, সুবীরেরা কি তাহলে আজীবন হারিয়েই যাবেন মহাকালের শূন্য গর্ভে? কেউ তাদের খবর রাখবে না, জানতে চাইবে না তারা কেমন আছেন? কীভাবে চলছে তাদের জীবনের দিনগুলি? এর পরও প্রতিনিয়ত সুবীরেরা আসছেন, আলোকিত করছেন আমাদের চারপাশ; আসা যাওয়ার এ খেলা চলছে। অপুর পাঁচালীর শেষ দৃশ্যে সুবীরের জীবন যেমন বহমান, শত কষ্টের পরও এগিয়ে যান সামনের দিকে; ঠিক তেমনই এই হারানো শিশুশিল্পীদের ইতিহাসও বহমান, প্রতিনিয়ত এখানে যোগ হয় নতুন নতুন নাম।
লেখক : নাজমুল রানা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
তথ্যসূত্র
১. রায়, সত্যজিৎ (২০০৬ : ৮৯); একেই বলে শুটিং; নওরোজ কিতাবিস্তান, ঢাকা।
২.http://www.telegraphindia.com/1050315/asp/calcutta/story_4492664.asp
৩. মোকাম্মেল, তানভীর (১৯৯৩ : ৯); ‘সত্যজিৎ রায় : এক অনন্য শিল্পীর পাঁচালী’; সত্যজিৎ রায় স্মারক গ্রন্থ; সম্পাদনা : তানভীর মোকাম্মেল ও অন্যান্য; ঋত্বিক চলচ্চিত্র সংসদ, ঢাকা।
৪. আউয়াল, সাজেদুল (২০১১ : ৯২); চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর; দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা।
৫. অরুণ সাহার সঙ্গে মুঠোফোনে লেখকের এ নিয়ে কথা হয়। কেনো আর কোনো চলচ্চিত্রে তাকে দেখা যায়নি—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘কারণ অফার পাই নাই, এজন্য করি নাই। এগুলোর জন্য তো লেগে থাকতে হয়, যোগাযোগ রাখতে হয়।’
৬. http://www.kalerkantho.com/online/national/2013/09/02/4054
৭. প্রাগুক্ত; মোকাম্মেল, তানভীর (১৯৯৩ : ৬৪)।
বি. দ্র. এ
প্রবন্ধটি ২০১৫ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের অষ্টম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন