Magic Lanthon

               

হালিমা খুশি

প্রকাশিত ০৭ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চরাচর : নিম্নবর্গের স্বাধীনতাহীনতা বনাম স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষা

হালিমা খুশি


গান চোখ বুজে শুনবে, হাঁ করে তাকিয়ে নয়। তখন বুঝতে পারতাম না, মা কেনো এমন কথা বলছেন। পরে মা রবীন্দ্রনাথ পড়তেন, পাশে বসে আমি চোখ বুজে শুনতাম। শুনতে শুনতে একটা সময় লক্ষ করলাম মাথার মধ্যে একধরনের দৃশ্যকল্প খেলা করছে। একসময় সেই দৃশ্যকল্পও মনের পরিস্থিতি বুঝে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিতে থাকলো। একদিন একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটলো, তখন আমি ১৮ কি ১৯, দেখলাম দেয়ালের পেইন্টিংয়ের একটা ইমেজ ফ্রেম থেকে বেরিয়ে এসে হাঁটছে, কথা বলছে! হাজারটা ইমেজের জন্ম দিচ্ছে ঘটনাগুলো বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ব্যক্তিজীবনের। তখন অবশ্য তার বসবাস ছিলো কবিতার সঙ্গে।

কবিতার মধ্য দিয়ে রাক্ষস রাষ্ট্রের ইমেজ তুলে ধরতে এতটুকু সংশয় কাজ করেনি তার। কারণ কবি হিসেবে বুদ্ধদেবের প্রথম ও প্রধান দায় ছিলো মানুষের কাছে। এই দায়ই হয়তো একটা সময় তাকে নিয়ে গেছে চলচ্চিত্রের জগতে। কারণ হিসেবে বুদ্ধদেব নিজেই বলেছেন, আমাদের পরিচিত এই বাস্তবকে কাব্যদর্শন সমন্বিত একটা নতুন জগতে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা চলচ্চিত্রের আছে। সব কথা না বলেও বোঝানো যায় অনেক কিছু (মিনিমালিজম)। কিন্তু ওত পেতে থাকা সুযোগ সন্ধানীরা মিথ্যার সুন্দর মোড়কে এই মাধ্যমটাকে কাজে লাগিয়েছেন অর্থ আত্মসাৎ-এর নতুন একটা যন্ত্র হিসেবে।

কারণ তারা জানতেন, শিল্প-সংস্কৃতির কাছে মানুষ সহজেই নতজানু হয়। তবে প্রাকৃতিক নিয়মেই এর বিপরীতে কিছু নির্ভীক মানুষেরও জন্ম হয়। তারা না পারতে পারতেই পেরে যান। কারণ তারা বিশ্বাস করেন, কোনো একদিন আসবে যখন ওই সুযোগ-সন্ধানীরা পড়ে যাবে তলানিতে। তেমনই বিশ্বাসী মানুষদের একজন বুদ্ধদেব, আর সেই ছাপ আমরা দেখি তার চলচ্চিত্রে। তিনি শিকড়কে ভুলে যাননি। তার চলচ্চিত্রে ঘুরেফিরে এসেছে আমি, আমরা, আমাদের কথা; রাষ্ট্রহীন রাষ্ট্রের স্বপ্নের কথা। যেখানে প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নিয়ন্ত্রিত হবে না। বুদ্ধদেবের তেমনই এক স্বপ্নের চলচ্চিত্র চরাচর (১৯৯৩)। নখওয়ালা, সুযোগ-সন্ধানী রাষ্ট্র, তার বিপরীতে কিছু মানুষের মানসিক শক্তির লড়াই আর তাদের স্বপ্নএই তিনে মিলে চরাচর হয়েছে একাকার।

দাশগুপ্তের চোখে সমাজ-রাষ্ট্র-বাস্তবতার নির্মাণ

চলচ্চিত্রের বাস্তবতা সাদা পর্দার চতুষ্কোণ ছাড়িয়ে প্রসারিত হবে; চরিত্ররা দর্শকের মনের সঙ্গে কথা বলবে, চলাফেরা করবে; তাদের পরিস্থিতি ভাবিয়ে তুলবে, সমব্যথী করে তুলবে; সঙ্গীত, হন্যে হয়ে খুঁজবে। কিন্তু তা না করে দর্শকদের এমন এক জগতে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তাদের জীবন তো দূরের কথা, ভারতবর্ষ থেকে শুরু করে পৃথিবীর কোথাও যার অস্তিত্ব নেই। চলচ্চিত্রের এই পরিস্থিতিতে কবি বুদ্ধদেব অনুভব করলেন একটা সময়যখন ব্যক্তি ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে বেরিয়ে আসছে যত না সমাধানের সূত্র জন্ম নিচ্ছে তার চেয়ে অনেক, অনেক বেশী জিজ্ঞাসা। তিনি বললেন, আভ্যন্তরীণ কলুষতার প্রাবল্যের বিরুদ্ধে একটি অনুরূপ শক্তির উদ্ভবের ফলে দেখলাম, আমি বিপ্রতীপ কবিতার জন্ম দিয়েছি এবং তারই চর্চা করে চলেছি। এই চর্চারই বর্ধিত রূপ দেখা যায় বুদ্ধদেবের চলচ্চিত্রেও।

কাব্যময়তার সব উপাদানের উপস্থিতি তিনি ঘটালেন তার চলচ্চিত্রে। তবে এটি ঠিক, কাব্যময়তার ভান করে অতিরিক্ত কিছু করেননি তিনি। তার ভাষায়, ...কবিতা, সংগীত ও ছবিএ তিনটি শিল্পমাধ্যমের প্রাণসত্ত্বাকে একই সূত্রে যে বেঁধে রেখেছে, সে আর কেউ নয়ছন্দ। একটা চলচ্চিত্রের যেমন নিজস্ব শৈলী থাকে তেমনই তার একটা ছন্দ থাকে, যে ছন্দ নিজেই গড়ে ওঠে, আবার ভেঙেও যায় নতুন করে গড়ে ওঠার জন্য। চলচ্চিত্রকার হিসেবে তিনি খুঁজেছেন এই ছন্দ যা তার পরিমিতি বোধকে নিয়ে গেছে অন্য এক উচ্চতায়।

কাব্যিক শৈলীর সঙ্গে তার চলচ্চিত্রে মোটিফের ব্যবহার দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। মোটিফে সাধারণত কোনো প্রতীকী চরিত্র বা রঙ কিংবা সঙ্গীতের কিছুটা এদিক-ওদিক করে বার বার উপস্থাপন করে পুরো কাহিনির একটা পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। অত্যন্ত মুন্সিয়ানা দিয়ে বুদ্ধদেব খেলেছেন সেই মোটিফ নিয়ে, বলেছেন তার স্বপ্নের কথা।

কালপুরুষ-এ (২০০৮) বাবার সঙ্গে বেশ সখ্য ছিলো সুমন্তের। কিন্তু বাবা-মায়ের ভুল বোঝাবুঝি সুমন্তকে বাবার কাছ থেকে নিয়ে যায় অনেক দূর। সেই সুমন্ত নিজেই এখন বাবা; স্ত্রী সুপ্রিয়ার সঙ্গে দূরত্ব, সন্তান শান্তা ও শান্তনুর সঙ্গে তার সম্পর্কে দেয়াল তৈরি করছে; যেমনটা হয়েছিলো ঠিক তার বেলাতেও। এখন নিজেকে দিয়ে তিনি তার বাবাকে বুঝতে পারেন। তাই কল্পনায় তিনি বাবাকে ভাবেন, তার সঙ্গে না-বলা কথা বলেন। তার প্রতি সুপ্রিয়ার করুণার কথা শুনে বাবা বলেন, আসলে ওরা যেমন চেয়েছিলো তেমন আমরা হতে পারিনি। যে কারণে সবাই আমাদের ছেড়ে যায়, ভালোবাসার আর কেউ থাকে না।

আজ আর বাঁশিবাদক ইদ্রিসের মতো স্বার্থহীনভাবে আদর করে কেউ কিছু দিতে চায় না সুমন্তকে, সবাই কেবল পাওয়া, না-পাওয়ার হিসাব কষতে ব্যস্ত। এ সেই ইদ্রিস, ছোটোবেলায় সুমন্ত যার বাঁশি শুনে দৌড়ে গিয়েছিলো। তখন অবশ্য সুমন্তের কাছে বাঁশি কেনার টাকা ছিলো না, ইদ্রিস তাকে এমনিতেই সেই বাঁশি দিতে চেয়েছিলো। হারিয়ে যাওয়া সেই আদর, স্নেহ আর ভালোবাসা সুমন্তকে তাড়িয়ে বেড়ায় ক্ষণে ক্ষণে। হয়তো এজন্যই সুমন্তের ব্যর্থ জীবনের বাঁকে বাঁকে আমরা ইদ্রিসকে কিংবা তার সুরকে শুনতে পাই।

একই আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা কিংবা ওই সুর আমরা অন্যভাবে শুনতে পাই লাল দরজাতে (১৯৯৭)। এখানে প্রথম দৃশ্যেই লাল চাদর গায়ে চেরাপুঞ্জি পাহাড়ে শৈশবের নবীনকে লাল পিঁপড়া হাতে বলতে শুনি, ছোটি মোটি পিঁপড়া বটি লাল দরজা খোল দে। নবীনের এই শৈশব মূর্তি ঘুরেফিরে আসে তার চেতনায়। একসময় যে নবীনের মন্ত্রে লাল দরজা খুলে যেতোনবীনের বাবার ভাষায়, ভালোবাসা দিয়ে চাইলে যেকোনো কিছু পাওয়া যায়বড়ো হয়ে সেই নবীন কিন্তু কাউকে, এমনকি নিজেকেও ভালোবাসতে পারেননি।

অন্যদিকে নবীনের গাড়িচালক দিনু, তার দুই বউ আর প্রেমিকাকে নিয়ে সব ঠিক রেখে এগিয়ে চলেন। দিনুর প্রতি এদের কারো কোনো আক্ষেপ নেই। নবীন তাই বলেন, তুমি খুব ভালো আছো দিনু! কারণ সম্পদশালী নবীনের স্ত্রী বেলা, একমাত্র সন্তান কুশল তাকে ভালোবাসে না, কথা পর্যন্ত বলতে চায় না। একদিন কুশলের ফোন ধরে নবীন বলেছিলেন, আমি বাবা বলছিরে। কুশলের উত্তর ছিলো, আমি মার সঙ্গে কথা বলতে চাই। এর ঠিক পরের শটেই বুদ্ধদেব ছোটো নবীনকে লাল পিঁপড়া হাতে তার বাবার কাছে দৌড়ে যেতে দেখান। ছোটো নবীন সেই পিঁপড়া তার বাবার হাতে তুলেও দিয়েছিলো; বাবা ছিলো নবীনের বন্ধু, নবীন কিন্তু কুশলের বন্ধু হয়ে উঠতে পারেননি। মোটিফ নিয়ে বৈপরীত্যের এ খেলা খেলেছেন বুদ্ধদেব, সফলও হয়েছেন।

শৈশবের কোমলমতি নবীন বড়ো হতে হতে অর্থ-পেশা-ব্যস্ততার মধ্যে হারিয়ে ফেলেছেন তার মানবিকতা, নিজের সত্তা। তার চারপাশ তাকে দিয়েছে যেমন, কেড়েও নিয়েছে ঢের। শৈশব নবীনকে তাই বার বার হাতছানি দিয়ে ডাকে; অসহ্য নবীন একপর্যায়ে বলতে বাধ্য হন, যদি আবার প্রথম থেকে শুরু করা যেতো, একেবারে সেই চেরাপুঞ্জি থেকে। এই ইচ্ছার প্রকাশ লাল পিঁপড়া হয়ে (মোটিফ) বার বার ফিরে আসে লাল দরজায়।

আগেই বলেছি রাষ্ট্র নিয়ে বুদ্ধদেবের স্বপ্নের কথা। চলচ্চিত্রে সেই রাষ্ট্র থেকেছে কখনো পর্দার আড়ালে আবার কখনো পর্দা সরিয়ে স্পষ্ট হয়ে। স্বপ্নের দিন-এ (২০০৪) প্রথম দৃশ্যেই কিছু পুলিশের মৃতদেহ, তাদের গাড়ির ভাঙা কাচের উপর কাঠবিড়ালের অস্থির ছুটে চলা এবং পুলিশের নেমপ্লেটে খানিক তাকিয়ে থেকে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাওয়া দেখি। রাষ্ট্রীয় বিশৃঙ্খলায় ছা-পোষা কাঠবিড়ালের এই নিশ্চিন্ত লুকোচুরি প্রশ্ন জাগায়। হতে পারে, রাষ্ট্রের অনৈতিক ন্যায্যতা আদায়কারী অস্ত্রধারী পুলিশের, অন্য অর্থে রাষ্ট্র কাঠামোর পতন ঘটলেও সাধারণের স্বপ্ন থেমে থাকে না, জীবন চলে নিশ্চিন্তে-নির্বিঘ্নে। কাঠবিড়ালকে দ্বিতীয়বার দেখি তার স্বাভাবিক কৌতূহল, চঞ্চলতা নিয়ে পরেশের গাড়িতে। আই ডি কার্ড নিয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে পরেশ আর পরেশের সঙ্গে কাঠবিড়ালদুজন যেনো দুজনের মতো খেলছে।

ঠিক তার পরের শটেই দেখা যায়, পরেশের স্বপ্নের (নায়িকা রাইমা সেন) ছবি সাঁটানো প্রজেক্টর বাক্স। সবকিছুর মধ্যেই কাঠবিড়াল যেমন তার স্বাভাবিক ছোটাছুটি করে চলে, তেমনই সবকিছুর ভিতরেও পরেশ তার স্বপ্নকে নিয়েই এগোতে চান। সর্বস্ব হারিয়েও তাই পরেশকে আমরা দেখি স্বপ্নের সেই মেয়ের পিছু পিছু ইদ্রিসপুর যেতে। আবার এর পরের শটে দেখি মরা ঘাস সবুজ হয়ে তার ওপর দিয়ে কাঠবিড়ালের ছুটে চলা। কারণ মানুষ কোনো না কোনোভাবে তার স্বপ্নের কাছে পৌঁছাতে চায়। তাই গাড়ি, প্রজেক্টর, রিল, সঙ্গী চপলকে হারিয়েও আমিনার সঙ্গে ইদ্রিসপুরে যেতে চান পরেশ। তিনি জানেনসেলুলয়েডে যে মানুষটাকে দেখা যায়, সে মানুষটাকে তিনি জীবনে পাবেন না; তবুও তিনি স্বপ্ন জিইয়ে রাখেন।

একইভাবে স্বামীকে হারিয়েও আমিনা ভালো থাকার স্বপ্ন দেখে অনাগত সন্তানকে নিয়ে। নিজে মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেলেও অনাগত সন্তানকে তিনি বলেন, একদিন তরে আমি পেপার আইনা দিমু, এরাম উল্টাপাল্টা না, সোন্দর একটা জায়গার পেপার। ওদিকে গাড়ি চুরি নিয়ে কষ্ট নেই পরেশের, তার সব চিন্তা রিলগুলো নিয়ে। তাই আমরা পরেশকে বলতে শুনি, রিলগুলো নামাসনি? কেননা, এই রিলের ভিতরেই তার স্বপ্ন আসে-যায়! কুরোসাওয়ার একটা কথা মনে পড়ে যায়, আমার জীবন থেকে যদি স্বপ্ন চলে যায়, অন্তত দুঃস্বপ্ন যেন থাকে।

একইভাবে মন্দ মেয়ের উপাখ্যান-এ (২০০২) রজনী, বাসন্তী, বকুলদের স্বপ্ন থাকে একটা স্থায়ী মাথা গোঁজার জায়গা নিয়ে। অথচ রাষ্ট্র কিন্তু তার নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণে দায়বদ্ধ। তবে রাষ্ট্র যে তার দায় একেবারে পূরণ করেনি, তা নয়। নটবরদের করেছে! যার একটা সিনেমাহল, তেল কল, ধান কল, মটর-গাড়ির ব্যবসা আছে। অথচ দুবেলা ভাতের জন্য রজনীদের নিজেদের শরীরটাকে কুকুর-শেয়ালের হাতে তুলে দিতে হয়। রজনীর মেয়ে লতি, তিনি পড়াশোনা করে ওই নরকের গণ্ডি পেরুতে চান। লতির স্বপ্ন একাকার হয়ে যায় শিক্ষক নগেণ বাবুর স্বপ্নে। কিন্তু বাধ সাধেন নটবরেরা। তারা মিথ্যা স্বপ্নে বেঁধে লতির শরীর পেতে চান। মানুষ ভূলোক থেকে চন্দ্র্রলোকে পা রাখে, অথচ সমাজের একটা অংশকে তখনো থাকা-খাওয়া-পরার জন্য শরীর বেচতে হয়, যুদ্ধ করতে হয় সমাজ-রাষ্ট্রের সঙ্গে। তবুও উজান যাত্রা থেমে থাকে না। সে যাত্রা লতি-বকুল-বাসন্তীর।

এই বাসন্তী কিংবা বকুলদের মতো স্বপ্ন নিয়ে কলকাতায় আসেন দিলীপ, ইয়াসিন ও মধুবালা। কিন্তু যে স্বপ্ন তাদের দেখানো হয়, সেই স্বপ্নের দুঃস্বপ্ন হওয়ার কাহিনি নিয়েই আমি, ইয়াছিন আর আমার মধুবালা (২০০৭)। নগরের পিচঢালা পথ ধরে সোফা মাথায় নিয়ে হেঁটে চলে সাধারণ কিছু মানুষ। বার বার পর্দায় আসা সেই ক্ষুদ্র দৃশ্য দিয়ে বুদ্ধদেব মূলের দিকে এগিয়ে যান। বাঘের থাবাওয়ালা পা নিয়ে সেই সোফা মাটিতে না বসে সাধারণের ঘাড়ের ওপর চড়ে ঘুরতে থাকে।

সাধারণ সোফায় বুদ্ধদেব রাষ্ট্রের আদল দেন। সোফা শুধু সাধারণের ঘাড়ে রেখেই ক্ষান্ত হন না তিনি, তার উপরে আবার সেই সাধারণ মানুষকে জায়গাও করে দেন। আপাত মনে হয়, সুন্দর গদির (রাষ্ট্র) উপর যত্নে থাকছে সেই উদ্বাস্তু মানুষ। কিন্তু একটু খেয়াল করলে ধন্দটা কেটে যায়। সাধারণের ঘাড়ের ওপর যে রাষ্ট্র বসে আছে, সেই রাষ্ট্রকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে কিন্তু সাধারণ মানুষই। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, সাধারণ সেই মানুষ কিন্তু সাধারণ মানুষের ঘাড়ের ওপরই বসে আছে! এই ছলটাই রাষ্ট্র করে। কারণ তার নির্ভরতা যে সাধারণ মানুষের ওপরই, সেটা সে বুঝতে দেয় না; উল্টো এমন ভাব দেখায় যেনো রাষ্ট্রই আমাদের নিরাপত্তা, ভরণ-পোষণ দেয়। এই ভাব বজায় রাখতে রাষ্ট্র আইনের ধোঁয়া তুলে ওই সাধারণের ওপর শোষণ-নিপীড়ন চালায়। সে কারণে একসময় পুলিশের পিটুনিতে আহত দিলীপের জায়গা হয় সেই সোফার উপরই। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও তার দ্বারা সংঘটিত বিপর্যয়দুই-ই বহন করতে হয় সাধারণকে।

তবে এ নিয়ে প্রতিবাদ যে নেই, এমন নয়। যদিও বুদ্ধদেব জানেন প্রচলিত ব্যবস্থাকে সমূলে নাড়া দেওয়ার ক্ষমতা দুই-তিন জোড়া হাতের থাকে না, কিন্তু দোলা তো দিতে পারে, যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে অনেক দূর পর্যন্ত। তার তেমনই এক সৃষ্টি উত্তরা (২০০০)। উত্তরা স্বপ্ন নিয়ে বেলপুরে এসেছিলেন রেলকর্মচারী স্বামী বলরামের সঙ্গে। কিন্তু এখানে তিনি দেখেছেন হিংসা, লড়াই (কুস্তি), সাম্প্রদায়িকতা; অথচ সেখানে নেই মানবিকতার লেশমাত্র। তিনি প্রতিবাদ করেন; যেতে চান বামুনের সঙ্গে, যিনি স্বপ্ন দেখান ভালো থাকার, ভালো রাখার। কিন্তু তাতেও বাধা। এই অদৃশ্য বাধা উপেক্ষা করতে চান উত্তরা, পারেন না। তবে তিনি জানেন, তিনি জিতে গেলে একটা অংশের অস্তিত্বে টান পড়বে। তাই তার মতো মানুষের স্বপ্নকে কেড়ে নিয়ে ওরা হিংসা, দ্বন্দ্ব, শোষণকে টিকিয়ে রাখে। বার্নার্ড শর ভাষায়, Beware of that man whose God is in heavenএটাই হয়তো অদৃশ্য বাধার চরিত্র। এই চরিত্রই আমরা আবার দেখি চরাচর-এ (১৯৯৩)। এবারের আলোচনা চরাচর-এর লখা, সারি, নিতাই, গৌরি, ভূষণ, নটবর, শ্বাসমল ও কালীচরণকে ঘিরে।

আমরা শিকার করি পাকি (পাখি), আর শ্বাসমল বাবু

শিকার করে আমাদের

সামন্ততান্ত্রিক সমাজে রাজার অধীন ছিলো জমিদার, আর জমিদারের অধীনে একেবারে প্রান্তে ছিলো কৃষক। ভূমির মালিকানা কিন্তু জমিদার কিংবা কৃষককারো হাতেই ছিলো না। অথচ কৃষকের ঘামে-শ্রমে করা উৎপাদন মাঝখানে কয়েক হাত (জোতদার-জমাদার-মোড়ল) বদলে ঠিকই পৌঁছে যেতো জমিদার হয়ে রাজার কাছে। কিন্তু সবকিছু করেও বছর জুড়ে ওই কৃষক থাকতো নিঃস্ব-ভুখা। ১৭৯৮-এ ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দৃশ্যত সামন্ততন্ত্রের তরি ডোবানো হয়। সেই ডুবন্ত তরি কিন্তু ডুব-সাঁতার দিয়ে পাড়ে ভেড়ে ঠিকই। তাই চরাচর-এ লখারা পাখি বেচেন শ্বাসমলের কাছে, শ্বাসমল বেচেন কালীচরণের কাছে। নটবর থেকে শ্বাসমল হয়ে কালীচরণ সবাই ভালো থাকে, খালি লখার চুলায় আগুন জ্বলে না।

সামন্ত সমাজে কৃষক এক মনিবের জমি ছেড়ে অন্য মনিবের কাজ করতে পারতো, এই স্বাধীনতা দাস সমাজে ছিলো না। এই সময়ে এসেও লখাদের মনিব পরিবর্তনের সেই সুযোগ নেই। এমন চক্রে লখা-ভূষণদের বাঁধা হয়েছে, একটু নড়াচড়া করে এদিক-ওদিক গেলেও তাদের ফিরতে হয়েছে পুরনো মনিবের কাছেই। ফলে দাস থেকে পুঁজিবাদ, লখাদের অবস্থান একচুলও পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন হয়েছে কেবল দাস সমাজে দাসমালিকের, সামন্ততন্ত্রে সামন্তপ্রভুর আর পুঁজিবাদে পুঁজিপতির। শ্রমিক যতো শ্রম দিয়েছে শোষিত হয়েছে ততো, শোষণ থেকে পুঁজি বেড়েছে, পুঁজির বৃদ্ধিতে বেড়েছে ক্ষমতা, ক্ষমতায় বেড়েছে আবার সেই শোষণ। পুরো সিস্টেমটা একটা চক্র। তাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আক্ষেপ, ... পদ্মার ভাঙন ধরা তীরে মাটি ধসিতে থাকে, পদ্মার বুকে জল ভেদ করিয়া জাগিয়া উঠে চর, অর্ধ-শতাব্দীর বিস্তীর্ণ চর পদ্মার জলে আবার বিলীন হইয়া যায়।১০ তেমনি বুদ্ধদেবের ভূষণরা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন এক জায়গাতে।

সারি থাকলি পাকি থাকে না

পাকি থাকলি সারি পালায়

সবার উপরে থাকবে মানবিকতা, মানুষের স্বাধীনতা; আইন নয়। কিন্তু সম্পদই যে সমাজের মানবিকতা, স্বাধীনতার নির্ধারক, সেখানে মানুষ কতোখানি মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে পারে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই সারি (লখার বউ) আর পাখিকে একই সঙ্গে থাকতে দেওয়া হয় না। মানুষ বেড়েই ওঠে এই পাখি আর সারির প্রতিযোগী ডিসকোর্সের মধ্যে দিয়ে; একই সঙ্গে স্বাধীনতা আর পরাধীনতার সহাবস্থান সম্ভব নয়। এ কারণে লখা যখন স্বাধীনতার স্বাদ খোঁজেন পাখির মুক্তিতে, সারি তখন চলে যায় রাগে, ক্ষোভে। কিন্তু লখাদের তো শৃঙ্খলমুক্ত হওয়া যাবে না! তাহলে সেই অদৃশ্য শক্তি শোষণ করবে কাকে? সে তো টিকেই আছে জনকল্যাণের নামে লখা বা শোষণকে পুঁজি করে! তাই তাকে লখাদের টিকিয়ে রাখতেই হবে।

আর লখাদের টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন পড়ে শ্বাসমলদের। শ্বাসমলরা পুরো প্রক্রিয়াকে একটা চর্চার মধ্যে রাখেন। লখাদেরকে প্রয়োজনে ঋণ দেন, ঋণ দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকেন। কারণ শ্বাসমলরা জানেন, একবার লখারা এই জালে আটকালে আজীবন পাখির মতো শুধু আটকাতেই হবে। এই আটকে যাওয়া শুধু শ্বাসমলের কাছে নয়, সারির কাছে; পাখির কাছে।

এভাবেই অদৃশ্য শক্তি একেকটা দরজায় পাহারাদার রেখেছে একধরনের হুমকি দেওয়ার জন্য, হয় সারি না হয় পাখি। তাই লখাকে বাধ্য হয়ে সেই চর্চার মধ্যে যেতে হয়, বলতে হয়অনেক রোজগার করবো; কলকাতায় যাবো; অনেক অনেক পাখি ধরবো, আর বেইচে আসবো। আর বেচতে পারা মানে সারির প্রয়োজন মতো ভাত, কাপড় দিতে পারা অর্থাৎ আবার সেই শৃঙ্খল, সেই চর্চা। কিন্তু কখনো কখনো সেই চর্চায় ব্যত্যয় ঘটে, লখারা চর্চার বিপরীতে দাঁড়ান, ফিরে আসেন; তাতে চর্চার আঘাতে মন ভাঙে তাই সারিরা চলেও যান। তাহলে কি মেনে না নিলে এভাবেই লখাদের জীবন কাটবে? একবার ভাবুন তো, এই লখারা যদি সংখ্যায় বেশি হয়!

একদিকে পাখি পূজা

অন্যদিকে ভোজন

নিজেরা তো ধরো, সব বিক্রি করে দাও, এখন খাওএমনই করেই লখাকে বালিহাঁসের মাংস খেতে বলছিলেন কালীচরণ। সেটা ছিলো কালীচরণের পাখি পূজার দিন। একই সঙ্গে এটা পাখি মুক্তি ও ভোজনের দিনও বটে! কালীচরণের কাছে পাখি ঈশ্বর, পূজনীয়; কারণ ঐশ্বর্যের একটা বড়ো অংশ পাখি তাকে এনে দিয়েছে। তাই আয়োজন করে তাকে স্বাধীনতা দেওয়া। প্রভুদের মহত্ত্বের এ এক নিদর্শন বটে! কিন্তু লখারা কি বোঝে বা তাদের বুঝতে দেওয়া হয়কোন্ চক্রের উত্তরীয় এটা?

কালীচরণ পাখি পূজার দিনে এলাকার দরিদ্রদের পেট পুরে খাওয়ান; তাদের পরিবারের খোঁজ নেন। আধপেটা এই মানুষগুলোর কাছে কালীচরণ তাই ভালো মানুষ। কিন্তু কালীচরণের ঐশ্বর্যের পাহাড় গড়তে গিয়ে এই মানুষগুলো (লখা) কীভাবে জীবনের একেকটা দিন গুজরান করেন তা কি জানেন তিনি? উল্টো তাদের স্বার্থসিদ্ধ দিবাস্বপ্ন দেখাতে থাকেন। মার্কসের ভাষায়, যে-শ্রেণীটির দখলে সমাজের উৎপাদনের উপায়সমূহ সেই শ্রেণী সমাজের মানসিক উৎপাদনও নিয়ন্ত্রণ করে, এবং ফলত...তাদের ধারণাগুলো সাধারণত আধিপত্যকারীদের অধীনস্ত হয়ে পড়ে।১১ তাই কালীচরণ যখন ন্যায্য পাওনা, উপরি রোজগারের কথা বলেন, চোখের সামনে সুন্দর জীবনের একটা চিত্র এঁকে দিলেন তখন মনে হলো, এবার বুঝি তারা শ্বাসমলের শোষণ চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন (?)। 

ভূষণ তাই বলেন, শ্বাসমল বাবু আমাদের কী ঠকানটাই ঠকায়, একবার ভেবে দেখ! কিন্তু কালীচরণই যে মূল শোষক-মূর্তি তা কি লখারা জানেন? বেশি পয়সা দেওয়ার ছল করে তাদের মনোজগতে ভালো থাকার যে মিথ্যা-চৈতন্য নামের ভ্যাকসিন পুশ করানো হলো তা কি বোঝেন তারা? কালীচরণ আগাম টাকার সঙ্গে কলকাতা যাওয়ার ভাড়া দিয়ে বলেন, ...বাকি পয়সা তুমি যেমন যেমন পাখি দেবে, তেমন তেমন! রোজকারটা রোজকার। তিনি শ্বাসমলের থেকে বেশি দিতে চান ঠিকই, কিন্তু কতোখানি বেশি? ধরে নিই, শ্বাসমল একটা পাখি লখার কাছ থেকে পাঁচ টাকায় কিনে কালীচরণের কাছে বিক্রি করেন ২০ টাকায়, কালীচরণ আবার সেই পাখি কলকাতায় বিক্রি করেন পঞ্চাশে। এক হাত থেকে আরেক হাত হয়ে চূড়ান্ত হাতে পৌঁছানো অবধি কতোখানি লাভ আর কতোটুকু শোষণ তা কিন্তু লখাদের অজানা।

তাই কালীচরণের এক প্রস্তাবেই কলকাতায় তার আড়তে পাখি দিতে সম্মত হন তারা। হয়তো কালীচরণ তাকে ১০ টাকা দিতে চেয়েছেন, দৃশ্যত যেটা শ্বাসমলের থেকে ঢের বেশি। অর্থাৎ যতো হাত কম, শোষণ ততো কম। তাই লখারা যদি সরাসরি মূল ক্রেতার কাছে যেতে পারতেন তাহলে ৫০-এর পুরোটাই হতো তাদের, যেটা তাদের প্রাপ্য। কিন্তু খুব কায়দা করে সে জায়গাটা নিজের করে নিয়েছেন শ্বাসমল বা কালীচরণের মতো মধ্যস্বত্বভোগীরা। কারণ ওই অংশটাই কিন্তু কালীচরণের লালায়িত ধন, অন্যদিকে লখাদের মৃত পুঁজি। লখার এই পুঁজির ওপর আয়োজন হয় লখাদের ভুরিভোজের। ওদের টাকায় ওরা খাবে, আর মহৎ হবেন কালীচরণ! যতোই বলি এটা লখার প্রাপ্য, তবুও তা কালীচরণের।

এখানে মহত্ত্বের আড়ালে-আবডালে তাদের চৈতন্যে আরেকটা মিথ্যার প্রবেশ ঘটানো হয়। যতো বেশি পাখি, ততো বাড়তে থাকবে এই ভোজের পরিসর। লখারা ভাবতে থাকেনকতোই না ভালো তাদের নতুন বাবু! এই বাবুদের সঙ্গে যদি আজকের দিনের গার্মেন্ট মালিকদের মিলাই তবে বিশেষ অত্যুক্তি হবে বলে মনে হয় না। গার্মেন্ট শ্রমিকদের মস্তিষ্কে এই চৈতন্য গেঁথে দেওয়া হয়। ওখানে যেমন ভূষণদের মতো পাখি ধরা কিছু মানুষ জোগাড় করে দিলে উপরি রোজগার, ভুরিভোজ হয়; তেমনই গার্মেন্টে থাকে নামমাত্র চিকিৎসা সেবা, স্যানিটেশন সুবিধা, দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা।

তেকন (তখন) ওই হারামজাদা নটবর

তোর মাগির কাছে আসে

সারির শাড়ি নেই, নেই পেট পুরে খাবার; আর গহনা? সে তো স্বপ্নযেটা পেলে তিনি বশে থাকবেন। মৌলিক চাহিদা যেখানে উপেক্ষিত সেখানে তাড়না নেই ইট বাঁধানো বাড়িতে ঘুমানোর। সে কারণে ডিসকোর্স এখানে যেভাবে গড়ে উঠেছে, তাতে দাম্পত্য জীবনের খুব স্বাভাবিক ও যৌক্তিক প্রশ্নকেনো সারি থাকবেন লখার কাছে? তাই লখা যখন বিল-বাদাড়ে, সারি তখন ভাঙা বাড়িতে নটবরের সঙ্গে। লখা তা জানেন এবং  মেনেও নেন! কেননা প্রশ্ন তোলার জন্য পায়ের তলায় শক্ত মাটি নেই তার। লাল দরজাতেও যেমন প্রশ্নহীন দিনুর বউয়েরা। লখা যে কারণে নটবরকে নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না, একই কারণ তারাও। অর্থাৎ টাকা থাকলে নটবরেরা যেমন সারিকে পায়, তেমনই একসঙ্গে যদি সবার ভরণ-পোষণের মুরোদ থাকে, তবে দুই বউ, বান্ধবীতে সমস্যা কোথায়! তাই ডা. নবীনের গাড়িচালক দিনুর দুই বউ ও এক প্রেয়সী এবং তারা সবাই সবাইকে জানেন, মেনেও নেন।

অন্যদিকে অর্ণব রায়ের সঙ্গে স্ত্রী বেলার সম্পর্ক মেনে নিতে পারেন না নবীন; এমনকি রায়কে হত্যার পরিকল্পনাও করে। তাহলে চরাচর-এ সারিকে কেনো মেনে নেন লখা, মালতিরাই বা কেনো দিনুকে? এটা কি মেনে নিতে পারা, নাকি বাধ্য হয়ে মেনে নেওয়া? আবার মালতির শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার মৃত মাসতুতো বোনের বরের সঙ্গে। কলকাতা থেকে ফিরে মালতিকে খুঁজতে গিয়ে দিনু যখন সেই সম্পর্কটা বুঝে ফেলেন; তিনি অবাক হন না, মালতিকে বলেন, আমারটাও একটা জীবন, তোরটাও আরেকটা; সবই অদ্ভুত। কিন্তু দিনু ভরণ-পোষণে সক্ষম হয়েও কেনো এটা মেনে নিলেন? তাহলে কি দিনুর দুর্বলতা তার বহুগামী স্বভাবে? পুরুষের এই স্বভাব তো নতুন নয়, এ নিয়ে পুরুষের গর্বেরও শেষ নেই। তাই পুরুষ-দিনুর এই সত্যভাষণ বুদ্ধদেবের পুরুষালি অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন জাগায়। 

এখানে লখা আর দিনু এক সরলরেখায়। সারি অভিযোগের সুরে লখাকে বলেন, আমারে ভালোবাসার কতা বলচো, সে তোমার শরীল চাইলে তবে, এদিকে যেকন-তকন পাকি ধরে সোহাগ করতে তো কম যাওনা। ওদিকে দিনুরও একই অবস্থা, সেও তার ইচ্ছে মতন চাইলেই সুখী, মালতি কিংবা প্রেয়সী প্রতিমার কাছে যান।

বুদ্ধদেব নারী-পুরুষের এই সব অবস্থানকে নাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেননি। ওখানে মালতিদের যেমন ভরণ-পোষণ দরকার, এখানে তেমনি সারির; ব্যর্থ হলে সারিরা চলে যায়। সারির এই উপস্থাপন কিন্তু নারীকে দুর্বল করে, লোভী মানুষ হিসেবে তুলে ধরে। এবং শেষ পর্যন্ত নটবরের সঙ্গে সারির চলে যাওয়া কিন্তু তারই প্রমাণ।

আমি একবার একজনকে দেইকেছিলাম (দেখেছিলাম)

যে সমুদ্র দেইকেছে

নটবর, যে শ্বাসমলের গদিতে হিসাব রাখেন আর মাঝে মাঝে বাইক হাঁকিয়ে লখাদের তাগিদ দিয়ে আসেন। তিনি কিন্তু সারাদিন গুড়, রুটি খেয়ে লখাদের মতো পাখি ধরেন না! অথচ তিনিই বিশাল দোতলা বাড়ির মালিক। অন্যদিকে লখাদের একবেলা হাঁড়ি চড়ে তো আরেক বেলা চড়ে না। লখারা শ্রম দেন আর পেট পুরে ফুলবাবুটি সেজে ঘুরে বেড়ান নটবর! আবার অন্যের বউকে নিয়ে ফুর্তি করার ন্যায্যতাও পান তিনি। অথচ যে মানুষগুলো দিনের পর দিন ঘাম ঝরিয়ে তাদের হাত, স্বপ্ন, কামনা, প্রত্যাশাকে এতদূর অবধি জকির মতো টেনে আনলেন, কোথায় তারা, তাদের স্বপ্ন? কালীচরণ যেমনটা বলেন, মাসে আমি এতো পাখি বেচি, আকাশ ভরে দিতে পারি। অথচ লখারা জানেনই না, এই পাখিগুলো কেনো কিনেন কালীচরণ! তাদের পরিচিত, জানার জগৎ, আকাঙ্ক্ষা কতোখানি ছোটো!

বেঁচে থাকার একেবারে মৌলিক চাহিদাই তারা পূরণ করতে পারেন না, তাই সমুদ্র দেখার আকাঙ্ক্ষা জাগানোর মতো আকাঙ্ক্ষাই নেই তাদের। সমুদ্র দেখা মানুষই তাদের সমুদ্র দেখার সাধ মিটিয়ে দেয়। স্বপ্ন সঙ্কুচিত হতে হতে কোন্ জায়গায় এসে পৌঁছালে এমনটা হয়ভেবে দেখা দরকার।

কী করছিস রে নেতাই? পাকি

পুঁতছি, পাকি গাছ হবে বাবা 

পাকি ব্যাচার দিন এলি, ও স্বপ্নে দেখা দেয়, দেকি নেতাই কাঁদছে। লখার তিন বছরের ছেলে নিতাই, যে এখন আর নেই; কিন্তু লখা এখনো তার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে তাকে অনুভব করেন। নিতাই তাকে পাখি ভালোবাসতে শিখিয়ে গেছে, এখন মনে হয় ছেলের থেকেও তিনি বেশি ভালোবাসেন পাখিকে। নিতাইয়ের মৃত্যুর দিন কতক আগে লখা দেখেন, সে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে একটা মৃত পাখি পুঁতছে। লখা কারণ জানতে চাইলে নিতাই বলে, পাখি পুঁতছি, পাখি গাছ হবে বাবা। সে মনে করে পাখির পুনর্জন্ম হবে গাছ হয়ে এবং পাখিরা ওই গাছে বসবে; কিচিরমিচিরে মুখর করবে চারদিক; ইচ্ছে মতো উড়বে। নিতাইয়ের বার বার স্বপ্ন হয়ে আসার এই মোটিফ মনে করাতে চায় পাখি আর নিতাইয়ের স্বাধীনতা এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে লখার অবচেতন মনে জায়গা করে নেওয়ার কথা। তাই ছেলের মধ্যে খোঁজা নিজের স্বাধীনতার স্বাদ তাকে ভাবিয়ে তোলে। লখা তখন পাখির মধ্যে নিতাইকে, নিজেকে খুঁজে পান। তাই ভূষণকে তিনি বলেন, পাখিদের জীবনটা কেমন সোন্দর বলো তো, রোজগার করা নেই, সোংসার করা নাই, খালি ওড়া আর ওড়া!

বুদ্ধদেবের এই মোটিফ আর  ফ্রয়েডের স্বপ্ন ব্যাখ্যায় একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ফ্রয়েডের ভাষায়, Ôdreams are wish filment১২ অর্থাৎ স্বপ্ন, চাহিদা পূরণের উপায়। স্বপ্নে কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই প্রকৃত ইচ্ছাটা থাকে ছদ্মবেশে। তাই লখার স্বাধীনতা, নিতাইয়ের ছদ্মবেশ নিয়ে বার বার ধরা দেয় তার স্বপ্নে। ফ্রয়েড যেমন তার মনোঃসমীক্ষণে স্বপ্নের ছদ্মবেশকে সরিয়ে তার নিহিতার্থ (প্রকৃত ইচ্ছা) খুঁজে বের করেন, তেমনি বুদ্ধদেব নিতাইয়ের অন্তরালে লখার স্বাধীন সত্তাকে বার বার তুলে ধরেন। যে জন্য লখা প্রতিবাদ করে বলতে পারেনবাবুরে বইলে দিও পাকি আমি বেইচবো না

শেষ কথা

আমরা যে এতো আমি আমি করি, আসলে কি আমাদের মধ্যে আমি আছে? কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেছি, আমিটা কোথায়, আমার মধ্যে কার বাস? করবোই বা কীভাবে, সেই চেতনাতেও তো মরিচা ধরেছে। তাই সবকিছু আমাদের স্বাভাবিক মনে হয়। বুঝতেও পারি না, আমাদের মধ্যে বাস করা ওই মানুষ আমাদের ঠুলি পরিয়ে যেভাবে বলে আমরা সেভাবে দেখি, ভাবি, ব্যাখ্যা করি। কিন্তু তবুও কেউ সেই ঠুলিকে ভেঙে ফেলে সমাজ-রাষ্ট্র-মানবিকতা-বাস্তবতাকে দেখেন অন্য চোখে। তাই তাকে আবার রাষ্ট্র এমনকি আমরাও দেখি অন্য চোখে। তাই একবার ভেবে দেখা দরকার, আমাদের অনৈতিক নৈতিকতা কতোটা গভীরে নিয়ে গেছে আমাদের অযৌক্তিক যৌক্তিকতাকে। আমরা ভাবতেই পারি না, আমাদের চাওয়া আর আমাদের নেই। তাই কেউ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বললে আমাদের মূলে আঘাত লাগে। আমরা হতাশ হই, এমনকি তাকে পরিত্যাগ করতে দ্বিধা পর্যন্ত করি না; যেমনটা ভূষণ, সারিরা করেছেন লখার আচরণে!

লেখক : হালিমা খুশি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। হালিমা লেখালেখির পাশাপাশি নিয়মিত রবীন্দ্রনাথের গান করেন।

[email protected] 

 

 

তথ্যসূত্র

১. এই আলোচনাটি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কীভাবে ছবি করি কীভাবে ছবি হয় (২০১১) গ্রন্থের ১১ থেকে ১৬ পৃষ্ঠার বিভিন্ন জায়গা থেকে নেওয়া হয়েছে। 

২. দাশগুপ্ত, বুদ্ধদেব (১৯৯৩ : ৩০); কবিতা ও চলচ্চিত্র; স্বপ্ন সময় ও সিনেমা; বাণীশিল্প, কলকাতা।

৩. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত, বুদ্ধদেব (১৯৯৩ : ১৩)।

৪. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত, বুদ্ধদেব (১৯৯৩ : ৩৪)।   

৫. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত, বুদ্ধদেব (১৯৯৩ : ২৯)।

৬. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত, বুদ্ধদেব (১৯৯৩ : ২৯)।

৭. প্রাগুক্ত; দাশগুপ্ত, বুদ্ধদেব (১৯৯৩ : ৩২)।

৮. দাশগুপ্ত, বুদ্ধদেব (২০১১ : ১৭); কীভাবে ছবি করি কীভাবে ছবি হয়; কীভাবে ছবি করি কীভাবে ছবি হয়; পরম্পরা প্রকাশন, কলকাতা।

৯. ফজল, আবুল (২০১৩ : ৩২২); মানবতন্ত্র; সাহিত্য সংস্কৃতি ও জীবন; ফিরিঙ্গী বাজার রোড, চট্টগ্রাম।

১০. বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক (২০১১ : ২৮৭২৮৮); পদ্মা নদীর মাঝি; শ্রেষ্ঠ উপন্যাস; সালমা বুক ডিপো, ঢাকা।

১১. মামুন, আ-আল (২০০৬); মার্কসবাদী মৌল ধারণা ও মিডিয়া বিচারে তার প্রয়োগ; অপ্রকাশিত প্রবন্ধ।

১২. মিত্র, মাধবেন্দ্রনাথ (২০০৯ : ৮৪); মনঃসমীক্ষণ; নির্বাচিত ধ্রুবপদ-২; সম্পাদনা : সুধীর চক্রবর্তী; গাঙচিল, কলকাতা।

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের জুলাইয়ে ম্যাজিক লণ্ঠনের সপ্তম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন