সাদেক আলী, সফিকুন্নবী সামাদী ও ম্যাজিক লণ্ঠন পরিবার
প্রকাশিত ০৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘সেখানে ছবি আঁকাটা বা মূর্তি বানানোটা যেমন জানতে হয়, সঙ্গে ফিল্মটাকেও বুঝতে হয়’
সাদেক আলী, সফিকুন্নবী সামাদী ও ম্যাজিক লণ্ঠন পরিবার

[চলচ্চিত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শিল্প-নির্দেশনায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন সাদেক আলী। রবীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি ও সমীর চন্দ-এর মতো বিখ্যাত শিল্প-নির্দেশকের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন বলিউড ও টালিগঞ্জে। এখন কাজ করছেন স্বাধীনভাবে। চারশ’র বেশি বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করা সাদেক-এর উল্লেখযোগ্য হিন্দি কাহিনীচিত্র প্যারানইয়া, শাট আপ লিসেন, কুচ লাভ জ্যায়সা, বাই চান্স,ফয়সালা, কুচ রোকে হুয়ে পাল। চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সস্ত্রীক ঘুরতে আসেন সাদেক। সেই দিন সন্ধ্যায় ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সদস্যদের সঙ্গে আড্ডায় বসেন তিনি। প্রচণ্ড শীতে রবীন্দ্র কলাভবনের ১২৩ নম্বর কক্ষে হালকা উষ্ণতাকে আশ্রয় করে ঘণ্টা দুয়েকের এই আড্ডা রেকর্ডিং থেকে প্রতিলিপি করে ছাপা হলো।]
কাজী মামুন হায়দার : আসলে যেভাবে ফরমালি বসলাম আমরা, বিষয়টা মোটেও এতো ফরমাল না, একেবারে ইনফরমাল, যেটাকে আমরা বলি আড্ডা। সাদেক আলি, বোম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আর্ট-ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন; শিল্প-নির্দেশক যেটাকে আমরা বলি। ফিল্মের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। ফিল্মটা আসলে ডিরেক্টরের মাথায় থাকে, সিনেমাটোগ্রাফারের মাথায় থাকে। কিন্তু সবই থাকে, তাদের মতো করে। কিন্তু এটাকে আরো পরিশীলিত রূপ দেওয়ার জন্য, যেটা ওঠা-নামা থেকে শুরু করে এভরিথিং, সব বিষয়টাকে শিল্পিত রূপ দেওয়ার জন্য যে মানুষটি কাজ করেন একেবারে মঞ্চের পিছন থেকে, তিনি হচ্ছেন আর্ট-ডিরেক্টর। উনি এসেছেন, আমাদের বাংলা বিভাগের প্রফেসর, আমরা সবাই চিনি উনাকে, সফিকুন্নবী সামাদী, ওনার বন্ধু। ওনার সঙ্গে আছেন আয়েশা খাতুন, সহধর্মিনী, উনিও একজন কথাসাহিত্যিক। সব মিলিয়ে যেটা আমরা করবো, একধরনের, যার যা ইচ্ছা, যে রকম কথাবার্তা বলার ইচ্ছা, আমাদের মতো করে। শুধু একটু সচেতন থাকবো, দুইজন একসঙ্গে কথা বলবো না। রেকর্ডিং হবে এটা। আমরা চেষ্টা করবো ট্রান্সক্রিপ্টটা থেকে যাতে ভালো কিছু একটা বের হয়। পুরো আড্ডাটা সঞ্চালনা করবেন স্যার (সফিকুন্নবী সামাদীকে দেখিয়ে)।
সফিকুন্নবী সামাদী : আমার সৌভাগ্য। সৌভাগ্য এই জন্য বলছি, বন্ধু সাদেকের সঙ্গে বসেছি। অনেকবার বসা হয়। আজকে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর আয়োজনে বসছি। আয়োজন বলবো, কারণ ম্যাজিক লণ্ঠন এক ঘণ্টার মধ্যে, এতোটা করতে পারে, এটা কল্পনাতীত। সাদেক আসবেন, হরতাল, সবমিলিয়ে একটা অনিশ্চয়তা ছিলো। ফলে সাদেক কবে আসছেন আমরা বুঝতে পারছিলাম না। গতকাল উনি এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠে আমাকে খবর দিয়েছিলেন। কথা হয়েছিলো আজকে ক্যাম্পাসে দেখা হবে। ক্যাম্পাসে আসতে আসতে ওদের দেরি হলো। সবমিলে যদিও রাজশাহীতে এই শীতে আমরা অভ্যস্ত। তবুও এই সময়টায় আমরা কুঁকড়ে উঠি। তবে সবমিলে এখন কিন্তু ওয়ার্ম। এই ঘরটার দরজা জানালা বন্ধ বলে ওয়ার্ম আছে। সাদেক আলি, মূলত তার সঙ্গে যখনই আমি কথা বলেছি, আমাকে বারবার একটা কথা বলেছেন, ‘ইউ নো, আমি চারুকলা বিভাগে ছবি আঁকার জন্য ভর্তি হইনি। আমার মাথায় ছিলো, আমি ফিল্মের আর্ট-ডিরেকশনে কাজ করবো। সেই জন্যে আমি চারুকলায় পড়েছি।’ ওটা আর্টিস্টদেরই কাজ। কিন্তু, আর্টিস্টদের চেয়েও আরো একটু বেশি কাজ। কারণ, সেখানে ছবি আঁকাটা বা মূর্তি বানানোটা যেমন জানতে হয়, সঙ্গে ফিল্মটাকে বুঝতে হয়। অন্তত ফিল্মটাকে অনুভব করতে হয়। নইলে ঠিক ফিল্মের আর্ট-ডিরেকশনে কাজ করা যায় না। সাধারণত যে প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয়, আই থিঙ্ক, ‘আপনি এখানে কেনো এলেন?’ আমরা সেটা দিয়েই শুরু করবো। প্রশ্নটা হয়তো গতানুগতিক হতে পারে, উত্তর গতানুগতিক নাও হতে পারে! আমরা এখান থেকে শুরু করি। তারপরে সবাই আমরা কথা বলবো। যার যা প্রশ্ন মনে আসে, সেটা আমরা বলবো। মামুন যেটা বললেন যে, একজন কথা বলার সময় আরেকজন নয়; হাত তুললে সেটা...। সাদেক আলি আপনি শুরু করুন।
সাদেক আলি : আর্ট-ডিরেকশনে আসার আগে কোনো কোর্স আমাদের ওখানে, মানে ইন্ডিয়াতে হয় না। সেভাবে কেউ পড়াশোনা করে আর্ট-ডিরেকশনে আসে না। যারা আসে তারা আর্ট কলেজ থেকে আসে। তারপর ওই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ঢুকে কারো সঙ্গে কাজ করতে করতে আর্ট-ডিরেক্টর হয়ে যায়। সেই জায়গায়, আমি যখন আর্ট কলেজে আসি, তখন একজন আর্ট-ডিরেক্টরের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিলো। ঋত্বিক ঘটকের নাম প্রায় সকলে জানেন। ঋত্বিকের প্রায় সব ছবির আর্ট-ডিরেকশন তিনি করেছেন। নাম রবি চট্টোপাধ্যায়। ওনার সঙ্গে আমার প্রথম থেকেই যোগাযোগ ছিলো। উনি আমাকে ইনসিস্টও করেন খানিকটা। আমি যেনো আর্ট কলেজে পড়ি। আর্ট কলেজে পড়াশোনা করলে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আসতে সুবিধা; এভাবেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আসা। এবং সেটাই ঠিক হয়ে গেলো,আমি আর্ট-ডিরেকশনই করবো। তারপর যখন কলকাতায় আর্ট কলেজে আমি অ্যাডমিশন নিলাম, তখন রবি চট্টোপাধ্যায় যেসব ফিল্মে কাজ করতেন, আমি সেগুলোতে কাজ করার ও কাজ দেখার সুযোগও পেলাম। যার ফলে আমার হাতেখড়িটা আর্ট কলেজ এবং ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে একই সঙ্গে হয়ে উঠলো। এইভাবেই আমার আসা। আর আমি যে আর্ট-ডিরেকশনই করবো, সেটা হয়ে গেলো। তারপর কলকাতা আর্ট কলেজ শেষ হলো। রবি চট্টোপাধ্যায়ের বেশ বয়স তখন;কাজ কম করছিলেন। তারপর আমি বোম্বেতে সুযোগ পেলাম,বোম্বেতে তখন খুব বড়ো একজন আর্ট-ডিরেক্টর আমাকে ডাকলেন। তিনি প্রায় ছ’বার ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। ওনার বিখ্যাত ছবি আছে-রুদালি, সর্দারি বেগম, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস, তারপরে আরো একটা ফিল্ম আছে সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল, আছে সর্দার; ফিল্মের নামই হলো সর্দার। রিসেন্টলি রাবণ বলে একটা ফিল্ম এসেছে মনি রত্নমের। মনি রত্নমের দিল সে বলে একটা ফিল্ম আছে। ছ’বার ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, এখনো পর্যন্ত এটা রেকর্ড। কোনো আর্ট-ডিরেক্টর এতোবেশি অ্যাওয়ার্ড পায়নি। তার সঙ্গে আমি কাজ করছিলাম; সমীর চন্দ রিসেন্টলি মারা গেছেন। কলকাতার বাঙালি। ওনার সঙ্গেও কাজ করেছি।
একসময় আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট কাজ শুরু করলাম। অনেকগুলো ফিল্মে কাজ করেছি। সব থেকে বেশি যে কাজটা করেছি সেটা হচ্ছে কমার্শিয়াল-ফিল্ম। যেটাকে বিজ্ঞাপন বলে আর কী। যার কয়েকটা আমি দেখালাম। প্রায় চারশ'র মতো অ্যাডফিল্ম করেছি, টিভি সিরিয়ালও অনেক। একটা টিভি সিরিয়াল আগে হতো, স্বাভিমান সব থেকে বড়ো ডেইলি সোপ ছিলো সেটা। প্রায় পাঁচ বছর ধরে সিরিয়ালটা চলে। এ মাউথ ফুল অব স্কাই নামের সিরিয়াল, যেটা ইন্ডিয়ার প্রথম ইংলিশ সিরিয়াল। সেখান থেকে অনেক আর্টিস্ট তৈরি হয়েছে। পরে কাভি কাভি, গোলমাল নামে সিরিয়াল করেছি। এ রকম আরো অনেক।
সামাদী : অর্থাৎ, আপনার সিরিয়ালেও কাজ আছে। মানে ছোটোপর্দার জন্যও কাজ আছে?
সাদেক : হ্যাঁ। ছোটোপর্দার জন্য অনেক কাজ করা আছে।
সামাদী : আজকাল অবশ্য ওখানে যা দেখতে পাচ্ছি, আমার একদম মানে বার্ডস আই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ছোটোপর্দার সঙ্গে বড়োপর্দার আর তফাতও করা হচ্ছে না।
সাদেক : হ্যাঁ, তাই।
সামাদী : সেই অর্থে ফিন্যান্সিয়াল তফাতও খুব বেশি না মনে হয়!
সাদেক : না, খুব বেশি না। একটা সিরিয়ালে যে পরিমাণ টাকা ইনভেস্ট করা হচ্ছে, ফিল্মের ক্ষেত্রেও ঠিক সেই রকমই। একটা সময় যেটা হয়েছিলো, টিভি এতোটা পপুলার হয়ে উঠছিলো, তখন মনে হচ্ছিলো যে, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির, মানে ফিচার ফিল্মের একটা প্রবলেম হবে। সিনেমাহলে কেউ ফিল্ম দেখতে যাবে না। বাড়িতে বসে যখন দেখতে পাচ্ছি, তখন আর হলে কেনো যাবো? বাড়িতে বসে আমরা মিনিমাম পয়সায় দেখছি। আর হলে যাওয়া মানে অনেক খরচ। কিন্তু আস্তে আস্তে দেখা গেলো, দুটোই একটা প্যারালাল জায়গায়, সিনেমাটা সিনেমার জায়গায়ই থাকলো। যথারীতি লোকে বাড়িতে যেমন সিনেমা দেখছে, তেমনি সিনেমাহলে গিয়েও দেখছে।
সামাদী : একটা ছবির প্রিমিয়ার টেলিভিশনে দেখছে, তারপর তার ইচ্ছে হচ্ছে বড়োপর্দায় দেখার, বড়োপর্দায় দেখারতো একটা মজা আছে আলাদা। আমরা ল্যাপটপে বা আজকাল ডেস্কটপে ছবি দেখছি। তার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ফেস্টিভালে গিয়েও ছবিটা দেখছি।
সাদেক : হ্যাঁ। ছোটোপর্দায় দেখা আর বড়োপর্দায় দেখার পার্থক্য আছে। বড়োপর্দায় যখন একটা ফিল্ম হচ্ছে তখন ডিটেইলটা আমরা ভালো দেখতে পাই। এটা টিভিতে দেখতে পাবো না। লাইট অ্যান্ড শ্যাডো, অনেক সময় ব্যাকগ্রাউন্ড বোঝাই যায় না।
সামাদী : আমাদের ছাত্রজীবনে রিলিজড হলো এ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া।আমরা ব্রিটিশ কাউন্সিলে ছবিটা দেখেছিলাম। একটা দৃশ্যের কথা আমার মনে আছে, লোহার ফ্রেম দিয়ে কাঁচের ঘর, বৃষ্টি পড়ছে সেখানে, কাঁচের উপর দিয়ে রাস্ট গড়িয়ে পড়ছে। সেটার যে ডিটেইল, পরে আমি টেলিভিশনে দেখলাম ডিটেইলই নেই। মানে আবছা আবছা জিনিস কিছু একটা পড়ছে।
সাদেক : মার খাচ্ছে। আমরা যে ইমোশন নিয়ে টিভি দেখছি, সেটা ফিল্মে হচ্ছে না। আবার যখন ঘরে অনেকেই আমরা গল্প করতে করতে টিভি দেখছি, কেউ এলে তার সঙ্গে কথা বলছি। কিন্তু যখন সিনেমাহলে যাচ্ছি, তখন আমার ফোকাস পুরোটাই হচ্ছে ফিল্ম দেখা। যার ফলে ফিল্মটা ভালো করে দেখতে পাই।
সামাদী : সেজন্যই তো।
সাদেক : সেটা তো রয়েছেই।
সামাদী : সেজন্যেই তো ছোটোপর্দায় ছবি বানানো, আর বড়োপর্দায় ছবি বানানোর প্রেসক্রিপশনটাই আলাদা। হয়তো ছোটোপর্দার জন্য হলে ক্লোজ-আপটা বেশি থাকে, মিডিয়াম শট্ বেশি থাকে।
সাদেক : না, সেটা কতোগুলো জায়গায় আছে। খুব বেশি যে আছে, তা নয়। সেখানে ফিল্ম আর টিভি বলে খুব একটা আলাদা কিছু হয় না। কারণ, সমান পরিমাণই কাজ করতে হয়। তবে কতোগুলো জিনিস, যেহেতু ফিল্মে গল্প বলার ব্যাপারটা এতোটাই বেশি, এই ব্যাপারটা তো সবাই জানে, যেহেতু ঘরে ফিল্ম দেখবে লোকে, গল্প করতে করতে দেখবে, খেতে খেতে দেখবে, আরো কিছু করবে। অতএব তার মধ্যে কতোটা আকর্ষণীয় করা যায়, যাতে লোক ইনভল্ব হয়।
সামাদী : তোমরা প্রশ্ন করো।
ফারুক ইমন : ব্যবহারিক জায়গাতে আমার একটা প্রশ্ন ছিলো; সেটা হলো, আর্ট-ডিরেক্টরের কাজ যদিও শিল্প-নির্দেশনার পুরো ব্যাপারটা দেখা। কিন্তু সিনেমার পরিচালকের সঙ্গে যদি কোনো জায়গায় কনফ্লিক্ট বাধে, মানে পরিচালকের আলাদা ইয়ে থাকতে পারে, এভাবে চাই আমি সেটটা, সেই জায়গায় আর্ট-ডিরেক্টরের সঙ্গে পরিচালকের বোঝাপড়াটা কিভাবে হয়?
সাদেক : এটা অনেক সময় হলেও, ডিপেন্ড করে ডিরেক্টর কতোটা স্ট্রং তার ভিজ্যুয়াল জায়গাতে; অ্যাকচুয়ালি সে যেটা চায় এবং সে নিজে কতোটা জানে-তার ওপর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক ডিরেক্টর আছে যার খুব একটা জানা-শোনা নেই। তখন আর্ট-ডিরেক্টর যেভাবে করছে সেটাই হয়। আবার আর্ট-ডিরেক্টর অনেক সময় ভাবে-না, আমি এইভাবেই করবো, কিন্তু ডিরেক্টর বলে-না, আমার এইটাই দরকার, তুমি আমাকে এইটাই করে দাও। সত্যজিৎ রায়ের ফিল্মগুলোতে সে জিনিসটা বেশি পরিমাণে দেখা যায়। সত্যজিৎ রায় এতোটাই স্ট্রং ছিলেন তার জায়গায় যে, আর্ট-ডিরেক্টর শুধুমাত্র সুপারভাইজারের মতো থেকেছে। কারণ, সত্যজিৎ নিজে ড্রইং করে দিয়েছেন, নিজে বলে দিয়েছেন-এটার এই রঙ, এটা এ রকম, এটার ডিজাইন এই হবে। সেটা ডিপেন্ড করে ডিরেক্টরের ওপর। স্ট্রং হলে বলবে আমার গল্পের জন্য এটা দরকার। আর যেহেতু ডিরেক্টর পুরো ব্যাপারটাই তদারক করছে, সে ভিজ্যুয়ালাইজড করছে যে আমার এইটা চাই। একজন আর্ট-ডিরেক্টর তো অনেক পরে আসে। ডিরেক্টর যখন থেকে লিখছে, তখন থেকে সে ভিজ্যুয়ালাইজ করছে, আমি এটাই করতে চাই। আমাদের কাজ তো তাকে সাপোর্ট করা। যে ক্যারেক্টার আছে, সেই ক্যারেক্টার অনুযায়ী আমরা মেক-আপ করছি, সেইভাবে ড্রেস করছি। তো আমরা ঠিক সেইভাবেই তার ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করছি।
ইমন : মূল ভাবনাটা পরিচালকের মাথায় থাকছে। দেখা যাচ্ছে, শিল্প-নির্দেশনার ব্যাপারটি পুরোপুরি আর্ট-ডিরেক্টারের হাতেই থেকে যাচ্ছে, এ রকম হচ্ছে...
সাদেক : হ্যাঁ। যেমন সঞ্জয় লীলা বানসালির দেবদাস আর পুরনো যে দেবদাস পাই প্রমথেশ বড়ুয়ার; অথেনটিক দিক থেকে দেখলে পুরনোটা অনেক বেশি অথেনটিক, যা হওয়া উচিত-সেইভাবেই সে করেছে। কিন্তু যখন সঞ্জয় লীলা বানসালি বানালো সেখানে দেখি, আমরা জানি পরিণীতা একটা সাধারণ ঘরের মেয়ে, একটা গ্রামের, তাকে একটা রাজরানি করে তুললো। তার বাড়ি রাজপ্রাসাদের মতো।
আয়েশা খাতুন : পার্বতী।
সাদেক : হ্যাঁ। তার বাড়িও সেরকম দেখালো। তো একটা ফিল্মের জন্য আমরা যেটা বলি যে, মূল ভাবনাটা আসলে পরিচালকের মাথায় থাকছে।
সামাদী : বানসালির দেবদাসকে কি অরিজিনাল বোম্বেটে দেবদাস বলতে পারি?
সাদেক : আসলে, তখন তো আমরা কথায় কথায় বলতাম-এটা হিন্দি সিনেমা, মানে হিন্দি সিনেমা। তখনো বোম্বে কথাটা এভাবে আসেনি...।
সামাদী : ওই... ইটস্ অল ক্যারেক্টারাইজিং।
সাদেক : হিন্দি সিনেমাকে আমরা হিন্দি সিনেমা বলতাম, কিন্তু বোম্বে কথাটা অতোটা ছিলো না।
সামাদী : ওর প্রশ্নের সূত্র ধরে আমি আরেকটি প্রশ্ন করি, ডিরেক্টর জানেন না, তাহলে ডিরেক্টর সত্যিই জানেন না আসলে তিনি কী চান? এই দৃশ্যটাকে কিভাবে ভিজ্যুয়ালাইজ করবেন? অথচ আপনাকে বা কোনো আর্ট-ডিরেক্টরকে বললেন, আমার এই এই দরকার। আর্ট-ডিরেক্টর নিজে থেকে সেটা বুঝলেন এবং করলেন। ডিরেক্টর বললেন, বাহ্ আমি হয়তো এভাবে ভাবিইনি, এই রকম কি আপনার ক্ষেত্রে ঘটেছে কখনো?
সাদেক : বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তো সেইটাই হয়। কারণ হচ্ছে, আমাদের ওখানে আমি যেভাবে দেখেছি কলকাতাতেও দেখেছি, বেশিরভাগ ডিরেক্টরই হয়তো খুব বেশি আর্ট-ডিরেকশনটা কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে জানে না। মানে হাতে গুণতি কয়েকজন মাত্র, যারা এই ব্যাপারটা খুব ভালো করে মানে; তারা বলে আমার এটাই দরকার; আদারওয়াইজ আর্ট-ডিরেক্টর যা করে সেইটাই। জয়াচন্দ্রা নামে একজন ডিরেক্টর আছেন, আমি অনেক সময় এ রকম কিছু বলতে গেলে আমাকে এ রকমও বলছে, আর্ট-ডিরেক্টর ম্যা হু কি আপ হ্যাঁয়?
সামাদী : ডিরেক্টর?
সাদেক : জি, হ্যাঁ। না, ও ওইভাবে বলছে যে, আর্ট-ডিরেক্টর ম্যা হুঁ কি আপ হ্যাঁয়, মানে সে ডিরেক্টর।
সামাদী : ও, আমি নিজে বলবো না, সামাঝ লিজিয়ে।
সাদেক : সামাঝ লিজিয়ে, তার মধ্যে মহেশ ভাটও ওরকম। ও দাদা আপ করিয়ে না, আপ জেয়সা পসান্দ করতে হ্যাঁয়। মানে আপনি যেমন পছন্দ করেন সেইভাবে; এ রকম আর কী।
সামাদী : তবে সে কি কোনো সাজেশন আপনাকে দেয়, নাকি আপনার কাছে স্ক্রিপ্টটা ছেড়ে দেয়?
সাদেক : হ্যাঁ সাজেশনতো দেয়, সঙ্গে স্ক্রিপ্টও।
সামাদী : স্ক্রিপ্টটা ছেড়ে দেয়?
সাদেক : আমরা প্রথম যখন কাজ শুরু করি, তখন একটা স্ক্রিপ্ট দেওয়া হয় পুরো গল্পটা কী তার একটা স্কেচ। স্ক্রিপ্টটা আমি পড়ে, তারপর ওদেরকে ইয়ে করি। তারপর ডিরেক্টর, ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি এবং আর্ট-ডিরেক্টর-তিনজন মিলে একটা আলোচনা হয়; সেট কী ধরনের হওয়া উচিত, কী ধরনের কালার হবে, বিশেষ করে কালার আর স্পেস এইগুলো ক্যামেরাম্যান ঠিক করে।
সামাদী : স্পেসিয়ালি আমি এটা জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম, বিশেষ করে কালার চুজ করার ক্ষেত্রেতো অবশ্যই ফটোগ্রাফারের মানে সিনেমাটোগ্রাফারের মত নিতেই হয়।
সাদেক : নিশ্চয়ই। তার কারণ, আমরা যে ফিল্ম ব্যবহার করছি, একটা সময় একেক ধরনের ফিল্ম ব্যবহার করা হয়। ডে হলে এক রকম হবে, নাইট হলে এক রকম হবে, হাই স্পিড আছে, তারপর আউটডোর হলে একরকম হবে। ফুজি ফিল্মে একরকম কালার হয়, কোডাকের একরকম কালার হয়। তো সেজন্য ক্যামেরাম্যান কী ধরনের কালার ব্যবহার করবে, সেটা আর্ট-ডিরেক্টর নির্ধারণ করে দেয়।
সামাদী : কনট্রাস্টটা আনতে হলেও, মানে কোন্ কালারটা ক্যামেরায় কী আসবে, সেটাওতো খানিকটা সিনেমাটোগ্রাফারের?
সাদেক : এটা আর্ট-ডিরেক্টরই ভালো বোঝে। কারণ, কিভাবে সে লাইট করবে।
সামাদী : এখন, এই যে আমরাতো রিয়েলস্টিক ফিল্ম কিছু দেখতে পাচ্ছি। কিছু আছে সাজেস্টিভ। এই সাজেস্টিভ ফিল্মে ডিরেক্টর কী চায়? আপনি কী করেন? মানে সাজেস্টিভ অথবা সিম্বলিক ফিল্ম খুব শিল্পসমৃদ্ধ ফিল্ম হতে পারে, আবার খুব সাধারণ সিম্বলিক ফিল্মও হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে ডিরেক্টরের চাওয়া আর আপনার কাজ করার মধ্যে সমন্বয়টা কিভাবে হয়?
সাদেক : কোন্ পরিপ্রেক্ষিতে, মানে কিসের জন্য আমরা সেটা বানাচ্ছি, সেভাবে ডেকোরেশনটা করা হয়।
সামাদী : এই মুহূর্তে আমি-অন্যের কাজ যদিও-সাওয়ারিয়া ছবির কথা, অথবা আরেকটা ছবির কথা আমি বলতে পারি খুব পপুলার হয়েছে ওম শান্তি ওম। আমার অনেক বন্ধুর সঙ্গে আমি একমত নই, এই দুটো ফিল্মকেই আমি ভালো ফিল্মের তালিকায় রাখতে চাই। প্রশ্নটা হলো, সাওয়ারিয়াতে যে সেট ব্যবহার করা হলো, এই সেট কেনো ইচ্ছে করে বুঝিয়ে দেওয়া হলো-দিস্ ইজ সেট, দিস্ ইজ নট রিয়েল; এইটার ব্যাখ্যা আপনার কাছে কী?
সাদেক : আমি ঠিক জানি না, এটা ডিরেক্টরের ব্যাপার। পুরোটাই একটা সাজেস্টিভ ওয়েতে এবং অনেকটাই ড্রামার মতো করে বা অনেকটা ফ্যান্টাসি ধরনের করা হয়েছে। এটা আমি ঠিক বলতে পারবো না। ডিরেক্টরের...
সামাদী : না। আমি জানি না, আপনি আমার সঙ্গে একমত হবেন কি না-মতটা জানতে চাচ্ছি, আপনি তো দেখেছেন ছবিটা?
সাদেক : দেখেছি।
সামাদী : ডিরেক্টর একটা ড্রিমের ভিতরেই রাখতে চেয়েছেন, পুরো গল্পটাই কিন্তু একটা ড্রিম আসলে। এবং এই যে ড্রিম, শুধুই স্বপ্ন, বাস্তবের সঙ্গে এর মিল থাকতে পারে বা বাস্তবে এর প্রভাব থাকতে পারে; কিন্তু এটা আসলেই স্বপ্ন। এই কথাটিই বারবার কি বলতে চান এই সেট দিয়ে?
সাদেক : সেটাই অনেকটা করেছে। কিন্তু একটা জিনিস যেটা আমরা জানি, ফিল্মের ক্ষেত্রে, ফিল্ম হচ্ছে রিয়েল বা রিয়েলিস্টিক মিডিয়া, ফিল্ম কখনো লোকে সাজেস্টিভ বা ইয়েতে খুব একটা পছন্দ করে না। এভাবে যে ফিল্ম হয়েছে সেগুলো সাকসেস্ও হয়নি। সেইভাবে সাওয়ারিয়া ফিল্মটাও সাকসেস্ হয়নি। মানে ফিল্ম হিসেবে, মানে দর্শকরা ফিল্মটাকে একেবারেই নেয়নি। আর এ রকম যতো ফিল্ম হয়েছে দেখা গেছে, ফিল্মে সাজেস্টিভ লোক খুব একটা পছন্দ করে না। আমরা নাটকের ক্ষেত্রে দেখতে পারি, নাটকের স্টেজে দেখতে পারি। কিন্তু ফিল্মে যখনই দেখছি যে, ফিল্ম অ্যাকচুয়ালি যা জানি, দেখি, সেইটাই হওয়া উচিত। সেটাকেই লোকে পছন্দ করে; সাজেস্টিভ খুব একটা চলে না।
সামাদী : আপনারা যখন লোকেশনে কাজ করেন, ওটাতো আলাদা জিনিস, আউটডোরে কাজ করেন। সেখানে আর্ট-ডিরেক্টরের কাজ কী থাকে মূলত?
সাদেক : অন ইভেন্ট, কোন্ জায়গাতে করছি, যেমন আগে একটা ফিল্ম দেখলাম, ওই এলআইসি (আড্ডা শুরুর আগে সাদেক তার বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনফিল্ম আমাদের দেখিয়েছিলেন) বোটের পাঁচটা মেয়ে একটা জলের মধ্যে একটা নৌকা ইয়ে করলো; তারপর ওইটা গঙ্গার বিভিন্ন জায়গা বইতে বইতে লাস্টে শেষ হচ্ছে সমুদ্রে গিয়ে। এটা বেশিরভাগই হয়েছে আউটডোরে। কিন্তু এখানে প্রচুর কাজ আছে, ছোটো ছোটো কাজ। কিন্তু দেখে বোঝাই যায় না। যেমন একটা জায়গাতে, ওই যে নৌকাটা যখন আসছে, একটা জায়গাতে কতোগুলো ছোটো শুকনো গাছ ছিলো, তার মধ্যে আটকে গেলো। গাছের গুড়ি আমরা বানিয়েছি। এটা কাউকে আমি যদি না বলি, তার পক্ষে বোঝা সম্ভবই না যে, এটা সেট। এ রকম প্রচুর জিনিস হয় যেগুলোকে...
সামাদী : আপনি একটু আগে বলছিলেন, আমাকে পাঁচশ নৌকা বানাতে হয়েছে।
সাদেক : না, পাঁচ হাজার। পাঁচ হাজার নৌকা বানিয়েছি। যেগুলোকে ফিল্মে দেখে বোঝা যাবে না। ওয়াটার ফলস্ যেখানে রয়েছে ওখানে এতো স্পিডে জলটা আসে, যখন আমরা নৌকাটা দিচ্ছি ক্যামেরা ধরার আগেই তা কোথায় ভ্যানিস হয়ে যাচ্ছে। ওকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লাস্টে আমরা কী করেছি, ওগুলো প্লাস্টিক সুঁতো দিয়ে বেঁধে বেঁধে একটা একটা করে কোনো রকমে ধরে কিছুক্ষণ রাখছি, তার মধ্যে যেটুকুন নিতে পারছি এ রকম। তারপরে যে নৌকা যাচ্ছে, সেখানে ওই একটা ছোটো ব্রিজের মতো ছিলো তার মধ্যে দিয়ে নৌকাটা নিচে পেরিয়ে এলো। সেখানে ওই প্লাস্টিক সুঁতো দিয়ে বেঁধে রেখেছি। তারপর আস্তে আস্তে কখনো তার মধ্যে...
সামাদী : আর্ট-ডিরেক্টর হিসেবে আপনার কি বিষয়টি জানা ছিলো, এ রকম একটা পরিস্থিতির শিকার আপনাকে হতে হবে, নাকি ওখানে গিয়ে আপনাকে আবিষ্কার করতে হয়েছে?
সাদেক : আমি এটা কাজ করতে গিয়ে দেখেছি। আর্ট-ডিরেক্টরদের উপস্থিত বুদ্ধি থাকা ভীষণ দরকার। না হলে খুব মুশকিল। কারণ বোঝা যায় না, এখন কী হবে। ইমিডিয়েট কিছু একটা ভাবতে হবে, যাতে এইটাতে করলে আমরা কাজটা করতে পারবো বা কোনো জিনিস নেই, অন্য কী দিয়ে আমরা সেটাকে করতে পারি এ রকম।
আয়েশা : এইখানে তোমার ওই আইসক্রিমের, আমি একটু বলতে চাচ্ছি।
সামাদী : নিশ্চয়ই।
আয়েশা : আইসক্রিমের যে অ্যাড দিচ্ছিলো, এটা দেখলে তো মনে হবে সেটা আইসক্রিম। কিন্তু ওটা আইসক্রিম ছিলো না। ওটা কী ছিলো বলো? যখন কিছুতেই ফ্রেমে ধরা যাচ্ছিলো না। আমি ওর সঙ্গে যাই মাঝে মাঝে দেখতে। তো বিশ্বাস করা যায় না, ওটি কি। ওরা কোলগেট দিয়ে আইসক্রিম তৈরি করেছে।
সাদেক : এইগুলো থাকে অনেক সময়। যেমন আমরা ক্রিমের, কোল্ড ক্রিমের অ্যাড বা যেগুলো জিনিস, যেমন আইস ক্যামেরাতে ধরা যায় না। যার জন্য আলাদা আমরা অ্যাক্রিলিক দিয়ে ওই সাইজের কিউব বানাই।
সামাদী : সিনথেটিক।
সাদেক : সিনথেটিক। আমরা যখন ওই ওয়াইনের মধ্যে আইস দিচ্ছি, তার মানে অ্যাক্রিলিকের আইস (আড্ডারতদের উচ্চস্বরে হাসি)। কেননা অরিজিনাল আইস ক্যামেরাতে ধরা যায় না। ওটা জলে এতো ট্রান্সপারেন্ট হয়, ওই ফ্রেমটাতে আর পাওয়া যায় না।
সামাদী : দ্যাট মিনস ইওর ওয়ার্ক ইনক্লুডস দ্যাট প্রপস্।প্রপস্তো আপনাদের করতে হয়, মানে ফিল্মে তাহলে যখন কাজ করেন সেখানে প্রপস্টাও সেটের মধ্যেই আসছে?
সাদেক : একটা হচ্ছে কন্সট্রাকসন্স,আরেকটা হচ্ছে প্রপস্। সেই জন্য আর্কিটেক্ট আমাদের ইউনিটের ডিপার্টমেন্টে ইনভল্ব হয়। একটা হচ্ছে আর্কিটেক্ট, যেটা আমরা ঘরবাড়ি বানাচ্ছি, আরেকটা হচ্ছে ইনটেরিয়র, আরেকটা আর্ট, আমি আর্টিস্টিক ওয়েতে কিভাবে করছি। কারণ, আমরা যা দেখি সেটাকেই সরাসরি করি না, আমরা তার চেয়ে একটু ভিন্ন করি। যাতে লোকেদের আরো ভালো লাগে। কারণ, আমাদেরতো অনেকে ফলো করে। যেমন আমরা যে সমস্ত পর্দাগুলো ব্যবহার করি, হয়তো অরিজিনালি যে পর্দা হয়, তা ব্যবহার করি। আমরা ড্রেস ম্যাটেরিয়ালের কাপড় ওখানে ব্যবহার করি বা বেডশিট। আমরা খুব ভালো শাড়ি দেখলাম সেই শাড়িটাকে আমি সেলাই করে পর্দা করলাম অথবা বেডশিট করলাম। যেটা নরমালি কিনতে গেলে কোথাও পাবো না।
সামাদী :সেটের ক্ষেত্রে আমাদের, আমি বাংলাদেশের নাটকের কথা বলছি-এদেরও আমি বলতে চাই, আমাদের খুব বড়ো বড়ো নাট্যকাররা বা ডিরেক্টররা কখনো কখনো মানে দারিদ্রে ভোগে, মানসিক দারিদ্রে ভোগেন। আমার মাস্টারমশাই খুব বড়ো নাট্যকার। আমি তখন জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র। তখন মাত্র ‘নুরুল দীনের সারা জীবন’ মঞ্চে এলো। বিশাল সেট, মানে ওই সেটই আসলে, ঢাকায় তখন এতো বড়ো হল ছিলো না যে, এই সেট ধারণ করে। তবু কৌশলে সেই সেট ধারণ করলো। তো আমার মাস্টারমশাই সেলিম আল দীন বললেন-জানিস, আমি ‘নুরুল দীনের সারা জীবন’ দেখতে গিয়েছিলাম, সেট দেখলাম। আমি কিন্তু ‘কেরামত মঙ্গল’ অর ‘কীত্তনখোলা’, আমার ঠিক মনে নেই, সম্ভবত ‘কেরামত মঙ্গল’-এ; আমি এমনভাবে লিখছি, এর চেয়ে বড়ো সেট ব্যবহার করবো। আপনাদের ফিল্মে কি এ রকম কখনো ঘটে যে, অসম্ভব একটা বড়ো সেট বা এ রকম বড়ো রকমের কিছু একটা করে তাক লাগিয়ে দিতে হবে, এ রকম কারো কারো প্রবণতা কি আছে? নিশ্চয়ই আপনাদের প্রতিদ্বন্দ্বীতাও আছে।
সাদেক : হ্যাঁ, আছেতো। আমি বললাম তো, সঞ্জয়লীলা বানসালির দেবদাস তার একটি বড়ো উদাহরণ। এ রকমতো প্রচুর আছে। আমরা যেগুলো দেখি, ফিল্মে বিশেষ করে আগে, যেটা এখন হিন্দিতে চেঞ্জ হয়েছে, এখন সেই ট্রেন্ড চেঞ্জ হচ্ছে। আগে দেখতাম, বেশিরভাগেই বিশাল বড়ো একটা ঘর হবে, তার মাঝখানে একটা সিঁড়ি হবে, উপরে একটা বারান্দা-এ ধরনের এগুলোতো আগেই ছিলো। যা নরমালি ঘর হয় তার থেকে অনেক বড়ো সাইজ হচ্ছে, তার বাড়ির ডেকোরেশনেও তাই। যে যা নয়, তাই ফিল্মে হয়ও।
আয়েশা : আমার মনে হয়েছে যেটা আপনার প্রশ্নে যে,পা সিনেমা। পা সিনেমার যে বেডরুম দেখাচ্ছে... ওখানে যে সেটটা ব্যবহার করা হয়েছে সেটাতো দরকার ছিলোই না, পরিষ্কার সব। কিন্তু এতো জিনিস, এতো প্রাচুর্য ওখানে দেখিয়েছে, সেটা মনে হয় যে, ভিক্টোরিয়ার প্রাসাদেও নেই। অথচ একজন ডাক্তারের ঘর ওটা!
সামাদী : আচ্ছা, সেইটাতো একটা দিক, এর পজেটিভ কোনো ব্যাপার কি দেখতে পান?
আয়েশা : পজেটিভ...
সাদেক : ঠিক পজেটিভ বা এভাবে নয়।
সামাদী : একটা ছবির নাম মনে করিয়ে দিচ্ছি, ওটাকে সামনে রেখে যদি কথা বলেন, বিধু বিনোদ চোপড়ার সম্ভবত প্রথম ছবি ১৯৪২ : এ লাভ স্টোরি। যে সেট বানালো, পুরনো কোনো বিল্ডিং সে নিলো না। সেটাতে কি পজেটিভ কিছু ঘটেছে সেটের ক্ষেত্রে?
সাদেক : না। ফিল্মের ক্ষেত্রে কী হয়েছে, আমার ফিল্মটা দেখতে ভিজ্যুয়ালি কতোটা রিচ হবে, দেখা যাবে যে প্রচুর কিছু করেছে সেরকম টেন্ডেন্সি থেকেই করা হয়েছে। অনেক জায়গাতেই তাই হয়, যেমন আমরা গল্পের ক্ষেত্রেও দেখি আমাদের টিভির ইয়েতে, কোনো কিছু হলেই আমি ব্ল্যাংক চেক দিয়ে দিলাম, যতো খুশি ভরে নাও, (উপস্থিত সবার হাসি) তার অ্যাকাউন্টে কতো টাকা আছে আমি জানি না, কিন্তু চেক দিয়ে দেয়। কিংবা কথায় কথায় চার কোটি দিয়ে দিলাম, পাঁচ কোটি দিয়ে দিলাম! এইগুলো শুনতে ভালো লাগে বা যাদের হয়তো পয়সা নেই, তারা অন্তত এইটা শুনেও খুশি যে, পাঁচ কোটি টাকার একটা চেক দেখলাম। এটাতে একটা ফিল্মের ব্যাপার কাজ করে আর কী।
সামাদী : এর বিপরীত কি কিছু ঘটে? কোনো ডিরেক্টর কি এ রকম ভাবে, যিতনা কর্ সক্তে সিম্পল কারো?
সাদেক : এইটাতো একটা সময় ছিলো, কিন্তু এখন ওতোটা নেই।
সামাদী : আপনার এক্সপেরিয়েন্সে কি কোনো ডিরেক্টর আছে, আমি সিমপ্লিসিটির মধ্যে আমার বিউটিটাকে আনতে চাই। আপনার মনে পড়ছে কি, এ রকম কারো নাম এখন?
সাদেক : আছে। যেমন শ্যাম বেনেগাল আছে, মনি রত্নম আছে। আমার কী দরকার, যেটা অনেক সময় থাকে মাথাতেও, যা আমি ফিল্মে করেছি। এটা মনে হচ্ছে, এ রকম করলে ভালো লাগবে, অনেক সময় সে ডিরেক্টর বলে দিয়েছে-না না এগুলো দরকার নেই, এটা বেশি হচ্ছে। এ রকম অনেক সময়ই হয়েছে। অ্যাডের ক্ষেত্রে তো খুব ইয়ে, অ্যাড হচ্ছে খুব মানে খুব ম্যাথোডি, যেহেতু ওই ১০ সেকেন্ড, ৩০ সেকেন্ড এ রকম একটা ইয়েতে হয়,ম্যাক্সিমাম এক মিনিটের হয় আর কী। ওই সময়ের মধ্যে একটা ফিল্মের যা বাজেট হয়, যদি এক কোটি টাকার একটা ফিল্ম হয় তো অলমোস্ট এক কোটি টাকার একটা অ্যাড হচ্ছে; যেমন আমি এলআইসি বোটের যে অ্যাডটা করেছি ওইটা ৭৫ লাখ রুপির অ্যাড ছিলো। অথচ এখানে কোনো নামকরা আর্টিস্ট নেই, কিচ্ছু নেই। কয়েকটা আর্টিস্ট যারা অলমোস্ট ওখানকারই লোক। আমরা এই অ্যাডটা করেছিলাম রিশিকেশ, কেদারনাথ ওইখান থেকে শুরু করে হরিদ্বার, তারপরে বেনারস, তারপর কলকাতা।
সামাদী : একদম গঙ্গার ধারা ধরে?
সাদেক : হ্যাঁ। গঙ্গারই এটা, গঙ্গোত্রী থেকে কেদারনাথের ওখানে। আমরা একদম গঙ্গোত্রী যাইনি, ওই কেদারনাথের ওখানে একটা ক্যানেল। কারণ আমরা তো ওসব চিট করি, একবার এদিকে ক্যানেল যখন দেখাচ্ছি, আরেকবার ওদিকে দেখাচ্ছি-তখন পুরো ব্যাপারটাই উল্টে যায়। সেই ছোটো ক্যানেলটাকেই আমরা গঙ্গার উৎস দেখিয়ে দিলাম (সবার হাসি)।
সামাদী : (হাসতে হাসতে) সেটাতো করতেই হবে।
সাদেক : আর দরকার নেইতো। আমরা তো ভিজ্যুয়ালি দেখাতে চাইছি, এটা এই। গঙ্গার উৎস থেকে, ওই একটা ছোটো জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে গঙ্গাটা বড়ো হচ্ছে।
সামাদী : কমার্শিয়ালের কথা যখন এলো, এতো বড়ো বাজেট, এতো পরিশ্রম করে কাজ হচ্ছে। অথচ কমার্শিয়াল এক-দেড় মিনিটের হয়। আজকাল আমাদের দেশে সেলফোন কোম্পানিগুলো খুব পয়সা হাতাচ্ছে, তাতো বোঝাই যাচ্ছে তাদের অ্যাড ফিল্মের লেন্থ দেখে। এই যে এতোটা অ্যাফোর্ট দেয়া হচ্ছে, এই অ্যাফোর্টে কি কিছু পাচ্ছে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি? আপনার, অ্যাফোর্ট বলতে আমি বুঝাচ্ছি, টাকার চেয়েও বড়ো হলো এতো আর্টিস্ট; সবাইকে আমি আর্টিস্ট ধরছি, ডিরেক্টর, আর্ট-ডিরেক্টর এবং সেখানে যদি অ্যাক্টর থাকে তাহলে সবাই যে অ্যাফোর্ট দিচ্ছে, এই যে তার যে প্রাপ্তি, শিল্প হিসেবে যে প্রাপ্তি, সেটা কি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে কোনোভাবে কন্ট্রিবিউট করছে?
সাদেক : কমার্শিয়ালের ক্ষেত্রে?
সামাদী : কমার্শিয়ালটা করছে কী?
সাদেক : না, কমার্শিয়ালটা বেসিক্যালি একেবারেই কমার্শিয়াল পয়েন্ট অব ভিউতেই দেখা হয়। সেখানে বিজনেস করছে। তার সঙ্গে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি মানে আর্টের রিলেশন বলা যেতে পারে, নেই। এতে কী হচ্ছে, কে কতো ভালো করতে পারে, এই টেন্ডেন্সি কিন্তু ডিরেক্টরের থাকে; আমি কম সময়ের মধ্যে কতো ভালো একটা ফিল্ম বানাতে পারি।
সামাদী : সেটার উদ্দেশ্যটা কী? আমি একটি শিল্প বানালাম নাকি পরে আরেকটা কাজ পাবো?
সাদেক : দুটোই, দুটোই মাথায় রাখে। তার কারণ, এখানে যে ক্লায়েন্ট, যার প্রডাক্ট, সে তা একটা অ্যাডভার্টাইজমেন্ট এজেন্সিকে দিচ্ছে; মাঝখানে এজেন্সি থাকছে। তারপর প্রোডাকশন হাউজ, যারা ফিল্মটা বানাচ্ছে; আসলে তিনটে স্তর আছে। ক্লায়েন্ট তো বলে দিচ্ছে, তুমি আর্ট করবে কী, কী করবে সেটা পরের ব্যাপার, আমার যে জিনিস সেইটা যেনো ঠিকঠাক দেখানো হয়, আমার বিক্রি হয়।
সামাদী : আপনার নিশ্চই মনে পড়বে সেই বিখ্যাত ছবিটি, শাবানা আজমি আর কুলভূষণ খারবান্দা এবং স্মিতা পাতিল কাজ করেছিলেন। মানে ছবিটা দেখানো হচ্ছে, দেখানোর পরে এবারে বিজনেসম্যান বলছে, ভালো হয়েছে, খুব ভালো হয়েছে, কিন্তু আমার প্রোডাক্ট কই?
সাদেক : সেটাই। এটাতো অবশ্যই থাকে। তাইতো ওই তিনটে চেইনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এরপরে ডিরেক্টরের ওপরে নির্ভর করে, সে কতোটা ভালো ফিল্ম বানাতে চায়। উদ্দেশ্য ঠিক থাকলো, যার প্রোডাক্টের জন্য করছি সে যেনো আল্টিমেট খুশি হয়, আমার প্রোডাক্ট ভালো হয়েছে।
সামাদী : না, তাহলেতো অন্তত একটু শৈল্পিক তৃপ্তি থাকে। আর কমার্শিয়ালে?
সাদেক : হ্যাঁ, অনেক থাকে। আমি সেটাও বলতে চাইছিলাম, একটা টেন্ডেন্সি কাজ করে, ওই যে আমাকে কুড়ি সেকেন্ডে দেখাতে হবে। ডিরেক্টর ভাবে, আমি একটা ভালো কাজ করলাম। সেটা যেনো ভালো...
সামাদী : তাহলে এইটাকে আমরা আর্টিস্টিক একটা তৃপ্তি...
সাদেক : আর্টিস্টিক তৃপ্তি অবশ্যই থাকে। একটা সুবিধা হচ্ছে যে, এখানে টাকাটা অনেক বেশি। বাজেট, বাজেটওয়াইজ যেটা হয়। যা হয়তো খরচ হচ্ছে সবসময়ই বাজেট করা হয় তার ডাবলেরও বেশি। এ রকম অনেক অ্যাড আছে, যেগুলো হয়তো আমাদের এখানেই করা যেতো। অথচ আমরা ইচ্ছে করেই চলে যাচ্ছি অন্য জায়গাতে টাকাটা খরচ করতে। আমি একটা অ্যাড ফিল্ম করেছিলাম আইসিআইসিআই ব্যাংকের। বোম্বেতে আমরা অনেকগুলো শুট্ করেছি। তারপর কথা হলো আমরা ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে শুট্ করবো। এমনি এইপাশে একটা রাস্তা আর এইদিকে একটা রাস্তা আছে, মাঝখানে একটা ডিভাইডার, তার মধ্যে কিছু গাছ-টাছ আছে। জাস্ট ওখানে এক বাবা তার ছেলেকে সাইকেল চালানো শেখাচ্ছে। সাইকেলটা জাস্ট চালাতে চালাতে ছেড়ে দিচ্ছে, আর অপজিট সাইডে মানে রোডের ওই সাইডে একটা এটিএম সেন্টার দেখা যাচ্ছে, জাস্ট এ টুকু। ওই মাঝখানে একটা ডিভাইডার আছে। এইটা মানে এই শুটিংটা করার জন্য ব্যাঙ্গালোরে যাওয়ার কোনো দরকার ছিলো না। মাঝখান থেকে হঠাৎ করে দেখি তার জন্য প্রায় ৬০ জন লোককে ফ্লাই করে নিয়ে যেতে হলো। তাদেরকে হোটেলে রাখলো তিনদিন ধরে। আবার ওখান থেকে শুটিং করে ফিরে এলো। এটা বোম্বেতে...
সামাদী : একটা গ্র্যান্ড হওয়া, একটা প্রবণতা...
সাদেক : হ্যাঁ, সেটাই আর কী। তারপরে ক্লায়েন্টকেও দেখাচ্ছে, দেখো আমার এই শুটিংটা ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে করলে অনেক ভালো হবে। তার জন্য টাকার দরকার হবে, টাকাটাতো ও দেবে। একটা আইডিবিআই ব্যাংকের অ্যাড আছে। দুটো বাচ্চা আর কোনো কিছুই নাই। তারা স্কুল থেকে পালিয়ে ফুটবল খেলবে। একটা জঙ্গলের মতো জায়গা আছে, সেখানে গিয়ে ওই জঙ্গলের দুটো কাঠ নিয়ে একটা-দুটো পোল বানিয়ে নিলো, নিয়ে খেলতে যাচ্ছে, তখন একটা হাতির বাচ্চা বেরিয়ে আসে। তারপর দেখা যাচ্ছে, হাতির মা-টাও বেরিয়ে আসে। ওরা দুজনে গোল পোস্ট উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে অন্য জায়গাতে বসাচ্ছে, আবার হাতির বাচ্চাটা সেখানে চলে আসছে। তার মানে হাতির বাচ্চাটা বল খেলবে-এ রকম। এই শুটিংটা আমরা ইন্ডিয়াতে যেকোনো জায়গায় করতে পারতাম। কিন্তু সাউথ আফ্রিকায় শুট্ করলাম। যে বাজেটটা, ওইটা যদি আমরা এখানে শুট্ করতাম কুড়ি থেকে ৫০ লাখ টাকা খরচ হতো। ওরা হয়তো সেটা এক কোটি টাকা বাজেট দেখাবে। এতোগুলো লোককে নিয়ে যেতে হবে সাউথ আফ্রিকায়, তাদেরকে থাকতে দিতে হবে, তার খাওয়া আছে, সবকিছু আছে। এগুলো করে অ্যাডওয়ালারা।
সামাদী : যার প্রোডাক্ট তিনিও কি একটু তৃপ্তি পান এ বিষয়ে যে, আমার প্রোডাক্টের অ্যাডটা তৈরি হলো সাউথ আফ্রিকায়, সুইজারল্যান্ডে?
সাদেক : হ্যাঁ। এটা অ্যাডভার্টাইজমেন্ট এজেন্সি আর প্রোডাকশন হাউজ এই দুইজনের মধ্যে একটা টাইআপ হয়। তাতে অ্যাকচুয়্যালি হচ্ছে কী, টাকা যতো বেশি ইনভল্বড হবে, ততো বেশি ম্যানুপুলেট হবে। যদি কম টাকা হয়, তবে ভাগটা কম পাবে।
ইমন : আচ্ছা, একটু আপনার কাজে ফিরে যাই, ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার অ্যাডে মাটির ব্যাংকের রঙ বা প্রপসের ডিজাইনটা কী হবে-এই কাজটা কার?
সাদেক : এটা আর্ট-ডিরেক্টরেরই ছিলো।
ইমন : ডিরেক্টরের নাকি আপনার ছিলো?
সাদেক : না। আমরা বানিয়ে দিয়েছি। কিন্তু এটা ডিরেক্টর বলেছিলো। তিনি আমাদের বলেছিলেন, আমাদের যে ট্র্যাডিশনালগুলো আছে, সেগুলোই দরকার। ব্যাংক যেহেতু আজকাল প্লাস্টিকেরও পাওয়া যায়। তখন আমরা ওটা বানালাম; কারণ, ওটা কিনতে পাওয়া যায়নি।
মামুন হায়দার : সাদেক আলী ভাই, আপনি আপনার ফিল্ম নিয়ে কথা বলেন। আপনি আর্ট-ডিরেকশন করেছেন এমন ফিল্ম নিয়ে কথা বলেন।
সামাদী : আপনি স্বাধীনভাবে যে কাজগুলো করেছেন, কোন্ ফিল্মটা বানিয়ে আপনার তৃপ্তি বেশি হয়েছে। সেটা একটু ডিটেইল বলতে পারেন, তার গল্প, তার...
সাদেক : ফিল্মটা দেখে নিলে সেক্ষেত্রে ভালো হতো।
সামাদী : নিশ্চয় দেখবো আমরা।
সাদেক : বাই চান্স বলে একটা ফিল্ম করেছিলাম, সেটা পুরোপুরি আমার, মানে আমি যা ভেবেছি, যেভাবে ভেবেছি, আমাকে স্ক্রিপ্ট দিয়েছে এবং ডিরেক্টর পুরোপুরি সেটাকে ইয়ে করেছে। হয়তো কখনো কখনো কোনো কোনো জায়গাতে ডিরেক্টরের মনে হয়েছে, আরো কিছু অ্যাড করা লাগবে, সেভাবে পরামর্শ দিয়েছে।
সামাদী : সেই ফিল্মের গল্পটা একটু বলবেন...
সাদেক : রিসেন্টলি একটা ফিল্ম রিলিজ হয়েছে কুচ লাভ জ্যায়সা। সেটাও পুরোপুরি আমার কাজ করা। ফিল্মটা রিলিজ হয়েছে এক বছর হলো।
সামাদী : এখনো বোধহয় ডিভিডিতে আসেনি।
সাদেক : না, আসেনি।
সামাদী : রাহুল বোস মনে হয় অভিনয় করেছে!
সাদেক : হ্যাঁ রাহুল বোস, সেফালি সায়া, ওম পুরি, ঋতু চন্দ্রা এ রকম সব আর্টিস্টরা। ডিরেক্টর ছিলো বার্নালি রায় শুক্লা; বাঙালি ডিরেক্টর।
সামাদী : ওই স্টোরিটা কী রকম ছিলো; ফিল্মটা দেখতে পারিনি তো সেজন্য বলছি।
সাদেক : ফিল্মটা দেখলে কথা বলতে বেশি সুবিধা হতো। স্টোরি ছিলো ২৪ ঘণ্টার গল্প নিয়ে। বাড়ির একটা মহিলা, বউ। তার জন্মদিন হচ্ছে ২৯ ফেব্রুয়ারি, যেটা লিপ ইয়ার, চার বছরে একবার হয়। ফলে জন্মদিন খুব একটা মনে থাকে না, বাড়ির কাজের জন্য। সেই মেয়েটা, যে ছোটোবেলায় বিশাল স্বপ্ন দেখতো কিছু একটা হবে। তার সবরকম ইচ্ছে-ঘোড়ায় চড়তো, মাউন্টেনিং করতো, সে রকম তার স্বপ্ন। সে পরবর্তীকালে একেবারেই বাড়ির বউ হয়ে গেছে। সে শুধুমাত্র ঘরের কাজ-কর্ম করে, তার ছেলে-মেয়েদের দেখাশোনা করে, তাদের স্কুলে পাঠানো এসব নিয়ে ব্যস্ত। সে ভুলেই গেছে, সে একটা সময় কিছু হওয়ার কথা ভাবতো। সেই রকম একটা দিনে সকাল বেলাতে সে যথারীতি উঠেছে, বাচ্চাদের জন্য খাবার বানাচ্ছে, তার হাজবেন্ডের জন্য বানিয়েছে, তাদের স্কুলে পাঠাচ্ছে, সে অফিসে যাচ্ছে, কেউ তাকে আর উইশ করছে না, ভুলে গেছে-চার বছর পরে। এইসব হয়ে যাওয়ার পরে যথারীতি তার কাজ-কর্ম চলছে। সে খুব ব্যস্ত-সেটা আমরা ফিল্মে দেখাচ্ছি। তারপর একটু বেলা হওয়ার পরে ওর বাবা ওকে ফোন করে উইশ করছে। তারপর ওকে জিজ্ঞেস করছে, আজকে কী পার্টি হচ্ছে? যেহেতু জন্মদিন; তার হাজবেন্ড বড়ো একজন অফিসার। তারা পার্টিতে খুব অভ্যস্ত। তার হাজবেন্ডতো ওকে কিছু বলেনি।
এবার ওর মা ওকে বলছে, তোর কাছে তো আমরা এসব শুনতে অভ্যস্ত নই। কারণ, তুইতো অনেক কিছু হওয়ার কথা ভাবতিস। বাবা-মার কথা শোনার পরে ওর মধ্যে একটা রি-অ্যাকশন হলো। তারপর ওর মনে হচ্ছে, আজকে কিছু একটা করবো। সেই অবস্থায় ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। প্রথমে তার লম্বা চুল পার্লারে গিয়ে কেটে বব করছে, সে মডার্ন ড্রেস কিনছে, তারপর রাস্তার ধারে একটা দোকানে সিগারেট খাচ্ছে। সে ভাবছে, আজকে একেবারে বাঁধন ছাড়া কিছু করবো। সে একটা রেস্টুরেন্টে গেছে। রেস্টুরেন্টে গিয়ে যখন খাচ্ছে, পাশের টেবিলে একজন লোক বসে গোঙরাচ্ছে...তারও জন্মদিন আবার ওই দিনটাই। ওর কাছে গিয়ে সে সিগারেট চায়। ওকে লোকটা খুব ইম্পর্টেন্স দিচ্ছে না, তখন এ আবার গায়ে পড়ে ওর সঙ্গে আলাপ করার চেষ্টা করছে।
ওকে জিজ্ঞেস করছে, তুমি কি পুলিশের লোক? ও কিছু বলে না। এর ধারণা হচ্ছে, ও একটা ডিটেকটিভ, ও কোনো একটা কেস হ্যান্ডেলিং করার চেষ্টা করছে। তখন ও বলছে, আমি কি আজকে আপনার সাথে থাকতে পারি? লোকটা কিছু বলে না, সে বেরিয়ে যাবে। আর এই মেয়েটা গিয়ে সেদিন একটা গাড়িও কিনেছে, সেই দিন...তারা ড্রাইভিং করে দূরে একটা গেস্ট হাউজে যায়। এই একদিনের ঘটনাকে এভাবে তুলে ধরা আর কী। একসময় মহিলা বুঝতে পারে এটা কী করলাম আমি! এ রকম একটা ইয়ে ছেড়ে আমি এখানে চলে আসছি। ওদিকে ওর হাজব্যান্ডকে তার সেক্রেটারি বলছে, আজকে তো ম্যামের জন্মদিন, তাহলে তো ফুল পাঠাতে হবে।
সামাদী : এখানে সেট তো অনেকগুলো করতে হয়েছে। কোন্ সেটটা করে আপনার ভালো লেগেছে, যেখানে একদম রিয়ালিটির কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছেন?
সাদেক : অনেকগুলোই আছে, যেহেতু একদিনের। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছে, রেস্টুরেন্টে যাচ্ছে, পুলিশ স্টেশন আছে, ওদের ঘর আছে, রাতে জন্মদিনের পার্টি হচ্ছে। আছে, অনেক সেট আছে।
সামাদী : আমি অবশ্য খুঁজেছিলাম, ঢাকার বাজারে তো আসেইনি, ডাউনলোড করা যেতে পারে হয়তো।
আয়েশা : এই সিনেমাটাতে একটা জায়গা ছিলো, যেটা ফাইভ স্টার হোটেল, সেটা আসলে একটা হল। পরে গিয়ে দেখে এসেছি একটা ফালতু হল।
সামাদী : সেটাতো আর্ট-ডিরেক্টরকে বানাতে হয়েছে। ফিল্মে অনেক রকম চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও আমাদের ডিরেক্টর, আমি বাংলা ফিল্মকেই ধরছি। আমি বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করছি না- নিশ্চয়ই আলাদা; এটাও সত্য, আবার একও। এই দ্বৈতাদ্বৈত চলছে আমাদের ফিল্মে বা সাহিত্যে বা যেকোনো রকম শিল্পকলায়, সব জায়গায়। আমি বলছি যে, স্টোরি ভেঙে দেওয়ার একটা প্রবণতা এলো আমাদের ফিল্মে, যা পাশ্চাত্যে তো খুব হচ্ছে। তা সত্ত্বেও সত্যজিৎ দাঁড়িয়ে রইলেন স্টোরি টেলিংয়ে। ইভেন, তিনি যে অন্যরকম ছবি বানাচ্ছেন, আমি অন্যরকমই বলছি ধরুন হীরক রাজার দেশে। তারপর তার সিক্যুয়ালগুলো করছেন গুপি গাইন বাঘা বাইন, গুপি বাঘা ফিরে এলো। তারপর তার স্ক্রিপ্ট নিয়ে তার ছেলে ছবি করলেন। এই সমস্ত ছবিতেও, ইভেন একটু হয়তো স্টোরি ভাঙার প্রবণতা কাঞ্চনজঙ্ঘায় থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু সচেতনভাবে ভাঙতে চাননি বলেও আমি বিশ্বাস করি; দেবীতেও নয়। আপনি কি স্টোরি টেলিং বন্ধ করার দিকে, স্টোরি ভেঙে দেওয়ার দিকে, নাকি স্টোরি টেলিংটা সিনেমাতে থাকবে বলে আপনি মনে করেন?
সাদেক : হ্যাঁ। যেহেতু ফিল্ম একটা রিয়ালিস্টিক মিডিয়া। আমরা যতো রিয়ালিস্টিকভাবে দেখবো সেটাই পছন্দ করবো এবং দেখতে ভালোও লাগে সেটা। এই ধরনের যতো ফিল্ম ভেঙেছে, সেই ফিল্মগুলো আর সেভাবে সাকসেস্ হয়নি; সেটা বিদেশেও হয়েছে। আর এটাও দেখা গেছে, যতো বিশেষ কোনো স্টোরিকে বেস করে ফিল্ম হয়েছে, সেই সমস্ত ফিল্ম আজও আমরা বারবার ঘুরে ঘুরে দেখি। তো এটাতো একটা টেন্ডেন্সি, আমার মনে হয় সত্যজিৎ রায় ওটাকেই রাখার চেষ্টা করেছেন। আমাদের নভেলের যে ফর্ম, সেই ফর্মটাই ফিল্মে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
সামাদী : বাংলা নভেলে যেটা রবীন্দ্রনাথ প্রথম শুরু করলেন ক্রোনোলজি ব্রেকিং। বিশেষভাবে আমি বলবো চতুরঙ্গ-এ এসে স্ট্রেট স্টোরি বলছেন,চোখের বালিতেও। সাইকো অ্যানালিসিস আছে, কিন্তু স্টোরিটা বলছেন। প্লেন স্টোরি বলছেন এবং ক্রোনোলজিক্যাল বলছেন। তারপরে গোরাতে অবশ্যই বলছেন। কিন্তু চতুরঙ্গ-এ এসে ক্রোনোলজি ভেঙে দিলেন। ফিল্মেতো এ রকম ক্রমভঙ্গ ব্যাপারটা এসেছে। সেটাতে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন কি না?
সাদেক : না। সেটাই বলছি যে, খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। সেই ক্রোন ফিল্মগুলো খুব একটা সাকসেস্ দেখা যাচ্ছে না। অনেকেই করার চেষ্টা করেছে, অনেক সময় হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, সেই ধরনের এগুলোকে খুব একটা...
সামাদী : যেমন যুক্তি তক্কো গপ্পোতে খানিকটা হলেও ক্রোনোলজি ভাঙার ব্যাপার আছে।
সাদেক : তা হলেও, সেখানে একটা গল্পের ধারা বয়ে গেছে।
সামাদী: তার চেয়ে নিশ্চয়ই মেঘে ঢাকা তারা অনেক মিষ্টি মেসেজ দেয়। খুব ক্রুয়েল জীবন, কিন্তু মিষ্টি গল্পটাও আছে।
সাদেক : সেটাই। আমার মনে হয়, সেই গল্পটা যদি না থাকতো, তাহলে হয়তো এতোটা পপুলার জায়গাতে যেতো না। কিছু...বাট ভালোতো লাগতেই পারে; যেগুলো গল্প ওরিয়েন্টেড সেগুলোই পপুলারিটি পাচ্ছে।
সামাদী: মেকিংটাকে আপনি কতোটা গুরুত্ব দিচ্ছেন? থিমের সঙ্গে আমরা যদি পারসেন্টেজ হিসাবে হিসাব করি ফিফটি পারসেন্ট, ফরটিফাইভ টু ফিফটিফাইভ, সিক্সিটি টু ফোরটি, থার্টিভাইভ টু সিক্সিটিভাইভ পারসেন্টেজ হিসাবে।
সাদেক : কৌশলটা...কারণ ফিল্মটাতো বেসিক্যালি একটা কৌশল বেস। কারণ, এখানে ক্যামেরা আছে, এডিটিং আছে, তারপর বাকি সবটাই টেকনিক্যাল জায়গা।
সামাদী : এটাতো পলিশ্ড হতে হবে।
সাদেক : হ্যাঁ। টেকনিক্যালটা তো ফিল্মের একটা বড়ো ব্যাপার।
সামাদী : পলিশ্ড হতে হতে যদি সেটা কৃত্রিম হয়ে যায় বা কৃত্রিম মনে হয়, তাহলেও পলিশ্ড হতে হবে? আপনার মতটা জানতে চাচ্ছি আর কী।
সাদেক : এই জিনিসগুলো কৃত্রিম, তাই পছন্দ করি না। যাতে না হয়, যেহেতু টেকনোলজির ব্যবহার হয়েছে। সেইটাই এখন, এখনকার ফিল্মের ক্ষেত্রে সেইটা হয়ে গেছে।
সামাদী : কিন্তু বেসিক প্রশ্ন আমি করছি, সেটা হলো আমি সবার জন্য বলছি; সবাই মত দিতে পারে যে, আর্ট জিনিসটা জীবন্ত নয়, আর্ট তো আর্ট। জীবন থেকে কিছু জিনিস নিয়ে আমি এটা বানাচ্ছি, বানিয়ে তুলছি। তাহলে এখানে বানিয়ে তোলার ব্যাপারটা থাকবে কি না?
সাদেক : না, এইটা যখন পেইন্টিং-এর ক্ষেত্রে যাচ্ছি, তখন প্রযোজ্য। ফিল্মের ক্ষেত্রে আমরা একেবারেই সেটাকে করার কথা ভাবতে পারি। যেমন একটা হসপিটাল...
সামাদী : তাহলে স্টোরি টেলিং থাকলেওতো সিনেমাতে ক্রমভঙ্গ ব্যাপারটা থাকছেই। উল্লম্ফন থাকছেই। (অন্যদের উদ্দেশে, তোমরা একটু কথা বলো...)
আড্ডায় অংশ নেওয়া একজন (নাম জানা যায়নি) : আমরা একটা স্লাম দেখাচ্ছি, একটা নিম্নবিত্তের জীবন দেখাচ্ছি, এটা আমরা কতো সুন্দরভাবে দেখাবো, তখন আমি সেটটা কিভাবে তৈরি করবো? আমি একটা সাদামাটা জীবন দেখাচ্ছি, কিন্তু ওটাকে আমি খুব সুন্দরভাবে দেখাবো। কারণ, ওটার ওপর আমার বিজনেস। আমি একটা স্লামকে নিয়ে বানালাম, তাদের লাইফটা আমি আরেকটা ক্লাসকে দেখাচ্ছি, সেক্ষেত্রে আমি কী কী দেখাবো বা কী দেখাবো না, বা মূল উদ্দেশ্যটা কিভাবে রান করবে, কিভাবে করলে...
সাদেক : না, এইবার হচ্ছে যে আমরা যেমন সুন্দরের ব্যাপারটা বলছি, ফিল্মে নরমালি যে স্লাম দেখি সরাসরি সেটাকেই ই করি না আর কী। আসলে আমরা রঙের ব্যবহার, প্রপসের ব্যবহারগুলোকে সেই ভাবে করি, তাদের বাড়ির ডিজাইন করি, যাতে ফ্রেমটা সুন্দর লাগে। হয়তো খুব বেশি রিয়ালিস্টিকের সঙ্গে সেইটা ইয়ে নয়। ফিল্মটাকে ভালো করার জন্য অনেক সময় আমরা একটু বেশি কাজ করি, যাতে দেখতে সুন্দর লাগে।
সামাদী : দেখতে সুন্দর লাগে, সেটা কী মধ্যবিত্তের স্বপ্নের দেখা, মানে-'ক্যায়া কারু, ম্যায় তো বেএমতিয়ার হু, জমিন সখত হো, আসমা দূর।' মধ্যবিত্তের এইতো চরিত্র। যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছি সেই মাটিটা শক্ত, মানে কঠিন, বাস্তব, আর আসমান অনেক দূরে; এইতো মধ্যবিত্তের চরিত্র। এই শের-এ মধ্যবিত্তের চরিত্র আর কেউ এতো সুন্দরভাবে বলতে পেরেছে-এই দুই লাইনে আমারতো মনে হয় না। আচ্ছা, তাহলে সেই মধ্যবিত্ত যে ক্লেদাক্ত জীবন-যাপন করে, তার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে স্বপ্নের ডানায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য আপনি কী করেন? নাকি আপনার টেকনিক্যালি ভিজ্যুয়ালাইজ করতে সুবিধা হবে, সুন্দর দেখাবে বলে করেন?
সাদেক : হ্যাঁ। এটা অনেকটা ওই রকম, ফ্রেমটা সুন্দর হোক। সেই জায়গা থেকে বিচার করলে এই ভাবনাটা অ্যাকচুয়ালি ডিরেক্টটরের। কারণ ডিরেক্টর যদি সেই ভাবে ইন্সট্রাকশন না দেয় যে, না আমার লিমিটেশন এই, এর বেশি দেখানো যাবে না, এখানে বেশি রঙ ব্যবহার করা যাবে না। আমরা অনেক সময় দেখাই, একটা মানুষের জীবনের দুটো পার্ট, প্রথম তার একটা লাইফ ছিলো, যেখানে তার লাইফটা আইসোলেটেড, ফেড, তার মধ্যে কালার নেই। সে দুঃখে-কষ্টে আছে...তখন আমরা সাধারণত ঘরের রঙই ব্যবহার করছি না। এমন প্রপস্গুলো ব্যবহার করছি যেগুলো ধূসর। যাতে তার ক্যারেক্টারকে ইয়ে করে...
সামাদী : কিন্তু মনের ওপরে, অবস্থার ওপর ইফেক্ট করে, সেই সেটে যেতে হয়। বিআর চোপড়ার কথা আমি নিয়ে আসবো। অ্যাংরি ইয়াং বানানোর ক্ষেত্রে বিআর চোপড়ার তো জুড়ি নেই। আমার ভাইপো, যখন ভিএইচএস এলো তখন অমিতাভ বচ্চনের নাম জানতো না, জানতো বিজয়। কারণ, ছবিতে বিজয় নামে অভিনয় করেছে অ্যাংরি। বেকার ছেলে কিন্তু প্রতিবেলা বেরোবার সময় একটা নতুন টি শার্ট পরে। আমার মনে হয় যে, ও বলতে চাইছিলো-এই মধ্যবিত্তের এই স্বপ্নাকাঙ্ক্ষাকে আমি পূরণ করবো কি না...এখন হলে হয়তো বেকারের হাতে একটা স্মার্টফোন লাগিয়ে দিতেন, একটা থ্রিজি স্মার্টফোন! বেকার চমৎকার টি-শার্ট পরে বেরুচ্ছে এবং ফিল্টার টিপ সিগারেট থাকছে-এগুলো আমরা দেখেছি। সেটা আরেক জাতের ফিল্ম তো আছেই।
সাদেক : সেটা বারবার বলছি, সেটা ডিরেক্টরের ওপর ডিপেন্ড করে, সে কতোটা চায়...
সামাদী : কিছু ফিল্ম কিন্তু আমাদের শিল্প-বৃত্তিকে পূরণ করে। আর কিছু ফিল্ম...
সাদেক : হ্যাঁ। জাস্ট ফিল্মের জন্য।
সামাদী : মধ্যবিত্তের স্বপ্নাকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করে। নরমালি অন্তত স্টাডি করার জন্যই তোমাদের এই ফিল্মগুলো দেখা উচিত-সাব-কন্টিনেন্টাল ফিল্মের কী অবস্থা। মর্দ বলে একটা ছবিতে অমিতাভ বচ্চন বলেন, 'তুমনে তো কাহা থা ঘোড়া ভি নেহি আয়েগা, কুত্তা ভি নেহি আয়েগা, হিন্দুস্তানি ভি নেহি আয়েগা। দেখো, হিন্দুস্তানি ভি আ গ্যায়া, উসকা কুত্তা ভি আ গ্যায়া, উসকা ঘোড়া ভি আ গ্যায়া।' এখনো কিন্তু এই ধরনের ছবি হচ্ছে। আমি যে...এরা যে প্রশ্নটা নিয়ে সাধারণত উদ্গ্রীব, আর্ট-ফিল্ম এবং কমার্শিয়াল-ফিল্মের যে ধোঁয়া আমরা ৮০’র দশকে, ৯০-এর দশকে দেখেছি, শুনেছি-এই আর্ট-ফিল্ম সম্পর্কে আপনার অ্যাসেসমেন্ট কী এবং এখন কি সেই আর্ট-ফিল্মের অস্তিত্ব আছে কি না?
সাদেক : একটা সময় তো আর্ট-ফিল্মে দুটো পার্টই হয়ে গেছিলো। ...ওরা তো ফিল্ম বানায়, আর আমরা আর্ট করছি। এটা বেশ অনেকদিন ধরেই চলেছে। এইটা করতে গিয়ে দেখা গেছে, কয়েকজন কিছু ভালো ফিল্ম বানিয়েছে; বেশিরভাগই কিন্তু ভালো ফিল্ম করেনি; তারা জাস্ট একটা ফিল্ম করার কথা ভেবে ফিল্ম করেছে এবং এই আর্ট-ফিল্মের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গভর্মেন্ট তাদেরকে সাপোর্ট করেছে। আর এখানে বদমায়েশি হয়েছে, যে টাকাটা পেয়েছে তার বেশিরভাগ টাকা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে কোনোরকমে একটা ফিল্ম করেছে। আমাদের ইন্টেলেকচুয়্যাল লোকগুলো এগুলো করেছে-অনেক বড়ো বড়ো ডিরেক্টর, নামে তারা কিন্তু ভীষণ বড়ো ডিরেক্টর।
সামাদী : ছবিও ভালো বানিয়েছেন নিশ্চয়ই!
সাদেক : কয়েকটি ফিল্ম ভালো বানিয়েছে, তা সেইটাকে কাজে লাগিয়ে, দশটা ফিল্ম খারাপ করেছে। এখন যদি ওই ফিল্মগুলোকে নিয়ে অ্যানালাইসিস করা যায়, দেখা যাবে পারপাসলি ওই ফিল্মগুলোতে, যাতে কম বাজেটের ফিল্ম মনে হয় বা গরিবি ফিল্ম মনে হয়-সেটা কিন্তু করেছে! যাতে টাকাটা ইনভল্ব না হয়, এইটা চলেছে অনেকদিন ধরে। যেটা সত্যজিৎ রায় নিজেও একটা জায়গাতে বলেছেন, ফিল্ম কখনো আর্ট-ফিল্ম বা কমার্শিয়াল-ফিল্ম বলে কোনো ফিল্ম হয় না। ফিল্ম-ভালো ফিল্ম এবং খারাপ ফিল্ম। যে ফিল্ম চলে, যে ফিল্মে পয়সা আসে, সেটা কমার্শিয়াল-ফিল্ম।
সামাদী : একই সঙ্গে আর্ট-ফিল্ম, কমার্শিয়াল-ফিল্ম-দুই সত্তা থাকতে পারে না?
সাদেক : থাকতে পারে। যার ফলে দেখা যাচ্ছে যে পরবর্তীকালে যে ফিল্মগুলো শুরু হলো, সেগুলো কিন্তু দুটোকেই রেখে মাঝখান থেকে ফিল্ম নির্মাণ শুরু করলো; যেমন লগান। ওটা আর্ট-ফিল্মের বিষয়, কিন্তু সেটা একটা সুন্দর ফিল্ম হয়েছে। সবধরনের লোকেরা দেখেছে, বুদ্ধিমান লোকরাও দেখছে, আবার ঠেলাওয়ালা, রিকশাওয়ালারাও দেখছে। তারপর সোয়াদিস্ট বলে একটা ফিল্ম এসেছে, থ্রি ইডিয়টস্ এগুলো সবার জন্য এবং মারাত্মক পরিমাণে বিজনেস সাকসেস্।
আড্ডায় অংশ নেওয়া একজন (নাম জানা যায়নি) : ব্যবসা করেছে।
সাদেক : হ্যাঁ। যার ফলে এখন যেটা হচ্ছে, ডকুমেন্টারির বিষয়গুলোই এখন ফিল্মের বিষয় হয়ে উঠেছে, ডকু-ফিচার ধরনের একটা ফিল্ম হচ্ছে।
সামাদী : ডকু-ফিকশন ফিল্ম...
সাদেক : হ্যাঁ। ডকু-ফিকশনাল হচ্ছে, তার মধ্যে মেসেজও রয়েছে, আর্ট সবকিছুই আছে। আবার ভালো বিজনেসও করছে, সব শ্রেণির লোকেরা এই ফিল্মগুলো পছন্দ করছে। তো সেই জায়গাটাতে পুরোপুরি...
সামাদী : সেই সমন্বয়ই চলচ্চিত্র সাধনা। যারা করলেন বোম্বেতে বা বেঙ্গলে, ওয়েস্ট-বেঙ্গলে; তবে ওয়েস্ট-বেঙ্গলে কতোটা হয়েছে আমি বলতে পারবো না। বোম্বে ফিল্মটা আমাদের সামনে আসে, আমরা দেখি-সেরকম দুই একজন ডিরেক্টরের ভালো কাজের কথা বলবেন একটু।
সাদেক : আচ্ছা। যেমন, বিধু বিনোদ চোপড়া যে ধরনের ফিল্মগুলো করেছে। অবশ্যই পরে তারা সব ভালো ফিল্ম করেছে। তারপর আশুতোষ গোয়াড়িকরের লগান, তারপর স্বদেশ। অনুরাগ বসু ভালো ফিল্ম করছে।
সামাদী :পাপিহা খুব ভালো ছবি বলে আমার মনে হয়েছে। আর প্রকাশ ঝা?
সাদেক : প্রকাশ ঝা একটা প্যাটার্নে, একটা লেভেল মানে রাজনীতি নিয়ে এক সাইডে চলে গেছেন। ফলে একটা-দুটো ফিল্ম ভালো লাগে; কিন্তু যখন একটা লোকের ফিল্মগুলো এক রাস্তায় চলে, তখন মনে হয় ও যেনো বায়াসড্ হয়ে কাজ করছে।
সামাদী : আপনি সত্যজিৎ রায়ের ব্যর্থতা কোথায় বলবেন?
সাদেক : ব্যর্থতাটা এটাই যে, সত্যজিৎ রায় কোনো শিষ্য তৈরি করতে পারেননি। আর সত্যজিৎ মারা যাওয়ার পর তার পুরো ইন্সটিটিউটটাই শেষ হয়ে গেলো, এখন আমাদের সত্যজিতকে খুঁজতে হয় তার ফিল্মগুলোতেই!
সামাদী : শিষ্য নেই!
সাদেক : না। তার কোনো শিষ্য নেই।
সামাদী : সন্দীপ, সন্দীপও...
সাদেক : না। সন্দীপতো বাবার ছেলে হয়ে গেছে! সে বাবার গল্প ছাড়া ফিল্ম বানায় না। যা আছে সেটাই করে যাচ্ছে আজও।
সামাদী : কিন্তু, একজন মানুষ হীরক রাজার দেশে বানাচ্ছেন,গুপী গাইন বাঘা বাইন বানাচ্ছেন একরকম,দেবী আরেকরকম,কাঞ্চনজঙ্ঘা বানাচ্ছেন, মানে সৌন্দর্যের একটা চূড়ান্ত সীমায় উঠে গেছেন-সেই মানুষটা কি একসময় দৈন্য বোধ করেছিলেন? আমি মৃণালের (মৃণাল সেন) মতো রাজনৈতিক ছবি বানালাম না, আমার জীবন বোধ হয় ব্যর্থ হয়ে গেলো! তাই শাখা-প্রশাখা,গণশত্রু বানাচ্ছেন?
সাদেক : এই জায়গাটাই অ্যাকচুয়ালি তা-ই হয়েছে। একটা সময় এসে ওর মনে হয়েছে, সবাই আর্ট ফর আর্টসেক করে ফিল্ম বানিয়েছে। অনেকেই বলছে, এটা ফিল্মের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে। আমার মনে হয়, যেদিন থেকে ওর মধ্যেও ঢুকলো, সামাজিক দায়বদ্ধতাকে বেইস করে আমারও ফিল্ম বানানো উচিত, গণশত্রু তখন...
সামাদী : পলিটিক্যাল ট্রিলজিও বলতে পারি আমরা। গণশত্রু,শাখা-প্রশাখা এবং আগন্তুক...
সাদেক : হ্যাঁ,আগন্তুক...
সামাদী : আগন্তুক, পলিটিক্যাল ট্রিলজি বলতে পারি আমরা।
সাদেক : এবং তিনটেই...
সামাদী : সেখানে তো সত্যজিৎ নেই...
সাদেক : নেই, একেবারেই নেই; মানে তার ফিল্ম বলে মনেই হয় না।
সামাদী : ইভেন বাক্স বদল-এর মাধ্যমেও...
সাদেক : হ্যাঁ। পরবর্তীকালে আর দেখা যায়নি। তো সেটা মনে হয়েছে যে, এরপরে আর সত্যজিৎ যদি ফিল্ম না বানাতেন তাহলে ক্ষতি নেই।
সামাদী : মানে ইরেজ করে দিলে কি সত্যজিৎ রায়ের ক্যারেক্টার বুঝতে কোনো সমস্যা হবে, এ তিনটে ছবি ইরেজ করে দিলে?
সাদেক : না। বাকি তো সবগুলোতেই তার একটা ধারাবাহিকতা...
সামাদী : আপনি বাঙালি ডিরেক্টর, বাঙালি হিসেবে কাজ করছেন ওখানে; আমার এবং এখানকার সবার জানা দরকার, হোয়াট ইজ দ্য কন্ট্রিবিউশন অব বাঙ্গালিজ ইন বোম্বে ফিল্ম? আপনি নাম ধরে বলবেন, এদের জানা দরকার।
সাদেক : নামগুলো তো আমি সব বলতে পারবো না, মনে নেই। তারপরও বলছি...
সামাদী : মানে ডিরেকশন, মিউজিক-এই দুটি ক্ষেত্রে।
সাদেক : আজকের বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম যে ইন্ডিয়ান ফিল্ম শুরু হলো, সেটা হচ্ছে দাদা সাহেব ফালকে-এর রাজা হরিশচন্দ্র। তারপরে কিন্তু আর ওখানে সেভাবে ফিল্ম হয়নি। তারপরে আমাদের পুরো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির যে শুরুটা, সেটা হয়েছে কলকাতায়। কলকাতায় নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও যখন শুরু হলো, তখন বোম্বে থেকেও আর্টিস্টরা এসে কাজ করেছে। মানে, রাজ কাপুরের বাবা পৃথ্বিরাজ কাপুর, সেও এসে কাজ করেছে। কলকাতা ইন্ডাস্ট্রি অনেকদিন ধরে ডেভেলপ্ড হয়েছে। কিন্তু বোম্বে আর সেভাবে হয়নি। অ্যাকচুয়ালি বোম্বেতেও ছিলো না; ছিলো শোলপুর, তারপরে পুনেতে। এরপর দেখা গেলো, বাঙালিরা বোম্বেতে গেলো, ‘বোম্বে টকিজ’ নামে প্রথম একটা স্টুডিও হলো। আমার নামটা মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে, তারা গিয়ে সেখানে প্রথম সিনেমা শুরু করে। পরে দেবু মুখার্জি (রানি মুখার্জিদের পরিবার, তাদের পূর্ব পুরুষেরা) রানির বাবা বোধহয়, না না রানির দাদু; সে ফিল্ম স্টুডিও তৈরি করে; দেখা গেলো ওই সময় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পুরোটাই কলকাতার বাঙালিরা, মানে ওখানে গিয়ে মিউজিক ডিরেকশন থেকে শুরু করে স্ক্রিপ্ট রাইটার, ক্যামেরাম্যান সবই। ৩০-৪০-এর দশক থেকে শুরু হয়ে গেলো শচীন দেব বর্মন, অনিল বিশ্বাস।
বলা যেতে পারে, পুরো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির যতোগুলো হেড সেসময়, তারা বাঙালি ছিলো; শচীন দেব বর্মনও বাঙালি। ত্রিপুরার মানুষ হলেও বাঙালি, এটা কিন্তু মনে রাখতে হবে। বাঙালি শচীন দেব বর্মন যে ভিত্তিটা স্থাপন করলেন, জগন্ময় মিত্র হিন্দিতে যতো গান ডিরেকশন দিয়েছেন, সুর করেছেন তার হিসাব নাই। তারপর হেমন্ত মুখার্জি, হেমন্ত কুমার নামে, তারপরে শচীন দেবের ছেলে রাহুল দেব বর্মন, অপরেশ লাহিড়ীর ছেলে বাপ্পি লাহিড়ী; বাপ্পি বা রাহুল যতোই ধুমধাড়াক্কা গান করুক না কেনো, ফিল্মের মেজাজ বুঝে গান করার মতো ক্ষমতা তাদের ছিলো। বাঙালি হিসেবে কিন্তু আমার গর্ব হয়, বোম্বের ফিল্মের হিস্ট্রি বাঙালিরা ডমিনেট করেছে; মিউজিকে সেই ডমিনেশন এখনো আছে।
রুবেল পারভেজ : আপনার কাছে আমি জানতে চাই, একটু আগে আপনি (সফিকুন্নবী সামাদীকে উদ্দেশ করে) বললেন, সত্যজিতের তিনটি সিনেমাকে ইরেজ করে দিয়ে সত্যজিতকে দেখা যায়। যদি তাকে শিল্পী হিসেবে দেখি, ভালো-মন্দ মানুষের ভিতরে থাকতে পারে। এখন ওই তিনটা জিনিসকে বাদ দিয়ে কি অ্যাকিউরেট সত্যজিতকে দেখা উচিত? দ্বিতীয় হলো, একটা সিনেমা বানিয়ে ছেড়ে দিলো, সেটা সত্যজিৎ বা যেই হোক না কেনো, তার ভিতর সবসময় কি ডিরেক্টরকে খোঁজা উদ্দেশ্য হওয়া উচিত?
সামাদী : সাদেক বলবেন নিশ্চয়ই, আমি অবশ্যই ডিরেক্টরকে খুঁজবো। কারণ, তিনি আমাকে সেই খোঁজায় উৎসাহিত করেছেন; নিজে একটা চরিত্র বানিয়েছেন। আমরা জানি মৃণাল, ঋত্বিক এই ধরনের ছবি বানান। আমি সত্যজিতের ১০টা ছবি বেরিয়ে যাবার পর, অবশ্যই ঘরে-বাইরে আমার মাথায় লাগে। কাস্টিং থেকে শুরু করে সব জায়গায় ঘরে-বাইরেতে আমি গণ্ডগোল পাই। দেবীর মতো ছবি প্রভাত কুমারের একটা মামুলি গল্পকে যে উচ্চতায় তিনি নিয়ে যান; কিংবা পরশ পাথর পরশুরামের একটি মামুলি গল্পকে যে উচ্চতায় নিয়ে তিনি যান-সেই ডিরেক্টরতো পথে পড়া ধন নয়। সেখানে ডিরেক্টর তার সমস্ত কিছু; তবে কিনা মানুষের বয়স বাড়লে বিবেক বুদ্ধি একটু কমে অথবা অন্যরকম ভাবে কিছু পেতে চান।
যারা ছবিতে রাজনীতি পছন্দ করেন তারাতো খুব হই-হুল্লোড় করেছেন মৃণালের ছবি নিয়ে। তবে আমার কাছেতো মৃণালের একটা-দুটা মানেখণ্ডহর,ভুবনসোম,আকালের সন্ধানে ছাড়া বাকিগুলোকে ভালো ছবি মনে হয় না। ঋত্বিকের একটা আধাপাগলামি, আধামাতলামি আছে। তারপরও আমি কিন্তু শ্রদ্ধা করে এই কথা বলছি। সেই জায়গায় যখন ঋত্বিককে নিয়ে যাই, হয়তো তিনি বলবেন, তাহলে কি রাজনৈতিক ছবি বানানো হবে না! রাজনৈতিক ছবির চেয়ে তিনি যে অনেক বড়ো বড়ো ছবি বানিয়েছেন, সেটা হয়তো মুহূর্তের জন্য ভুলতেও পারেন। সেই জায়গা থেকে হয়তো তার পলিটিক্যাল ট্রিলজি করা। আমি এই জায়াগাটা ধরতে চেয়েছি।
রুবেল : আমি ওই জায়গাটা বলতে চাচ্ছি না, আমি বলতি চাচ্ছি, আমি তো প্রতিদিন একই জামা গায়ে দিবো না, একই পাত্রে ভাত খাবো না; কিংবা একই গতিতে চলবো না। আমি ডিরেক্টর, আমার মনে হলো আমি এভাবে করবো ইত্যাদি ইত্যাদি...
স্যার, আরেকটা কথা আপনার কাছে, (সামাদী বলছেন, হ্যাঁ প্লিজ) এখানে শিল্পভিত্তিক সিনেমা নিয়ে কথা হচ্ছে, আসলে শিল্প-চর্চার ক্ষেত্রে এখানে শিল্পকে জাজ করার জন্য বা সংজ্ঞায়নে আমরা সবসময় একটা লেভেলকে বাদ রেখে কথা বলি; মানে মধ্যবিত্তকে আমরা বাদ দিচ্ছি, মধ্যবিত্তের মধ্যে কি শিল্প নেই?
সামাদী : আমি তো বলবো যে, শিল্প কাউকে বাদ দিয়ে হয় না। কিন্তু তলস্তয় তো একটা কথা বলেছিলেন, ফর্মের কচকচি যে সমস্ত শিল্পে আছে, সেগুলো জাস্ট শুধু প্রোস্টিটিউট। কারণ, শিল্প এখন মুষ্টিমেয় বড়োলোকের বিনোদনের বিষয় হয়ে গেছে। তলস্তয়ের এ কথাকে আমরা ফেলতে পারি না তো! ফর্ম নিয়ে, পাশ্চাত্যের ফিল্ম নিয়েও কিন্তু এ রকম কচকচি হয়েছে। ইরানের মাখমালবাফ এখনো স্টোরি বলেন; আমাদের ছবি দেখতে অসুবিধা হয় না। সামিরা তার মেয়ে; তার ছবি আমরা ফেস্টিভালে দেখালাম-অ্যাপল। অসম্ভব বড়ো বক্তব্য আছে এর মধ্যে। তোমরা নিশ্চয়ই দেখেছো পুরো বাক্সবন্দি ইরানিয়ান সোসাইটির ওই দুইটি মেয়ে; যে ছেলেটা তাকে আপেল কিনতে নিয়ে যায়, সে আবার ফিরে আসে, তার বাবার কাছ থেকেই টাকা নিবে। মুক্তিটা ঘটে তাহলে ঘর থেকে বা নিজের ভিতর থেকে। আর মেয়েটার নাম বোধহয় মাসুমা। মাসুমার অন্ধ মা-সেতো পুরা ইরান, তার মানে দেশমাতৃকা। এই রকম করে একটা অর্থ নিশ্চয়ই কেউ বের করবে। আবার গল্পটা শুধু কেউ দেখবে। এ রকম ছবির প্রত্যাশা করতে তো আমার দোষ নেই যে, রিকশাওয়ালাও একটা গল্প বের করতে পারবে, আবার একজন বোদ্ধাও কিছু বের করতে পারবে। সবসময় ওই ছবি ওই রকম হবে-এটা আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু কিছুদিন আগে, এটা হতো বোম্বেতো। হিউজ টাকার ব্যাপার কিন্তু বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। আমরা বাংলাদেশে বসে এটা ভাবতেও পারি না।
সাদেক : এখন মধ্যম বাজেট যেগুলো, সেগুলো ২৫-৩০ কোটি থেকে শুরু করে আপ-টু ৭০ কোটি পর্যন্ত। আর হায়েস্ট বাজেট হচ্ছে তার উপরে। এখন একশ কোটি টাকার উপরে একেকটা ফিল্মে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর একেবারে খুব কম বাজেট হলেও পাঁচ বা ১০ কোটির নিচে ফিল্ম হয় না।
মাজিদ মিঠু : স্যার, আমার একটু জানার ছিলো। আমি একটু অ্যাকাডেমিক দিক থেকে বিষয়গুলো জানতে চাচ্ছি। যারা শিল্প-নির্দেশনার কাজ করেন, বিশেষ করে চলচ্চিত্রে যেতে হলে আর্টে যারা পড়েন বা না পড়েন তারা কী করতে পারেন?
সাদেক : আমি তো প্রথমেই বলেছি যে, আর্ট কলেজে যাওয়া, ইন্টেরিয়র ডিজাইন নিয়ে পড়া বা আর্কিটেক্ট হওয়ারও দরকার নেই। কারণ এটা ভিজ্যুয়াল মিডিয়া। এই বোধটা থাকার দরকার যে, ফিল্ম পড়তে গেলে সুন্দর করে তোলা বা যে রিক্যুয়ারমেন্টগুলো দরকার-এগুলো দেখলেই হয়। তারপর দেখা গেছে, ডিরেক্টররা অনেকে কাজ করে বা দেখে দেখে ভালো আর্ট-ডিরেক্টর হয়ে উঠেছে। আমি যেমন ফিল্মের আর্টের কথা ভাবছি, তেমনি আমাকে বাজেটের দিকটাও দেখতে হয়; সেটা করতে গেলে কী পরিমাণ খরচ হবে।
মাজিদ : তার মানে যেটা চাইছেন সেটাও করতে পারবেন না?
সাদেক : হ্যাঁ সেটাই, যার ফলে দেখা গেছে, অনেকেই ভালো আর্টিস্ট অথচ তার অন্যান্য গুণগুলো নেই; সে বাজেট করতে জানে না...
মাজিদ : একটা বিষয়ে আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতি জানতে চাইবো, সিনেমা হচ্ছে রিয়েলিস্টিক একটি বিষয়। আপনি নিজেই বললেন একটু আগে, আমরা মানুষের জীবনে যেভাবে ঘটে সেভাবেই দেখতে চাই, হয়তো একটু রস জড়িয়ে। কিন্তু আপনি যে-কটি সিনেমায় কাজ করেছেন বা করছেন, সেখানে অতিমাত্রায় যে জীবনবোধ দেখানো হচ্ছে। স্যার বললেন যেটা, যদি কোনো বেকারকে দেখানো হয় আইফোনসহ, মানে এই যে অতিরিক্ত প্রপস্-যা শিল্প নির্দেশকরা দিচ্ছেন-সেখানে ডিরেক্টরের কী করার আছে? এগুলো আসলে ভালো হচ্ছে বা খারাপ হচ্ছে, আপনার কাছে কী মনে হয়? আপনারা কাজ করে কি শান্তি পাচ্ছেন না?
সাদেক : না, আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শান্তি পাই না। আমার মনে হচ্ছে, এটা করা দরকার, এটার সঙ্গে এটা যায় না; অথচ ডিরেক্টর যা বলছে তা আমাকে করতে হচ্ছে।
রুবেল : কিন্তু আপনার নামের পাশে তো ডিরেক্টর কথাটা লেখা আছে।
সাদেক : কিন্তু অনেক সময়ই স্বাধীনতাটা থাকে না। কারণ আমরা ডিরেক্টর ঠিকই, কিন্তু আল্টিমেটলি তো একজনের অধীন।
মাজিদ : মানে, সর্বশেষ আপনার অনুভূতি খুব একটা সুখকর নয়।
সাদেক : বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা-ই।
সামাদী : হ্যাঁ, এটা কিন্তু দুই অর্থেই হতে পারে। ওই যে প্রশ্নটা করে, ডিরেক্টর কে-তুমি না আমি? এক অর্থে স্ক্রিপ্ট দিয়ে দিলাম তুমিই করো। অন্য অর্থে, তোমার এতো কথা বলার দরকার কী-যা বলছি তাই করো।
মামুন হায়দার : ফিল্মে যেটা হয়-ফিল্মের একটা ব্যাপার হচ্ছে, ফিল্মকে ডিরেক্টরস মিডিয়াম বলা হয়। এটা যখন ওই ফিফটিনে সুররিয়ালিজম বা দাদাইজম হচ্ছে, তখনও কিন্তু ওরা বলেই দিচ্ছে, এটা ডিরেক্টরস মিডিয়াম। পরের দিকে নিউরিয়ালিজম যখন হলো, আসলে ডিরেক্টরই সব। ডিরেক্টর কী বলতে চান, সেটা...
সাদেক : একটা ফিল্ম যখন হয়, অন্তত এক হাজার লোকের ইনভল্বমেন্ট, কিন্তু আমরা দেখি আল্টিমেট...
সামাদী : একটা কর্পোরেট হাউজের কথা আমরা চিন্তা করতে পারি। ডিরেক্টর, প্রোডাকশন, মার্কেটিং, ফিন্যান্স আর থাকেন একজন ম্যানেজিং ডিরেক্টর। আজকাল খুব কায়দা করে সিইও বলা হচ্ছে। এই যে অল ইন ওয়ান, ডিরেক্টরও তাই। আর্ট-ডিরেক্টরকে যা বলবেন সেটা করবে।
রুবেল : ওই প্রত্যেকটা, কাউকে মেক-আপম্যান বলছি, কাউকে সিনেমাটোগ্রাফার বলছি, তাদের পাশে কিন্তু ডিরেক্টর কথাটা দেখি না। তাহলে যখন আপনাকে ক্ষমতা দেওয়া হলো...
সামাদী : না, আজকাল কিন্তু ডিরেক্টর অব সিনেমাটোগ্রাফি বলছে।
সাদেক : ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি...আগে মানুষ বলতো না, এখন বলা হচ্ছে।
আয়েশা : অনেকগুলিই আছে, ডান্স-ডিরেক্টর, কস্টিউম ডিরেক্টর...
সাদেক : ডান্স-ডিরেক্টর আছে, মিউজিক-ডিরেক্টর আছে...
সামাদী : আমাদের ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পক্ষ থেকে একটু তাড়া অনুভব করা হচ্ছে, মেয়েরাও যাবে হলে। আসলে আজকে আমি...শেষ একটা জানার আছে; আমার মনে হয় সবারই-বাংলাদেশের সিনেমা আপনি কী রকম দেখেছেন এবং সে বিষয়ে আপনার একটু পাসিং কমেন্ট...
সাদেক : বাংলাদেশের ফিল্ম আমার খুব একটা দেখা হয়নি। কয়েকটা ফিল্ম দেখেছিলাম-মাটির ময়না একটা, যথেষ্ট ভালো ফিল্ম। ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম যেভাবে হয়, প্রায় সে ধরনেরই ফিল্ম। আবার অনেক ফিল্ম দেখি যেগুলোকে মনে হয়, অনেক বেশি যাত্রা-টাইপ বা মেলোড্রামা। এটা একটা দিক। আরেকটা হচ্ছে টেকনিক্যাল যে জায়গাগুলি বলেন, ফটোগ্রাফি এবং আর্ট-ডিরেকশন; সেখানে বোম্বের ফিল্ম যেভাবে প্রেজেন্টেবলভাবে দেখি সেই রকম জায়গাতে দেখি না। আমার মনে হয়, এখানে যে রিসোর্স আর ওখানে যা রিসোর্স-দুটার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকার জন্যই এটা হচ্ছে। সেগুলি যদি এখানেও ডেভেলপড হয় আস্তে আস্তে, এই ফিল্মের মধ্যেও সেই জিনিসগুলা দেখা যাবে।
সামাদী : আমরা আসলে সাদেক আলী সাহেবের কথা শুনলাম। বাংলাদেশের ফিল্ম সম্পর্কে ওনার যে কমেন্ট শুনলাম। তবে আমার নিজের একটা মত আছে, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ বোম্বের মতো এতো রিসোর্স ঢাকায় নেই। যদি সত্যিই বোম্বের মতো রিসোর্স থাকতো, আমরা তারেককে পেতাম না, আমি সিওর। কারণ তারেক যে অনটন এবং যে দৈন্যের মধ্যে মাটির ময়না করেছে, সেই দৈন্যটা হয়তো দরকারও ছিলো। আমিও নিজে মনে করি, বাংলাদেশের একটা ভালো ছবি, তারেকেরও বেস্ট ছবি মাটির ময়না। তারপরে রানওয়ে করেছেন। তার মাঝখানে আর কিছু আছে কি না জানি না।
মামুন হায়দার : আছে স্যার,অন্তর্যাত্রা আছে।
সামাদী : মাটির ময়নার চেয়ে উপরে যেতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না।
মামুন হায়দার : পারেনি।
সামাদী : আমারও মনে হয় না। আমার সঙ্গে অনেকে একমত হবেন-মাটির ময়নার চেয়ে, মানে শুধু ওর যে ইমাজিনেশন বলবো, জানলাটা বন্ধ করা এবং জানলাটা খোলা-ইট হ্যাজ বিকাম অ্যান আইকন। এই আইকন আমাদের ফিল্মে খুব দরকার। মানে, একটা দৃশ্য দিয়েই কিন্তু অনেক কিছু বোঝানো সম্ভব। বন্ধ করা এবং খোলা-অসাধারণ ব্যাপার মনে হয়েছে। অন্তর্যাত্রাও আমি দেখেছি। আর রানওয়েও দেখেছি,মাটির ময়না সেক্ষেত্রে অসাধারণ ছবি আমার মনে হয়। আর যাদের কথা বলা হলো মেলোড্রামাটিক; আমি এদের জন্য বলছি, ওরা হয়তো (উপস্থিত তরুণেরা) ওভাবে দেখেনি ছবিগুলো।
আমজাদ হোসেনের ছবি আমরা একসময় দেখেছি। ‘একটি আমজাদ হোসেন চলচ্চিত্র’ অথবা তারপর নাম পাল্টালো-আমজাদ হোসেন চলচ্চিত্র পাঁচ, ছয়...এগুলো। তারপরে, ওই খান আতাউর রহমানের কিছু ছবি আমরা দেখেছি। মেলোড্রামাটিক ছবি কী জিনিস, সেটা তোমরা আস্তে আস্তে দেখবে। এতোদিনে হয়তো দেখেও গেছো এদের ছবি। সেই জায়গা থেকে যে মানুষটি আমাদের মুক্তি দিচ্ছিলো, আরো আছে তার সহযাত্রী...। যে মানুষটি আমাদের মুক্তির সন্ধান দিচ্ছিলো, দুর্ভাগ্যবশত তিনি আমাদের সঙ্গে নেই। আমাদের ফিল্মের জগতটা খানিকটা শূন্য করে দিয়ে, খানিকটা আধখান করে চলে গেছেন তিনি। আমি বিশ্বাস করি,কাগজের ফুল অসাধারণ কিছু হতো। কারণ, ওই থিমটা ওই রকমই ছিলো। তারেকের প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই, সাদেক সাহেবকে ধন্যবাদ জানাই, ম্যাজিক লণ্ঠনকে ধন্যবাদ জানাই। শেষ পর্যন্ত কিন্তু আমার মনে হয়নি, আজকের এই যে বসা-সেটা খুব কম কিছু হয়েছে; আমিতো অনেক কিছু পেয়েছি। ধন্যবাদ সবাইকে (সবার হাততালি)।
দায় স্বীকার : বিশাল এই আড্ডাটি রেকর্ডিং থেকে প্রতিলিপি করতে সহায়তা করেছেন তামান্না মৌসী, রুবেল পারভেজ, মাজিদ মিঠু, রোকন রাকিব, আশফাক দোয়েল ও মাহামুদ সেতু। পুরো লেখাটি তৈরিতে সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেছেন ইমরান হোসেন মিলন।
বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জানুয়ারির ম্যাজিক লণ্ঠনের ৫ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন