Magic Lanthon

               

এন. রাশেদ চৌধুরী

প্রকাশিত ০৩ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ডুবসাঁতার : নতুন বাংলা সিনেমার সন্ধানে

এন. রাশেদ চৌধুরী

ডুবসাঁতার, নূরুল আলম আতিকের সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র। ডিজিটাল ফরমেটে নির্মিত এ-ছবিতে নির্মাতা একজন নেশাগ্রস্থ তরুণের করুণ পরিণতির পাশাপাশি তার প্রজন্মের অশান্ত সময়কে চিহ্নিত করেছেন, যারা রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক চরম উদাসিন্যের শিকার। ছবির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে এক স্বামীহারা নারীর তিন সন্তান-বড়ো ছেলে অন্ধ রোকন, ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছোট ছেলে রেহান এবং সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মেয়ে রেনু’দের পরিবারকে ঘিরে। রেনু চাকরি করেন একটি উন্নয়ন সংস্থায়, যারা সমাজের নেশাগ্রস্থ তরুণদের নিয়ে কাজ করে। রেনুকে দেখা যায়, প্রায়ই এক সহযোগীকে নিয়ে নেশাগ্রস্থদের বিষয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে উপাত্ত সংগ্রহ করতে। রেনুদের নিম্ন-মধ্যবিত্তের সংসারে ওর উপার্জনই একমাত্র আয়ের উৎস-একথা না বললেও বুঝে নেওয়া সহজ।

রেললাইন পেরিয়ে রোজ কাজে যাওয়ার সময় রেনুর মনে উঁকি দেয় বড়ো ভাই রোকনকে নিয়ে ওর শৈশবের স্মৃতি। অন্ধ বড়োভাই রোকনই যেনো রেনুর একমাত্র বন্ধু। রোকনকে রোজ খবরের কাগজ পড়ে শোনানো, শেভ করিয়ে দেওয়া, চুল আঁচড়ে দেওয়াসহ সুখ-দুঃখের নানান স্মৃতি ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্যে দুজনের গভীর অনুষঙ্গ প্রকাশ্য। নিত্য অভাব-অনটন নিয়ে ছোট ছেলে রেহানের নানান অনুযোগ সত্ত্বেও রেনুর আয়ে সচল সংসারে স্নেহময়ী মা মায়ার বাঁধনে বেঁধে ফেলেন সেই মানসিক ভারসাম্যহীন ও সহায়সম্বলহীন ভাতচোর পাখিকেও, সবাই ঘুমিয়ে গেলে রোজ রাতে যে রান্নাঘরের পিছনের জানালায় হাত গলিয়ে হাড়ির ভাত চুরি করতো ।

একদিন রেনু ও ওর সহকর্মী নেশাগ্রস্থ তরুণদের বিষয়ে উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে এক বিদঘুটে পরিস্থিতির শিকার হন। তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি পিছন থেকে ছবি তুলতে চাইলে এক তরুণ রেগে যান। তিনি রেনুকে জিজ্ঞেস করেন কেনো ও পিছন থেকে ছবি তুলছে! ছেলেটি কেবল মাদকাসক্ত বলেই তার আত্মসম্মান (self-dignity) খোয়াতে রাজি হয় না। রেনু আসলে এমন ছেলে হয়তো কখনও  দেখেনি। সন্ত্রস্ত রেনু এবারের মতো কোনোরকম পার পেলেও শেষ পর্যন্ত প্রেমে পড়েন ওই মাদকাসক্ত তরুণ ইমরানের। ইমরান রেনুর অন্ধ ভাই রোকনের দাবা খেলার নিয়মিত সঙ্গী হলেও মা খানিক চিন্তিত হয়ে পড়েন। একাধারে তার ভয় রেনুর মতো উপার্জনক্ষম সংসার-সদস্য হারানোর, অন্যদিকে একবার বিয়ে করে সংসার ভাঙ্গা রেনুকে নিয়েও যেনো তার দুঃচিন্তার অন্ত নেই। এ-দিকে মহল্লাবাসী বখাটে তরুণরাও ভিতরে ভিতরে ফুঁসতে থাকে বহিরাগত ইমরানের রেনুদের বাড়িতে যাওয়া-আসায়। কিন্তু সব সন্দেহ আর শঙ্কা বিসর্জন দিয়ে রেনু আর ইমরান যেনো ভেসে যায় এক  স্বর্গীয় সংসর্গে।

কিছুদিন পর ইমরানের মাদকাসক্ততা নিয়ে চিন্তিত হলেও যেনো কোনো উপায় থাকে না রেনুর। ততোদিনে প্রেমে উন্মত্ততার নিয়তিও বেড়ে উঠতে থাকে ওর শরীরে। স্বভাব সুলভ আত্মম্ভরী প্রকাশ ভঙ্গির ইমরানও যেনো এই খবরে খানিক চিন্তিত হয়। মা-ও রেনুর ব্যাগে প্রেগন্যান্সি টেস্টের স্ট্রিপ দেখে সব বুঝে ফেলেন মুহূর্তেই। এক বৃষ্টির রাতে রোকনের সঙ্গে দাবা খেলে ফেরার পথে চোর ভেবে পাড়ার ছেলেরা বেদম প্রহার করে ইমরানকে। এতে নিহত হয় ইমরান। দুঃখময় জীবনের শোকবার্তা হাতে শোকের সাগরে ভেসে যায় রেনুকা। ছবির প্রথম অংশ এখানেই শেষ।

এরপর শুরু হয় রেনুকার বাঁচার সংগ্রাম। শোকের ভার সইতে না পেরে রেনু অবসন্ন হয়ে পড়ে। মা এবং বাড়ির অন্যদের পরামর্শে রেনু বাসে চেপে বেড়াতে যায় খালাতো বোন মিথিলাদের বাড়ি কক্সবাজারে। সেখানে গিয়ে খোলামেলা পরিবেশে খানিক স্বস্তি পায় রেনু। নিজেকে নতুনভাবে উপলব্ধি করে এবং আবার বেঁচে ওঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। বাড়ি ফেরার পথে মহল্লার রাস্তায় ভাতচোর পাখিকে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে পেটাতে দেখে এগিয়ে যায় রেনু। রেনু ওকে বাঁচাতে চাইলে মহল্লার বখাটেরা রেনুকে লক্ষ্য করে খিস্তি ছোড়ে, ব্যভিচারিণী বলে গালি দেয়। এখানে জ্ঞান হারায় রেনু। ছবির শেষের অংশে আমরা রেনুকে সেই প্রথম দৃশ্যের ন্যায় রেল লাইন পেরিয়ে কাজে যেতে দেখি। খানিক থমকে দাঁড়িয়ে শৈশবের ট্রেনে কাটা পড়া হাঁসের দৃশ্য ভেসে আসে ওর মনে। বিদ্রুপের হাসি হেসে জীবন সংগ্রামে পৃথিবীর পথে পুনরায় পা বাড়ায় রেনু।

এই হলো সাধারণভাবে ডুবসাঁতার ছবির গল্প। তবে একই সঙ্গে ডুবসাঁতার এক অস্থির সময় ও প্রজন্মের গল্প, যে প্রজন্মের বেড়ে ওঠার খবর তথাকথিত আরবান কমিউনিটি রাখেনি বা রাখার প্রয়োজন অনুভব করেনি। বিভিন্ন সময়ে ছবিটির নির্মাতা আতিক নিজেও যেভাবে বলেছেন, ‘একদিন রাস্তা পার হয়ে, একটা রিক্সার পাশ দিয়ে যাচ্ছি, প্যাথেড্রিন নিয়ে চোখ বন্ধ করে হাঁটতেছিলাম...একটা চিৎকার শুনে চোখ খুললাম...দেখি, রিক্সায় বসা এক মহিলা আমার দিকে আঙ্গুল তুলে দেখাচ্ছেন...আশেপাশের লোকজন পাগল বা ছিনতাইকারী ঠাওরালো আমারে...এখন নেশাকারী, ছিনতাইকারী একসমান, পিটায় মেরে ফেলা তো কোনো ব্যাপার না...এসব খুব ভয় লাগতো আমার। আমি এখানে সেখানে অনেক কষ্ট করে যেতাম, কিন্তু বাসে উঠতাম না, এই একই কারণে। হয়তো আমি ভিড়ের বাসে উঠলাম, আমার পাশের লোকটার পকেট মারা গেলো। পকেটমার সন্দেহে পাবলিক আমাকে পিটিয়ে মেরে ফেলল।...’ আমরা নিজেরাও পত্র-পত্রিকা, সংবাদে এখনও এসব প্রায়ই ঘটছে দেখতে পাই। এই কয়েকদিন আগেও গাবতলীর কাছে ছয়জন কলেজ ছাত্রকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো ছিনতাইকারী সন্দেহে। আতিকের ছবি ডুবসাঁতার-এর ইমরান চরিত্রটিও এমনই এক পরিস্থিতির শিকার। ইমরানের নিরপরাধ স্বাধীনচেতা চিত্তকে যেনো সহজে মেনে নিতে পারে না এই সমাজ ও তার বাসিন্দারা। যেনো শুধু নেশাগ্রস্থ হওয়ার কারণেই গণ-পিটুনিতে প্রাণ দিতে হয় তাকে। অথচ তার দুঃখ-ভারাতুর হৃদয় কেনো সারাক্ষণ নেশা হাতড়ে ফিরছে একবারও কেউ জানতে চায় না। আমার মনে পড়ছে রবার্ট ব্রেসো নির্মিত দি ডেভিল প্রবাবলি ছবিটির কথা। মনে পড়ছে সেই তরুণ চার্লসকে, যে আধুনিক পৃথিবীর মানবসৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ ও হঠকারিতায় হতাশ হয়ে বেছে নেয় আত্মহননের পথ।

এই আত্মহনন ছাড়া আর কি-বা ছিলো এক সময়ে আমাদের দেশের এতোসব প্রতিভাবান ছেলেদের? এরা সব আত্মহননের নেশাতেই মেতেছিল যেনো, নেশাদ্রব্য গ্রহণে তিলে তিলে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনার মধ্য দিয়ে। ডুবসাঁতার ছবির এই অদ্ভুত যুবক ইমরানও কী আমাদের এইসব চেনা জগতের বাসিন্দাদের একজন নয়! পরিচালক নূরুল আলম আতিকের ডুবসাঁতার ছবিতে আমরা দেখি মহল্লার কতোগুলো ছেলে নির্দ্বিধায় পিটিয়ে মারছে ইমরানকে। দেশের সাধারণ জনজীবনের দীর্ঘ হতাশাবোধ ও আর্থ-সামাজিক অবক্ষয় মানুষকে যেনো বিবেকহীন পশুতে পরিণত করেছে। রেনুদের মহল্লাবাসী এই তরুণরাও তাই এক বিকৃত আনন্দবোধে ভোগেন ইমরানকে পিটিয়ে মারতে পেরে। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া এক নৈমিত্তিক দৃশ্য যেনো এটি, যা দেখলাম, খানিক হা-হুতাশ করলাম, আবার ভুলে গেলাম। 

ছবির সংগ্রামী মেয়েটিও আমাদেরই এই চেনা পরিপার্শ্বের একজন। এককালে বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়া এই রেনুইতো বাঁচতে চায়, নিজের পরিবারের সদস্যদের বাঁচানোর মন্ত্রে নিজেকে নিয়োজিত করে। চলচ্চিত্রনির্মাতা ছবিটির শুরুতেই রেনুর সংগ্রামী জীবন ও তার পরিবারের ছবি এঁকেছেন বাস্তবানুগ ভঙ্গিতে। রেনুর প্রতিদিনকার কাজে যাওয়ার পথের সেই রেলক্রসিং, বাড়ি ফেরার পথে বাজার করা, মহল্লায় প্রবেশের পথে বখাটে ছেলেদের টিজিং, স্যাঁতসেঁতে একতলা বাড়ি আর অন্ধ বড়োভাই রোকন, এই যেনো রেনুর নিত্য অনুষঙ্গ। রেনুর মা হিসাবি এবং অভিজ্ঞ সংসারকর্ত্রী, যিনি জানেন কীভাবে রেনুর স্বল্প আয় -নির্ভর এই সংসার চালাতে হবে। তার এই দৃঢ়তাও যেনো প্রকাশ পায় ছোট ছেলে রেহানের অহেতুক আবদার দমনে। অন্ধ বড়োভাই রোকনই যেনো রেনুর একমাত্র সঙ্গী। বিভিন্ন সময়ে ফ্ল্যাশব্যাকে দেখা যায় রোকন ও রেনুর স্মৃতিতে ভেসে ওঠা ওদের ছেলেবেলার নানান মুহূর্তের দৃশ্যাবলী। বহমান বর্তমানকে যেনো পরিচালক বাঁধতে চেয়েছেন অতীতের মধুর স্মৃতি-বন্ধনে। মূলত এসব দৃশ্যে মা’র সঙ্গে রেনুর সাঁতার কাটা, অন্ধ ভাই রোকনকে হাত ধরে রেললাইন পার করানো, রোকনের চশমা খুলে নেওয়ায় খেলার সাথীদের সঙ্গে রেনুর মারামারির দৃশ্যসমূহ যেমন রেনু-রোকনের সম্পর্কের নির্ভরতা প্রকাশ করে, রেললাইনে কাটা পড়া রাজহাঁসের দৃশ্য তেমনি জীবন-সমুদ্রে পরাজিত প্রায় রেনুকে বার বার বেঁচে ওঠার অনুপ্রেরণা যোগায়। তবে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি রেনুদের মতো স্বল্প আয়ের নিম্ন-মধ্যবিত্ত সংসারে এমন স্বপ্ন-বিলাসিতার সুযোগ আদৌ কতোটা বিদ্যমান তা ভেবে দেখার বিষয় বৈকি!

ডুবসাঁতার দেখে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন মনে জাগে। রেনুদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য রেনু। ওর আয়েই কি ওদের বাড়ির ব্যবস্থাপনার খরচ জুগিয়েও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ভাই রেহান, অন্ধ বড়োভাই রোকন ও মা’র পুরো সংসারের খরচ মেটানো সম্ভব? অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যায়, ইমরান সম্ভ্রান্ত পরিবারের স্বাধীনচেতা সন্তান। তবে তার কোনো পারিবারিক রিলেশন আমরা দেখি না। এ-ছাড়া, ইমরান যে-বাড়িতে বাস করেন, তার খরচ ও আয় - সংস্থানই বা কীভাবে হয় সে-ব্যাপারটিও পরিচালক প্রকাশ করেননি। দেখা যায়, গান গাওয়া আর  প্রাইভেট কারে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া যেনো ওর আর  অন্য কাজ নেই।

এ-ছাড়া রেনু যে-নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস্তবতায় বিচরণ করে, তার মতো সাধারণ একজন  মহল্লাবাসী মেয়ের জীবনে এত্তো রোমান্টিক অবসর কী সত্যিই আছে, যে প্রিয়জনের বিরহে সমস্ত দায় মুক্ত হয়ে শোকসাগরে বিলীন হওয়ার সুযোগ পাবে! তবে, গল্পের নায়িকার চূড়ান্ত পরিণতি-নির্ভর ছকই ডুবসাঁতার ছবির কাহিনীকে শেষঅব্দি ছাড়ে না। প্রেমিকের মৃত্যুতে রেনু যে-দীর্ঘস্থায়ী শোকের আবহে বিচরণ করে, সে-বিরহ হয়তো ওর দেহজ আকাঙ্ক্ষার সীমানা ছাড়িয়ে দেহাভ্যন্তরে বেড়ে ওঠা ঐশ্বরিক আবহে অবগাহনের চেষ্টা। তাই যে-মুহূর্তে আমরা জানতে পারি রেনুর সম্ভাব্য সন্তানের সি ভাইরাস হওয়ার আশঙ্কার কথা, তখন আমাদের চারপাশের নেশাক্রান্ত উজ্জ্বল বন্ধুদের করুণ পরিণতির কথা ভেবে একাত্মতা বোধ করি আমরাও রেনুর বিরহবোধের সঙ্গে। বন্ধু চলচ্চিত্রনির্মাতা নূরুল আলম আতিক তার নিজস্ব জীবনযাপনের বিপরীতে যে-রুঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন, তারই খানিকটা হলেও যে ভাগাভাগি করেছেন সাধারণ দর্শকের সঙ্গে, তাইবা কম কিসে? ডুবসাঁতার তার মর্ম বেদনার অন্তর্নিহিত কাব্য। তবে এ-ক্ষেত্রে, পরিচালক দৃশ্যমালার চিত্রায়ণে কল্পিত স্বপ্নমিশ্রিত আবহের পরিবর্তে নিত্য-বাস্তবতার অভিজ্ঞতায় রেনুর দিনপঞ্জি চিত্রায়ণ করলে, ডুবসাঁতার ছবির দর্শক সাধারণ হিসেবে আমাদের একাত্মতা নিশ্চয়ই আরও বেড়ে যেতো। গানের দৃশ্যসমূহের চিত্রায়ণে কল্পনাপ্রবণ রোমান্টিক ধারণা আরও  বেশি করে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে, ছবিটির বাণিজ্যিক সফলতা চিন্তার সংশ্লিষ্টতাকে প্রত্যক্ষ করে।      

জেড সেভেন ক্যামেরা নিতান্ত সাধারণ ডিজিটাল ভিডিও ক্যামেরা। সেই ক্যামেরা দিয়েই আতিক তার ডুবসাঁতার ছবির শ্যুটিং করেছেন। পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবির ইতিহাসে ডুবসাঁতার তাই সবসময়ই পথপ্রদর্শক হিসেবে একটি উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে থাকবে, অন্তত ভিডিও মাধ্যমে নির্মিত এর স্বাধীন উপস্থাপনের স্বতন্ত্রতায় তবে সিনেমাটোগ্রাফিতে প্রতিশ্রুতিশীল চিত্রগ্রাহক রাশেদ জামানের চিত্রগ্রহণ, এঙ্গেল নির্বাচন ও চরিত্র চিত্রায়ণের কোথাও কোথাও আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন ধারণা ও দেখার অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে খানিক ফারাক লক্ষ্য করা গেছে। অপেক্ষাকৃত বেশি মিডক্লোজ শটে দৃশ্যধারণ আমাদের স্বাভাবিক দৃশ্য-অভিজ্ঞতার বাইরে। তবে, রেনুদের বাড়ির পরিবেশ এবং অভ্যন্তরীণ জীবনাচারের দৃশ্যগুলো, বিভিন্ন সময়ের রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য উন্মুক্ত স্থানগুলো, চলমান জনজীবনসহ অনেক দৃশ্যেই রাশেদের চিত্রগ্রহণ টেকনিক ও অপারেশন অভিনবত্ব লক্ষ করা গেছে।    

আতিক চরিত্র রূপায়ণে বরাবরই অভিনব। পরিচালক মূলত বাস্তবানুগ অভিনয় রীতিতে চরিত্রসমূহের মনোজাগতিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করেন। এতে চরিত্রগুলো বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। অভিজ্ঞ অভিনয় শিল্পীদের পাশাপাশি নন্‌-এ্যাক্টরদের  নির্বাচন এবং তাদের দিয়ে নিয়ন্ত্রিত অভিনয় আদায় করাও পরিচালকের মুন্সিয়ানা বটে। রেনু চরিত্রে জয়া আহসান, মা’র চরিত্রে ওয়াহিদা মল্লিক জলি, রোকন চরিত্রে অশোক ব্যাপারী, রেহান চরিত্রে শাহরিয়ার শুভ’র পাশাপাশি ইমরান চরিত্রে রুদ্র শাহরিয়ার, রেনুর খালাতো বোনের ভূমিকায় সুষমা সরকার, তার স্বামী সানি’র চরিত্রে স্বাধীন খসরু, ভাতচোর পাখি’র চরিত্রে দেবাংশু হোর, মহল্লাবাসী যুবকসহ অন্যান্য নানান চরিত্রে নন্‌-এ্যাক্টরদের সবার অভিনয়ই বাস্তবানুগ।

ডুবসাঁতার চলচ্চিত্র ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের তরুণ-প্রজন্মের চলচ্চিত্রনির্মাতাদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। অনেকেই ভিডিও মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাণে নির্মাতার স্বাধীন প্রকাশভঙ্গির প্রায়োগিক সম্ভাবনা ডুবসাঁতার-এ খুঁজে পাবেন এ-বিষয় সন্দেহাতীতভাবে সত্য। আমাদের মধ্যে চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী অধিকাংশ তরুণ নির্মাতারা যেখানে ব্যস্ত ডিজিটাল ভিডিও মাধ্যমের উচ্চতর ও আধুনিক সংস্করণের চমক নিয়ে, তাদের উদ্দেশে ডুবসাঁতার চলচ্চিত্রটি নিবেদিত। এতে চলচ্চিত্রনির্মাতা প্রযুক্তিগত নির্ভরতার পরিবর্তে নিজস্ব অভিজ্ঞতানির্ভর কাহিনীর বস্তুনিষ্ঠতা ও ন্যারেটিভ স্টাইলের যে-সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন তা হতে পারে একটি সময়োপযোগী উদাহরণ। বাংলাদেশে যেখানে ডিজিটাল চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সের মতো একটি-দুটি সিনেমা থিয়েটার ছাড়া অন্য গত্যন্তর নেই, সেখানে ডুবসাঁতার চলচ্চিত্রের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হয়েছে টেলিভিশন। তবে একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা যে-আশা সবসময় করেন, বৃহত্তর দর্শকগোষ্ঠী সিনেমা হলের অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে একাত্ম হবেন তার ছবির সঙ্গে, সে-আশা দুরাশাই থেকে যাচ্ছে। অধিকাংশ সিনেমা হল, তাদের দর্শককে আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নতুন চিত্তাকর্ষক ছবির যোগান দিতে না পেরে যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, সেখানে নিজস্ব উদ্যোগে নির্মিত আতিকের ডুবসাঁতার সিনেমা হলগুলোকে ডিজিটাল প্রজেকশন সিস্টেমের আওতায় নিয়ে আসার জন্য সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের অভাবে শুধুমাত্র টেলিভিশনে প্রদর্শিত হচ্ছে, এটা মানতে খুব কষ্ট হয়।

এ-ছাড়াও সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের স্বাধীন ও শিল্পসম্মত প্রকাশভঙ্গি এবং প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে প্রতি বছর ডিজিটাল মাধ্যমে নির্মিত অন্তত পাঁচটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে যে অনুদান প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন, তা অনেক তরুণ নির্মাতার প্রাণে আশার সঞ্চার করেছে। অথচ এসব ছবি নির্মাতারা কোথায় প্রদর্শন করবেন; এ-বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন। সিনেমা হলগুলোকে ডিজিটাল প্রদর্শন ব্যবস্থার অধীনে আনতে না পারলে সরকারের সব সদিচ্ছায় গুড়েবালি। আশার কথা, সম্প্রতি বেসরকারি উদ্যোগে অন্তত ৫০টি সিনেমা হল ডিজিটাল প্রজেকশন ব্যবস্থার আওতায় আসছে। এতে দেরিতে হলেও ডিজিটাল মাধ্যমে নির্মিত ছবি অন্তত দর্শক সিনেমা হলের উপযুক্ত পরিবেশে বসে দেখতে পারবেন সে-দিন হয়তো বেশি দূরে নয়। 

 

লেখক : এন. রাশেদ চৌধুরী, চলচ্চিত্র নির্মাতা সংগঠক।

[email protected]

 

তথ্যসূত্র

১. রহমান, এবাদুর (২০০৯:৪১); ‘এবাদ-সংলাপিকা’; ডুবসাঁতার সিনেমাতন্ত্র; পাণ্ডুলিপি কারখানা, ঢাকা ।


বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জুলাইয়ের ম্যাজিক লণ্ঠনের তৃতীয় সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন