Magic Lanthon

               

আবু সাইয়ীদ

প্রকাশিত ১২ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ঋতুপর্ণ ঘোষ এবং চিত্রাঙ্গদা

আবু সাইয়ীদ


সালটা ১৯৯৯ কিংবা ২০০০ হবে।টেলিভিশনে রিমোট চাপতে চাপতে ভারতিয় কোনো এক বাংলা চ্যানেলে একটি সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান মাঝখান থেকে দেখা শুরু করি। সাক্ষাৎকারগ্রহীতা এবং সাক্ষাৎকারদাতা কাউকেই আমি চিনি না। তবে সাক্ষাৎকারদাতার পরিশীলিত ভাষায় সুন্দর ও গুছিয়ে উত্তর করার ঢঙটি আমাকে আকৃষ্ট করে;সঙ্গে বিষয়ের চমৎকারিত্বে অনুষ্ঠানের বাকি অংশটুকু সেদিন দেখে ফেলেছিলাম। বিশেষ করে একটি প্রশ্নের উত্তর,এক যুগ আগের কথা হুবহু মনে নেই; তবে মূল ভাবটা ছিলো এ রকম-প্রশ্নকর্তা বলছেন,তোমার দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ বাঙালি নারী কে? উত্তরদাতা একটু হেসে বললেন,কিছুদিন আগে এক অনুষ্ঠানে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো শ্রেষ্ঠ বাঙালি পুরুষ কে? আমি উত্তর দিয়েছিলাম,রবীন্দ্রনাথ। আজও আমি তোমার প্রশ্নের উত্তরে বলছি,শ্রেষ্ঠ বাঙালি নারীও রবীন্দ্রনাথ। আমার জন্য একটু হোঁচট খাওয়ার মতোই উত্তর ছিলো এটি। তবে উত্তরদাতা বিষয়টি ব্যাখ্যা করছিলেন এভাবে-পুরুষ-রবীন্দ্রনাথ বাঙালি নারীকে যেভাবে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন তা কোনো বাঙালি,এমনকি কোনো বাঙালি নারীর পক্ষেই সম্ভব হয়নি;বাঙালি নারীর অন্তরের কথা যেভাবে রবীন্দ্রনাথ চিত্রায়ণ করেছেন তা অন্তরে নারী সত্তা ধারণ ছাড়া সম্ভব নয়,ইত্যাদি। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন লেখা থেকে নানা উদাহরণ দিয়ে তার বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছিলেন উত্তরদাতা।

এর কিছু সময় পর, হতে পারে সেটা কয়েকদিন কিংবা মাস;ভারতিয় কোনো এক বাংলা চ্যানেলের একটি অনুষ্ঠান দেখি,নাম এবং ঋতুপর্ণ; সেদিন বুঝলাম ওই দিনের সাক্ষাৎকারদাতার নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ। চলচ্চিত্রনির্মাতা। আমার ঠিক মনে নেই,তখন পর্যন্ত ঋতুপর্ণ ঘোষের কোনো চলচ্চিত্র আমি দেখেছি কি না অথবা ঊনিশে এপ্রিল এবং বাড়িওয়ালি এই চলচ্চিত্র দুটি আমার দেখা ছিলো।

মানব মনের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা নিয়ে ঋতুপর্ণ কাজ করতে পছন্দ করতেন,আমি তার যে চার/পাঁচটি চলচ্চিত্র দেখেছি তাতে আমার এমনই মনে হয়েছে। সরাসরি সমাজ,রাজনীতি,অর্থনীতি নিয়ে তার অতোটা ভাবনা নেই,তার ভাবনা মানুষ নিয়ে,মানুষের সঙ্কট নিয়ে। তবে সেটাও মানুষের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সঙ্কট নয়,মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কট। হয়তো এ কারণেই তার চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোও উচ্চমধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের হয়ে উঠেছে,নিম্নবিত্তের নয়। এছাড়া তার চরিত্রগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছে শিল্পসংশ্লিষ্ট মানুষেরা-কখনো নৃত্যশিল্পী,কখনো মৃৎশিল্পী,কখনো কবি,মঞ্চনাটকের অভিনেতা আবার কখনো চলচ্চিত্রনির্মাতা।চিত্রাঙ্গদা চলচ্চিত্রটির মূল চরিত্র রুদ্রও একজন নৃত্যশিল্পী তথা কোরিওগ্রাফার,নাট্য-পরিচালক;তার জেন্ডার আইডেন্টিটি ও তা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা-এই চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু। রুদ্রর ক্রাইসিসটা চিত্রাঙ্গদা চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে চিত্রনাট্য রচনা করেছেন ঋতু।

মণিপুর রাজের ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে শিব বর দিয়েছিলেন,তার বংশে কেবল পুত্রসন্তানই জন্মাবে। তারপরও যখন চিত্রাঙ্গদার জন্ম হলো, তখন তাকে পুত্র রূপেই বা পুরুষ রূপেই পালন করলেন রাজা। কিন্তু চিত্রাঙ্গদার নারী সত্তা তাকে নারীরূপেই প্রকাশ করলো। ঋতুর চিত্রাঙ্গদায় রুদ্রের পরিবারও রুদ্রকে ছেলে জ্ঞান করেই বড়ো করেন; কিন্তু রুদ্রর মধ্যে নারীসত্তা ছিলো প্রকট,আর তার অনিবার্যতায় শেষপর্যন্ত নারী হবার জন্য রুদ্র অস্ত্রোপচার পর্যন্ত করান।

রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা এবং রুদ্রের ক্রাইসিসের মধ্যে কিন্তু বিস্তর ফারাক রয়েছে। চিত্রাঙ্গদা একজন নারী, শুধু তার বেড়ে ওঠা ছিলো প্রচলিত ধ্যানধারণার একজন পুরুষের মতো বা বাহ্যত তাকে একজন পুরুষ করে রাখা। পক্ষান্তরে রুদ্রর ক্রাইসিস কিন্তু জেন্ডার ক্রাইসিস;সে নারী নয়,আবার পুরুষও নয়। তার শরীরটা পুরুষের কিন্তু ভিতরের মানুষটা নারী। এ কারণে রুদ্রের ক্রাইসিস অনেক বেশি জটিল,অনেক বেশি মানবিক। আর যখন এই ক্রাইসিসটি স্বয়ং এই চলচ্চিত্রের নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষের,যখন ঋতুর চিত্রাঙ্গদা একটি অটোবায়োগ্রাফিকাল ফিল্ম এবং একজন মানুষের গৎবাঁধা স্বাভাবিক জীবন নয়,তখন এই চলচ্চিত্রটি নিঃসন্দেহে আলাদা মনোযোগ দাবি করে। ঋতুপর্ণ ঘোষ এই চলচ্চিত্রে নিজেই অভিনয় করেছেন রুদ্র চরিত্রে;সেটা হয়তো এই চরিত্রটি অন্য কোনো অভিনেতা বা অভিনেত্রী ভালো করবেন না-এমন ভাবনা থেকে নয়,হয়তো এই চরিত্রটির ওপর তার মমতার কারণেই।

হাসপাতালের বেডেই শুরু হয় চলচ্চিত্রটি,কাউন্সিলর শুভর সঙ্গে কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে,ক্লোজশট্‌ রুদ্রের ওপর স্থির,অফ ভয়েসে শুভর সংলাপ। আবার যখন শুভর ওপর ক্যামেরা,তখন অফ ভয়েসে রুদ্র। ক্যামেরার মুভমেন্ট,সংলাপ বলা সবকিছুই বেশ ধীরস্থির,শান্ত।রুদ্র কাউন্সিলর না চাইলেও,রুদ্রের কাউন্সিলর হয়ে যায় শুভ। কয়েকটি সংলাপের মধ্যেই বুঝতে পারা যায়,রুদ্রের পরিচালনায় (চলচ্চিত্রে) করা চিত্রাঙ্গদা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রাঙ্গদার মতো নয়। শুভ সংশয় প্রকাশ করে,এটা যে চিত্রাঙ্গদা-এটা বোঝা যাবে? অথবা একটু বেশিই অটোবায়োগ্রাফিকাল লাগছে না? নাকি সেটাই তুমি চাইছো? এই যে সংশয়,এই সংশয় কিন্তু শুভর না,এই সংশয় রুদ্রের,রুদ্রের মনোজগতের। হাসপাতাল থেকে রুদ্রর জন্য কোনো কাউন্সিলর নিয়োগ দেওয়া হয়নি। শুভর সঙ্গে যতো কথোপকথন তা রুদ্রের সঙ্গে রুদ্রের নিজের,নিজের ভাবনা ও সংশয়ের সঙ্গে বোঝাপড়া। সংশয় যেমন চলচ্চিত্রের শুরুতে,তেমনি মাঝে এবং শেষেও,তা হয়তো চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুর কারণেই যা সরলভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই,সঙ্কটটা জটিল ও বহুমাত্রিক।

বিষয় বৈচিত্র্য ও নির্মাণশৈলীর কারণে ঋতুপর্ণের অন্য চলচ্চিত্রগুলোর মতো চিত্রাঙ্গদাও দর্শককে ভাবায়; যদিও এই চলচ্চিত্রে বেশকিছু মেলোড্রামাটিক দৃশ্য এবং তার পুনরাবৃত্তি রয়েছে। পার্থ,যাকে রুদ্র ভালোবাসে,তার আচরণ ও কর্মকাণ্ড চলচ্চিত্রটির উচ্চাঙ্গীয় ধারার আঙ্গিক গঠনের সঙ্গে অনেকটাই অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে।অর্জুনের আরেক নাম পার্থ,তার সঙ্গে মিল রেখেই হয়তো এই চরিত্রের নাম পার্থ রাখা হয়েছে। অর্জুন যেমন চিত্রাঙ্গদাকে আন্দোলিত করেছিলো,তেমনি পার্থ করেছে রুদ্রকে। পার্থর প্রতি রুদ্রর এতোটা আকর্ষণের কারণ,যা অনেকটাই পাগলের মতো বলা চলে,তা ঠিক বোধগম্য নয়।এর কারণ কি পার্থর শারীরিক গঠন,পার্থ নেশা করে বা পার্থর মেলোড্রামাটিক আচরণ? চলচ্চিত্রের অনেকটা অংশ জুড়েই রুদ্র ও পার্থর শারীরিক মেলামেশা,বিশেষ করে রম্নদ্রের শারীরিক আকাঙ্ক্ষা স্থান করে নিয়েছে। তা এতোটাই বেশি যে, এই চলচ্চিত্রে রুদ্রের একমাত্র ক্রাইসিস যৌনতা,এমনটাই মনে হয়। এই সবই হয়তো হয়েছে বাণিজ্যিকীকরণের চিন্তা-ভাবনা থেকে। ইদানীং অনেকের মধ্যে এমন একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে যে,শিল্পভাবনা,বাণিজ্যভাবনা এবং সঙ্গে আরো কিছু অনুষঙ্গকে একত্রিত করে ঘুটা দেওয়া,যাতে দুকূলই রক্ষা হয়। এমন একটি ক্ষীণ প্রবণতা ঋতুপর্ণ ঘোষের মধ্যেও ছিলো বলে মনে হয়েছে। আবার একজনের ক্ষীণ প্রবণতায় অনুপ্রাণিত হয়ে,অন্যজন প্রকট প্রবণতার দিকে ছুটছেন। প্রবণতাটি সামগ্রিক চলচ্চিত্রযাত্রায় মঙ্গল বয়ে আনছে কি না,যাত্রাটা ঠিকঠাক পথে আছে কি না বা বিষয়ের গভীরতায় পৌঁছুতে কোনো অন্তরতা সৃষ্টি করছে কি না তা সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখা উচিত।

তারপরও নির্মাণের যতো অনুষঙ্গ,ইমেজ,সম্পাদনা,সঙ্গীত,শব্দ,অভিনয় সবদিক থেকে ভারসাম্যপূর্ণ চিত্রাঙ্গদা বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে নিঃসন্দেহে,যেমনটা ঋতুপর্ণের চলচ্চিত্রের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড।

 

লেখক : আবু সাইয়ীদ বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র : কিত্তনখোলা (২০০০),শঙ্খনাদ (২০০৪),নিরন্তর (২০০৬),বাঁশি (২০০৭),রূপান্তর (২০০৮),অপেক্ষা (২০১০)।

[email protected]

 বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।  

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন